Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪১

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪১

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪১
নওরিন কবির তিশা

শ্রাবণের উন্মাতাল বর্ষণ স্তিমিত হয়ে এলেও রাজধানীর রাজপথে তার রেশ রয়ে গিয়েছে এখনো। পিচঢালা কালো পথগুলো বৃষ্টির পরশে সিক্ত; ধুলোবালিহীন বাতাসের এক প্রশান্ত শীতলতা মহানগরীর গুমোট ভাবটাকে অনেকটা ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে।
মেহেসানা ধীর পায়ে ফুটপাত ধরে এগোচ্ছে। গত এক মাস ওর ওপর দিয়ে যেন রীতিমতো কালবৈশাখীর তান্ডব বয়ে গিয়েছে। মা ভীষণ অসুস্থ ছিলেন, হাসপাতালের সেই উৎকণ্ঠা মিশ্রিত লড়াই ওকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বড্ড ক্লান্ত করে ফেলেছে। দুদিন হলো মাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ও নিজের প্রাত্যহিক জীবনে ফিরছে, কিন্তু হৃদয়ের কোথাও যেন একরাশ শূন্যতা আর শ্রান্তি বাসা বেঁধে আছে‌ এখনো।

সহসা এক কর্ণবিদারী ব্রেক কষার শব্দ মেহেসানার চিন্তার জাল ছি’ন্নভি’ন্ন করলো। চমকে উঠে ও দেখল, একটি ধবধবে সাদা রঙের বিলাসবহুল গাড়ি ওর ঠিক সামনেই উদ্ধত ভঙ্গিতে এসে থেমেছে। চাকার ঘর্ষণে রাস্তার জমে থাকা বৃষ্টির জল ছিটে এসে মেহেসানার ওড়নার এক কোণে লাগল। ও বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে পাশ কাটিয়ে যেতে উদ্যত হতেই গাড়ির দরজা খুলে গেল।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘদেহী পুরুষ; পরনে ল্যাভেন্ডার রঙা লিনেন শার্ট, হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো, আর চোখে সেই চিরচেনা ব্ল্যাক অ্যাভিয়েটর। আদ্রিয়ান নিজের চশমাটা এক আঙুলে সামান্য নামিয়ে তেরছাভাবে মেহেসানার দিকে তাকাল; তীব্রভাবে আকর্ষক দৃষ্টি মেলে আদ্রিয়ান আলস্যভরে গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে চাবির রিংটা ঘোরাতে ঘোরাতে ভরাট স্বরে বলল,
“কী হলো মিস সাউন্ডবক্স? এই এক মাসে কি আপনার গলার ব্যাটারি একদম লো হয়ে গিয়েছে? রাস্তার মাঝখানে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে একটু শব্দ করুন দেখি, আপনার ওই ক্যাসেট প্লেয়ারের আওয়াজ শুনে তো কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড় হওয়ার কথা ছিল!”

মেহেসানার ইচ্ছা করছে আদ্রিয়ান কে থাপড়িয়ে সোজা করে দিতে কিন্তু মাঝ রাস্তায় কোনোরুপ সিনক্রিয়েট করতে নারাজ ও; কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে নিজের ব্যাগের ফিতেটা শক্ত করে চেপে ধরে ত্যাড়া স্বরে পালটা জবাব দিয়ে ও বলল,
“আপনি কি রাস্তার মোড়ে মোড়ে ডিউটি নেওয়ার পারমিট পেয়েছেন নাকি মিস্টার ল্যাম্পপোস্ট? আর আমার ব্যাটারি লো না হাই, সেটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।”
আদ্রিয়ান এবার বাঁকা হাসল। চশমাটা পুরোপুরি খুলে শার্টের কলারে ঝুলিয়ে রেখে ও এক কদম এগিয়ে এল মেহেসানার দিকে। নিচু স্বরে বলল,
“এটাই তো আপনার সমস্যা ম্যাডাম।যাইহোক শুনেছি আপনার আম্মা অসুস্থ ছিলেন? তা কেমন আছেন উনি?”
আদ্রিয়ানের গলায় চিরচেনা বিদ্রূপ থাকলেও, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন উদ্বেগটুকু মেহেসানার কান এড়াতে পারল না। ও ওড়না সামলে নিয়ে গজগজ করতে করতে বললো,,

“মা ভালো আছেন।এখন পথ ছাড়ুন, আমার কাজ আছে।”
আদ্রিয়ান এবার এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে মেহেসানার দিকে এক আজ্ঞাবহ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,,
“কাজ তো আমারও আছে মিস। কিন্তু আমি যখন এসেছি তখন আপনার আর কাজ দেখানো সাজেনা। তাই চুপচাপ ভেতরে এসে বসুন, নাকি ওই পাবলিক বাসের ধস্তাধস্তি খাওয়ার ইচ্ছা আছে?”
মেহেসানা বড্ড ক্লান্ত ইদানিং, কথা বাড়াতে একটুও ইচ্ছা করে না ওর। তাই চিরাচরিত ঝগড়াটা এক কোণে তুলে রেখে গাড়িতে উঠে বসলো ও। আদ্রিয়ান কিঞ্চিত বিস্ময়াভিভূত। সার্বক্ষণিক ঝগড়া করা মেয়েটার এমন শান্ত রুপ সহ্য হলো না ওর। ভেতরে বসে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ও একঝলক মেহেসানার দিকে ফিরল,,
“আর ইউ্য ওকে?”
মেহেসানা বড্ড ক্লান্ত ভঙ্গিমায় ওর দিকে তাকালো,“হুম।”
“বাট আমার তো মনে হচ্ছে না।”
“মানে?”
“আপনাকে এতো শান্ত ভাবে ভালো লাগছে না।”

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো মেহসানা। মায়ের চিন্তায় এতটাই ব্যাকুল ও যে নিজেকে সময় দেওয়ার একদন্ড সময় নেই ওর কাছে। অথচ বিগত এক মাস যাবত হাসপাতালের গুমোটবদ্ধ পরিবেশে থেকে নিজের শরীরের অবস্থা ও খারাপ ওর। কিন্তু বলবে কাকে? বাবা মাকে নিয়ে ব্যস্ত, আর ওর তো কোন বড় ভাই বোন ও নাই। তার ওপর বয়স বেড়েছে বিয়ের জন্য চাপ কম নয় পরিবার থেকে। সবকিছু মিলিয়ে বড্ড ক্লান্ত লাগছে ওর। ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। এদিকে ওকে এমন নিশ্চুপ দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল আদ্রিয়ান। উদ্বেগ মিশ্রিত কন্ঠে ও ফের শুধালো,,
“কি হল কথা বলছেন না কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”
মেহেসানা প্রত্যুত্তর করলো না কেবল না বোধক মাথা নাড়িয়ে বোঝালো ওর খারাপ লাগছে না। তবে আদ্রিয়ানের দৃষ্টি এড়ালো না ওর ক্লান্ততা। ও কথা না বাড়িয়ে গাড়িটা অন্যদিকে ঘোরালো। মেহেসানা প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মেলতেই আদ্রিয়ান ইশারায় ওকে শান্ত করল।

ক্ষনিকের ব্যবধানে দূর্বার গতিতে চলমান গাড়িটার বেগ বনানীর আভিজাত্যে ঘেরা এক নিভৃত কফি শপের সামনে এসে স্তিমিত হলো। মেহেসানা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আশেপাশে দৃষ্টি বুলাতে তৎপর। আদ্রিয়ান কোনো বাক্যব্যয় না করেই নেমে এসে মেহেসানার দিকের দরজাটা খুলে দিল। মেহেসানা বিস্মিত কণ্ঠে বলল,,
“এইখানে কেনো?”
“নামুন আগে।”
“কিন্তু?”
“আরে নামুন মিস,ঘুরতেই এসেছি কিডন্যাপ করি নি আপনাকে।”
“বাট!”
“আবার!”—— আদ্রিয়ান এইবার একমুহূর্ত স্থির রইলো না। একপ্রকার টেনে বের করে আনল মেহেসানাকে। মেহেসানাও আজ বারণ করলো না। কেনো? মন খারাপ বলে নাকি এই মানুষটার পাশে স্বস্তি অনুভব করছে? কি জানি!
ভেতরে প্রবেশ করল চড়ুই যুগল। কাঁচের এপারের সোনালি আলোকছটায় মোড়ানো ক্যাফেটির শান্ত পরিবেশ এক লহমায় মেহেসানার অবসাদগ্রস্ত মনকে দোলা দিল;কফির তীব্র সুবাস আর মৃদু যন্ত্রসংগীত স্নায়ুগুলোকে শীতল করে দিল। কোণের একটি নিভৃত টেবিলে বসলো ওরা।

আদ্রিয়ান মেনু কার্ডটা একপাশে রেখে মেহেসানার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। মেহেসানা ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার বাইরে দ্রুতগামী শহরের দিকে চেয়ে বিরক্তির সুরে বলল,
“এখানে নিয়ে আসার মানে কী? আমি বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম।”
আদ্রিয়ান টেবিলের ওপর দুই হাত আড়াআড়ি করে রেখে একটু হাসল,
“আপনার চেহারা দেখলে মনে হচ্ছে কেউ আপনাকে চিবিয়ে গিলে ফেলেছে। স্রেফ এক কাপ কফি খান, আপনার ওই হ্যাংওভার মার্কা মুখটা অন্তত মানুষের পর্যায়ে আসুক।”
মেহেসানা তেড়েফুঁসে উঠতে গিয়েও দমে গেল। আদ্রিয়ান এবার ওর দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে এসে আকস্মিক কোমল কন্ঠে বলল,
“মিস সাউন্ডবক্স, অনেক তো একা লড়াই করলেন। মাঝে মাঝে রিলাক্স করা অপরাধ না।”
মেহেসানা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই আদ্রিয়ান অত্যন্ত সহজভাবে টেবিলের ওপর রাখা মেহেসানার বরফশীতল হাত দুটোর ওপর নিজের উষ্ণ তালু রাখল। আকস্মিক এই স্পর্শে মেহেসানার বুকের ভেতরটা যেন ছলকে উঠলো, ও কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠে হাত সরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু আদ্রিয়ান ওর হাতটা আরও একটু দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল।এক সমুদ্র সমান আশ্বাসের সহিত মৃদু হেসে বলল,,

“এই যে হাত দুটো কাঁপছে কেন? নিজেকে বড্ড একা মনে হয়, তাই না? লিসেন মেহেসানা, আই অ্যাম নট জাস্ট আ আর্গুমেন্টেটিভ লাইক ইয়্যু । আপনার এই খারাপ সময়গুলোতে পাশে থাকার মতো কাঁধ আমার আছে। আপনি ঝগড়া করতে পারেন, কিন্তু নিজের যত্ন নিতে ভুলে যাবেন না। এই এক মাসে আপনার চোখের নিচে বড্ড বেশি কালী পড়েছে। আই রিয়ালি মিস দ্যাট চনমনে মেহেসানা।”
আদ্রিয়ানের যত্নশীল সোজাসাপ্টা কথাগুলো মেহেসানার সবটুকু প্রতিরোধ মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিল। ও এক পলক আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ হাতের দিকে তাকালো, তারপর মাথা নুইয়ে অগোচরে নিজের নেত্র কার্নিশে জমে ওঠা জলটুকু আড়াল করার চেষ্টা করল। আজ আর কোনো পালটা যুক্তি নেই, কোনো ত্যাড়া কথা নেই; কেবল এক নিবিড় প্রশান্তি যেন চরাচর গ্রাস করে নিচ্ছে।

মৃদুমন্দ ও শীতল হাওয়া বইছে; বৃষ্টির দেখা নেই। আকাশজুড়ে মেঘেদের অলস মন্থর গমনে সূর্য আজ বড্ড ম্রিয়মাণ; তার তেজহীন কিরণচ্ছটা গাছের ঘন পল্লবের ফাঁক গলে মেঠো পথে আলপনা আঁকছে। বর্ষণের আর্দ্রতায় এক অদ্ভুত নাতিশীতোষ্ণ প্রশান্তি চারদিকে। প্রতিদিনের ন্যায় আজও অপরাহ্নে ঘুরতে বেড়িয়েছে তৃষা। তবে সঙ্গে আজ ভিন্ন জন। টুইংকেল আর‌ আর্য; মূলত টুইংকেলকে গ্রামে ঘুরতে নিয়ে বেরিয়েছে তৃষা আর ওদের পিছু নিয়েছে আর্য।
কাঁদাজলে সিক্ত মেঠো পথ ধরে হাঁটছে ওরা।তৃষার হাত ধরে ছোট ছোট পায়ে কাদার আল এড়িয়ে হাঁটছে টুইংকেল। দুপাশে ধানখেতের দোদুল্যমান রাশি রাশি সবুজের সমারোহ। টুইংকেলের বিস্ময় যেন বাঁধ মানছে না। বিশাল দিঘির জলে কচুরিপানার বেগুনি ফুলগুলো বড্ড অপরিচিত ওর। টুইংকেল বড় বড় চোখ মেলে তৃষার পানে চেয়ে মুগ্ধ স্বরে বলে উঠল,

“ও বানি! লুক অ্যাট দিস! ইটস রিয়েলি লাইক আ স্টোরি বুক! আচ্ছা বানি? ওগুলো কি?”
তৃষা টুইংকেলের প্রশ্নাত্মক দৃষ্টির নিষ্পাপ বিস্ময় দেখে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি হেসে বলল,
“ওগুলোকে ধান বলে সোনা। আমরা যে ভাত খাই ওগুলো এখান থেকে হয়।”
“ওওওও। কিন্তু এগুলো তো গোল্ডেন গোল্ডেন আমরা তো হোয়াইট কালার ভাত খাই।”
টুইংকেল এর এমন কথা রে না হেসে পারল না তৃষা,,
“কারণ ওখানে এগুলোকে আরো অনেক প্রসেস করে তারপর নেওয়া হয় মা।”
টুইংকেল এবার বুঝদারের মতো বললো, “ওহ, আচ্ছা।”
“হ্যাঁ মাম্মাম,ভালো লাগছে তোমার?”
“ভীষণ!আই লাভ দিস সো মাচ!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে আর্যর ভরাট আর কিছুটা শ্লেষাত্মক কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“হুমমম… ভালো তো সবই লাগছে কিন্তু কেউ একজন আমারও হাত ধরে সঙ্গ দিলে আরো ভালো লাগতো। কি বলো মাম্মাম?”
আর্যর এমন কথায় টুইংকেল পিছু ঘুরলো। ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক এত মারপ্যাঁচ বুঝলো না। সরাসরি প্রশ্ন করে বলল,,

“আচ্ছা পাপা বানি তাহলে তোমারও হাত ধরবে?”
আর্য সঙ্গে সঙ্গে প্রফুল্ল কন্ঠে বলল,, “হ্যোয়্যাই নট মাম্মা।”
পরক্ষণেই তৃষার দিকে তাকিয়ে ও বলল,, “মানে যদি সে চায় আর কি। আমার কোনো আপত্তি নাই।”
তৃষা ঘাড় ঘুরিয়ে আর্যর দিকে একবার রাগান্বিত চাউনি নিক্ষেপ করতেই আর্য তৎক্ষণাৎ ঠোটে কর্নিষ্ঠা আঙ্গুল ঠেকিয়ে চুপ করলো। তবে টুইংকেল ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। ও তৃষার দিকে ফিরে আবদারের স্বরে বলল,,
“ও বানি, তুমি পাপার হাতটাও ধরো না। না হলে পাপা যদি হারিয়ে যায়। ও তো গ্রামের কিচ্ছু চেনে না।”
“তোমার পাপা বাচ্চা নয় সোনা, হারিয়ে গেলে ঠিকই ফিরে আসতে পারবে। চলো আমরা ওই দিকটায় যাই।”
তৃষা আর একটিবারও ফিরল না আর্যর দিকে। গটগট পায়ে টুইকেলকে নিয়ে হাঁটতে লাগলো। ঠিক তখনই আরিশা আর ওর বান্ধবীরা একরাশ চঞ্চলতা নিয়ে ঝড়ের বেগে সেখানে উদয় হলো। আরিশা এসেই টুইংকেলের গাল টিপে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“ওহ,মাই লিটল ডল। পিপি, তুমি বরং ফুপ্পার সাথে একটু ঘুরে আসো, আমরা টুইংকেলকে নিয়ে ওদিকের শিমুল বাগানে যাই? ওখানে এখন ঝাঁক বেঁধে পাখি আসে। ওকে আমাদের কাছে দাও না প্লিজ!”
তৃষা কিঞ্চিৎ দ্বিধান্বিত হয়ে বাধা দিতে চাইল,
“আরে না, ও একা পারবে না তো…।”
কিন্তু আরিশা কোনো কথা না শুনেই টুইংকেলকে জাপটে ধরে হাসিমুখে বলল,
“আরে আমরা আছি তো! চলো সুইটি, তোমাকে গ্রামের সিক্রেট জঙ্গল দেখাব!”
তৃষা কিছু বলার অবকাশ পাওয়ার আগেই ওরা টুইংকেলকে নিয়ে চঞ্চলা হরিণীর মতো দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল। বিজন মেঠো পথে এবার কেবল রয়ে গেল আর্য আর তৃষা। বাতাসের শোঁ শোঁ ধ্বনির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে তৃষার ওড়নার আঁচল।ও অস্বস্তিতে পড়ে দ্রুত পায়ে এগোতে চাইল; ঠিক সেই মুহূর্তে একটা মৃদু টান অনুভব করল ও। ফিরে তাকাতেই দেখল, আর্য ওর ওড়নার এক কোণ আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
তৃষা এক হ্যাঁচকা টানে ওড়নাটা ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও ব্যর্থ হলো আর্যর বলিষ্ঠ বন্ধনের দরুন; ও কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

“হোয়্যাট ইজ্য দিস? রাস্তার মাঝখানে এসব কী ধরনের অসভ্যতা!”
আর্য এক কদম এগিয়ে এসে তৃষার চোখের দিকে তাকিয়ে ভরাট গলায় বলল,
“অসভ্যতা কোথায় দেখলে? আমি তো জাস্ট আমার গাইডকে রিকোয়েস্ট করছি। আই মিন, এই নির্জন গ্রাম, এই মেঠো পথ।আমি যদি পথ হারিয়ে ফেলি। তাই বলছি তুমি একটু ঘুরিয়ে দেখাও।”
তৃষা ত্যাড়া স্বরে জবাব দিল,
“মাথা খারাপ! আমার এত ফালতু টাইম নাই। ম্যাপ দেখে পথ চিনে নিন যান। এখন ছাড়ুন আমায়।”
“ইটস নট অ্যাবাউট দ্য ম্যাপ, তৃষা। ইটস অ্যাবাউট ইউ্য। তোমার গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে চাইছি, উইথ ইউ। ডোন্ট বি সো হার্ড অন মি।”
তৃষা বিরক্তিমাখা চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল,

“দেখুন, দ্যিস ইজ্য ভিলেজ সাইড। এখানকার মানুষ কিন্তু খুব কনজারভেটিভ। সো, বিহেভ ইউরসেলফ!”
আর্য হাসতে হাসতে বলল, “ওহ কাম অন, মাই লাভ।রোম্যান্স কি আর লোকেশন দেখে হয়? ইট’স আ স্টেট অফ মাইন্ড। আর তাছাড়া, তোমার মতো সুন্দরী সঙ্গিনী থাকায় এই কাদা-মাখা রাস্তাটাকেও তো হাইওয়ে মনে হচ্ছে।”
তৃষা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে কলস কাঁখে এক মাঝবয়সী মহিলাকে আসতে দেখলো ও। মহিলাটি পার্শ্ববর্তী কলপাড় থেকে পানি নিয়ে ফিরছিলেন , কিন্তু মাঝপথে আর্য আর তৃষার এই দৃশ্য দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তার কড়া চাউনি নিক্ষেপ পূর্বক কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়া ভঙ্গিতে তিনি এগিয়ে এসে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ও মা! এ কী অলক্ষুণে কাণ্ড গো! ভরদুপুরে মাইনষের চোখের সামনে ছ্যামড়ির আঁচল ধইরা টানাটানি? লজ্জা-শরম কি সব ধুইয়া খাইছো?”
হঠাৎ এমন অতর্কিত হামলায় আর্য বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু মুখে আমতা আমতা করে বলল,
”আরে না না, কাকিমা! ইউ্য আর গেটিং ইট রং। আমি আসলে ওর… মানে আমি ওর বর হই।”
মহিলাটি এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন,
“বর হইছ তো ঘরে গিয়া পীরিত করো! রাস্তার মইধ্যে এই ঢং কেন? তৃষা, ওরে কি সত্যিই চেনো তুই? নাকি এই ছোকরা না চিনা তোরে জ্বালাইতেছে?”
আর্য এবার আশাবাদী দৃষ্টিতে তৃষার দিকে তাকাল, মনে মনে ভাবল তৃষা নিশ্চয়ই এখন পরিস্থিতি সামাল দেবে। কিন্তু তৃষা ঘটালো ভরাডুবি। মহিলাটির দিকে ফিরে হেলদোলহীন কণ্ঠে ও বললো ,
“না,কাকিমা, আমি ওনাকে চিনিই না! কোত্থেকে জানি এসে পিছু নিয়েছে। আপনি বরং ওর একটা ব্যবস্থা করেন তো!”

আর্যর আকাশ থেকে পড়ার দশা!
“তৃষা! হ্যোয়াট আর ইউ্য সেয়িং? আমি তোমার বর, আর তুমি বলছ চেনো না?”
মহিলাটি এবার আর্যর দিকে তেড়ে আসতে গিয়ে রাগে গজগজ করে বললেন,
“চিনিস না? দাড়া, আইজ তোর একদিন কি আমার একদিন! অসভ্য ছ্যামড়া!”
তেড়ে আসতে গিয়ে মহিলাটির কাঁধের কলসটা সামান্য হেলে গিয়ে কিছুটা জল ছিটকে আর্যর শার্টে লাগল। তৃষা ভয় পেলো আর্য নিশ্চিত রুপে রেগে যাবে এবার। মহিলাটিকে কি করবে জানা নেই তবে তৃষার অবস্থা খারাপ করে ছাড়বে। না না বাবা ঘুমন্ত সিংহকে জাগানো ঠিক হবে না, সে দ্রুত মহিলাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আরে না না কাকিমা, থাক থাক! আসলে ওর মাথায় একটু সমস্যা আছে তো, মাঝে মাঝে আবোলতাবোল বলে। আপনি কিছু মনে করবেন না, আপনি বরং যান।”
মহিলাটি আচানক এমন বাঁধা পেয়ে;এবার তৃষার দিকে ফিরে মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,
“মাথায় তোরই সমস্যা আছে! কত কী ঢং করলি আমার সাথে, আমার পানিডাই পইড়া গেল! মরণ আর কি!”
বলেই তিনি গজগজ করতে করতে পা চালিয়ে চলে গেলেন।আর্য নিজের ভেজা শার্টের দিকে তাকিয়ে আর তৃষার হাসিমুখ দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,,
“মাথায় সমস্যা? রিয়েলি তৃষা? এটাই ছিল তোমার বেস্ট এক্সকিউজ?”
তৃষা হনহন পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,, “ঠিক-ই তো বলেছি।”

নিশিথিনীর নিবিড় আঁচল ক্রমে আচ্ছন্ন করেছে সুবর্ণপুরের নিস্তরঙ্গ প্রান্তর। গগনতলে একফালি মালিণ্যহীন চাঁদ আজ বড্ড মায়াবী;তার নিচে ঠাঁই পেয়েছে রূপালি জ্যোৎস্না সিক্ত ধানক্ষেতগুলো। দূর জনপদ হতে ভেসে আসা ব্যাঙের সমবেত ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ধ্বনি আর ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম তান নিস্তব্ধ রজনীতে এক বিচিত্র সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
নৈশভোজের সমাপনান্তে শ্রান্ত টুইংকেলকে নিদ্রপুরীতে পাঠিয়ে তৃষা ধীর পায়ে এসে দাঁড়ালো কক্ষের ঝুল বারান্দাটায়। সিক্ত মাটির আদিম সোঁদা গন্ধ আর শীতল সমীরণের স্পর্শে ওর উন্মুক্ত কেশরাজি অবাধ্য হয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে ললাটে। এক অপার্থিব মৌনতায় ও চেয়ে আছে দূর দিগন্তের ওই ম্লানিমাজল জ্যোৎস্নার পানে।
সহসা পিছে কারো উপস্থিতি অনুভূত হতেই তড়িৎ বেগে ঘুরে দাঁড়াতে চাইলে ও কিন্তু তৎক্ষণাৎ ওর মেদহীন কোমর আঁকড়ে ধরল একজোড়া বলিষ্ঠ হাত। কিঞ্চিৎ কম্পিত হওয়ার পরমুহূর্তেই আগন্তুকের অস্তিত্ব উপলব্ধি করে থমকালো ও। পরিচিত ভেজা ভেজা গন্ধটা অনুভব করে হৃদয়ের শিহরণ তুমুল হয়েছে ওর। তবুও নিজেকে যথাসাধ্য সামলিয়ে কণ্ঠস্বর কড়া করে ও বলল,,

-‘ ছাড়ুন আমাকে।
-‘ উম…. কি বললে? শুনতে পাচ্ছি না।
-‘ আই সে ছাড়ুন আমাকে।
আর্য বাঁধন আরো দৃঢ় করে বলল,-‘ স্টুপিড গার্ল। ছাড়বো বলে ধরেছি নাকি?
তৃষা তাচ্ছিল্যের হাসি মেলে বলল,,-‘ আর এটা কতদিন ধরে থাকবেন? যতদিন না পুরোপুরি নিজের ফার্স্ট ওয়াইফকে ভুলতে পারেন? কিন্তু তারপর? তারপর আমার কি হবে ভেবে দেখেছেন? আপনি তো স্যরি বলেই গায়েব হবেন কিন্তু তারপর আমার এই ছোট্ট হৃদয়ের র-ক্তক্ষ’রণের কি হবে মিস্টার আর্য এহসান?
তৃষার এহেন কথায় রীতিমতো তাজ্জব বনে গিয়েছে আর্য; বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হলেও ও তৃষাকে ছেড়ে না দিয়ে বিদ্যুৎবেগে ওর কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল,,
“ওয়াট দ্য হেল আর ইউ টকিং অ্যাবাউট, তৃষা? আর ইউ্য ক্রেজি?”
তৃষা দুহাতে আর্যর বুক ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু আফসোস ওর ক্ষীণ দেহ তাতে সায় দিলো না। তবুও ও ফুঁসে উঠে বলল,

“ক্রেজি আমি নই মিস্টার আর্য এহসান, ক্রেজি তো আপনি! যে কি না এখনো নিজের পাস্টের ট্রমা থেকে বের হতে পারেন নি। আপনার ফার্স্ট ওয়াইফই আমাকে সব বলেছে। আপনি এখনো আপনার প্রথম স্ত্রীর স্মৃতিতে বুঁদ হয়ে আছেন। আমাকে স্রেফ একটা রিবাউন্ড বা তাকে ভোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন না তো? জাস্ট অ্যা পাপেট টু হিল ইওর ওল্ড উন্ডস।”
আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে এল এবার। ও এক পা এগিয়ে তৃষাকে রেলিংয়ের সাথে চেপে ধরল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তৃষার ললাটে বিঁধছে, র’ক্তা-ক্ত দৃষ্টি মেলে ও বলল,,
“লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি। প্রথমত, মাহেরিন কী বলেছে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো তুমি আমাকে কতটা চেনো। ডু ইউ্য রিয়ালি থিঙ্ক আই অ্যাম দ্যাট চিপ? কাউকে ভোলার জন্য আমি অন্য একজনের লাইফ নিয়ে খেলব?”
তৃষা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“মানুষের অবচেতন মন অনেক কিছুই করে মিস্টার আর্য এহসান। আপনি হয়তো নিজেও জানেন না যে আপনি এখনো ওই ছায়ার পেছনে ছুটছেন।”
আর্য এবার তৃষার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল,,

“বাজে বকা বন্ধ করো! ইটস বিন ইয়ার্স, এন্ড শি ইজ ডেড ইন মাই মেমোরিজ টু। তোমার ওই ইনসিকিউরিটি দিয়ে আমাদের প্রেজেন্ট নষ্ট কোরো না। আই ডোন্ট নিড এ্নি মিডিয়াম টু ফরগেট হার। তোমাকে যখন কাছে টানি, তখন শুধু তোমাকেই দেখি, অন্য কাউকে নয়। সো, স্টপ দিস ননসেন্স রাইট নাও! তোমার কি মনে হয় এই এক মাসে আমার হৃদ দহন,আমার ব্যাকুলতা,বারবার ফোন করা,তুমি না ধরলেও পুনরায় নির্লজ্জের মতো ট্রাই করা,সব অভিনয় ছিল? আর ইউ্য দ্যাট ব্লাইন্ড?”
তৃষা নিশ্চুপ,যেন বাকশক্তি হারিয়েছে ও।তবে আর্য থামলো না। একমাস যাবত তৃষার সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণ বুঝে ওর মস্তিষ্কে দোলা দিলো একটাই প্রশ্ন,মাহেরিনের সাথে তৃষার দেখা হলো কিভাবে? ও তৃষাকেই প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলো তবে সেটা না করে ও বলল,,

“বাই দ্য ওয়ে আ’ম ইমপ্রেজড মিসেস তৃষা নেওয়াজ। বাহিরের কেউ তোমাকে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলল আর তুমি সেইটাই মেনে নিলে। আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস এতটাই ঠুনকো?”
তৃষা অশ্রুসিক্ত নয়নে চাইলো আর্যর পানে, অস্ফুট স্বরে বলতে চাইলো ‘না’।তবে ততক্ষণে আর্যর বাহুবন্ধন শিথিল হয়েছে। ও তৃষাকে ছেড়েই কক্ষ ত্যাগ করলো। একটি বারও চাইলো না পিছে।এদিকে ওর প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে তৃষা আনমনে বলল,,
“অভিমানী মনটা আপনাকে হারাতে চায়নি বলেই হয়তো মিথ্যে সন্দেহের দেওয়ালে নিজেকে বন্দি করে আগলে রাখতে চেয়েছিল; অথচ আজ সেই দেওয়ালটাই আমাদের মাঝে এক অতল দূরত্ব তৈরি করে দিল ক্যাপ্টেন।”
হৃদয়ের নিভৃত কোণে বেজে উঠলো গানের কয়েকটি কলি,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪০

🎶মনের অনুরাগে বাজে এমন রাগিণী….
কাছে এসে কেনো কাছে আসতে পারি নি….
আমি আজও বুঝি নি আমি আজও বুঝি নি…..
তোমার আমার প্রেম আমি আজও বুঝি নি …..🎶

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪২

1 COMMENT

  1. বাকি পর্বগুলো তাড়াতাড়ি দেন আপু একটা একটা দিয়েন না সবগুলো একসাথে জলদি দিয়ে দেন। একটা একটা পড়তে ভালো লাগে না, সবগুলো একসাথে পড়লে ভালো লাগবে।

Comments are closed.