Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৭

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৭

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

আয়মান আর ফিজার বিয়ের পর হিয়া নিজের গ্রামের বাড়িতেই ফিরেছিল। বিয়েতে সেদিন দীপ্রর সাথে অল্প দুয়েক যা কথা হয়েছিল ঐটুকুই। এর বাইরে এই দুইদিন আর কথা হয়নি। দীপ্রকে অবশ্য সেদিন দেখে বেশ আনন্দিতই মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল হিয়ার আকদেন খবরটা পেয়ে দীপ্র সত্যিই খুব, খুব খুশি! হিয়া ঐটুকু ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একই জায়গাতে দাঁড়িয়েই হিয়া খুশি হতে পারেনি। নিজের কাছের বন্ধুর বিয়ের খবর পেয়ে ওর শুধু কান্না পেয়েছিল, সুখ নয়। হিয়ার জন্মদিন আজ।জন্মদিনের এই দিনটা বাড়িটা কাটানোর পাশাপাশি সকাল সকাল তাকে আরো একটা বিষয় জানানো হয়েছে। পাত্রপক্ষ তাকে দেখতে আসছে। সব ঠিক থাকলে হয়তো আজই আকদ পড়িয়ে নিবেন। হিয়া শুধু বুকে পাথর ছাপিয়ে বসে ছিল।

সত্যিই যদি সব ঠিকঠাক হয় তখন? আজ যদি সত্যিই সে অন্য কারোর হয়ে যায়? এইটুকু ভেবেই তো নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে তার। কান্না পাচ্ছে। আচ্ছা, কি এমন হতো যদি দীপ্রর সাথে তার মিল হতো? যদি দীপ্রও তাকে ভালোবাসত? ক্ষতি হতো? আল্লাহ কেন দিল না এই ভাগ্যটুকু? হিয়া ভেবেই টলমল চাহনিতে চাইল আলমারির আয়নার দিকেই। ছিহ! কিসব ভাবছে সে। কেন ভাবছে দীপ্রর কথা? অন্যের জিনিসের প্রতি হিয়া লোভ করছে? ছিহ। না, হিয়া এমন নয়। নিজের চরিত্রকে সবসময় রেখেছে পবিত্র। আর সে হিয়াই কিনা অন্যের ব্যাক্তিগত মানুষকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করবে? ছিহ ছিহ! কি বিশ্রী রকমরন পরিকল্পনা! হিয়া এইটুকু ভেবেই সরল। হাতে থাকা লাল টুকটুকে শাড়িটা হিয়াকে তার আম্মুই দিয়েছে৷ পরার জন্য। হিয়া সে শাড়িটা উল্টেপাল্টে দেখল। অবশেষে মায়ের কথামতো বেশ সুন্দরভাবে শাড়িটা গায়েও জড়াল। কালো পাড়ের লালচে-কালোর মিশ্রনে একটা শাড়ি। যাতে হিয়াকে সত্যিই সুন্দর দেখাচ্ছিল। চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে বেঁধে ছেড়ে দেওয়া। হিয়া ওভাবেই নিষ্প্রভ চাহনিতে কিয়ৎক্ষন তাকাতেই তার আম্মু এসে বলল,

“ হিয়া, পাত্রপক্ষ জানিয়েছে আজকেই তোমাদের আকদটা করে নিবে। তোমার অমত নেই তো এতে? ”
হিয়া চাইল কেমন যেন করে। অমত? অমত করার মতো হিয়ার জীবনে কিচ্ছু আর অবশিষ্টই নেই। কার জন্য অমত করবে সে? হিয়া মৃদু গলায় বলল,
“ কিন্তু এতোটা তাড়াহুড়ো আম্মু? ”
“ পাত্রে কি যেন কাজ আছে। মাঝখানে সময় পাবে না আর। ”
হিয়া মাথা নাড়াল। অতঃপর বলল,
“ ওহ, তোমরা যা ভালো বুঝো তাই করো। আমার সমস্যা নেই। ”
“ পাত্রের ছবি না দেখেই রাজি হয়ে যাচ্ছো? ”
হিয়া মলিন হাসল। ছবি দেখে আর কি করবে? হবে কেউ একজন। বলল,
“ তোমরা যা সিদ্ধান্ত নিবে ভালো সিদ্ধান্তই নিবে। আমার তোমাদের উপর ভরসা আছে আম্মু। ”
” ভেবেচিন্তে বলছো তো? পরে আকদের সময় না টা বলতে পারবে না। ”
” বলব না। ”

হিয়া আর কিছু বলল না। শুধু বুক ভার হয়ে আসে মেয়েটার। কান্নারা দলা পাকিয়ে জমে থাকে হৃদয়ের গহীনে। সত্যিই আজ তার আকদ? দুইদিন আগে দীপ্রকে বলা মিথ্যেটাই সত্যি হয়ে গেল আজ? অবশ্য একদিন না একদিন তো হতেই হতো। তবুও কেন এমন কষ্ট হচ্ছে হিয়ার? হিয়া চোখ বুঝে। লালাভ চক্ষুজোড়া চক্ষুপল্লবের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা চালিয়ে বিড়বিড় করল,
“ দীপ্র? তুই কেন আমার হলি না? কেন আমাকে ভালোবাসলি দীপ্র? কেন ভালো না বেসেও ভালোবাসার মতো অনুভূতি দেখেছিলাম আমি তোর চোখেমুখে? কেন আমি তোকে ভালোবাসতে গেলাম দীপ্র? ভালোবেসেও না পাওয়ার যন্ত্রণা কি ভীষণ পোড়ায়। তুই কি জানিস তা? ”
হিয়া আরো অনেকটা সময় ওভাবে বসে থাকল থম মেরে। অতঃপর কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিয়ে কল দিল দীপ্রকেই। ওপাশ থেকে কল রিসিভড হতেই অযুহাত দিয়ে বলল,
“ ভুলে চলে গিয়েছে কলটা দীপ্র৷ ”
“ ভুলে? ”
“ অন্য একজনকে কল দিচ্ছিলাম। কিভাবে যেন তোর কাছে চলে গিয়েছে। ”

দীপ্র হাসল মৃদু। আজ হিয়ার জন্মদিন। প্রত্যেকবার আগ বাড়িয়ে বারোটায় উইশ করলেও এবার দীপ্র উইশ করেনি। এই বিষয়টাও অবশ্য হিয়ার মন খারাপের অন্যতম এক কারণ। নিজের বউ নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে বন্ধুর বার্থডে ভুলে গেছে? অবশ্য ভুলে যাওয়াটাও বিস্ময়কর কিছু না। প্রেমে পড়ে মানুষ কতকিছু ভুলে যায়। দীপ্রর উত্তর এল,
“ ভুলে কল এলে কল রেখে দে। শুধু শুধু ব্যালেন্স শেষ করে লাভ আছে কোন? ”
অথচ হিয়া তবুও কল রাখল না। আরো কিছুটা সময় কানে ফোন চেপে বসে রইল। দীপ্রর কথা কত স্বাভাবিক। আজ যে হিয়ার জন্মদিন তা হয়তো মনেই নেই। হিয়া ফোন রাখল। তাচ্ছিল্য হেসে আওড়াল,
“ সময়ের সাথে সাথে মানুষের গুরুত্ব ও কি সুন্দরভাবে বদলায়! গুরুত্বের শীর্ষ থেকে একেবারে তলানিতে পড়লেও অবাক হওয়ার মতো কিচ্ছু না। ”

হিয়াকে দেখতে পাত্রপক্ষ একটু আগেই এসে হাজির হয়েছে। হিয়া অবশ্য তখনও নিজের রুমে। একটু পরই বোধহয় নিয়ে যাওয়া হবে তাকে। হিয়া নিজেকে এতোটা সময় শান্ত রেখে প্রস্তুত করেছে একটু একটু করে। মনেপ্রানে মেনে নিয়েছে জীবনে যেটা পাবেই না তা নিয়ে আফসোস করে কি লাভ? জীবনে যত সম্ভব কত আফসোস রাখতে হবে। তবুও আফসোস তো থাকেই। জীবনের বাঁকে বাঁকেই কতশত না পাওয়া আফসোস থেকে যায়।
ঠিক একটু পরই হিয়াকে নেওয়া হলো পাত্রপক্ষের সামনে।ভাবীর পাশেই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ানো। হিয়া মুখ তুলে তাকায়নি তখনও। ওভাবেই নিচের দিকে মুখ করে চেয়ে আছে। দীপ্র বোধহয় এই প্রথম প্রেয়সীকে পাত্রীরূপে দেখে সোফায় হেলান দিয়ে চাইল। মুখে ফুটল অদ্ভুত এক হাসি। ইশশ! কতকাল অপেক্ষা করেছে সে এই দিনটার জন্য। কতকাল বুকের ভেতর একটা অল্পস্বল্প ডানা ঝাপটানো অনুভূতিকে লালন করেছে। দীপ্র হাসে। মুখে হাত দিয়ে খুব সূক্ষ্ম নজরেই পরখ করল হিয়াকে। তখনও তাকায়নি মেয়েটা। দীপ্র কেবল অপেক্ষা করছিল কখন তাকাবে। হিয়ার রিয়্যাকশন কি হবে তা দেখার জন্য। অপরদিকর হিয়া মনের ভেতর এক অসহ্যকর অনুভূতি চেপে রেখেই এখানে বসে আছে। মনেপ্রাণে চেষ্টা করছে এই অসহ্যকর অনুভূতিটাকে সহ্য করে নিতে। অথচ পারছে কোথায়? ওর কেবল কান্না পাচ্ছে যেন। কেবল মনে হচ্ছে ও কারোর হলে, ঐ মানুষটাকে কক্ষনো ভালোবাসতে পারবে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে হিয়ার সত্যিই ইচ্ছে হচ্ছে দীপ্রর কাছে আকুতি করর বলতে যে, সে দীপ্রকে ভালোবাসে। দীপ্রর যদি মন গলে? যদি তাকে ভালোবাসে? এইটুকু ভেবেই ফের আবার ঘৃণা হলো নিজের প্রতি। ছিহ! কিসব ভাবছে। যে মানুষটা অন্য কারোর তাকে নিয়ে ভাবাও অন্যায়। হিয়া নিজেকে যথাসম্ভব চেষ্টা করল শান্ত রাখতে। কিন্তু হৃদয় তখনই চরমরূপে উত্তাল হলো যখন কানে এল,

“ ওভাবে মুখ নামিয়ে রাখলে মুখ দেখব কি করে আম্মু? একটু তো মুখ তোল। আমাদেরও তাকিয়ে দেখ।”
কন্ঠটা দীপ্রর মায়ের। হিয়া চেনে এই কন্ঠটা। মুহূর্তরই চোখ তুলে তাকাল ওদিক পানেই। হ্যাঁ। দীপ্রর আম্মুই তো। পাশাপাশি দীপ্রর আব্বু, দীপ্র চাচা-চাচী এবং দীপ্রর সে কাজিনটাও। হিয়ার বুক কাঁপে। উনারা কেন? উনারাই কি পাত্রপক্ষ? পাত্র কে তাহলে? দীপ্র? নাকি দীপ্রর কোন কাজিন? এইটুকু ভাবনা মাথায় নিয়েই একে একে দীপ্রর পরিবারের সবাইকে দেখতেই পাশ থেকে ভেসে এল আরো একটা কন্ঠস্বর,
“ আমার দিকেও তাকান মিস হিয়া। তাকাবেন না? ”

এই কন্ঠটা শুনে হিয়ার চোখেমুখে আরো বিস্ময় বয়ে গেল। দীপ্রর কন্ঠ! মুহূর্তেই চাইল। চোখে মুখে তীব্র বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। দীপ্রর চোখেমুখে হাসি। বোধহয় হিয়ার বিস্ময়টা দেখে মজা পাচ্ছিল সে। দীপ্র মুচকি হাসল হিয়ার বিস্ময় ভরা চাহনি দেখে। এক পা এক পা করে এগিয়ে হিয়ার সামনে দাঁড়িয়েই আচমকা হাঁটু গেড়ে বসল হিয়ার সামনেই। অতঃপর হিয়ার সবচাইতে পছন্দের গন্ধরাজ ফুল এগিয়ে ধরেই মুচকি হেসে বলল,
“ আমার বউ হবেন মিস হিয়া? একদম মাথায় করে রাখব। একটা সংসার পাতবেন আমার সাথে? প্লিজ..”
হিয়ার বুকের ভেতর তখন উত্তাল ঢেউ। যে পুরুষটার জন্য এত দুঃখ, এত দীর্ঘশ্বাস, এত কষ্ট সেই পুরুষটাই চোখেমুখে হাসি নিয়ে তার সামনে বসে আছে। আবেদন রেখেছে তারই অতি কাঙ্ক্ষিত এক বিষয়বস্তু নিয়ে। হিয়ার ঠোঁট কাঁপে। এতক্ষনে ধরে চেপে রাখা কান্নাটা আর বোধহয় ধরে রাখা গেল না। টলমল করা চোখজোড়া মুহূর্তেই নেমে এল নোনা পানির স্রোত। দীপ্র দেখে তা। দেখেই বলল,
“ আমি আপনাকে কাঁদানোর জন্য আসিনি হিয়া৷ আমি আপনাকে আমার করে নিতে এসেছি। অনুমতি দিন। ”
হিয়া তখনও স্থির দাঁড়িয়ে। দীপ্র কি মজা করছে? হিয়া তখনও ওভাবেই কান্নারত চোখে দাঁড়িয়ে। দীপ্র আবারও বলল,

“ অনুমতি দিবেন না? বউ হবেন না আমার? ”
এবারেও হিয়ার উত্তর না পেয়ে দীপ্র ছোটশ্বাস ফেলল। কান ধরে বলল,
“ এতদিনের সব মিথ্যের জন্য সরি। তুই বললে কান ধরে উঠবসও করব হিয়া। তবুও রাজি হয়ে যা। আমার বউ হয়ে যা একটাবার। দেখবি, আর কোন মিথ্যে বলব না। শুধু ভালোবাসব। ”
উপস্থিত বাকিরা তখন হাসছিল। অথচ হিয়ার তখন কান্না পাচ্ছে। রাগে ক্ষোভে ইচ্ছে হচ্ছিল দীপ্রর মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। হিয়া আর দাঁড়াতে চাইল না৷ কান্না আটকিয়ে মুখ ফিরিয়ে পা চালাতে চাইল নিজেরই ঘরের দিকে। অথচ তার আগেই দীপ্র হাত চেপে ধরল। বলল,
“ আন্টি আপনার মেয়ে এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেন? আমি কিন্তু আজকে আকদ শেষ করে তারপরই বাসায় ফিরব। নয়তো যাব না৷ ”
হিয়া হাতটা টেনে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিতে চাইল যেন৷ ঠিক তখনই হিয়ার সামনে এল দীপ্রর কাজিনটা। একই ভাবেই কানে ধরে বলল,

“ সরি সরি সরি ভাবি। প্ল্যানটা আমারই ছিল। প্ল্যানটা আমিই দিয়েছিলাস তোমার মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা শুনানোর জন্য। কিন্তু তুমি তো এত চাপা স্বভাবের যে কিছুই বললা না। দীপ্রর হয়ে আমি সরি৷ ক্ষমা কনে দাও। ”
হিয়া শুনল। মেয়েটা ফের আবারও বলল,
“ কি হলো? ক্ষমা করবে না? ”
হিয়া এবারে উত্তর করল,
“ তোমাকে করেছি। কিন্তু দীপ্রকে আমি ক্ষমা করতে পারব না। ও যা করেছে তাতে ক্ষমা মিলে না। ”
দীপ্রর মুখটা এবার ফ্যাকাসে হয়ে এল। হিয়া যা শক্ত মনের মেয়ে। দেখা গেল আজীবনেও ক্ষমা করবে না। দীপ্রকেও মেনে নিবে না। তখন? তখন কি করবে? দীপ্র অসহায় গলাতেই বলল,
“ ওর বেলায় মিললে আমার বেলায় মিলবেেনা কেন ক্ষমা? ”
“ কারণ, তুই জঘন্যরকমের অন্যায় করেছিস দীপ্র। আমার অনুভূতি বুঝে উঠতে পেরে জেনেবুঝেই কষ্ট দিয়েছিস আমাকে।”

“ আর দিব না। ”
হিয়া তবুও উত্তর করল না। দীপ্র এবারে ছোটশ্বাস ফেলে। বলল,
“ ওকে, ক্ষমা না মিললে শাস্তি দে আমাকে। তবুও আমার হয়ে যা। আজীবন আমার হয়ে থাকার শাস্তিটা দিয়ে দে, মাথা পেতে নিব। ”
হিয়া শুধু চাইল। তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েই মুখটা থমথমে করে চলে গেল নিজের ঘরে। এর পরের মুহূর্তটা হিয়াকে বুঝাতে বুঝাতেই গেল। হিয়ার মা বাবা, দীপ্রর মা বাবা সবাই রাজি করানোর পর হিয়া রাজি হলো। অতঃপর এক রোদেলা দুপুরে দীপ্র এবং হিয়া দুইজনই দুইজনের হয়ে আবদ্ধ হলো। বিয়ে নামক পবিত্র এক সম্পর্কে জড়াল। দীপ্রর তখন সুখ সুখ অনুভব। হৃদয়ে অদ্ভুত শান্তি। অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয়। দীপ্র তা এখন খুব ভালোভাবেই বুঝে উঠতে পারছে।
দীপ্র আর হিয়ার আকদ অনুষ্ঠানের পরই দুইজনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়া হয়েছিল। হিয়া তখন থমথমে মুখে একপাশটায় বসা। আর দীপ্র একটু একটু করে এগিয়ে ফ্লোরে বসল একদম হিয়ার কাছেই মুখোমুখি হয়ে।অতঃপর হিয়ার কোলে থাকা হাতটা আগলে ধরে বলল,

“ সত্যি আর করব না। সরি। এবারের মতো ক্ষমা করে দে হিয়া। ”
হিয়া এবারও উত্তর করল না। দীপ্র আবারও বলল,
“ হিয়া, কথা বলবি না আমার সাথে? ভালোবাসি তো তোকে। এভাবে কথা না বললে আমার কষ্ট হয় খুব। কথা বল না…”
“ এই হিয়া.. ”
হিয়া রাগে দুঃখে না পেরে হাত সরিয়ে নিল। বলল,
“ আমি তোর সাথে আর জীবনেও কথা বলব না দীপ্র। তুই আমায় কষ্ট দিয়েছিস। অনেক বেশিই!”
দীপ্রর মুখটা এবারেও ফ্যাকাসে হয়ে এল। বলল,
“ সত্যিই সরি তো। একটাবার ক্ষমা করে দে। কথা দিচ্ছি, আর কখনো কষ্ট দিব না হিয়া। এই হিয়া..তুই কথা না বললে আমার অস্থির লাগে। এতগুলো দিন যে যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছিলে এটাও খুব কষ্টে সহ্য করছিলাম আমি। শুধু তোর জন্মদিনের অপেক্ষায় ছিলাম.. ভাবলাম মন খুলে কথা বলব। কিন্তু এখন তুই বলছিস কথাই বলবি না? ”
হিয়া এবারে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল যেন। ঠোঁট কামড়ে কান্না দমানোর চেষ্টাই করেই বলে উঠল,
“ তুই একটা বেয়াদব দীপ্র। একটা অসহ্যকর জন্তু তুই। তোকে আমি সহ্য করতে পারছি না। আর একটা কথা বললে তোকে আমি ঠেলে বেলকনি দিয়ে ফেলে দিব। ”

দীপ্র হাসল এবারে। বলল,
“ পারবি আমায় ঠেলে ফেলতে? তুই নিজেই তো পাটকাঠি হিয়া। ”
“ আমি আজীবন মনে রাখব তুই আমায় কষ্ট দিয়েছিস। ”
দীপ্র হাসে। হিয়ার যে হাতটা ধরে ছিল ঐ হাতটাতেই নিজের পুরু ঠোঁটজোড়া ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“ আমিও আজীবন মনে রাখব, কেউ একজন আমায় ভালোবেসে কেঁদেছিল। ”

মাঝখানে কেঁটেছে প্রায় তিনটে বছর। আদ্র এই কয়েকটা বছর কারাগারে বন্দি থাকতে থাকতে বোধহয় বাইরের রঙিন দৃশ্যগুলো ভুলেই গিয়েছিল সে। শুধু চোখে ফুটছে সেসব অন্ধকার স্মৃতিই। আদ্র হাসল মৃদ। পাশে দাঁড়ানো সাইয়ারা মেহজাবীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ একজন অপরাধীকে এতোটা সাপোর্ট দেওয়ার কারণ কি মিস সাইয়ারা মেহজাবীন? ”
সাইয়ারা হাসর মৃদু। বলল,
“ যাদের সাপোর্ট দেওয়র দুনিয়াতে কেউ থাকে না তাদের কেউ না কেউ একজন সাপোর্ট করার জন্য থাকতে হয়। আমিও করলাম একটু আধটু সাপোর্ট। জেল থেকে প্রথম ছাড়া পেয়ে কেমন লাগছে আদ্র? ”
আদ্র তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। উত্তর করতে ইচ্ছে হলো না। তবে এই যে ছাড়া পেল এতগুলো দিন পর। ওর ইচ্ছে হচ্ছে এখনই মায়ের কবরে ছুটে যাক। একটা বার মায়ের কবর ছুঁয়ে কান্না করুক। একটাবার মাকে সবটা কথা জানাক হৃদয়ে। সব যন্ত্রনা, সব কষ্ট সব উগড়ে দিয়ে কেঁদে ফেলুক বাচ্চাদের মতো। আদ্র চোখ বুঝে। সাইয়ারা আবারও বলল,

“ আমি চাইলে আপনাকে অনেক আগেই জামিন করাতে পারতাম আদ্র। কঠিন না আমার জন্য। এখান থেকে ট্রান্সফার ও হয়েছি বেশ অনেক মাস। মাঝেমাঝেই আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। কিন্তু আপনাকে ছাড়াইনি কেন জানেন? কারণ আপনি ছাড়া পেয়েই বসে থাকবেন না। হয় আপনার বাবা, নয়তো বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী যে কারোর জন্যই আক্রমনাত্মক হয়ে ফিরবেন। ”
আদ্র হাসে। বলে,
“ এখন ফিরব না কে বলল আপনাকে?”
“ এখন আপনার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী দেশেই নেই আদ্র। সম্ভবত দেশের বাইরে। আর আপনার বাবা শয্যাশায়ী। তাকে আর কিই বা মারবেন? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৬

“ শয্যাশায়ী তো কবে থেকেই। মরে না কেন ঐ জানোয়ার? ”
“ কৃতকর্মের ফল ভোগ করছে বোধহয়। ”
আদ্র শুনল। কৃতকর্ম? কৃতকর্মের ফল ভোগ করছে? তার আম্মুকে মেরে ফেলে এখন কৃতকর্মের ফল ভোগ করে কি লাভ হ্যাঁ?

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৮