Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ১৪

নিবৃতা পর্ব ১৪

নিবৃতা পর্ব ১৪
নেহার ছায়ালিপি

চতুষপার্শ্ব জুড়ে এখন শীতল হাওয়ার দাপট চলে। বিকেল পাঁচটার মাঝেই অবনীতে আঁধার নেমে আসে। তপনের সেই তেজোদ্দীপ্ত রশ্মি ম্লান হয়ে এসেছে। দুপুর বেলা তীব্র দাবদাহের পরিবর্তে অলস ঠান্ডা মানুষকে কাবু করে নেয়। সময়টা হলো পহেলা ডিসেম্বর। নতুন মাসের প্রারম্ভ। আকাশ বাতাসে নব নব ছুটির উল্লাস ঘুরে বেড়ায়। শুকনো খরখরে পাতার ন্যায় সারাবছরের ক্লান্তিরা যেন ঝরে পরে।

হাতে গোনা কয়েক দিন পূর্বেই, অষ্টম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাইতো তানহা রয়েছে ভীষন খোশমেজাজে। তবে আজ ওর খুশির পাল্লাটা যেন একটু বেশিই ভারি। তাবিবদের ফ্ল্যাটে দুটো মানুষের উপস্থিতি থাকে, অথচ আজ সেখানে চলা হুটোপুটিতে মনে হচ্ছে কোন উৎসব জেগে উঠেছে বোধহয়। থেমে থেমে টাইলসের মেঝেতে তানহার কোমল কদম ক্ষীপ্র গতিতে ছুটোছুটি করছে৷ একবার রান্নাঘরে ছুটছে তো আরেকবার বসার ঘরে। কাজ তার বিশেষ কিছুই নেই তবে অস্থির ভাবখানা এমন যেন বিশাল কোন দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে বসে আছে। মেয়েটা বড় হয়েছে বেশ। বাবার মতোই তার শ্যামল বরণ তবে মুখের গড়নটা বেশ মায়াবী। মেয়ে হিসেবে উচ্চতা যথেষ্ট। তার আম্মুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে একদম! বাবার জিনগুলো খুব ভালো করেই লাভ করে নিয়েছে সে৷ পাশাপাশি আম্মুর যত্নে কেশগুচ্ছ হয়ে উঠেছে দীপ্তময়। তার উপর চোখ আটকে গেলে মন বিগলিত হতে বাধ্য। আচার আচরণে বেশ পটু। কথাবার্তায় তার দায়িত্বশীল মনোভাব যেন উপচে পরে! এই প্রাঞ্জল, চঞ্চল মেয়েটাই তো নিবৃতার জীবনের জ্বলজ্বলে শুকতারা যে নতুন ভোরের আগমনী বার্তা জানিয়ে নব্য সূচনা ঘটিয়ে যায়।

– আম্মু! হলো তোমার পায়েশ রান্না করা? আমাদের কিন্তু দেরি হয়ে যাবে!
রান্নাঘরের দরজা ভেদ করে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠে তানহা। নিবৃতা তখন পায়েশটুকুন বোলে ঢেলে নিচ্ছিলো। নিচু গলায় সাবলীলভাবে বললো,
– এই তো হয়ে গিয়েছে।
– দাও দাও! আমি নিয়ে যাই।
তানহা সম্মুখে হাত বাড়াতেই নিবৃতা কপট রাগের ভান করে হালকা চাপড় মারে সেখানে। শাসনের সুরে বলে,
– গরম দেখছ না? এতো সাহস ভালো নয়।
দন্ত কপাটি মেলে হাসে, কানের পিছ চুলকে তানহা সরে আসে। এভাবেই এক কালে সংসার কর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকা নিবৃতা পুরো দমে একজন অভিজ্ঞ সাংসারিক মেয়ে হয়ে গিয়েছে। নিজের অপরিপক্কতা কাটিয়ে উঠে নতুন করে সব ঢেলে সাজিয়েছে, গড়ে তুলেছে নিজেকে। অথচ স্বীয় মেয়েকে রেখেছে এসব থেকে অনেক দুরে। টুকটাক হালকা পাতলা নিরাপদ কাজ ছাড়া তানহাকে কোনকিছুই করতে দেয় না নিবৃতা। মোটকথায় তুলোয় মুড়িয়ে রেখে ওকে লালন করছে৷ তানহার অবশ্য কোন অভিযোগ নেই। মায়ের ভালোবাসা সে এভাবেই লুফে নেয়, একেবারে কাঙালের ন্যায় অথচ নিবৃতার ধ্যান জ্ঞান কিন্তু সব ওকে ঘিরেই। দিনের সিংহভাগ কাটে ওর কাজেই। তবুও ওর মনই ভরে না মায়ের আদরে। লোভী সে আরও বেশি করে চায়। নিবৃতাও এতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করে না। ওর শান্তি ও সুখ যে এতেই নিহিত। হ্যান্ড গ্লাভস্ পরে মাঝারি আকারের গরম বোলটি হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে নিবৃতা। পিছু পিছু তানহাও ওকে অনুসরণ করে চলে আসে।

– চলো রেডি হবে তো এবার!
তানহার কথায় নিবৃতা ভ্রু কুচকায় নিবৃতা। ওড়না টেনে কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছতে মুছতে বলে,
– বোরকা পরতে কতক্ষণ লাগে আমার?
তানহা নেত্রদ্বয় অবাকত্বের পর্যায়ে পৌছে ছানাবড়া হয়ে গেলো। অবিশ্বাসের সুরে বললো,
– কি যে বলো না তুমি সবসময়। হ্যা!
নিবৃতা বোকা বনে গেলো। সে আবার কি করলো?
– কি হয়েছে?
– কি হয় নি সেটা বলো! তুমি এভাবে বলতে পারলে?
মেয়েটা এরকমই। ছোট বিষয়কে টেনে এরূপ প্রলম্বিত করে এমন ভাব ধরবে যেন মস্ত বড় কিছু একটা হয়ে গিয়েছে। নিবৃতা এসবে এতোদিনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। ও পাত্তা না দিয়ে টেবিলে সাজানো খাবারগুলো শেষবারের মতো দেখে নিলো। নাহ, সব ঠিকই লাগছে। ও মনে মনে হাফ ছাড়লো! ঠিক থাকলেই শান্তি। মায়ের থেকে গুরুত্ব না পেয়ে তানহা মুখ ফুলালো। নিবৃতার কাঁধে থাকা ওড়নার একাংশ হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,

– স্পেশাল ওকেশনে কি আমরা ভালো কাপড় পরি না? একটু সাজগোছ করতে হয় না?
– হয়তো।
– তাহলে তুমি কেন তৈরি হবে না?
– আজ আবার কোন স্পেশাল ওকেশন?
নিবৃতা বেখেয়ালি কথায় তানহা চট করে সরে যায় কাছ থেকে। রুষ্ট চিত্তে তাকিয়ে বলে,
– আমার বাবা, তোমার হাজবেন্ড, আজ এত বছর পর বাসায় ফিরছে, এটা স্পেশাল ওকেশন না তোমার কাছে?
নিবৃতা তখনও পিছু মুড়ে টেবিল গোছাচ্ছিলো। তাহার কথায় বুদ্ধিদয় হতেই তৎক্ষনাৎ জ্বিভ কাটলো! কি থেকে কি বলে ফেললো। এভাবে বলা ঠিক হয় নি। ও ইতস্তত ভঙ্গিতে ঘুরে বললো,
– স্পেশালই তো। কিন্তু কোন অনুষ্ঠান তো না।
– আমার জন্য তো উৎসবই।
তানহা নাছোড়বান্দা হয়ে বলতেই নিবৃতা নত স্বীকার করলো। পরাজয় মেনে নিয়ে মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তানহাকে আগলে নিয়ে বললো,
– আচ্ছা। তাহলে বলো, কি পরবো।
তানহা উৎফুল্ল হয়ে তৎক্ষনাৎ জবাব দিয়ে বসলো, যেন সে অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছে।

– শাড়ি!
নিবৃতা গোলগোল নয়ন মেলে চাইলো। আতংকিত সুরে বললো,
– বিয়ের দিন ছাড়া তো আর কখনও শাড়ি পরি নি আমি।
– সমস্যা নেই। আমি পরিয়ে দিবো।
– আমার ভালো লাগে না। অন্য কিছু বলো।
বিগত কয়েক বছরে সম্পর্কটা অনেক গভীর ও সহজ হয়েছে ওদের। নিবৃতাকে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। পছন্দ, অপছন্দ, দ্বিমত, সব কিছুই তার ঝিলমিলের কাছে খুব সরল মনেই প্রকাশ করতে পারে নিবৃতা। তাই তো এখন নাকোচ করার মতো সার্মথ্য ওর হয়েছে।
– এতোগুলা শাড়ি তোমার। ওগুলো কি ওভাবেই নষ্ট হবে?
– নষ্ট হবে কেন? তুমি আরেটকু বড় হলে তোমাকে দিয়ে দিবো। তখন তুমি পরবে।
নিবৃতা মিষ্টি করে হেসে তানহার ললাট কোণে চুমু খেলো। তানহা মনে মনে আপ্লূত হলেও তা লুকিয়ে রাখলো। আপাতত কাজ থেকে সরা যাবে না।

– আচ্ছা সে দেখা যাবে। কিন্তু এখন তো তোমাকে পরতেই হবে।
– কিন্তু..
– তোমার ঝিলমিলের অনুরোধ তুমি রাখবে না?
এই কথার বিপরীতে নিবৃতার সকল ভয়, দ্বিধা ও অমত মিলিয়ে যেতে বাধ্য। ও অসহায় মুখ করে চেয়ে থেকে একসময় মাথা দোলালো। সে রাজি। তানহা নিবৃতাকে জাপটে ধরে পরপর সরে এলো। দৌড়ে গেলো কাবার্ডের কাছে। কয়েক পলের মাঝেই একটি নীল রঙা শাড়ি বের করে নিলো। বোঝাই যাচ্ছে, আগে থেকে সময় নিয়ে তবেই এটা পছন্দ করে রেখেছে মেয়েটা। বড় হয়েছে সাথে ঘটে বুদ্ধিও বেড়েছে তরতরিয়ে। মা’কে লাজে ফেলার পরিকল্পনা। বাবার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। নিবৃতা বুঝলো সব তবে এবারে মৌন থাকলো। ওর সকল দুর্বল প্রতিরোধ এবারে টিকে থাকতে পারবে না সে ওর জানা হয়ে গিয়েছে।

তাবিবের মাস তিনেক আগে ফেরার কথা থাকলেও বিশেষ ও দুর্লভ একটি কেস আসায় ও আর তখন আসতে পারে নি। স্বীয় অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চেয়েছিল ও, যেই স্বর্ণালী সুযোগ মিললো, তখন আর হাতছাড়া করতে ইচ্ছে হয় নি। এরজন্যই তো এতো কষ্ট করে, পরিবার ছেড়ে ভীনদেশে এসে থাকছে। তাই কষ্টটা আরেকটু বাড়িয়ে আরও কিছু মাস থেকে গিয়েছিল। তবে এবার সত্যিই সকল কাজের অবসান ঘটিয়ে, একেবারে চলে আসছে তাবিব। ফিরছে তার আপন নীড়ে। বর্তমানে সে বিমানে উড্ডীয়মান অবস্থায় আছে। হাজার হাজার মাইল পারি দিয়ে স্বদেশে ফিরে আসছে। এখন ওকেই বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে তামহা ও নিবৃতা যাচ্ছে। তাবিব মানা করেছিল ওদের আসতে। অযথা ঝামেলা বাড়ানোর কি প্রয়োজন। তবে তানহা ওর কথা শুনে নি। তাবিবের কথাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে জানিয়েছে যে ওর আম্মুকে নিয়ে সে যাবে বিমানবন্দরে। মেয়ে এতো করে চাইছে যখন তখন তাবিব আর মানা করে নি। বরঞ্চ মনে মনে খুশিই হয়েছে। ওর ছোট পরিবারটা ওকে নিতে যাবে ভাবতেই কোমল অনুভূতি জেগে উঠে মনে। তবে এসবে নিবৃতা নিশ্চুপ। দিনশেষে যেটা ধার্য করা হবে ও নীরবে সেটাই মানবে, পালন করে যাবে। নিজস্ব কোন মতামত ওর কখনোই থাকে না।

চাতক পাখির ন্যায় এরাইভাল টার্মিনালের বাহিরে নিবৃতা ও তানহা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। তানহার উৎসুক দৃষ্টি ভেতরের দিকে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টায়। কাঙ্ক্ষিত আগমনী ফ্লাইটের ঘোষনা দেওয়া হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। তাহলে তাবিব আসছে না কেন? তানহা অস্থিরতায় পায়চারি করলো। অথচ নিবৃতা শান্ত নদীর মতো নিস্তরঙ্গ। নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে। আরও কয়েক পল গড়িয়ে যেতেই দুর হতে এক পুরুষ অবয়ব নজরে এলো। আগাগোড়া তার কালোয় মোড়া। কালো ডেনিম প্যান্ট, শার্ট ও তার উপরে মোটা কালো জ্যাকেট। পীঠে একটি ব্যাগ ঝুলছে, সাথে দু’হাতে দু’টো ট্রলি ব্যাগ টেনে নিয়ে আসছে সে।
– বাবা!

তানহা মৃদু চিৎকার দিয়ে দৌড়ে চলে গেলো! তানহার আওয়াজে নিবৃতা মুখ তুলে চাইলো। অনতি দুরেই মানুষটা দাড়িয়ে। সবসময়কার দেখা সেই চিরচেনা গাম্ভীর্যতা আজ তার মুখাবয়বে অনুপস্থিত। বরঞ্চ সেথায় এক নম্রতা বিরাজমান। চোখেমুখে প্রশান্তির ছায়া, ঠোঁটের কোন ঘেষে আছে চমৎকার এক মৃদু হাসি। নিবৃতা দৃষ্টি সরায় না। দেখে যায় মানুষটাকে। সাথে দেখে কিভাবে চপল পায়ে ছুটে যাওয়া মেয়েকে দেখে সেও ত্রস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে আগলে ধরেছে। তার অভিব্যক্তি জুড়ে ভর করা নিদারুণ খুশির ঝলক দেখে অলক্ষ্যে, অজানায় নিবৃতার চোখদুটোও হেসে উঠে। ভিনদেশে থেকে মানুষটা বোধহয় সেখানকার আবহাওয়ার সাথে কিছুটা খাপ খাইয়ে গিয়েছে। আগে থেকে তার শ্যামল বর্ণ হালকা হয়ে এসেছে। উজ্জ্বল লাগছে বেশ। চুলগুলো মাঝারি আকৃতির করে ছাটা। মুখে ছিটেফোঁটা দাড়ি গোঁফের অস্তিত্ব নেই। আগে থেকে আরও বেশি বলিষ্ঠ দেহের অধিকারি মনে হচ্ছে। কতক্ষণ বেহায়ার মতো তাকিয়ে থাকতেই নিবৃতা হকচকালো, যখন সেখান থেকেই তাবিবের নিগুঢ় দৃষ্টি ওকে ছুঁয়ে দিলো। চোখের ভাষায় কি যেন দুর্বোধ্য ঠেকলো ভীষন, নিবৃতা অপ্রস্তত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো তড়িৎ গতিতে।
তানহা বাবার এক হাতের ট্রলি নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। সে এখন বড় হয়েছে, ধীরে ধীরে বাবা মায়ের ভার বহন করা শিখছে। তাবিব বড্ড স্নেহে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। বাচ্চাটা তার বড় হয়ে গিয়েছে। ভাবসাব কেমন পরিণত! কথাবার্তার ধরন নজরকাড়া। প্রনোচ্ছল ভাব তার কমে নি বরঞ্চ সেটাই ওর ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছে। তাবিবের চোখ ভিজে আসতে চাইলো। সন্তানরা বড় হয়ে গেলে কি সব বাবা মায়েদেরই মন কেমন কেমন করে উঠে? ও মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে হাসার চেষ্টা করে।

– চলো চলো আম্মু দাঁড়িয়ে আছে ওখানে।
নিবৃতার কথা উঠতেই তৎক্ষনাৎ সম্মুখে তাকায় তাবিব। নজরে আসে, সেই পরিচিত নারী অবয়ব, তার চিরচেনা জড়তায় ডুবো ডুবো অভিব্যক্তি। অন্যের দায়িত্ব নিতে শিখলেও মেয়েটা নিজের ব্যাপারে পিছিয়েই রইলো। সমস্যা কোথায়? তাবিব এখন চলে এসেছে! এই বাকি পথটুকুন নাহয় ও নিজ হাতে পার করতে সাহায্য করবে তার নিবেদিতাকে। ও সরল হেসে এগিয়ে এলো। কাছাকাছি চলে আসতেই পুনশ্চঃ আর কিছু ভাবলো না। সরাসরি নিবৃতাকে এক পাশ থেকে আগলে নিয়ে আরামে চোখ বুজলো। পুরুষালী থুতনি গিয়ে ঠেকলো নিবৃতার নত মস্তকের উপর। অকস্মাৎ এরূপ কিছুর জন্য প্রস্তত ছিল না নিবৃতা। আপাদমস্তক এক উষ্ণ চাদর ওকে জড়িয়ে নিলেও মনে হলো ও অদ্ভুত শীতলতায় জমে গিয়েছে। কেমন গাঁট হয়ে গেলো। ওর নরম বদন মুহুর্তে কাঠে পরিণত হওয়ার পার্থক্যটুকুন সহজেই বুঝলো তাবিব৷ খারাপ লাগলেও সরে এলো পরপর। গাঢ় নজরে চেয়ে বলে,

– আই মিসড্ ইউ।
সাধারণ একটা বাক্য, যেটা হয়তো গত কয়েক বছরে তাবিব, নিবৃতার কাছে নানানভাবে ব্যক্ত করেছে। তবুও আজ যখন সামনাসামনি দাড়িয়ে গভীর গলার কাতর স্বীকারোক্তি শুনলো তখন নিবৃতার অন্তঃস্থল নিবিড়ভাবে কেঁপে উঠে। কন্ঠনালী ফুড়ে কিছু উচ্চারণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হলো। ওকে আজও নিরুত্তর দেখে তাবিব আর কিছু বললো না। নিশ্চুপে দুরে সরে এলো। তানহা এতক্ষণ তার বাবা মা’কেই হাসিমুখে দেখছিলো। বাবা মা’য়ের বন্ধনটা ঠিক কেমন এখনও বোঝা সম্ভব হয় নি ওর পক্ষে। তবে এতোটুকু অবশ্যই ও বুঝে যে, ওদের প্রথম গুরুত্ব তানহাই। সেটা হয়তো ভালো খারাপ উভয় দিকেই প্রভাব ফেলে।
এরপর আরও গুটিকতক কথাবার্তা ফুরোলে ওরা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে পরলো। গন্তব্য সেই চিরচেনা নীড়! পার্কিং লটে এসেই গাড়ির পেছনে নিজের লাগেজগুলো তুলে রাখছিলো তাবিব৷ এদিকে অবচেতন মনেই, রোজকার অভ্যাস অনুযায়ী নিবৃতা ড্রাইভিং সিটে নিজের জায়গা বুঝে নিয়েছে। বিষয়টা খেয়াল করতেই তানহা ঠোঁট চেপে হাসলো। তাবিব কাজ শেষে উল্টো পথে ড্রাইভিংয়ের জন্য যাবে তার আগেই তানহা এসে বাবার বাহু চেপে ধরে বলে,

– আজ তোমার স্পেশাল ট্রিমেন্ট পাওনা। তাই আরাম করে বসো তো।
প্যাসেঞ্জর সিট খুলে ধরে দাড়ায় তানহা। ভেতরে তখন নিবৃতা হতভম্ব দৃষ্টিতে চেয়ে। একবার তাবিবকে দেখছে তো আরেকবার নিজের দিকে। আবারও ভুল করে বসেছে! তাবিব অবশ্য এতে খুশিই হলো। খোশমেজাজে গিয়ে বসে পরলো জায়গা মতোন। অথচ নিবৃতা তখন নিশ্চল জড় পদার্থের ন্যায় বসে।
– আম্মু গাড়ি ছাড়ো।
পেছন থেকে মেয়ে তাড়া দিলে নিবৃতার ঘোর ভাঙে। কুন্ঠায় মাথা নত করে তাবিবের উদ্দেশ্যে জড়িয়ে আসা গলায় বলে,
– আমি আসলে… আসলে আমার খেয়াল ছিল না…
– এর আগে এক্সিডেন্টে করেছ কোন?
– হ্যা?
সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রাসঙ্গিক কথায় নিবৃতা অবাক হয়ে চায়। তাবিব আরাম করে পীঠ এলিয়ে বসতে বসতে বলে,
– করেছ?
ভাসা উত্তরে নিবৃতা বলে,
– না।
– তাহলে সমস্যা কোথায়? বাসায় নিয়ে চলো আমাদের।

নিবৃতা শুষ্ক এক ঢোক গলাধঃকরণ করে নিজেকে সামলায়। স্টিয়ারিংয়ে হাতদুটো শক্ত করে চেপে ধরে। অথচ দৃশ্যমানরূপে ওর আঙুলগুলো কাঁপতে দেখা যাচ্ছে। তাবিব হতাশায় রুষ্ট হয়। মেয়েটা এখনও ওকে যমের মতো ভয় পায়। কেন? আশ্চর্য!
– এতো নার্ভাস হচ্ছো কেন? ভুলে গিয়েছ কে তোমাকে ড্রাইভিং শেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছে?
শান্ত কন্ঠস্বর। তাবিব যে মনে মনে বেজায় চটেছে এটা ও মোটেও প্রকাশ করলো না। ওর ধৈর্যের পরীক্ষা যে সবে শুরু হলো এটা ভালোমতোই বুঝতে পারছে ও। কিয়ৎক্ষণ গড়াতেই নিবৃতা সহজ হয়। ওর মনোবল তো একদম পাশেই বসে। নিবৃতাকে নজরে, খেয়ালে রেখে। তাহলে সমস্যা কোথায়? উল্টো কিছু হলে যে, সে মুহুর্তেই আপন হাত এগিয়ে দিবে সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। নিজের নির্বুদ্ধিতা ও বোকামিতে নিজেকে আবারও ভর্ৎসণা জানালো নিবৃতা। অতঃপর হালকা মনেই গাড়ি চালু করলো।
ততক্ষণে বাবা মেয়ে আবারও রাজ্যের আলাপ জুড়ে বসেছে। প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা হতো, তবুও যেন কতশত বুলি জমে আছে। সেগুলোই খালি করছে৷ আর এদিকে নিবৃতা দক্ষ এক চালকের ন্যায়ই তাদের নিয়ে চললো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে!

ঘরের কিছুই বদলায়নি। তাবিব যেমন রেখে গিয়েছিল ঠিক তেমনই আছে৷ উল্টো এক ধরনের সজীবতা বিরাজ করছে এখানে। সবকিছু একটু বেশিই পরিষ্কার ও ঝকঝকে। সাধারণত একগাদা বই পত্র, ও নানান কাগজে ঠেসা ঘর কখনো নান্দনিক হয়ে উঠে না। অথচ এই ঘরটাকে দেখলে শান্তি শান্তি লাগছে। নিশ্চয়ই ঘরের কর্ত্রীর বড় অবদান রয়েছে এখানে। মাত্রই গোসল করে এসেছে তাবিব। বাহিরের তুলনায় ঘরের ভেতর ঠান্ডা নেই বললেই চলে। বিছানার সম্মুখে বসে ভেজা চুলগুলো মোছার উদ্দ্যেশ্যে তয়লা চালাচ্ছিলো ও।
– বাবা খেতে আসো।
তানহার উচ্চ কন্ঠী ডাকে তাবিব নড়েচড়ে উঠলো। মেয়ের এই দুরন্তপনার সে ভীষন অভাববোধ করেছিল এতোদিন। অবশেষে সেটা ঘুচলো। আয়নার সম্মুখে দাড়িয়ে কিছুটা পরিপাটি হয়ে নিলো তাবিব। অতঃপর চোখে রিমলেস চশমাটা এটে বেরিয়ে পরলো। তবে কদম স্থুল হলো খাবার ঘরের সম্মুখে এসে। কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো তার বিভ্রম হচ্ছে। চোখের সামনে ঘটা কোনকিছুরই সত্য নয়। নাহলে তাবিব কবে থেকে এতোটা সৌভাগ্যমান হলো? একটু একটু করে ওর মন মস্তিষ্ক ঘন এক ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো।

ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিবৃতা। প্লেটে প্লেটে ভাত তুলে নিচ্ছিল। ওর গায়ে জড়ানো সেই নীল শাড়ি। মাথায় নতুন বৌয়ের ন্যায় ঘোমটা টানা। হাতে তাবিবের দেওয়া মোটা বালাগুলো চকচক করছে। দুর থেকে আসা কৃত্রিম সাদা আলোয় নাকের হিরক খন্ডটি জ্বলজ্বল করে শুভ্র মুঝের শোভা বাড়িয়েছে। চেহারার রুগ্ন ভাবটা অনেকটাই কমে এসেছে। কিছুটা হলেও শরীরের ওজনের বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রতিদিন তাকে ভিডিও কলে দেখলেও সামন-সামনি দেখার মাঝে কিছু একটা বিশেষ তো আছেই, নতুবা এমন নতুন নতুন লাগছে কেন সবকিছু? আগেকার ছেলেমানুষী চেহারায় পরিণত এক ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এবার ‘ঘর কর্ত্রী’ সম্বোধনটা একদম ঠিকই যাবে ওর সাথে।
– এসেছ?
তানহা পেছন থেকে আসতেই তাবিবের ভাবনারা ছুটে পালায়। কিঞ্চিৎ মাথা ঝেড়ে বলে,
– এই তো।
– আম্মু আজ কতকিছু রান্না করেছে! সব তোমার পছন্দের!

উৎসাহী কন্ঠে তাবিব কিছুটা বিস্মিত হয়। সে ভাবে নি ওর জন্য এমন কোন আয়োজন করা হবে, তাও আবার নিবৃতা নিজ হাতে করবে! ও বিভ্রান্ত হয়েই এগিয়ে গেলো। চেয়ারে বসতেই নজর গেলো টেবিলের উপর। সেখানে নানা পদ সাজিয়ে রাখা। যা যা চোখে পরছে তার সবই তাবিবের একান্ত পছন্দের। এই যেমন ওর হাস পছন্দ, আর তানহার মুরগী। আজ তাই মুরগীর বদলে হাসই রান্না করা হয়েছে। আছে চুই ঝাল দিয়ে করা গোশতের রেজালা। সাথে খিচুরির সাথে ইলিশ ভাজা ও কয়েক ধরনের ভর্তাও নজরে আসছে। ইলিশের থেকে তাজা ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। নিশ্চয়ই গরম গরম ভেজে নিয়ে এসেছে। তাবিবের মুখের বুলি ফুরোয়। অবয়বে ভর করে অবিশ্বাস। সামান্য রুটি ভাজতে না পারা মেয়ে আজ সময়ের পার্থক্যে এতো কিছু শিখে ফেলেছে? সে জানতো নিবৃতা রান্না আয়ত্তে আনছে তাই বলে এতো দুর? ও কিয়ৎক্ষণ নির্বাক বনে চেয়ে রয়। তাবিবকে এভাবে চুপ হয়ে থাকতে দেখে নিবৃতা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। ওর দ্বারা কি আবার কোন ভুল হয়ে গেলো? ও সংশয়ে তানহার দিকে তাকালে তানহা স্মিত হাসে৷ নীরবতা ভেঙে বলে,

– অবাক হয়েছ তাই না? কিন্তু কি বলো তো, তানহা’স আম্মু ইজ দ্যা বেস্ট! তাই এখন স্বাভাবিক হও।
মেয়ের কথায় তাবিব সরল হাসে। মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
– এবার তো মানতেই হচ্ছে।
তাবিবকে সাবলীল আচরণ করতে দেখে নিবৃতা হাফ ছেড়ে বাঁচে। বাবা মেয়ের পাতে খাবার তুলে দিয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে তাবিব সরাসরি ওর কবজি আঁকড়ে ধরে।
– পাশে বসো।

শুধু বলেই থেমে যায় নি, বল খাটিয়ে নিবৃতাকে বসিয়ে ছেড়েছে। নিজ উদ্যোগে ওর প্লেটটাও এগিয়ে দিয়েছে। নিবৃতা সবই মৌন বনে মেনে নিলো। বরখেলাপ অবশ্য ও কখন করেও না। অতঃপর যখন খাওয়ার পালা শুরু হলো তখন তাবিবের আর কথা বলতে ইচ্ছে হলো না। শুধু মনে হচ্ছিল আজ কয়েক যুগ বাদে ঘরের খাবার খাচ্ছে ও। এক মায়াবী আদর জড়িয়ে সবটায়। এই স্বাদ যেন কোন অমৃত। ঘর ফেরত ব্যক্তির সকল ক্লান্তি নিরাময়ের যোগ্য। এক বুক ভালোবাসা দিয়ে রান্না করা অঢেল প্রশান্তি! এরপর আর কি? ও শুধু খেয়েই গেলো। হিসেব ছাড়া।

নিবৃতা পর্ব ১৩

স্বাভাবিক নিয়মের বাহিরে। তানহা তো বাবার এরূপ অবস্থা দেখে হেসে কুটিকুটি, সাথে লজ্জা না পেয়ে, তাবিবও আজ শব্দ করে না হেসে পারলো না। এতো আনন্দময় প্রহর, অথচ নিবৃতার মনে তখন দোলাচালের পাহাড়। লোকটা সবসময় এতো এতো কাজের, গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে, প্রয়োজন না থাকলেও নিবৃতার জন্য বলে। কিন্তু আজ যা বলা উচিত ছিল তা একটিবারের জন্যও বললো না। পেট পুরে খেলো, বাবা মেয়েতে উল্লাস করে উঠলো, কিন্তু নিবৃতাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো না, তোমার হাতের রান্না সত্যিই অনেক সুস্বাদু নিবেদিতা!
নিবৃতার ঠোঁট উল্টে এলো। এমন না যে সে প্রশংসা পাওয়ার জন্য এতো কষ্ট করেছে, কিন্তু করেছে তো ঐ মানুষটার জন্যই। বরাবরই মনের কথা ও মুখ ফুটে বললো না। শুধু হৃদয়ে জমে উঠা ক্লেশ নিয়ে মুখ ভার করে বসে রইলো!

নিবৃতা পর্ব ১৫