সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৩
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
খড়খড়ে রোদ উঠেছে ঢাকা শহরে । আবহাওয়া আজ বড্ড তপ্ত । বৈশাখ এর এই কাঠফাটা রোদ্দুর এ এই মানুষ ঠেলে চলাফেরা যে কতটা বিরক্তিকর এক মিনিট এর জন্য ঢাকার রাস্তায় বের হলে টের পাওয়া যায়। মানুষ ক্লান্ত চোখেমুখে হন্নে হয়ে চলছে যার যার গন্তব্যে। গরমের তীব্রতায় রাস্তার পাশের কুকুর গুলো ঝিমুচ্ছে একটু ছায়া পেলেই।
ঈশান এসি গাড়ি থেকে নামতেই গরমের ভয়াবহতা টের পেলো । এই দু মাসে বাড়িতে থেকে বাজে অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছে । তাদের ওখানটার আবহাওয়া সারাবছর বলা যায় বেশ নাতিশীতোষ্ণই থাকে । সুতরাং মফস্বল থেকে এসে ঢাকা শহরে মানিয়ে নেওয়া বড্ড কষ্টকর হয়ে যায়। তবে উপায় কি ! কর্ম ব্যাস্ততায় ছুটতে হয়ই আরাম আয়েশ জলাঞ্জলি দিয়ে।
দুপুর আড়াই টে । ঈশান এসে ঢুকলো পুরান ঢাকার একটা ইংরেজ আমলের বাড়ির ভিতরে । বাইরে থেকে যতটা পুরানো দেখা যায়, বাড়ির অবস্থা ভিতরে ততটাও শোচনীয় নয় । বরং বাইরে থেকে ভাঙা কুঠুরি লাগলেও ভিতরে বিদেশি সাজসজ্জার ছোঁয়া । বাড়ির মালিক যে যথেষ্ট সৌখিন তা বোঝা যায় । ঈশান কে দেখেই বাড়ির হেড বেয়ারা সালাম ঠুকলো । সোফায় বসতে বলে ছুটলো ওপরে । সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বেশ সাহেবিয়ানার সাথে অপেক্ষা করছে ঈশান। এখানে আজকেই তার প্রথম আসা। এর আগে যতবার দেখা করেছে কোনো না কোনো হোটেল এ অথবা রেস্তোরাঁয়। ঘরের চার দেয়াল ভর্তি বিভিন্ন বিদেশি পেইন্টিং। অ্যানটিক এর জিনিসপত্রে ঘর ঠাসা। মিনিট দুয়েক এর মধ্যেই দোতলা থেকে কারোর নেমে আসার শব্দ পাওয়া গেলো।
ঈশান কে দেখে একগাল হাসলো মহিলা। নাম মিসেস কাবেরী দত্ত। পিতার সূত্রে খ্রিস্টান হলেও,স্বামীর সূত্রে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে। ঈশান নিজেও উঠে দাড়িয়েছে।৷ মিসেস কাবেরী এসে দাড়ালো ঈশানের সামনে। মিষ্টি কন্ঠে বললো,
____”ভাবলাম পথ ভুলে এসেছো।”
ঈশান মহিলার হাত ধরে তার পাশেই বসালো । স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
____”কাজ ছিলো ঢাকা তে ভাবলাম দেখা করে যাই।”
____”বেশ ভালো করেছো। আছো কতদিন? “
____”সপ্তাহ খানেক।”
____”তোমার বন্ধু রা তো ঈদের ছুটিতে সব এলাকা গিয়েছে। উঠেছো কোথায়?”
____”যেখানে বরাবর উঠি।”
____”তোমাকে আর কতবার বললে হোটেল মোটেল ছেড়ে আমার বাসায় এসে থাকবে বলতে পারো?”
____”স্কিপ টা পয়েন্ট। আমার আসা অন্য দরকারে।”
পৌঢ়া মহিলাটি নড়েচড়ে বসলো। ঈশানের মুখাবয়ব বেশ সিরিয়াস লাগলো এই মূহুর্তে তার কাছে। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
____ “বলো?”
ঈশান মহিলার দিকে তাকিয়ে সেও গম্ভীর স্বরে বললো,
____”সাজিদ সরকার কে কোনোভাবে ওখান থেকে ট্রান্সফার করা যায়না?”
____”কোনো সমস্যা? “
____”ওইরকম-ই।”
____”তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড ও। আমি যতদূর জানি।”
____”সত্যিটাই জানেন।”
____”তাহলে?”
____”আমার কাজ এগোতে সমস্যা হচ্ছে। পুলিশ ফোর্স বারিয়েছে। পুরো এলাকা সিল করেছে। কড়া নজরদারি। এর মধ্যে আমি শান্তি মতো কিচ্ছু করতে পারছি না। আমার যতদূর মনে হয় সাজিদ আমাকে সন্দেহও করছে।”
মহিলা টির মুখ কুচকে এলো। কিছুক্ষণ ভাবলো ঠান্ডা মাথায় বোধহয়।
____”রুষার বিষয়টা জানালে না আমাকে।”
____”জানানোর কিছু ছিলো না। সি নোউজ এভরিথিং এবাউট মি। একদম শুরু থেকে জানতো। আমার সম্পর্কে সব তথ্য কালেক্ট করছিলো।”
চা কফি চলে এলো এরই মধ্যে। মহিলা নিজের হাতে চায়ের কাপ তুলে কফি এগিয়ে দিলো ঈশান এর হাতে। ঠান্ডা স্বরে বললো,
____”তাতে ওর লাভ?”
____”ব্ল্যাকমেইল করতো হয়তো আগে পরে। তবে আমি ফাইল গুলো সরিয়ে নিয়েছি কায়দা করে। আর..”
ঈশানের কথা মাঝের বিরতি তে মহিলা চায়ে চুমুক দিতে গিয়েও দিলো না। আগ্রহ মুখে তাকিয়ে রইলো ঈশানের কথা শেষ হওয়ার।
____”সি ওয়াজ আ ড্রাগ সাপলায়ার। সিঙ্গাপুর সহ উন্নত বেশ কয়েকটা দেশ থেকে ড্রাগ আনা নেওয়ার কাজ করতো। “
মহিলা বেশ চমকালো ঈশানের কথায়। রুষা মেয়েটাকে সে চেনে। ঈশানের বন্ধু হিসেবেই চেনে। মেয়েটা কে দেখে মোটেই এরকম মনে হয় না। তার থেকেও বড় কথা একটা মেয়ে হয়ে কিভাবে এতো রিস্কি একটা কুকর্মের সাথে যুক্ত থাকতে পারে! রাশভারি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
____”এসবে যুক্ত হলো কি করে?”
____”কি করে সেটা এখনো জানতে পারিনি। ওর লিডার কেউ একজন। যে ওকে চালনা করে। সম্ভবত জোর করেই করায়। আমার তথ্য কালেক্ট করতে ও আমার সাথে ওঠাবসা করতো। তবে…
____”তবে এরই মধ্যে সে সত্যিই তোমার প্রেমে পরে যায়। তাইতো?”
ঈশানের অসমাপ্ত কথা শেষ করে দিলেন তিনি। ঈশানও মাথা নাড়লো । রুষা কে বা কার কথায় তার পিছু লেগেছে সেটা খুঁজতে গিয়ো মরিয়া হয়েছে সে । তাদের পরিচয় এর দু বছরের মাথায় জানতে পারে রুষার এই অধ্যায় এর কথা। সে যে আদতেও ভোলাভালা কোনো রমনী নয় সেটা জানার পর ঈশানও প্রশ্রয় দিতে থাকে রুষা কে । রুষা কে বুঝতে না দেওয়ার পায়তারা আরকি। তবে রুষা নিজেও গভীর জলের মাছ। একটা সময় সেও বেশ আন্দাজ করে ফেলে ঈশান আসলে জানে তার সত্যিটা। তবে ততদিনে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। সে নিজে গভীর ভাবে প্রেমে পরেছে ঈশানের। দু নৌকায় পা দিয়ে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করতো। তাদের বিয়ের বিষয়টাও রুষার যেমন পরিকল্পনার অংশ ছিলো ,ততটাই পরিকল্পনা মতো ছিলো ঈশানেরও । বিয়ে টা যে আদতে হতোই না সেটা রুষা বা ঈশান দুজনেই জানতো।
ঈশান তিতির এর বিয়ের দিন হোটেলে ঈশান আসলে নিজের সম্পর্কে রুষার কাছে জমানো সব তথ্য সরাতে গিয়েছিলো । তার সাথে রুষার সম্পর্কেও বেশ কিছু গোপনীয় তথ্য জোগাড় করতে পারে। ঈশান যেমন টা জেনেছিলো রুষার বিষয়ে। একই বিষয় সাজিদ ও খুঁজে বের করছিলো। বন্ধু দের মধ্যে রুষা কে নিয়ে বিদ্বেষ তৈরি হয় আদতে তার পর থেকেই। তবে রুষাকে যে পরিচালনা করে ঈশান তার অস্তিত্ব এই দেশে পায়নি। সম্ভবত দেশের বাইরে থেকে মেয়ে টাকে হুকুমের ওপর রাখা হয়।
ঈশান আর বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ইয়াজের ঘটনা টাও খুলে বললো মিসেস কাবেরী দত্ত কে। মহিলার মুখচোখে রাজ্যের আধার এসে ভর করলো। বেশ চিন্তিত হলো মুখের অবয়ব।
____”বাই এনি চান্স ইয়াজের সাথে রুষা…”
____”কানেক্টেড। আই গেজ।”ঈশান গম্ভীর মুখে বললো কথাটা।
____”প্রমান পেয়েছো কোনো?”
____”এখনো অবধি নয়। তবে খবর পেয়েছি রুষা আমাদের ওখানে গিয়েছে। হোটেল কনটিনেন্টাল এ উঠেছে। ঈদের দিন গিয়েছে। সম্ভবত আমার খোঁজে।”
____”তোমার এখানে আসা রিস্ক হয়ে গেলো না তাহলে?”
____”উমমম… আই গেজ, নাহ। সাজিদরা আছে ওখানে।”
____”তাহলে সাজিদ কে সরাতে চাচ্ছো কেনো?”
____”আমার পথে ঝামেলা করছে বড্ড। আমি এলোমেলো ফেঁসে গেলে এগোতে পারবো না আর।”
____”বেশ। একটু সময় লাগবে। একটা কেসের তদন্ত প্রাপ্ত এএসপি কে এতো হুট করে সরিয়ে ফেলা যায়না। “
____”টেক ইও্যর টাইম।”
মফস্বলের আনাচে-কানাচে সুবর্ণা সহ বাকি খুন গুলোর আলোচনা । কান পাতলেই শোনা যায় সেসব কথা। পুলিশের তদন্ত পুরো দমে শুরু হয়েছে। কড়া পাহাড়া বসেছে পুরো এলাকা জুড়ে। কঠিন ভাবে তল্লাশির ওপরে সব। সাজিদের ব্যাস্ত সময় কাটছে। যদিও বেকার লাগছে সব খাটনি। এসব যেই ঘটাক না কেনো। কোনো মামুলি বুদ্ধি তে করেনি। বরং দিনের পর দিন সাজানো প্ল্যানে করা সবকিছু। পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরো সব। ওপর মহল থেকে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কালপ্রিট কে ধরার জন্য। প্রেস মিডিয়া চব্বিশ ঘন্টা অতিষ্ঠ করেই রাখছে। সাজিদের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা।
সারা দিন এর ব্যাস্ততার পরে সে যখন বাড়ি ফিরলো তখন এশার আজান হচ্ছে। আশেপাশে থেকে আজানের মিষ্টি ধ্বনি কানে বাজছে। গ্রাম্য কুকুর গুলো হাক ছেড়েছে একই সাথে। গেটে তালা লাগানোর টুং টাং শব্দের মধ্যেই পায়ের কাছে শব্দ করে পরলো একটা পাথর। পা সরিয়ে ফেললো সাজিদ। গেট খোলার শব্দ পেয়ে অনিমা বেরিয়ে এসেছিলো। দরজায় দাড়ানো সে। ওরকম কোথা থেকে পাথর টা পরলো ধরতে পারলো না সেও। সাজিদ এর কপালে ভাজ পরলো যখন খেয়াল করলো পাথরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে একটা সফেদ কাগজ। ওটা হাতে তুলে নিলো। গেট তালা দেওয়ার বদলে খুলে বাইরে এলো আবার।হাক ডাক না করলেও ভালোমতো পরখ করলো আশপাশে। বেশ অন্ধকার। তাদের বাড়ির কোনায় জ্বলতে থাকা চকচকে আলোতেও আশেপাশে দেখতে পাওয়া গেলো না কাৎকে।
____”ভিতরে এসো তো। আবার মাথায় ছুড়ে মাথা না ফাটালে হয়।”
অনিমার চিন্তামাখা কন্ঠে ঘাড় ঘুরিয়ে চলে এলো। সন্তপর্ণে বাড়ির ভিতর ঢুকেই খুললো কাগজ টা।
কম্পিউটার এ ছাপা লেখা। চিঠির মতো করে লেখার ধরন।
“দারোগা সাহেব,
বৃথা এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছেন। আমাদের সমস্যাই এটা জানেন তো। তবে একটা কথা আছে জানেন তো? যেখানেতে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলেও পাইতে পারো, অমূল্য রতন। আপনি বুঝি কথাটা মানেন না? দূরে দৃষ্টি পরে দেবেন কেমন? আগে আশপাশ টা ভালো করো নজর দিন। শার্টের বোতাম কার শার্টে ফিক্সড হয় সেটা না মিলিয়ে পুলিশের ইউনিফর্ম জড়িয়ে আপনি ঘুরছেন পথে পথে। এটা কি ঠিক! রয়েল এনফিল্ড এর দাগ ধরে পিছু না ছুটে, নিজের চারা চাকাতে এসির হাওয়া খেতে ব্যাস্ত! এতো অবজ্ঞা করলে কেস সলভ হয়? হয় না তো। আপনি তাইলে আমি আপনাকে সাহায্য করতেই পারি। এখন জিজ্ঞেস করবেন আমার ফায়দা কি!ফায়দা অবশ্যই আছে। দেশের নাগরিক আমি। দেশের জন্য ভেবে বললাম। ঈশান কোনে বেশ মেঘ জমে আছে। সেটা সরিয়ে সূর্যের দেখা আপনাকেই এনে দিতে হবো কিন্তু। “
ইতি
আপনার গুণমুগ্ধ আগন্তুক “
চিঠিটা সাজিদ নিজে কয়েকবার পরলো। স্বামীর মুখের অবস্থা দেখে নিজ থেকে সেটা নিয়ে পরলো অনিমা। দুজনেরই চোখাচোখি হলো এ যাত্রায়! চিঠিতে কিছু একটা লেখা আছে যা তারা ক্রমাগত ভেবে চলছে। কিন্তু মনকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। বিধায় সেটা নিয়ে কেউ কথাও তুলছে না।
নিয়াজ ড্রয়িং রুমের সোফায় পা তুলে বসে রাতের খাবার খাচ্ছে। নিয়াজের মা মিনা পাশেই বসা। ছেলের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে। সাথে দুজনের দৃষ্টিই টিভি তে। মূলত সিনেমা চলছে নিয়াজ এর পছন্দ মতো। মিনা শুধু তাকিয়ে আছে, এই অবধিই।
আচমকা কলিং বেল বাজায় নিয়াজ চকিত হলো। মাকে বসতে বলে সেই এগোলো। আজকাল সতর্কের মার নেই। এলাকার যা অবস্থা!
তবে মিনাও উঠে এসেছে ছেলের পিছু পিছু। দরজার বাইরে দাড়িয়ে আছে তাদের এলাকার ঘটক সাহেব। সাথে সয়ং তাদের এখানকার কলেজের প্রফেসর তাহমিদ কায়েস এর মা। এরা আদতে নিয়াজ দের তিন বাড়ি পাশেই ভাড়া থাকেন। ঠোঁট টিপলো নিয়াজ। হালকা পাতলা টের পেলো এদের আসার কারণ। তবে বলা আগেই কিছু নেই। ভদ্রতা বোধ থেকে ঘরে এনে না বসালেই নয়।
মিনা ছেলের দিকে একনজর তাকিয়ে দরজা খুললো। সাদরে এনে বসালো। নিয়াজ নিজের খাবার প্লেট নিয়ে এসে বসলো ডায়নিং এ। কথায় কথায় যা উঠলো তার সারমর্ম হলো এই যে তাদের ছেলের জন্য দেওয়ান বাড়ির ছোট কন্যা তিতির কে মহা পছন্দ। ঈদ কাটতে না কাটতেই ছেলের তাড়ায় ছুটে আসতে হয়েছে তাদের। মেয়েটাকে যে কোনো মূল্যে ছেলের বউ বানানোই আপাতত তাদের মূল উদ্দেশ্য।
নিয়াজ নিজের প্লেটের দিকো তাকিয়ে হতাশায় মাথা নাড়লো। ওদিকে মিনা ক্রমাগত বুঝিয়ে যাচ্ছেন দেওয়ান বাড়িতে তিতিরের সম্বন্ধ নিয়ে গেলে দেওয়ান রা কি পরিমাণ ক্ষেপে যেতে পারে।
এলাকায় দেওয়ান পরিবার কে মানুষ যতটা সমীহ করে চলে,ততটা ভয় ও পায়। হুটহাট হেসে খেলে সে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার মতো বুকের পাটা এলাকায় খুব কম মানুষ এরই আছে। এরই হেতু তে বারংবার নিয়াজ দের এখানে আসছেন তারা।
তাদের দৃঢ় ভরসা নিয়াজদের পরিবার এর মাধ্যমে সম্বন্ধ নিয়ে গেলে কোনো ধরনের ঝামেলায় পরতে হবে না তাদের।
ঘটক সাহেবের এই যুক্তি হলেও তাহমিদ এর মাকে অন্য রকম কনফিডেন্স লাগছে নিয়াজের কাছে। তার ছেলে কোন দিকে কম! তাদের পরিবার এর কি কি আছে সব ব্যাখ্যা দিতে মরিয়া ভদ্রমহিলা। এক পর্যায়ে স্পষ্ট বোঝা গেলো নিয়াজ রা বা ঘটক সাহেব না এগোলেও সে নিজেই যেতে দ্বিধা করবে না। মিনা বড্ড অসহায় হয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। সে নিজেও সাহস পাচ্ছে না তিতিরের বিয়ের কথা বলতে। তবে অন্য ভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন।
দেওয়ান দের সম্ভবত মেয়ের জন্য ছেলে পছন্দ করে রাখা, সে বর্ণনাও দিলেন।
তবে তাতে তাহমিদ এর মায়ের মধ্যে কোনোরকমে দমে যাওয়া ভাব লক্ষ্য করা গেলো না। তার নিজের ছেলেকে নিয়ে তার আকাশ পরিমান অহংকার। তার ছেলে সোনার টুকরো। তাকে ঠুকরানোর প্রশ্নই ওঠে না। কথায় কথায় বারবার বোঝালেন তিতিরের জন্য এমন ছেলে দেওয়ান রা দেশ বিদেশ ঘুরেও পাবে না। নিয়াজ এ যাত্রায় বেষম খেলো। নাকে মুখে উঠলো খাবার। বিড়বিড় করে আউরালো
____”সর্বনাশ এর মাথায় বারি দেবে এই মহিলা আর তার ছেলে! ঈশান আরশাদ এর বউ কে বিয়ে করার জন্য ছক করা হচ্ছে! জানলে আমাকে সহ কবরে পাঠাবে। আস্ত ঝামেলা এসে হাজির।”
____ “তোমার বার্বি কই?”
নিয়াজের প্রশ্নে অদূরে বসে থাকা তিতিরের দিকে তাকালো নিশি। সবাই এখন তার রুমেই। আজ রাতে একসাথে ঘুমাবে সব বোনেরা এই প্ল্যান হয়েছে।
____”কেনো বলোতো?”
____”তোমার ভাই কি বউ কে আদর সোহাগ করে একটু আধটু?”
সারাদিন পর কল করে নিয়াজের এহেন কথায় মেজাজ খারাপ হলো নিশির। লোকটার যেনো আর কোনো কাজ নেই। কখন কাকে খোচানোর ওপর থাকা যায় এই পরিকল্পনায় আছে যেনো। নিশ্চয় তার ভাইয়ের পিছনে পরেছে এবারে। বিরক্ত স্বরে বললো,
____”বাজে না বকে যেটা বলার সেটা বলো।”
নিয়াজ শব্দ করে হাসলো। মায়ের কোলে মাথা রেখে শোয়া। তাহমিদ এর মা চলে যাওয়ার পর থেকে মায়ের সাথে তিতির আর ঈশান কে নিয়েই আলাপ আলোচনা চলছিলো।
____”স্বামী আদর সোহাগ না করলে মেয়েটার জীবন নষ্ট করে লাভ কি! ভালো ভালো বিয়ের সম্বন্ধ আসছে। দেওয়ান সাহেব বউ এর বিয়ে দিতে রাজি হবে নাকি?”
নিশি নাক সিটকালো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
____”তাহমিদ কায়েস?”
____”হু। আজ ওর মা এসে ছেলের যা গুনগান গেয়ে গেলো। দু এক এর মধ্যে তোমাদের বাড়ি গিয়ে পৌছুলো বলে। তোমার ভাই তো ফোন ধরলো না। না হলে ওর থেকেই শুনতাম বউ বিয়ে দেবে কিনা!”
____”চুপ করোতো। আজেবাজে কথা। সোজা না করে দিতে পারো না? আমাদের চৌকাঠ অবধি এলো আবার এক ঝই ঝামেলা।”
নিয়াজ এর কন্ঠে এবার কপট রাগ এর আভাস পাওয়া গেলো। বাঁকা কন্ঠে বললো,
____”বিয়ে করে বউ এর পরিচয় না দিলে মানুষ বিয়ের কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। তা তোমার সুপারম্যান ভাই বউ কে পকেটে তুলে রাখে কেনো? ভালো টালো তো বাসে না। সেটা তো উঠতে বসতে বলে।”
নিশি তাকালো বোনের দিকে। তিতির, নূরি সামনে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। মুভি খুজছে সারারাত জেগে দেখার মতো। ওড়না অবহেলায় পাশে সরে গেছে। পাশ থেকেই দেখা গেলো বেশ কয়েকটা কালচে দাগ। ঠোঁট এ ঠোঁট টিপে হাসলো নিশি। ফিসফিস করে বললো,
_____”ভাই বোন দুটোই আমার। আমি তো কিচ্ছু জিজ্ঞেস করতে পারি না। ওদিকে বড় ভাই, এদিকে তিতির টা ছোট বোন। সম্ভবত প্রেমে মজেছে দুজন।”
বলে কি মেয়েটা এতক্ষণ এ! নিয়াজ আগ্রহ গলায় বললো,
____”কি করে বুঝলে!”
____”চোখের সমানে প্রমান নিয়ে ঘোরে আমার বোনটা। আমার ভাইয়ের আকা আদরের দাগ গুলো।”
নিয়াজ মায়ের কাছ থেকে সরে এসে দাড়ালো অন্ধকার বেলকনিতে। সায় জানালো নিশির সাথে।
____”তোমার ভাই একটা যা তা। ভালোবাসে, অথচ মুখে বলতে গিয়ে নাটক করে। ওকে একটু জ্বালালে কেমন হয়? “
নিয়াজ এর কন্ঠের ধরনে ভয় পায় খানিকটা নিশি। লোকটা মহা ফালতু। কি করতে কি করার ঘট পাকাচ্ছে কে জানে। কটিন কন্ঠে মানা করলো নিশি।
____”খবরদার পাকনামি করবে না। ওদের টা ওরা বুঝবে।”
____”ধ্যাত। তোমার ভাই বাসর সেরে ফেলবে। তাও বউয়ের কথা কারোর কাছে প্রকাশ করবে না। এটা ঠিক! দাওয়াত খাবো না? আজব। বউ লুকিয়ে রাখার জিনিস। তোমাকে যেদিন বিয়ে করবো। আমি তো ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে বিয়ে করতে যাবো। রাজা বাদশা দের মতো হাতির ওপর বসে।”
হেসে ফেললো নিশি। কথাটা সত্যিই নিয়াজ বলে। বলা যায় না। লোকটা এটা করতে পারে। শতভাগ সম্ভবনা আছে। যা পাগল!
তিতির এর ব্যাস্ত চোখ বারবার যাচ্ছে তার ফোনের দিকে। আজ সারাদিন এ একটা বারও ঈশানের সাথে কথা হয়নি। লোকটা জাদু টাদু করেছে নাকি ! এতো অস্থির লাগে কেনো৷ চব্বিশ টা ঘন্টাই একটা মানুষ মাথার ভিতরে কিভাবে ঘোরাফেরা করতে পারে!
ফোন করবে কি একটা বার! ভেবে পাচ্ছে না সে। ব্যাস্ত আছে কি না সেটাও বুঝতে পারছে না। পাশেই নিশি, নূরি গভীর মন দিয়ে সিনেমায় ব্যাস্ত। তার মন বসছে না।
রাত বেশ গভীর হয়েছে। ঈশানের যদিও এতো জলদি শুয়ে পরার প্রশ্নই ওঠে না। তবুও, কতটা কেমন ব্যাস্ত বা ক্লান্ত সেটা না বুঝে কল দিয়ে বিরক্ত করা টা কেমন দেখায় বুঝতে পারছে না তিতির।
ঈশান সত্যিই ঘুমিয়েছে। ঘড়ির কাটা রাত সাড়ে বারোটার ঘরে। হোটেলে ফিরেছে ঘন্টা দেড়েক আগেই। এসে কোনোমতে শাওয়ার টা নিয়েই শুয়েছে। বাড়ি থেকে আসার পর একটা দিনও টানা তিন ঘন্টা ঘুমিয়েছে কি না মনে পরে না। ঘুম কাতর মানুষ হিসেবে এটা তার জন্য বড্ড কষ্ট কর।
তিতির কে কল করতে গিয়েও কল করেনি সে। মেয়েটা ঘুমিয়ে পরেছে কি না সেও একই কথা ভেবে কল করেনি। তাছাড়া মেয়েটাকে কল করলে অশান্তি বারে। বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করে মন। ঘুম উড়ে গিয়ে অন্য অনূভুতি এসে হানা দেয়।
হোটেল রুমের সফেদ বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শোয়া ঈশান। কোমড়ে অবহেলায় জড়িয়ে আছে একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। দু হাত বালিশে তুলে মুখ গুজে ঘুমিয়ে আছে।
ফোন ভাইব্রেশনের শব্দে নড়েচড়ে উঠলো সে। তখন ক্লান্তিতে ফোন টা সাইলেন্ট করার কথা মাথায় ছিলো না। ফোনটার ভাইব্রেশনে কাঁপছে বিছানা।
ঘুমের ঘোরেই কেটে দিলো ফোনটা। একবার,দুবার নয়। ক্রমাগত বাজছে। তাকাতে পারছে না কড়া ঘুমে। কোনোমতে চোখখুলে ফোনা রিসিভ করে ঠেকালো কানে। অস্ফুটে বললো,
____”উমম।”
নিয়াজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে এই মূহুর্তে। নাঈম এর সাথে মিলে ঠিক করেছে দেওয়ান সাহেব কে একটু নাচাবে। বউ পাগল কতটা হলো বিয়ের এ দুমাসে সেটা পেট থেকে বের করেই ছাড়বে। খ্যাকখ্যাক করে হেসে উচ্চ কন্ঠে বললো,
____”তোর বউয়ের জন্য বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে কাল প্রফেসর সাহেব তোদের বাড়ি যাবেন বলে ঠিক করেছন। আমাকে ঘটক হতে বলছেন। কি করি বলতো?”
সারাদিন এর ব্যাস্ততার পর ঘুম সম্ভবত ঘন্টাখানেকও হয়নি ঈশানের। নিয়াজ কি বললো তা এক বিন্দুও কানে গেলো না তার। বেচারা ঘুমের তীব্রতায় বুঝতেই পারলো না কি শুনলো বা আদৌ কিছু শুনছে কি না। ঘুম ঘুম কন্ঠে ভাঙা গলায় বললো,
____”উমমমম। বিয়েই তো। দিয়ে দে।”
নিয়াজ হতভম্ব হলো এ যাত্রায়। শা*লা বলে কি! বউয়ের বিয়ে দিতে বলছে। তাও এতো চিল মুডে!সজ্ঞান এ আছে তো নাকি! দেওয়ান সাহেব আর যাই হোক, ভালো না বাসলেও নিজের জিনিস কাউকে দিতে রাজি নয়। এ তারা ভালো করে জানে।
হতভম্বতা দ্রুত কাটিয়ে ব্যাগ্র কন্ঠে শুধালো,
____”ড্রিকস্ করেছিস ভাই? বউয়ের বিয়ে দিবি! মাতাল হয়েছিস?”
ঈশানের ঘুম এরই মধ্যে আরও একটু গাঢ় হয়েছে। নিয়াজ এর ফোন কল আর এই কথাগুলো সম্ভবত স্বপ্ন ভেবে ভুলেও যাবে বেচারা। নিয়াজের কথার সম্মতি হিসেবে গোঙালো খানিকটা।
____”উমমম। বিয়েই তো। দিয়ে দে। আমি এসে না হয় আবার দেবো।”
ফোন টা কান থেকে সরিয়ে মুখের সমানে এনে হা করে কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো নিয়াজ । ঠিক নাম্বার এই ডায়াল করেছিলো কি না সেটা বোঝার চেষ্টা করলো । ঠিকই তো আছে। ঈশানেরই নাম্বার। তবে কথার ধরন তো মেলে না!
____”শালা তুই ত্যাড়া সেটা জানতাম। এতটা পাগল তা তো জানতাম না। “
সাঁঝের মায়া পর্ব ৪২
ঈশানের ওাপশ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাওয়া গেলো না। নিঃশ্বাস ভাড়ি হয়েছে। কান থেকে ফোনটা সরিয়ে বিছানার আরেক মাথায় ছুড়ে ফেললো। নিয়াজ এ যাত্রায় হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো নিজের ফোনের দিকে। কপালে আঙুল ডললো।
____ আচ্ছা ঈশান কি আমার কথাগুলো সিরিয়াসলি নিলো না! নাকি ব্যাটার আসলেই যায় আসে না!”
নিয়াজ ঝটপট ফোন লাগালো নাঈম এর কাছে। বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় বসা উচি। একা সে পাগল হবে কেনো ভেবে ভেবে। ওউ ভাবুক একটু।
