লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭
লিজা মনি
রাতের ঘন নিস্তব্ধতা চিরে অজ্ঞাত কারো নিঃশব্দ আগমন ঘটে এনি’র কক্ষে। একটি ছায়া অন্ধকারকে ছিঁড়ে প্রবেশ করে। তার চোখদুটো জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো দীপ্তিমান। অনির্বাণ কোনো অভিশপ্ত আগ্নেয়গিরির গর্ভে লালিত হিংস্রতা চুয়েপড়া লাভায় পরিণত হয়েছে। শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যাওয়ার মত তার উপস্থিতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে এনি গভীর নিদ্রায় বিভোর। হাত-পা এলিয়ে শরীর ঢলে পড়েছে একপাশে। মায়াবী মুখখানি তবুও জ্যোৎস্নার অভাবে অন্ধকারে ধরা দেয় না। অবচেতন মনে কোনো অতলান্ত ভাবনার জালে জড়ানো সে। যার ভারে সে নিশ্চিন্তে নিদ্রা গেছে।অজানা এক অভিশপ্ত আগন্তুকের উপস্থিতি তার চেতনার চৌহদ্দিতে ধাক্কা দেয়নি এখনো।
লোকটি নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। মুখে এক ভয়ানক গাম্ভীর্য নিয়ে অগ্রসর হয়। তার চোখে তীক্ষ্ণ নয় বরং ক্রোধের আগুনে জ্বলতে থাকা এক অভিশপ্ত নিষ্ঠুরতা।যেখানে দয়ার কোনো স্থান নেই। হালকা ধূসর চোখের মণির চারপাশে রক্তাভ লালিমা তার অন্তর্দাহ ও অমার্জনীয় অভিপ্রায়কে নির্জন রাত্রির সাক্ষী করে তোলে। চোয়াল শক্ত, হাঁটু দৃঢ়, প্রতিটি পদক্ষেপে হিংস্র সংকল্পের ছাপ।
সে যখন এনির পাশ ঘেঁষে আসে। তার গা ছুঁয়ে অশুভ হিমেলতা ছড়িয়ে পড়ে। এক মুহূর্ত থেমে মায়ার ঘোরে অর্ধ-আচ্ছন্ন সেই মুখশ্রীকে এক চাউনি দেখেই হঠাৎ করেই তার হাত জোরে চেপে ধরে। এনির কোমল ত্বকে সেই শীতল আর শক্ত আঙুলের ছোঁয়া যেন বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো আঁচড়ে দেয়। হঠাৎ আক্রমণে এনি ব্যথিত গুঙিয়ে ওঠে।ঘুমের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা চেতনা খানিকটা ফিরে আসে।
লোকটির ঠোঁটে তখন এক রকম বাঁকা হাসি খেলে যায়।যেন নিকষ অন্ধকারের রাজপুত্র, তার শিকারকে একফাঁকে পাকড়াও করেছে। মুহূর্ত না গড়াতেই নিজের মুখ সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যায়। সে এনির গলার কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে এক নিষ্ঠুর কামড় বসিয়ে দেয়।রক্ত-মাংস ছেঁড়ার নৃশংসতায়। নিদ্রিত দেহ যেন দপ করে জ্বলে ওঠে। ব্যথার তীব্রতায় এনি আর্তনাদ করে উঠে বসে।তীব্র কান্নার মতো এক চিৎকার ছিঁড়ে ফেলে রাতের স্তব্ধতা।
কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ঘাম। এনির শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো আর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। সেই মুহূর্তে সে উপলব্ধি করে তার পাশে কেউ একজন রয়েছে। তার হাত এখনও কারো শক্ত মুঠিতে বন্দী। কিন্তু পুরো রুম আঁধারে নিমগ্ন।সে চাইলেও বুঝে উঠতে পারে না কার মুখোমুখি হয়েছে সে। মুখ অচেনা, অবয়ব অস্পষ্ট, নিঃশ্বাস কেবল একটা অমঙ্গলের পূর্বাভাস দেয়।
এনির শরীর ঠাণ্ডা ঘামে ভিজে যায়। কামড়ের দাহ তখনও ত্বকে বাজে। কাঁপতে কাঁপতে বুকের গভীর থেকে উঠে আসে ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠস্বর একটি অস্পষ্ট, অসহায় উচ্চারণ,,,
” ক.. কে আপনি?
এনির শরীর ছুঁয়ে যেতে থাকে একটা স্পর্শ। তার গলায় কেমনভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ এনির গলায় চেপে ধরে শক্ত ভাবে। এনি বুঝতে পারছে না ঠিক তার সাথে কি হচ্ছে। শুধু বুঝতে পারছে একটা পৈশাচিক হাত তাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে বাজেভাবে। তার গলায় চেপে ধরেছে মেরে ফেলার জন্য। গলায় এমনভাবে চেপে ধরেছে যেন এখন ওই শ্বাসটা বন্ধ হয়ে যাবে। এনি ছটফট করে উঠে। নিশ্বাস নিতে না পেরে হাত – পা এলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ হয়ে যাবে এমন সময় গলা থেকে হাতটা শীতল হয়ে যায়। লোকটা গলা থেকে হাত সরিয়ে এনির পুরো মুখে স্পর্শ করে। এনি নিশ্বাস নিচ্ছে বড় বড়। গা গুলিয়ে আসছে তার । সে চেঁচিয়ে উঠবে তার আগেই আগন্তুক তার দুই ঠোঁট নিজের আঙ্গুলে দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। এনির মনে হচ্চিলো ঠোঁটগুলো দাঁতের ঘর্ষনে কেটে যাবে। দাঁতের ঘর্ষনে ঠোঁট কেটে যায়।
তখনই শুনা গেলো লোকটার হাসির শব্দ। রাতের অন্ধকারে হাসিটা ভয়ংকর হয়ে উঠে। এনি শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” ন..নিক!
— ইয়াহহ বেবিগার্ল।
এনি ভয়ে ছটফটিয়ে উঠে,
“বেবিগার্ল নয়। এনি আমার নাম। আমার রুমে কি করছেন? সত্যি করে বলুন কেনো এসেছেন? বাজেভাবে ছুঁয়েছেন কেনো আমাকে?
এনি কথা বলছে ঠিকই কিন্তু তার কণ্ঠের অন্তস্তলে গোপন কম্পন যেন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দকে বিকৃত করে তোলে। শীতল ভয় যেন তার শিরায় শিরায় বিষাক্ত নীল রক্তের মতো প্রবাহিত হচ্ছে। হৃদয়ের গভীর কুঠুরিতে যন্ত্রণার এক বিষাক্ত পঙ্কিলতা জমে উঠছে। নিজের অস্তিত্বের প্রতি এক তীব্র বিক্ষোভ। এক অপ্রতিরোধ্য আত্মঘৃণা তাকে ভিতর থেকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে এক নিরব অথচ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ।
সে ক্রমাগত নিজের গলা আর মুখ ঘষে যাচ্ছে। যেন সেই স্পর্শ, সেই দংশনের স্মৃতি, ত্বক থেকে মুছে ফেলতে চায়। অথচ ত্বকের গভীরে লেপটে থাকা সেই নরকীয় ছোঁয়া কোনোভাবেই আলগা হচ্ছে না। তার দেহ-মন তখন এক অব্যক্ত ঘৃণায় জর্জরিত।জীবন যেন নিজেকে বর্জন করার অনুনয় করছে।
পিপাসা এক বিভীষিকাময় তৃষ্ণা তাকে গ্রাস করে। মনে হয় সমস্ত শরীর এক আগ্নেয়গিরির কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে একমাত্র ঠাণ্ডা জলের এক ফোঁটাই হয়তো তাকে বাঁচাতে পারে। অথচ সামনেই অন্ধকারের মূর্ত রূপ হয়ে নিক বসে আছে। চোখে এক নিষ্ঠুর নিষ্পৃহতা, ঠোঁটে অনাসক্তি, যার উপস্থিতি নিজেই মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী।
এনি নিজেকে সতর্ক করার আগেই ডিমলাইট হঠাৎ জ্বলে ওঠে। আলো নয় যেন অন্ধকারের চোখ খুলে গেছে। সেই ক্ষীণ হলুদাভ আলোয় নিকের ছায়ার রেখাগুলো আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। নিক তার হাত ছেড়ে দেয়। অথচ সেই ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে এক প্রকার নিপীড়নের পরিণতি নিহিত ছিল।
তার হাত এত শক্তভাবে চেপে ধরা হয়েছিল যে ছেড়ে দেওয়ার পর মনে হলো সেই জায়গা দিয়ে রুহটাই যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। মাথা হালকা হয়ে ঘুরে উঠে। শরীর ভারসাম্য হারায়। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে হাতের গায়ে গভীরভাবে বসে থাকা পাঁচটি আঙুলের ক্ষতচিহ্ন।মনে হয় কেউ পাথরে শেকল বেঁধে রেখেছিলো তাকে।
এনির চোখ ছলছল করে ওঠে। ভেতরে ভেতরে কান্না তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে বন্যার মতো বেরিয়ে আসতে চায়। সে নিজেকে সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় প্রাণী মনে করে।একটি নীরব শিকার যে কারও করুণা না পেয়ে শুধুই নির্যাতিত হয়।
নিক তখনও স্থির তার চাহনি এখনও ধাতব। কোনো মানবিক উষ্ণতা নেই সেখানে। সে ধীরে কোনো আবেগহীন গতিতে একটি সিগারেট তুলে নেয়। মুখের রেখাগুলো কাটা-কাটা আর আ শীতল। চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে আছে। তবুও দৃষ্টিতে এক রকম উগ্রতা। দৃষ্টি আগুন ছুঁড়তে পারে চোখ দিয়েই।
তার চোখজোড়া অস্বাভাবিক লাল যেন ঘুমহীন রাতগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে সেখানে হিংস্র আগুন জ্বালিয়েছে। নিক যখন ধীরে ধীরে আগুন জ্বালিয়ে সিগারেট ঠোঁটের কোণে স্থাপন করে। দেখে মনে হচ্ছে দানব স্বয়ং ধ্বংসের বারুদে আগুন দিচ্ছে।
নিকের পরনে একটি কালো শার্ট, বুকের ওপরে তিনটি বোতাম খোলা।আর সেই উন্মুক্ত বুকে দেখা যাচ্ছে ড্রাগনের ট্যাটু, যেটি তার শরীরের মতোই জ্বালাময়ী ও রহস্যময়। গলায় ছড়িয়ে থাকা আঁকাবাঁকা রেখাগুলো যেন জ্বলন্ত সাপের মতো তার হৃৎপিণ্ড ঘিরে নাচছে।
এনি ভড়কে যায়।চোখে ভয় জমে ওঠে। গলার স্বর আটকে যায়। তবুও সে নিজেকে ভেঙে পড়তে দেয় না। এনি জানে ভয়ের কাছে মাথা নত করলে সে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সে নিজের অস্তিত্বকে আঁকড়ে ধরে এক টুকরো সাহসিকতা দিয়ে নিজেকে স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে।
নিক সিগারেটের ধোঁয়া চুমুক দিয়ে একটানা গিলে। তারপর এনির চোখে চোখ রেখেই সেই বিষাক্ত ধোঁয়ার বিস্ফোরণ ঘটায় তার মুখের দিকে। ধোঁয়া যেন শুধুই তামাক নয়, অপমান, ক্রোধ, দম্ভ সবকিছু একসাথে জমাট হয়ে ধেয়ে আসে এনির মুখে।
সেই ধোঁয়ার তীব্রতায় এনি এক মুহূর্তেই কেঁশে ওঠে। এনির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। তার কাশি থামে না। একটানা খিঁচ ধরে ফেলে বুকের পাঁজরে। সেই কাশির দমক বুকের ভেতর শ্বাসটুকুও চেপে ধরেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে পানি তুলে নেয়। এরপর এক চুমুকে গিলে ফেলে।
গলার জ্বালা কিছুটা প্রশমিত হলেও চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হিংস্র পুরুষটিকে দেখে তার অন্তর পুনরায় দুলে ওঠে। ধীরে ধীরে মাথা তোলে আর এক নিঃশ্বাসে তাকায় নিকের চোখে। যেখানে ভয়, ঘৃণা, অপমানের সঙ্গে মিশে থাকে একটুকরো প্রতিরোধের আগুন।
– জানোয়ার! এত রাতে কিসব নাটক করছেন আপনি? প্লিজ রেহায় দিন আমাকে।
নিক তাকিয়ে আছে এমন এক অস্বাভাবিক স্থিরতায়। তার চারপাশের জগতের কোনো শব্দই আর শ্রবণেন্দ্রিয় স্পর্শ করছে না। এক চূড়ান্ত বিমূঢ়, নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সে পৃথিবীর অস্তিত্ব থেকেই বিচ্ছিন্ন। তার চোখজোড়া নিঃসীম শূন্যতার দিকে ঘুরে থাকা দুটি গহ্বর যেখানে কোনো অনুভূতির প্রবেশাধিকার নেই। সে সিগারেটের দিকে চেয়ে থাকে।ঠোঁটে জমাট গম্ভীরতা। কোনো কথা, প্রশ্ন, কিংবা প্রতিবাদের স্পন্দনেও যার অভিব্যক্তি এক বিন্দু চঞ্চল হয় না।
ডিভান থেকে ধীর নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিমায় সে উঠে বসে। তারপর সম্পূর্ণ নির্লিপ্ততা নিয়ে সিগারেটের জ্বলন্ত প্রান্তটি সে নিজের হাতের শিরার উপর রাখে। তপ্ত ছেঁড়া সিগারেট চাপা আগুন কাঁপতে থাকা চামড়ার গভীরে গেঁথে যায়। সিগারেটের ছেঁকা খেয়েও নিকের ঠোঁটে গম্ভীর হাসি।
এনি আচমকা চমকে ওঠে। সেই দৃশ্য তার দৃষ্টিশক্তির ভেতর বাজের মতো আঘাত হানে। মুখে হাত চাপা দিয়ে সে বিছানার চাদর মুঠো করে ধরে। এই নৃশংসতার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা আঁকড়ে ধরা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। তার চোখ বড় হয়ে যায়।হৃদস্পন্দন যেন বুকে লাফিয়ে উঠতে চায়।
আর কপালের উপরে ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা ঘনীভূত হয়ে টুপটাপ করে নামতে থাকে। সেগুলো আর জল নয় বরং আতঙ্কে গলে যাওয়া সত্তার দাগ।
ঘরে এসি চললেও এনি শরীরে উত্তাপ বাড়ে। গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে।কিন্তু তা ঠাণ্ডায় নয় বরং এক হিমশীতল ভয়ের তীব্র তাপপ্রবাহে। তার মনে প্রশ্ন ঘূর্ণায়মান হয়,
” মানুষ কীভাবে এমন আত্মনির্যাতনে আনন্দ খুঁজে পায়? এই পিশাচটা কী আদৌ মানুষ?
এনির ভাবনার প্রহর ঘটে নিকের ভয়ানক আওয়াজে,
” আর ইউ স্কেয়ার্ড, বেবিগার্ল? তোমার ডান হাতে স্পর্শ করেছিলো বাস্ট্রাডটা, তাই না? ভেবেছিলাম ভুলে যাব। কিছু করব না কিন্তু…
নিক কথা শেষ করতে পারে নি। এনি নড়েচড়ে উঠে। বিছানা থেকে নেমে পিছিয়ে যায়। নিকের দিকে তাকিয়ে কাঁপা আওয়াজে বলে,
” কি.. কিন্তু কি? কি করবেন আপনি?
এনি সিগারেটের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়াতে নাড়াতে বলে,
” কিন্তু ঘুম হচ্ছিলো না। শান্তি পাচ্ছি না আমি কিছুতেই। বুকের ডান পাশে তীব্র দহন হচ্ছে। চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্য কেনো ভেসে আসছে বলোতো?
নিক কথা বলছে আর সেই প্রতিটি শব্দের ভারে চারপাশের বাতাস জমে জমে থমকে যাচ্ছে। সে এক পা এক পা করে সামনে এগিয়ে আসে।তার চলাফেরায় নেই কোনো তাড়াহুড়া। আছে এক নিরাবেগ হিংস্রতার শীতল হিসেব। এদিকে এনি কাঁপতে কাঁপতে পেছনের দিকে সরতে থাকে। তার চোখে আতঙ্ক। ঠোঁটে কাঁপন আর দেহে এক বিষন্ন ক্লান্তির প্রতিচ্ছবি।
এনির পা দু’টি যেন আর তাকে বহন করতে পারছে না।শরীর ও আত্মা সমানভাবে নিঃশেষিত।
তবুও পরবর্তী শ্বাসটুকু টানার শক্তি সঞ্চয় করর ক্ষীণ কিন্তু জেদি স্বরে বলে,
” আপনি একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত। আপনার মনে, চোখে তাতে ভ্রান্তি থাকাটাই স্বাভাবিক। নাবিদ আমাকে নিতে এসেছিলো আপনি যেতে দেননি।তাই সে আমার হাত ধরেছে। এতে আপনার হৃদয়ে এত যন্ত্রণা কেন? আমি আপনার প্রেমিকা নয় নিক জেভিরান। আর না আমি আপনার বউ। আপনি..
এনি শেষ করতে পারে নি কথাখানা। পুনরায় আক্রমনে দু – পা পিছিয়ে যায়। নিক এনির গলায় বন্ধুক চেপে ধরেছে। কথাটা অত্যন্ত রাগের সাথে এনির মুখ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলে,
” রক্ষিতা! রক্ষিতা তুই আমার।
এনির চোখে পানি চলে আসে। রক্ষিতা শব্দটা কাটা দিয়ে উঠে শরীরে। কিন্তু নিক তখন ঠিক সামনে। হিংস্র কোনো হায়নার মতো দাঁড়িয়ে। এনির দৃষ্টি মেঝের দিকে।
নিক ফিসফিস করে উঠে। কণ্ঠস্বরে তখনও বিষ ও আগুন মিশে আছে,
“You are just my fucking toy. But…
“বাট” শব্দটা অসমাপ্ত রয়ে যায়। নিক বাঁকা হেসে অসমাপ্ত কথার বদলে জিজ্ঞেস করে,
” রক্ষিতা মানে কি জানো?”
প্রশ্নটি শরীর ছেঁড়ার জন্য নয় বরং আত্মা বিদীর্ণ করার জন্য ছোড়া হয়। এনির হৃদয়ের অভ্যন্তরটা যেন পাঁজর ফুঁড়ে উঠে আসে। সে জানে না আসলে ‘রক্ষিতা’ শব্দটির প্রকৃত ব্যাখ্যা। তার মাথায় শুধু একটি সোজা মানে গেঁথে আছে গোলাম আর স্বাধীনতাহীনতা। এনি কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করে,
” কি?
নিক এবার হালকা হেসে এনির একগুচ্ছ চুল শাহাদাত আঙুলে পেঁচিয়ে টান দেয়। যন্ত্রণায় এনি গোঙাতে গোঙাতে মাথা নিচু করে।কিন্তু তার কষ্টের মুহূর্ত শেষ হয় না। পরমুহূর্তে নিক সেই জ্বলন্ত সিগারেটটি এনির বাম হাতে চেপে ধরে।
এনির মুখ ফেটে যায় আর্তনাদে। ব্যথার তীব্রতায় সে কাঁদতে থাকে কিন্তু নিক অবিচল।
নিক তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ভয়ঙ্কর কোমল অথচ বিষাক্ত গলায় বলে,
“রক্ষিতা মানে এমন নারী, যাকে কোনো পুরুষ তার বৈধ স্ত্রী না করেও ভোগ করে। তার শরীর ব্যবহার করে বাট সম্পর্ক নয়। কতবার গিয়েছো আমার বিছানায় বেবিগার্ল? তুমি নিজেই আমাকে রক্ষিতা বলে জাগাতে চাও? আমার ভিতরের দানবটাকে?
সামলাতে পারবে নিক জেভরানকে? না পারো, না চাও তবুও আজ থেকে তুমি আমার রক্ষিতা হয়েই থাকবে। স্বেচ্ছায় হোক বা জোরে আই ডোন্ট কেয়ার। নিক জেভরানের বেডে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থেকো।
এই কথাগুলো শুনে এনি স্তব্ধ হয়ে যায়। তার কাঁধে, হাতে, চামড়ার গভীরে যে যন্ত্রণা পোড়াচ্ছে। তা তার হৃদয়ের ভেতরের দহনকে ছুঁতে পারছে না। কারণ সে তখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। চেতনা আর অবচেতনতার মাঝামাঝি দোলায়মান। নিকের ঠোঁটের স্পর্শ এনির কান থেকে গাল পর্যন্ত যায়।
‘রক্ষিতা’ এই শব্দটি তার মস্তিষ্কের ভেতর গুমরে গুমরে শকুনের ঠোকরের মতো ফিরে আসছে। তার চোখ স্থির ঠোঁট নিস্তব্ধ। মাথায় অসহনীয় শব্দ-বিস্ফোরণ।
নিক সিগারেট ছুড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। এনির নজর যায় না। তার দৃষ্টিভঙ্গি এখন নিজের পোড়া হাতে।ফর্সা ত্বকের উপর পুড়ন্ত দাগ যেন বিদ্রূপ করছে তার নারীত্বকে।
কিন্তু আচমকাই এনি নিকের পা জড়িয়ে ধরে ফেলে।
নিক থেমে দাঁড়ায় সাথে আশ্চর্য হয়। তার কপাল কুঁচকে যায়। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে এক গুঁড়ি মেরে বসে থাকা মেয়ে। যার মুখ থমথমে বিরাজ করছে। এনির চোখে আছে করুণা আর মিনতি।
এনি বলে উঠে ভাঙা আর কান্না গলায়,
” আমার সম্মানটুকু নষ্ট করবেন না। আমি আজীবন আপনার গোলাম হয়ে থাকব কুকুরের মতো। যত যন্ত্রণা দিবেন, নেব। যত কষ্ট, সব সয়ে যাব। কিন্তু… কিন্তু আমার সম্মানকে পায়ের নিচে ফেলবেন না। আমাকে মেরে ফেলেন। কিন্তু বিবাহবহির্ভূত স্পর্শে আমি টিকতে পারব না। দয়া করুন। প্লিজ এমন কিছু করবেন না যার পরিণতিতে আমি জীবন্ত মরে যাব।
নিক যেন এই কান্না প্রার্থনা, অনুনয় কিছুই শোনে না। তার ভঙ্গিতে করুণা নেই। আর মানবিকতা অনেক দুর। সে নিঃশব্দে পেছন ফিরেই হনহনিয়ে এগিয়ে যায়।
তবে যাওয়ার আগে বিরক্তিতে ভরা এক হিংস্র মুহূর্তে সে পায়ের ঝাপটা দিয়ে এনিকে সজোরে সরিয়ে দেয়।
এনি ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ে পাশের কাঠের টেবিলটিতে। ধাক্কায় মাথার ভিতর যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয় সহস্র রক্তবিন্দু।
নিক দরজার কাছে যেতেই এনি বলে উঠে,
” জানোয়ার!
তবে নিক শুনল না। রক্তাক্ত এনিকে রেখেই বেরিয়ে যায়। এনির চেতনা টলোমলো বাতির মত নিভু নিভু করে জ্বলে। পরমুহূর্তেই তার কপালের মাঝখানে রক্তরঙা রেখা আঁকা পড়ে এইটা শুধু কোনো ক্ষতের চিহ্ন নয় এইটা এক নারীর ভেঙে পড়া আত্মমর্যাদার জ্বলন্ত ছাপ। গড়িয়ে পড়া রক্ত একেকটি ফোঁটায় লেখা থাকে অসম্মান, নিপীড়ন, আর করুণ নির্জনতায় বন্দী একটি অস্তিত্বের নিরব প্রতিবাদ।
এনি মাথায় হাত দিয়ে থরথর করে কেঁপে ওঠে। আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কান্নার শব্দ ছিঁড়ে ফেলে নিশুতি রাতের স্তব্ধতা। এক হাহাকারের মতো। কোনো চরম দুর্ঘটনায় নিহত আত্মার বিলাপ। তার কান্না আর্তিতে রূপ নেয়। সারা শরীর দুলতে থাকে সেই বেদনার কম্পনে। উপরের দিকে তাকিয়ে, নিষ্ঠুর নির্জন আকাশের দিকে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে চিৎকার করে ওঠে,
“এই তুমি! হে চুপ করে থাকা আকাশ! আমাকে কোন নরকে ঠেলে দিলে? এমন হিংস্র, ঘৃণ্য, বিবমিষায় ভরা নরক কি আমার প্রাপ্য ছিল? আমি তো কোনো পাপ করিনি! কেন আমাকে এইভাবে বারবার ভেঙে চুরমার করলে?
আমার মা-বাবাকে কেড়ে নিয়ে সাত বছর বয়সেই আমাকে অনাথ করেছিলে। করুণার পাত্র করে তুলেছিলে। কিন্তু আজ… আজ তুমি আমাকে কোথায় এনে ফেললে? এই পুরুষ-নরকের ভেতর কেন আমাকে একা দাঁড় করিয়ে দিলে? দয়া করো… সাহায্য করো! প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে নাও তোমার কাছে। রুহটাকে আজরাইল দিয়ে ছিনিয়ে নাও! আমি আর পারছি না! আমি চাই না সেই নরপিশাচ আমার দেহ ভোগ করুক। তার আগেই যেন আমি প্রাণহীন পড়ে থাকি। বাঁচলে যদি বেঁচে থেকেও মরার মত বাঁচতে হয় তবে মৃত্যুই হোক মুক্তি। জীবন্ত লাশ হয়ে আর কতকাল থাকব আমি?
এনি সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। হায় আফসোস সাউন্ড প্রুফ রুমের আওয়াজ বাহিরে যাওয়ার ক্ষমতা নেই । এনির আর্তনাদ কোনো একক নারীর বিলাপ নয় এটা সেই সমস্ত নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে যারা সমাজের কুৎসিত মুখোশে প্রতিনিয়ত পদদলিত হয়। অথচ কেউ দেখে না। কেউ শোনে না। তার রক্ত রঙ নয় বরং এক নীরব অভিশাপ। এক বিদীর্ণ আত্মার মৌন বিদ্রোহ। চাঁদের আলোতে রক্তের লাল আরও গাঢ় লাগে। ঠিক তেমনই তার ব্যথার গভীরতাও অসীমতাকে ছুঁয়ে যায়।
এই অন্ধকারে এনি একা নয় সে প্রতিধ্বনি হয়ে উঠছে সমস্ত অবদমিত কণ্ঠের। এটা শুধুই আর্তনাদ নয় এটা ইতিহাসের পৃষ্ঠা কাঁপানো এক নারীর অবিস্মরণীয় চিৎকার। এনি হুট করে থেমে যায়। থেমে যায় তার গলা ফেটে আসা চিৎকারের আওয়াজ। হাতের পুড়ে যাওয়া স্থানটার দিকে তাকায়। আবার ও চোখ বন্ধ করে ফেলে সাথে সাথে। গলায় নিকের স্পর্শ আছে অনুভব করতেই দুই হাত দিয়ে গলায় ঘেষতে থাকে। কিন্তু এনির শক্তি ফুরিয়ে আসে। পা দুই পাশে ছড়িয়ে নিস্তেজ হয়ে হেলান দিয়ে বসে থাকে। জ্ঞান হারিয়েছে কি না সেটা বুঝার ইয়াত্তা নেই।
BBC আফ্রিকা চ্যানেলের সহকারীর স্ত্রী অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছে। আর সেই অভিযোগের প্রধান আসামী গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। উনার অভিযোগ ওনার স্বামীকে গ্যাংস্টার বস মেরেছে। হ্যা এইটা সত্যি নিক মেরেছে উনার স্বামীকে। কিন্তু আদ’ও কি কোনো প্রমান আছে? কোনো সাক্ষী ছিলো ওইদিন রাতে হত্যার সময়। কেউ কি সাক্ষী দিবে নিকের বিরুদ্ধে? সেই সাহসিকতা কি কারোর আছে? থাকবে কিভাবে , সবাই তো ছিলো নিকের লোক। গার্ড, অধিরাজ আর আরিশ ছাড়া তো কেউ ছিলো না। লাশকে ফেলে দেওয়া হয়েছে সমুদ্রের কোন গহ্বরে তার কোনো ইয়াত্তা নেই। কে খুঁজবে এই লাশ? আর কে আঙ্গুল তুলবে গ্যাংস্টার বসের দিকে যেখানে কোনো প্রমান নেই। কিন্তু সহকারীর স্ত্রী অভিযোগ করেছে প্রতিটি চ্যানেলে। সেই সংবাদ সাথে সাথেই নিকের কানে আসে। অধিরাজ দাঁড়ায় নিকের সম্মুখে। পাশেই আরিশ কপাল কুচকে তাকিয়ে আছে। কালো গড়নের সুদর্শন জিম করা বডি নিয়েও অধিরাজ কাঁপছে কিছুটা। এনিকে একটু দেখার জন্য ও মন উতলা হয়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি খুব ভয়াভহ । এখন এনির সাথে সে দেখাও করতে পারবে না।
নিক কে কপাল ঘেষতে দেখে আরিশ গম্ভীরতা টেনে বলে,
” কি করবি নিক? ওই মহিলার কাছে যাবি?
— মহিলাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নয় আমি আরিশ। তাদের দেখলেই শরীর জ্বলে উঠে।
অধিরাজ অনেক সময় নিকের মুখে মহিলাদের প্রতি এমন ঘৃনিত বাক্য শুনে। কিন্তু এত বছরেও তার জানা হলো না কেনো নিক জেভরান মহিলাদের ঠিক এতটা ঘৃনা করেন? কেনো ওদের ছায়া দেখলেই উনি এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েন? বিশেষ করে কোনো মা যখন তার বাচ্চাকে আদর করছে তখন নিক এক ভয়ানক হায়েনায় পরিনত হয়। তার চোখ গুলোর দিকে ঠিক তাকানো যায় না। অধিরাজের মনে প্রশ্ন জাগে কিন্তু করার সাহস পায় না। যদি এইটা বসের দুর্বলতা হয় তাহলে অনেক কষ্ট পাবে। কিন্তু নিক জেভরানের কি কষ্ট বলতে কিছু আছে?
অধিরাজের ভাবনার মধ্যেই নিক ডার্ক বাঁকানো চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে বলে,
” গাড়ি বের করে। সমুদ্রীয় প্যালেসে যাব, সাথে ওই মহিলার কাছে।
আরিশ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,
” মি, কায়াত নারী আর অস্ত্র পাচারের শেয়ার চাচ্ছে। তুই কি শেয়ার করবি?
নিকের মুখ ভঙ্গিমা বদলে যায়। রক্ত চোখে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” কখনো দেখেছিস আমাকে শেয়ারে ব্যবসা করতে? এই কালো সম্রাজ্য আমি গড়ে তুলেছি। নিজের সব কিছু, যেখানে কারোর স্থান নেই। বিলাতে গেলেই বিনাশ নিশ্চিত।
— দেখেনি, তাবে এমনি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
— এইটা সেই মাদার্ফা** এর একটা চাল। আমাকে ফাঁসানোর জন্য পথ খুঁজছে। নাহলে এতদিন বলে নি আজ কেনো বলছে?
— গভীরে ভাবি নি। তুই তাহলে আয় আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি।
আরিশ ওয়াইনের গ্লাসে সামান্য চুমুক দিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় মাঝ বয়সী একটা মহিলাকে দেখে কপাল কুচকে ফেলে। নিকের বাড়িতে মেয়ে মেইড? আরিশ আশ্চর্য নিয়ে তাকায় নিকের দিকে। নিক মহিলাকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
” উপরে একটা মেয়ে আছে। তার দেখা- শুনার দায়িত্ব আপনার। আর রুমের ভেতরে যত ধারালো জিনিস আছে সব সরিয়ে ফেলবেন। একটা ধারালো জিনিস ও যাতে না থাকে। খাওয়া – দাওয়া সব আপনি দেখা- শুনা করবেন। যদি আপনাকে অমান্য করে তাহলে আমাকে জানাবেন।
মহিলাটি নিকের কথা মত নত মস্তিষ্ক নাড়ায়। নিক গম্ভীর হেসে নিজ গন্তব্যে এগিয়ে যায়। আর এইদকে আরিশ আর অধিরাজ টাস্কি খেয়ে দাড়িয়ে আছে। মেইড! অসম্ভব!
রাত্রির গভীরতা ক্রমশ ঘনীভূত হয় সমুদ্রতীরবর্তী রিয়ু প্যালেস জানজিবারের অলিন্দে। বাতাসে ভেসে আসে ভারত মহাসাগরের দিকচক্রবাল ছুঁয়ে আসা স্যাঁতসেঁতে লবণাক্ত সুবাস। কানে বাজে দূরের ঢেউয়ের সংগীত। কোনো অতলান্তিক অতীতের নিঃশব্দ আহ্বান। সমুদ্রের ধার ঘেঁষে স্থাপিত অভিজাত কাঠের কাউচে বসে আছে এক যুবক। সে গভীর চিন্তামগ্ন নীরব, বিষণ্নতা-আচ্ছন্ন।
তার ডান হাতে মোটা ব্যান্ডেজ। তার রক্তসিক্ত করতল আড়াল করে রাখছে দেহের নয়। আত্মার এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। চোখের দৃষ্টিতে সময়ের স্থবিরতা। সেকেন্ডগুলো থেমে আছে। অথবা চুপিচুপি হারিয়ে যাচ্ছে অজানা অতলে। তার অবয়বে ফুটে উঠেছে এক অন্তর্গত সংগ্রামের ছাপ। যেখানে বেদনার ভাষা নেই আছে শুধু শূন্যতা। যুবকটা উঠে দাঁড়ায়। কাউচ ভেদ করে দুরে অবস্থিত ব্লেক ভাইপার মেনশনের দিকে তাকায়। কালো কাউচ দিয়ে ঘেরা প্রতিটি দেয়াল। অন্ধকারে ও কত সুগভীর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিক জেভরানের অট্টালিকাটাকে।
যুবকটা দেখতে পারছে না তবুও অনুমান করছে। সেই অট্টালিকার কোনো এক রুমের, কোনো এক প্রান্তে তার ছোট প্রানটা বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নিক জেভরান কি আদ’ও ছাড় দিয়েছে? রক্ষিতা হিসেবে শারীরিক তৃপ্তি মিটায় নি? যদি নাই মিটাত তাহলে আমার এনিকে কেনো ক্রয় করেছে? চিন্তায় মাথা ছিড়ে যাচ্ছে নাবিদের। কেনো কিনেছে এনিকে সেই সূত্র ধরতে পারছে না।সামান্য সৌন্দর্যের কাঙ্গালী হয়ে এমন করেছে! আর নিশ্চয় এনিকে গভীর ভাবে স্পর্শ ও করেছে? মুহূর্তেই ছটফট করে প্রেমিক মনটা। ছুটে যেতে চাচ্ছে তার পাখিটার কাছে। হাজার পুরুষের স্পর্শ লাগলেও এনি শুধু আমার। আমি সেই বিধ্বংসী, বিধ্বস্ত মেয়েটাকেই চাইব। কলঙ্কিত শরীরকে আমার স্পর্শে পবিত্র করে তুলব । নাবিদ ওয়াইনের গ্লাস ঘোরিয়ে দুরে দৃষ্টি রেখে বলে,
“নিজের ধ্বংসের শিখরে দাঁড়িয়েও যদি কিছু চাইবার অধিকার থাকে, তবে সে অধিকার আমি কেবল এনির জন্যই ব্যবহার করব।
এরপর সামান্য থেমে গম্ভীরতা নিয়ে চেয়ারে মাথা হেলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টেনে বলে,
” অতি শিঘ্রয় আমি আপনার সম্মুখীন হচ্ছি নিক জেভরান। ক্ষমতা আর দাপট আমার ও কোনো দিক দিয়ে কম নয়। আমার ভালোবাসার কসম করে বলছি এই সপ্তাহের ভিতরে আমি এনিকে নিজের কাছে নিয়ে আসব ওই। এই অন্ধকার গভীর রজনীতে আমি তর কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম।
নিক চলে যেতেই মেইড এনির রুমের দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছিলো। কিন্তু কেনো জানি অজানা ভয় কাজ করছে। সে শুনেছে মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী। তার ভেতরে ধুক ধুক করছে মেয়েটাকে এক নজর দেখার জন্য। মেইড সব ভয় কাটিয়ে পুনরায় এনির রুমের দিকে যায়। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই অবাক হয়ে যায়। পুরো রুম অন্ধকারে আচ্ছন্ন। মেইড কপাল কুচকে নিজের ফোনের লাইট অন করে সুইচ বোর্ড খুজতে থাকে। কাঙ্খিত জিনিস খুজে পেয়ে সাথে সাথে লাইট অন করে দেয়। লাইট অন করে সামনে এগিয়ে যাবে এমন সময় মুখে হাত দিয়ে স্তব্দ হয়ে যায়। মেঝেতে দেয়ালে হেলান দিয়ে এনি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সারা রাত এইভাবে ছিলো। এনির অবস্থা দেখে সে দ্রুত সেদিকে যায়। এনিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। এনি এখনও নিস্তব্দ হয়ে পড়ে আছে। মহিলাটা এনির মুখের দিকে তাকিয়ে আরও ঝলকানি খায়। ঠিক কতটা মায়া আছে এই মুখে তা অনুভব করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এইটা কোনো মেয়ে নাকি উপর ওয়ালার দান! মহিলাটা এক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে যায় এনির সৌন্দর্যে। সুগভীর এই পাতলা গড়নের মেয়ের চেহারায় কিছু তো একটা আছেই। নাহলে এক পলক দেখাতেই চোখ বাঁধিয়ে কেনো গেলো? যেন কোনো চাঁদের ঝলকানি। আর এই মেয়ের এমন করুন অবস্থা? গলায় আঙ্গুলের ছাপ, হাতে সিগারেটের পুড়া ছেকা, সাথে আঙ্গুলের ছাপও স্পষ্ট। কপাল কেটে রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে।কান্নার কারনে চোখের পানির দাগ এখনও স্পষ্ট। মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে। মহিলাটির ভীষন মায়া হয় এনির উপর। সে কোনোরকম টেনে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দেয়। এনি এখনও নিস্তেজতার গভীরে ডুবে আছে। মহিলাটা একটা কাপড় ভিজিয়ে এনে পুরো শরীর মুছে দেয়। এরপর কাটা স্থান – গুলোতে মেডিসিন লাগিয়ে দেয়।কামড়ের দাগ দেখে তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। মেডিসিন গুলো বেড সাইডে সুন্দরভাবে সাজানো ছিলো। মহিলাটি রুম থেকে বেরিয়ে একজন হাউজকিপার কে আদেশ করে গরম স্যুপ নিয়ে আসার জন্য। এরপর নিজে এসে এনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। টানা আধা ঘন্টা পর এনি এনি নিভু নিভু চোখ মেলে তাকায়। মাথা যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে। কিছুতেই চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। তবুও বহু কষ্টে নিস্তেজ শরীরকে টেনে – টুনে হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে।
চোখের সামনে মহিলাকে দেখে বলে,
” কে আপনি?
মহিলাটি এনির চোখের দিকে এক পলক তাকিয়ে থাকে। সে এতক্ষন এনিকেই দেখছিলো। এনির প্রশ্নটা কানে পৌঁছায় না তার। নিজের অজান্তেই বলে,
” তুমি খুব সুন্দর মা। একদম উপর ওয়ালার আশির্বাদ।
এনি কিছুটা থতমত খেলেও তাচ্ছিল্য ভঙ্গিমায় বলে,
” আশির্বাদ নিয়ে বানিয়েছে অথচ আজ অভিশাপ হয়ে গেলাম। কিন্তু কে আপনি? এই প্রথম কোনো নারীকে দেখেছি। কাল একজন ছিলো কিন্তু তাকেও দুই মিনিটের জন্য দেখেছিলাম। শুনেছি সে কম বয়সী মেয়ে তাই বাহির করে দেওয়া হয়েছে। আপনি কে?
মহিলাটি চোখের পানি মুছে বলে,
” আমি চিত্রারানী।
— হিন্দু?
— হুম। বাপ – দাদার ধর্ম।
এনি তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। এখানে প্রতিটি মানুষ কি তবে অন্য ধর্মের?
— আপনাকে আমি চিত্রা মাসি ডাকতে পারি?
— কেনো নয়। অবশ্যই ডাকবেন ম্যাডাম।
এনি মুখ কালো করে বলে,
” ম্যাডাম সম্মোধন কেনো করছেন মাসি? আমাকে এনি বলে ডাকবেন।
— স্যার রাগ করবে।
— কোন স্যার?
— নিক স্যার।
মুহূর্তেই এনির হৃদয় জ্বলে উঠে। রাতের ঘটনা থেকে শুরু করে নিকের প্রতিটা পাপ ভেসে উঠে। ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে বলে,
” ওই জানোয়ারের নাম উচ্চারন করবেন না মাসি। আমার জীবনটাকে নরকে পরিনত করেছে।
চিত্রা ঢোক গিকে সামান্য। এনির কথা যদি নিক শুনে তাহলে নির্ঘাত কোনো ক্ষতি করে দিবে। সে তো নিক কে চিনে। এর আগেও একবার কাজ করেছে এখানে। নিক কখনো উনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে না কিন্তু নিকের স্বভাব সম্পর্কে সে অবগত। চিত্রা ভয়ে নিশ্বাস ফেলে স্যুপটা এনির মুখের কাছে নিয়ে আসে। এনি মুখ ঘোরিয়ে নিলে মহিলাটা বলে,
” ক্ষুধার্ত রেখে নিজেকে কষ্ট দিতে পারবে কিন্তু লড়াই করতে পারবে না। সঠিকভাবে বাঁচতে হলে শরীরে শক্তি প্রয়োজন। আর শক্তির জন প্রয়োজন খাবার। তাই খাবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেই সমস্যর সমাধান নয়। মনে রেখো লোকে তৈলাক্ত মাথায় তেল ঢেলে দেয় বেশি করে।
এনি মনযোগ দিয়ে চিত্রার কথা শুনে। কেনো জানি অতি আপন মনে হচ্ছে উনাকে তার কাছে। চিত্রা স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছে আর এনি বাধ্য মেয়ের মত খেয়ে যাচ্ছে। কোনো অভিযোগ নেই, যেন মায়ের হাতে খাচ্ছে । স্যুপ খাওয়া অবস্থায় এনি মহিলাটিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে,
” জানেন যখন আমি মাত্র সাত বছর বসয়ের তখন আমি এতিম হয়ে যায়। তখন থেকে মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। খুব মিস করি আমি আমার মাম্মামকে।
চিত্রা প্রথমে বেশ অবাক হয়। তার মত সামান্য মেইডকে জডিয়ে ধরেছে ভেবে স্তব্দ হয়ে যায়। যে এইটুকু বুঝেছে মেয়েটা অনেক সরল। কিন্তু নিয়তি তাকে নরকে ঢেলে দিয়েছে। তার চোখের কোণে জমে উঠে। এনিকে নিজের সাথে মিশিয়ে বলে,
” কেউ ছিলো না তোমার মা?
— আমার আপা ছিলো। যে আমাকে বড় করে তুলেছে। কিন্তু বয়সের ব্যবধান মাত্র চার বছরের। আপা আমাকে সব কিছুতে আগলে রেখেছে কিন্তু আফসোস এইবার সে হেরে গিয়েছে।
— তোমার আপা কোথায়?
— ইরান। কিন্তু সে এসেছে এখানে। আমি সংবাদ পেয়েছি
– ইরান! তুমি ইরানী?
— হুম। আমার পাপা ইরানী ছিলো আর মাম্মাম ভারতীয়।
চিত্রা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। মেয়েটা কি ফুটফুটে। মনে হচ্ছে নিজের মেয়ে।
— তারা কিভাবে মারা গিয়েছে? তোমাকে পাচার কেন্দ্রে কিভাবে নিয়ে আসা হয়েছে।
এনি বুক থেকে মাথা তুলে বলে,
” অন্য একদিন বলব চিত্রা মাসি। আজ মন – মস্তিষ্ক বিলুপ্ত হয়ে আছে।
চিত্রা এনিকে আর প্রশ্ন করে না। বেড সাইট থেকে মেডিসিন নিয়ে বলে,
” মেডিসিন টা খেয়ে নাও মা।
এনি কপাল কুচকে সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” কিসের মেডিসিন এইটা চিত্রা মাসি?কে দিয়েছে?
চিত্রা সত্য চেপে রেখে বলে,
” ব্যাথা নাশক মেডিসিন। খেয়ে নাও দ্রুত। যেখানে যেখানে ব্যাথা পেয়েছো সব কমে যাবে।
এনি মুখ ঘোরিয়ে বলে ,
” অভ্যন্তরীর ব্যাথা কে মিটাবে মাসি? বাহ্যিকটাই কেনো চোখে পড়ে সবার? আমাকে বাঁচাবে এই যন্ত্রনা থেকে?
চিত্রা চমকায়, স্তব্দ হয়ে তাকায় এনির অনুভুতী হীন সমুদ্রের ঢেউ ওর মত সুগভীর নেত্রে,
” নিয়তি কখন কি করে বুঝা মুশকিল। তবে আমরা এখানে সবাই নিক স্যারের দাস। উনি যা বলে তাই হয়। উনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু হলে প্রান হারাবে সবাই। আমি নিরুপায় আজ। তোমাকে সাহায্য করতে গেলে দুইজন ওই মরতে হবে।
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬
– মরন যদি শান্তি নিয়ে আসে তাহলে আমি মরতে রাজি মাসি। তবে চিন্তা করবেন না আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। আপনাকে কিছু করতে হবে না।
এনি আর কথা না বলে শুয়ে পড়ে। এনিকে চোখ বন্ধ করতে দেখে চিত্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। এনি শরীরে চাদর টেনে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নাবিদের ইশারার কথা ভাবতে থাকে। মনের ভেতরেই বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসে,
” কবে আসবেন নাবিদ ভাই? ”
