নিবৃতা পর্ব ১৩
নেহার ছায়ালিপি
নিজের পরিচিতদের মাধ্যমে, উত্তরার একটি ড্রাইভিং স্কুলে নিবৃতার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছে তাবিব। এতো দুর আসার একমাত্র কারণ হলো, এখানে মেয়েদের জন্য মহিলা প্রশিক্ষক রয়েছে। নিবৃতা যেন কোনরূপ জড়তা বিহীন, সুষ্ঠুভাবে এই কাজটায় মনোযোগ দিতে পারে, সে কথা ভেবেই তাবিব এই পন্থা অবলম্বন করেছে। এই যে, নিজের সমস্যাগুলো, কিংবা অস্বস্তি অথবা নীরব শব্দ, যা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করতে নিবৃতা ব্যর্থ, সেগুলোই খুবই মনোনিবেশ সহকারে, পর্যবেক্ষণ করে, তাবিব নামক মানুষটা ওকে বুঝে ফেলে৷ কিভাবে পারে, নিবৃতা সেটা জানে না। কিন্তু বিয়ের পর থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত ওর অপরিপক্কার জন্য কখনও কোন কথা শোনায় নি তাবিব। ওর মাঝে স্পষ্ট দৃশ্যমান থাকা অস্বাভাবিকতাগুলো নিয়েও কোন প্রশ্ন অবদি করে নি। দেশে থাকার অল্প সময়টুকুন কিংবা হাজার হাজার মাইল ভিনদেশে থেকেও, সেই একজন নিবৃতাকে নীরবে আগলে রেখেছে এবং রাখছে। কখনো বিন্দুমাত্র অভিযোগ করে না সে।
বরঞ্চ ওর বিশ্বাসগুলোকে আস্তে করে মেনে নিয়ে নীরবে নিজেকে সমর্পন করে দেয়, ছোট থেকে ছোট যেকোন বিষয় নিবৃতাকে শেখার জন্য আগ্রহ ও বল জোগায়। সে কেন করছে এসব, সেটা নিবৃতা হয়তো পুরোপুরি জানে নয়তো না। ঐ যে, একদিন সকাল বেলা হুট করেই কল করে ওকে বললো যে, ‘ আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি নিবেদিতা’৷ এরপর আর দ্বিতীয়বার সেই বাক্য উচ্চারণ করে নি তাবিব। অথচ নিবৃতা অনুভব করে, সেদিনের পর থেকে মানুষটার ব্যবহারে পরিবর্তন না এসেও যেন অনেক কিছুর বদল ঘটে গিয়েছে। পুরুষালী সেই কন্ঠে ভিন্ন এক টান রয়েছে। উচ্চারিত শব্দগুলোতে রয়েছে অদ্ভুত মিষ্টতা! নিবৃতা কিছুটা হলেও বুঝতে শিখেছে। মানুষটা ওকে অনেক পছন্দ করে বিধায়ই সব করছে। অথচ নিবৃতার ভয় হয়! এই যে, তানহার সাথে ওর মনের মিলটা আচমকাই জমে গিয়েছিল। সৃষ্টি হয়েছিল মধুর এক বন্ধন। কিন্তু তাবিব নামক মানুষটা ওর জন্য এক সংশয়ের নাম। ও মুখে প্রকাশ করে না। পরিস্থিতির দ্বায়ে হয়তো চেহারাতেও সেই ভাবটা লুকোনো শিখে গিয়েছে। কিন্তু সে এখনও তার মনের অবস্থা নিয়ে দ্বিধান্বিত। ও জানে, যদি ওর কাছে দুটো রাস্তা দেওয়া হতো এবং এর মধ্যে একটি ছিল, তাবিবের সাথে সংস্পর্শে না থেকেই তানহাকে পাওয়া যাবে, তাহলে এখন এই মুহুর্তে ও এই পথটাই বেছে নিতো। তবে সেরকম কিছুই হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিছু পেতে হলে, কষ্ট করা অনিবার্য। তানহার সাথে শান্তি পূর্ণ এক জীবন পেতে হলে ওর বাবাকেও মেনে চলতে হবে৷ সেজন্যই নিবৃতা তাবিবের এতো বাধ্য! নতুবা ও কবে এক ছুটে পালিয়ে যেতো!
নিজ জীবনের এরকম প্যাচানো সমীকরণ মেলানোতেই বিভোর ছিল নিবৃতা। তখনই টুং করে টেবিলের উপর থাকা মোবাইলে শব্দ হয়। ওর ধ্যান ভাঙে সেই ক্ষীণ আওয়াজে। সেটি হাতে তুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠে একজনের পাঠানো উৎসাহী বার্তা।
– ওল দ্যা বেস্ট নিবেদিতা। নিজেকে শান্ত রেখে, তারপর মনোযোগ দিবে। দেখবে কিছুই কঠিন মনে হবে না। আর কোন সমস্যা হলে তৎক্ষনাৎ নিজ মুখে বলবে। কারণ সেখানে কিন্তু মিস্টার তানজিব নেই। গেট আ গ্রিপ ওফ ইউরসেল্ফ! ওকে? রাতে কথা হবে।
এই সময়টাতে তাবিব ব্যস্ত থাকে, কাজের ভীষন চাপ। গত রাতে কথা হয়েছে তবুও সে ততটুকু যথেষ্ট মনে করে নি। সময় বের করে আবার নিবৃতাকে এখন মনোবল জোগাচ্ছে। নিবৃতা পলকহীন তাকিয়ে থাকলো সেই আগত কয়েক বাক্যের দিকে। লোকটা ভুল কিছুই বলে নি৷ ওখানে তো সে থাকবে না। নিবৃতার চোখ মুখ কিংবা অভিব্যক্তি দেখে ওর প্রয়োজন কিংবা অসুবিধা বোঝার জন্য সে নেই। তাই তো সতর্ক করে দিলো।
– আম্মু চলো!
তানহার ডাকে নিবৃতা চোখ ঘুরিয়ে চায়। ও তৈরি হয়ে বসে ছিল, তানহার অপেক্ষায়। নিচে লিটন ভাই দাঁড়িয়ে আছে। নিবৃতাদের উত্তরা নিয়ে যাবে।
– চলো।
সায় জানিয়ে নিবৃতা উঠে এলো। বুকের মাঝে অস্থিরতায় কেমন হাসফাস লাগছে। ভয়ে হাতের তালু ঘামছে। ও শুধু মনে মনে চেয়ে গেলো, শেখার সময় ওর হাতটা যেন না কাপে। নতুবা বড্ড ঝামেলা হয়ে যাবে। ঘোলাটে সেই পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাবে ও। একা থাকলে তবুও নিজেকে বুঝ দিতো, কিন্তু সাথে তানহা আছে। কোনরূপ বিরূপ অবস্থায় নিবৃতা কোনভাবেই পরতে চায় না। করুনাময়ের নিকট সাহায্য কামনা করতে করতে ও বেরিয়ে পরলো।
নিবৃতার ইন্সট্রাক্টর একজন ত্রিশোর্ধ মহিলা। আচার আচরণ তার বেশ সাবলীল ও বন্ধু সুলভ। প্রথম দিন বিধায় তেমন কঠিন কিছুই শিখতে হয় নি। কোথায় ব্রেক আছে, ক্লাচ কি, এক্সেলেটর, গিয়ার, স্টিয়ারিং কি। এগুলো কিভাবে কাজ করে সেই প্রাথমিক জ্ঞানটুকুই অর্জন করেছে।
এবং ভালো ছাত্রী নিবৃতা মনোযোগ দিয়ে সব শুনেছে অতঃপর ঠিকঠাকভাবেই করে দেখাতে পেরেছে, যেমন, উচ্চতা ও নাগাল অনুযায়ী, সিট কিভাবে উচু নিচু করতে হয়, বিশেষ করে সাইড মিরর ও রিয়ার ভিউ কিভাবে ঠিক করে নিতে হয়, সবটাই ও প্রথমবারেই করে দেখাতে পেরেছে। নিবৃতা ছোট বেলা থেকেই তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের অধিকারী ছিল। বাবা বলতেন, নিবৃতার নাকি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। ক্লাসে প্রথম স্থান সবসময় ওরই দখলে থাকতো। কি জানি, বাবা ওকে খুশি করার জন্য বলতো না আসলেই সেসব সত্য! নিবৃতার তো আর কিছুই মনে নেই৷ শৈশব কেমন ছিল, স্মরণীয় স্মৃতিগুলো কিছুই স্মরণে নেই। তবে ও চেষ্টা করে। যতটুকু ওকে শিখতে বলা হয়, ততটুকু সঠিকভাবে করার জন্য ও যথেষ্ট নিষ্ঠা প্রয়োগ করে। এবং শেষে গিয়ে ওকে নিরাশ হতে হয় নি। আজও যখন প্রশিক্ষকের থেকে প্রশংসা পেলো তখন বাচ্চাদের মতোই ওর মনের ভেতরটা প্রফুল্ল হয়ে উঠলো।
– গ্রেট! আপনি অনেক শার্প মাইন্ডেড! আমি ধারনা করছি আপনার খুব বেশি একটা সময় লাগবে না।
রাতে, পইপই করে এই পুরো বাক্য টুকুন তাবিবকে জানিয়েছে নিবৃতা। যেন ঐ মানুষটা বুঝে ও জানে যে নিবৃতা তাকে নিরাশ করবে না। তাবিব অবশ্য আগে থেকেই সব খবর নিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু নিবৃতা ওকে যখন নিজ থেকে জানালো তখন মনটা ওর প্রাপ্তিতে ভরে উঠলো। এভাবেই যেন ধীরে ধীরে খোলস ত্যাগ করে এই মেয়েটা তার পূর্ণাঙ্গ রূপে চলে আসুক, তাবিব এখন শুধু এতটুকুই চায়।
তবে বিপত্তি বাঁধলো দ্বিতীয় দিনে। এবার ব্রেক নিয়ন্ত্রণে আনা শিখতে হবে নিবৃতাকে।
– ঠিক আছে। এবার গিয়ার এক নামান। ব্রেক ছেড়ে আস্তে আস্তে ক্লাচ তুলুন।
নিবৃতার হাতদুটো ক্ষীণ লয়ে কাঁপছে। ভয়ে তালু ঘেমে ভিজে এসেছে। ও একবার আড়চোখে প্রশিক্ষকের দিকে তাকালে তিনি চোখে আশ্বস্ত করেম। নিবৃতা চোখ বুজে লম্বা শ্বাস ছাড়ে। প্রকম্পিত হাতেই স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে। আরেক হাতে সাবধানে ক্লাচ ছেড়ে দেয়। তবে ওকে হতাশ করে দিয়ে গাড়িটা একবার ঝাঁকি খেয়ে থেমে যায়। সাথে সাথেই নিবৃতার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। ও ভীত দৃষ্টিতে তাকালে প্রশিক্ষক সাহস জুগিয়ে বলে,
– প্রথম প্রথম এমন হয়ই। ভয় পাওয়ার মতো কিছুই হয় নি৷ আমরা আবার চেষ্টা করবো। সমস্যা নেই।
এই অল্পতেই বুকের মাঝে ভয়ের দানা বাঁধতে শুরু করলো। বারংবার মনোযোগ সরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সর্বাঙ্গই কাঁপছে। তবুও গতকালের শেখা সবগুলো আরেকবার মনে করে নিলো, পাশেই প্যাসেঞ্জার সিটে বসা প্রশিক্ষক ওকে দিক নির্দেশনা দিয়ে চলেছেন। এবার প্রয়াস চালাতেই গাড়ি সামনের দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে চললো। তৎক্ষনাৎ পাশ থেকে নিবৃতাকে বাহ বাহ দেওয়া হলেও ওর ভয়টা কাটে না। কেন যেন মনোযোগ আসছে না। যদ্দরুন গতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসলো। পরপর গাড়িটা আবারও তীব্র এক ঝাঁকুনি দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। হতাশায় ও দু’চোখ শক্ত করে বুজে ফেলে তড়িৎ।
– যতবার এই ভুলটা হবে আমরা ততবারই আবার শিখবো।
নির্ভুলতায় অভ্যস্ত নিবৃতা প্রথমবার ভুল করেই মনে নিয়ে বসলো যে ওর দ্বারা হবে না এই কঠিন কাজ। ইচ্ছে শক্তি কেমন নিস্তেজ হয়ে এলো। ঐ দিন আর তেমন গতি হয় নি ওর। একই ভুল বারংবার করছিল। অভিব্যক্তি হয়ে উঠেছিল অস্থির। তাই শেষমেশ ওকে ছুটিই দেওয়া হয়েছে। বাসায় এসেও ওর মনটা সারাদিনে আর ভালো হলো না। তানহা কতো করে বোঝানোর চেষ্টা করলো কিন্তু ওর মনোবল আর ফিরলো না।
তাবিব কয়েক পল নিশ্চুপে দেখে গেলো স্ক্রিনে দৃশ্যমান সাদা ফ্যাকাসে মুখখানি। মেয়েটার ত্বক একটু বেশিই ফর্সা। তন্মধ্যে এই পাণ্ডুর ভাবে ওকে আরও অসুস্থের মতো লাগছে দেখতে। তাবিব নিশ্চিত মেয়েটার রক্তাল্পতা আছে। আরও না জানি কত কত সমস্যা ভেতরে চেপে রেখে বসে আছে। তাবিবকে অনেক সমসয় ব্যয় করতে হবে এর পেছনে। মনের অসুখে বলে শরীরও খারাপ করে। নিবৃতাকে দেখে আপাতত সেটাই লাগছে। তাবিব কারণ জানা সত্বেও সরাসরি সেই প্রসঙ্গে গেলো না। নরম স্বরে বললো,
– তোমাকে আজ এমন দেখাচ্ছে কেন?
কেমন দেখাচ্ছে? নিবৃতা আজ সারাািনে বোধহয় একবারও আয়নায় মুখ দেখে নি। তাই বলতে পারছে না। অদৃশ্য জড়তা ওকে তখনই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললো। মাথার ঘোমটা আরেকটু টেনেটুনে ঠিক করে নিলো। তাবিব হতাশ চোখে কান্ড খানি দেখে বিড়বিড়িয়ে বললো,
– নির্বোধ!
অথচ নিবৃতা ঠিকই শুনে নিয়েছে কথাটুকু। ওর লজ্জতি বোধ আরও বাড়লো। ও তো সত্যিই এক গাধী। আজ সকালে সেটা আবারও প্রমান করেই এসেছে ও। এসব যে সাধারণ ভুল সেটা ওর মন মানতে ব্যর্থ! ভাবনার প্রতিফলনে ওষ্ঠ পল্লব চেপে ধরলো সহসা। মাথা আরেকটু নামিয়ে লহু কন্ঠে বললো,
– ফিমেইল ইন্সট্রাক্টর থাকলে নিশ্চয়ই ফিমেইল ড্রাইভারও আছে। তাই না?
মেয়েটা কৌতুহলে প্রশ্ন করছে। উন্নতি ভালোই তবে এর লক্ষ্যটা বড় মন্দ। তাবিব গা ছাড়া ভঙ্গিতে বললো,
– সহজে পাওয়া যায় না। কিন্তু হ্যা, আছে৷
– তাহলে আমাদের জন্য একটা খুঁজে দিন না।
– কেন? তুমি না ড্রাইভিং শিখছো?
সংকোচে ওর চিবুক গিয়ে গলায় ঠেকে যাওয়ার জোগাড়। যেন সে ভীষন কুণ্ঠিত। মিইয়ে যাওয়া গলায় বলে,
– আমাকে দিয়ে এসব হবে না। অনেক কঠিন।
তাবিব উঠে দাঁড়িয়েছে। হিটারে কফির জন্য পানি গরম দিতে দিতে বলে,
– আজ ভুল করেছ?
– জি।
– এজন্যই কি চাচ্ছো না?
উত্তর আসে না কোন। তাবিব জানতো অপর পক্ষ এতে মৌনই থাকবে। ও শান্ত স্বরে বললো,
– ভুল না করলে শিখবে কিভাবে? আর ভুল করে যেই বিষয়টা শেখা হয়, সেটা সবচাইতে নিখুঁত হয়। জানো কি?
প্রত্যুত্তরের আশায় তাবিব তখন উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে। কিন্তু ওকে নিরাশ হতে হলো।
– আপনি একটু কষ্ট করে খুঁজে দিন না।
এভাবে হবে না। দুর্বল জায়গায় একটু খোঁচা না দিলে হবে না। তাবিব চুপ থাকলো কিছুক্ষণ। কফি তৈরি করে সেটা মগে ঢেলে নিলো। অতঃপর আরাম করে বসে বললো,
– তারা হয়তো তোমার বয়সী কিংবা ছোটও হতে পারে।
– আচ্ছা।
– তোমার ভালো লাগবে? এরকম কেউ তোমাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর তুমি চুপচাপ বসে আছো? ও যেটা পারে, সেটা তুমি পারো না।
নীরব মুখটা লক্ষ্য করে তাবিব আবারও বলে,
– সবাই বলবে, তানহার আম্মু ড্রাইভিং পারে না। এরজন্য আরেকটা মেয়ে ড্রাইভার রেখেছে। পরে তানহাও ভাববে তার আম্মু শিখতে পারলো না। মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছে। ওর খারাপ লাগবে না? অথচ দেখলাম, বিষয়টা নিয়ে ও খুবই এক্সাইটেড ছিল। থাক কি আর করার, তুমি যেহেতু পারবে না তাহলে আমি…
– পারবো।
তটস্থ হয়ে বলে উঠে নিবৃতা। তাবিব না শোনার ভান করে বলে,
– কি বললে?
– আমি পারবো। আরও চেষ্টা করবো।
– সত্যিই তো? না পারলে বলো আমি মানা করে দেই।
– না।
– ঠিক তো?
নিবৃতার এবার রাগ হয়। লোকটা এতক্ষণ ওকে বুঝিয়ে যাচ্ছিলো যেন ও মাঝপথে থেমে না যায়, আর এখন? ও বারবার করে সায় জানানোর পরও এভাবে বলছে! ও রুষ্ট চোখে তাকায় ক্ষনিকের জন্য। যা স্বীয় নজরে পরতেই তাবিব থমকে যায়। ওর কথাও থেমে যায়। আর কিচ্ছুটি বলতে পারে না। ঐ ডাগর ডাগর চোখের এক ভিন্ন সৌন্দর্য হলো তাতে মিশে থাকা এক টুকরো রাগের অনুভুতি! তাবিবের প্রতি থাকা নীরব অথচ দৃশ্যমান নালিশ। ও ঠোঁট ছড়িয়ে সরল হাসে৷ তরঙ্গের ন্যায় মোহন গলায় বলে,
– তোমার দু’চোখে আঁকা অভিযোগের রেখা
আমার এই মনকে করে তুলে ভীষন দিশেহারা।
নিবৃতা বুঝেনি কিছুই। অভ্যাসানুযায়ী তাবিবের বিশ্লেষণের অপেক্ষায় রইলো। তবে তাবিব আর কিছুই বললো না। শুধু দেখে গেলো। অন্তঃকরণে সৃষ্ট হওয়া শূন্যতা একটু একটু করে নিষ্পত্তি করার প্রয়াস চালালো। অথচ চোখ জুড়ালেও ছুঁয়ে না দিলে যে মনের তৃষ্ণা মিটে না।
অতঃপর নিবৃতা যখন পরদিন ড্রাইভিং স্কুলে গেলো, তখন নিপুণতার সাথেই পরিস্থিতি সামাল দিলো। কোন ভুলের রাস্তা ও আর খোলাই রাখে নি। বিয়ের সময় নিজের সাথে করা ওয়াদা পালনে সক্ষম হয়েছে নিবৃতা। তানহা, নিবৃতার ঝিলমিল। এই একটা নাম, একটা অস্তিত্বের জন্য নিজেকেও উপেক্ষা করা শিখে গিয়েছে ও। এখন আর কোন কিছুই অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। নিজের মেয়ের জন্য নিবৃতা সব করতে রাজি। ভয়কে জয় করা থেকে শুরু করে নিজের স্বস্তিকর স্থানও ও ত্যাগ করেছে। এভাবেই ড্রাইভিং টেস্টের দিন উত্তীর্ণ হলে। ও কোন প্রকার ত্রুটি ব্যতীত, একজন দক্ষ চালকের ন্যায়ই পরীক্ষায় পাশ করে প্রশংসায় ভাসলো।
এভাবেই একটু একটু করে, এগিয়ে চলেছে নিবৃতা। সবকিছু নতুন করে শিখছে, জানছে, চিনতে পারছে। হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞ গিন্নি, আদর্শ মা। সঙ্গে আছে তানহার ন্যায় চটপটে সাথী। এবং আরেকজন মানুষ। যে সাথে উপস্থিত না থেকেও সর্বদা নিবৃতার পাশে থেকেছে। এই সম্পর্কের সমীকরন কোথায় গিয়ে আটকা পরেছে তা কেও জানে না। তবে কোনকিছুর সূচনা ঘটলে তাকে বহমান থাকতেই হয়। নিবৃতা একজন স্ত্রী হিসেবে কেমন সেটা আন্দাজ করা কঠিন। তাবিবের বিষয়ে তার নিজস্ব কোন মতামত নেই, নেই কোন জিঘাংসা। কৌতুহল শূন্যের কোঠায়। কেমন আছেন, কি করছেন। এই সাধারণ প্রশ্নও সে প্রথম প্রথম করে নি। তবে এই যে, সে ভীষন বাধ্য! তাবিব যেদিন বললো এই কথা, তারপর দিন থেকে কথা হলেই এ দুটো প্রশ্ন তার ধরা বাঁধা নিয়ম। তাবিবের মতোন একজন ধৈর্যশীল স্বামী পেয়েছে বলেই হয়তো নিবৃতা স্বাভাবিক এক জীবনের অংশীদার হয়েছে। তবে এমন নয় যে, তাবিব কখনও হতাশ হয় না। ওর উষ্ণ স্বীকারোক্তির বিপরীতে যখন শীতল প্রত্যুত্তর মিলে, তখন নিজেকে অসহায় লাগে। ক্লান্তি বোধ হয়। তবে পর মুহুর্তে নিজেকে সামলে নেয়। নিবৃতাকে সে সময় দিয়েছে।
আপন কথার বরখেলাপ হওয়া যাবে না৷ এজন্যই তো নিজের ভালোর খাতিরে তাবিব স্বীয় অনুভূতি সামলে রাখে। মুখ ফুটে বলে কম। ও নিজেও জানে না, কেন মেয়েটার প্রতি এতোটা গভীর টান অনুভুত হয়! ওর মেয়ে তানহাকে এতো ভালোবাসার জন্য, না কি এই পবিত্র সম্পর্কের জোর? হয়তোবা নিবৃতা নামক অস্তিত্বের মাঝেই বিশেষ কিছু আছে, যার কারণে মেয়ের পর বাবাও মন খুইয়ে বসেছে!
এভাবেই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার তাগিদে, হৃদয়ে লাগাম টেনে ভিনদেশে নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রেখেছিলো তাবিব। পুরো দমে মনোনিবেশ করে গিয়েছে স্বীয় কর্তব্য ও কর্মের উপর। মনের মাঝে সর্বদা বাস করেছে আপন নীড়ে ফিরে তাড়া। অতীব কাছের দুটো মানুষের কাছে ফেরত যাওয়ার ভীষন ইচ্ছে। সুমিষ্ট ফলের আশায় একাকিত্বকে সয়ে নিয়েছিল তাবিব। এবং এখন অবশেষে সেই প্রাপ্তির দোরগোড়ায় দাড়িয়ে ও।
রাতের আকাশে তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে। ছাদ খোলা বারান্দার রেলিঙে হাত ঠেকিয়ে তাবিব শূন্যে তাকিয়ে ছিল। আজ ডর্মে ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মাঝ রাত। দেশে রাত এগারোটার মতোন বাজে। মা মেয়ে নিশ্চয়ই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইতিমধ্যে। তাবিব স্মিত হাসে। পরপর অন্ধকারে মোবাইলটি হাতে নিতেই তা জ্বলজ্বল করে উঠে।
তানহা ঘুমিয়ে গেলেও নিবৃতা জেগে ছিল। মেয়ে তার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী এবার। হাতে গোনা কয়েক মাস বাদে জেএসসি পরীক্ষা। ওর পড়ালেখা বিশেষ তদারকিতে রাখে নিবৃতা। তাই তো এই রাতের বেলা বসে বসে, তানহার জন্য নোট লিখছিলো ও। মেয়েটার যেন সুবিধা হয় সেই লক্ষ্যেই এতো কষ্ট।
নিবৃতা পর্ব ১২
রাতের এই অদ্ভুত নীরবতার মাঝে নিবৃতার মোবাইলে চলে আসে সেই একান্ত পুরুষের গোপন এক বার্তা। দ্রুত গতিতে চলা কলম থেমে যায় আচমকা। শান্ত ভঙ্গিতে মোবাইলটি হাতে নিলেও পর মুহুর্তে নিবৃতার কোনকিছুই আর শান্ত রইলো না। চোখের দৃষ্টি থমকে গিয়েছে ইতিমধ্যে। নিস্তব্ধতার মাঝে কর্নকুহরে নিজের অভ্যন্তরে ধুকপুক করা যন্ত্রের বেসামাল নিপিড়নেরই শব্দ শুনতে পায় ও কেবল। হাতটাও কেঁপে উঠে থেমে থেমে।
– তোমাকে দেওয়া সময়টুকু শেষ হলো। আমার অপেক্ষার প্রহর ফুরোলো যে। এবার কোথায় যাবে তুমি? আমিই যে তোমার একমাত্র গন্তব্য নিবেদিতা।
