Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ১৫

দুইজনাতেই পর্ব ১৫

দুইজনাতেই পর্ব ১৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

সাক্ষ্য এহসান নামক ভদ্রসভ্য পুরুষটি আসলেই যেমন গম্ভীর শান্ত রূপ দেখায় মোটেও অতোটা নয়৷ অন্তত দ্বিতী যেটুকু বুঝেছে তাতে এই লোকটি বেশ ধুরন্ধর ব্যাক্তি। দ্বিতী মুখচোখ কুঁচকেই বলল,
“ আমি তিন চার দিনের জন্য কখনোই কোথাও আপনার সাথে যাব না। গাড়ি থামান,এক্ষুনিই। আমার আব্বু আম্মু চিন্তা করবে। ”
সাক্ষ্য তাকায়। ওভাবেই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে গাড়ি চালাল। অতঃপর বলল,
“ আপনার আব্বু আম্মুর আপনার জন্য চিন্তা না করে আমার জন্য চিন্তা করছেন মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম।খু’নাখু’নি যদি সত্যি হয়েই যায় তাদের মেয়ের হাতে? এই নিয়ে ভীষণ চিন্তিতই দেখাল অদিতি আন্টিকে। ”
দ্বিতীর রাগে নাক মুখ লাল হয়ে উঠএ কেমন। তার আব্বু আম্মুকেও বলে এসেছে নাকি এক্সপেরেন্ট করবে? যে প্রকার ভদ্র সাজে সে হিসেবে বলার কথা নয়। আবার বলতেও পারে। দ্বিতী বাঁকা চোখে চেয়েই বলল,

“ গাড়ি থামান৷ নামব আমি, বাসায় যাব।”
সাক্ষ্য উত্তর করে না। দ্বিতী ফের আবার ও রাগে মুখচোখ লাল করে উত্তর করল,
.“ বললাম তো গাড়ি থামাতে। শুনতে পাননি? ”
সাক্ষ্য তাকাল এবারে। ওভাবেই নির্বিকার ভঙ্গিতে চালাতে চালাতে বলল,
“ গাড়ি থামবে না। চুপচাপ বসে থাকুন দ্বিতীকা তাসনিম। ”
দ্বিতী কি বাধ্য মেয়ের মতে বসে থাকবে নাকি সে কথা শুনে? বলল,
“ বসে থাকব না। কি করবেন? ”
সাক্ষ্য হাসল এবারে ঠোঁট বাঁকিয়ে। বলল,
“ কি করলে ভালো হবে? আই মিন, কি করলে খুশি হবেন? ”
“ দেখুন, এভাবে গাড়িতে উঠিয়ে কোথায় নিয়ে চলে যাওয়া কিডন্যাপিং। আমি আমার আম্মু আব্বুকে এক্ষুনিই বলব। ”
সাক্ষ্য এই কথাতেও যেন মজা পেল। বলল,
“ বলুন। প্লিজ। ”

দ্বিতীর কথায় পেরে উঠতে না পেরে রাগ তখন আঁকাশ ছুঁয়েছে। চোখমুখ লালচে। ঐ রাগ রাগ ভাব নিয়েই দ্বিতী দ্রুত ফোন বের করে কল করল মাকেই। তারপর কর রিসিভড হতেই টানটান স্বরে সাক্ষ্যর রাগটা ঢালল মায়ের উপরই। জিজ্ঞস করল,
“ কোথায় তুমি আম্মু? কল তুলতে এতক্ষন লাগল তোমার? আশ্চর্য! ”
দ্বিতীর কন্ঠ শুনেই বুঝা গেল যে রেগে আছে। ওপাশে দ্বিতীর মা ছোটশ্বাস ফেললেন। মেয়ের রাগ বুঝে উঠে বললেন,
“ মাথা ঠান্ডা করে দ্বিতী। কি হয়েছে? ”
দ্বিতীর এবার বলতে গেলে রাগে দুঃখে কান্নাই চলে এল। সবনময় যা চেয়েছে তাই পেয়েছে, সবকিছুতে গুরুত্ব পেয়েছে। অথচ সে দ্বিতীকেই সাক্ষ্য এহসান কোন গুরুত্ব দেয় নি। এইথেকেই পুরুষটির প্রতি আছে সূক্ষ্ম এক ক্ষোভ। আবার সেই পুরুষটি এখন তাকে তার কথা মতো নাচাবে? দ্বিতী মেনে নিবে তা? দ্বিতী ওভাবেই থমথমে মুখে উত্তর করল,
“ কি হয়েছে মানে? হয়নি কি? তুমি জানো কি হয়েছে? কি হয়েছে আম্মু ”
দ্বিতীর মা ছোটশ্বাস ফেললেন। ফের পরমুহূর্তরই কিছু মনে পড়েছে ভঙ্গিতে বললেন,

“ তোকে কতবার কল দিলাম দ্বিতী। ফোন তুলিসনি কেন হুহ? ”
“ ফোন সাইলেন্ট আম্মু। কিন্তু আমার কথা শোনো। আমাকে তোমার বান্ধবীর ছেলে..”
“ হু, ওটাই বলতে চাইছিলাম তোকে দ্বিতী৷ সাক্ষ্য হয়তো তোকে ভার্সিটি থেকে নিয়ে নিবে৷ ওর একটা ফ্রেন্ডের আকদ হচ্ছে। এত করে বলল.., ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকেই জানতে চায়,
“ কি বলল? ”
“ সাক্ষ্যর বন্ধু অনেকবার বলল দ্বিতী। সাজি ও সকাল থেকে বারকয়েক কল করে বলেছে। সাক্ষ্য অবশ্য বলেছে, না গেলেও সমস্যা নেই। অসুবিধা থাকলে না যাওয়াটাই বেটার। পরে আমারই মনে হলো যে, থাক। গিয়ে ঘুরে আয়। দুদিন পর এমনিতেই ওদের হয়ে, ওদের ঘরে চলে যাবি।আর তোরা যেমন, সংসার করলে কিভাবে করবি আমি নিজেই চিন্তায় আছি। তাই তো, ভেবেছি ঘুরে আসলে আর ও ভালোই হবে। বন্ডিংটা মজবুত হবে৷ ”
দ্বিতী দ্বিগুণ রাগল। বলল,

“তো? তুমি তাই বলে রাজি হয়ে যাবে আম্মু? তুমি তো আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে। তোমার সাথে আমি আর কথাই বলব না। ”
“ পাগল! কি বিশ্বাসঘাতকতা করলাম? জামাকাপড় সব গুঁছিয়ে দিয়েছি তাড়া থাকাতে। দেখিস তো সব ঠিক আছে কিনা। কোনকিছু না দিলে তো সমস্যা হবে তোর। ”
“ তুমি থাকো ওসব নিয়ে। আমি ওখানে কি করে থাকব আম্মু? এতদিন? তুমি তোমার মেয়ের সাথেই এই মীরজাফরের মতো আচরণ করলে তুমি? মনে রাখব আমি। ”
এইটুকু বলেই কল রাখল। সাক্ষ্য যেন মজা পেল এতক্ষনকার ঝগড়া শুনে৷ ঠোঁট বাঁকিয়ে জানতে চাইল,
“ কি হলো? চিন্তা করছে আপনার আব্বু আম্মু? ”
দ্বিতী ফুঁসে উঠে জানাল,
” আপনি মানুষটা খুব ধূর্ত ! আপনাকে আমার আম্মু তো আর চিনে উঠতে পারেনি। পেরেছি তো আমি। আমি আপনাকে শিরা উপশিরায় চিনে ফেলেছি বুঝলেন? ”
সাক্ষ্য ফের ঠোঁট বাঁকায়। বাঁকা হেসে মাথা নেড়ে বলল

“ এক্সাক্টলি! আপনি না চিনলে আর কে চিনবে বলুন?”
“ অনেকেই! ”
“ যেমন?”
“ নিধি। ”
সাক্ষ্য এবার ভ্রু বাঁকাল। ফুরফুরে মেজাজটার বারোটা বাজাতে বোধহয় দ্বিতীর এই উত্তরটাই যথেষ্ট। দ্বিতী আবারও উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,
“ নিধির সাথে আপনাকে দারুণ মানায় স্যার। পার্ফেক্ট কাপল। আমি তো ফ্যান আপনাদের। ”
“তাই নাকি? ”
“ ইয়েসস! নিধির সাথে গানটাও কি জোশ গেয়েছেন। নিধির সাথে তো ম্যাচিং ম্যাচিং ড্রেসও পরেন। আপনি জানেন আপনাদের কত সুন্দর মানায় স্যার? আহ! কি সুন্দর কাপল! ”
এভাবে প্রায় অর্ধেক রাস্তা দ্বিতী নিধি আর সাক্ষ্যর প্রশংসাই করে গেল। যেনতেন প্রশংসা নয়। একেবারে মন খুলে প্রশংসা করা। যেন সে সত্যি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছে। সত্যি সত্যিই এই দুইজনের কি বড় ভক্ত। সাক্ষ্য শুনে শুনে কেবল বিরক্ত হলো। একই টপিকে এত কথা শুনে কপাল কুঁচকে এল তার৷ অবশেষে একপ্রকার চাপা রাগই জন্মাল সাক্ষ্যর। ভ্রু বাঁতিয়ে তাকাল। দ্বিতী তখন ফের উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,

“ আচ্ছা আপনি প্রোপোজ করেছেন নিধিকে স্যার? কিভাবে করেছেন? কয় বছর যাবৎ পছন্দ করেন স্যার? ”
দ্বিতী যে ইচ্ছে করেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এসব বকে যাচ্ছে তা বুঝতে বাকি নেই সাক্ষ্যর। তবুও তার রাগ হচ্ছে। নিধিকে নিয়ে এই ধারণা কে ডুকিয়েছে দ্বিতীর মনে তা নিয়েও জন্মার চিড়চিড়ে এক রাগ। সে মোটেই নিধির সাথে ম্যাচিং করে ড্রেস পরে না। আর না তো পছন্ত করে। তবে? এমন একটা ভাবনা এল কি করে? দ্বিতী ফের আবারও বেশ উৎসুক হয়ে বলল,
“ করেন নি এখনো প্রপোজ? ইশশ!করে ফেলুন জলদি। আমরা পাশে আছি। ”
ফের পরমুহূর্তেি আবার বলল,
“ স্যার? নিধিকে আপনি বসে প্রোপোজ করবেন নাকি দাঁড়িয়ে? আর, আর আপনাদের বিয়েটা? কবে করছেন বিয়েটা স্যার? ”
সাক্ষ্য কটমট করে তাকাল। গাড়ি চালানোর মাঝখানেই হুট করে গাড়ি থামাল। অতঃপর ওভাবেই হীমশীতল গলায় বলল,

“ আর একটা কথা বললে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিব দ্বিতী। স্টপ দিস। ”
“ স্টপ কেন? ভার্সিটির জনপ্রিয় কাপল বলে কথা। সবাই বললে দোষ নেই, আমি বললেই দোষ? ”
সাক্ষ্যর চাহনি তখন শীতল। শীতল এক চাহনি ফেলেই জানাল,..
“ হ্যাঁ, আপনি বললেই দোষ৷ আরেকটা কথা বললে আজকে সত্যিই খু’নোখু’নি হবে। দেখে নিবেন। ”
এইটুকু বলার পর সাক্ষ্য আর কিছুই বলল না। থমথমে এক মুখশ্রী নিয়ে সারাটা পথ ড্রাইভ করেছে। অতঃপর নিয়ে এল একটা সাধারণ বাসাতেই। যাতে তালা দেওয়া বাইরে থেকে। সাক্ষ্য শুধু তালাখানা খুলে পা বাড়াল। যেতে যেতে বলল,
“ একই রুমে থাকার সূচনায় স্বাগতম মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। পা ফেলে রুমে এসে উদ্ধার করুন এবারে। ”
দ্বিতী শুধু আশপাশে চাইল। কেউ নেই। অথচ তার মা বলল সাক্ষ্যর বন্ধুর নাকি আকদ? এটা আকদের হাল অবস্থা? নাকি নমুনা?মুহূর্তেই বলল,

দুইজনাতেই পর্ব ১৪

“ এটা আকদের নমুনা নাকি? চালাকি করলেন তাই না? ভদ্র সভ্য রূপ ধরে আমার আব্বু আম্মুকে বোকা বানিয়ে মনে মনে এই কূটনৈতিক পন্থা অনুসরণ করলেন? ছিহ! ”
সাক্ষ্য এবারে হাসল মৃদু। দ্বিতীর আড়ালেই। জানাল,
“ বউ যদি হয় অদিতি আন্টির মেয়ে দ্বিতীকা তাসনিম, তখন এসব পন্থা অনুসরণ করা খারাপ কিছু নয়। ”

দুইজনাতেই পর্ব ১৬