Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ১৭

সে খলনায়ক পর্ব ১৭

সে খলনায়ক পর্ব ১৭
ফারহানা সানিয়াত

ওয়াসরুমে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে প্রাণপ্রিয়া, এমন ভাবে দিচ্ছে যে তার পরনের শার্ট ভিজে যাচ্ছে কারণ সে কিছুক্ষণ আগের ‌ স্মৃতি ‌পানির সাথে ধুয়ে ফেলতে চাইছে ভাবতে পারছে না ওই‌ লোক তাকে স্পর্শ করেছে তাও ওইভাবে! কেনো? এটা খুবই বাজে ছিল … নাহ তার ই ভুল হয়েছে সব ভুল তার অবশ্যই তার ধৈর্য রাখা উচিত ছিল কিন্তু এমনটা কেনো করল,,,
বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে প্রাণপ্রিয়া সামনে আয়নার দিকে তাকায় তার মুখে পানির কণা জমে আছে সে কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ স্পর্শ করে তবে চোখে ভেসে উঠে সেই কিছুক্ষণ আগের স্মৃতি,, না না এটা খুব ই বাজে,, খুব ই বলে প্রাণপ্রিয়া দ্রুত ঠোঁট আর গলা ঘষা শুরু করে যেখানে দামিয়ান স্পর্শ করেছিল। এতোটুকু বুঝতে পারছে ওই লোক থেকে তার দূরে থাকা অবশ্যই জরুরি।

দিনটা শুরু সকলের প্রতিদিনকার ব্যস্ত রুটিন অনুযায়ী যে যার মত কাজে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মধ্যে কোন ফাঁকে যে সময় চলে যায় বোঝাই যায় না। যেমন প্রাণপ্রিয়া আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আশ্রমের কিছু কাজকর্ম সারে।তার পরীক্ষা সামনে এর জন্য কলেজে এখন আর যাওয়া লাগবে না, তাই কাজকর্ম শেরে কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে বসে ড্রইং করতে আর এই ড্রইং করতে করতে কোন ফাঁকে যে বেলা গুড়িয়ে সকাল দুপুর পার হয়ে যাচ্ছে জানা নেই তবে এর মাঝে সেলিনা আর আশ্রমের বাকি ছেলে মেয়েদের সাথেও তার কথাবার্তা সময় পার হয়েছে কিন্তু এত কিছুর মাঝে ও কালকে ঘটনাটা যেন প্রাণপ্রিয়ার মস্তিষ্কে গাঁথা যেটা খুবই বিরক্তকর আর জঘন্যতম বাজে,,
অন্যদিকে আবরার ম্যানশনে আদনান চৌধুরীদের বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে সবাই।পার্টি রাতে হলেও তাদের আগে থেকে ওই বাসায় উপস্থিত থাকার জন্য অনেকবার বলা হয়েছে,
ছেলের শ্বশুর বাড়ি আবার বিজনেস পার্টনার কোনভাবেই হুমায়ুনের না বলার সুযোগ ছিলনা তাই এখনই সবাই রেডি হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে বের হওয়ার জন্য,
দামিয়ান আয়নার সামনে নেভি ব্লু কালার কোর্ট প্যান্ট পড়ে ফর্মাল গেটাপে দাঁড়িয়ে। পাশে দুজন লোক দাঁড়ানো যাদের হাতে ও কোর্ট প্যান্ট,,
সোফায় পায়ের উপর পা তুলে হেলান দিয়ে বসা আহানাফ দামিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক হাত দিয়ে চোয়াল ঘষে বলে ,,

__ এটা একদম পারফেক্ট ব্রো,, আজ মেয়েদের চোখে তোমার থেকে সরবেই না ।
আহানাফের কথায় দামিয়ান হালকা হেসে ড্রেসিং টেবিলের ওপরে রাখা সিলভার কালার ঘড়ি নিয়ে পড়তে পড়তে বলে,,
__ আমি আমার ফিয়েন্সের বাসায় যাচ্ছি আহানাফ।
আহানাফ সোজা হয়ে বসে,,so what bro মধুর দেখলে মৌমাছিরা আকর্ষণ হবে এটাই নরম।
দামিয়ান চোখ তুলে আয়নায় আহনাফকে দেখে তবে কিছু বলেনা,,
__ স্যার আসবো? দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে নিকলাই,,
দামিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়,, hum come ,
নিকলাই ভিতরে ঢুকে,,
দামিয়ান আয়নার সামনে থেকে সরে সোফায় আহানাফের পাশে পায়ের উপর পা তুলে বসে,দাঁড়িয়ে থাকা দুজন লোককে হাতের ইশারায় চলে যেতে বলে,,
__ সবকিছু রেডি ? তুমি কি এখন বের হচ্ছ? প্রশ্ন করে দামিয়ান,
নিকলাই মাথা নাড়ায়,, জি স্যার,
__ ওকে তাহলে রাশিয়া পৌঁছে আমাকে ফোন করো যা কথা হবে ফোনে ।
নিকলাই ফের মাথা নাড়ায় এরপর যেভাবে এসেছিল সেভাবেই আবার চলে যেতে আহানাফ নিকলাইয়ের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বলে ওঠে,
__তোমার এসিস্ট্যান্ট চলে যাচ্ছে!!দামিয়ান সোফায় হেলান দেয়, হুম

উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টর আবাসিক এলাকায় বিশাল বড় দুতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি আদনান চৌধুরীর,, ৬ নম্বর সেক্টরে সবচেয়ে সুন্দর বললে চলে তাদের ,তার মধ্যে আজকে পার্টির জন্য বাড়ি আর সামনের গার্ডেন আরো সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে যা চোখে লাগার মত,,
__ আজকে পার্টিতে দুটো জিনিস সবার দৃষ্টি কেড়ে নিবে এক এই বাড়ির সৌন্দর্য আর দুই তুমি,,খোলা বারান্দার বেতের সোফায় বসে মিসেস চৌধুরী
‌সারার উদ্দেশ্য বলে ওঠেন তাঁর ঠোটে স্বচ্ছ হাসি।
সামনে রেলিংয়ে হাত ভড় দিয়ে দাঁড়িয়ে সারা। তার দৃষ্টি নিচে গার্ডেনে তবে মাথায় ঘুরছে অন্যকিছু যার কারণে মাত্র বলা নিজের মমের কথা খেয়াল বা শুনেনি সে ভীষণ গভীর ভাবনায় আপাতত আর ভাবনার বিষয়টা হলো দামিয়ান,,
বাসায় আসার পর মিসেস চৌধুরী তাকে অনেক বুঝিয়েছে যে সে সবকিছু পাওয়ার যোগ, তার ধারে কাছে কোনো মেয়ে নেই, তাই তাকে দামিয়ানের স্ত্রীর হিসেবে হুমায়ুন তাকে চেয়েছেন ।এর মানে তার মূল্য অন্য কোনো মেয়ের থেকে অবশ্যই বেশি, তার উচিত নিজের জায়গা শক্ত করে ধরা, সেখানে নাই বা থাকুক ভালোবাসা কিন্তু সে যা যা পাওয়ার যোগ্য সেগুলো যদি না পায় তাহলে তার মূল্য কি,,

সারা ভাবনার মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শক্ত করে রেলিং ধরে,, ছোট থেকে সে যা চেয়েছে তার আগেই সব পেয়েছে এবং এখনো পায়। সে ওই সব আর এখন যা সবকিছু পাওয়ার যোগ্য কারণ পড়াশোনা নাচ গান খেলাধুলার সবকিছুতে সে প্রথম ছিল। আর সবার কাছে অসাধারণ একজন মেয়ে হিসেবে পরিচিত। তাহলে এখন কেনো সে এত কিছু ভাবছে অবশ্যই দামিয়ানের স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা তার মধ্যে আছে সাথে আবরার বিজনেস সামলানোর যোগ্যতা ও তাই তো তাদের চোখে তাকে পড়েছে,,
মিসেস চৌধুরী মেয়েকে ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখে বসা থেকে উঠে এগিয়ে মেয়ের‌ কাঁধে হাতে রেখে বলেন,,
__ কি ভাবছো সারা?
হঠাৎ সারা কাঁধে স্পর্শ অনুভব করতে ই কিছুটা চমকে মিসেস চৌধুরীর দিকে তাকায়,,সারাকে চমকাতে দেখে মিসেস চৌধুরীর কপালে বাজ ফেলেন,,সারা কয়েকবার চোখের পলক ফেলে এরপর স্বাভাবিক কন্ঠেই বলে ,,
__ কিছু না আমার ড্রেস কখন আসবে মম?
মিসেস চৌধুরী মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অতপর আবার হেসে মেয়ের গালে হাত দিয়ে বলেন,,
_ এই তো কিছুক্ষণ পরে চলে আসবে,

রাতের অন্ধকারে চৌধুরী বাড়ির জাঁকজমক পার্টির আমেজ একদম অন্যরকম কিছুটা পশ্চিমাদের মত।
পশ্চিমাদের মতো বলতে বাড়ির আশেপাশে ডেকোরেশন খাবার দাবার এইসব আর এসব কিছুর আয়োজন পার্টির মেইন গেস্ট ক্যাথরিনের জন্য,,
আপাতত ক্যাথরিন সবার সাথে পরিচিত হয়ে মিস্টার মিসেস চৌধুরী সাথে কথা বলছেন সাথে হুমায়ূন আর দামিয়ান ও আছে, সবার মধ্যে ব্যবসায়িক কথাবার্তা চলছে তবে তার মাঝে মিস্টার চৌধুরী দামিয়ান কে বলেন উঠেন,,
__ আমার মনে হয় দামিয়ানের উচিত যতদিন বাংলাদেশে থাকা হয় আমাদের ব্যবসায় কিছু সময়ের জন্য হলেও হাত লাগানো এতে নতুন এক্সপেরিয়েন্স হবে।দামিয়ান হালকা হাসে,, পাশ থেকে হুমায়ুন বলেন,
__ এটা ভালো কথা কিন্তু আমার ছেলের সময় নেই, আমার জানা‌ আছে। তবুও আমি অবশ্যই তাকে কয়েক মাসের জন্য কিছু দায়িত্ব দিব ভেবে রেখেছি।

বাবার কথায় দামিয়ান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না এই ব্যাপারে সে আগে থেকে জানে। সাথে থাকা ক্যাথরিন ও চুপ‌ আপাতত বাংলা কথা হালকা বুঝলেও এতটাও বুঝতে পারছে না।
হাতে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারা, পরনের তার হালকা আকাশি রংয়ের ওয়েস্টার্ন বডিকন । পাশে আহানাফ ও দাঁড়ানো দুজনের দৃষ্টি সামনে সবাই যেখানে আছে সেখানে,
দামিয়ান সবার সাথে কথা বলা শেষ করে সদর দরজা দিয়ে বাহিরে কোথায় যেন একটা যায়।আহানাফ ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পাশে সারাকে বলে ,,

__ ব্রো বাহিরে যাচ্ছে তোমারও যাওয়া উচিত,
সারা সামনে দৃষ্টি রেখে মাথা নাড়ায়, হুম।
আহনাফ হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে সারাকে দেখে ,,
পার্টির সব মেয়েদের নজর ব্রোয়ের দিকে তোমার এখনই যাওয়া উচিত,,
সারা হালকা হাসে, ছুতে পারার অধিকার আমার হবে। কার নজর পড়লো বা কতজনের নজর পড়লো এসব দেখে জেলাস ফিল করা বাচ্চামো।

__ তাহলে আমার নজর তোমার দিকে পরলেও সমস্যা নেই তাই না। সারা ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে গ্লাস ঠোঁট ছোঁয়ায়,, নাহ।
আহনাফ কিছুটা শব্দ করে হেসে উঠে,, মেয়েদের নজর থেকে ছেলেদের নজর অনেকটা গভীর হয় আমি কিন্তু সব অ্যাঙ্গেল থেকে নজর দিব।
আহনাফের কথা শুনে সারা তার দিকে ঘুরে তাকায়,,
__ তুমি হয়তো ড্রাংক হয়ে গেছ আহনাফ।
__ হুম অনেকটা,,

গার্ডেনের এক পাশে হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পরপর ঠোঁটের মাঝে নিয়ে ধোয়া বাতাসে ছাড়ছে দামিয়ান। হালকা মৃদু বাতাসে, গার্ডেনের এই পাশটায় কোনো মানুষ নেই, হালকা লাইটের আলোয় আলোকিত কিছু দূরে সুইমিং পুল যেখানে ‌দামিয়ানের দৃষ্টি আপাতত ,, সে কিছু নিয়ে ভাবনায় আছে কিছু বলতে ওই আশ্রিতাকে নিয়ে যা তাকে কাল রাত থেকে খুবই বিরক্ত করছে,,
কারণ মনে মনে কিছু কামনা তৈরি হচ্ছে তার, আর এটা কোন আবেগের কামনা সে ভালো করেই জানে যা ওই আশ্রিতার থেকে পাওয়া যাবে। আর এমন কামনা হওয়া খুবই স্বাভাবিক কারণ ওই আশ্রিতা মেয়ের সৌন্দর্য আকর্ষণ উত্তেজনা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু দামিয়ান জানে এসব অপ্রয়োজনীয় আকর্ষণ কিছুদিন পরে ই বিলীন হয়ে যাবে কিন্তু সে এতোটুকু চায় ওই আশ্রিতার অস্থিরতা আর ছটফট উপভোগ করতে আর এটা শুধু তার জন্যই থাকবে।
__ এখানে একা একা কী করছো দামিয়ান?
আকস্মিক পিছন থেকে সারার কন্ঠ। দামিয়ান ভাবনা থেকে বের হয়ে পিছে ঘুরে তাকায়,, সারা কাছে এসে দামিয়ানের শরীরে হাত রাখে,,

সে খলনায়ক পর্ব ১৬

__ ক্যাথরিন মম তোমাকে খুঁজছে,,দামিয়ান সারার হাতের দিকে তাকায় সে এখানে আসার পর থেকে সারার হাবভাব তার প্রতি অনেকটা চেঞ্জ দেখছে।
হালকা হাসে দামিয়ান এরপর সে নিজেও সারার কোমরে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে তাকে আরো কাছে টেনে কোনরকম কথা ছাড়া নানানভাবে স্পর্শ করতে থাকে এতে সারা কিছুটা‌ অবাক হয় তবে কিছু বলে না শুধু দামিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এদিকে আহানাফ দোতলার উপর থেকে সব দেখছিল ছিল। তবে সে এখন চোখ সরিয়ে ফেলে আর হাতের ওয়াইন এক ঢোকে খেয়ে পা বাড়িয়ে চলে যায়।

সে খলনায়ক পর্ব ১৮