সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৯
Raiha Zubair Ripti
মির্জা বাড়ির বিশাল বসার ঘরটা আজ অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে। একসাথে বসে আছে তিনটি পরিবার। মির্জা বাড়ির লোকজন, সিকান্দারের মামা বাড়ির মানুষ, আর সালমান মির্জার পরিবার। অথচ এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও ঘরে এক ধরনের চাপা নীরবতা, অস্বস্তির এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে সবার মাঝে।
সিকান্দারের মামা বাড়ির লোকজন স্পষ্টই অস্বস্তিতে। দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর এই বাড়িতে তাদের পা পড়েছে।
সবার থেকে একটু দূরে নিশ্চুপ বসে আছেন হোসনেয়ারা বেগম। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু তার নীরবতাই যেন সবচেয়ে জোরালো । এই বাড়ির কারো সাথে তিনি কথা বলেননি। এমনকি তার একসময়কার প্রাণের বান্ধবী মনোয়ারা মির্জার সাথেও না।
মনোয়ারা মির্জা কয়েকবার এগিয়ে গিয়েছিলেন, কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হোসনেয়ারা বেগম মুখ ফেরিয়ে নিয়েছেন। কেনই বা বলবেন? যে মানুষগুলোর ছলচাতুরী আর বিশ্বাসঘাতকতার কারনে তার ফুলের মতো মেয়েটা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল, তাদের সাথে কোনো মা কি কথা বলতে পারে?
নীরবতা ভেঙে হোসেন আলী একটু নড়েচড়ে বসলেন। চারপাশে তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন—
“আমাদের এবার ওঠা উচিত। সিকান্দারকে তো দেখছি না। যাওয়ার আগে দেখা করে গেলে ভালো হতো না?”
হুমায়ুন,হোসেন আলীর ছোট ভাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
সালমান মির্জা কথাটা শুনে তাড়াতাড়ি বলল-
“সে কী! আজই তো এলেন, আজই চলে যাবেন? অন্তত আজ রাতটা থেকে যান।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই সেলিম মির্জা বিরক্ত গলায় বলে উঠলেন-
“থেকে যাবে মানে? কোথায় থাকবে? এই বাড়িতে?”
হঠাৎ এমন তীক্ষ্ণ সুরে কথাটা শুনে সালমান মির্জা থমকে গেল।
“এটা কেমন কথা ভাইজান?”
হোসেন আলী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর মায়ের কাছে গিয়ে তাকে উঠতে সাহায্য করলেন। স্পষ্ট কঠোর গলায় বললেন-
“আমাদের কারোই এখানে থাকার ইচ্ছে বা রুচি কোনোটাই নেই। ভাগ্নের বিয়ে ছিলো,ভাগ্নে এতবার করে আসতে বলেছিল বলেই আসা। তা না হলে জীবনেও এই মির্জা বাড়ির চৌকাঠও পেরোতাম না। ”
কথাটা শেষ হতেই সাইদা মির্জা ঠোঁট বাঁকিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন-
“ আসতেন না! এসেছেন তো। যেহেতু এসেছেন, খাওয়া-দাওয়া তো করলেন। এখন দয়া করে উঠুন। বাড়িটা একেবারে ধর্মশালার মতো লাগছে। এত লোকজনে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।”
মনোয়ারা মির্জা এবার কড়া চোখে তাকালেন তার দিকে। কিন্তু সাইদা মির্জা থামার মানুষ নন।
“এভাবে তাকাচ্ছেন কেনো? যা সত্যি তাই তো বলছি। এইসব… গরিব ঘরের মানুষজন এলে বাড়ির পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যায়। ”
“চুপ করবে তুমি? ” মনোয়ারা মির্জা দাঁত চেপে বললেন।
সাইদা মির্জা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সিঁড়ির দিক থেকে ভেসে এলো ভারী পায়ের শব্দ।
সবাই একসাথে তাকালো। সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে সিকান্দার। তার চোখ লাল, চোয়াল শক্ত। মুখে এমন এক কঠিন অভিব্যক্তি, যা দেখে মুহূর্তেই বোঝা যায়,সে সব শুনেছে। নিচে নেমে সোজা দাঁড়ালো সাইদা মির্জার সামনে। কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। তারপর ঠাণ্ডা কাঁপন ধরানো কণ্ঠে বলল-
“আপনি কাকে গরিব বললেন?”
সাইদা মির্জা একটু থমকে গেলেও নিজেকে সামলে নিলেন।
“যা সত্যি তাই বলেছি..”
সিকান্দার তীব্র হাসলো সে কথা শুনে।
“সত্যি? সত্যি বলার আগে নিজের অবস্থানটা একবার আয়নায় দেখে নেওয়া উচিত ছিল না? ”
“তুমি কি মিন করতে চাইছো সিকান্দার?” কড়া গলায় বললেন সাইদা মির্জা।
“ কি মিন করতে চাইছি বুঝেন নি? ইশশ এতোটা বোকা নাদান কবে হলো সাইদা মির্জা! ”
“ সিকান্দার.. নিজের সীমা ছাড়িয়ে যেও না। ”
“ নিন গেলাম ছাড়িয়ে নিজের সীমা। কি করবেন এখন শুনি? তারা আমার পরিবার। তাদের অপমান করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? আপনি নিজের অতীত ভুলে গেছেন নাকি? আপনি নিজেই তো ছিলেন একজন ড্রাইভারের মেয়ে। কিভাবে ভুলে গেলেন নিজের এই চিরন্তন অতীত টা? ”
সাইদা মির্জা এবার রাগে কাঁপতে লাগলেন-
“ সিকান্দার..!!”
“ চিৎকার করলেই সত্যি টা মিথ্যা হয়ে যাবে না। আকাশে থুথু ফেলার আগে এটা ভাবা উচিৎ ছিলো না যে থুথু টা তো পরে আপনার শরীরেই এসে পরবে? ”
সাইদা মির্জা স্বামী আর ছেলে অর্নবের পানে তাকালো।
“ তোমরা চুপচাপ আমার অপমান হতে দেখছো! কিছু বলছো না এই ছেলেকে! ”
“ আপনার স্বামী কি বলবে আমাকে? উনি আমাকে কিছু বলতে আসলে উনি জানেন উনার জন্য সেটা ভালো কিছু বয়ে আনবে না। ”
সেলিম মির্জা অন্য দিকে তাকালো। কিন্তু অর্নব মায়ের অপমান মেনে নেয় নি। নিবে কেনো? সেজন্য সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ তুমি আমার মাকে অপমান করতে পারো না ভাইয়া। তোমার নিজের মা না তাই বলে যখন তখন তাকে যা নয় তাই বলতে পারো না। ”
সিকান্দার অর্নবের দিকে তাকালো। গম্ভীর গলায় বলল-
“ জাস্ট কিপ ইয়োর মাউথ শাট। তোমার মা এতক্ষণ ধরে আমার মামাদের কি বলছিল? তখন কোথায় ছিলো তোমার প্রতিবাদ? তখন কেনো থামাও নি তোমার মা কে? এখন আসছো মায়ের হয়ে কথা বলতে? ইট ছুঁড়ে মারলে পাটকেল খেতেই হয়। এই সহজ প্রবাদ বাক্য টা নিজের মাথাতেও ঢোকাও,আর তোমার মায়ের মাথাতেও। মামা অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর এভ্রিথিং। ”
সিকান্দারের কথা শুনে হোসেন আলী বলল –
“ না না তুমি কেনো সরি বলছো ভাগ্নে। এখন আসি আমরা?”
“ যাওয়াটা কী খুব জরুরী ?”
“ হুমম। তোমার মামি আর বোনরা বাড়িতে একা। বুঝই তো দিনকাল কেমন। তা বলো বউ নিয়ে আসছো কবে? না-কি আসবে না আর মামারা গরীব বলে। ”
“ মামা আপনিও না…খুব শীগ্রই যাব আপনার বউমাকে নিয়ে। নানিজান খুশি আপনি?”
হোসনেয়ারা বেগম নাতির মাথায় হাত বুলালো।
“ বেশি সময় লাগাস না আসতে। অপেক্ষায় থাকবো তোদের। থাকবি কিন্তু অনেক দিন আমার কাছে। ”
হোসেন আলীরা চলে গেলেন। সিকান্দার গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসলো। বাড়িতে ফিরতেই সালমান মির্জা এবার বললেন সিকান্দার আর মুনতাহার তাদের বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টা। সিমরান, সুনেহরা দূরে বসে ফেসবুক স্ক্রোল করছে। নাদিম একটু ধানমন্ডি গেছে একটা কাজে। সিকান্দার কে চুপ থাকতে দেখে ময়না বেগম জিজ্ঞেস করলেন –
“ কিছু বললে না যে?”
সেলিম মির্জা বললেন-
“ মেয়েকে নিয়ে যাও। সিকান্দার কাল থেকে অফিসে জয়েন করবে। সে যেতে পারবে না। ”
সালমান মির্জা ভাইয়ের কথা শুনে বললেন-
“ সকালে না হয় ও বাড়ি থেকে যাবে অফিসে। ”
“ না তা হয় না। মুনতাহা কে নিয়ে যা। ও গেলেই হবে। ”
“ বেশ, তাহলে মুনতাহা কে নিয়েই যাই। ডেকে নিয়ে আসো তো সিমরান। ”
সিমরান রুমে গেলো মুনতাহা কে নিয়ে আসতে। মুনতাহা খাটে বসে ছিলো পা ঝুলিয়ে। সিমরান এসেই বলল-
“ চলো নিচে,বাবা ডাকছে। ”
মুনতাহা সাথে সাথে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ কেনো ডাকছে?”
“ ও বাড়িতে যেতে হবে না? সেজন্য। ”
“ উনি কি বললো?”
“ সিকান্দার ভাইয়া নাকি যাবে না। তুমি একাই যাচ্ছ। ”
মুনতাহার মুখটা চুপসে গেলো। উনাকে যে বলে দিলো মুনতাহা যাবে না ও বাড়িতে। নিয়ে যাওয়ার কথা বললে যেন মানা করে দেয়। লোকটা যেতে দিচ্ছে!
মুনতাহা সিমরানের পেছন পেছন নিচে আসলো।
সিকান্দার ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে একবার মুনতাহা কে আড়চোখে দেখে বেশ গম্ভীর গলায় বলল-
“ মুনতাহা যাচ্ছে না চাচা। ”
“ কেনো? ”
“ আমি যেতে দিতে চাচ্ছি না । ”
“ কোনো সমস্যা হয়েছে? ”
“ সমস্যাই বলা চলে। ”
“ কি সমস্যা বলো আমাদের। ”
“ আপনারা বাপ সমতূল্য মানুষ। আপনাদের সামনে কিভাবে বলি কথা টা? ”
“ আহা বলোই না। ”
সিকান্দার বা হাত টা দিয়ে থুতনির সাইডটায় স্লাইড করতে করতে বলল-
“ একজন বলল,পুরুষ মানুষ নাকি বউ ছাড়া থাকতে পারে না। কথাটার সাথে নিজের খুব মিল পাচ্ছি। সেজন্যই চাচ্ছি না বউকে নিজের থেকে দূরে রাখতে। ”
মুনতাহা কেশে উঠলো। সিকান্দার আঁড়চোখে তাকিয়ে আবার বলল-
“ আর তাছাড়া এত গুলো দিন তো আপনাদের কাছেই ছিলো। আমার কাছে থাকুক না ক’টা দিন। তারপর না হয় গিয়ে থাকবে। ”
সালমান মির্জা বুঝলো। তাই আর জোর করলো না। আর কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলো। মুনতাহা স্বস্তির শ্বাস ফেললো। ও বাড়িতে তার একটুও যাওয়ার ইচ্ছে নেই আর।
সন্ধ্যার পর সিকান্দার একটু বাড়ির বাহিরে গিয়েছিল। মুনতাহার সাথে এ বাড়ি দাদি ছাড়া তেমন কেউই কথা বলে না নিজ থেকে। তো মুনতাহা নিজেদের রুমে বসে থাকতে থাকতে বোর হছিলো বলে দাদির রুমের দিকে যেতে নিলো। বিয়ের দিন মুনতাহা জেনেছিল সিকান্দার সাইদা মির্জার সৎ ছেলে। এর আগে তো জানতো তার দুই ছেলে এক মেয়ে। অর্নব কখনো বলে নি এই বিষয় নিয়ে। দাদির রুমে যাওয়ার পথে অর্নবের সাথে তার দেখা হলো। মুনতাহা বিরবির করে ঠোঁটে কোনে আওড়ালো-
“ শয়তানের নাম নিতে না নিতেই শয়তান এসে হাজির। ”
মুনতাহা পাশ কেটে চলে যেতে নিলে অর্নব রাস্তা আঁটকে ধরে হাত দিয়ে। মুনতাহার কপালে দুটো ভাজ পড়ে।
“ কি সমস্যা? রাস্তা থেকে সরুন। ”
অর্নব দেওয়ালে হাত ঠেকিয়ে বলল-
“ রিভেঞ্জ নিতে এ বাড়িতে এসেছো? আমারই বড় ভাইকে বিয়ে করেছো? সবটা আমার উপর রাগ করে তাই না? আমাকে এখনো ভালোবাসো তাই না? ”
মুনতাহা চোখ মুখে বিরক্ত আর রাগের ছাপ স্পষ্ট।
“ এসব বলে নিজেকে ক’বেলা স্বান্তনা দেন শুনি? ”
“ আমি সত্যি বলছি তুমি নিজেও তা জানো। ”
“ সিরিয়াসলি! আপনার মনে হয় আমি আপনাকে আজও ভালোবাসি! নাইস জোক্স। আপনার মতো ঠকবাজ,প্রতারক কে আমি মুনতাহা সেদিনই মন থেকে উঠিয়ে দিয়েছি। হয়তো আপনি এখনো আমাকে ভুলতে পারেন নি। সেজন্য বউ থাকা স্বত্ত্বেও আমাকে ডিসটার্ব করেন। লজ্জা শব্দ টা বোধহয় আপনার জীবনে নেই তাই না? ”
“ তোমার তো আছে। তাহলে তুমি কোন আক্কেলে আমার ভাইকে বিয়ে করো হু? ভালো তো বাসো না তাকে। ”
“ কে বললো বাসি না ভালো?”
অর্নবের মসৃণ রাখা কপালটায় এবার দুটো ভাজ পরলো।
“ মিথ্যা বলো না তো। ”
“ হু আর ইয়্যু? আপনাকে মিথ্য কেনো বলবো আমি? আমার স্বামী সে। ভালোবাসবো না আমি? পৃথিবীতে একমাত্র কাউকে যদি আমি আমার সবটা দিয়ে ভালোবেসে থাকি সেটা কেবল আমার স্বামী। ”
“ তুমি তো ভালোবাসতে আমাকে। সেখানে তুমি ভাইয়াকে কিভাবে ভালোবাসো? বিয়েই তো হলো কাল। ”
“ বিয়ে হলো বলেই তো ভালোবাসি। পবিত্র একটা সম্পর্কের জোর আছে না? সেই জোরেই ভালোবাসি। আর আপনাকে ভালোবাসতাম ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম। নাউ দ্যিস টাইম আই জাস্ট হেইট ইয়্যু। ”
অর্নবের মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল। চোখে যেন অবিশ্বাস, ক্ষোভ আর একরাশ জেদ জমে উঠল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল-
“হেইট করো? আমাকে? এই নাটকগুলো অন্য কাউকে দেখাও মুনতাহা। আমি তোমাকে চিনি। ”
মুনতাহা এবার এক পা সামনে এগিয়ে এল। চোখ দুটো ঠান্ডা,ধীরে ধীরে বলে উঠলো-
“চেনেন? চিনে থাকলে আজ এই প্রশ্ন করতেন না। যাকে একসময় ভালোবাসতাম, সেই মানুষটার সাথে আজকের আপনার কোনো মিল নেই।”
অর্নব হেসে উঠল,তাচ্ছিল্যের হাসি।
“তাহলে কি? এক রাতেই ভালোবাসা বদলে গেল? ভাইয়াকে দেখে হঠাৎ প্রেম জেগে উঠল?”
মুনতাহার ধৈর্য এবার ভাঙতে শুরু করল।
“আপনি চাইলেই নিজের মতো করে সবকিছু ভাবতেই পারেন, কিন্তু তাতে সত্যিটা বদলাবে না। আমি আপনার অতীত ছিলাম,এটা সত্যি। কিন্তু এখন আমি সিকান্দার শাহ্ এর স্ত্রী। এটাই আমার একমাত্র পরিচয়।”
অর্নব গলা উঁচু করল-
“পরিচয়? নাকি প্রতিশোধ? আমাকে দেখানোর জন্যই তো এই বিয়েটা করেছো তুমি!”
মুনতাহা এবার কঠোর গলায় বলল-
“ এনাফ ইজ এনাফ ! নিজেকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবা বন্ধ করুন। আমার জীবনে আপনি এক্সজিস্টই করেন না।”
তাদের দুজনেরই কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে উঁচু হতে লাগল। করিডোরে উত্তেজনার ভারী বাতাস জমে উঠল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কড়া কণ্ঠ ভেসে এলো সাইদা মির্জার গলা-
“এখানে কি হচ্ছে?”
দুজনেই ঘুরে তাকাল। সাইদা মির্জা দাঁড়িয়ে আছেন, চোখ মুখে বিরক্তি আর কড়া রেখা। তিনি একবার অর্নবের দিকে, তারপর মুনতাহার দিকে তাকালেন।
“বাড়িটা কি বাজার বানিয়ে ফেলেছো তোমরা? এত চেঁচামেচি কিসের?”
অর্নব কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সাইদা মির্জা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। তারপর সরাসরি মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বললেন-
“ এই তুমি রান্নাঘরে যাও। চা বানিয়ে নিয়ে আসো। মেমসাহেব হয়ে বসে থাকার জন্য এসেছো নাকি এ বাড়িতে? এই বাড়ির বউ হওয়ার সখ হয়েছিল তাই না? এখন বউয়ের দায়িত্ব পালন করো। সকাল লাঞ্চ, ডিনার সব তুমি বানাবে এখন থেকে। এখন চা বানিয়ে আনো। মাথা ব্যাথা করছে ভীষণ। ”
মুনতাহা এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখে অপমানের ছাপ ফুটে উঠলেও কিছু বলল না। নিঃশব্দে মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। বাড়ির ম্যেইড মুনতাহা কে দেখে বলল-
“ কিছু লাগবে ভাবিমনি? ”
“ চা বানাবো। চা পাতা কোথায় রাখা আছে?”
“ ঐ তো উপরের তাকে। ”
মুনতাহা উপরের ডেস্ক থেকে চা পাতার কৌটা টা বের চা বানাতে লাগলো।
এদিকে সিকান্দার বাড়ি ফিরে সোজা নিজের রুমে ঢুকেছে। রুমে ঢুকেই দেখলো,রুম তার খালি। পুরো রুমে মুনতাহা নেই। মেয়েটা গেলো কোথায়? রুম থেকে বের হয়ে সিমরান কে দেখেই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“মুনতাহা কোথায়?”
সিমরান উত্তর দিল-
“রান্নাঘরে।”
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“রান্নাঘরে? কেনো?”
তার প্রশ্নটা শুনে সাইদা মির্জা এগিয়ে এলেন।ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বললেন-
“ বাড়ির বউ বলে কথা,তো কাজকর্ম করবে না? পটেরবিবি হয়ে বসে থাকবে? যার যেখানে থাকা উচিৎ, সে তো সেখানেই থাকবে তাই না?”
সিকান্দারের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
“ আমার স্ত্রী কি এ বাড়ির কাজের লোক?”
“ সেটা কখন বললাম? এসব কাজ করলে কেউ কাজের লোক হয় নাকি? বাড়ির বউয়ের কর্তব্য এগুলো। ”
“ সেই হিসেব টানলে,এ বাড়ির বউ তো আপনি নিজেও। তা আপনি কদিন রান্না ঘরে গেছেন? আপনি না গিয়ে থাকলে আমার স্ত্রী কেনো যাবে? মুনতাহা আমার স্ত্রী। তাকে কাজের লোকের মতো ট্রিট করলে আমি তা মোটেও সহ্য করবো না। বাড়িতে ম্যেইড রাখা হয়েছে কাজ করার জন্য। তারা করবে। আমার স্ত্রী কেবল রানির মতো থাকবে বুঝেছেন?
এক মুহূর্তও আর দাঁড়ালো না সিকান্দার। সরাসরি রান্নাঘরের দিকে হাঁটলো। রান্নাঘরে ঢুকে দেখলো মুনতাহা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে চা নাড়ছে। সিকান্দার একটুও দেরি না করে তার হাতটা ধরে ফেলল।
“ চলুন।”
মুনতাহা চমকে তাকালো-
“ চা…”
সিকান্দার গম্ভীর গলায় বললো-
“ চা বানানোর জন্য বাড়িতে ম্যেইড রাখা আছে, এখন আপনি আমার সাথে চলুন।”
এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেও শেষমেশ কিছু বললো না মুনতাহা। সিকান্দারের সাথে হাঁটতে লাগল। বসার ঘর পেরিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল তারা। রুমে এসে মুনতাহার হাতটা ছেড়ে দিলো সিকান্দার।
“ আপনি রান্নাঘরে কেনো গিয়েছিলেন মন? আমি কি আপনাকে রান্না ঘরে গিয়ে রান্নাবান্না করার জন্য বিয়ে করেছি? হুম? আজ ঢুকেছেন ঢুকেছেন,এটাই লাস্ট। ভবিষ্যতে আর ঢুকবেন না।”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৮
“ বাড়ির বউ আমি। রান্নাবান্না করবো না? এটা কেমন কথা?”
“ আপনার জায়গা রান্না ঘরে না। ”
মুনতাহা দু কদম এগিয়ে আসলো। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ আমার জায়গা তাহলে কোথায়?”
সিকান্দার বুকের বা পাশে আঙুল ঠেকিয়ে বলল-
❝ এখানে। আপনার জায়গা কেবল এইখানেই, আমার হৃদয়ে। কোনো কিছু করার হলে এখানে করুন। কাজ কেনো করবেন আপনি? রাজ করবেন। রাজ করুন আমার হৃদয়ে, রানির মতো করে। একটা টু শব্দও করবো না কথা দিচ্ছি। ❞
