প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫২ (২)
জান্নাত নুসরাত
ঘড়ির কাটা টিকটিক করে রাত এগারোটা পঁঞ্চাশ মিনিটে থেমেছে৷ অন্ধকার ড্রয়িং রুমের সোফায় চুপচাপ বসে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে নুসরাত। অনেক্ষা করছে কখন বারোটা বাজবে। আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। সৌরভি আর ইরহাম এখনো ঝগড়া করছে। ঝগড়ার কারণ সেপারেশনে যখন সবাই তাদের পাঠাতে চাচ্ছে তাহলে ইরহামের এমন মনোভাবের কারণ কী! তাকে ছেড়েই দিলে তো পারে। বিবাহ নামক বন্দনে আবদ্ধ রাখার মানে কী? বিরক্ত হলো ভীষণ নুসরাত! সারাদিন ঝগড়া করে খায়েশ মিটেনি, এই রাতের বেলা ও ঝগড়া করতেছে। মানুষকে কী ঘুমাতে দিবে না? তার ভীষণ ইচ্ছে হলো দুটোকে লাত্থি দিয়ে বাড়ির বাহিরে ফেলে আসতে, কিন্তু কিছু ইচ্ছে পূরণ করা যায় না, তাই ইচ্ছেটাকে কোনোভাবে মনের ভেতর দামাচাপা দিয়ে সময় দেখে নিল আবার। এগারোটা ঊনষাট বাজছে। নুসরাত মেসেজ টাইপ করল আরশের নাম্বারে,”জন্মদিনের শুভেচ্ছা, মাওলানা, হাজী সৈয়দ আরশ হেলাল…!
মেসেজটা সেন্ড করে নুসরাত নিজের রুমে পা চালিয়ে চলে গেল। বিছানায় লাফিয়ে উঠে শুয়ে পড়তেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল।
সৌরভির রাগে শরীর কাঁপছে। ইরহামের দিকে তাকিয়ে আছে সে। কিন্তু ইরহাম? সে সৌরভির দিকে ফিরে ও তাকাচ্ছে না। স্ত্রীর ক্ষোভপূর্ণ দৃষ্টি নিজের উপর বুঝতে পেরে নড়চড় বিহীন। নির্লিপ্ত! দুপুর থেকে এমন করেই খেয়ে ফেলবে, খেয়ে ফেলবে দৃষ্টিতে চেয়ে। ইরহাম ভিডিও গেম খেলছিল। মনোযোগ স্থির রাখতে পারল না। গেমপ্যাড কাউচে ফেলে ঘুরে তাকাল সৌরভির দিকে। মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করল,”সমস্যা কী?
উত্তর আসলো তেঁতানো কন্ঠে,”কী সমস্যা হবে?
“তাহলে আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?
‘“তাকিয়ে থাকার কারণ তুমি জানো না, ইরহাম?
ইরহাম স্বাভাবিক ভাব ভঙ্গি রেখেই বলল,“না, জানি না! তুমিই বলো?
সৌরভির মস্তিষ্ক যন্ত্রণা চৌচির হলো। চোখ মুখ খিঁচে জিজ্ঞেস করল,”সত্যি তুমি জানো না? নাকি আমার সাথে ভান করছ?
অবাক কন্ঠস্বর তার,”আশ্চর্য, আমি জানব কীভাবে, কী হয়েছে না বললে?
“নাটক করবে না ইরহাম!
ইরহাম নিজেও গম্ভীর কন্ঠে হুশিয়ারি দিল,“ তুমি ও হেয়ালি করবে না, যা বলবে তা স্পষ্টভাবে বলবে। নাহলে চুপ থাকবে।
সৌরভি নিজের দিকে আঙুল তুলল,”আমি হেয়ালি করি, আমি?
“অবশ্যই, তুমি হেয়ালি করছ। এভাবে তাকিয়ে ছিলে কেন, পরিষ্কার করে বলবে, তা না করে তুমি আমার সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিচ্ছো?
সৌরভি কিছু বলতে চাইল কথার বিপরীতে ইরহাম থামিয়ে দিল। কথা বললে কথা বাড়বে এজন্য। নরম কন্ঠে শুধাল,”কী হয়েছে, বলো?
সৌরভি কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গিয়েছিল এতক্ষণে। ইরহামের নরম কন্ঠে তা আবার গাঢ় হলো। নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,”সবাই আমাদের সেপারেশনে যেতে বলছে, তাহলে তোমার সমস্যা কী এখানে?
“আমার কোনো সমস্যা নেই।
“তাহলে ওখানে বড়দের কথা শোনলে না কেন?
“আমি সেপারেশনে যেতে চাই না, এজন্য শুনিনি।
হাইপার হয়ে সৌরভি বলল,“ কিন্তু আমি সেপারেশনে যেতে চাই।
ইরহাম গেমপ্যাড হাতে তুলে নিয়ে, কাউচে পা ছড়িয়ে বসল। বলল,”তোমার কথা কে মূল্য দিচ্ছে?
“আমার কথার কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে?
ইরহাম শব্দ করে শ্বাস ফেলল। এগিয়ে এসে সৌরভির কাছে বসতে বসতে বলল,”অবশ্যই, তোমার কথার মূল্য আমার কাছে সবার আগে। কিন্তু সেই কথাটা যুক্তিপোযুক্ত হতে হবে। এমন বাল ছাল কথার কোনো মূল্য নেই।
“তোমার কাছে সেপারেশন বালছাল মনে হয়?
ইরহাম কাঁধ ঝাঁকাল,”কেন মনে হবে না? কোনো কারণ আছে? সেপারেশন, ডিভোর্স এসব বালছালই… আমার কাছে তো তাই মনে হয়। এই যে আমরা বিয়ে করে আনন্দে আছি, এটা নষ্ট হয়ে যাবে সামান্য এই সেপারেশনের জন্য।
সৌরভি খ্যাপল। রাগে ক্ষোভে ভেতরটা ফেটে গেল। তবুও যতেষ্ট ঠান্ডা স্থির থাকার চেষ্টা করল। কন্ঠে
তাচ্ছিল্য নিয়ে জিজ্ঞেস করল,”আমরা আনন্দে আছি, বিয়ে করে?
ইরহাম অবিচল, অনড় তার কথায়। সৌরভির হাত নিজের দু-হাতের মুঠোয় চেপে ধরল,”তুমি না থাকলে কী হলো? আমি তো আছি, খুশিতে।
“তাহলে তুমি আমায় ছাড়বে না এই জঞ্জাল থেকে?
“ উঁহু, এই জীবনে তো না! আর তাছাড়া তোমার কাছে যা জঞ্জাল মনে হচ্ছে তা আমার কাছে ফুলের বাগান মনে হচ্ছে।
বিড়বিড় করে আওড়াল সে,“অসহ্য..!
সৌরভির কথার বিপরীত ইরহামের স্লান হাসল। ইরহামের হাসি, নরম কন্ঠে সৌরভির মাথা ব্যথা শুরু হলো। কিৎকাল তার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, হয়ে উঠল না। চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দু-জনের। নিমেষেই চোখ সরিয়ে নিল সৌরভি। ইরহাম তখনো চুপচাপ তাকিয়ে তার দিকে! একদৃষ্টিতে! তার দৃষ্টির গভীরতায় হাফসাফ করল মেয়েটা। দমবন্ধ এই পরিবেশ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ঘাড় বাঁকিয়ে পশ্চিমের জানালার দিকে তাকাল, উদাস চোখে একমনে তাকিয়ে রইল।
ধীরে ধীরে পুরো রুমটা অন্ধকারে ডুবে গেল, সৌরভির অজান্তে। শক্ত বুকে মাথা ঠেকতেই মোচড়া মুচড়ি করল । ইরহাম চেপে ধরে রাখল নরম শরীরটা নিজের সাথে। হাড়গোড় ভেঙে গুঁঢ়ো করে দেবে তার চেপে ধরার ধরণটা এমন।
সৌরভির শক্ত হয়ে থাকা শরীর নরম হয়ে আসে। সন্ধ্যার সূর্যের আলোর মতো মিইয়ে যায় সে। অতঃপর আর নড়চড় করল না। নিশ্চুপ পড়ে রইল ইরহামের বুকে। চোখ বেয়ে এক ফোটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। গালে থেকে গেল তার চিহ্ন।
ঝিঝি পোকার ঝিঝি ডাক ভেসে এলো পেছনের জঙল থেকে। রাতের উত্তাল হাওয়া পশ্চিমের খোলা জানালা দিয়ে এসে ছুঁয়ে দিল তাদের। মধ্যরাতে হুতুম প্যাঁচার এক নাগাড়ে ডাক শোনা গেল, সাথে সৌরভির মৃদুমন্দ ফুঁপানোর আওয়াজ,”আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না, ইরহাম!
ইরহামের কন্ঠ খাদে নামানো, শক্ত, অথচ দৃঢ় গলা রুমের চারিপাশে বারি খেল,“তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে কে, সৌরভি? আমি তোমার কাছে আর কোনো ক্ষমা চাইব না। যে দোষ আমি করিনি তার ভার আমি বয়ে বেড়াবো না আর।
সৌরভির শরীর কাঁপে সামান্য। কান্নার তোড়ে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বুনো ফুলের সুগন্ধি নাকে এসে সুরসুরি দিয়ে উড়ে যায়। ইরহামের ঠোঁট গাল হতে শীতিল হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। সৌরভি বিড়বিড়ায় নিজ মনে,”ধ্বংস হয়ে যাবে তুমি, সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে আমার মতো। আমার অভিশাপ লাগবে তোমার গায়ে। দুনিয়ার নিষ্ঠুরতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে তুমি, বিলীন হয়ে যাবে তোমার অস্তিত্ব…
সকাল এগারোটা। সাধারণ এই কয়েকদিনের তুলনায় আজকের দিনে হট্টগোল বেশি শোনা যাচ্ছে সৈয়দ বাড়িতে। নুসরাত ব্রাশ করতে করতে এগিয়ে গেল বাড়ির বাহিরে৷ সামান্য উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখল, অতঃপর মুখে পানি ছিটা দিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ও বাড়িতে কী হয়েছে তা জানার জন্য। নাছির সাহেব পেছন থেকে হাঁক ছুঁড়লেন,’”কোথায় যাচ্ছো ঘুম থেকে উঠে?
লাগামহীন ছুটে যাওয়া নুসরাতের পা ব্রেক কষল যেন,”আব্বা, একটু ও বাড়িতে যাই।
“কেন?
কপাল কুঞ্চিত করে পরপর প্রশ্ন ছুঁড়লেন ভদ্রলোক। নুসরাত সেলিনের স্যান্ডেল জোড়া হাতে নিয়ে দৌড়ানোর প্রয়াস করল। বলল,”এসে বলব, এখন যাই।
নাছির সাহেব নুসরাতকে যেতে দিলেন না। কথার বলার তালে এগিয়ে এসে চেপে ধরলেন তার হাত। বললেন,”আজ আমার সাথে অফিসে যাবে তুমি।
চোখ, মন সৈয়দ বাড়ির দিকে স্থির রেখে, তাড়া দিয়ে জানতে চাইল,”চয়েসে’’র শো-রুমে যাবেন নাকি কারখানায়?
“শো-রুমে!
নুসরাতের মুখ দেখার মতো হলো। জিজ্ঞেস করল,”ওই ম্যানেজার আবির এখনো চয়েসে রয়েছে?
নাছির সাহেব প্রশ্নের উত্তর দিলেন,“হ্যাঁ..!
নুসরাত আর কথা বাড়াল না। বলল,”আচ্ছা এসে যাব৷ আপনি এবার আমার হাত ছাড়ুন আব্বা।
“কিন্তু আমরা এখনই যাব।
“এসে যাই, পাঁচ মিনিট।
হাতের আঙুল বাবাকে দেখিয়ে চোখ পিটপিট করল। নাছির সাহেবের হাত ঢিলে হয়ে আসলো মিষ্টি মুখটার দিকে তাকিয়ে। হাত ঢিলে হতেই দৌড় দিল নুসরাত। তার হুড়োহুড়ি করে দৌড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললেন নাছির সাহেব।
জায়িন আর ইসরাতের ঝগড়া লেগেছে। বিয়ের দশ দিন পর নতুন দম্পতির ঝগড়া লেগেছে তা সৈয়দ বাড়ির সবার মুখ দেখে মনে হলো বড় আনন্দদায়ক ঘটনা ঘটছে। রুহিনী বেগম নিজের বিয়ের স্মৃতিচারণ করে আবেগে আপ্লুত হয়ে ঝর্ণা বেগমকে বললেন,”বাসর রাতে সোহেদকে লাথি দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দেওয়ায় আমাদের ও জায়িন ইসরাতের মতো ঝগড়া হয়েছিল।
ঝর্ণা বেগম জা এর দিকে একবার অবশ্য চোখ পাঁকিয়ে তাকালেন, এমন তারছেড়া কথা বলার জন্য।
দো-তলা থেকে ঝগড়ার শব্দ ভেসে আসছে এখনো। জায়িনের গলা শোনা যাচ্ছে না তেমন, ইসরাতের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কথা বলছে কম চ্যাঁচাচ্ছে বেশি। তার গলার তিরিক্ষি স্বর দরজার ফাক গলে বেরিয়ে বারি খাচ্ছে চারিদিকে। তেক্ত কন্ঠে সে বলছে,”জায়িন, আপনি আমার উপর দোষ চাপাচ্ছেন কেন? নিজের জিনিস যদি নিজে সামলে না রাখতে পারেন, তাহলে আমার দোষ কোথায়? আমি হাত দিব কী, দেখিনি পর্যন্ত আপনার কার্ড, পাসপোর্ট!
অতঃপর কথার বিপরীতে জায়িনের গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো,”আমি দোষ চাপাচ্ছি তোমার উপর। এমন এক থাপ্পড় গালে বসাব, চাপার সব দাঁত নড়ে যাবে।
নুসরাত ঝগড়া দেখার জন্য দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠল। শান্ত শিষ্ট জায়িন ভাই, আর ইসরাত দু-জনে হঠাৎ চ্যাতল কেন, কারণ খুঁজে পেল না সে। কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে করিডোর পাড় করল তড়িৎ পায়ে। দরজা থেকে দু-হাত দূরত্বে এসে দাঁড়াতেই, কপালের ভাঁজ আরোকটু বেড়ে গেল। মুখ কুঁচকে তাকিয়ে দেখল ছোট মা আর বৌমার কান্ড। লাইন ধরে সবাই ভেজানো দরজার সামনে বসে আছেন। মাহাদি, আহান, ঝর্ণা বেগম আর রুহিনী। দু-জনের চোখ স্থির রুমের ভেতর হলেও একজন অন্যজনকে ধাকাচ্ছেন তরকারি চুলোয় বসানো একটু দেখে আসার জন্য, কিন্তু কেউই নতুন দম্পতির ঝগড়া রেখে তরকারি পুড়ে যাচ্ছে কি না তা দেখতে গেলেন না।
ঝর্ণা বেগম বললেন,”যা তো ছোট, চুলোয় তরকারি বসানো আছে, গিয়ে দেখে আয়।
রুহিনী বেগম বললেন,”আপা তুমি যাও, আমি পারব না।
ঝর্ণা বেগম তোষামোদ করলেন,”যা না তরকারি পুড়ে যাবে।
রুহিনী বেগম নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে ওঠলেন,”একদিন পুড়া তরকারি খেলে কিছু হবে না, ওদের ঝগড়া দেখতে দাও তো আপা। দেখি জায়িন আব্বা, আর ইসরাত আম্মা কী করে!
দু-জনে সহমত পোষণ করে সামনের দিকে তাকালেন। আকস্মিক সবাইকে ধাক্কিয়ে এসে নুসরাত ও ঢুকে পড়ল। বোকাদের মতো হা হা করে দাঁত বের করে হেসে বলল,”আমি ও ঝগড়া দেখতে এসেছি ওদের।
রুহিনী বেগম জায়গা করে দিলেন। নুসরাত জায়গা থাকলেও মেঝেতে বসল না, ধপাস করে গিয়ে রুহিনীর কোলে বসল। বলল,”তোমার একটা বড় ছেলে থাকলে, শিওর তাকে আমি বিয়ে করে নিতাম।
রুহিনী বেগম মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,”এমন অকর্মাণ্য মেয়ে মানুষকে আমি আমার ছেলের বউ বানাতাম না কখনো।
হাসল নুরুল ঠোঁট এলিয়ে। হাত সামনে এনে কিছু একটা ছিটিয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল,”জাদুটোনা করতাম তোমাকে আর তোমার ছেলেকে। চুহ চুহ বলে!
রুহিনী বেগম খুব ধীরে থাপ্পড় বসালেন পিঠে। কিৎকাল বিলম্ব হওয়ার পর দু-জনে মনোযোগ দিল সম্মুখের দিকে। ইসরাত রাগে লাল হয়ে আছে, অদেখা ধোঁয়া উড়ছে তার দু-দিকে। নুসরাত লাল কাপড় দেখলে ষাঁড় যেমন লাল হয়ে যায় রাগে, তেমন করে ইসরাতের চেহারাটা ভাবল। তার ভাবনার মতোই ইসরাত তেমন একটা কান্ড করে বসল। হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে জায়িনের বুকে ধাক্কা দিল হাত দিয়ে। আকস্মিক ধাক্কায় সে পেছনে সরে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে তেড়ে আসা স্ত্রীর হাত দু-খানা চেপে ধরল আত্মরক্ষার জন্য৷ ইসরাত তাতে আরো বেশি খ্যাপল। খ্যাপা ষাঁড়ের মতো মাথা দিয়ে ধাক্কা দিল তার বুকে।
“আশ্চর্য ইসরাত, আপনি আমাকে গরুর মতো ধাকাচ্ছেন কেন?
ইসরাত চ্যাঁচাল,“আমি গরু না, গরু আপনি।
“হ্যাঁ, আমি গরু, আর গরুর স্ত্রী আপনি বাছুর।
নুসরাতের জিভ কাঁপল। কথাটা শুধরে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোনোরকমে গলবিলে আসা কথাটা সামলাল। বিড়বিড় করে আওড়াল,”গরুর স্ত্রী গাভী ব্যাটা, বাছুর না। অশিক্ষিত, মূর্খ!
ইসরাত নিজের হাত ছাড়াতে না পেরে আবারো বুকে ধাক্কা দিল মাথা দিয়ে। জায়িন ইসরাতের দু-হাত ঘুরিয়ে শক্ত করে পিঠের কাছে চেপে ধরে, অন্যহাতে মাথাটা চেপে ধরল বুকে৷ শুভ্র চেহারাটা তখন রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। বারংবার বিড়বিড় করছে সে,”আমি মোটেও গরু না, আপনি গরু, আপনি গরু।
জায়িন সহজ কন্ঠে স্বীকারক্তি দিল,”আচ্চা, আমিই গরু। এবার রাগ ঠান্ডা করুন।
প্রথম দিকে বুক থেকে মাথা ছাড়ানোর জন্য ইসরাত ছটফট করলেও এখন তা থামিয়ে দিয়েছে। চোখদুটো বন্ধ করল। চুপচাপ দুয়েক সেকেন্ড এমন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ফুঁপিয়ে উঠল। এক ফোটা নোনাজল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। জায়িন পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। বলল,”হয়েছে, আর কাঁদবেন না।
“আপনি আমার উপর দোষ চাপাচ্ছেন, জায়িন? আমি আপনার পাসপোর্ট স্পর্শ পর্যন্ত করিনি।
“আচ্ছা, আ’ম স্যরি! সব দোষ আমার।
ইসরাত মাথা তুলে তাকাল। রক্তাভ হওয়া চেহারাটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে,”স্বীকার করছেন, সব দোষ আপনার?
জায়িন উপর নিচ মাথা নাড়াল৷ বলল,”আমি স্বীকার করছি, সব দোষ আমার। এবার কী স্বীকারক্তির জন্য লিখিত দলিল দিতে হবে?
““ইয়েস, আপনি আমাকে লিখিত এগ্রিমেন্ট দিবেন। এবং ভবিষ্যতে আপনার যেকোনো কিছু হারিয়ে গেলে আমার উপর কোনোপ্রকার দোষ চাপাতে পারবেন না, আর চিৎকার তো একদম করতে পারবেন না।
জায়িন শ্রাগ করল কাঁধ। ইসরাতের কথায় তাল মিলিয়ে ঠিক আছে বলল। কথা বলার মধ্যেই, তাদের মাঝে দু-হাত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জায়িন তাকাল ইসরাতের দিকে! সময় নিয়ে তাকিয়ে থাকল! সময় গড়াল! টিকটিক করে ঘড়ির কাটা গিয়ে থামল এগারোটা আটত্রিশ এর ঘরে। অনড় অবিচল জায়িনের দৃষ্টি হতে ইসরাত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। শীতিল, একগুঁয়ে নেত্রের তোপে পড়ে আমতা আমতা করে ওঠল সে। জায়িনের দৃষ্টি নিজের থেকে টলাতে জিজ্ঞেস করল,”কিছু চাই আপনার?
লোকটা দু-হাত দু-দিকে ছড়িয়ে দিয়ে নির্লজ্জের মতো আবদার করে বসল,”শান্তির প্রয়োজন, এদিকে এসে একটু জড়িয়ে ধরুন তো আমায়..!
ইসরাত হেসে ফেলল শব্দের সহিত। জায়িনের আবদারে দু-পা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতেই, তাকেও লোকটা দু-হাতে কোমর চেপে টেনে নিল নিজের সান্নিধ্যে। এতে সামান্য মেঝে থেকে উপরে উঠে গেল ইসরাতের পা। তবুও লক্ষীটি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে স্বামীর নিকটে, একদম হৃদয়ের কাছে।
নুসরাত চোখদুটো গোলাকার আকৃতির করে হা করে দেখছিল দু-জনের কান্ডকারখানা। তার দেখার মধ্যে ব্যাঘাত ঘটাতে রুহিনী বেগম চোখ চেপে ধরলেন। নুসরাত ভীষণ বিরক্ত হলো। চেপে ধরা হাতের উপর দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখতে চাইল সম্ভব হলো না৷ তারপর ও প্রয়াস চালাল। বিরক্ত স্বরে বলল,”আরে দেখতে দিচ্ছো না কেন ছোট আম্মু?
“অন্যের রোমান্স কেন দেখবে তুমি?
নুসরাত নিজের চোখ থেকে হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল,”তোমরা ও তো দেখতেছ?
“আমরা দেখলে এক আর তুমি দেখলে আরেক।
নুসরাত দাঁতের কপাটি চাপল। গাল ফুলিয়ে বলল,
”তোমরা আমি আর কী আলাদা, দেখলে কী সমস্যা হয়?
“অনেক সমস্যা! নিজে বিয়ে করে রোমান্স করো, অন্যের রুমে আড়ি পেতে রোমান্স দেখবে না একদম৷
ভীষণ অপমানিত বোধ করল নুসরাত। ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেল। আহান তখনো দরজার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। তা খেয়াল করে ঝর্ণা বেগম তার কান চেপে ধরে টেনে নিয়ে আসলেন দূরে। ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইলেন,”এত মুচকি হাসির কারণ কী?
আহান থতমত খেল। হাসি মিলিয়ে গেল সেকেন্ডের ভেতর। মা চাচির কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে গোমড়া মুখে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হতেই মায়ের হুশিয়ারি বাক্য কানে আসলো আহানের,”আর যেন জায়িন ইসরাতের রুমের সামনে না দেখি।
আহান নাকের পাটাতন ফোলাল। ঘোৎ ঘোৎ করে মুখ ফসকে বলে ফেলল,”আমি দেখলে সমস্যা, আর তোমরা মা চাচি হয়ে যে ছেলে মেয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উৎ পেতে ওসব দেখো তখন লজ্জা লাগে না?
রুহিনী বেগম পায়ের জুতো হাতে তুললেন। তবে রে বলে ছু্ঁড়ে মারলেন আহানের উদ্দেশ্যে। জুতো জোড়া তো লাগলই না আহানের গায়ে, উল্টো মাহাদির নাক আর ঠোঁটের মধ্যে গিয়ে ধপাস করে লাগল। শক্ত চামড়া মুখে লাগতেই যন্ত্রণা এক নিমিষেই মস্তিষ্ক স্পর্শ করল। না চাইতেও চিৎকার করে উঠল,”আম্মুউউউউ…!
“এদিকে আয় একটু কথা আছে..!
নুসরাত ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। আরশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল তার দিকে। ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,”কী কথা?
আরশ কপাল কুঞ্চিত করল। শক্ত গলায় বলল,”আসতে বলেছি না?
বিরক্তির সাথে ঠোঁট বাঁকাল নুসরাত। মুখ ঝামটা মারতে গিয়েও মারল না। বিড়বিড় করে ভেঙচাল,”এদিকে আয়, উনার আদেশ কোন দুঃখে শোনব। আসতে বলেছি না, তুই আসতে বললেই কেন আমি আসতে যাব কুত্তা..!
“সব আমার কানে আসছে, নুসরাত!
নুসরাত ভেংচি কেটে আবারো ভেঙচাল,” সব আমার কানে আসছে, নুসরাত! তোর কানে গেলে, আমার কী! আমি কী বলেছি আমার কথা শোন! আশ্চর্য..!
অন্যমনস্কতা ঘিরে রাখা নুসরাতের হাতে শক্ত টান পড়ল। তড়াক করে উঠে তাকালেই, চোখাচোখি হলো আরশের সাথে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ সামান্য পিছু সরতে নিলেই পিঠ ঠেকল দেয়ালে। আরশ ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,”হু, কী বলছিলি?
নুসরাত শব্দ করে শ্বাস ফেলল। ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,”কিছুই না..!
“শোনলাম তো কিছু বিড়বিড় করছিলি।
”সেটা একান্ত ব্যক্তিগত আমার বিষয়..!
“তোর ব্যক্তিগত বিষয় ও আছে নাকি?
নুসরাত মাথা দোলাল। কোনো একটা চিন্তায় ডুবে গিয়ে বেঘোরে আওড়াল,” ভাবছিলাম আমাদের যদি কখনো দেখা না হতো, তাহলে কত ভালোই না হত..! ইস কী যে ভালো হতো..!
তারপর আরশের দিকে তাকিয়ে উল্লাসপূর্ণ স্বরে বলে ওঠল,”আই উইশ, আই হ্যাড নেভার মিট ইউ, আরশ ভাই..!
আরশ হাসল জিভ দিয়ে গাল ঠেলে। চোখে চোখ রেখে বলল,”চাল, জুটি।
নুসরাত আরশের বলার ধরণ দেখে হেসে ফেলল শব্দ করে। আরশের গায়ের পাশ দিয়ে বের হতে নিলে দু-হাতে তার বাহু চেপে আবার দেয়ালে চেপে ধরল লোকটা। নুসরাত জিজ্ঞেস করল,”কী বলবেন বলেছিলেন যেন?
আরশের নির্লিপ্ত স্বর নুসরাতের কানের আশপাশে বারি খেল,”তোকে কিছু বলব বলেছিলাম?
ভ্রু উচিয়ে, ঠোঁট চেপে বলে ওঠল সে,”হ্যাঁ, বলেছিলেন তো..!
আরশ ঝুঁকে আসলো নুসরাতের দিকে। নাকের ডগায় চিমটি কাটল আদুরে ভঙ্গিমায়। আরশের এমন ভাব ভঙ্গি দেখে কপাল কুঁচকাল নুসরাত সামান্য। ডেনিম শার্টের কলার চেপে ধরে মাথা ঠেকাল কাঁধে। জানতে চাইল,”মজা নিচ্ছেন আপনি?
“উঁহু, না!
নুসরাত মাথা তুলে তাকাল তার দিকে। বলল,” জায়গা দিন, যাব!
আরশ কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,“কোথায়?
সহজ কন্ঠে উত্তর দিল সে,“শো-রুমে!
“শো-রুমে কেন যাবি?
“ আমার ইচ্ছে। আপনাকে বলব কেন? আপনি কে?
আরশ কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। জিজ্ঞেস করল,”যদি না যেতে দেই?
“আপনি আমাকে জানেন, না যেতে দিলে আপনার মাথা ফাটিয়ে ফেলব।
“ দেখি ফাটিয়ে দেখা তো.!
নুসরাত নাক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। বলল,”আরশ ভাইইইই, আপনি আমার ধৈর্য্যে পরীক্ষা নিচ্ছেন।
“নিলে কী হবে?
“আমি যা ইচ্ছে করতে পারি,আমাকে ভয় পেয়ে থাকবেন।
আরশ টিপন্নী কেটে বলে ওঠে,“ আচ্চা, তাই নাকি?
নুসরাত মাথা দোলাল উপর নিচ। বলল,”হ্যাঁ..!
“তাহলে নিজের হাইট বাড়িয়ে দেখা।
নুসরাত ক্ষোভে শক্ত হাতে কিল বসাল আরশের পিঠে। চিৎকার করল,”আবারো হাইট নিয়ে খোটা দিচ্ছেন আপনি, আরশ ভাইইইই। তালগাছের মতো লম্বা হয়ে জীবনে কোন বাল ছিঁড়েছেন আপনি?
আরশ নিষেধাজ্ঞা জারী করল,
“গালি দিবি না, নুসরাত।
“ একশো-বার দিব। কী করবেন আপনি?
কথা শেষ হওয়ার আগেই আরশ ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসাল নুসরাতের গালে। হিসহিসিয়ে বলল,”থাপড়ে সোজা বানিয়ে দিব।
নুসরাত মেজাজ দেখিয়ে ধুপধাপ করে হেঁটে চলে গেল। কিছু বলল না। আরশের মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কিছু না বলে চলে যাওয়ায়। পকেটে হাত দিয়ে, ঘুরে হাঁটতে নিলেই পেছন থেকে কিল বসাতে নিল নুসরাত, তার পূর্বেই আরশ তার হাত চেপে ধরে একটানে নিজের সম্মুখে নিয়ে আসলো। তিরিক্ষি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”জংলী বিড়ালের মতো আচরণ করছিস কেন?
নুসরাত চ্যাঁচাল,”আপনি জংলী বিল্লি! কেউ এত জোরে মারে।
গালে হাত দিল সে। তারপর আবার মুখ ফুলিয়ে বলল,”দাঁতের হাড় নড়ে গেছে।
আরশ একপেশে ঠোঁট বাঁকাল। ভীষণ আশ্চর্যতা নিয়ে জানতে চাইল,”দাঁতের আবার হাড় আছে নাকি?
“আপনার না থাকলে আমার আছে।
নুসরাতের কথা শেষ হতেই যে গালে থাপ্পড় পড়েনি ওই গালে আরেকটা থাপ্পড় বসাল আরশ। নুসরাত অবাক চোখে তার দিকে তাকাতেই, আরশ বলে ওঠল,” একগালে থাপ্পড় দিলে বিয়ে হয় না, তাই দু-গালে থাপ্পড় দিয়ে ইকুয়াল করে দিলাম।
রাগে নাকের পাটা কাঁপল নুসরাতের। আরশের হাত থেকে নিজের হাত দুখানা ছাড়িয়ে এনে ঝাড়া মেরে চলে গেল হম্বিতম্বি করে।
গোধূলির আলো খেলা করছে পশ্চিম আকাশে৷ তেছড়া ভাবে আলো এসে বারি খাচ্ছে পূর্বের থাইগ্লাসের সামনে৷ পর্দা ভেদ করে তা ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। মাহাদি আরশের ওয়ালেটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। অনেকক্ষণ যাবত ওয়ালেট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর, সামনে বসা জায়িনকে ও দেখাল। বলল,”দেখুন তো জায়িন ভাই, এটা কে, চিনেন নাকি!
জায়িন ওয়ালেটটা হাতে তুলে নিল। দেখল কিছুক্ষণ! ঠাহর করতে পারল না কার ছবি! মেয়েটার বয়স চৌদ্দ পনেরো এমন! মুখের কাঠামো চেনা পরিচিত মনে হলো। পকেট হাতরে চশমা বের করে চোখে আটতেই হাসির তোড়ে ডলে পড়া এক তরুণীর মুখ ভেসে উঠল৷ দেখা শেষে ওয়ালেটটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাহাদির হাতে ফিরিয়ে দিল। মাহাদি তাকিয়ে ছিল উত্তরের আশায়, জায়িনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ভ্রু উচাল। জানতে চাইল,”বললেন না তো, কে ওটা?
জায়িন চোখ তুলে শীতিল ভাবে তাকাল মাহাদির দিকে। চশমার গ্লাস টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে ভাবশূণ্য গলায় বলল,”নুসরাত!
“নুসরাতের ছবি ওর ওয়ালেটে কী করে?
জায়িন উত্তর দিল না। উঠে দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে যেতে ছোট্ট করে উত্তর দিল,” যে ছবিটা রেখেছে, তাকেই জিজ্ঞেস করে নিস।
মাহাদি তাকিয়ে রইল জায়িনের যাওয়ার দিকে। ওয়াশরুম থেকে আরশ বের হতেই ঘাড়ে ওঠে চেপে ধরল তাকে। কঠোর কন্ঠে জানতে চাইল,”নুসরাতের ছবি তোর ওয়ালেটে কী করে?
আরশ তোয়ালি দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে তাকাল একবার মাহাদির দিকে। বাহির থেকে মাগরীবের আযান ভেসে আসছে ধীর স্বরে৷ হয়তো দূর দূরান্তের মসজিদে আযান দিচ্ছেন ইমামেরা। আরশ উত্তর দিল না। মাহাদি নিজেও ছাড়ার পাত্র না। চেপে ধরে জানতে চাইল,”উত্তর দেয়..!
নিষ্প্রভ কন্ঠে ভেসে এলো আরশের নিকট থেকে উত্তর,”তোকে উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।।
অতঃপর চুপচাপ জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে মনোযোগী হলো। মাহাদি হা করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। আরশ কথা না বললে কী ছেড়ে দিবে তাকে, অবশ্যই না! আজ এর উত্তর সে আদায় করেই ছাড়বে। তোয়ালি নিয়ে চুপচাপ শাওয়ার করার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। শাওয়ার শেষে বের হয়ে দেখল আরশ নামাজ শেষ করে বসে আছে জায়নামাজে।
“নুসরাতের ছবি তোর ওয়ালেটে কেন?
মাহাদি ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই আবার একই প্রশ্ন করল। আরশ কিছু বলতে নিবে মাহাদি আগেই হুশিয়ারি দিল,” জায়নামাজে আছিস, মিথ্যা কথা বলার চেষ্টা একদম করবি না। এবার বল, ওর ছবি তোর ওয়ালেটে কী করে, এবং এই ছবি তুই কোথায় পেয়েছিস?
ধামি স্বরে উত্তর দিল আরশ,“ছবি আহান দিয়েছে।
“একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিস, অন্যটার উত্তর দিবে কে?
আরশ হেয়ালি করল,
‘’অন্য প্রশ্নটা কী?
মাহাদি ধৈর্য হারাল অচিরেই, তবুও জিজ্ঞেস করল শান্ত কন্ঠে,“ওর ছবি তোর ওয়ালেটে কী করে? পছন্দ করিস ওকে?
“মোটেও ওকে আমি পছন্দ করি না, আই হেট হার..!
“মিথ্যা বলছিস?
“ মোটেও না..!
“তাহলে ওর পেছন পেছন ঘুরিস কেন?
“ এমনি, ভালো লাগে জ্বালাতে।
“আর কিছু নেই? পছন্দ, ভালোবাসা, ভালোলাগা?
সরল কন্ঠে উত্তর দিল আরশ,” নাহ..!
মাহাদি বিস্ময়ে কপালে তীক্ষ্ণ ভাঁজ ফেলল। আশ্চর্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“সত্যি ঘৃণা করিস?
আরশ আবারো আগের মতো করে বলল,“মিথ্যা বলছি না, আই হেট হার।
মাহাদি তোয়ালি দিয়ে ঘাড়ের পানি মুছল। আরশের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে নিল। ওয়ালেটটা অবেহেলায় ছুঁড়ে ফেলল। কন্ঠ ভীষণ ভারী করে বলল,”ভালোবাসার থেকে ঘৃণা বেশি প্রবল হয়, আরশ। ভালোবাসায় খাদ থেকে যায়, কিন্তু ঘৃণাতে, বিন্দুপরিমাণ খাদ থাকে না।
মাহাদির কথায় আরশ উত্তর করল না। মাহাদিও উত্তরের আশা করেনি। রুম থেকে চুপচার বেরিয়ে যায়। রুমের দরজা লক হওয়ার শব্দ হতেই চকিত জায়নামাজের দিকে তাকাল আরশ। ওয়ালেটটা অবেহেলায় পড়ে আছে সেখানে। ঘরের আলো ধূলোর মতো মিলিয়ে গিয়েছে ততক্ষণে৷ ল্যাম্পের নিয়ন আলোয় আরশ চুপচাপ তাকিয়ে দেখল ওয়ালেটের ভাঁজে ভাঁজে রাখা অনেকগুলো নুসরাতের পাসপোর্ট সাইজ ছবি। সবগুলোতেই হাসি লেপ্টে আছে ঠোঁটে। আরশ জানে না সে কেন নুসরাতের ছবি নিয়ে ঘুরে! সে দেখেছে জায়িন ইসরাতের ছবি নিজের মোবাইলের ওয়ালপেপারে, কভারের পেছনে, এমনকি ওয়ালেটে রেখেছে। দেখতে ভালো লেগেছে তাই নিজেও করেছে তাই।
চুপচায়নিজের ট্রাউজার্স এর পকেট হাতড়াল ছেলেটা। আরেকটা ওয়ালেট বেরিয়ে এলো।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫২
সেখানে নুসরাতের এখনকার একটা ছবি রাখা। বুড়ো আঙুল দিয়ে একটু একটু করে মুখে হাত বুলাল। কপালের বেবি হেয়ার গুলো সরিয়ে দিতে চাইল, সরল না। আরশ জানে সরবে না, তবু্ও বারকয়েক এমন করল। হাত তোলে দোয়া করার পূর্বে বার কয়েক ছবির দিকে তাকিয়ে আনমনেই বিড়বিড়াল,”তুই ও জানিস, আমরা দু-জন দু-জনকেই কী প্রখর ঘৃণা-টা’ই না করি, তবুও আমাদের ভেতরের এই আকর্ষণ আমরা দু-জনের কেউ-ই অস্বীকার করতে পারব না। আমাদের দু-জনের ঘৃণার মাত্রা এত প্রখর কেন, নুসরাত? তুই কী বলতে পারবি এর কারণ কী?
ছবিটা কী আরশকে উত্তর দিতে পারবে? ছবিটা উত্তর দিল না! দিতে পারবে ও না, তবুও আরশ উত্তরের আশায় বহুক্ষণ প্রতিক্ষায় বসে রইল।

Apu onk shundor house!!!,next part plz taratari dio
Kottoo din por dilo😑
1st time sobar agee comment Korlam
Thanks for golpo deyar jonno
Please baki porbo gula DAO
Doya kore baking ULA DEO API
Kottoo din por dilo 😑
Sundor hoyeche next part taratari deben