Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৬

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৬

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৬
jannatul firdaus mithila

“ মনস্তার! শি ইজ মিসিং।”
কথাটুকু যেন বজ্রপাতের ন্যায় কানে শোনালো মুগ্ধের। মুহুর্তেই যুবকের মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটল। বাদামী চোখদুটো নিমিষেই জ্বলে উঠল অদৃশ্য আগুনে! ঘন ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে স্পষ্ট দেখা মিললো গোটাকতক ভাঁজ। ফর্সা মুখখানা লাল হয়ে গেছে কেমন! দৃঢ় চোয়ালটা ব্লেডের ন্যায় তীক্ষ্ণ হচ্ছে ক্রমশ। যুবকের ধারালো দাঁতকপাটি একে-অপরের সাথে তীব্র ঘর্ষণে কটমট শব্দ তুলছে। ফোনের ওপাশ নিস্তব্ধ! মনস্টারের এহেন নিরবতা খুব একটা সুবিধের ঠেকলো না এডউইনের নিকট। বেচারা ভয়ার্ত ঢোক গিলে অপেক্ষায়িত। এদিকে মনস্টার চোখ বুঁজে দাঁতে দাঁত চেপে যাচ্ছে। বাহাতের শক্ত তালু দ্বারা নিজের ঘাড়টা কেমন ডলতে ডলতে কটমটিয়ে বলে ওঠে,

“ প্যালেস ভর্তি গার্ডস থাকা স্বত্বেও ঐটুকুন একটা পুঁচকে বান্দীর মেয়ে মিসিং হলো কিভাবে?”
শুকনো ফাঁকা ঢোক গিললো এডউইন! আড়দৃষ্টে তাকালো অদূরে মাথা নুইয়ে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা মিলার পানে। মেয়েটার ফর্সা মসৃণ গালদুটোয় স্পষ্ট পাঁচ আঙুলের ছাপ। এডউইন কিয়তক্ষন শক্ত মুখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। সময় নিয়ে মুখ খুলবে ওমনি ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক হিংস্র গর্জনধ্বনি!
“ আশেপাশের সবগুলো শহরে লকডাউন দে এডউইন! এন্ড কল মা’ই সাইলেন্ট ওলভস! পাতাল খুঁড়ে হোক কিংবা আকাশ চিঁড়ে, আমি ফেরার আগে ঐ বান্দীর মেয়েকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের কর! রিমেম্বার ওকে খুঁজে না পেলে সবকিছু ধ্বংস করে ফেলব আমি। আই রিপিট — আগুন জ্বালিয়ে দিব পুরো শহরে! তোদের সবকটা’কে নিজ হাতে পিস পিস করে কা’টব! মাইন্ড ইট।”
ভয়ার্ত ঢোক গিললো এডউইন। এহেন ০° সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও বড্ড ঘামাচ্ছে তার কপাল। গলাটা খুশখুশ করছে ভয়ে। চোখেমুখে সে-কি আতঙ্কিত ভাবসাব। জনাব আলগোছে হাত ঢোকালেন পকেটে। তড়িঘড়ি করে রুমালটা বের করে এনে ঘর্মাক্ত কপালখানা মুছলেন কোনমতে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে দুটো বাক্য আওড়াতেই যাবে ওমনি ওপাশ থেকে খট করে কেটে গেল কল। এডউইন হতভম্ব হয়নি মোটেও। উল্টো আতঙ্কিত মুখাবয়বে ফোনের স্ক্রিনে কাঁপা কাঁপা আঙুল চালালো বারকয়েক। অপরিচিত এক নম্বরে গোটা গোটা অক্ষরে মেসেজ পাঠালো,
“ মনস্টার ইজ কলিং ইউ অল… গেট রেডি।”

গম্ভীর মুখখানা কঠিন হচ্ছে মুগ্ধের। শক্ত হাতের তালুতে ভার্টু কালেকশনের এক্সপেন্সিভ ফোনটা কেমন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। কানের পাশে বেজে যাচ্ছে কেবল একটি কথাই — “ মনস্টার! শি ইজ মিসিং!”
নাকের পাটা ফুলল মনস্টারের। চোখেমুখে লেপ্টে গেল অদৃশ্য আগুন। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব তক্ষুনি হাত থেকে ফোনটা ছুঁড়ে মা’রল কনক্রিটের রাস্তায়। মুহুর্তেই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল ওতো দামী ফোনটা। এতে অবশ্য বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই শ্যাডো মনস্টারের। সে উল্টো শক্ত মুখে দু’হাত গুঁজল প্যান্টের পকেটে। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটটা কেমন কামড়ে ধরেছে উপচে পড়া রাগের তোড়ে। ঘাড়ের সবক’টা রগ ফুলেফেঁপে একাকার! শক্ত চোয়ালে যুবক খানিক ঘাড় ঘোরালো এদিক-ওদিক। কটমট শব্দ তুলছে ঘাড়ের রগ, দাঁত কপাটির তীব্র ঘর্ষণের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে বেশ। মুগ্ধ কেমন চিড়বিড়িয়ে আনমনে বিড়বিড় করল,
“ ইউ্য ক্রসড ইউ’র লাইন বি*চ! ইউ জাস্ট ক্রসড ইউ্যর লাইন। অবশেষে…নিজ হাতে নিজের কবর খুঁড়লি বান্দীর মেয়ে! নাউ বি প্রিপেয়ার্ড ফর মি।”
বলেই ক্রুর হাসলো মুগ্ধ। পরক্ষণে গমগমে গলায় হুংকার ছুঁড়ল গার্ডদের উদ্দেশ্যে,
“ গেট দ্যা জেট রেডি।”

ব্যস্ত পায়ে প্যালেসের প্রশস্ত করিডর দিয়ে হাঁটছে গম্ভীর মুখো এডউইন। এগোচ্ছে প্যালেসের সদর দরজার দিকে! ডান কানে এয়ারপড গুঁজে রাখা তার। মুখ চলছে অনবরত। একের পর এক হুংকার ছুঁড়ে যাচ্ছে যুবক। দাঁত খিঁচে আওড়াচ্ছে,
“ এ নিয়ে ঠিক সাতবার সম্পূর্ণ প্যালেস থেকে শুরু করে জঙ্গল অব্ধি তল্লাশি চালানো শেষ, তবুও মেয়েটার খোঁজ পেলি না কেউ? সে-কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল না-কি?”
পেছন পেছন হাঁটছে সশস্ত্র গার্ডদের দলবল! ব্যস্ত এডউইনের এহেন হুংকারে তটস্থ সব। প্রতিত্তোর করবার তেমন একটা সাহস পাচ্ছে না কেউ। এদিকে উত্তরের অপেক্ষায় এডউইন ফের গর্জে উঠল,
“ মুখে জিভ নেই তোদের বা’স্টার্ড? নাকি বুলেট খেলে তারপর মুখ দিয়ে কথা বেরুবে! কোনটা?”
শুকনো ঢোক গিললো সবাই। মাঝে থেকে একজন মনে মনে ভীষণ সাহস যুগিয়ে আধো আধো স্বরে শুধালো,
“ এডউইন ট্রাস্ট মি! আশেপাশের এমন কোনো জায়গা বাদ নেই যেখানে আমরা খুঁজিনি। আমার মনে হচ্ছে এডউইন, মেয়েটা….”
কথাটা জিভের ডগা দিয়ে বেরিয়েছে মাত্র আর ওমনি বেচারা গার্ডের চোয়াল বরাবর শক্ত হাতের থাবা বসালো এডউইন। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কায় গার্ড! হকচকিয়ে তাকায় এডউইনের মুখপানে। এডউইন দাঁতে দাঁত চাপছে কেমন, দাঁত কপাটির কটমট শব্দগুলো বড্ড কানে বাজছে গার্ডের। চোয়ালের ব্যথায় কুঁচকে যাচ্ছে চোখমুখ! এদিকে এডউইন হাতের জোর বাড়াচ্ছে ক্রমশ। গার্ডের চোয়ালখানা শক্ত করে চেপে ধরে খানিকটা উঁচিয়ে তুললো মুখ। পরক্ষণে দাঁত কিড়মিড় করে আওড়াল,

“ কল হার মেডাম! ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু এড্রেস হার — মেয়েটা!”
বলেই গার্ডের চোয়ালটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো এডউইন। লম্বাটে চোয়ালখানার পেশিগুলো শক্ত করে ফুটিয়ে, হাত গুজঁল পকেটে। ফের কঠিন গলায় আদেশ ছুড়েঁ বলল,
“ গতকাল যে ট্রাকগুলো দিয়ে বাজার এসেছিল, আগামী এক ঘন্টার মধ্যে সে-ই ট্রাকগুলোর ড্রাইভারদের আমার সামনে এনে হাজির করবি। ডু ইউ্য গেট দ্যাট?”
পরপর মাথা ঝাঁকায় সবাই। একযোগে গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,
“ কমান্ড এক্সেপ্টেড এডউইন!”

এহেন কথার প্রতিত্তোরে মৌন এডউইন। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল নিজ জায়গায়। ওদিকে গার্ডরা সব একে একে এডউনকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। প্রায় মিনিট দুয়েক বাদেই এডউইন পা বাড়ায় উল্টো পথে। পায়ের গতি অপ্রতিরোধ্য রেখে বা-হাতের কব্জি উল্টে দৃষ্টি ঠেকালো ঘড়ির পানে। আর মাত্র কয়েক মিনিট! তারপরেই আসবে তারা। এ-ই প্রথম সাইলেন্ট ওলভস টিমের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে এডউইনের। এ নিয়ে ভেতরে বড্ড অস্থিরতা যুবকের। মনস্টারের তত্ত্বাবধানে গড়া এই সিক্রেট টিম, ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত এক্সপার্টরা। মনস্টারের ডান হাত হওয়া স্বত্বেও দ্য সাইলেন্ট ওলভস টিমের সাথে দেখা করার সৌভাগ্য মিলেনি তার, মূলত মনস্টার নিজেই এ-ই সৌভাগ্য দেয়নি কাউকে। তবে এডউইন আজ পাচ্ছে। বুকটা কাঁপছে তার। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে যাওয়ার দরুন বারবার জিভ ঠেলে ভিজিয়ে যাচ্ছে কোনমতে। পাদু’টো বড্ড অস্থির এডউইনের। মস্তিষ্কে কেবল বাজছে — যেভাবেই হোক মুনবার্ডকে খুঁজতে হবে।
ব্যস্ত পায়ে প্যালেসের ফ্রন্ট এরিয়ার রাজকীয় প্রথম সিঁড়িটায় পা রাখল এডউইন। কপাল কুচঁকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে হাতঘড়ির পানে। ডানহাতের আঙুলে গুনছে সময়, ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে আওড়াচ্ছে,
“ ১০, ০৯, ০৮, ০৭………..”

এলোমেলো ভঙ্গিতে প্রহর গুনছে এডউইন! অস্থিরতায় ঠোঁট কামড়ে যাচ্ছে বারবার। প্রহরের কাটাঁ প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে ঠেকতেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল প্রাইভেট বাসের ইঞ্জিনের শব্দ! তৎক্ষনাৎ চোখ তুলল এডউইন। প্যারাডাইসের কেঁচি গেট দিয়ে একে একে ঢুকছে ৬টি কালো রঙা বাস। বাসের সে-কি দুর্বার গতি! এডউইন চটজলদি সিঁড়ি ডিঙিয়ে ছুট লাগালো লনের দিকে। সবুজ ঘাসে ঘেরা লনের একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে হাত উঁচায় যুবক। ইশারায় থামাতে বলল বাসকে! এহেন ইশারা পেয়ে খানিকক্ষণ বাদেই থামল সবকটা বাস, সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো ড্রাইভওয়ের প্রশস্ত রাস্তায়। এডউইন হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল বাসগুলোর দিকক। রয়েসয়ে খুলে যাচ্ছে প্রতিটি বাসের দরজা! একে একে বাসের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে কালো ব্যুট পরিহিত কয়েক জোড়া পা। প্রত্যেকের গায়ে কালো রঙা লং ওভারকোট, মাথায় টানা হুডি! মুখ লুকিয়ে আছে কালো হুডির আড়ালে। ঠোঁটের একাংশ চক্ষু গোচর হচ্ছে কোনরকম। সকলের দু’হাত ঢেকে আছে কালো রঙা গ্লাভসে। এডউইন কেমন স্থির হয়ে গেল তাদের দেখে। মানুষগুলোর সে-কি ডিসিপ্লিন! হাঁটছে তাও সারিবদ্ধ ভাবে। মাথাটা কেমন নুইয়ে রাখা প্রত্যেকের। সাইলেন্ট ওলভস টিমের ভাইস এডমিন রয়েসয়ে এগিয়ে এলো এডউইনের দিকে। পাদুকা আরামে দাঁড় করিয়ে রেখে, হাতদুটো কোমরের পিঠে গুছিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। ভীষণ ভারী অথচ শান্ত কন্ঠে আওড়ালেন,

“ হোয়াট’স দ্যা মিশন এবাউট?”
এতক্ষণ সাইলেন্ট ওলভস মেম্বারদের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে ছিলো এডউইন। বেচারার অবাধ ধ্যান ভাঙলো এডমিনের ভারী কন্ঠে। হুটহাট ডাকে সে কেমন হড়বড়িয়ে উঠল দেখো! রয়েসয়ে ঘাড় বাকিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকল,
“ মাইকেল!”
একমুহূর্ত কাটলো বোধহয়। পরক্ষণেই কৃষ্ণাঙ্গ বলিষ্ঠদেহী এক মধ্যবয়স্ক গটগটিয়ে বেরিয়ে এলেন প্যালেস থেকে। বাহাতে একখানা কাগজ মোড়ানো তার, চোখেমুখে নির্লিপ্ত ভাব স্পষ্ট। লম্বা লম্বা কয়েক কদমেই সে চলে এলো এডউইনের নিকট। বিনম্র শ্রদ্ধায় হাতের মুড়িয়ে রাখা কাগজটা এডউইনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আওড়াল,
“ ডান এডউইন!”

গম্ভীর মুখে কাগজটা হাতে নিলো এডউইন। কোনরূপ কালবিলম্ব না করে ব্যস্ত হাতে কাগজটা খুলতেই চোখে পড়ল — আর্টিস্টের রংতুলিতে আকাঁ মাহি’র একখানা রঙিন ছবি! মেয়েটা কি সুন্দর হাসছে। তার ফর্সাটে মুখখানা যেন সকালের নরম আলোর এক টুকরো দীপ্তি ছড়াচ্ছে। নাক-গালের লালচে ভাবটা কি সুন্দর ফুটিয়েছেন আর্টিস্ট। এহেন প্রাণবন্ত ছবিটার দিকে একমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এডউইন। মুখভঙ্গি বড্ড এলোমেলো তার, কন্ঠনালী বেয়ে এডামস অ্যাপেলটা ক্ষনে ক্ষনে নামছে কেমন। ওদিকে, সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সাইলেন্ট ওলভস মেম্বার বুঝি তিতিবিরক্ত হচ্ছেন এডউইনের এহেন হুটহাট ঘোরের মাঝে ডুবে যাওয়ায়। সে তৎক্ষনাৎ গম্ভীর মুখে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন। এরূপ শব্দে হকচকায় এডউইন! ঘোর কাটতেই বেচারা কেমন হড়বড়িয়ে হাতের ছবিখানা এগিয়ে দিলো সম্মুখের যুবকের দিকে। হুডি পরিহিত যুবক রয়েসয়ে হাতে নিলেন কাগজটা। তাতে এক সুন্দরী তরুণীর হাসিমাখা ছবি দেখে কেমন ভ্রু গোটালেন তিনি। ঠোঁট দুটো হালকা নাড়িয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালেন,
“ সিরিয়াসলি? একটা সাধারণ মেয়েকে খুঁজতে যাব আমরা? দ্য সাইলেন্ট ওলভস টিম মেম্বাররা?”
এডউইন চাপা হাসল কেমন! মাথাটা ক্রমাগত নাড়িয়ে গমগমে গলায় প্রতিত্তোরে বলল,
“ শি ইজ মনস্টার’স!”
তৎক্ষনাৎ স্থবির হলেন এডমিন। শীরঁদাড়া সোজা হলো পরক্ষণেই। মন্সটারের আদেশ যেহেতু, খুঁজতে তো হবেই!

“ এক্সকিউজ মি মিস? আমায় এক গ্লাস পানি দিবেন কী?”
বৃদ্ধ স্কেচ আর্টিস্টের কন্ঠ কানে পৌঁছাতেই জানালার কাছ থেকে সরে আসে মিলা। মুখটা কেমন অন্ধকারে নিমজ্জিত তরুণীর! গালদুটো ফুলে গেছে ব্যথায়। ঠোঁটের এককোনে লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া র’ক্ত। এডউইন যেভাবে চড়িয়েছে মেয়েটাকে! সে-যে এখনো ঠিকমতো নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে আছে তা-ই তো অনেক। মিলা উদাস মুখে এগিয়ে আসে ডিভানের দিকে। হাত বাড়িয়ে সম্মুখের স্কচ টেবিলের ওপর থেকে গ্লাসভর্তি করে পানি ঢেলে এগিয়ে দেয় আর্টিস্টের দিকে। বিছানার এককোণে বসে থাকা বৃদ্ধ পেইন্টার হাত বাড়ালেন কোনমতে! হাতদুটো বড্ড কাঁপছে তার। পানির গ্লাসটা কোনমতে ধরতে পারলেও মুখ অব্দি গ্লাস এগোচ্ছে না কেন যেন। পানি যেটুকু নিয়েছেন তাও বুঝি পড়ে যাচ্ছে হাত কাঁপার ফলে। মিলা কপাল কুঁচকালো তা দেখে। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি এভাবে কাঁপছেন কেন?”

বৃদ্ধ ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিললেন বারকয়েক। গ্লাসটা ফের মুখের সামনে ঠেলে দিতেই তা আচমকা হাত ফসকে পড়ে গেল মেঝেতে। মুহুর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল কাঁচের গ্লাসটা। বৃদ্ধ বুঝি ভারি ভড়কালেন নিজ কর্মে। মুখটা করে নিলেন কাচুমাচু। মিলা অবোধের ন্যায় দেখছে সব। ঘাবড়াতে থাকা বৃদ্ধ’র পানে হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে থেকে আওড়াল,
“ কি হলো আপনার? আপনি ঠিক আছেন তো?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়ায় দু’ধারে। একমুহুর্ত স্থির থেকে আচমকা বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ওঠে কেমন। মিলা হকচকায় এরূপ কান্ডে। তক্ষুনি হড়বড়িয়ে এগিয়ে এসে বসল বিছানার আরেকপাশে। চোখদুটো ছোট ছোট করে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,
“ আরে, আরে! কি হলো আপনার? কাদঁছেন কেন এভাবে?”
বৃদ্ধ কাঁদছে তো কাঁদছেই! থামবার নাম নেই তেমন। মিলা কেমন হাসফাস করছে লোকটার ওমন কান্না দেখে। এদিকে বৃদ্ধ কান্নার মাঝেই হেঁচকি তুলতে তুলতে শুধালেন,
“ আমাকে এভাবে জোর করে তুলে আনলো কেন? আর এটাই বা কোন জায়গা? সবার হাতে ব’ন্দুক কেন? ওরা কী আমায় মে’রে ফেলবে? ”
এহেন কথা কর্নকুহরে পৌঁছান মাত্র মিলার বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ নিশ্বাস। মেয়েটা ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল শূন্যে। আনমনে চাপা স্বরে বলল,
“ আপনি যেহেতু দ্য মনস্টার প্যারাডাইসে আছেন, সেহেতু আপনার বেঁচে থাকাটা অনিশ্চিত হলেও আপনার মৃ’ত্যুটা নিশ্চিত। হোক সেটা কয়েকদিন আগে কিংবা পরে।”

সফেদ রঙা মেঘেদের রাজ্য ভেঙে উড়ছে প্রাইভেট জেট। নরম কার্পেটের ফ্লোরে বিরতিহীন কদমে হাঁটছে মুগ্ধ। শক্ত চোয়ালে একই পথ বারবার প্রদক্ষিণ করে যাচ্ছেন বলিষ্ঠ পুরুষ। বাম হাত তার পকেটে গুঁজে রাখা, ডানহাতের তর্জনী এবং মধ্যমার ফাঁকে গুঁজে আছে জ্বলন্ত মোটা সিগার। কানে এয়ারপোড! অস্থির রাগান্বিত যুবক কেমন চিবিয়ে চিবিয়ে বলে যাচ্ছে,
“ প্রতিটা এয়ারপোর্টে লকডাউন দে! আশেপাশের সবগুলো রেলস্টেশনে কড়া নজরদারি রাখ। সেইন্ট পিটার্সবার্গ থেকে শুরু করে মস্কো অব্ধি যত রাস্তা, অলি-গলি আছে সবগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ চেক কর। আমি ব্যাক করার আগে ঐ জানোয়ারের বাচ্চাকে খুঁজে বের করবি বা’স্টার্ড । ডু ইউ্য গেট দ্যাট?”
ওপাশের উত্তর শোনা যায়নি তেমন। মুগ্ধও গ্রাহ্য করল না তাতে। হাত বাড়িয়ে কান থেকে এয়ারপোডটা খুলে এনে ছুঁড়ে ফেলল কার্পেটের ফ্লোরে। মাত্রাতিরিক্ত রাগে কাঁপছে যুবক! চোয়ালটা কেমন থরথর করছে তার। পায়ের গতি জোরালো করে হাঁটছে এদিকওদিক, লম্বা লম্বা টান বসাচ্ছে সিগারের শেষভাগে। তাতেও বুঝি রাগ কমছে না তার। উল্টো বাড়ছে তরতর করে। যুবক কেমন শক্ত হাতে খামচে ধরে নিজের লম্বা চুলগুলো। ঠোঁটের ওপর দাঁত বসিয়ে মনে মনে বলল,

“ কোথায় লুকাবি তুই চাশমিস? কোথায়? তুই পাতালে লুকোলেও সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনার ক্ষমতা রাখি আমি, সেখানে এটা তো জাস্ট রাশিয়া। অনেস্টলি স্পিকিং — দিস টাইম আ’ল কিল ইউ্য চাশমিস! আ’ল ফা’কিং কি’ল ইউ্য।”
মনে মনে মেয়েটাকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করেও রাগ কমছেনা যুবকের। সে এবার ঘটায় আরেক কান্ড। তক্ষুনি শক্ত হাতে পাঞ্চ বসালো লেদারের সিটে। একটা, দুটো পরপর অসংখ্য! যুবকের মুষ্টিবদ্ধ হাত থেঁতলে যাবার যোগাড় যেন। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে সে কেমন অনবরত পাঞ্চ মার’তে মা’রতে হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,
“ জানোয়ারের বাচ্চা! কোন দিক দিয়ে কমতিতে রেখেছিলাম তোকে? কোন জিনিসটার অভাব দিয়েছিলাম বান্দীর মেয়ে, যে আমার কাছ থেকে এভাবে পালাতে হলো তোর! মাত্র ছ’টা মাস-ই তো নিজের কাছে রাখতাম তোকে, এরপর নাহয় যেখানে ইচ্ছে সেখানে গিয়ে ম’রতি বেয়াদবের বাচ্চা! এবার তোকে হাতের কাছে পেয়ে নেই শুধু, আই সয়্যার, তোকে সারাজীবনের মতো পঙ্গু বানিয়ে ছাড়ব।”

রাশিয়ার মেঘমদুর আকাশে উড়ছে একের পর এক অগণিত হেলিকপ্টার! আশপাশের জনসাধারণ কেমন অবাক চোখে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। কি থেকে যে কি হচ্ছে কে জানে! সারা শহর জুড়ে টহল দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে — আগামী ২৪ ঘন্টা যেন কেউ নিজ বাড়ি থেকে না বের হয়। প্রতিটি বৃহত্তর শহরের সবগুলো ব্যস্ত এবং দূর্গম রাস্তায় ইতোমধ্যে বসেছে চেকপয়েন্ট। সেইন্ট পিটার্সবার্গ থেকে শুরু করে প্রায় ৬৫০ কি.মি দূরে অবস্থিত রাজধানী মস্কো অব্ধি প্রতিটি রাস্তায় নেমেছে রোলস রয়েজের কালো রঙা SUV. সবগুলো চেকপয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে সাইলেন্ট ওলভস টিম মেম্বার্স এবং রেসকিউ্য ডগস। ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে ছুটছে বাস ভর্তি সশস্ত্র গার্ডস। কেউ কেউ ছুটছে বাইক নিয়ে।

মস্কোর সাদোভোদ পাইকারি মার্কেট! বিশালাকৃতির মালবাহী ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে। চেকপয়েন্টে সাইলেন্ট ওলভস মেম্বার্স ভীষণ বিচক্ষণতার সাথে প্রতিটি গাড়ি চেক করে যাচ্ছে। ০৯৮৪৫ — নম্বর ট্রাকটি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। এদিকটা জনমানবহীন! পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে থিমস নদী। নদীর ওপারে মার্কেট। ড্রাইভার মহাশয় ভীতসন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। ট্রাকের ভেতর এখনো বসে আছে অপরিচিত মেয়েটা! তাকে এবার বের করে দেয়া উচিত। তাই যে ভাবনা সে কাজ। ড্রাইভার আলগোছে ড্যাশবোর্ডের পাশে থাকা লাল রঙা বাটনটায় আঙুল ছোঁয়ালেন। পরমুহূর্তেই ট্রাকের পেছন দরজাটা খুলে গেল খট করে। ভয়ার্ত সপ্তদশী ঢোক গিললো সামান্য। দরজা খুলে যাওয়ায় আশেপাশের ফাঁক ফোকঁর দিয়ে আলো ঢুকছে বেশ। মাহি বুঝল সকাল হয়েছে। এতক্ষনে মন থেকে ভয়-ডর কেটে গিয়েছে অনেকটাই। মেয়েটা কেমন নিঃশব্দে দুপা এবং হাতে ভর দিয়ে এগিয়ে আসে দরজার নিকট। অতঃপর দু’হাতে দরজার গায়ে হালকা ধাক্কা দিতেই তা খুলে গেল পুরোপুরি। মাহি তখন একলাফে নেমে আসে ট্রাক থেকে। এদিক-ওদিক খানিক দৃষ্টি বুলিয়ে আনমনে ভয়ার্ত ঢোক গিললো সপ্তদশী। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক, পাদু’টো কাঁপছে ঠান্ডায়।

ভয়ার্ত মেয়েটা ট্রাকের পেছন থেকে খানিক উঁকি দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখে — একদল সশস্ত্র বাহিনী সবগুলো গাড়ি চেকিং করে যাচ্ছে। ভীতু মাহি’র ছোট্ট মস্তিষ্ক নড়ে উঠল বুঝি। কোনরূপ রিস্ক না নেবার উদ্দেশ্যে গায়ের ওপর জড়িয়ে থাকা পাতলা শালটা তক্ষুনি মাথার ওপর পেঁচিয়ে নেয় মাহি। মুখে ঢেকে নেয় শালের একাংশে! হাতের মুঠোয় এখনো রাশিয়ান মুদ্রা, সেলফোন! মাহি ভয়ে জড়সড় পায়ে এগোয় উল্টো পথে। পথের বাম দিকে নদী, আর ডানদিকে নিচু দোকানপাট! সাঁতার জানেনা মাহি, বাধ্য হয়ে এগোতে হবে ডানদিকে। তবে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে যাবে কি করে সে? মাহি পড়ল বড্ড দোটানায়। এত কষ্ট করে পালিয়ে এসেও কি-না শেষে ধরা পড়বে লোকগুলোর হাতে? নিজ ভাবনায় নিমগ্ন মাহি। ঠোঁট উল্টে দাঁড়িয়ে আছে পথের এককোণে। এরইমধ্যে ভাগ্য বুঝি খানিকটা সুযোগ দিলো তাকে। পেছন থেকে একে একে ছুটে এলো বড় দুটো ট্রাক। রাস্তায় জ্যাম পড়ার দরুন তারা ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ল মাঝপথে।

এ-ই সুযোগে মাহি দিলো ভো দৌড়! মাথায় শাল দিয়ে ঘোমটা পেচিয়ে রেখেই মেয়েটা কেমন বিরতিহীন কদমে দৌড়াচ্ছে দেখো। তার বুঝি মিনিট পাঁচেক লাগলো এপাড় থেকে ওপাড়ে আসতে। পরক্ষণেই সপ্তদশী আড়াল হলো মার্কেটের ভীড়ের মধ্যে। মুখখানা লুকিয়ে এগোচ্ছে সে। ক্ষুধায় পেট ডাকছে কেমন! শরীরটাও বড্ড দূর্বল লাগছে এমুহূর্তে। মাহি পা থামালো মাঝপথে। পেটটা ভীষণ ডাকছে তার, এমুহূর্তে একটুখানি খাবার না খেলেই নয়। সপ্তদশী ঘাড় বাকিয়ে এদিক-ওদিক মুদির দোকান খুঁজল। পরক্ষণে তার চোখ আটকাল খানিকটা দূরে, সেথায় এক সারিতে বেশকিছু মুদির দোকান দেখা যাচ্ছে। মাহি আর সময় নষ্ট না করে তক্ষুনি দ্রুত পা বাড়ায় সেদিকে। মুদির দোকানে বড্ড ভীড়! পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকার যোগাড় নেই তেমন। অসহায় মাহি কেমন অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। বিক্রেতা বড় ব্যস্ত মানুষ! একে একে সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন সামগ্রী। এরইমধ্যে তার দৃষ্টি স্থির হলো মাহি’র পানে। তিনি কেমন গমগমে গলায় মাহি’কে জিজ্ঞেস করল,

“ শতো তেবে নুঝনা?”
(কি লাগবে?)
অবোধ মাহি তাকিয়ে রইল হতবুদ্ধির ন্যায়। রাশিয়ান ভাষায় কথা বলছেন দোকানী, তা থোড়াই বোধগম্য হচ্ছে সপ্তদশীর! মেয়েটা কেমন অবোধের সুরে আওড়াল,
“ আই ডোন্ট নো রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ। ক্যান ইউ স্পিক ইন ইংলিশ?”
দু-চার ক্লাস অব্ধি কোনমতে টেনেটুনে পড়েছেন দোকানী! ইংরেজি জানলে থোড়াই দোকানীগিরী করতো! মহাশয় কেমন নাকমুখ কুঁচকালেন তরুণীর মুখে ইংরেজি শুনে। ভুলেও পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে ব্যস্ত হলেন অন্য ক্রেতাদের নিয়ে। মাহি ফের অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনি তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। মাহি’কে পথিমধ্যে এরূপ অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থামলেন তিনি। আগ বাড়িয়ে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

“ হেই মিস! ডু ইউ নিড সামথিং?”
মাহি ঘুরে তাকায় তার পানে। ওপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে,
“ ইয়াহ! আ’ম হাঙ্গরি এন্ড আই নিড সাম ফুড। বাট আই কান্ট সে রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ সো…”
কথা বলার মাঝখানেই যুবক হাত উঁচিয়ে থামায় মাহি’কে। ঠোঁটদুটোতে বিশাল হাসি একে বলে ওঠে,
“ ওকে আই ক্যান হেল্প ইউ! গিভ মি মানি।”
বোকা মাহি শালের ভেতর থেকে হাত বের করে আনে। হাতের মুঠোটা সামান্য ফাঁক করে যেইনা টাকা বের করতে যাবে ওমনি যুবক এক খামচিতে মাহি’র হাত থেকে টাকা এবং ফোন নিয়ে দিলো এক ভো দৌড়। এরূপ কান্ডে হতবাক মাহি! চোর পালিয়ে যাচ্ছে অথচ চিৎকার দেবার নাম নেই সপ্তদশীর। মস্তিষ্ক তার সজাগ হলো বেশ কিছুক্ষণ পর। এরপরই মেয়েটা কেমন চেঁচিয়ে উঠল নিজ ভাষায়! কোনোদিক না তাকিয়ে দূর্বল শরীরেই ছুটল সম্মুখে। তবে এবারেও ভাগ্য তার সহায় হলোনা। পথিমধ্যেই তার গায়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে গেল এক মিষ্টি বিক্রেতার। বেচারা বিক্রেতা হুটহাট ধাক্কার তাল সামলাতে না পেরে তক্ষুনি ছিটকে পড়লেন সম্মুখে। হাত থেকে তার সবগুলো মিষ্টি পড়ে গেল মাটিতে। এহেন কান্ডে তটস্থ মাহি! ভয়ে গুটিয়ে নিলো নিজেকে। অপরাধীর ন্যায় আমতা আমতা করে আওড়াল,
“ আ’ম সরি আমি আসলে…!”

বাকিটা শোনার ধৈর্য্য হলোনা বিক্রেতার। তিনি তৎক্ষনাৎ দু’হাতে ভর দিয়ে পড়া থেকে উঠে দাঁড়ালেন। রাগ-ক্ষোভে শক্ত হাতে চপেটাঘাত বসালেন মাহির নরম ফর্সা গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় গাল বাকিয়ে নেয় মাহি। কেঁদে উঠে ফুপিয়ে ফুপিয়ে! ওদিকে বিক্রেতা প্রবল রাগ ঝাড়ছেন মেয়েটার ওপর। তার ওতো কষ্টের মিষ্টি! সবগুলো নষ্ট করে ফেলল মেয়েটা? বিক্রেতা ফের মেয়েটার দিকে তেড়ে আসতে গেলেই স্থানীয়রা আটকালো তাকে। তবে বিক্রেতার হম্বিতম্বি তখনো কমেনি! তিনি কেমন গো ধরে নিজ ভাষায় বলছেন,
“ ওকে ধরো! হয় ও আমার ক্ষতিপূরণ দিবে নয়তো ওকে আমি পুলিশে দিব।”
এরূপ অবস্থায় স্থানীয়রা বিক্রেতার পক্ষ নিলো। একজন এগিয়ে এসে মাহি’কে জিজ্ঞেস করল,
“ হেই ইউ্য! গিভ হিজ কম্পেনসেশন!”
মাহি অসহায়! গালে হাত ঠেকিয়ে হেঁচকি তুলে কাঁদছে কেমন। আধো আধো স্বরে কোনমতে বলছে,
“ আই ডোন্ট হেভ এনি মানি!”

প্রাইভেট জেট থেমেছে রানওয়েতে। এয়ার স্টেয়ার্স দিয়ে দাম্ভিক কদমে নামছে মুগ্ধ। গায়ে জড়ানো দামী ট্রেঞ্চ কোট -প্যান্ট! ব্যুট জুতোর ধুপধাপ শব্দে নামছেন তিনি। চোয়ালটা বড্ড শক্ত! অদূরেই ভয়ে জড়সড় ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। বরাবরের মতোই নতমস্তকে। মুগ্ধ শক্ত মুখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো এডউইনের মুখোমুখি। অতঃপর কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই এডউইনের গাল বরাবর সজোরে বসল এক থাপ্পড়! মুহুর্তেই গাল বেঁকে গেল এডউইনের। মাথাটা ঝনঝনাচ্ছে বেচারার। মুগ্ধ থামলো না এটুকুতে। তক্ষুনি শক্ত হাতে পাঞ্চ বসালো এডউইনের পেটে। এহেন আক্রমণে নুইয়ে গেল এডউইনের পিঠ! বেচারা ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে ব্যথাতুর শব্দ আওড়ে পেট চেপে ধরেছে কেমন। ওদিকে মুগ্ধ ফের চড় বসিয়েছে এডউইনের আরেক গালে। মাত্রাতিরিক্ত রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব, পাদু’টো দিয়ে আচমকা লাথি বসালো এডউইনের পায়ের হাঁটুতে। এবার বুঝি ব্যথাটা মারাত্মক অনুভূত হলো এডউইনের। বেচারা তক্ষুনি উল্টো পড়ল রানওয়ের জমিনে। গলা ছেড়ে কাশতেই মুখ দিয়ে ছিটেফোঁটায় বেরুলো লহু! মুগ্ধ তখন ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের ন্যায় দাঁত কিড়মিড় করতে করতে এগিয়ে এসে এডউইনের বুকের ওপর পা চেপে ধরল। ব্যথায় জ্ঞান হারাবে এডউইন! মনস্টারের পা ধরে আর্তনাদ করে বলে ওঠে,

“ ভুল হয়ে গেছে মনস্তার! আমি.. ”
বাকিটা বলার আগেই তার বুকের ওপর সজোরে লাথি বসায় মুগ্ধ! মুহুর্তেই কলিজা কেঁপে ওঠে এডউইনের! ব্যথায় বেচারা দম আঁটকে নিয়েছে বোধহয়। তবুও মনস্টারের পা ঠেলে দেওয়ার দুঃসাহস হয়নি তার। কেননা মনস্টার তো এমনি! নির্দয়, পাষন্ড! তার কাছে থোড়াই আপন পর আছে। যখন রাগ উঠবে তখন সবাইকে মে’রে ফেলতে এক সেকেন্ডও ভাবাভাবিতে ব্যয় করার মতো সময় নেই তার কাছে। মুগ্ধ নামক নির্দয় মানব এবার এডউইনের মুখপানে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে শুধায়,
“ তুই থাকতে ঐ বান্দীর মেয়ে পালালো কিভাবে? কোথায় ছিলি তুই? না-কি এসবে তোর ও হাত আছে?”
থামল মুগ্ধ! ঠোঁটের কোণে ফোটালো ক্রুর হাসির রেশ। পায়ের জোর বাড়িয়ে এডউইনের বুকের বাপাশে পা’টা কেমন পিষিয়ে পিষিয়ে বলতে লাগল,

“ আগে ওকে পেয়ে নেই তারপর তো**কে গরম তে”’লে ফ্রা–ই করব মনে রাখিস। বি রেডি!”
বলেই পা সরায় মুগ্ধ! গায়ের কোটটা খানিক ঝাঁকিয়ে নিয়ে, হাতা গোটাতে গোটাতে এডউইনকে জিজ্ঞেস করল,
“ হেলিকপ্টার কতটা উড়ছে?”
ব্যথায় কুপোকাত এডউইন! চোখ কুঁচকে পড়ে আছে জমিনে। তবুও মনস্টারের কথার প্রতিত্তোর যে দিতেই হবে। সে কেমন আধো আধো স্বরে বলল,
“ ৫০০টা মনস্তার! বাস যাচ্ছে ১২০০টা! ৮০টা ট্রাকভর্তি কমব্যাট। সেইন্ট পিটার্সবার্গ থেকে শুরু করে মস্কো অব্ধি বসেছে চেকপয়েন্ট!”
গম্ভীর মুখে সবটা শুনলো মুগ্ধ! পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত করে লাথি বসালো এডউইনের গায়ে। দাঁত খিঁচে আওড়াল,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৫

“ ছোটলোকের বাচ্চা! টাকার অভাব পড়েছে আমার? সবকিছু ডাবল কর। যেভাবেই হোক আগামী ২ঘন্টার মধ্যে ঐ বান্দীর মেয়েকে আমার সামনে এনে হাজির করবি! আদারওয়াইজ সব-কয়টা আমার হাতে ম’রবি!”
একমুহুর্ত থামল মুগ্ধ। শক্ত হাতে ঘাড় ডলতে ডলতে গলা উঁচিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ আমার বাইক রেডি কর! দেখি কোথায় লুকিয়ে বসে আছে ঐ দেড়ব্যাটারী!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৭