Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪

এক দেখায় পর্ব ৪

এক দেখায় পর্ব ৪
সুরভী আক্তার

ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৮ টার ঘর ছুঁই ছুঁই করছে ..
দরজা খোলা রেখেই ডাইনিং এ পায়চারি করতে করতে বারবার মেয়ের ফোনে কল করে যাচ্ছেন আজমাল হোসেন ,, তার পাশেই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাবিনা বেগম,,মিহি আর ওর বন্ধুদের আজকের ঘোরাঘুরির Planning সম্পর্কে আজমাল হোসেন এবং সাবিনা বেগম দুই জনেই অবগত, মেয়ের স্বাধীনতায় কখনো হস্তক্ষেপ করেন নি মিহির বাবা-মা , একমাত্র মেয়ে হওয়ার দরুন মিহি যখন যা চেয়েছে তখন তাই দেওয়ার চেষ্টা করেছেন আজমাল হোসেন , তবে ঢাকা শহরের মতো ব্যাস্ত এক শহরে মেয়েকে বন্ধুদের সাথে একা ছাড়তে নারাজ থাকলেও অনেক জোরাজুরি করার পরই মিহিকে বাইরে যাওয়ার জন্য Permission দিয়েছিলেন তারা , জনবহুল পূর্ণ ঢাকা শহরে দিনের তুলনায় রাতের ব্যস্ততা একঠু বেশি থাকে ,, এদিকে রাত ৮ বাজতে চললো তবুও মেয়ে বাসায় ফিরছে না দেখে চিন্তিত হয়ে পরেছেন মিহির বাবা-মা ,, একেরপর এক কল করে যাচ্ছেন মিহির ফোনে ।

অন্যদিকে,,
পড়ে যাওয়ার ভয়ে চোখ মুখ খিচে রেখেছে মিহি ,, তবে যখন মিহি বুঝতে পারে যে সে পড়ে যায়নি বরং ওর হাতটা শক্ত করে কেউ ধরে রেখেছে তখন পিটপিট করে চোখ মেলে সামনে তাকায় , ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় দেখতে পায় লম্বা সুঠাম দেহি একজনকে, যিনি একহাতে মিহির হাত ধরে রেখেছে এবং অন্য হাতে রয়েছে একটি মোবাইল, তাকে দেখেই চোখ আটকে যায় মিহির,লম্বায় প্রায় ৬ ফুট তো হবেই, তার পরনে কালো রঙের একটি ব্রান্ডেড ফুলহাতা শার্ট যার হাতা গুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো যেনো আলোকচিত্রের তুলিতে আঁকা আধুনিক ক্যাজুয়ালতা পূর্ণ, ফর্সা ত্বকে কালো রঙের শার্ট টা বেশ ফুটে উঠেছে , তবে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না one time mask এর আড়ালে ঢাকা রয়েছে মুখটি,, চুলগুলো কপালে এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।
লোকটিকে এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার মাঝেই আবার ও মিহির মুঠোফোনটি বেজে ওঠে, যার শব্দে ঘোর কেটে যায় মিহির,, এলোমেলো চোখের পলক ফেলে তড়িঘড়ি করে লোকটার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় ও ,, তারপর আমতা আমতা করতে করতে লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, যা দেখে মিহি মিনমিনে গলায় বলে..

– আ..আ.. Actually I am Sorry ,, আসলে ভুলটা আমারই , আমি না দেখতে পাইনি,ঐ ব্যাগে বারবার ফোনটা বেজে যাচ্ছিলো তাই ওটা খুঁজতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম..
মিহির কথার মাঝে আবারো ওর মুঠোফোনটি বেজে ওঠে,, মিহি লোকটির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের ফোনের দিকে তাকায় , আব্বু কল করছে , মিহি চোখ গোল গোল করে ফোনের দিকে তাকিয়েই কপালে চাপর মেরে বলে…
” এই যাহ্ আব্বু ফোন করছে…
বলেই তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করতে করতে দৌড়ে রিকশার দিকে চলে যায়, ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিহির বাবা বলে ওঠেন..

– আম্মু,, তুমি ঠিক আছো তো? আর কোথায় আছো তুমি? সেই কখন থেকে তোমাকে ফোন করে যাচ্ছি, ফোনটা রিসিভ করছো না কেনো তুমি? কোথায় আছো তুমি বলো আমি তোমাকে নিতে আসছি ।
– Sorry আব্বু , আসলে ফোনটা ব্যাগে ছিলো তাই বুঝতে পারিনি,,আর তুমি tension করো না আমি রাস্তায় আছি এখুনি আসছি ,, তোমাকে আর আসতে হবে না,,এখন রাখি ?
ফোনটা কেটে দিয়ে রিকশায় উঠতে উঠতে ব্যাস্ত স্বরে রিকশা চালককে বলে — ” ”
” মামা ধানমন্ডির প্রথম সড়কে নামিয়ে দিয়েন ।
মিহি তো চলে যায় ,, তবে পেছনে ফেলে রেখে যায় একজোড়া স্থির দৃষ্টি যা এখনও মিহিতেই সীমাবদ্ধ…
– Rafi ,, what happened ? এদিকে আমার প্রান যাই যাই অবস্থা আর তুই তখন থেকে ঐ মেয়েটার দিকে ওভাবে ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে কি এতো দেখছিস বলতো ?

কারোর কথায় ধ্যান ভাঙ্গে রাফির,, আরো একবার তাকিয়ে দেখে অদুরে চলে যাওয়া রিকশাটির দিকে যা এখন প্রায় চোখের আড়াল হয়ে গেছে। কতক্ষন যে এইভাবে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল তা নিজেও জানেনা রাফি । এবার রাফি নিজেকে সংযত করে , তারপর পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে..একহাত হাঁটুতে এবং একহাত কোমরে রেখে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত , শান্তকে এমন অবস্থায় দেখে রাফি আবারও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
এইতো কিছুক্ষণ আগে,, রুহির পাঠানো location অনুযায়ী রাফি আর শান্ত এখানে এসেছিলো রুহিকে নিতে , মোড়ের মাথায় গাড়ি থামিয়ে রাফি আর শান্ত গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। গাড়ি থেকে নামার আগে রাফি মুখে মাস্ক পড়ে নেয় যাতে ওকে কেউ চিনতে না পারে, কিন্তু গাড়ি থেকে নামার পরেই অসাবধানতাবশত শান্ত একটা কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে যায় , যা দেখে সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকা রাফিও নিজের হাসি কন্ট্রোল করতে পারেনি, উচ্চ শব্দে হাসতে হাসতে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে শান্তর এই অবস্থার ভিডিও করতে শুরু করে । ঠিক তখনই ধাক্কা লাগে মিহির সাথে..

বর্তমান..
– ব্যাটা এটাই হলো প্রকৃতির নিয়ম বুঝলি,, তুই আমার পেছনে লেগেছিলি না এখন দেখ । তোর পিছনে হাজার হাজার মেয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অথচ তুই কাউকে দু পয়সার ও পাত্তা দিস না ,, আজ দেখ ঐ মেয়েটা তোকেই দু পয়সার ও পাত্তা দিলো না ,,How interesting…
কোমর সোজা করে শার্টের কলার ঠিক করতে করতে ভাব নিয়ে কথাগুলো বলল শান্ত,,
শান্তর এহেন কথায় রাফি ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল..
– এবার তুই একটু বেশি বেশি বলে ফেলছিস না ?
– আমি আবার কি বললাম ? যা দেখলাম তাই তো বললাম । আমি তোকে First time কোনো মেয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম,, কিন্তু আফসোস মেয়েটা তোকে পাত্তাই দিলো না । আচ্ছা ভাই তুই আবার ঐ ডাগর চোখা মেয়েটির প্রেমে পড়ে যাসনি তো-?

– কথা বারাস না,, রুহি wait করছে তাড়াতাড়ি চল ।
শান্তকে এড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথাটা বলল রাফি । শান্ত হতাস শ্বাস ছেড়ে বলল…
– যাহ বাবা ,, এখন কি তুই আমাকেও পাত্তা দিবি না নাকি? আসবে আসবে আমার ও দিন‌ আসবে তখন আমিও দেখিয়ে দেব।
বলতে বলতে রাফির পিছনে হাঁটা লাগায় শান্ত ।

আর এই দিকে রুহি সেই তখন থেকে টং দোকানে বসে অপেক্ষা করছে ওর ভাইয়ার জন্য , অথচ তার আসার কোনো নাম নেই , অবশেষে রুহি বিরক্ত হয়ে রাস্তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়…
– Sissy..
চিরচেনা সেই কন্ঠে চেনা সেই আদরের ডাক শোনা মাত্রই রুহি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়,, সামনে ভাইয়াকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ভাইয়া কে । আদুরে কন্ঠে বলে…
– এতোক্ষণে তোমার আসার সময় হলো ভাইয়া, সেই কখন থেকে আমি এখানে একা একা বসে আছি জানো ?
– কেনো? একা একা বসে আছিস কেনো? তোর Friends রা কোথায়? যাদের জন্য আমরা দেশে আসার কথাটা তুই বেমালুম ভুলে গেলি তারা তোকে এখানে এভাবে একা রেখে চলে গেলো ?
– Sorry বললাম তো ভাইয়া, আসলে আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো আজকের তারিখটা । তাইতো আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে এসেছিলাম । আর ওরা তো তোমার আসার কথা শুনে একটু আগে চলে গেল।
আদুরে গলায় কথা গুলো বলে রুহি । রুহির কথা শেষ হতেই শান্ত রাফির পিছন থেকে বলে ওঠে…
– কেমন বন্ধু নিয়ে ঘুরো, যারা তোমায় এভাবে মাঝরাস্তায় একা ফেলে চলে যায় ?
শান্তর এহেন কথায় হঠাৎ করেই শান্তশিষ্ট রুহির মেজাজ বিগড়ে যায়, রুহি কপাল কুঁচকে নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে..

– আপনি? আপনি এখানে কেনো এসেছেন ? আর কোন সাহসে আপনি আমার বন্ধুদের সম্পর্কে এসব কথা বলছেন?
রুহির কথায় শান্ত বিড়বিড় করে বলে..
– বাপরে,,বেডি বড্ড চেইতা গেছে। যেমন ভাই তার তেমন বইন , DNA test এর কোনো প্রয়োজন নাই – পুরাই কার্বন কপি।
– বিড়বিড় করে কি বলছেন হ্যাঁ ? আর ভাইয়া তুমি ওনাকে এখানে কেনো নিয়ে এসেছো ?
– আবার শুরু হয়ে গেল তোদের মাঝে । রুহি, তাড়াতাড়ি চল বাড়িতে সবাই wait করছে ।
রাফির কথার পর আর কেউ কথা বাড়ায় না,, রুহি শান্তকে ভেংচি কেটে গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ে । গাড়িতে বসে রুহি রাফিকে বলে..
– ভাইয়া তোমার ফোনটা একটু দাও তো ,, একটা কল করতে হবে।
বিনা বাক্যে রাফি রুহিকে নিজের ফোনটা দিয়ে দেয় । ফোন হাতে নিয়েই রুহি মিহিকে কল করে, দুই-একবার রিং হওয়ার পর মিহি কল রিসিভ করে.. রুহি বলে….
– হ্যালো Pakhi ,, তুই ঠিকমতো বাসায় পৌছে গেছিস তো ?
– আমি ঠিক আছি,, আগে নিজের কথা বল ,, কোথায় তুই? তোর ফোনটাও তো অফ । আমার কি tension হচ্ছিল তুই জানিস ?
রুহি আলতো হাসে মিহির কথায় । কোমল কন্ঠে বলে…

– আমি এখন গাড়িতে আছি,, ভাইয়া এসেছে, বাসায় ফিরছি । tension করিস না।
এরপর দুই বান্ধবী মিলে আরো কিছু কথা বলে ফোন রেখে দেয়।
“এই নতুন পাখির আমদানি আবার কোথা থেকে হলো?
রুহির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে শান্ত..শান্তর সাথে তাল মিলিয়ে রাফিও বলে…
“এই Pakhi টা আবার কে ?”
শান্তর কথায় পাত্তা না দিলেও রাফির কথায় রুহি এই কদিনে ঘটে যাওয়া সবকিছু এক এক করে বলে দেয়। এবং এটাও বলে যে.. মিহি ওর Best friend এবং ওরা একে অপরকে Pakhi বলে ডাকে। রুহির সব কথা শুনে শান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রাফি বলে…

এক দেখায় পর্ব ৩

– এই কদিনের পরিচয়ে তুই একটা মেয়েকে নিজের Best friend বানিয়ে নিলি ?
রাফির কথায় বাঁধা দিয়ে শান্ত হাত উঁচিয়ে বলে..
– Objection,,,ও না হয় কদিনের পরিচয়ে Best friend বানিয়ে নিয়েছে । কিন্তু তুই ? তুই তো শালা জীবনের প্রথম বারের মতো এক দেখায় একটা মেয়ের…..
আর কিছু বেফাঁস বলার আগেই রাফি শান্তর পা নিজের শক্ত Boot দিয়ে চেপে ধরে । কুকিয়ে ওঠে শান্ত । অমনি চুপ হয়ে যায় সে । রাফি কটমট করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় ওর দিকে ।
রুহি কিছু না বুঝতে পেরে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে । রাফি একবার গাড়ির ফ্রন্ট মিররে দেখে নেয় রুহির অবস্থা ।

এক দেখায় পর্ব ৫