নিবৃতা পর্ব ৯
নেহার ছায়ালিপি
এক বুক আশা নিয়ে তাবিব আজ অপেক্ষায় ছিল, সে সত্যি সত্যিই থমকানো হৃদয় নিয়ে সেই মানবীর তরে পথ চেয়ে ছিল। মন ভেঙে যাওয়ার কষ্ট কি, কেমন লাগে এবং ঠিক কতটা ধারালো এর আঘাত, সেটা খুব করে তাবিবের অনুভুতিতে এখনও জমা আছে। অন্তঃকরণে উঁকি বুকি দিলে হয়তো দেখা যাবে, পুরনো সেই ঘাঁ শুকিয়ে গেলেও কালো মোটা আস্তরনের দাগ বসে রয়েছে। এবং এতোকিছুর পরেও যখন আবারও, সময়ের ফেরে এই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের দরজা কারও জন্য খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন নিজের উপরই ভরসা পাচ্ছিলো না ও। একই ভুল দ্বিতীয়বার ঘটানোর চাইতে মর্মান্তিক কিছু নেই জীবনে। তবুও এই অবাধ্য মনটার কাছে হেরে গিয়ে ও আজ আশায় ছিল। নিজ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় তটস্থ হয়েছে।
যার প্রতি ওর উষ্ণ, নমনীয় সব অনুভূতিরা পসরা সাজিয়েছে, সেই মানুষটাও অনেকটা ওর মতোই দগ্ধ, কিংবার তার চেয়েও বেশি তার মনোঃকষ্ট। সাহসের ছিটেফোঁটাও নেই তার মাঝে। কেউ পথ দেখিয়ে না দিলে সে সামনে হেঁটে এগিয়ে যেতে অক্ষম। সেজন্যই তাবিব এতটুকু করতে রাজি। ও রাস্তা চিনিয়ে দিবে। এরপর, ও সেদিকে এগিয়ে যাবে কি যাবে না, সেটা সম্পূর্ণ ঐ মানুষটার উপরেই নির্ভরশীল। নিবৃতাই চুড়ান্ত ফয়সালাকারী। তাবিব যতটুকু করতে চাইছে, এর চেয়ে বেশি আপাতত, ওর জন্য মোটেও সম্ভব নয়। এই যে, আজ যদি নিবৃতা ওর ডাকে সাড়া দিয়ে না আসতো তাহলে সে তার মনের আঙিনায় দোর লাগিয়ে দিতো। নিজ থেকে সেটি আর কখনই খুলতো না। আপন সকল আকাঙ্ক্ষার সমাপ্তি এখানেই ঘটাতো। মনকে পেছনে ফেলে হয়তো সুখ পাওয়া যায় না। তাবিব নাহয় এই এক জীবনে সেটা আর নাই পেলো। সাধারণভাবে বেঁচে থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু এই মাত্র, নিজের সকল ভয় ও সংশয়কে পেছনে ফেলেই হোক কিংবা দায়বদ্ধতা থেকেই, নিবৃতা যখন ওর দুয়ারে এসে দাড়িয়েছে, তখন সবটা পানির মতোই সহজ হয়ে উঠেছে তাবিবের নিকট। এই সম্পর্কের প্রতি নিবৃতার যেই কর্তব্য আছে, সেটা ও অদেখা করে না। এতেই চলবে। ওর মানুষটা একটু আলাদা। সবার থেকে ভিন্ন। কেমন দিশেহারা থাকে সর্বদা। কিচ্ছুটি বুঝে না। সেটুকুই নাহয় তাবিব শিখিয়ে দিলো ওকে। আর নিবৃতা ছাত্রী হিসেবে অসাধারণ। তাবিব দিনশেষে নিশ্চয়ই নিরাশ হবে না!
– ভেতরে আসুন।
তাবিবের কথামতোন শ্বাস আটকে নিবৃতা চলে এলো ওর ঘরে। এই কক্ষের বাতাবরণে এক ভিন্নতা রয়েছে। নিবৃতার অন্তঃস্থল কেমন করে যেন কাঁপিয়ে তোলে। হয়তো মনের মাঝে থাকা ভয়ের কারণে, নতুবা তাদের সম্পর্কের বাস্তবতার কারণে।
– বসুন।
তাবিব হাত দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বিছানার সম্মুখেই। উসখুস করার কোন মানেই হয় না। নিজেকে শান্ত রেখে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে নিবৃতা গিয়ে বসলো সেখানে। দৃষ্টি বরাবরই তার নত। কেমন গুটিয়ে রাখা তার অভিব্যক্তি। তাবিব কিছুক্ষণ নিষ্পলক চোখে সেই শুভ্র মুখখানি পরোখ করলো। কেমন লালচে হয়ে আছে সেটি। সরু নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। তাবিব এক প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়লো। অতঃপর টুপ করে নিবৃতার সম্মুখ বরাবর মেঝেতে বসে পরলো। অকস্মাৎ এরূপ কাজে ভড়কে গেলো নিবৃতা। আৎকে উঠে কিছু বলবে তার আগেই তাবিব সাবলীল কন্ঠে বলে,
– তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছো কেন নিবেদিতা? আমি কি পর কেউ?
নতুন সম্বোধন! আচ্ছনতা ঘিরে ধরলো নিবৃতাকে। চুপ হয়ে গেলো সহসা। দৃষ্টি গিয়ে ঠেকলো আপন কোলের উপর। ওকে শান্ত হতে দেখে তাবিব আবারও বলে,
– বলো, আমি কি তোমার পর কেউ?
লোকটা প্রথম দিন থেকেই শাব্দিক অর্থে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবার তার নির্দেশনা অমান্য করার সাহস করলো না নিবৃতা। এমনকি আজকের পর থেকে হয়তো কখনোই পারবে না। ও মিহি গলায় বলে,
– না।
– আমি তাহলে কে?
ঠোঁট গুটিয়ে নিলো নিবৃতা। কি বললে তার উত্তর মানুষটাকে সন্তুষ্ট করবে? বুঝে আসলো না। তাবিব মুচকি হাসলো। নিজ থেকেই নিবৃতার সহায়ক হলো।
– আমি তোমার স্বামী হই। তোমার সবচাইতে আপন মানুষ।
ভেতরটায় কেমন অজানা শিহরণ বয়ে চলে। নিবৃতা জানে না এর অর্থ। তবে ভীতিই ধরে নিলো ও। তাইতো সময় না নিয়ে সায় জানিয়ে বললো,
– জ্বি।
তাবিব গভীর চোখে তাকিয়ে থেকে অদ্ভুত গলায় বলে,
– আমি তোমার কে?
স্বীকারোক্তি চাইছে সে। হয়তো আপন অধীকার বুঝে নিতে সে মরিয়া! নিবৃতা চোখের পাতা শক্ত করে বুজে এক অক্লিষ্ট ঢোক গিলে। মেঝেতে বসায় সেই নত মুখের সকল কার্যকলাপ বেশ আমোদেই উপভোগ করছে তাবিব। নিবৃতার এই অবস্থা দেখে ওর এবার আর হাসি পেলো না। শুধু দেখে গেলো, সম্মুখে থাকা মেয়েটা, ঠিক কতটা ভঙ্গুর। কতটা অপারগ। অসহায়ত্ব তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে। কেন এতোটা বেহাল দশা তার? মনটা অত্যন্ত নরম। এর জন্য বুঝি? ওর বেশ মায়া হলো। কিন্তু দমে গেলো না। আজ রাতে তাদের মাঝে কিছু স্পষ্টতা নিয়ে আসা অনিবার্য! কয়েক পল গড়িয়ে নিবৃতা আওড়ালো সেই বাক্যটি।
– আপনি আমার স্বামী। আমার সবচাইতে আপন মানুষ।
– কথাটা তোমার মন মস্তিষ্কে গেঁথে রেখো। এখন থেকে আমিই তোমার সব!
শীতল সেই স্বরে দৃশ্যমানভাবে কেঁপে উঠে নিবৃতা। সম্মানের খাতিরেই, বয়সে বড় মানুষের সামনে এভাবে উঁচুতে বসা থাকা ওর নিকট অসহনীয় ঠেকলো। ও না পারতে আইঢাই করে উঠে বলে,
– আপনি নিচে বসে আছেন কেন? উঠুন প্লিজ!
তাবিব আশ্লেষে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
– উহুম! এভাবেই বেশ আছি। অন্তত তোমার মুখটা তো দেখতে পারছি ভালোমতোন। কবে আবার এই সুযোগ মিলে, কে জানে!
কোন দ্বিধা নেই লোকটার কথায়। অবশ্য কখনো থাকেও না। সে কাঁচের স্বচ্ছ ব্যাক্তিত্বের মানুষ। কোন রাখঢাক নেই। অথচ সে ভালোমতোই জানে, নিবৃতা নামের মেয়েটা আগাগোড়াই লজ্জা ও সংকোচে ভরপুর। কেন তার উপর কি একটু রহম করা যায় না? ওর নাকটা আবারও ঘামে ভিজে উঠলো। ছোট ছোট বিন্দু কণা উজ্জ্বল আলোয় চিকচিক করছে। তাবিব ওর মাঝে জেগে ওঠা লোভকে প্রশ্রয় দিলো। একটুখানি ছুঁয়ে দিলে কি হবে? লজ্জাবতীর ন্যায় গুটিয়ে যাবে? তাবিব আজ নাহয় সেটুকু দেখলো! যেই ভাবা সেই কাজ। হাত বাড়িয়ে আচমকাই বুড়ো আঙুলের সাহায্যে মুছিয়ে দিলো নিবৃতার সরু, নরম নাকটুকুন। এবং ঠিক তাবিবের কল্পনার মতনই মাথাটুকু তার আরেকটু নত হলো সহসা। হাত দুটো আকড়ে ধরলো পরিধেয় জামার দুপাশ! তাবিব কপাল চুলকে হেসে ফেলে, তবে নিঃশব্দে।
– একটু সহজ হও। আমার সামনে তোমার এতো সংকোচ মানায়?
– আমি এরকমই। অদ্ভুত, অসহ্য, অবুঝ। একটু মানিয়ে নিন কষ্ট করে, নাহয় আমায় অল্প খানিকটা সময় দিন। সত্যি বলছি, আমি চেষ্টা করবো। আপনি নিরাশ হবেন না।
তাবিবকে অবাক করে দিয়ে এরকম একটা উত্তর এসেছে সেই মানবী থেকে। দৃষ্টি তার কেমন মৃত! কন্ঠে অচেনা ব্যাথা ও আকুতি। তাবিব থমকে তাকিয়ে রইলো সেই মুখ পানে। ধীরে ধীরে মোটা মোটা দানায় অশ্রুরা ঝড়ে পরছে নামিয়ে রাখা চোখ দুটো থেকে। তাবিব কি ওকে কিছু বলেছে? এভাবে কেদে ফেললো কেন? প্রশ্ন করলে, উত্তর মিলবে না। এটা ও খুব ভালো করেই জানে। তাই কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে বিষয়টা নিজ থেকে বোঝার চেষ্টা করলো সে।
এদিকে নিজের মনকে যতই মানিয়ে নিয়ে আসুক, দিন শেষে হেরে যাওয়া নিবৃতা আবারও হেরে গেলো। পারছে না সে কোনভাবে। তাবিব সামনেই বসা, সে সত্য ভুলে গিয়ে কেঁপে উঠতে থাকা হাতটা দিয়ে বা হাত চেপে ধরলো শক্ত করে। আর এসবই নীরবে দেখে গেলো তাবিব। একটা সময় এর মর্মার্থও বুঝে ফেললো। মাথা নিচু করে এক হতাশাগ্রস্ত শ্বাস ছাড়লো। ও তো এতোটা অমানবিক নয়। নিবৃতাকে ও একটু হলেও কি বোঝে নি? বুঝেছে তো। পরিস্থিতি বিবেচনা করে কি ওরকম কিছু ওর পক্ষে ভাবা সম্ভব ছিল? নাহ! অথচ মেয়েটা কেমন ধারণা নিয়ে বসে আছে। নিজের ও নিবৃতা, উভয়ের জন্যই ওর খারাপ লাগলো। পুনরায় গাঢ় দৃষ্টি সেই ক্রন্দনরত মুখ পানে নিবদ্ধ রেখে বললো,
– আমি কিছু বলবো। মন দিয়ে শুনবে।
– আচ্ছা।
কম্পনশীল গলায়ও সে জবাব দিয়েছে। এতেই তাবিব খুশি হলো। সহনশীল গলায় বললো,
– আমাদের বিয়ের কারণটা কি?
– ঝিলমিল।
– সেটা আমরা বিয়ের আগেই পরিষ্কার করে নিয়েছিলাম। তাই তো?
লোকটার তাহলে মনে আছে! নতুবা তার আচার আচরনে সেটা স্পষ্ট ছিল না। নিবৃতা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
– জ্বি।
– আমি এর সাথে আরেকটা কথাও বলেছিলাম। মনে আছে?
কথা তো হয়েছিল বেশ। এখন সে কোনটা বোঝাচ্ছে? বিভ্রান্ত মুখটা দেখে তাবিবই বলে,
– বলেছিলাম, আমাদের সম্পর্ক ও এর সমীকরণ, সময়ের উপরে ছেড়ে দেওয়া হলো। যা হবে পরে দেখা যাবে।
– হ্যা।
নিবেদিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে, শান্ত সুরে মায়া ঢেলে এবার তাবিব বলে,
– আমাদের মনটা না বড্ড অবাধ্য, বেপরোয়া। একে কোন ভাবেই বাগে রাখা সম্ভব নয়। ছোট্ট এক কারণে কাউকে ভালো লেগে যায় নয়তো অপছন্দ হয়ে যায়। হাজার চাইলেও তুমি একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। পরিস্থিতি সাপেক্ষে তোমার মস্তিষ্ক বিষয়টা সামলে নিলেও, মনকে তুমি পরিবর্তন করতে পারো না। এটা কি তুমি বোঝো নিবেদিতা?
কথাটা খুব সহজই ছিল। বোঝা কঠিন নয়। নিবৃতা মাথা নাড়িয়ে বললো,
– জ্বি, বুঝি।
– আমার ক্ষেত্রেও এই বিষয়টাই ঘটেছে। এই যে বলেছিলাম না, আমাদের সম্পর্কটা সময়ের উপরে ছেড়ে দাও। কিন্তু দেখো, আমার জন্য বেশি সময় লাগে নি। এই কদিনেই আমার মনটা আয়ত্ত থেকে ছুটে পালিয়েছে।
নিবৃতা ঠোঁট গুটিয়ে নিলে। এর কথার অর্থ কি দাঁড়ালো? সরাসরি না বলেও কি বোঝাতে চাইলো যে, মানুষটা ওকে পছন্দ করতে শুরু করেছে? এরকমটা কখনো ঘটে নি নিবৃতার সাথে। সম্পূর্ণ নতুন অনুভুতির তোড়ে ওর গাল দুটো লাল টকটকে হয়ে উঠলো। লজ্জা লাগছে কি? পেটের ভেতরটা কেমন মোচড়াচ্ছে। তাবিব তার জহুরি নজরে খেয়াল করছে সবটা। আবির মাথা কোপল দুটো চোখে ধরেছে ওর। ও তৎক্ষনাৎ নজর সরিয়ে দিয়ে আবার বলে,
– এই যে বললাম, পছন্দ, অপছন্দ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এটা আবার ব্যাক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। হয়তো কারও সেটা কখনো পছন্দই হয় না। আবার পছন্দ হতে কিছুটা সময় লাগে। তবে তোমার ক্ষেত্রে পছন্দ না করতে পারার সুযোগটা নেই নিবেদিতা।
শেষ বাক্যটায় গলার স্বর কেমম নিরেট হয়ে এলো। নিবৃতা কিঞ্চিৎ নয়ন মেলে চাইলো। দুজনের দৃষ্টি একত্রিত হতেই তাবিব বক্র হেসে বলে,
– তোমাকে সময় দেওয়া হলো। দু বছরেরও বেশি সময়। দিনশেষে এই সম্পর্ক মাঝে আমি এবং তুমিই থাকবো, এবং এর খুটি হলো তানহা। তাই দ্বিতীয় কোন উপায় নেই। এখন বলো, এতটুকু সময়তে তোমার চলবে না?
অনেকটা সময়! নিবৃতার ঠোটের কোনে সূক্ষ্ম হাসির ঝিলিক খেলে গেলো। চটপট উত্তরে বললো
– চলবে, চলবে!
তাবিব হাসলো। আবারও সকালের ন্যায় নিবৃতার কপালে টোকা দিয়ে বললো,
– শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিলে। আমি ওমন কিছুই ভাবি নি। আমি যতটুকু বলবো, ততটুকুই চিন্তা করবে। এর বেশিও না কমও না।
নিবৃতার পুরো বদন আড়ষ্টতায় ছেয়ে গেলো। ব্রিড়া ছেয়ে গেলো পুরে অস্তিত্ব জুড়ে। আসলেই বেশি দুর চলে গিয়েছিল। অথচ প্রয়োজনের সময় ওর দ্বারা কিছুই হয় না। তবে এ বারে তাবিবকে গম্ভীর দেখালো। আগ বাড়িয়ে আগলে ধরলো নিবৃতার দুই হাত। নিবৃতা গোল গোল চোখে চাইলেও পাত্তা পেলো না তাবিবের কাছে। ও নিজের মতোন করে, কিছু না বলেই, বাম হাতের লম্বা হাতাটা গুটিয়ে নিলো আচমকা। উদ্ভাসিত হলো বিভীষিকাময় সকল চিত্র। ওর নজর পরলো। চোখের পলক অবদি নড়লো না। কালসিটে দাগ, আচড় ও আঙুলের ছাপে ভরা হাতটা খুব ভালো করে দেখলো। এক সময় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো সেখানে। মনে হলো পুরুষোচিত শক্ত হাতটাও মৃদু মন্দ কাপছে। নিবৃতা শ্বাস আটকে বসে রইলো।
– এতো নরম মনের কেনো তুমি? চিত্ত এতো দূর্বল কেন?
নরম সেই গলার সুর। যেন আহ্লাদ করছে!
– এই প্রশ্ন আমার নিজেরও। অথচ আজ পর্যন্ত কোন জবাব পাই নি।
কেন যেন নিজেকে আজ আটকালো না নিবৃতা। মনে হলো লোকটা ওকে খোঁটা শুনাবে না। ওকে নিচু করে দেখবে না। কারণ জানে না, তবে মনে হলো। একান্তই ওর ধারনা।
– তোমার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে জানা হয়েছে। কেন যেন তখন বিস্তারিত শোনার ইচ্ছে হয় নি। তুমি কি এখন আমাকে কিছু বলতে চাও?
অতীত! গহন আঁধারে নিমজ্জিত, লজ্জিত, সীমানাহীন পীড়ায় মোড়া সেই অতীত। নিবৃতা চায় না সেটাকে সম্মুখে আনতে। ভুলতে চায়। অথচ ও ব্যর্থ! ওর বাবার সকল চেষ্টাও ও পরাজিত করে ছেড়েছে। কেমন নিস্তেজ কন্ঠে আওড়ালো,
– আপনি শুনতে চান?
সেই ভেঙেচুরে যাওয়া মানুষটা কথা বলছে এভাবে! অবিশ্বাস্য তবুও তাবিব এগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে। নমনীয় হয়ে বলে,
– তুমি বলতে চাও?
– না।
– তাহলে আমিও শুনতে চাই না।
ওকে স্বস্তি দেওয়াই তাবিবের লক্ষ্য। নিবৃতাও এতক্ষণের আটকে যাওয়া শ্বাস টুকুন ছেড়ে দিলো। মুখ হা করে বায়ু টানলো। দৃশ্যটি দেখে তাবিবের মায়া লাগলো। হাতের মুঠোয় থাকা নরম, কম্পমান হাতদুটো আরেকটু নিবিড়ভাবে আকড়ে ধরে বলে,
– এই দুই বছরে, তুমি আমাকে পছন্দ করার রাস্তা খুঁজো। এর উপহার স্বরূপ, কথা দিচ্ছি, তোমার সকল দুঃখ, ক্লেশ, কষ্ট, আমি মুছিয়ে দিবো।
টুপ করে একটি অশ্রু কনা গড়িয়ে পরে অক্ষি কোল টপকে। তাবিন কোমল গাল মুছিয়ে দেয় আপন হাতে। যেন এখনই ওর সমস্ত গ্লানি দুর করে দিতে চায় ও। বেসামাল, অবর্ণনীয় অনুভূতি সামলাতে নিবৃতা চোখ জোড়া বুজে ফেলে। তাবিব চেয়ে চেয়ে দেখে সেই মুখটি। এই দেখার যেন শেষ নেই। ওর অনুভব এতোটা মজবুত কখন হলো? নিজের অজান্তেই ফেঁসে গিয়েছে ও। বেশ বাজেভাবে! মুহুর্তের পর মুহুর্ত গড়ায়। এই নীরবতা ভাঙে না। কোন শব্দ না পেয়ে, নিবৃতা যখন অক্ষি পল্লব মেলে চায়, তখন এক জোড়া মোহনীয়, মাদকতাপূর্ণ দৃষ্টির কবলে পরে। আজ কি ওর নিস্তার নেই? একটু কি ছাড় পাবে না ও?
– আজ সত্যিই তোমার নিস্তার নেই।
তাবিব গভীর গলায় বলতেই নিবৃতা মিইয়ে গেলো। এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো চারপাশে। লোকটা ওর মনের কথা কিভাবে যেন বুঝে যায়।
– এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো। মনোযোগ দিয়ে শুনো।
– আচ্ছা।
– আমি একটা লম্বা সময় ধরে দেশে থাকছি না। আমি নেই মানে, তোমাদের অভিভাবক নেই৷ এরকমটা কিছু মোটেও ভাববে না। বিদেশে তো কি হয়েছে, আমি না থাকলেও আমার বিশ্বস্ত মানুষদের নম্বর তোমার কাছে থাকবে। আমায় না পেলে, বা আমার জায়গায় কাওকে লাগলে তারাই এগিয়ে আসবে। আমি জানি তোমার জন্য অনেকটাই কষ্টকর। আমার কথা ভেবে মেনে নিও। আর তোমার পরিবার তো আছেই। যাওয়া আসার ক্ষেত্রে আমার কোন বাধা নেই। তবে সাবধানে থাকবে। নিজের এবং তানহার জন্য। তোমার দুজন আমার আমানত। নিজেদের হেফাজত করবে। পারবে না?
গভীর মনোনিবেশেই শুনেছে নিবৃতা। বুঝলোও ঠিকঠাক। তাই সায় জানিয়ে বললো,
– পারবো।
তবে একটা প্রশ্ন ওর মনে খচখচ করছে বেশ। উপেক্ষা না করে বললো,
– একটা প্রশ্ন করি?
কন্ঠটা মাসুম শোনালো। তাবিব হাসে। আশ্চর্য! এই মেয়ের সাহচর্যে ইদানীং একটু বেশিই হাসছে ও।
– একটা কেন? হাজারটা করো।
– ঝিলমিলকে দিয়ে আমায় বিশ্বাস করেন?
এমন না যে এই প্রশ্ন তাবিবের মাথায় আসে নি। রীতিমতো আতংকেই ছিল। নিবৃতার উপর ও বিশ্বাস করে। তবে তাদের অজান্তেই তাবিব কড়া নিরাপত্তা রেখে যাচ্ছে। সমস্যা যেদিকেই হোক, ও জেনে যাবে তৎক্ষনাৎ।
– আমার মেয়ের পছন্দে আমার সায় ছিল। আর এখন? আমার পছন্দের উপর আমার বিশ্বাস আছে।
উত্তরটা জটিল নয়, তবে এর মর্মার্থ গভীর। নিবৃতা কেমন বোকার মতো চেয়ে থাকলো। বুঝে নি সে তেমনটা। তাবিব মাথা নাড়ায়। এতো সহজে তো সব হবে না।
– মায়ের চেয়ে আপন কেউ হয় না। তুমি না তানহার আম্মু?
তাবিবের মুখে এই স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল নিবৃতা। ও বড্ড অনুরাগ নিয়ে বলে,
– আমি ওয়াদা করছি, আমার কারণে ঝিলমিলের কখনো কোন সমস্যা হবে না।
তাবিব মায়াময় মুখটাতে স্নেহের দৃষ্টি বুলিয়ে বলে,
– আমি জানি তো।
কৃতজ্ঞতায় নিবৃতার মনটা ভরে উঠলো। পেলব ওষ্ঠ তিরতির করে কাপলো। কোনমতে বললো,
– ধন্যবাদ। বিশ্বাস করার জন্য।
অভিব্যক্তি এমন যেন এখনই কান্নায় ভেঙে পরবে। তাবিব তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– এখানেই থাকো। আমি আসছি!
আলমারির দিকে ছুটলো সে। তার তাড়াহুড়ো দেখে নিবৃতা তাকালো সেদিকে। কয়েকটা বাক্স বের করছে লোকটা। ওগুলো কি? প্রশ্নটা উঁকি দিলো মানসপটে। তবে চুপ থাকলো ও। ধীর হয়ে বসে তাবিবের নির্দেশ পালন করলো। বাক্সগুলো নিয়ে এসে তাবিব আবারও বসলো নিচে। উচ্ছ্বসিত গলায় বললো,
– ঐ যে বিয়ের আগেরদিন তোমার জন্য গহনা কিনলাম। নানান ব্যস্ততায় তোমাকে সেগুলো দেওয়ায়ই হয় নি আর।
অপেক্ষা করে না সে। অধীকার খাটিয়ে লুফে নেয় নম্র হাত দুটো। গোল মতন দেখেতে বাক্সটার মধ্যে দুটো মাঝারি আকৃতির স্বর্ণের বালা ছিল। সেটাই ওর হাতে পরাতে পরাতে বলে,
– ছোটবেলায় দেখতাম মা সবসময় বালা পরে থাকতেন। এখন সামর্থ্য হওয়ায় ভাবলাম তোমার জন্যও কিনি। আজ তিনি জীবিত থাকলে হয়তো চাইতেন তার ছেলের বৌয়ের হাত খালি না থাকুক। তাই নিয়েছি।
সরু, চিকন হাতে সোনার বালা দুটো ঝকমক করছে। যদিও নিবৃতা একটু বেশিই রোগাটে, নাহয় আরও মানাতো! ও নিস্পন্দ নয়নে চেয়ে আছে ওর হাতের দিকে।
– তোমার আঁধার সময়ের দুঃখগুলোকে আমি চকচকে আলোয় রাঙিয়ে দিলাম। ধীরে ধীরে বাকিগুলোও একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
তাবিবের কন্ঠে আশা। অথচ সে কি জানে, নিবৃতা তার সমস্ত বদন জুড়ে ঠিক কি কি চিহ্ন বহন করছে? আধার রাতের তারার মতোই শুভ্র ত্বকে তারা জ্বলজ্বল করে। সেগুলো কখনোই মিটবার নয়।
এক সময় আংটিটাও ওর অনামিকায় পরিয়ে দেয় তাবিব। অতঃপর শেষে গিয়ে যে বাক্সটা হাতে নেয়, সেখানে এক জোড়া নুপুর ছিল। শব্দহীন তারা। সেটি হাতে তুলে প্রশস্ত হাসে তাবিব।
– নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ানোর জন্য সামান্য তোহফা।
নিবৃতা অবাক হয়ে বলে,
– আমি কখন রান্না করলাম?
– এই যে শরবত আর চা।
– ওগুলো রান্না?
– যে চুলো কিভাবে জ্বলে না জ্বালায়, সেটাই জানতো না। তার কাছ থেকে পাওয়া এতটুকুই তো বিশাল।
নিবৃতা লজ্জা পেলো। কুন্ঠায় লেপ্টে গেলো পুরোপুরি। তাবিব সময় অপচয় করে না। ওর এক পা তুলে নেয় উরুর উপর।
– কি করছেন?
নিবৃতার অস্থির কন্ঠে তাবিব প্রত্যুত্তর করে সাবলীলভাবেই।
– স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে দুজনই সমান সমান। এগুলোতে কিছু হয় না। বুঝেছ?
এর বিরুদ্ধে শেষে গিয়ে নিবৃতার আর কিছুই বলা হয় না। লোকটা বলার কোন অবকাশ রাখলে তো?
– এগুলো কখনো খুলবে না৷ সারাক্ষণ পরে থাকবে। যে কেউ দেখলেই যেন বুঝে তুমি বিবাহিতা। নাহলে কিন্তু খবর করে ছাড়বো।
– সন্দেহ করছেন?
অতি বিস্ময় সেই স্বরে। ও বিশ্বাসই করতে পারছে না। তাবিব আশাহত দৃষ্টিতে তাকায়। সাবলীল শব্দে না বললে, এই মেয়ে কিছুই বুঝে না ঠিকঠাক। আর যা ভাবো তাও ভুল!
– যা আমার তা যেন আমারই লাগে। এটাই চাই আমি।
কে কার? গহনাগুলো যে তাবিব কিনেছে সেটা? নিবৃতার মাথায় এলো না। ওর বেকুব মুখ দেখে তাবিবের আর কিছু বলতেও ইচ্ছে হলো না। অনেক কিছুই বলেছে আজ। সেটাই এতোদিন কল্পনাতীত ছিল। আজ ও নিজের দেয়াল নিজেই ভেঙেছে। এতোটুকুই যথেষ্ট। এবারে ও উঠে দাঁড়ালো। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে নিবৃতার দিকে চাইতেই নজর আঁটকে গেলো। ঘোমটা মাথায় নত মুখে বসা একটি অপরূপা মেয়ে। হঠাৎ করেই নিবৃতার মাঝে বিরাজমান নির্জীবতা কেন যেন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরঞ্চ কোমল দেখাচ্ছে ভীষন। হঠাৎ পরিবর্তনটুকুর ওর চোখের না মনের? জানে না তাবিব। তবে সিলমোহর প্রয়োজন। ও ক্ষীণ হাসলো। একদম নিকটে গিয়ে দাঁড়ালো ওর। হঠাৎ করেই তাবিবকে কাছে দেখে লাজুকলতা মানবী হকচকালো বেশ। তবে প্রতিক্রিয়ার সময় পেলো না। পুরুষালী পোক্ত হাত উঠে এলো ওর কোপল জোড়ায়।
তাবিব নরম হাতে আগলে ধরেছে ওর মুখটা। বল প্রয়োগ করে ওর দৃষ্টি বরাবর আনত চেহারাটা তুললো। মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইলো অপলক। নিবৃতা অসহায় অনুভব করলো। নজর চুরি করতে আশেপাশে তাকালো। ঠিক সেই মুহুর্তেই উষ্ণ স্পর্শ পরলো কপালের মাঝ বরাবর। পুরুষ্টু ওষ্ঠ চেপে বসেছে সেখানে। স্নেহ, সম্মান ও স্বীকারোক্তি মিলেমিশে অসংখ্য অনুভূতির স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটালো। নিবৃতার অক্ষি পল্লব নেমে এলো ধীরে ধীরে। অনুভব করলো, তাবিবের উষ্ণ শ্বাস সরাসরি ওর মুখের উপর পরছে। অন্তঃপট থরথর করে উঠলো ওর। তাবিব ওভাবেই ঠোঁট রেখে অনুচ্চ স্বরে মদিরা কন্ঠে বললো,
– নাউ ইউ লুক লাইক মাইন। মিসেস তানজিব। মাই নিবেদিতা৷
গাল দুটো গরম হয়ে উঠলো। তাবিব স্পষ্ট আপন হাতে অনুভব করলো সেটা। অস্পষ্ট হেসে পরপর সরে এলো। লজ্জা ওর নিজেরও লাগছে খানিকটা এখন। কোমরে হাত ঠেকিয়ে আশেপাশে তাকালো। কোন অযুহাত খোঁজার চেষ্টায়।
– তোমার কি খুব বেশি ঘুম পাচ্ছে?
নিজেকে সামলানোতে ব্যস্ত ছিল নিবৃতা। এহেন প্রশ্নে সুযোগ বুঝে পালিয়ে যেতে চাইলে। কিন্তু কেন যেন পারলো না। মিহি হলায় বললো,
– না।
– আমার সাথে রাত জাগবে? আমার লাগেজ গুছানো তে সাহায্য করবে৷ আর বাদবাকি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আমি তোমায় বুঝিয়ে দিতাম।
– আচ্ছা।
– তার আগে চলো, দু কাপ কফি করে নিয়ে আসি।
নিবৃতা ঝটপট উঠে দাঁড়ালো। ব্যগ্র হয়ে বললো,
নিবৃতা পর্ব ৮
– আমি পারবো তো।
তাবিব বিস্তর হাসে। ঘর থেকে বের হতে হতে বলে,
– কিছু কিছু কাজ, কিছু কিছু সময়, একত্রে ভাগ করে করলে বেশি ভালো লাগে। আজ এটা শিখে নাও।
মাথা নাড়িয়ে, বাধ্য ছাত্রীর ন্যায় নিবৃতাও তার পেছন পেছন চললো।
