বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির অল্প কয়েকটা দিন মোটামুটি চললেও এরই মধ্যে তার ভাবীর নানান কথা শুনে গ্রামের আর পাঁচজনও ধারণা করে নিল যে মিথিকে শ্বশুড়বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাও আবার সন্তানসম্ভাবা অবস্থায়। কানাঘেষায় কিছু মানুষ তার ভাবীকে এও বলতে শুনেছে যে মিথির বাচ্চাটা তার নয়।অন্য কারো। এমন নিম্নমানের সমালোচনা যখন গ্রামময় আলোচনা হচ্ছিল তখনও তাকে কেউ একটু আশ্বাস দিল না। মিথিকে সরাসরি কেউ কিছু না বললেও মোটামুটি পুকুরপাড়ে বা বাড়ির উঠোনে বিভিন্ন কথায় বিভিন্ন ভাবে মানুষজন কি বলতে চাইছে তা বোধহয় মিথির বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। মিথি এবারে দমবন্ধ লাগল। ইচ্ছে হলো সব ছেড়েছুড়ে কোথাও চলে যেতে। অনেক দূরে, অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে মন চাইল ওর। গ্রামে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন বিশ্রী অনুভূতি হবে জানলে মিথি আসত না। সত্যিই আসত না। গ্রামময় তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন আলোচনা হচ্ছে? ছিঃ! এই তো একটু আগেও একজন পুকুরপাড়ে বলে বসল,
“ মিথি? তো কি জন্য তোকে এই অবস্থায় বাড়ি থেকে বের করে দিল? কোন দোষ পেয়েছে কি তোর? না মানে, শুধু শুধুই পাঠিয়ে দিল? ”
মিথি কোথাও বলেনি ওকে পাঠিয়ে দিয়েছে ওরা। কিংবা এও বলেনি ও বিনাদোষেই বের করে দিয়েছে। তবুও এই প্রশ্নগুলো ওর কাছে অসহ্য লাগছে। নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা জম্মাচ্ছে ওর। ঠিক এভ আলচোনা সমালোচনার মধ্যে যখন মিথির দমবন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হলো তখন একদিন হিয়া এল। শুনেছে মিথি শ্বশুড়বাড়ি থেকে ফিরেছে। সে শুনেই বান্ধবীকে দেখতে এসেছিল ও। একই গ্রামে থাকায় এসব কানাঘেষা ওর কানেও গিয়েছিল। মিথিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল না হিয়া। অনেকটা সময় একসাথে বসে গল্পগুজব করার পরই হিয়া জিজ্ঞেস করল,
“ রাতে ঘুমাস না নাকি দোস্ত? চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছে তোর। ”
মিথি হেসে উত্তর করল,
“ জীবনের মানে বুঝতে বুঝতে রাতের ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছে হিয়া। তোর কথা বল? সব ভালো চলছে নিশ্চয়? কোন কোন ভার্সিটিতে এডমিশন দিবি? ”
একটা সময় মিথি এবং হিয়া দুইজনই একসাথে পড়েছেে।একসাথে ক্লাস করত, পড়ালেখা করেছে, কলেজ গিয়েছে। অথচ আজ দুইজনার পথচলা ভিন্ন। একটা সময় দুইজনই পড়ালেখায় মনোযোগী ছিল, ভালো ছাত্রী ছিল, স্বপ্নও ছিল দুইজনের এক। অথচ বাস্তবতার কাছে অনেককে বোধহয় হার মানতে হয়। স্বপ্নদের দুমড়ে মুঁছড়ে ফেলে দিতে হয়। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। নিজের স্বপ্নের এমন করুণ পরিণতি দেখে ওর নিজেরই দুঃখ হয়। মায়া হয় ওসব স্বপ্নের প্রতি। তখন ও কতোটা আহ্লাদী ছিল। কতোটা আদুরে হুহ? আব্বার আদরের মেয়ে ছিল। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই হিয়া হুট করে জিজ্ঞেস করল,
“ কথা ঘুরাবি না মিথি। ”
“ কোথায় কথা ঘুরাচ্ছি? এমনিই ঘুম হচ্ছে না হয়তো। তার উপর প্রেগনেন্সি প্রবলেম তাই হয়তো। ”
“ তোর শ্বশুড়বাড়ি ভালো মিথি? মিথ্যে বলবি না। ”
“ হু? ”
“ তোর শ্বশুড়বাড়ির লোক ভালো? বর ভালো? ”
মিথি উত্তর করতে চাইল না। হিয়া ওর অনেক আপন। অনেক কাছের বন্ধু। বলতে গেলে ছোটকাল থেকে ও এই একজনকেই অনেক আপন ভেবে এসেছে। অনেক কাছের ভেবেছে। বরাবরই ওর নিজস্ব ভালো লাগা, খারাপ লাগা সবই ও হিয়ার কাছে প্রকাশ করত। অথচ আজ পারছে না। দুঃখরা গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। মিথি কথা কাঁটাতে চাইল। বলল,
“ তোর ওখানকার সময় কেমন যাচ্ছে? মেসে মানাতে পারছিস? ”
হিয়া রাগল বোধহয়। সরাসরিই বলল,
“ আমি তোর বন্ধু হই তাই না মিথি? তো এত চাপাচাপি কেন থাকবে আমাদের মধ্যে? আগে তো ছিল না। আগে তো তুই গলগল করে সব বলতি।তাকা এইদিকে। আমি তোর আপন তাই না মিথি ? অনেক আপন তো। তাহলে আমায় কেন বলবি না তুই কিছু? ”
“ বলার মতো কি আছে যে তোকে বলব?”
“ তুই কিছু নিয়ে চাপে আছিস। বল কি নিয়ে? ”
” ঐ একটু মুড অফ। ঠিক হয়ে যাবে। ”
হিয়া এবার রেগেই বলল,
“ মিথ্যে বলবি না। যদি নাই বলিস আমি আর কখনো তোর কাছে আসব না মিথি। ”
মিথি তাকাল। হুট করেই হিয়ার দিকে চেয়ে ওর চোখ টলমল করে উঠল যেন। একটা আহ্লাদী জায়গা পেয়ে ও কাঁদতে চাইল যেন। অথচ কান্না আটকাল ঠোঁট কাঁমড়ে। শুধাল,
“ আমি কিছু একটা করতে চাই হিয়া। সবকিছু থেকে, সবার থেকে অনেক দূরে যেতে চাই। এসব, এসব টক্সিকতা আর নিতেই পারছি না আমি। আমি মরে যাচ্ছি বোধহয় হিয়া। ”
হিয়া নিজের বান্ধবীর দিকে চাইল। মিথির মুখে তাকিয়ে ওর নিজেরও মন খারাপ হলো। এগিয়ে বলল,
“ আমায় বল, কি হয়েছে? শ্বশুড়বাড়িতে ঝামেলা? ওরা তোকে মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে তাই তো? ”
মিথি বুঝে গেল হিয়া জানে। গ্রামময় আলোচনা থেকে বোধহয় জানে। মুহুর্তেই মিথির সত্যিই কান্না এল। ছিঃ! মানুষ ওকে কতোটা নিচু ভাবছে। কতোটা! ওকে চরিত্রহীন ভাবছে৷ছিঃ। মিথির ঘৃণা হয় আদ্রর প্রতি। আদ্রর মুখটা চোখে ভেসে উঠতেই ওর রাগে, ঘৃণায় আদ্রকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় যে, কেন করল এমনটা? কেন ওর চরিত্রে দোষ ফেলল আদ্র? মিথি হিয়ার দিকে চেয়ে বলল,
“ তোর বিশ্বাস হয় যে আমি চরিত্রহীন হিয়া? বিশ্বাস হয়? আমি, আমি তো বিয়ের আগের দিন রাতেই মনে প্রাণে তার হওয়ার শপথ নিয়েছিলাম। মুহিব ভাই এর প্রতি তখন অনুভূতি থাকলেও আজ আমার মুহিব ভাইয়ের প্রতি কোন অনুভূতিই নেই। মুহিব ভাই এর নাম শুনলেও আগে যে আমি লজ্জা পেতাম আজ আর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। আমি, আমি আমার ভাগ্য মেনে নিয়েছিলাম ভাই ভাবীর কথাতে। একটা সাঁজানো গোছানো সংসার করার শপথ নিয়েছিলাম আমি মনে প্রাণে।তেমনটা ভেবেই তো আমি বিয়েটা করলাম। যদি তেমনটা না ভাবতাম আমি তোর বুদ্ধি ধরে হলেও পালিয়ে যেতাম হিয়া। পালিয়েছিলাম? তখন কষ্ট হলেও আমি বিয়েটা করেছিলাম, বিয়েটাকে মেনে নিয়েছিলাম। একটা সংসার সাঁজানোর আপ্রান চেষ্টা করছিলাম।অথচ হলো কি? বিয়ের রাতেই আমি তার হিংস্র রূপ দেখলাম। আমার সমস্ত শরীরে তার হিংস্র ছোঁয়া পেলাম। আমি তার মধ্যে অনুভূতি দেখতাম না, অথচ লালসা দেখলাম। কামনা দেখলাম। তবুও আমি তার সাথে সংসার করার চেষ্টা করলাম। বহু চেষ্টা করলাম। বারবার মুহু নামটা শুনলেও আমি কখনো ভাবিনি মুহুটা তার প্রেমিকা হতে পারে হিয়া। আমি কতোটা বোকা! দুই দুইটা মাস আমি নিজের মতো করে চেষ্টা করে গেলাম মানিয়ে নিতে। নিজের মতো করে সংসার সংসার খেলা খেললাম। অতঃপর আমি জানতে পারলাম,আমি মা হবো। তুই জানিস হিয়া? আমার কাছে ঐ অনুভূতিটা কতোটা পবিত্র ছিল। কতোটা সুন্দর ছিল? আমি কি ভেবেছি জানিস হিয়া? যে এই অনুভূতিতে আদ্রও খুশি হবে। আমার সংসারে এই নিয়ে হলেও অনুভূতি স্থাপন হবে।আদ্রর মনেও সুন্দর অনুভূতি জাগবে। অথচ আদ্র তো পাষান। উনি নিকৃষ্ট, জঘন্য! উনি কি করল জানিস হিয়া? ”
হিয়া নিশ্চুপে শুনছিল। উত্তর করল,
“ কি করল? ”
“ আমায় এবরশ করাতে বলল। আমার বাচ্চাটা তার চাই না। কেন জানিস? মুহু তার প্রেমিকা। আমি প্রেগন্যান্ট এমনটা শুনলে তো মুহু জেনে যাবেই যে আমার সাথে সে ফিজিক্যালি ইনভলবড ছিল। তাই, শুধুমাত্র এই কারণে সে আমার বাচ্চাটা চাইল না। মেরে ফেলতে চাইল কতোটা হিংস্রভাবে। আমি ওই রাতটা ভুলব না। কখনো ভুলব না হিয়া। ”
“ তারপর? ”
মিথি হাসল এবার। বলল,
“ তারপর আর কি? নিজের দোষ ঢাকতে আমার উপর দোষ ফেলল। কখনো যদি তার প্রেমিকা জেনে যায়? এই ভয়েই বোধহয় জানাল যে সন্তানটা তার নয়। অন্য কারো। কাপুরুষ! একটা কাপুরুষের সাথে ভাইয়া আমার বিয়ে দিয়েছিল হিয়া। ”
হিয়া চুপ থেকে শুনল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনেকটা সময় পর বলল,
” তোর ভাই ভাবীও তো খুব একটা ভালো না মিথি। আমি শিওর তোকে সাপোর্ট করবে না। পড়ে থাকবি এখানে? ”
“ যাওয়ার মতো জায়গা ও নেই আর। ”
“ শহরে চল। আমার সাথে মেসে থাকিস। কোন একটা কাজ নিশ্চয় পেয়ে যাবি আস্তে আস্তে।পাশাপাশি টিউশনিই পাওয়া গেলে যেতে পারে। কাজ না পাওয়া অব্দি তোর খরচটা আমি ম্যানেজ করে নিব। যাবি? ”
মিথি কিছুটা সময় চুপ থাকল। অতঃপর বলল,
“ আমার কাছে জমানো কিছু টাকা আছে এক মাস চলার মতো। এইছাড়া কিছু সোনা ও আছে। বিক্র করতে পারি তাই না হিয়া? ওগুলা দিয়ে ম্যানেজ করা যাবে প্রথম দিকটা। ”
হিয়া শুনল। বলল,
“ বিক্রি করার প্রয়োজন নেই আপাতত ওসব। পরে বড় প্রয়োজনে লাগতে পারে তো। এখনকার দিকটা আমি আর তুই মিলে মিটিয়ে নিতে পারব। আমি ওখানে কথা বলে নিব হু? পরশু বিকালে যাব কেমন? ”
মিথি শুনল। ওর সত্যিই কোথাও স্বস্তি লাগছে এখান থেকে বের হতে পারবে ভেবে। সত্যিই শান্তি লাগছে। বলল,
“ হিয়া? ”
“ কি? খুশি না তুই? ”
মিথি বলল,
“ আমি সত্যিই সব ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ হিয়া। ”
হিয়া মিষ্টি করে হাসল। বলল,
” পাগল। ঐ জানো”য়ারকে দেখিয়ে দিতে হবে না আমার বান্ধবী কি জিনিস? আমার সাথে একবার দেখা হলে ঐ ব্যাটার কপালে নির্ঘাত দুঃখ আছে। শা’লা ক্যারেক্টারল্যাস একটা। এতই যখন প্রেমিকার প্রতি প্রেম তখন বউকে কেন কাছে টানলি শা’লা?এটাই জিজ্ঞেস করতাম সবার প্রথমে। ”
হিয়ার সাথে কথা বলার পরই মিথিকে নিশ্চিন্ত দেখা গেল। সেদিনটা ও উৎফুল্ল হয়েই কাজকর্ম করল। অতঃপর রাতে দেখা গেল আদ্রর মা এল। তার ফুফি৷ মিথি কিছুটা অপ্রস্তুতই হলো এতে। সে ভাবেনি ফুফি আসবে৷ তাও তাকে নিতে। আদ্র মা মূলত মিথিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই আসল। অথচ মিথি যেতে রাজি হলো না। অবশেষে উপায় না পেয়ে এমনও প্রস্তাব রাখা হলো যে ওর জন্য আলাদা বাসা ঠিক করবে। আদ্র যাবে না। ও নাহয় আলাদা বাসাতেই থাকবে।তবুও মিথি রাজি হলো না। আদ্রর মা নিজের ছেলের অন্যায়ের জন্য জোর দিয়েও কিছু বলতে লজ্জা হলো। নয়তো মিথিকে জোর করেই নিয়ে যেতেন উনি। পরদিন সকালে উনাকে ফিরতে হলো খালি খালিই। মিথিকে নিতে পারলেন না। তবে মিথির জন্য কিছু টাকা দিয়ে গেলেন মিথির ভাবীর কাছেই। অতঃপর সেদিন বাসায় ফিরেই সর্বপ্রথম দেখা হলো আদ্রর সাথে। আদ্রর সাথে তার মা কথা বলছে আজ অনেকদিনই। মিথি যাওয়ার পরই। আদ্রও কি বুঝতে পেরেছে মায়ের রাগের জায়গাটা? হয়তো বুঝেনি। আদ্র এগিয়ে এল। আজ তার মায়ের জম্মদিন। তাই তো সুন্দর করে শুধাল,
” আম্মু, হ্যাপি বার্থডে। ”
আদ্রর মা উত্তর করল না। এড়িয়ে যেতে নিলেই আদ্র শুধাল,
“ তুমি আমার সাথে কথা বলছো না আম্মু। কেন বলছো না? কথা বলো আম্মু। ”
আদ্রর মা তাকাল। উত্তর করণ,
“ তোমাকে ছেলে ভাবতে লজ্জা হচ্ছে তাই। ”
“ কি করেছি আমি? ”
“ কি করোনি? একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগে আছো। বলেছিলাম সবটা ঠিক করে নাও। সম্পর্কটা ঠিক করো আদ্র। তুমি করলে না। ”
আদ্র চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পর বলে,
“ আমি তো মুহুকে ভালোবাসি তুমি জানো আম্মু। ”
“ আমিও মিথিকে ভালোবাসি। তুমি জানো মিথি কতোটা নিষ্পাপ, সহজ সরল? ভাইয়া মারা যাওয়ার পর ওকে পুত্রবধূ করেছিলাম কেবল ওর কষ্ট দূর করার জন্য। অথচ এখন মনে হচ্ছে ওর কষ্ট আরো বাড়ালাম আমি। তোমার মতো বেয়াদবের সাথে বিয়ে দিয়ে ওর জীবনটাই শেষ করলাম। কি করে পারলে ওকে এতোটা কষ্ট দিতে? ”
আদ্র তার মাকে ভয় পায় এটা ঠিক। তবে আজ বোধহয় ভয় হলো না। বলল,
“ কি কষ্ট দিয়েছি ওকে? ওর উচিত ছিল না বিয়ের আগে জেনে নেওয়া যে ওর স্বামী অন্য কাউকে ভালোবাসে?ও কি করে মুহুর জায়গা নিবে বলো? ”
“ বারবার মুহুর নাম করবে না। ঐ মেয়েটাকে আমি সহ্য করতে পারি না আদ্র। তুমি জানো। ”
এটুকু বলেই আবারও বলল,
“ তুমি জানো? মিথি তোমায় কতোটা ঘৃণা করে আদ্র? তোমার সাথে সাথে ওর চোখে আমি আমার জন্যও ঘৃণা দেখেছি। অথচ ওর আম্মু হতে চেয়েছিলাম আমি। আর সে আমিই ওর চোখে এতোটা ঘৃণার হয়ে উঠলাম যে এতবার বলার পরও ও আমার সাথে আসল না। বোধহয় ওভরসা করতে পারছে না আমার উপর। ”
“ ওর এত সাহস হলো যে ও তুমি বলার পরে না করেছে?আমার আম্মুকে না করেছে? ”
আদ্রর কথা শুনে ওর মা উত্তর করল,
“ কেন আসবে ও? তোমার মতো নিকৃষ্ট মানুষ যেখানে আছে ওখানে নিশ্চয় কোন মেয়ে ফিরবে না আদ্র। ”
“আমি তোমার কাছে নিকৃষ্ট মানুষ আম্মু?”
“ আদ্র, নিজের সন্তানের গুরুত্বই দিতে পারোনি তুমি। নিজের প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতিকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছো। আর তুমি বলছো তুমি নিকৃষ্ট মানুষ নও? ”
মায়ের কথা শুনে আদ্রর এই প্রথম বোধহয় নিজের প্রতি খারাপ লাগল। ওর মায়ের চোখে ওর জন্য রাগ নয়, বরং ঘৃণা দেখাচ্ছে। আদ্র কি বেশি অন্যায় করেছে? ছোটবেলায় যেমন অন্যায় করলে আম্মু রাগ করত? আজ তো রাগ করছে না, ঘৃণা করছে। আদ্র আম্মুকে ভালোবাসে। সত্যিই ভালোবাসে। কিন্তু মুহুকেও ভালোবাসে ও। কি করবে ও. আম্মুর ঘৃণা কাঁটাতে ও অনেকটা সময় পর আবারও আগের মিথ্যেটা বলতে লাগল,
“ উহ, সত্যি বলছি আম্মু। ওটা আমার বাচ্চা…”
অতঃপর কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই আদ্রর গালে স্বশব্দে একটা চড় পড়ল। নিজের মায়ের চড় খেয়ে হাতটা যখন অটোমেটিক গালে গিয়ে পৌঁছাল তখন তার মা বলল,
“ মিথ্যে বলবে না আর। আমি জানি কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে আদ্র। বারবার মিথ্যে বলবে না। তোমাকে আমার অসহ্য লাগছে দেখতেও। ”
“ আম্মু… ”
“ তোমাকে আমার ছেলে ভাবতেই আজকাল লজ্জা লাগছে আদ্র। একে তো মিথ্যে বলছো, মিথির চরিত্রে আঙ্গুল তুলেছো। ওসব আমাদের পর্যন্তই থাকলে হতো না? ওসব তুমি ওর ভাবীকেও বলেছো? কোন সাহসে বলেছো? ”
আদ্র নাক লাল হয়ে এসেছে। রাগ হচ্ছে। অদৃশ্য রাগ জমছে মিথির উপরও। বলল,
“ জিজ্ঞেস করল কেন ওর ভাবী? আমি তো নাহলে বলতাম না। ”
“ তোমাকে যদি ছোটবেলায় মেরেধরে মানুষ করতাম আদ্র, তাহলে এমনটা হতেই না। এমন অমানুষ হতে না অন্তত। মিথি তোমার থেকে মুক্তি চায়, ডিভোর্স চায় এটক তোমার কাছে লজ্জার লাগছে না আদ্র? ”
আদ্র উত্তর করল না। ওর মা আবারও বলল,
“ মুহুর সাথে মেলামেশা বন্ধ না করলে আমি সত্যিই তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিব আদ্র। এমনকি, তোমার একটা খরচও দেওয়া হবে না দেখো। মুহুকে আমি জীবনেও মানব না। কোনভাবেই মানব না। আর না তো মিথির সাথে তোমার ডিভোর্স হতে দিব। আমার নাতি নাতনিকে আমি মা বাবা হীন দেখতে পারব না। বলে রাখলাম তোমায়। ”
আদ্র এবারও নিরুত্তর । ওর মা আবারও বলল,
“ সত্যিই তোমার কোন দায়িত্ববোধ নেই আদ্র? তোমারই তো সন্তান। একবারও নিজের নিজের অনুভব হচ্ছে না? একবারও তোমার খুশি লাগছে না? অথচ তুমি যখন আমার গর্ভে তখন তোমার বাবা কতোটা খুশি হয়েছিল। পুরোটা বাড়ি মাথায় করে রেখেছিল। এখন আমার কি মনে হচ্ছে জানো? সেদিন তোমার উপস্থিতির কথা শুনে তোমার বাবারও খুশি হওয়া উচিক হয়নি। সত্যিই উচিত হয়নি। তোমার জম্মের পর আমারও ঐ সন্তান সন্তান অনুভূতি নিয়ে কেঁদে ফেলা উচিত হয়নি। সেদিনের এতোটা খুশি আজ আমার কাছে অর্থহীন লাগছে আদ্র। তুমি? তুমি কি করে এমন অমানুষ হলে?তোমার, তোমার নিজেরই স্ত্রী সন্তানসম্ভাবা। অথচ তুমি? তুমি কিনা অন্য নারীর সাথে সময় কাঁটাচ্ছো। ”
আদ্র রুমে ফিরে এল মায়ের কথাবার্তা শুনে। অতঃপর দেখল মুহু কল দিয়েছে। আদ্রর ইচ্ছে হলো না মুহুর কল তুলতে। রাগে হিসহিসিয়ে শুধু বলল,
” মিথি, তুই আমায় বারবার খারাপ করছিস। কি হতো, এবরশন করালে? সবটা ঠিক থাকত। তোর জন্য আমি এতোটা খারাপ হয়েছি। তোর জন্য মিথি। আমি নয়তো বলতামই না এতকিছু। ”
মুহু আবারও কল দিয়েছে। আদ্রর রাগ লাগছে শুধু। মুহুকে বারবার কল করতে দেখে কল তুলল ও। কানে তুলে বলল,
“ কিছু বলবে মুহু?”
ওপাশ থেকে মুহু বলে উঠল,
“ কল ধরতে দেরি হলো কেন তোমার? ”
“ এমনিই।”
ওপাশ থেকে মুহু শুধাল,
“ এতক্ষন মিটিংয়ে ছিলাম আদ্র। একটা কোম্পানির সাথে ডিল ছিল।বাট কোম্পানির ওউনার যে সে ছেলেটার মধ্যে অদ্ভুত কিছু একটা ছিল আদ্র। ”
মুহু সবসময়ই সব গল্প আদ্রকে বলে।অথচ আদ্রর আজ শুনতে মন চাইল না। মেজাজ খিটখিটে লাগছে।বলল,
“ তো?”
মুহু আবারও বলল,
“ তুমি প্রথমবার যেভাবে আমাকে এটিটিউড দেখিয়েছো এই ছেলেটাও আমার সামনে ওভাবে এটিটিউড দেখাল আজ। পাত্তা দিল না। আমাকে, মুহুকে পাত্তা দিল না আদ্র। আমার ইগোতে লেগেছে। ”
আদ্রর বোধহয় এই প্রথম মুহুকে বিরক্ত লাগে। চিড়বিড়ে স্বরে বলল,
“ এসব শুনে আমি কি করব?”
“এটিটিউড কেন দেখাল সে?”
আদ্র উত্তর করে না এবারে। ফোনটা রেখে দিয়ে ছুড়ে ফেলল। অতঃপর বিছানায় চুখ বুঝে গা এলিয়ে বলল,
“ আম্মু, আম্মু বলেছে আমি নিকৃষ্ট মানুষ।আমি অমানুষ। আমার জম্মের সময় তার খুশি হওয়া উচিত ছিল না। আম্মু, আম্মু বলল আমায়।মিথি, মিথি! তুই দুইদিনে এসে আমার আম্মুর এত প্রিয় হয়েছিস? আমার আম্মু আমায় অমানুষ বলেছে! তোর জন্য। ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১২
এসব বিড়বিড় করেই ও আবার ফোন তুলে মিথির ভাবীর নাম্বারে কল দিল। শান্ত গম্ভীর কন্ঠে মিথিকে দিতে বলল। অথচ মিথির ভাবী যখন ফোন নিয়ে মিথির কাছে গেল তখন মিথির একটাই কথা শোনা গেল,
“ উনার প্রতি আমার কেবল ঘৃণায় হয় ভাবী। কথা বলার ইচ্ছা আসে না। ”
আদ্র আবারও রাগে ফোন ছুড়ে মারল। মিথি? ঐটুকু মেয়ে? ঐটুকু ভীতু মেয়েটার কি কথা ফুটেছে আজকাল। ওর সাথে কথা বলার ইচ্ছা আসে না ওর? আদ্রর সাথে? যেখানে আদ্রর সাথে সব মেয়েরা কথা বলতে উৎসুক হয়ে থাকে, সেখানে কিনা এই মিথি ওর মুখের উপর এভাবে প্রত্যাখান করেছে?
