Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩২ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩২ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩২ (২)
jannatul firdaus mithila

“ আমার চাইতেও বেশি সুন্দর?”
সহসা মুখের উজ্জ্বল হাসিটা নিভে গেল সপ্তদশীর। গমগমে কন্ঠস্বর কানে যেতেই বুক কেঁপে উঠল খানিক। বরফের পুরু আস্তরণে দেবে থাকা উষ্ণ শরীরটা তড়িঘড়ি করে শোয়া ছেড়ে উঠে বসতে তৎপর হলো কেমন। সপ্তদশীর দু-হাতের নরম বাঁধন ঢিলে হয়েছে ইতোমধ্যে। সেই সুযোগে কিউটি মহোদয় লাফ দিয়েছে পাশে। কয়েকহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা নির্দয় মানবের একজোড়া বাদামী চোখ কেমন সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহি’র পানে। তার চোখদুটোতে একরাশ সন্দিগ্ধ ভাবসাব! চোয়াল শক্ত, নিখুঁত ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে আছে সামান্য। মাথার ওপর ওমন ভারী স্নোফল হওয়া স্বত্বেও যুবকের ফর্সা উদোম গায়ে কাপড়ের ছিটেফোঁটা অব্ধি নেই। ঢিলেঢালা ট্রাউজারের ডোর অবহেলায় ঝুলছে উদরকুন্ডের বেশ নিচে! ফলে দৃশ্যমান হচ্ছে রূঢ় মানবের বেপরোয়া, উদাসীন ভাব। দিনের আলোয় স্পষ্টতর যুবকের টানটান বলিষ্ঠ দেহ! মাথার চুলগুলো আজ-ও এলোমেলো তার। দু’হাত গুঁজে রাখা পকেটে। এদিকে ঠান্ডা হাওয়ার লাগামহীন স্পর্শে গায়ে কাঁপন ধরছে মাহি’র।

বেচারি এতক্ষণে টের পেল ঠান্ডার তীব্রতা। কাঁপতে কাঁপতে দু’হাত মুখের কাছে এনে, ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে উষ্ণ ধোঁয়া ছাড়ছে সপ্তদশী। কোনরকমে টলতে টলতে দাঁড়িয়েছে সে। আড়দৃষ্টে অদূরের রূঢ়ভাষী মানবের পানে একপল তাকাতেই চোখদুটো আপনা-আপনি কপালে উঠে গেল তার। যেখানে সে কাপড় পড়েও কাঁপছে, সেখানে রা’ক্ষসটা কি-না উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে? তার কি ঠান্ডা লাগছে না? নিজের অহেতুক ভাবনায় মত্ত সপ্তদশী, বেমালুম ভুলে গেল মনস্টারের করা প্রশ্নের জবাব দিতে। তার এহেন অবাধ্যতায় চোয়াল ফুটল বিপরীত মানুষটার। চোখদুটোতে ছেয়ে গেল অদৃশ্য আগুন। সে কেমন কিড়মিড় করতে করতে এগোচ্ছে সম্মুখে। মাহি আড়দৃষ্টে যুবকের অগ্রসর পদ পরোখ করতেই হকচকিয়ে পিছিয়ে যায় দু-কদম। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে তার বদন! নরম-সরম হাতদুটো একে-অপরের সনে ঘষে যাচ্ছে অনবরত। অথচ যুবক কেমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় এগোচ্ছে দেখো! পায়ের গতি মাহি’র বেশ নিকটে এনে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ ম’রার জন্য জায়গার অভাব পড়েছিল বান্দীর মেয়ে? শুধু শুধু সময় নষ্ট করে এই ঘন তুষারপাতে বের হলি কেনো? এরচেয়ে বরং প্যালেসের ছাঁদ থেকে একটা লাফ দিতি।”
তড়াক জ্বলে উঠল সপ্তদশীর মাথার তালু। নাকের পাটা ফুললো সামান্য। ফর্সা কপোলে টকটকে লালাভ আবরণ ফুটেছে বেশ আগে, তবে যুবকের এহেন অহেতুক খোঁচায় তা আরও গাঢ় হয়েছে এবার। তেলেবেগুনে ছ্যাৎ করে উঠার ন্যায় গজগজ করতে করতে মাহি শুধায়,
“ যখন-তখন ভুলভাল বকবেন না! আমি এখানে ম’রতে আসিনি।”
দৃষ্টিযুগল সরু হলো মুগ্ধের। চোয়ালের পেশী আগের ন্যায় টানটান। মুখাবয়বে একরাশ বিরক্তি লেপ্টে যুবক ফের খেঁকিয়ে বলল,

“ তাহলে কি এই ঠান্ডার মধ্যে বাদঁরের মতো নাচতে এসেছিস বান্দীর মেয়ে?”
দাঁতে দাঁত চাপলো মাহি। রাগ-ক্ষোভে তক্ষুনি মুখ ঘোরায় অন্যত্র। যুবকের একেকটা কথা যেন তার মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুনে ঘি ঢালতে সক্ষম। সপ্তদশী বয়সের তুলনায় রাগ দেখাল বেশ। মনের কোণে বিন্দুমাত্র ভয় না রেখে সঙ্গে সঙ্গে কড়া কন্ঠে জবাব দিলো —
“ ফর ইউ্যর কাইন্ড ইনফরমেশন — আমি নাচতে পারিনা! সো উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।”
মেয়েটার এহেন তিরিক্ষি জবাবে কপাল গুটিয়ে চাইলো মুগ্ধ। মস্তিষ্কে জ্বলে উঠল আগুন। যুবক কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে আচানক এক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম চোয়াল। তার ওমন অতর্কিত আক্রমণে বিলকুল ভড়কায়নি মাহি। উল্টো চোখমুখ খিঁচে চোয়াল শক্ত করে রাখল কেমন! মুগ্ধ হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। শক্তপোক্ত হাতের আঙুলে জোর বাড়িয়ে কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,

“ নাচতে পারিস না তবে মুখে মুখে তর্ক তো ভালোই করতে পারিস ঘাড়ত্যাড়ার ঘরে ঘাড়ত্যাড়া। কতবড় সাহস হলে আমার মুখে মুখে তর্ক করিস! দেই এবার চোয়ালটা ভেঙে বেয়াদবের বাচ্চা?”
নাক ফুলিয়ে একাকার মাহি। কপালে ফেলেছে গোটাকতক ভাঁজ। নিজেকে শক্ত রাখার কপট প্রয়াসে বরাবরের ন্যায় ব্যর্থ বেচারি। চোয়ালের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠে এবার। যুবক বুঝি এক্ষুণি নিজের রাক্ষুসে শক্তিতে তার চোয়ালখানা ভেঙে গুড়িয়ে দিবে । মাহি’র ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো ব্যথাতুর শব্দ। তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ক্রুর হাসল মুগ্ধ। মাহি’র তুলতুলে নরম গালে নিজ শক্তপোক্ত মোটা মোটা আঙুলগুলো বেশ দাবিয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ ব্যথা লাগে বান্দীর মেয়ে? অথচ আমার সামনে তোতাপাখির মতো চোয়াল নাড়ানোর সময় একবারও বুক কাঁপে না তোর? এই তোর আমাকে ভয় লাগে না বান্দীর মেয়ে?”
চোয়াল ভঙ্গুর প্রায়! তবুও ঝাঁঝ কমেনি সপ্তদশীর। মাথাটা ত্বরিত দু’ধারে নাড়িয়ে চট করে চোয়ালটা ছাড়িয়ে নিলো মুগ্ধের হাত থেকে। ব্যথাতুর চোয়াল নাড়িয়ে তিরিক্ষি কন্ঠে আচমকা বলে ওঠে —
“ না লাগে না আপনাকে ভয়! একদম লাগে না!”
কথাটা জিভ খসে বেরুনোর পরপরই সপ্তদশীর নরম তুলতুলে ডান গালটায় আচমকা সপাটে বসল এক থাপ্পড়। মুহুর্তেই গালটা কেমন জ্বলে উঠল বেচারির। ঘাড় বেঁকে গেল থাপ্পড়ের তীব্রতায়। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে আপনা-আপনি বেরিয়ে গেল ফোপাঁনোর শব্দ। জ্বলতে থাকা গালের ওপর আনমনে চলে এলো বেচারির হাত। তবে পরমুহূর্তেই ঘটল আরেক কান্ড! মুগ্ধের রুক্ষ আঙুল সহসা সপ্তদশীর চুলের গোছা খপ করে টেনে ধরেছে। চুলের যন্ত্রণায় এবারেও ককিয়ে ওঠে মাহি। চোখমুখ খিঁচে নিতেই কর্ণকুহরের ছিদ্র দিয়ে ঢুকল মুগ্ধের হিং স্র গর্জন!

“ আমাকে ভয় লাগে না তোর? ইউ্য ব্লা’ডি বি’চ! আমাকে, এই রুশদী কিং-কে ভয় লাগে না তোর? খুব আশকারা পেয়েছিস তাই না বান্দীর মেয়ে? দ্যান ওয়েট! মাইকেল!”
কঠিন হুংকারে দ্রুত পদে ছুটে আসে মাইকেল। কালো রঙা স্যুট-ব্যুট পরিহিত লোকটার সে-কি ভয়ার্ত মুখাবয়ব। শরীরটা বড্ড বড়ো। ঘাড় নুইয়ে দুপা আরামে দাঁড় করিয়ে মিনমিনিয়ে আওড়ালেন,
“ ইয়েস মনস্তার! জাস্ট অর্ডার মি।”
রাগে থরথর করে কাঁপছে মুগ্ধের চোয়াল। বাদামী চোখদুটোয় ছেয়ে গেছে রক্তাভ ভাব। সে কেমন কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে আদেশ করল—
“ গো এন্ড গেট সাইকি এন্ড প্রাডা। টুডে দে উইল টেস্ট হার!”
ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় মাহি। চুলের ব্যথা বেমালুম ভুলে গিয়ে শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলল পরক্ষণে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আচমকা বলে বসল,

“ কিহ?”
ক্রমাগত হিসহিসিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। এক ঝটকায় মাহি’র চুলের গোছা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াল সটান হয়ে। দু’হাত পকেটে গুঁজে সম্মুখে পা বাড়িয়ে গমগমে গলায় মাহি’র উদ্দেশ্যে আওড়াল —
“ বাড়ি যাওয়া এন্ড ফেমিলির সাথে কথা বলা ছাড়া নিজের আর কোনো শেষ ইচ্ছে থাকলে বলে ফেল বান্দীর মেয়ে! টুডে ইউ্য আর ফ্রী টু আস্ক ফর এনিথিং।”
আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি। মনস্টারের কথায় ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া জানাবে তা নিয়ে পড়ল বড্ড দোলাচালে। মস্তিষ্ক শূন্য শূন্য ঠেকছে তার। মাইকেল বাগান পথ ধরে পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হতেই ধ্যান ফিরল মাহি’র। তৎক্ষনাৎ বেচারি ছুটে এলো মুগ্ধের নিকট। পায়ের গতি চলমান রেখে দু’হাত জোর করে অনুনয় জুড়ে বলল,
“ প্লিজ প্লিজ এমনটা করবেন না। আমি কথা দিচ্ছি.. আমি, আমি আর তর্ক করব না আপনার সাথে। প্লিজ সাইকি, প্রাডাকে আনবেন না।”

শুনছেনা রূঢ় মানব। দু’হাত পকেটে গুঁজে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটছে গটগটিয়ে। মাহি কেমন ঘাড় উঁচিয়ে অনুভূতি শূন্য নয়নে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। চলন্ত যুবকের সঙ্গে পায়ের তালে জুড়ি মিলা ভার তার। তাইতো থেমেছে মাঝপথে। একযুগল অসহায় দৃষ্টি যুবকের চলে যাওয়ার পথে তাক করে রেখে আচমকা বরফ জমিনে হাঁটু ভেঙে বসল সপ্তদশী। কন্ঠে একরাশ কাতরতা ঢেলে চিৎকার করে আওড়াল,
“ আমায় মে’রে ফেলার পর দয়া করে আমার শরীরটা অক্ষত রাখবেন বিস্ট। আমার পরিবার যেন শেষ দেখাটুকু দেখতে পারে আমায়। আমার মা যেন শেষবার আমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে পারে অন্তত এই সুযোগটুকু থেকে তাদের বঞ্চিত করবেন না।”
থামল মুগ্ধের ব্যস্ত পদযুগল। ঘাড় বাঁকায় অল্প খানেক। ঠোঁটের রেখা সামান্য বাঁকিয়ে গমগমে গলায় প্রতিত্তোর করল,

“ ফা’ক ইউ্য এন্ড ইউ্যর রিকোয়েস্ট! গো টু হেল বান্দীর মেয়ে।”
যুবকের এরূপ তিরস্কারে মূর্ছাগত সপ্তদশী। চোখদুটোর দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে তার। দু-হাটুঁতে হাত চেপে রেখে কাঁদছে নিরবে। যুবক থামেনি। মিনিট খানেকের মধ্যেই আড়াল হলো দৃষ্টি সীমানা থেকে। মাহি ফুপিয়ে উঠল এবার। দু-হাতে মুখখানা ঢেকে নিয়ে ঝরাচ্ছে অশ্রু। ক্ষুদ্র দেহটা তার কাঁপছে কেমন! তা ঠান্ডায় না-কি কান্নার তোড়ে কে জানে! সময় পেরুলো মিনিট পাঁচেক। মাহি নিজ ভাবাবেগে তাড়িত। ঠান্ডায় হাত-পা নীলচে হয়ে যাচ্ছে তার। সেদিকে অবশ্য কোনরূপ উদ্বেগ নেই মেয়েটার। সে কাঁদছে তো কাঁদছেই! তবে এরইমধ্যে মুখ ঢেকে ক্রন্দনরত অবস্থায় আচানক কর্ণকুহরে শুনতে পেলো অতিপরিচিত দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!
“ চাল ওঠ বান্দীর মেয়ে!”
ত্বরিত মুখের ওপর থেকে হাত সরায় মাহি। হতবিহ্বলের ন্যায় ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো সম্মুখে পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা মানবের দিকে। মানবের মুখখানা কঠিন, চোয়াল শক্ত। চোখদুটো বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টে চেয়ে আছে কেমন। মাহি হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। সামান্য ফাঁপা ঢোক গিলে অনুরাগীণী নাকের পাটা ফুলিয়ে আওড়াল,

“ না আপনি মা’রবেন!”
সরু দৃষ্টে ঠায় তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। তার চোখেমুখে এখন আর আগের মতো উপচে পড়া রাগ নেই। দৃষ্টে জমেছে নির্লিপ্ততা! ঠোঁটের রেখায় তেমন একটা প্রাণোচ্ছল ভাব নেই যুবকের। চোয়ালের পেশী টানটান! সে কেমন গম্ভীর গলায় প্রতিত্তোরে বলল,
“ এমুহূর্তে কথা না শুনলে ঠিক মা’রব!”
তক্ষুনি ভড়কায় মাহি। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। হাতদুটো বুকের কাছে জড়সড়ভাবে টেনে রেখে, সপ্তদশী চিবুক ঠেকিয়েছে গলায়। মুগ্ধ একমুহূর্ত গভীর চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। আশ্চর্য! চোখদুটো ফের বেহায়া হতে চাইছে তার। মেয়েটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাওয়ার সে-কি নিদারুণ প্রচেষ্টা তাদের। মুগ্ধ বিরক্ত নিজের উদ্ভট কর্মে। কিছুক্ষণ আগেই এখান থেকে গটগটিয়ে চলে যাবার পর থেকে শুরু হলো তার মনো দ্বন্দ। বেয়াদব মনটা তারই বিরুদ্ধে ঘোর অবাধ্যতা দেখিয়েছে। বারবার কোনো কারণ ছাড়া তাকে একপ্রকার বাধ্য করেছে মেয়েটার কাছে ছুটে আসতে। অসভ্য পাদু’টোরও হয়েছে বড়ো জ্বালা! তার অনিচ্ছায় বিপক্ষ দলের প্রতি আজ্ঞাকারীতা দেখিয়ে হেঁটে এসেছে উল্টোপথে। এখন আবার চোখদুটোকে দেখো! কেমন গিলে খেতে চাইছে মেয়েটাকে। অথচ নির্দয় মানবের মস্তিষ্কে এখনো চলছে — মেয়েটা তার শত্রুর মেয়ে। সে ঘৃণা করে তাকে। মুগ্ধ নির্দয়! হুটহাট মনের কথায় সায় দেবার মতো বদঅভ্যেস নেই তার। বিচক্ষণী মস্তিষ্ক বরাবরই জিতে যায় এহেন দোটানায়। বেশ দক্ষতায় মনের কথায় সায় জানানো থেকে আঁটকে রাখে তাকে। আজও হলো তাই। মুগ্ধ নিজ মুখাবয়বে কপট গাম্ভীর্যের ছাপ ফোটালো। পকেট থেকে ডানহাতখানা আলগোছে বের করে এনে তর্জনী উঁচিয়ে তাক করল মাহি’র পানে। কন্ঠে রাগী ভাবস্রোত ধরে রেখে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

“ আর কখনো আমার মুখে মুখে তর্ক করবি?”
গাল ফুলিয়ে দু’ধারে মাথা নাড়ায় সপ্তদশী। নিরবে জানায় — আর করবে না। তা দেখে চোখদুটোতে প্রসন্নতার বদলে খানিক রূঢ়তার দেখা মিললো যুবকের। সে ফের একই ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ সবসময় আমার কথামতো চলবি তো?”
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে আলতো করে ভেজা চোখদুটো মুছতে মুছতে ওপর নিচ মাথা নাড়িয়ে নিরবে সম্মতি জানালো মাহি। তবে এহেন নিরব সম্মতি খুব একটা মনে ধরল না নির্দয় মানবের। সে কেমন ফট করে দিলো এক ধমক!
“ মুখ দিয়ে বল বান্দীর মেয়ে।”
এহেন ধমকে কেঁপে ওঠে মাহি। তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকিয়ে বাধ্য কন্ঠে আওড়ায়,
“ হ্যাঁ চলব!”
প্রসন্ন হাসলেন নির্দয় মানব। নির্ঘাৎ মনের অজান্তেই ডানহাতের রুক্ষ আঙুল দিয়ে আলগোছে আঁকিবুঁকি চালালো বোকা সপ্তদশীর মাথার তালুতে। চাপা স্বরে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“ অলওয়েজ বি মা’ই গুড গার্ল চাশমিস!”
থমকায় মাহি। বোকার মতো চোখ তুলে তাকায় যুবকের পানে। তার এহেন হতবাক দৃষ্টির পানে নজর ঠেকতেই সম্বিতে ফিরল মুগ্ধ। তক্ষুনি নজর সরিয়ে নিজের আঙুলের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল তার। নিজের এহেন উদ্ভট কর্মের উপযুক্ত কারণ না পেয়ে তক্ষুনি নিচে নামাল হাত। মুখগহ্বরে জিভটা খানিক উল্টে পাল্টে দাঁতে দাঁত চাপলেন যুবক। তক্ষুনি মাহি’র কাছ থেকে দু-কদম সরে এসে গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ঁল —
“ প্যালেসে যা।”
হতভম্বতার ডোর বড়ো ঠুনকো সপ্তদশীর। মুহুর্তেই কেটে গেল যুবকের গমগমে কন্ঠে। তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকিয়ে সপ্তদশী দ্রুত পদে পাশ কাটিয়ে চলে গেল যুবককে। এদিকে পেছন থেকে ঘাড় বাকিয়ে তার চলে যাওয়া দেখছে নির্দয় মানব। একমুহূর্ত ঠোঁটের কোণ দাঁত দিয়ে চেপে রেখে পরক্ষণে কপাল গুটিয়ে বিড়বিড়াল —
“ হোয়াট দ্য ফা*ক হ্যাপেনস টু মি হোয়েন শি ইজ এরাউন্ড মি? হলি শিট!”

মুখ ঢেকে আছে ফাঁ**সির কয়েদীদের ন্যায় কালো কাপড়ে। হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা কোমরের কাছে। মধ্যবয়স্কের টলমল কদমজোড়াঁ অন্ধের ন্যায় এগোচ্ছে সম্মুখে। নাকের ছিদ্র দিয়ে ভুরভুর করে ঢুকছে দামী চন্দন কাঠপোড়ার ভারী সুগন্ধি। মধ্যবয়স্ক বুঝে গেলেন — তিনি চলে এসেছেন যথার্থ স্থানে। দু’জন গার্ড এগিয়ে এসে আলতো করে ধরলেন মধ্যবয়স্কের বাঁধা হাত। অতঃপর তাকে একপ্রকার ঠেলেঠুলে নিয়ে গেলেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একখানা কক্ষে। মধ্যবয়স্ক ঢোক গিলছেন ক্ষনে ক্ষনে। গার্ডদের হুটহাট ঠেলাঠেলি অনুসরণ করে চুপচাপ এগোলেন সামনে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর গার্ডরা থেমে গেলেন মাঝপথে। একপ্রকার জোর করে মধ্যবয়স্ককে আলগোছে বসিয়ে দিলেন ফ্লোরে বিছিয়ে রাখা মখমলের তোশকে। মধ্যবয়স্ক মোটেও অবাধ্যতা করলেন না। চুপচাপ বাধ্য ছেলের ন্যায় বসে পড়লেন আসনে। মুহুর্ত ব্যয় হতেই পেছন থেকে কেউ একজন এগিয়ে এসে চট করে কাপড় তুলে নিলো মধ্যবয়স্কের মুখ থেকে। আর ওমনি সম্মুখের সবটা দৃশ্যমান হতে লাগল মানুষটার কাছে।

সামনেই দাউদাউ করে জ্বলছে হবনকুন্ড। তার ঠিক বিপরীতে বসে আছেন একজন দক্ষ ব্রাহ্মণ পন্ডিত। পন্ডিতের চোখদুটো বেঁধে রাখা কালো পট্টিতে। ডানপাশে একখানা বড় ফ্রেমের ছবি রাখা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক অপরুপার মুখ! কি সুন্দর অপ্সরার ন্যায় দেখাচ্ছে তাকে। ছবির সামনে একখানা হলদেটে কলস। যা ঝকমক করছে না! কলসের পানে তাকাতেই চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম যেন। কলসের মুখ ঢাকা লাল কাপড়ে। মধ্যবয়স্ক স্থির দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিয়তক্ষন। ছবিতে থাকা মুখখানা যে তার বড্ড চেনা। মধ্যবয়স্ক সময় নিলেন। রয়েসয়ে ঘাড় বাকিয়ে বা-দিকে তাকাতেই ঝটকা খেলেন খানিক। কয়েক হাত দুরত্বে রাজার ন্যায় দু-পা-ভাঁজ করে বসে আছে গম্ভীর মুখো মুগ্ধ। ডানহাতে লম্বা একটা কাঠের চামচ নিয়ে একটু একটু করে ঘি ঢালছে হবনকুন্ডে। পন্ডিত শাস্ত্রীয় মন্ত্র জপলেও মুগ্ধের ঠোঁট স্থির! চোখদুটো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে হবনকুন্ডের জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখার পানে। মধ্যবয়স্ক ঢোক গিললেন অলক্ষ্যে। তড়িঘড়ি করে নড়েচড়ে বসতে গেলেই টের পেলেন — পিছন থেকে কেউ তার হাতের বাঁধন খুলে দিচ্ছে। মধ্যবয়স্ক কৌতুহলবশত ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন, আর ওমনি তার চোখাচোখি হলো এডউইনের নিলচে -সফেদ রঙা অদ্ভুত অক্ষিপুটের সাথে। তক্ষুনি হকচকালেন মধ্যবয়স্ক! ভড়কে পিছিয়ে যেতে চাইলেই তার দৃষ্টি সীমানা থেকে আলগোছে সরে গেল এডউইন। কয়েক কদম ঘুরে এসে দাঁড়ালো মুগ্ধের বা-দিকে। মধ্যবয়স্ক হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে ঘুরে বসলেন হবনকুন্ডে মুখ করে। শাস্ত্রীয় ভঙ্গিমায় দু’হাত জোর করে প্রার্থনায় বসলেন পরক্ষণে।

সময় পেরুলো বেশ! শ্রাদ্ধের রীতিনীতি পালন হলো সুষ্ঠুভাবে। পন্ডিত মহাশয় পূজো অর্চনা শেষে একখানা বড়সড় থালা এগিয়ে দিলেন বা-দিকে। হাতদুটো কাঁপছে তার, সেই সঙ্গে কাঁপছে কন্ঠস্বর। লোকটা কেমন ভয়ে ভয়ে আওড়ালেন,
“ টিকা টুকু দিয়ে নিন কপালে।”
চোখ পাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। দাঁতে দাঁত চেপে থালাটাকে হাত দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়ে তক্ষুনি উঠে গেল আসন থেকে। অতপর কোনদিক না তাকিয়ে গটগট পায়ে চলে গেল কক্ষ ছেড়ে। পেছনে একদৃষ্টে তার চলে যাওয়া দেখল মধ্যবয়স্ক। রয়েসয়ে তিনিও উঠে দাঁড়ালেন বসা ছেড়ে। খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে এডউইনের পানে তাকিয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ আমি কি মনস্টারের সাথে একটু কথা বলার সময় পেতে পারি?”
এডউইন গম্ভীর মুখে মাথা দোলায় অল্প করে। প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে রেখে পা বাড়ায় দুয়ারের দিকে। গমগমে গলায় বলে,
“ ফলো মি!”

ক্রিমসম চেম্বার!
বিশালাকার কাঁচের তৈরী কক্ষে পা গুনে গুনে ঢুকলেন মধ্যবয়স্ক। অদূরে চোখ পড়তেই দেখলেন — ডেস্কের ওপর দু-পা উঠিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে মুগ্ধ। ডানহাতের দু-আঙুলের ভাঁজে জ্বলছে সিগার। যুবকের ঠোঁটের ফাঁকফোকঁর দিয়ে বেরুচ্ছে সিগারের কলুষিত ধোঁয়া। মধ্যবয়স্ক রয়েসয়ে এগোতে উদ্যোত হলেন। ঠিক তখনি তার নজ আটকালো — মুগ্ধের পেছনের কাচেঁর দেয়ালে। যেথায় আটকে আছে এক বিশাল কুমির। কুমিরটা বুঝি ঝিমাচ্ছে! তাকে দেখেই শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল মধ্যবয়স্কের। তিনি কেমন ঢোক গিলে দাঁড়িয়ে পড়লেন নিজ জায়গায়। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে মিনমিনে স্বরে আওড়াল,
“ কেমন আছো অধীর?”
অদূরের দাম্ভিক যুবক তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি। উল্টো হাত এগিয়ে এনে সিগার গুজঁল ঠোঁটের ফাঁকে। লম্বা এক টান বসিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়ল ধোঁয়া। কর্কশ কন্ঠে শুধালো,
“ এটা জানতে নিশ্চয়ই আসেননি তৌকির মির্জা!”

থতমত খেলেন তৌকির সাহেব। খানিকক্ষণ আমতা আমতা করে ফের আওড়ালেন,
“ এভাবে কথা বলছো কেন অধীর? আমি কি তোমার ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করতে পারিনা? তুমি মানো কিংবা না মানো এটা তো আর পাল্টে যাবে না যে — আমি তোমার বাপ!”
তক্ষুনি ঘাড় বাকিয়ে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করল মুগ্ধ। ধীরে ধীরে হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত সিগারটা পিষতে পিষতে কটমট করতে লাগল কেমন। মুহুর্তেই চোখেমুখে একরাশ আগুন লেপ্টে গর্জন তুলে বলল,
“ বাপ? মা’ই ফুট! আপনার মতো সাপকে বাপ মানে কে? নেহাৎ আপনি শ্যামৌপ্তী দেবীর সেকেন্ড হ্যান্ড হাসবেন্ড বিধায় আপনাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছি, নয়তো এতদিনে আপনাকেও জ্যান্ত পুঁতে ফেলতাম মাটির তলায়।”
কথাখানা শুনতেই তেতেঁ উঠলেন তৌকির মির্জা। রাগ সংবরণ করতে না পেরে ভুলবশত চেঁচিয়ে ওঠে বললেন,
“ অধীর!”

এহেন কন্ঠ কানে যেতেই তৎক্ষনাৎ ডেস্কের ওপর পড়ে থাকা রিভলবারটা তুলে নেয় মুগ্ধ। অতঃপর কোনরূপ আগপাছ বিবেচনা না করে তক্ষুনি ট্রিগার চাপলো বেপরোয়া যুবক। মুহুর্তেই বিকট শব্দে ফায়ার হলো। ভাগ্যক্রমে অল্পের জন্যে বেঁচে গেলেন তৌকির মির্জা। গুলিটা একদম কানের পাশ দিয়ে গিয়েছে তার। বেচারা ভয়ে ভয়ে বুক চেপে ধরে বসে পড়লেন ফ্লোরে। কাঁপতে কাঁপতে হতবাক দৃষ্টে সম্মুখে তাকাতেই হুংকার ছুঁড়ে মুগ্ধ!
“ ভাববেন না গু*লিটা মিস হয়েছে। ইট ওয়াজ মা’ই ফার্স্ট ওয়ার্নিং। হেন্সফোর্থ, আমার রাজত্বে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে কথা বলার আগে দশবার ভেবে নিবেন তৌকির মির্জা। কারণ সম্পর্কে আপনি আমার সো- কলড বাপ হলেও, ক্ষমতায় আমি আপনার চৌদ্দগুষ্ঠীর বাপ!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩২

বুক কাঁপছে তৌকির সাহেবের। একটুর জন্য হার্ট ব্লক হতে হতে গিয়ে বাঁচল তার। তিনি এখনো কাঁপছেন কেমন। একটুখানি স্থির থেকে কুটিলতায় নতমুখে থেমে থেমে বললেন,
“ আমি জানি তোমার কাছে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই অধীর। সে-সব নিয়ে আমার তেমন আফসোসও নেই। যাকগে, যা বলতে এলাম — আগামী ১৫ তারিখ নিরুপমার বয়স ১৮ হবে। হিমাংশু রায়কে দেয়া প্রতিজ্ঞার কথা মনে আছে তো? শত হলেও যার বদৌলতে তুমি অধীর রায় থেকে দ্য গ্রেট রুশদী কিং হলে তাকে দেয়া প্রতিজ্ঞা অবশ্য এতো তারাতাড়ি ভুলে যাওনি আশা করি। পৃথিবীর আর কোনো সম্পর্কের মূল্য না দিলেও আমি চাইব তুমি অন্তত ঐ মেয়েটার সিঁদুরের মূল্য দিও, যে কিনা বিগত ৮ বছর ধরে তোমার নাম করে নিজের সিঁথিতে মেখে আসছে!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৩

2 COMMENTS

Comments are closed.