Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ২৭

সে খলনায়ক পর্ব ২৭

সে খলনায়ক পর্ব ২৭
ফারহানা সানিয়াত

প্রতিটা মানুষের জীবনে দুই ধরনের স্মৃতি থাকে। কিছু ভালো স্মৃতি কিছু খারাপ স্মৃতি, ভালো স্মৃতি মানুষকে আরাম বা খুশি খুশি অনুভূতি দেয় তবে কথা আছে না ভালো কোনো কিছুই জীবনে বেশিক্ষণের জন্য নয় যত যাই করুন সবশেষে খারাপ স্মৃতি গুলো মাথায় চড়ে বসবেই যেমন জঙ্গলের ঘটনার তিনদিন পার হওয়ার পরও প্রানপ্রিয়ার মনে পড়ে চোখে জল চলে আসে,, কি করার এমন কিছু হলে একটা মেয়ের মনের ভেতর দিয়ে কি যায়। না পারছে কাউকে বলতে না পারছে চিৎকার করে কাঁদতে,সেদিন কোনভাবে নিজেকে শান্ত করে রহমান আঙ্কেলকে সব বলার চিন্তা করেছিল কিন্তু কি বলবে সে বড় সাহেবের ছেলে ভালো না, তাকে খারাপ ভাবে ছুঁয়েছে কিভাবে বলবে এগুলো আর আন্টি তাকে ও কি বলতে পারবে! মন যে অস্বাভাবিকভাবে ভীত হয়ে আছে তার, চেয়েও তাকে ফোন করতে পারেনি। সে জানে আঙ্কেল আন্টি তাকে বিশ্বাস করবে কিন্তু বলেও কি লাভ হবে সে তো আসলেই একটা অসহায় মেয়ে, ওই লোকদের আশ্রমে থাকে। তার মতো মেয়ের শরীরে দাগ পড়া ছাড়া কিছুই করার নেই উল্টো তার মনের ভেতর এসব চেপে স্বাভাবিক থাকতে বাধ্য হবে।

প্রাণপ্রিয়া চোখের জল মুছে নেয় সে বড় হয়েছে সে জানে সে বুঝে আঙ্কেল ঠিকই বলেছিল বড় হতে হবে মানুষ চিনতে হবে সে ওই লোককে চিনতে পেরেছে ওই লোকের মধ্যে ভালো বলতে কিছু নেই তার মতো পুরুষের প্রতি তার ঘৃণা যেভাবেই হোক ওই লোক থেকে তার দূরে থাকতে হবে যেভাবেই হোক,
চোখের জল মুছে ফেলা গাল বেয়ে আবারো জল গড়িয়ে পড়ে তার,
“দামিয়ান নিষ্ঠুর হৃদয়হীন ব্যক্তি আর এখন তার প্রতি প্রাণপ্রিয়ার ঘৃণার শুরু কতদূর যাবে দেখা যাক”
আপাতত প্রাণপ্রিয়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাজ করছে তার হাতে কাজ উঠতে চাইছে না তবুও কাজ করছে, যখন কাউকে বলে লাভ নেই তার উচিত নিজেকে জোর করে হলেও যা হয়েছে ভুলে থাকা ।
বর্ষাকালের ভারি বৃষ্টি চারপাশের পরিবেশ সকাল থেকে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে থামার যেন কোনো নাম গন্ধই নেই যার কারনে আজ বাচ্চার স্কুলে যেতে পারিনি, আর এই খুশিতে তারা আশ্রমের ভেতরে হইহুল্লোড় খেলাধুলায় যার যার মত ব্যস্ত।
আর মিস্টার রহমান তিনি সোফায় বসে ‌চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে আশ্রমের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লিস্ট বানাচ্ছে মাস শেষের দিকে বাজার সদাই কত কিছু প্রয়োজন তার মধ্যে আবার সেলিনাও নেই একটু ঝামেলা হচ্ছে হয়তো আজ বা কাল চলে আসবে সে। রহমান হা করে শ্বাস ফেলেন অতঃপর লিস্ট বানানো শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে রান্নাঘরের দিকে তাকান,,

__ প্রিয়া মা! এই প্রিয়া মা লিস্ট তৈরি হয়ে গেছে আমার ।
রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণপ্রিয়ার নিজ ভাবনার মাঝে আঙ্কেলের ডাক শুনে দ্রুত চোখের জল মুছে ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিৎ হাসি নিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে,,
__ আসছি আঙ্কেল!
প্রাণপ্রিয়ার কণ্ঠস্বর শুনে রহমান লিস্টের কাগজ তার পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকান বাজারে যাবে দুজন মিলে একেবারে সব কেনাকাটা করে নিয়ে আসবেন এটা তার আর সেলিনার কাজ হলেও এখন সেলেনার জায়গায় প্রাণপ্রিয়া দায়িত্বে আছে।
প্রাণপ্রিয় রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসে,তার পরনে নীল রংয়ের চুড়িদার, চুলগুলো বেনী করে কাঁধের একপাশে রাখা কপালে ছোট ছোট চুল পড়ে আছে তবে মুখটা শুকিয়ে কিছুটা রোগা রোগা ভাব,
রহমান তার দিকে তাকান মেয়েটা স্বাভাবিক থেকেও কেমন চুপচাপ, তিনি খেয়াল করছেন কয়দিন ধরে, এ নিয়ে জিজ্ঞেস ও করেছিলেন অসুস্থের কথা বলে মেয়েটা এড়িয়ে গেছে ,,,

__ কাজ শেষ হয়েছে তোমার? তিনি জিজ্ঞেস করেন ,
প্রাণপ্রিয়া মুখে কিঞ্চিত হাসি বজায় রেখে মাথা নাড়ায়।
__ হুম তাহলে চলো যাওয়া যাক,
প্রাণপ্রিয়া আঙ্কেলের কথা শুনে সদর দরজার দিয়ে বাহিরে তাকায় বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি, রহমান বসা থেকে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেন।
__ ছাতা নিয়ে যাব বৃষ্টির জন্য বসে থাকলে চলবে না আশা করি যদি বাজারে যেতে যেতে বৃষ্টি টা কমে আসবে।

লাঞ্চ টেবিলে একসাথে বসে আবরার ম্যানশনের সকলে সাথে ক্যাথরিন আর তার হেল্পিং হ্যান্ড রাত্রি।
কাল এংগেজমেন্ট পার্টি দামিয়ান‌ আর সারার।বাড়িতে ইতিমধ্যে সব কিছু আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। টেবিলের সামনে কিছু সার্ভেন্ট বাদ দিয়ে বাকি সার্ভেন্টদের যেন নিশ্বাস ফেলার সময় নেই বাইরে বৃষ্টির কারণে ঘরের ভেতর ডেকোরেশনের কাজ শুরু।
ক্যাথরিন এক দিন আগে হোটেল থেকে একেবারে চেক আউট করে এখানে এসে পড়েছেন,,
__ আমি অনেক খুশি হয়েছি একদিনের জন্য হলেও এই বাসায় থাকছো, হুমায়ুন ক্যাথরিনের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন।
ক্যাথরিন চামচে খাবার নিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করেন।
টেবিলে বাকিদের খাবার খাওয়ার চামচের টুংটাং শব্দ,
__ছেলের এনগেজমেন্ট আসতে তো হবে ই আর কাল আমাদের একসাথে ফ্লাইট এখান থেকে যাওয়া সুবিধা হবে।
বাংলাদেশের কাল তাদের শেষ দিন,, রাতে এংগেজমেন্ট হওয়ার পরপর ই তারা রাশিয়া যাওয়ার ফ্লাইটের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে।
ক্যাথরিন দামিয়ানের দিকে তাকান,দামিয়ান মনোযোগ দিয়ে খাবার খাচ্ছে। হুমায়ুন সূক্ষ্ম শ্বাস ফেলে তিনিও ছেলের দিকে তাকান,,

__ আবার কবে আসবে দামিয়ান,
দামিয়ান হাতের চামচ প্লেটের উপর রেখে টিস্যু দিয়ে হালকা ভাবে মুখ মুছে,
__ বলতে পারছিনা।
পাশ থেকে হাবিব বলেন,, পুরোপুরি এক মাস ও থাকলে না দ্রুত আসার চেষ্টা করবে।
দামিয়ান মুখে কিঞ্চিৎ হাসি নিয়ে মাথা নাড়ায়,
হুমায়ুন খাবারে মনোযোগ দেন, বেশিদিন থাকার কথা বললেও তার ছেলে সেখানকার ব্যবসায়ী সব কাজ ফেলে বেশিদিন থাকতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক, তবে অবশেষে এনগেজমেন্ট হচ্ছে এটার ই ছিল অপেক্ষা ।

বৃষ্টি কমে এসেছে, হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শরীর স্পর্শ করছে। প্রাণপ্রিয়া আর রহমান দুজনেই বাজারের মধ্য দিয়ে বাজারের ব্যাগ আর ছাতা হাতে নিয়ে হাঁটছে। আশেপাশে মানুষের গিজগিজ বেচাকেনার নানান কথাবার্তা। তাদের কেনাকাটা প্রায় অনেকটা শেষ, বাকি যা আছে আশ্রমের পরিচিত দোকানগুলোতে গিয়ে বললেই আশ্রমে তারা পৌঁছে দেবে। রহমান হাঁটার মাঝে প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকান,
প্রানপ্রিয়া চুপচাপ আশেপাশে দেখতে দেখতে হাঁটছে,
__ তুমি বাসায় চলে যাও মা, আমি দোকানগুলোতে বলে আসছি,
দুজন থেমে দাঁড়ায়,প্রাণপ্রিয়া আশপাশ থেকে চোখ সরিয়ে রহমান আঙ্কেলের দিকে ঘুরে।
__ কেনো আংকেল আমি তোমার সাথে থাকি,
__ না মা কোনো দরকার নেই তুমি যাও ব্যাগ নিয়ে বেশিক্ষণ হাঁটলে তোমার হাত ব্যথা করবে,
প্রানপ্রিয়া খানিকটা চুপ হয়ে অতঃপর বলে,,
__ করবে না আঙ্কেল আমার হাত এত দ্রুত ব্যথা করে না।
রহমান কিছুটা শব্দ করে হাসে ওঠে,

__ তবুও যাও আমার বেশি সময় লাগবে না তুমি সামনে হাঁটতে থাকো আমি আসছি, রহমান প্রাণপ্রিয়ার মাথায় হালকা হাত বুলিয়ে চলে যান।
প্রাণপ্রিয়া তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে নিশ্বাস ফেলে এরপর সেও হাটা ধরে ধীর পায়ে বাজারের মধ্যে দিয়ে।
মেঘলা আকাশে গুড়ুম গুড়ুম শব্দ, হয়তো আবারো বৃষ্টি নামবে, শীতল স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ প্রাণপ্রিয়া গভীর নিশ্বাস ফেলে তার মস্তিষ্কে সেই খারাপ স্মৃতি আবারো খোঁচা দিচ্ছে একটা বাজে অনুভূতি সে ঘৃনা করে কেনো ভুলে যায় না সে,
তার এসব ভাবনার আর হাঁটার মাঝে হঠাৎই বাজারের ব্যাগটা ছিঁড়ে সবজি নিচে গড়াগড়ি,

প্রাণপ্রিয় হতবাক, বিরক্ত। হলো কি এটা মানুষের চলাচল রাস্তার মধ্যে!!! মুখ দিয়ে তার চ শব্দ বের হয় , ইতস্ত চোখে আশেপাশে মানুষগুলোর দিকে এক নজর দেখে কিছু মানুষ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে,সে দ্রুত বসে মাথা নিচু করে একটা একটা করে সবজি উঠানো শুরু করে তবে হঠাৎ খেয়াল করে পুরুষালী এক হাত যে তার সবজি তুলতে সাহায্য করছে,
প্রাণপ্রিয়ার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে হাতের মালিক দেখার জন্য সে চোখ তুলে সামনে তাকাতে ই,
__ ইভান! নিঃশব্দে আওড়ায় ,
কালো টি শার্টের উপর সাদাকালো চেক চেক শার্ট যেমনটা তার সব সময়ের গেট আপ এলোমেলো সিল্কি চুলগুলো কপালে পড়া তবে মুখে আজ গম্ভীরতার ছাপ।
প্রাণপ্রিয়ার মুখে হাসি ফুটে ওঠে আজ তিন দিন পর ইভানের সাথে দেখা। তার কথামতো দুজনের মাঝে কোনো যোগাযোগ ছিল না। প্রাণপ্রিয়ার চোখ হালকা ঝাপসা হয়ে যায় অতি কষ্টে ঢোক গিলে,,
ইভান প্রাণপ্রিয়ার দিকে না তাকিয়ে নিচে পড়া সবজিগুলো ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে ব্যাগ হাতে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়,
__ চল,

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির বেগ আগে থেকে বেড়ে গেছে। পিচ ঢালা ভেজা রাস্তা দিয়ে হাঁটছে প্রাণপ্রিয়া আর ইভান।বাজার পার হয়ে তারা অনেকটা দূর চলে এসেছে
প্রাণপ্রিয়া ছাতা খুলে হাত উঁচু করে দুজনের মাথার উপর ধরে, ইভানের দৃষ্টি সামনে, ছয় বছরের মধ্যে আজ প্রথম তাদের মাঝে কোনো কথা নেই শুধু হাঁটছে তারা, প্রাণপ্রিয়া আড়চোখের ইভান কে দেখে, ইভান হা করে গভীর শ্বাস ফেলে, মনে মনে তিন দিন ধরে ভেবে যা সমাধান বের করেছে তা ভাবছে, সে রাতে তার মমের কাছে মনের পরিস্থিতি অবস্থা বললেও কোনো প্রতিক্রিয়া বা কিছু বলেনি এর কারন ইভান হয়তো জানে তবে এসব নিয়ে এখন ভাবতে চায় না। যদি একবার প্রাণপ্রিয়া সমাধান হিসেবে যা ভেবেছে তাতে রাজি হয়,,,

সে খলনায়ক পর্ব ২৬

__ ইভান! প্রাণপ্রিয়ার মিষ্টি কন্ঠের ডাক,,
দুজনের পা থেমে যায়,
প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,, বলেছিলাম আমাদের দেখা হলে আমরা সব সময়ের মতো স্বাভাবিক ভাবে,,,
__ ভালবাসি তোকে আমি,
দুজনের কথাটা একসাথে যেন ভাড়ি খেলো,

সে খলনায়ক পর্ব ২৭ (২)