অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২
ফাহিমা ইসলাম
এতোক্ষণে তূর্ণা হয়তো ভালো ভাবে কথা বললো। কথাগুলো বেশ ভয়ে ভয়েই বলেছে সে! সামনে থাকা মানুষটাকে বেশ ভয় লাগছে তার। কেমন করে তাকিয়ে আছে! এদিকে তূর্ণার কথা শুনে রৌদ্রিকে ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে আসে। সামনে থাকা মেয়েটার কথাগুলো অন্যরকম শোনাল, কেমন বাচ্চা টাইপ! রৌদ্রিক না রূপা নামক মেয়েটার সঙ্গে দেখা করেছে আর না তার পরিবারের সঙ্গে। সে শুধু তার মায়ের কথায় বিয়েতে রাজি হয়েছিল বহুদিন পর। দ্বিতীয়বারের মত নিজের জীবনে কাউকে টেনে আনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না তার। রৌদ্রিক তূর্ণাকে ভালো ভাবে খেয়াল করলো, মেয়েটা তার থেকে বয়সে বেশ ছোট হবে। বেশ বললে ভুল হবে অনেকটাই ছোট তার থেকে। কিন্তু তার থেকে বড় কথা রূপা নামক মেয়ের জায়গায় এই মেয়ে কি করে? রৌদ্রিক আবারও গম্ভীর গলায় সামনে থাকা হাঁসফাঁস করতে থাকা তূর্ণার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারলো-
“ তোমার বড় আপুর জায়গায় তুমি কেনো? আর আমি তোমার বর এটা কে বললো?”
তূর্ণা আঁড়চোখে রৌদ্রিকে দেখে নিয়ে আমতা আমতা করে বলে ওঠে-
“ রূপা আপু তো পালিয়েছে, তার পুতুল বরের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। তাই তো তোমার মত বর পেলাম আমি, আর এত নরম বিছানায়ও শুতে পারলাম প্রথমবার। নাহলে ওই শক্ত বিছানায় ঘুমাতে আমার অনেক কষ্ট হতো! রাতে অনেক ঠান্ডা লাগতো!”
তূর্ণার কথায় রৌদ্রিকের কপালে ভাঁজ পরলো। তারমানে যার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিলো তার সঙ্গে তার বিয়েই হয়নি। এই মেয়েটার সঙ্গে হয়েছে, কিছু একটা ভাবতেই রৌদ্রিকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। নেত্রযুগল ভয়ানক ভাবে লালচে আবরণে ভরাট হয়ে উঠলো। রৌদ্রিক গোলগাল আকৃতির তূর্ণার দিকে চাইলো, তূর্ণা আহামরি কোনো সুন্দরী নারী নয় তবে তাকে অসুন্দরের কাতারে ফেলানো যায় না। ছিমছাম শরীরের, হলদেটে ফর্সা গড়নের। আঁখি জোড়া ডাগর ডাগর কেমন মায়া জড়িয়ে আছে! ডাগর ডাগর আখিঁপল্লব জুড়ে ঢেউ খেলানো ভাবে কাজল লেপ্টে আছে। এছাড়া কৃত্রিম কোনো সাজসজ্জা নেই, থুতনির দিকের বা’দিকের নিচ বরাবর লালচে একখানা তিল। যার জন্য দেখতে আরও মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে। তবে এই মুহুর্তে রৌদ্রিকের কাছে এইসব ফিঁকে লাগলো। এই জায়গায় রূপা নামক মেয়েটা থাকলেও এমনই লাগতো তার, তার ভিতরকার কোনো অনুভূতির দেখা মিললো না। কয়েক বছর যাবৎ এই অনুভূতির দরজাটা সে বন্ধ করে দিয়েছে, যার কারণে আজকে এই লাবণ্যময়ী নারী কে দেখে তার অন্তঃকরণের নতুন অনুভূতির ঢেউ খেয়ে গেলো না। তূর্ণাকে এই মুহুর্তে অসহ্য লাগলো নাকি অন্যকিছু জানা নেই তার। এই মেয়ের জায়গায় ওর বোন হলেও একই অনুভূতি কাজ করতো তার; তূর্ণা ঘুমন্ত বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হুট করে বলে ওঠে-
“ আচ্ছা বর এই পুতুলটা কি তোমার? আমাকে কি এই পুতুলটাকে একটু নিতে দিবে? সত্যি বলছি একটুও ব্যথা দিবো না! ওকে একটু আমার কাছে দিবে?”
তূর্ণার কথাগুলো সাধারণ মানুষের মত মনে হলো না আবারও। রৌদ্রিক ঠিক বুঝতে পারছে না, সে যেটা ভাবছে সেটা কি ঠিক? এইভাবে কারো সম্পর্কে না জেনে তাকে মানসিক রোগী ভাবাটা ঠিক না, তবে তূর্ণার এতক্ষণের আচরণ আর কথাবার্তা সেটাই ইঙ্গিত করছে। তারপরও নিজের মধ্যে থাকা ভাবনাগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে-
“ হুম ও আমার পুতুল, আমার জান। এখন ঘুমাচ্ছে, ঘুম থেকে উঠলে কোলে নিও!”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণার মুখশ্রী চকচক করে উঠলো। ওষ্ঠপুটে চওড়া হাসির রেখা ফুটে উঠলো মুহুর্তেই। এর আগে কোনোদিন সে বাচ্চা কোলে নেয়নি, পাগল বলে কেউ তার কোলে বাচ্চা দিতে ভয় পেতো। যদি হুট করে আঘাত করে বসে সেই ভয়ে! তবে আজকে কেউ তাকে বারণ করছে না, এই বাড়িতে আসার পর থেকে এই বর নামক মানুষটাই হয়তো তূর্ণার সঙ্গে ভালো ভাবে কথা বলছে। হ্যাঁ লোকটা একটু গম্ভীর, কেমন কেমন করে কথা বলছে যার জন্য ভয়ও লাগছে তার। তবে তার থেকে বেশি ভালো লাগছে! রৌদ্রিক শান্ত চোখে নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর মুখপানে চেয়ে রইলো ক্ষানিকটা সময় নিয়ে।
মানুষ সামাজিক জীব, তাই এদের সবসময় ঐকবদ্ধ হয়ে বাস করতে হয়ে। বিশেষ করে সেটা যদি হয় পুরুষ তাহলে হয়তো আরও আগে একাকীত্ব জীবন পার করতে দেওয়া চলবেই না! সেখানে তো রৌদ্রিকের অর্ধেক জীবন পরে আছে, বর্তমান রৌদ্রিকে জীবন বলতে তার মেয়ে রোদেলা। মেয়ের জন্মের দুই মাস থেকে নিজ হাতে বড় করছে, জীবনটা যতটা সহজ দেখায় আসলে জীবন ততোটাও সহজ নয়। দুধের শিশুকে একা মা ছাড়া সামলানো কতটা কষ্টসাধ্য সেটা হয়তো রৌদ্রিক খুব ভালো করে বুঝেছে সে। তবে নিয়তি হয়তো চেয়েছিলোই এমনটা তাই ওইটুক বাচ্চাকে ঘিরেই রৌদ্রিকের সমগ্র জীবনটা জুড়ে আছে। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বলে-
“ যাও এইসব পাল্টে একপাশে শুয়ে পর, রাত হয়েছে অনেক।”
রৌদ্রিকের কথা তূর্ণা অবাক হলো বেশ! সে বিস্মিত নয়নে রৌদ্রিকের দিকে চেয়ে বলে-
“ সত্যিই তুমি আমাকে এই খাটে শুতে দিবো? আমাকে বকবেও না মারবেও না..!!?”
“ কেনো এর আগে খাটে ঘুমানি তুমি?”
“ ঘুমিয়েছি তো কিন্তু ওটা অনেক ছোট আর শক্ত। একবার রূপা আপুর খাটে বসেছিলাম, জানো বর রূপা আপু অনেক জোরে জোরে মে*রেছিলো! পায়ে অনেক ব্যথা পেয়েছিলাম! ”, ’ শেষের কথাটা একটু ভয়ে ভয়ে বললো তূর্ণা’
এদিকে রৌদ্রিক বেশ অবাকই হলো, খাটে বসার জন্যও কি কেউ মারে? রৌদ্রিক বুঝলো না হুট করে কার সঙ্গে তার জীবন জুড়ে গেলো। আর তূর্ণার এতক্ষণের কথা শুনে যা বুঝলো মেয়েটার উপর ওর বাড়ির সকলেই অত্যাচার করতো। এইসব বিষয়ে মাথা ঘামাতে চাচ্ছে না, তবুও ঘুরে-ফিরে এই প্রসঙ্গই তার মস্তিষ্কে ফিরে আসচ্ছে।
“ আজ থেকে কেউ মারবে না তোমায়। যাও ফ্রেশ হয়ে আস!”
তূর্ণা ভদ্র বাচ্চার মত উঠে দাঁড়ালো, এদিক-ওদিক চোখ ঘুরালো। তার কাছে তো জামা নেই, এখন কি পরবে সে। তার বরকে বলবে এই কথা? আবার ভাবলো যদি বকা দেয় তাকে! তাই কোনো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো রুমের মাঝ বরাবর। এদিকে রৌদ্রিক হাতের ঘড়ি খুলে সামনে তাকাতেই তূর্ণাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো।
“ দাঁড়িয়ে আছো কেনো? যাও ফ্রেশ হয়ে আসো!”,‘ শেষের কথাটুকু হালকা ধমকের স্বরে বললো’
তূর্ণা কেঁপে উঠলো খানিকটা! সে কি বলবে এবার? হাত কচলাতে শুরু করলো, ভয় লাগছে যদি লোকটা রেগে যায় তখন? রৌদ্রিক হয়তো এতোক্ষণে বিষয়টা বুঝতে সক্ষম হলো। সে নিজের আলমারির কাছে গিয়ে গিয়ে কিছু সময় বিয়ে একটা টিশার্ট আর টাউজার এনে তূর্ণার দিকে এগিয়ে দিলো গম্ভীর স্বরে বলে-
“ যাও পাল্টে আস, সকালে জামার ব্যবস্থা করে দিবো।”
তূর্ণা ভদ্র বাচ্চার মত মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। রৌদ্রিক সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো! বিয়ের পর পরই তার সার্জারি ছিলো। পেশায় সে একজন সার্জন, পারিবারিক ব্যবসা থাকার পরও নিজের সার্জন হওয়ার ইচ্ছেটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ঢ়ার বদৌলতে আজকে একজন সফল সার্জান সে।
কিছু সময় পর বাথরুম থেকে তূর্ণা চিৎকার দিয়ে আধভেজা অবস্থায় বেরিয়ে আসে। মেয়েটা বেশ ভয় পেয়েছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তূর্ণা আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠে-
“ বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে! ছাদ ভেঙে গেছে তো কেমন করে বৃষ্টি পরছে বর।”
রৌদ্রিক একবার বাথরুমের দিকে তাকালো, ভিতরে সাওয়ার অন করা। যার কারণে পানি পরছে, রৌদ্রিক এই মুহুর্তের কথা বলতে ইচ্ছে করলো না। তাই চুপচাপ টাওয়ালটা তূর্ণার কাছে এগিয়ে দিয়ে বলে-
“ ওটা বৃষ্টি না ওটা ঝরনা। যাও মাথা মুছে একপাশে শুয়ে পর।”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে মেনে নিলো পুরোটা। চুপচাপ রোদেলার পাশে শুয়ে পরলো, বাচ্চাটার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। এই জীবন্ত পুতুলটা ঘুম ভাঙলে সে কোলে নিবে, ইসস কি খুশি লাগছে তার!
রাত্রির কৃষ্ণবর্ণ সরে গিয়ে ধরণীতে নব দিনের সূচনা হয়েছে আবারও। পক্ষীরাজরা আবারও আপন নীড় থেকে বের হয়ে দূর মুক্ত আকাশে মত ডানা মেলছে তারা। দরজায় টোকার শব্দে রৌদ্রিকে ঘুম ছুটে যায়, কোনো রকমে সোফা থেকে উঠে একনজর বিছানার উপর ঘুমিয়ে থাকা রোদেলাকে দেখে নিলো। তারপর নজর গেলো পাশেই গুটিশুটি ভাবে নিদ্রায় মগ্ন তূর্ণার দিকে। মেয়েটা একবারে বিছানার শেষ ভাগে শুয়ে আছে, রৌদ্রিক আর কিছু ভাবলো না সোজা দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই জবা সিকদার কে দেখতে পেলেন, জবা সিকদার নিজের ছেলেকে দেখা মাত্রই ভেজা গলায় বলে ওঠে-
“ বাপরে মাকে মাফ করিস! তোর ভালো করতে দিয়ে এমনটা হবে ভাবিনি। তুই চিন্তা করিস না ওই পাগল মেয়ের সঙ্গে তোর ডিভোর্সের ব্যবস্থা করে দিবো।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার নজরে এলো বিছানার উপর ঘুমিয়ে থাকা তূর্ণার উপর। ভালো করে চোখ বুলিয়ে সোফায় আলাদা ব্ল্যাঙ্কেট দেখতে পান। যেটা দেখে তিনি বুঝে যান তার ছেলে সারা রাত ওই সোফায় শুয়ে ছিলো। যেটা দেখে তূর্ণার উপর রাগটা তার বেড়ে গেলো তরতর করে। রৌদ্রিক হয়তো জবা সিকদারের মনোভাব বুঝতে পারলো, তাই জবা সিকদার এগিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে ঘুম জড়ানো শান্ত কণ্ঠে বলে-
“ মা এমন কিছু কর না। তুমি যা চেয়েছো সেটাই করেছি আমি, তারপরও এইসবের মানে কি?”
“ কে বলেছে এমনটা চেয়েছি, আমি তো কোনো পাগলকে আমার ছেলের বউ হিসেবে চাইনি। তোর তো ওই রূপার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা।”
“ কথা ছিল মা, সেটা হয়নি। আর মেয়েটাকে মেবি ওর ফ্যামিলি সেভাবে টেককেয়ার করত না। তাই তুমিও ওর সাথে খারাপ কিছু করিও না।”
জবা সিকদার ছেলের কথায় অবাক হলেন। তার ছেলেকে এই মেয়েকে মেনে নিয়েছে?
“ রৌদ্রিক তুই কি ওকে মেনে নিয়েছিস? ”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১
রৌদ্রিক একবার ঘুমন্ত তূর্ণাকে দেখে নিলো। সে আসলে কি চাচ্ছে সেটা সে নিজেও জানে না, শুধু এতটুকুই জানে মেয়েটাকে এখন বিরক্তি কিংবা মানসিক ভাবে আরও অশান্তি সৃষ্টি না করা। রৌদ্রিক তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বলে-
“ জানি না মা, মেনে নিয়েছি নাকি না। তবে ও আর রোদেলার মধ্যে এখন পার্থক্য নেই। রাতেই বুঝতেছিলাম কিছু একটা আছে, তোমার কথায় সিউর হলাম।”
“ কি বলছিস এইসব তুই। তুই এই মেয়েকে ডিভোর্স দিবি, তোকে আর রোদেলাকে সামলানোর জন্য একটা বউমা চেয়েছিলাম। কিন্তু এই মেয়ে নিজেই তো পাগল তোদের আর কি সামলাবে!”
