প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬১
ইনান হাওলাদার
পরনে ধবধবে সাদা রংয়ের ট্র্যাকস্যুট ( জগিং ড্রেস ) তূর্যের। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাত্র জগিং থেকে ফিরেছে সে।ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসতে বসতে মায়ের কাছে কফি চাইলো ও ।এপাশের এসির টেম্পারেচার আরো খানিকটা কমিয়ে দিয়ে সেন্টার টেবিল হতে আজকের নিউজ পেপার তুলে নিলো।কয়েক লাইন পড়ার মধ্যেই লতা বেগম কফি নিয়ে আসলেন।দিতে দিতে বললেন,
” এখন থেকে বউয়ের কাছেই কফি চাইবি বাবা।মা-চাচিরা এ যাবৎ দিয়ে এলাম ।আর কত দিবো? ”
তূর্য সৌজন্য হেসে কফির কাপ নিলো ওনার থেকে। চুমুক দিতে দিতে একবার দোতলায় নিজের রুমের দিকে তাকালো।দরজা এখনো ভেজিয়ে রাখা। সকালে উঠে জগিংয়ে যাওয়ার সময় সে যেমন রেখে গিয়েছিল ঠিক তেমন। ও জানতে চাইলো,
” আহি ওঠেনি এখনো? ”
এর মধ্যে নাবিল-পিংকি-তাসিন-আলিয়া নিচে নেমে এলো। লতা বেগমের মনোযোগ সেদিকে চলে গেল। কে কি খাবে জিজ্ঞেস করে ওদের জন্যেও গরম পানি চুলায় দিলেন তিনি।নাবিল-তাসিন দুইজনে তূর্যের দুইপাশে বসলো।ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তূর্যের কথা শুনেছে।এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুব সাবধানতার সাথে তাসিন বলল,
” মেয়েটা এখনো ঘুম থেকে উঠতে পারলো না।রাতে একটু তো ঘুমাতে দেওয়া উচিত ছিল ভাই ”
তূর্যও কন্ঠ খাদে নামালো।অতঃপর শা’সালো ওকে,
” সব জেনে শুনে ড্রামা করবি না একদম ”
” তোরে বিশ্বাস করছিলাম। বা’ড়া তুই ছলনা করলি। রাতে যদি সত্যিই ঘুমায় তাইলে এহন কেন ঘুমাচ্ছে ? ”
” তোরা নিজের চোখে দেখেছিস ঘুমাচ্ছে।তারপরেও…..” ওদের বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই।সবটা জেনে বুঝেই এমন করছে।তাই তূর্য থেমে গিয়ে বলল,
” ওকে ফাইন! আমার বউ আমি তার সাথে যা খুশি করেছি। তোদের প্রবলেইম?”
” ভাই দেখ বোনরে কেমনে বউ বলে একটু লজ্জাও করে না ” নাবিলের দিকে তাকিয়ে তূর্যকে বিদ্রুপ করে বলল তাসিন। সাথে মুখও বিকৃত করলো। পরপর নাবিলও কিছু বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু ওর মুখে কুলুপ এঁটে দিলো তূর্য,
” তোরা বিদেয় হবি কবে? আই মিন কখন? খেয়েই যাবি? নাকি এক্ষুনি?”
ছেলে দুটোর মুখ থমথমে হয়ে গেল। একে অপরের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো।এমন ভাব এই বুঝি কান্না করে দিবে।অথচ,পুরোটাই নাটক। তাসিন থমথমে মুখেই বলল,
” একে কোন দেশি অপমান বলে ভাই? ”
তূর্য একদম নিশ্চুপ।যেন এইমাত্র কিছুই বলেনি সে।স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কফির কাপে একের পর এক চুমুক দিয়ে যাচ্ছে।
” বা’ড়া আমি জাদু জানলে এহনই তুড়ি মা’ইরা গায়েব হইয়া যাইতাম।এক মুহূর্ত থাকতাম না।কেমনে ….” কি বলবে কথা হারিয়ে ফেললো নাবিল।ফলস্বরূপ কথার মাঝ পথেই থেমে গেল সে।
” হ্যাঁ বল..তারপর? ”
তূর্যের উৎসাহ পেয়ে ও আবার বলা শুরু করলো,
” কি কমু বা’ড়া।আমার কান্না আসতাছে। এই কথা তুই কেমনে কইতে পারলি ? ছিঃ !”
এর মধ্যে লতা বেগম আসলেন।ওদের সবাইকে কফি দিলেন।আর পিংকিকে একটা ফলের জুসের গ্লাস দিয়ে বললেন,
” তোমার জন্যে এইটা ভালো হবে মা ”
” একটু বুঝান আন্টি।আমার একটা কথা গাইয়ে লাগায় না বাড়আআ…” দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো নাবিল।তোতলাতে তোতলাতে বলল
” বা বা বাড়িতে বাড়িতে থাকলে ” এরসাথে মনে মনে পণ করে নিল আর মুখ খুলবে না।লতা বেগম ওর কথার উত্তরে বললেন,
” কয়েক মাস গেলে ঠিক হয়ে যাবে।এখন হয়তো মুখে রুচি নেই বাবা ” এরপর পিংকির দিকে তাকিয়ে বললেন,
” অতীতে বন্ধু ছিল তাতে কি হয়েছে?এখন তোমার স্বামী হয়।নাবিল বাবার সব কথা শুনবে মা। ”
ওনার কথায় সাঁই দিলো পিংকি।বলল,
” জ্বি আন্টি! আহি ওঠেনি এখনো?”
” মেজো বুবু ডেকে এসেছিলেন।উঠেছে হাত-মুখ ধুচ্ছে মনে হয় ” বলে চলে গেলেন তিনি।আহি ঘুম থেকে উঠেছে কথাটা মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই উঠে দাঁড়ালো তূর্য।ওদের উদ্দেশ্যে বলল,
” চেইঞ্জ করে আসছি ”
পরপর বড়বড় পা ফেলে চলে গেল সে।
তাসিন ফিসফিস করে বলল,
” বউ উঠেছে শুনেই কীভাবে কেটে পড়লো দেখলি? ব’লদ ভাবে আমাদের।মনে হয় কিচ্ছু বুঝি না । এত তাড়াহুড়ো যেন একটু দেরি হলেই হেলিকপ্টার মিস করবে”
তূর্য রুমে এসেছে প্রায় মিনিট পাঁচেক হয়েছে। এসে আহিকে পায়নি।ওয়াশরুমের দরজা লক ,হয়তো সেখানে।তাছাড়া পানির শব্দও হচ্ছে। সে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো।কিয়ৎক্ষণ পার হতেই মাথায় তোয়ালে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে আহি বেরিয়ে এলো। পরনে নিত্যদিনের পোশাক।তূর্য সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলো।না দেখার ভান করল।আহিও তূর্যকে খেয়াল করেছে।তবে কোনো এক কারণে মুখ থমথমে হয়ে আছে। সে নিরিবিলি হেঁটে বেলকনিতে চলে গেল।তূর্য কিছুটা অবাক হলো।এভাবে কথাবার্তা ছাড়া চলে গেল মেয়েটা? মাথা থেকে তোয়ালে সরাতেই এক গোছ ভেজা লম্বা চুল পিঠে ছড়িয়ে পড়ল ওর। আগা হতে টুপটুপ করে পানি পড়তে আরম্ভ করেছে। তূর্য তির্যক চোখে আহির কাজকর্ম পরখ করলো।কোনো ভাবে স্টু’পিডটা ওকে ইগনোর করছে না তো?মিনিট দুয়েকের মাথায় রুমে ফিরে এলো আহি।এসে সোজা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো।তখনই তূর্য বলে উঠল,
” সারা রাত ঘুমিয়ে কাটিয়ে সকাল সকাল গোসলের সাইন্স কী?”
” এটা আম্মুকে কে বলবে বলুন তো। জোর করে গোসলে
ঢুকালো ” চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে উঠেছে আহির । কণ্ঠেও সামান্য তেজ।
তাহলে রাগটা মায়ের উপর হয়েছে।তূর্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।সন্দিহান গলায় জানতে চাইলো সে,
” কেন? ”
” আপনিই তো…..” কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল ও।
” আমিই কি? ” ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলো তূর্য।
” কিছু না ” ছোট করে জবাব দিলো মেয়েটা।
” সারা রাত ঘুমিয়ে থাকলে কিছু হবে কি করে ” থমথমে কন্ঠে বললো সে।
কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে গেল লোকটা। আহি ওর কথার মানে বুঝলো।বিড়বিড় করে আওড়ালো,
” এখন সাধু সাজা হচ্ছে ”
তূর্যের কান অবধি পৌঁছালো কথাটা।ও আহির দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
” আমি সাধুই। অসাধু হওয়ার কোনো অপশন রেখেছিস ?”
আহি এবার তেঁতে উঠলো,
” নাটক করবেন না তূর্য ভাই। আমার কোমরে এই দাগ কোথা থেকে এসেছে?” বলে জামার উপর দিয়ে বাম পাশের কোমরে আঙুল রাখলো ও।তূর্য জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ঠেললো।
কাল রাতে তাসিন দের মুখের উপর কল কেটে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর ওটা দরজায় এসে ধাক্কাধাক্কি করে।তূর্য বিরক্ত হয়ে উঠে যায়।এক প্রকার বাধ্য হয়ে দরজা খুলে।তাদের ধারণা আহি ঘুমায়নি তূর্য তাদের মিথ্যা বলেছে। তারপর নিজের চোখে মেয়েটিকে ঘুমাতে দেখে শান্তি ফিরেছে ওদের মনে। তূর্য ওদের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে আসার পথে হঠাৎ মোবাইলের ফ্লাশ পড়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা রমণীর উন্মুক্ত কোমরে।যার ডান পাশে একটা কালো কুচকুচে তিল। তূর্যের নজর যায় সেদিকে। পারে না নিজেকে সামলাতে। হয়তো চায় না। যার ফলস্বরূপ এখন আহির অভিযোগ।সে কল্পনার জগৎ হতে বেরিয়ে ভোলাভালা মুখ করে বলল,
” কই দেখি? জামা উঁচু কর।না দেখে বুঝবো কিভাবে কিসের দাগ , কোথা থেকে এসেছে ”
তূর্যের দুষ্টুমি গায়ে মাখলো না আহি।সে পূর্বের মতোই তেজি কন্ঠে আবারো বলতে শুরু করলো,
” একদম বোকা ভাববেন না আমাকে।আমি বুঝি সব। ”
” এত বুঝিস তবে ঘুমিয়ে গিয়েছিলি কেন?” গম্ভীর কন্ঠস্বর তূর্যের।
” আপনি এখনো ঘুম নিয়ে পড়ে আছেন তূর্য ভাই? আপনার জন্যই এখন আমার গোসল করতে হলো। গোসল না হয় করলাম।এখন আমি নিচে কিভাবে যাবো ”
” বলদের মতো কাজ করে বেড়াস নিজে আর আমাকে ব্লেইম দিচ্ছিস। হ্যাঁ,করেছি আমি।মেজো মা দেখলেন কিভাবে? ”
তূর্যের ধারণা আহি নিশ্চয়ই মাকে দেখাতে গিয়েছিল ‘ আম্মু এটা কিসের দাগ? ‘
” আপনি কি ভাবছেন আমি গিয়ে দেখিয়েছি ? আম্মু সকালে শাড়ি পরাতে এসে দেখে নিয়েছে। ”
” সার রাত ঘুমিয়ে কাটিয়েছিস এখন সারাদিন ঝগড়া করে কাটা ”
” এই পর্যন্ত এক কথা কয়বার বললেন তূর্য ভাই? আমি কি ইচ্ছা করে ঘুমিয়েছি নাকি।আপনিই তো শাড়ি আনতে গিয়ে হারিয়ে গেলেন।আর তাছাড়া আমি রাত জাগতে পারি না আপনি জানেন ” আহি থমথমে গলায় কথাগুলো শেষ করতেই তূর্য ওকে হ্যাঁচকা টানে নিজের উপর ফেলল। পিছন হতে কোমর জড়িয়ে ধরে ভেজা চুলে নাক ঘষতে ঘষতে বিড়বিড়িলো,
” কেন জাগতে পারিস না? হুউ? হোয়াই?আজকে ঘুমিয়ে দেখিস ”
মেয়েটার মেরুদণ্ড সোজা হয়ে এলো।চোখ খিঁচে বন্ধ করে দুই হাতে নিজের জামা মুঠ করে ধরেছে।মুহূর্তেই গলা শুয়ে কাঠ হয়ে গেল। হৃৎপিন্ডটা দ্রুত বেগে ছটফট করছে। এদিকে তূর্যের ঠোঁটের উষ্ণতা ঘাড়ে নেমে এসেছে।মেয়েটা এবার নড়াচড়া করে উঠল,
” তূ তূর্য ভাই ”
” হুউউ ” গভীর কন্ঠে সাঁড়া দিলো তূর্য।
” কি করছেন? ” তূর্যকে আটকানোর প্রচেষ্টা চালালো মেয়েটা। তূর্য পুনরায় জড়ানো কন্ঠে আওড়ালো ,
” নাথিং ”
আহির ছটফট করা বাড়তেই বিরক্ত হলো তূর্য।প্রেয়সীর কাঁধে সজোরে একটা কামড় বসিয়ে বলল,
” স্টু’পিড ! ”
আহি মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠল,
” উফ,তূর্য ভাই ”
পরপর আরেকটা কাঁমড় বসলো তূর্য।আর বললো,
” কি বললি? আবার বল ”
আহি এবারেও মৃদু চি’ৎকার দিয়ে উঠলো। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,
” ব্য’থা লাগছে তূর্য ভাই ”
তূর্য ফের কাঁমড় বসালো,
” আরেকবার বল ভাই ”
আহি এবারে কোনো মতে ঠেলে-ঠুলে উঠে গেল তূর্যের কোল হতে।মুখ ফুলিয়ে কাঁধ ডলতে আরম্ভ করলো।একবার করুণ চোখে তাকালো সদ্য ক্ষ’ত সৃষ্টি করা মানবের দিকে।সে দিব্যি বসে আছে।চেহারার এমনভাব যেন সাধু সন্ন্যাসী।দুঃখে-কষ্টে মেয়েটা রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে উদ্যত হতেই তূর্য বাঁধ সাধলো।হুকুম চালালো,
” টিশার্ট দে একটা ”
আহি থমথমে মুখে কাবার্ড হতে একটা টিশার্ট এনে তূর্যের হাতে দিলো।তূর্য চেয়ে চেয়ে প্রেয়সীর অভিমান দেখলো।ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি।কোনো রকমে টিশার্ট দিয়েই বেরিয়ে গেল আহি।পিছন থেকে হুশিয়ারি দিলো তূর্য ,
” কাঁধ-গলা সাবধান ! ”
” রাখবো না সাবধান।সবাই দেখবে আপনি কত বড় ভদ্র শ’য়তান ”
” ওকে রাখিস না।আমার কি? নাকের ডগায় লজ্জা আমার না ,তোর ”
দ্বিতীয় বৈঠকে খাওয়া দাওয়া চলছে চৌধুরী বাড়িতে।প্রথম বৈঠকে আসিফ চৌধুরী এবং তাহি,শান্ত, প্রান্ত — ওরা খেয়েছে। যে যার স্কুল-কলেজে চলে গিয়েছে।আর আসিফ চৌধুরী শহরের বাইরে গিয়েছেন।
আর এখন বাকি সকলে বসেছেন।সর্বদা প্লেটে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্বে বাড়ির তিন গিন্নি থাকলেও আজকে আরো একজন যুক্ত হয়েছে।বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের বড় বউ। পরনে মোটা পাড়ের লাল টুকটুকে শাড়ি।শাড়ির আঁচল টেনে আবার ঘোমটা টানা।সে ঘোমটা বারবার পড়ে যাচ্ছে আর আহি টেনে তুলছে।ইতোমধ্যে সবাই ডাইনিংয়ে বসে পড়েছে।তূর্য ,তাসিন আর নাবিল মাত্র নিচে নামলো।ওরা খাবার টেবিলে বসতেই মারুফা বেগম মেয়েকে ইশারা করেন প্লেটে খাবার তুলে দিতে।আহি মায়ের কথা মতো সেটা করলো। তূর্যের প্লেটের কাছে আসতেই ও বললো,
” খেতে বসছিস না কেন? ”
আহি ভাত তুলে দিয়ে নরম গলায় বলল,
” একটু পর বসছি ”
” কেন?ডেইলি তো আগে এসে বসে থাকিস।আজকে ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? ”
আহি মায়ের মুখের দিকে একবার তাকালো।সেও তো খেতে বসতে চায়।মারুফা বেগম মানা করেছেন।এখন সে বাড়ির মেয়ে নয়, বউ । তিনি পুনরায় চোখের ইশারায় সাবধান করলেন ওকে।আহি মুখ গোমড়া করে ফেললো।এসব খাদেম গিরি কে করবে। তূর্য মারুফা বেগমের চাহুনি খেয়াল করলো।বলল,
” কি হয়েছে মেজো মা? ওকে খেতে মানা করছেন কেন?”
মারুফা বেগম স্পষ্ট কন্ঠে বললেন,
” ও এখন আর বাড়ির মেয়ে নেই, চৌধুরী বাড়ির বউ।তাই আমাদের সাথেই খাবে।তোরা খেয়ে নে বাবা ”
” আচ্ছা! তাহলে আপনিও খেতে বসুন।চৌধুরী বাড়ির ছেলের শ্বাশুড়ি বলে কথা । এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কেমন দেখায় ”
মারুফা বেগমের মুখ বন্ধ হয়ে গেল।কি যুক্তি খাঁড়া করবেন বুঝলেন না। তাছাড়া তিনি একটা বললে তূর্য তার উপরেরটা বলে বসে থাকবে ।অগত্যা হাবলা সেজে গেলেন তিনি। তূর্য আহির উদ্দেশ্যে পুনরায় বলল,
” ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে না থেকে খেতে বস ”
এবারে তাদের মধ্যে হস্তক্ষেপ করলেন আকবর চৌধুরী। তূর্যের উদ্দেশ্যে বললেন,
” কালকে রাতে কি বললাম তোমাকে? সকাল হতে না হতেই গুলিয়ে খেয়েছ?ঠিক করে কথা বলো।এই বাড়ির বউ ও।তখন তো ঠিকই তালে তাল মেলালে ”
বিড়বিড় করলো তূর্য,
” মিলিয়েই বা কি লাভ হলো ।সে-ই তো …” বাকিটা শেষ না করেই নিরিবিলি খেতে থাকা তাসিনের দিকে তাকালো।অসভ্যটার অভিশাপই সত্যি হয়ে গেল। রাগে ফুঁসে উঠলো ও।
আকবর চৌধুরী ওর দৃষ্টি লক্ষ্য করে বললেন,
” ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন ছেলেটার দিকে।আমি বুঝে পাই না এই হাসি-খুশি ,মিশুক ছেলে-মেয়ে গুলো তোমাকে বন্ধু বানালো কি দেখে ”
ওনার আস্কারা পেয়ে তাসিন নিজের মুখটাকে একেবারে অসহায় বানিয়ে ফেলল।যেন দিন দুনিয়ায় ওর চেয়ে অসহায় ছেলে আর কেউ নেই।তূর্য ওর খেতে ব্যস্ত থাকা বন্ধুগুলোর দিকে একবার করে নজর বুলালো।তারপর বলল,
” সেটা শুধু আপনি না ,আমিও ভেবে পাই না।কীভাবে এই বদগুলোর সাথে ফ্রেন্ডশিপ হলো ”
পিংকি ওর বিরোধিতা করে বলল,
” ওই দুটোকে নিয়ে যা খুশি বল।আলিয়া আর আমাকে টানবি না ”
” খাওয়ার টেবিলেও তোরা ঝগড়া কর। ”
আলিয়ার কথায় তাসিন প্রতিবাদ করল।নির্দোষ সেজে বলল,
” আমি ভাই কিছুই বলিনি ”
সবাই যখন নিজেকে নির্দোষ সাব্যস্ত করতে ব্যস্ত।নাবিল তখনো পুরোপুরি নিশ্চুপ।কথা বলার ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই।মুখ খুললেই প্রথম যেই শব্দটা বের হবে সেটা হলো বা’ড়া ।কোনোভাবে যদিও শুরুতে আটকে রাখতে পারে শেষে নিশ্চিত বেরিয়ে আসবে।এর কোনো মাপ নেই। বন্দুকের গুলি মিস হতে পারে কিন্তু তার বলা বাক্যের সাথে ওই সুশীল শব্দটা বলা মিস হবে না।তবে ভিতরের এত কাহিনী চৌধুরী বাড়ির কেউ জানেনা।তারা নাবিলকে স্বল্পভাষী বলে জানেন।আসলাম চৌধুরী বললেন,
” নাবিলের সাথে তূর্যের খানিকটা মিল আছে।দুজনেই মেপে কথা বলে ”
সাথে সাথে খাবার তালুতে উঠলো নাবিলের।খুক খুক করে কেঁশে উঠলো।আহি দৌঁড়ে গিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল ওকে।পিংকি ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে।মাথায় এক নাগাড়ে ফুঁ দিতে আরম্ভ করলো।টেবিল শুদ্ধু সবাই উতলা হয়ে পড়লেন। কাঁশি বন্ধ হয়ে যেতেই পারভিন বেগম চিন্তিত হয়ে বললেন,
” কি হয়েছিল বাবা? হঠাৎ করে খাবার তালুতে উঠে গেল কেন? ”
” কি জানি আন্টি। বাআআআ ” সুর ধরলো নাবিল।কথা কাটিয়ে কি বলবে বুঝতে পারলো না সে।এখন কি বন্ধুর মাকে বা’ড়ার সাথে মিলিয়ে ভাবি বলে ডাক দিবে নাকি? এই যাত্রায় তূর্য ওকে বাঁচিয়ে দিলো।প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ অন্যদিকে টেনে নিলো। আহির দিয়ে দৃষ্টিপাত করে বললো,
” এখনো খেতে বসিস না কেন?”
আকবর চৌধুরী এবার খ্যাঁক করে উঠলেন,
” ভদ্রভাবে কথা বলো বাড়ির বউয়ের সাথে ”
তূর্য একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।অতঃপর বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬০
” খেতে বসা হোক ” কথার সাথে সাথে চোখ দিয়েও ইশারা করলো। আহির চোখ মুখ কুঁচকে গেল । এটা কেমন সম্বোধন? না তুই ,না তুমি আর না অন্যকিছু।তূর্যের মুখ থেকে ও কখনোই তুমি শোনার আশা করেনি।এসব কথা মাথাতেও আনেনি যে তূর্য ভাই ওকে তুমি বলতে পারেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তারও ইচ্ছা করছে প্রিয় মানুষটার মুখে তুমি ডাক শোনার। তূর্য ভাই তুমি বললে ঠিক কেমন লাগবে শুনতে? ও খুশি হবে নাকি লজ্জা পাবে? এসব কথা ভাবতে ভাবতেই সারা মুখ লজ্জায় ছেয়ে গেল মেয়েটার।
