Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩১

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩১

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩১
শ্রাবণী ইয়াসমিন

রাত প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। জেভিয়ারের বাগানবাড়ির চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর মাঝে মাঝে বাতাসে পাতার সড়সড়ানি। বাড়ির ভেতর মৃদু আলো, সব ঘর যেন ঘুমিয়ে আছে।
অ্যালেক্স একটু পানি খেতে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। করিডোরে হালকা আলো জ্বলছে, দেয়ালে ছায়া পড়ছে তার শরীরের। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল সে, আনায়ার রুমের দরজাটা আধখোলা।
তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে তাকালো। ঘরটা একদম ফাঁকা। বিছানা হালকা কুচকানো, জানালার পর্দা হালকা দুলছে, আর বাতাসে মৃদু আনায়ার পারফিউমের গন্ধ ভাসছে।
অ্যালেক্সের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ফিরে গেল নিজের রুমে।অ্যাশলি তখন বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বই পড়ছিল। অ্যালেক্স দরজা খুলেই বলল,

“অ্যাশ, তুমি একবার আনায়ার রুমে গিয়ে দেখো তো সে ঘুমাচ্ছে কিনা।”
অ্যাশলি একটু অবাক হয়ে তাকাল, “কেন? কিছু হয়েছে?” অ্যালেক্স গম্ভীর গলায় বলল, “আমি দরজাটা খোলা দেখেছি। ভেতরে কাউকে পাইনি।”
অ্যাশলি চমকে উঠে বইটা বন্ধ করল। তারপর ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আনায়ার রুমে ঢুকে সে চারপাশে তাকাল বিছানা ফাঁকা, বালিশে কুঁচকে যাওয়া চাদর, জানালা আধখোলা। অ্যাশলি বারান্দা পর্যন্ত গিয়ে খুঁজল, কিন্তু কোথাও কেউ নেই। তার গলা শুকিয়ে এলো। সে কয়েকবার ডাকল
“ আপু? আপু, আপনি কোথায়?”
কোনো সাড়া নেই। শুধু নিঃশব্দ বাতাস, আর দূরে কোনো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। অ্যাশলি হতভম্ব হয়ে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
রুমে ফিরে এসে দেখল, অ্যালেক্স সোফায় বসে আছে, কপালে হাত রেখে।
অ্যাশলি নিচু গলায় বলল,

“ আনায়া আপু রুমে নেই। বারান্দা, বাথরুম, সব জায়গা খুঁজেছি।”
অ্যালেক্স এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়াল। “কোথায় যাবে সে মাঝরাতে?” সে একের পর এক রুম, করিডোর, এমনকি বাগানের পথ পর্যন্ত খুঁজে দেখল। কিন্তু আনায়া কোথাও নেই।
বাইরে গিয়ে গেট পর্যন্ত পৌঁছে গেল সে রাতের অন্ধকারে কেবল গাড়ির চাকা ঘুরে যাওয়ার দাগ পড়েছে ভেজা মাটিতে। অ্যালেক্স থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতরটা যেন ভারী হয়ে উঠছে। সে চুলে হাত মুষ্ঠি করে চেপে ধরল।
ফিসফিস করে বলল, “এইবার আমি ভাইকে কী বলব? ভাই যদি জানে, আমি আনায়াকে একা ছেড়ে রেখেছিলাম!”
অ্যাশলি ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। নরম গলায় বলল, “আমার মনে হয় আপু নিজে থেকেই কোথাও গিয়েছে।”
অ্যালেক্স মাথা তুলল। চোখে সন্দেহের আভা ফুটে উঠলো। “তুমি এমন ভাবলে কেন, অ্যাশ?”
অ্যাশলি তোতলাতে লাগল, “এ…এমনি মনে হলো…”
অ্যালেক্স এবার পুরোপুরি তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গলায় ভারী স্বরে বলল, “অ্যাশ, কী হয়েছে? তুমি কি কিছু লুকাচ্ছো আমার কাছ থেকে?”
অ্যাশলি মুখ নামিয়ে ফেলল। গলার কাছে যেন কিছু আটকে গেল। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখে অস্বস্তি স্পষ্ট। অ্যালেক্স এক পা এগিয়ে এলো, এবার আরও নিচু গলায় বলল, “তুমি জানো আনায়া কোথায় গেছে তাই না?”
অ্যাশলি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দে।
রাতের সেই নরম নীরবতার মধ্যে অ্যাশলির নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। অ্যাশলির কাঁধ কেঁপে উঠল। চোখ নামিয়ে বলল,

“আ… আমি জানি না আপু কই গিয়েছে।”
অ্যালেক্স এবার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। “অ্যাশ, তুমি কিছু লুকাচ্ছো। কী লুকাচ্ছো তুমি?” অ্যাশলি মুখ নামিয়ে ফেলল, ঠোঁট কাঁপছে।
অ্যালেক্স গলা ভারী করে বলল,
“তুমি জানো না, ভাইয়ের কত শত্রু রয়েছে! এই বাড়িটা তার হলেও আশেপাশে কত চোখ লুকিয়ে থাকে তুমি জানো না। যেকোনো মুহূর্তে যা কিছু হয়ে যেতে পারে!”
অ্যাশলি চমকে মাথা তুলল। তার চোখে ভয় স্পষ্ট। অ্যালেক্স এবার প্রায় চিৎকার করে বলল,
” চুপ করে থেকো না সত্যি টা বলো অ্যাশ।”
অ্যাশলি ঠোঁট কামড়ে ধরল, তারপর একটা ঢোক গিলে নিচু গলায় সকালের সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলল। অ্যালেক্স শুনে স্থির হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে দুই হাত মাথায় রাখল। তারপর চোখ খুলে রাগে গর্জে উঠল, “তুমি আমাকে এইসব আগে কেন জানাওনি ইডিয়ট! যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে দায় কে নেবে?”
অ্যাশলি কেঁপে উঠল। অ্যালেক্স রেগে গিয়ে দরজার দিকে এগোল, গেইট পর্যন্ত পৌঁছে হঠাৎ থেমে গেল।তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে।কয়েক সেকেন্ড পর সে আবার ফিরে এসে অ্যাশলির দিকে তাকাল। “তুমি ভেতরে থাকো, দরজা লক করে দিও। কে আসলে খুলবে না। আমি যাচ্ছি।”
অ্যাশলি উত্তেজিত হয়ে বলল,
“কিন্তু আমি একা এত বড় বাড়িতে কী করে থাকবো?” অ্যালেক্স থেমে তাকাল তার দিকে।
“আনায়ার এখন বিপদ হতে পারে। ওকে খুঁজে বের করতেই হবে। তুমি একা থাকো, ভয় পেয়ো না আমি দ্রুত ফিরে আসব।”
অ্যাশলি আবার কিছু বলতে চায় কিন্তু আনায়ার বিপদ এর কথা ভেবে আর কিছু বলল না।

আনায়া থমথমে মুখে বসে আছে। তার কান যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে সত্যিই প্রেগন্যান্ট?
চোখ স্থির হয়ে আছে নিজের পেটের দিকে।
এরিক্স ধীরে সামনে এসে চেয়ার টেনে বসল তার বিপরীতে। ঘরে নিঃশব্দতা ছড়িয়ে আছে, শুধু দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা শোনা যাচ্ছে।
সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“অবশেষে সত্যের মুখোমুখি হয়েই গেলে তুমি!
বাই দ্য ওয়ে, তুমি ঠিকানা পেলে কী করে, বলো তো?”
আনায়া চোখমুখ শক্ত করে বলল,
“সেইসব আপনার না জানলেও চলবে। তবে আপনারা এত ঘৃণ্য কাজ করতে পারেন আমি কোনোদিন ধারণাও করতে পারিনি! ছিঃ।”
এরিক্স হালকা মাথা কাত করে শব্দ করে হাসল।
তার হাসিতে কেমন এক ভয়ানক প্রশান্তি মিশে আছে।
“চলো,” সে বলল, “তোমাকে আজ তাহলে একটা সত্যি কথা খুলে বলি।”
আনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। এরিক্স ধীরে বলল,
“তোমাকে আমি একবার বলেছিলাম যে ভাই নিজেই তোমাকে বিদায় করবে…তাই ভাই বিদায় করার আগে নিজে থেকে বিদায় হয়ে যাও। মনে আছে সেই কথা?”
আনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, মনে পড়তেই নিজের ভ্রু সোজা করে ফেলল।
এরিক্স ঠান্ডা কণ্ঠে আবার বলল,

“ আজ তোমাকে জেভিয়ার ড্রেভেনের ঘটনা খুলে বলি। সব যেহেতু জেনেই গিয়েছো, আজ আর কোনো লুকোচুরি করে লাভ নেই।”
একটু থেমে, নিঃশব্দ কণ্ঠে উচ্চারণ করল—
“জেভিয়ার আমার আপন র/ক্তে/র ভাই না । আমার বড় চাচার ছেলে ছিলো জেভিয়ার।
ছোটবেলায় জেভিয়ারের বাবা-মা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়। জেভিয়ার তখন তাদের বাড়িতেই ছিল, তাই সে বেঁচে যায়।”
ঘরে আবার নেমে এলো গভীর নীরবতা। এরিক্স কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করল।

“ওর বাবা… আমাদের বর্তমান কোম্পানি ড্রেভেন কর্পোরেশন এ খুব চতুরতার সাথে নিজের একটা শক্তপোক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলো।
একসময় সে আমার দাদার চোখের মণিও হয়ে উঠেছিলো।
আর আমার বাবা? তার সব সময় তার ভাইয়ের পায়ের নিচে পড়ে থাকত। যতই চেষ্টা করুক, দাদার চোখে সেই স্থান কখনো পায়নি।”
এরিক্স হালকা হাসল, কিন্তু চোখের কোণে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
“তবে ভাগ্য সব সময় একরকম থাকে না, তাই না?এক্সিডেন্টে ওর বাবা-মা মারা যায়, আর সেই মুহূর্ত থেকে পুরো ক্ষমতা চলে আসে আমার বাবার হাতে।”
সে একটু থামল, গভীর নিঃশ্বাস নিল।
“কিন্তু বাবার হাতে সবটা আসার পর থেকেই সব কিছু উলটে যেতে লাগল। ব্যবসায় লস, বাজারে বদনাম, আর দাদার পুরোনো পার্টনাররা একে একে মুখ ফিরিয়ে নিতে লাগল। বিজনেস ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে শুরু করল।”
এরিক্স চোখ তুলে তাকাল আনায়ার দিকে।

“ছোটবেলা থেকেই আমি জেভিয়ারকে দুচোখে সহ্য করতে পারতাম না। কেন পারব বলো?
সবাই শুধু ওরই সুনাম করত। সব কাজেই ওর নাম, ওর প্রশংসা, ওর সুনাম যেন আমি ছিলাম কেবল একটা ডাস্টবিন।”
এরিক্সের আঙুলগুলো টেবিলের ওপর ধীরে ধীরে ঠকঠক করতে লাগল।
“ওর ধূর্ত বুদ্ধিমত্তা, ওর ঠান্ডা মস্তিষ্ক সেই সবের জন্যই একসময় এক ড্রাগ সেলার ওর সঙ্গে ডিল করতে চায়। জেভিয়ার প্রথমে রাজি ছিল না এইসব অবৈধ ব্যবসায়। কিন্তু আমার বাবাই এত টাকার লোভ সামলাতে পারেনি।”
এরিক্স থেমে গিয়ে একবার নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল “ওকে জোর করেজ এই পথে নিয়ে যায় আমার বাবা।”
আনায়া স্থির হয়ে বসে শুনছিলো।
“জেভিয়ার সব সময় আমার পছন্দের জিনিসগুলো ছিনিয়ে নিয়েছে, যেমন- তোমাকেই দেখো না!” সে বলল নিঃশব্দে।

“এই ব্যবসা নিজে সামলায়, আর আমাকে যেন শুধু একটা কর্মচারী বানিয়ে রেখেছে। ওর ওপর আমার বহুদিনের ক্ষোভ ছিলো… আর সেই ক্ষোভই আমি পূরণ করি ওর বোনকে দিয়ে।”
আনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। এরিক্স ঠান্ডা, স্থির কণ্ঠে বলতে লাগল,
“আমি ওর বোনকে জানো প্রচুর যন্ত্রণা দিয়ে মেরেছি। ওর সব রাগ, ওর সব অন্যায়ের প্রতিশোধ আমি ওর বোনের ওপর ঢেলে দিয়েছিলাম। ওর বোন কে আমি নির্মমভাবে
রে/প করেছিলাম।
এই বলে সে একটআ দম ছেড়ে ধীরে পিছনে হেলান দিল। তার ঠোঁটের কোণে বিকৃত এক হাসি ফুটে উঠল।
“সব করেছি আমি…” সে হালকা করে ফিসফিস করে বলল, “আর দোষ ফেলেছি ভিক্টরের ঘাড়ে।
আমার এক ঢিলে দুই পাখি মারা হলো।”
এরিক্সের চোখে এখন কেমন এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
“ভিক্টর নিজেও জানে না আসলে কী হয়েছে।
সে তো সেদিন পুরো ড্রাংক ছিল, নিজের অপরাধটা তার নিজের কাছেই অস্পষ্ট।”
এরপর সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আনায়ার দিকে তাকাল তীক্ষ্ণ চোখে। “এখন…তোমার পয়েন্টের কথাগুলো বলি চলো।” সে নিচু গলায় বলল।

ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। আনায়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে ভয় আর ঘৃণার দৃষ্টিতে।
এরিক্স আবার বলতে শুরু করল,
“মেয়েদের ধরার কাজে সাধারণত জেভিয়ার কখনো নিজ কোনো হাত লাগায় না। মানুষের মাধ্যমে এইসব হয় চুক্তি, অপারেশন, কাউকে দিয়ে ব্যবস্থা করানো এইসব লোক দিয়েই করায়। জেভিয়ার আর ভিক্টরের মধ্যে সব সময় এমনই এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে। কারণ ডিলারদের পছন্দ নির্ভর করে কত দ্রুত এবং নিরাপদভাবে তারা ‘সাপ্লাই’ পৌঁছে দিতে পারে আর যাঁর কাছে সেটা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে পৌঁছায়, সেইজনের কাছে বেশি প্রস্তাব গড়ে ওঠে।

তাই এমনও হয়েছে যদি ভিক্টর কতগুলো মেয়েকে ধরে আনতো। তখন জেভিয়ার তাদের গিয়ে নাটকীয় ভাবে উদ্ধার করত যাতে পাব্লিসিটি হয় তার। আর তার দিকে কখনো এইসবের নাম না ওঠে। আর হতোও তাই। কতগুলো মেয়েকে বাচালেই খবরের কাগজে এবং নিউজ চ্যানেলে জেভিয়ার নাম চলে আসতো। এতে কখনো ওর দিকে সন্দেহের তীর যেতো না।
তবে তোমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা হয়েছিল। ডেভিড একটা বড় অংকের এমাউন্ট জেভিয়ার আর ভিক্টর দুজনকেই অফার করে শুধু তোমাকে তুলে এনে ওর কাছে দেওয়ার জন্য। জেভিয়ার কখনোই নিজের বিপরীত পক্ষকে দুর্বল ভাবে না ও কৌশলে, পরিকল্পনায়, আর কঠোরতায় কাজ শেষ করে।
তাই তোমার বেলা জেভিয়ার নিজে গিয়েছিল তোমাকে আনতে। সে শুধু পাঠিয়ে বা কাউকে দিয়ে কাজটি করলেই পারতো, তবে যেহেতু এত টাকার ডিল ছিলো তাই জেভিয়ার হালকা ভাবে নেয় নি ডিলটাকে তাই সে নিজেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আবার পাশাপাশি ভিক্টরও গিয়েছিল। দু’জনের উপস্থিতি একসাথে কাহিনিকে এক অদ্ভুত মোড় দিলো।

তুমি নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছো শুরু থেকে এখন অবধি যা হয়েছে সব টাই জেভিয়ার এর পরিকল্পনার অংশ। জেভিয়ারকে কখনো কোনো মেয়ের প্রতি এমনভাবে আবদ্ধ হতে দেখা যায়নি,অথচ ওই তোমাকে প্রথম দেখেই এমন ভাবে বুদ হলো যে বিয়ে অবধি করে ফেলল। আর সেটা আমাদের সবার কাছে ছিল অচিন্তনীয়।
প্রথমে সে বিষয়টা হালকা ভাবে নিয়েছিলাম আমরা।যেমন এটাকে শুধু একটা আরেকটি ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে ভাবছিলাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, আমরা লক্ষ্য করলাম তার মনোভাব বদলাতে শুরু করেছে। সে শুধু তোমাকে আনলো না সে তোমাকে নিজের করে ফেললো।
আমাদের কাছে এটা ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য। জেভিয়ার কখনোই কোনো এক মেয়ের প্রতি এমন অবসেসড হবে, এটা ভাবাই যায়নি।
ওই দিনের পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে গেলো। আমাদের কাছে এটা ছিল এক বড় ধরণের রহস্য। এত মাস হয়ে গেলেও, জেভিয়ার এবং ভিক্টর দু’জনই তোমাকে এনে দিতে পারছিল না। আমরা সবাই চিন্তিত ছিলাম, আর এই বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলাম। আমার ভাইয়ের মতো একজন রেড ফ্ল্যাগ মানুষ যে কোনো মেয়ের প্রতি দুর্বল হবে সে ভেবেই হাসি পেতো আমার । কারণ, জেভিয়ার ছিলো কাজে পূজারী। কাজ আর ডিল ছাড়া কিছুই বুঝতো না।

এরপর এরিক্স চোয়াল শক্ত করে একটু ধূর্ত হাসি দিয়ে বলে,
“আর আজ দেখো তুমি প্রেগন্যান্ট। তোমার গর্ভে জেভিয়ার এর। ”
আনায়া থমথমে চোখ মেলে এরিক্সের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ কমিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আমি প্রেগন্যান্ট… সত্যি? আপনি কি করে জানলেন?”
ঠিক তখনই এমন জেভিয়ার রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ঢুকল। সে চোখ কুঁচকে এরিক্সের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুই এইখানে কি করছিস?”
এরিক্স হালকা হাসি ছুঁড়ে উত্তর দিল,
“এমনিই খোঁজ নিতে এসেছিলাম। তোমার বউ আমাদের এমন একটা খুশির সংবাদ দিলো, তো একবার আসতে তো হতোই তাইনা।”
জেভিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, কোনো উত্তর দিল না। এরিক্স কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে মাথা নীচু করে সেই ঘর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।
এরিক্স বেরিয়ে যেতেই জেভিয়ার দরজার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে আনায়ার দিকে এগিয়ে গেলো। আনায়া ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকল। জেভিয়ার ধীরে ধীরে মাটিতে হাটু গেড়ে বসল, আনায়ার দুহাত জড়ো করে নিল এবং ধীর কন্ঠে বলল,
“আমি জানি, আমি খুবই ঘৃণ্য একজন মানুষ। তবে তোমার চোখে নিজের জন্য ঘৃণা আমি সহ্য করতে পারছি না, লাভবার্ড।”

আনায়া শক্ত হয়ে বসে রইল। আনায়া এবার মুখ তুলল, তার চোখ দুটো নিস্তব্ধ। আনায়া শক্ত কন্ঠে বলল,
“আমি তোমাকে শুধু কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, জেভিয়ার।”
জেভিয়ার মাথা নত করে বলবে, “বলো।”
“আমার আগে তুমি কতগুলো মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িত হয়েছো? কতগুলো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছো? কেন বাচ্চাদের সাথে তুমি অন্যায় করেছো? কেন তুমি অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে সেই অন্যায় কাজে জড়িত হয়েছো? আর কেন আমার কাছ থেকে সব লুকিয়েছো?”
জেভিয়ার কিছুক্ষণ কোনো শব্দ করল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল আনায়ার দিকে সেই চোখে ক্লান্তি, অপরাধবোধ, আর একরাশ ভয় তার ভালোবাসা কে হারানোর। এরিক্স যে সব বলে দিয়েছে, তাতে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।
জেভিয়আর এক পলক আনায়া চোখে তাকিয়ে বলে, “বাধ্য হয়েই এসেছিলাম এই কাজে..… কিন্তু এই কাজটাই এখন আমার নেশা হয়ে গেছে।”
সে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ নামিয়ে বলল,

“কি করব বলো? আমি কোনো বাচ্চাকে কষ্ট দেইনি… আমি কোনো বাচ্চার গায়ে হাত দিইনি। ওরা সাপ্লাই দেওয়ার অবস্থায় ছিল না, তাই আমার লোকেরা নিজেরাই চেয়ে নিয়েছে ওদের। আমি ওদের দিকে তাকিয়েও দেখিনি।”
আনায়া শব্দ করে হেসে ফেলে বলবে, “বাহ জেভিয়ার সুন্দর কথা বললে কিন্তু। তুমি বাচ্চাদের গায়ে হাত দাওনি, তাদের নাকি কষ্টও দাওনি। আর তোমার লোকেরা চাইলো তুমি দিয়ে দিলে। তোমার কথা শুনে আমার ঘৃণা হচ্ছে জেভিয়ার। এতদিন আমি একটা মিথ্যে লোকের পিছে ছুটেছি। একটা প/শু/র চেয়েও অ/ধ/ম লোকের পিছে পড়েছিলাম।”
জেভিয়ারের কণ্ঠ ভেঙে গেল, কিন্তু সে আবার আনায়ার চোখে তাকালো।
“আর আমি তোমাকে কিছু বলিনি কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাইনি, লাভবার্ড। জীবনের সবকিছু হারিয়ে শেষে তোমাকেই পেয়েছি। এই পৃথিবীতে… তোমার বুকে মাথা রাখলে যে শান্তি পাই, তা আর কোথাও পাই না।”
সে শেষ কথাটা বলেই আনায়ার হাত ধরে রাখল, যেন ভয় করছে পরের মুহূর্তেই সে হয়তো হাতটা সরিয়ে নেবে, হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আনায়া তাচ্ছিল্যের এক হালকা হাসি দিল, তার ঠোঁটের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল।
“আসল কথাই তো ফেলে গেলে, জেভিয়ার। শুরুতে যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর তো দিলে না।”
জেভিয়ার কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল। তার মুখের ভাবটা বদলে গেল নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা নামিয়ে নিল কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে বলল,

“জেভিয়ার কখনো মিথ্যে বলতে শিখি নি…”
তার গলা ভারী হয়ে উঠল, তবু সে বলতে থাকল,
“তুমি আমার জীবনে আসার আগে… আমি বহু নারীর সংস্পর্শে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছি বললে ভুল হবে ওরাই নিজেরাই আমার জীবনে আসতে চেয়েছিল। আমি হয়তো সামান্য সময় দিয়েছি, কিন্তু কখনোই বেশিদূর যেতে পারিনি। সর্বোচ্চ, হয়তো তাদের সাথে একটা কিস এর চেয়ে বেশি এগোতে পারিনি।”
সে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস নিল, তারপর নিচু স্বরে বলল,
“জানি না কেন পারতাম না, কোনো আগ্রহই পেতাম না ওদের প্রতি। যেন সব কিছুই কৃত্রিম, নিঃস্বাদ।”
জেভিয়ার ধীরে মুখ তুলে তাকাল আনায়ার দিকে চোখের গভীরে জমে থাকা অপরাধবোধের ভেতরেও এক অনড় ভালোবাসা। “তুমি… তুমি আমার জীবনের প্রথম নারী, যাকে আমি গভীর থেকেও গভীরতমভাবে স্পর্শ করেছি। যাকে আমি আমার সবটা দিয়ে ভালোবাসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। হ্যাঁ, তুমিই সেই নারী। যার দিকে চোখ পড়লে আমার দৃষ্টি কখনো সংযত থাকত না।”
তার কণ্ঠ এখন কেঁপে উঠছে হালকা। তবুও বলতে লাগলো

“তুমি ছাড়া আর কোনো নারীর এতটা সংস্পর্শে আমি যাইনি, আনায়া। তুমি আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ নারী। যাকে আমি আমার সবটা ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছি।”
জেভিয়ারের মুখে নিজের নাম প্রথমবার শুনে আনায়া থমকে গেল।
জেভিয়ারের ঠোঁট কাঁপছে হালকা, চোখে ক্লান্তির ছাপ, তবু একরাশ মমতা ভাসছে।
আনায়া এবার নিজের বুকের মধ্যে জমে থাকা তীব্র রাগটাকে সামান্য সংযত করে ফেলে।
কারণ সে নিজেও ভিডিওটিতে দেখেছিল জেভিয়ার শুধু একটা কিস করেছিল, এর বেশি কিছু নয়।
জেভিয়ার ধীরে তার কাছে এগিয়ে এসে আনায়াকে নিজের কাছে টেনে নেয়।
তারপর আনায়ার উরুর ওপর মাথা রেখে নিচু কণ্ঠে বলে,
“তুমি ছাড়া আমার আপন কেউ নেই, লাভবার্ড। মা-বাবা, বোন সবাইকে হারিয়ে আমি যে নিঃস্ব।
আমার জীবনের গন্তব্যহীন পথের একমাত্র দিশা তুমি। আর তোমাকে হারিয়ে ফেললে সত্যি বলছি পৃথিবীত থেকে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
আনায়া স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তার চোখে জল ভেসে ওঠে। আনায়া জেভিয়ার এর গালে হাত দিয়ে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে বলে,

“আমার জন্য এইসব ছেড়ে দিতে পারবে তুমি, জেভিয়ার? এই অন্ধকার জগত, এই র/ক্তে/র ব্যবসা, এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতা সব ছেড়ে আমার সাথে নতুন করে বাঁচতে পারবে?”
জেভিয়ার ধীরে মাথা তোলে। “এইটা সম্ভব না,” সে বলে নরম কিন্তু ভারী গলায়। আমি চাইলেও পারব না। এই দুনিয়া এমনভাবে জড়িয়ে আছে আমার সঙ্গে আমি সরে গেলে আমার জায়গায় আরেকজন আসবে। আর সে যদি আমার চেয়েও নির্মম হয়?”
আনায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু গলায় বলে,
“আমি কি সত্যি প্রেগন্যান্ট?” জেভিয়ার মুচকি হেসে বলে, “হ্যা। তুমি সত্যি প্রেগন্যান্ট।”
“আমি প্রেগন্যান্ট, তো আমি কেন জানি না। তোমরাই বা জানলে কি করে?” আনায়া ভ্রু কুচকে জিগ্যেস করে। জেভিয়ার ঠান্ডা ভাবেই বলতে থাকে, “তখন তুমি জ্ঞান হারানোর পর ডক্টর এসে চেকাপ করেছিলো তোমায়। তিনিই বলেছেন।”

কিছুক্ষণ নিরবতার পর জেভিয়ার কাপাকাপা হাতে আনায়ার উদর স্পর্শ করে বলে, ” লাভবার্ড আমার না বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি সত্যি বাবা হতে চলেছি! আ…আমার অংশ এইখানে আছে! আমি এতদিন যেসব বাচ্চাদের জীবন নষ্ট করেছি, আজ অমন একটা নিষ্পাপ বাচ্চা আমারও হতে চলেছে। আনায়ার চোখ গড়িয়ে এক ফোটা পানি পড়ে।
সে জেভিয়ার এর মাথায় হাত রাখে। জেভিয়ার আনায়াকে কাছে টেনে তার উদর উন্মুক্ত করে অজশ্র চুমু দিয়ে ভরিয়ে ফেলে। আনায়ার উন্মুক্ত পেটে হাত বুলিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে,

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩০

“লাভবার্ড… সত্যি কি এইখানে আমার লিটল লাভবার্ড আছে? এইখানে আমার প্রিন্সেস আছে? আমি আজ এত সুখ পাই… জানো কেন? এ… এইখানে আমার বাচ্চা আসতে চলেছে। আমি এত সুখ কোথায় রাখি বলো না, লাভবার্ড।”
আনায়া হঠাৎই কেদে দিয়ে বলে, “আমি এই বাচ্চা রাখবো না জেভিয়ার। আমি তোমার কোনো অংশ কে জন্ম দিয়ে এই পৃথিবীতে আরেকটা অমানুষ তৈরি করতে চাই না। তুমি আমাকে মুক্তি দাও…..মুক্তি দাও আমায়।”

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩২