Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২
সুরভী আক্তার

কাবির পরিবার আজ মেতেছে রঙিন আনন্দে । পুরো বাড়িতে উৎসব মুখরতা । কত বছর পর আজ সেজেছে এই বাড়ি ? বাড়ির সবাই মেতেছে নতুন আমেজে । এ বাড়ির বড় মেয়ে #সিরাত_কাবির । বিয়ের পর পদবী পরিবর্তন হয়ে #সিরাত_নেওয়াজ । তোফায়েল কাবিরের বড় মেয়ে সে । তোফায়েল কাবির তৌসিফ কাবিরের থেকে ছোট হলেও বড় ভাইয়ের আগে বিয়ে করেছিলেন তিনি । তার বিয়েটা ছিলো প্রেম ঘটিত । তৌসিফ কাবির নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ছোট ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন আগে । বড় ভাইয়ের বিয়ের আগেই একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছিলেন তোফায়েল কাবির । সেই কন্যা সন্তানই সিরাত । আজ সেই সিরাত মা হয়েছে । বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পর মাতৃস্বাদ পেয়েছে সে । এই নিয়ে খুশির শেষ নেই কাবির পরিবারে । সিরাতের বিয়ের দুই বছর পর থেকেই কাবির ম্যানশনে ঠাই হয়েছে ওর ‌। শশুর বাড়িতে ঠাই মেলে নি । স্বামীসহ কাবির পরিবারেরই বসবাস তার ।
বিয়ের পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে সিরাত । আজ সেই সন্তানের নামকরণ । ধুমধাম পড়েছে কাবির ম্যানশনে । খুশির জোয়ার নেমেছে ।

সময়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মাঝে পাঁচটা বছর কেটে গেছে এর মধ্যেই । এই পাঁচ বছরে বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হয় নি । শেষ বার ধুম পড়েছিল এ বাড়ির ছোট ছেলে রুডভিক কাবির রৌদ্রের বিয়ে নিয়ে । কিন্তু সেটাও অযাচিত একটা স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে । উৎসব ভেঙে শূন্যতা নেমেছিল এ বাড়িতে । রৌদ্রের অনুপস্থিতির শূন্যতা । ছেলেটা সেই যে সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে , আর ফেরে নি । দেশেও থাকে নি । পাড়ি জমিয়েছেন অদূরে । সুদূর সুইজারল্যান্ডে ।
কাবির পরিবারের সবার মুখেই আজ উপচে পড়া হাসি । সিরাতের বাচ্চার নাম করনের অনুষ্ঠান ঘরোয়া ভাবে । দু’দিনের একটা বাচ্চা । আজই দুপুরে হাসপাতাল থেকে ফিরে মা-মেয়ে মুখোমুখি হয়েছে হুটোপাটির । বাচ্চা টাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে সবার মাঝে ।

বাড়িতে ঢোকা মাত্রই সবার প্রথমে বাচ্চাকে কোলে নিয়েছে শুভ্র । অতি আলগোছে নরম তুলোর মতো ছোট্ট শরীর টাকে কোলে নিয়ে অজস্র চুমু খেলো সে । সে ওর বড় মামা । ইশশ্ , ভাগ্নি হয়েছে ওর । আদ্র ছটফট করে হাতাহাতি করছে বাচ্চা কে কোলে নিতে । শুভ্র ছাড়ছে না । ওর এখনো সাধ মেটেনি বাচ্চা কে কোলে নিয়ে । বাকিরা তো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বিচলিত হয়ে । শুভ্র আদ্রের বড় ‌। আদ্র উদগ্রীবতা ধরে রাখতে পারলো না ‌, বললো….
” ভাইয়া , এবার আমার কোলে দাও না ওকে । হসপিটালেও আমি ওকে কোলে নিতে পারি নি ।
” আগে ওর একটা নাম দেবো, তারপর ছাড়বো ওকে । ওর নাম কি দেওয়া যায় বলতো ? #আহিয়ান_নেওয়াজ আর #সিরাত_নেওয়াজের একমাত্র মেয়ের নাম কি দেওয়া যায় ? #আহিরাত_নেওয়াজ । নামটা কেমন , কাল অনেক ভেবে ভেবে নামটা বাছাই করেছি । আপু , বলতো নামটা কেমন হয়েছে । ভাইয়া , পছন্দ হয়েছে তোমার ?
সিরাত আর আহিয়ান কেবলই হাসলো । শুভ্রের বড় সিরাত । সিরাত মুচকি হেসে বললো…
” তোর পছন্দ হলেই হলো । বড় মামা হিসেবে ওর নামটা না হয় তোর পছন্দেই হোক ।
” অবজেকশন !!

চিকন মেয়েলি উঁচু কন্ঠে সবাই তাকালো সিঁড়ির দিকে । এ বাড়ির ছোট মেয়ে হাজির । তৌসিফ কাবিরের ছোট মেয়ে , শুভ্রের একমাত্র বোন #শাফাহ্_কাবির । এতক্ষণ ঘরে ছিলো । সিরাতের আসার আভাস পেয়েও নামে নি । এখন নেমেই হুটোপাটি করে দৌড়ে আসলো । ভরা গাল হেসে শুভ্রের কোলের বাচ্চা টাকে দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো । বললো….
” মাশাআল্লাহ আপু । তোমার মেয়েতো পুরো আমার মতো দেখতে হয়েছে ।
” এহহ্ , এসেছে গাব্বু ।
আমাদের আহিরাত পুরো সিরাত আপুর মতো মিষ্টি হয়েছে । তোর মতো চুনোপুঁটি হয় নি ।
শুভ্রর কথায় মুখ ভেংচায় শাফাহ্ ।
” ভাইয়া , মোটেও আমি চুনোপুঁটি নই । আর ও তো আমার মতোই হয়েছে । আর ওর নামটাও আমিই রাখবো । ওর একমাত্র খালামনি যে নাম রাখবে সেটাই গ্রহণযোগ্য হবে । পুরো দেড় ঘন্টা ধরে গুগল করে নাম সিলেক্ট করেছি আমি । ওর নাম –‌ #আলিসা_নেওয়াজ ।

” চুপ করবি । আমি ওর‌ নাম যেটা রেখেছি , সেটাই হবে । তোর ওসব আলিসা,এলিসা ওসব কিচ্ছু রাখা হবে না ।
” ভাইয়া….
” উফফফ , থামবি তোরা ? এসেছিস থেকে শুরু করেছিস । সিরাতকে একটু বিশ্রাম নিতে দিবি তো ? হসপিটাল থেকে ফিরেছে মেয়েটা । এসব নাম রাখারাখি সন্ধ্যায় হবে, এখন নয় । এখন বাচ্চা কে মায়ের কোলে দিয়ে যে যার ঘরে যা ।
শাহিনা কাবিরের কড়া ধমকে থামলো দুই ভাই বোন । এদুটো সবসময় এমন । বয়স বেড়েছে , কিন্তু বাচ্চামো যায় নি খুনসুটি পনায় । তোফায়েল কাবির আর তৌসিফ কাবির সোফায় বসে ওদের কান্ড দেখছেন আর মিটিমিটি হাসছেন । রুবিনা কাবির ব্যস্ত কিচেনে । শুভ্রর কোল থেকে বাচ্চা টাকে নিজের কোলে নিলো আদ্র । অমনি যেনো প্রাণ ফিরে পেলো সে ।
সিরাত এদিক ওদিক তাকিয়ে শাফাহ্ কে উদ্দেশ্য করে নরম নিচু স্বরে বলল….
” ও কোথায় ?
” ঘরেই আছে !
” জ্বর কেমন হলো এখন ? কমেছে ?
” টেম্পারেচার কমেছে একটু । এখন ঘুমিয়েছে । আদ্র ভাইয়া একটু আগেই জ্বর মেপে ঔষধ খাইয়েছে ।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা ।
বাড়িতে টুকটাক মেহমান এসেছেন । ড্রইং রুম মুখোরিত । সিরাত বাচ্চা কে কোলে নিয়ে বসে আছে সবার মাঝে । আহিয়ান বারবার তটস্থ হয়ে পরখ করছে মেয়ে বউকে । অনেক সাধনার পর বাবা হয়েছে সে । এই সুখের জন্য কত কি পেরোতে হলো । কত ঝড় ঝাপটা পেরোলো । অবশেষে সে বাবা হয়েছে ।
রুবিনা কাবির আর শাহিনা কাবির মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যস্ত । ড্রইং রুমের অন্যপাশে বাড়ির কর্তাদের আড্ডা বসেছে । আদ্র বেরিয়েছিল বাইরে । হাতে করে অসংখ্য ব্যাগ নিয়ে ফিরলো ও । সব ব্যাগ ভর্তি খেলনা । এতো সব খেলনা দেখে সিরাত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললো….
” এতোসব কি কিনে এনেছিস তুই ?
দুদিনের একটা বাচ্চা , ও এসব নিয়ে খেলতে পারবে ?
” যখন পারবে তখন খেলবে ।
এসব সফট টয়স , ওর আঘাত লাগবে না একটুও । আমার মামুনির জন্য তার মামার দেওয়া প্রথম উপহার এগুলো ।

বলতে বলতে একপাশে নজর পড়লো । এক কোণে সোফায় গা এলিয়ে গুটিসুটি মেরে নিশ্চল হয়ে বসে আছে কেউ । আদ্র খেলনা গুলো ঝটপট রেখে সেদিকে এগোলো । সামনা সামনি বসতেই পাশের ট্রে নজরে পড়লো । বাটি ভর্তি সুপ রাখা । আদ্র পূর্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলো সামনের জনকে । মেয়েটার চোখ মুখ লাল । টকটকে ফর্সা চেহারা শুকিয়ে গেছে দুদিনের জ্বরে । মুখ মলিন । চোখ দুটোও ফোলা ফোলা । আদ্র বললো মোলায়েম কন্ঠে….
” আমার মেঘ বুড়ির কি হয়েছে ?
জ্বর কমেছে তো । তাহলে এখনো এভাবে মনমরা হয়ে বসে আছে কেনো ?
সামনের মেয়েটার বসে যাওয়া স্বর….
” মাথা ধরেছে আবার , ভালো লাগছে না কিছু । তোমাকে যা আনতে বলেছিলাম , এনেছো ?
আদ্র সতর্কিত নজরে এপাশ ওপাশ তাকালো । শাফাহ্ সিরাতের কোলের বাচ্চার ছবি তুলতে ব্যস্ত । এতক্ষণে হাজার খানেক ছবি তোলা শেষ ।
আদ্র পকেট থেকে কয়েকটা চকলেট বের করলো । চোখ চুরিয়ে এগিয়ে দিয়ে বললো….

” টুকটুকির নজরে পড়লে এগুলোর একটাও পেটে যাবে না তোর । ওকে আলাদা করে দুটো দিয়ে বাকি গুলো নিজের জন্য রেখে দিস ।
অতঃপর সুপের বাটির দিকে তাকিয়ে আবার বললো….
” খাস নি কেনো ?
” মুখ তেতো হয়ে গেছে । কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছে না ।
” এখানে সবার থেকে আলাদা হয়ে বসে আছিস কেনো ? বাবুর কাছে যা ।
” না না , যদি আমার থেকে ইনফেকশন হয়ে যায় ।
” মাঝে মাঝে এমন বোকার মতো কথা বলিস , তোর থেকে ইনফেকশন হবে কেনো ওর ?
কথাটা একটু জোরে ছিলো । সিরাতের কানে পৌঁছেছে । সিরাত গলা উঁচিয়ে বললো….
” আর বলিস না , ওকে কখন থেকে আমার কাছে ডাকছি । নিজেও আসছে না , আমাকেও যেতে দিচ্ছে না ওর কাছে । বাবুর কাছেও আসছে না । ওর জ্বর থেকে নাকি বাবুর ইনফেকশন হবে । লজিক শুনেছিস ওর ?
আদ্র দুদিকে মাথা নাড়ালো । এই মেয়ে মাঝে মাঝে এমন বাচ্চাদের মতো বোঝে । অথচ সবসময় নিজেকে বিজ্ঞ হিসেবে প্রেসেন্ট করে সবার সামনে । যেনো কত বোঝে ও ।
মেয়েটা উঠে দাঁড়ালো । বললো সবার উদ্দেশ্যে….
” আমি ঘরে গেলাম ।
চোখ খুলে রাখতে পারছি না ।
পা বাড়াতে গেলে শাহিনা কাবির গলা বাড়িয়ে বললেন…
” সুপ কখন দিয়ে গেছি , খাস নি কেনো । খেয়ে যা…
মেয়েটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে জবাব দিলো ছোট করে…
” খাবো না মনি ।

ওদের ভাই বোনের মাঝে ক্যাচাল লেগেছে আবার । বাচ্চার নাম কে রাখবে এই নিয়ে । শুভ্র আর শাফাহ্ তর্কে লেগেছে একে অপরের সাথে । ওদের মাঝে ঢুকিয়েছে আহিয়ান কে । শুভ্র বলছে বাচ্চার নাম রাখা হবে আহিরাত । অন্যদিকে শাফাহ্ জিদ্দি খেয়ে বসে আছে । বাচ্চার ওর দেওয়া নামটাই রাখা হবে । আহিয়ান ফেসেছে ওদের দুটোর মাঝে । কে বলবে এ দুটোর বয়স একটার ঊনত্রিশ অন্যটার বিশ । শুভ্র ত্রিশের কাছাকাছি পৌঁছেছে । অথচ নিজের বোনের সাথে বাচ্চার মতো ঝগড়া করে সারাদিন । শাফাহ্ চেঁচালো….
” আম্মু , তোমার ছেলেকে আমার সাথে তর্ক করতে বারন করো । বাবুর নাম আমিই রাখবো । আমার দেওয়া নামটাই রাখা হবে ।

” কিছুতেই না । বাবুর নাম তো আমি রাখবো ।
” ভাইয়া , আমি কিন্তু তোমার এই ঝগড়ার কথা সবটা #মেহের আপুকে জানিয়ে দেবো ।
” এহহ্ , তোর মেহের আপুকে ভয় পাই আমি ?
” ভয় পাও না ? আপুর সাথে তোমার বিয়ে ভেঙে দেবো আমি । বলবো ছেলে ঝগড়ুটে ।
ছেলে মেয়েকে থামালেন তৌসিফ কাবির ।
” তোমরা দুজন থামবে ? সিরাত আর আহিয়ান কে ঠিক করতে দাও ওদের মেয়ের নাম । তোমাদের ঝগড়া বাঁধাতে হবে না এই নিয়ে ।
আদ্র বললো….
” আচ্ছা , তোরা দুজন থাম । আমি একটা নাম ডিসাইট করে দিচ্ছি ।
” আমি বড় মামা , আমি সবার আগে নাম ঠিক করেছি । তাই আমার দেওয়া নামটাই রাখা হবে । তাই না ভাইয়া ?
শুভ্রর করা শেষের প্রশ্নটা আহিয়ানের উদ্দেশ্যে । আহিয়ান শুধুই মাথা নাড়ালো । এতেই তেঁতে উঠল শাফাহ্….
” জিজু , তুমি ভাইয়ার ফড়ে যাচ্ছো কেনো ? তুমি না আমার পার্টনার । আমার হয়ে দল ভারী করবে তুমি । বাচ্চার নাম আমিই রাখবো । ওর নাম –‌ আলিসা নেওয়াজ । এটাই ফাইনাল ।
শাফাহ্’র কথা শেষ হতে না হতেই মেইন দরজার কাছ থেকে একটা ভরাট পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসলো….
“ বাচ্চার নাম ঠিক করবো আমি ।

রুডভিক কাবির রৌদ্র , আমার দেওয়া নামটাই সিলেক্ট করা হবে । ওর নাম রাখা হবে , #রামিশা_নেওয়াজ ।
উক্ত স্বর কর্নপাত হওয়া মাত্রই বাড়ির সবাই ধক্ করে ওঠে । ছ্যাঁত করে একাধিক জোড়া দৃষ্টি চকিতে চায় সদর দরজার দিকে । অমনি আটকে যায় সবার দৃষ্টি । সদর পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে রুডভিক কাবির রৌদ্র । হাতে বড়সড় একটা ল্যাগেজ । কপালে চুল আছড়ে পড়া । পড়নে একখানা কালো শার্ট আর প্যান্ট । শার্টের হাতা গোটানো কনুই অবধি । কলারের নিচের তিনটে বোতাম খোলা । উদ্দাম লোমশ বক্ষ অনেকটা দৃশ্যমান । রুবিনা কাবির ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠেন । দু কদম পিছিয়ে যান তিনি । দীর্ঘ পাঁচ বছর সামনাসামনি ছেলের মুখশ্রী দেখে অবিশ্বাস ঘিরে ধরে তাকে । চোখ ঝাপসা হয়ে আসে । তিনি অবিশ্বাসেই অস্ফুটে উচ্চারণ করেন হাঁসফাঁস করে …..
” রৌদ্র ?
আদ্র আর শুভ্র বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করলো….
” রুডি !
সন্দিহান চোখে তাকিয়ে সকলে ।
তোফায়েল কাবির ছেলেকে দেখে জমে গেছেন ।

রৌদ্র ল্যাগেজ রেখে সোজাসুজি সিরাতের দিকে এগিয়ে আসলো । সিরাত ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে । রৌদ্র হাঁটু মুড়ে বসলো ওর সম্মুখে । ভ্রু নাচালো । কোলের বাচ্চার দিকে দৃষ্টি ফেলে আকস্মিক মৃদু হাসলো বোধহয় । হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগে সিরাতের দিকে তাকিয়ে বললো…..
” ফ্লাইট থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে, স্যানিটাইজ করে তারপর এসেছি । রামিশা কে ছুঁতে পারি তো,আপু ?
সিরাত হেসে ওঠে ‌। তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকায় । বাচ্চা কে তুলে দেয় রৌদ্রের কোলে ।
রৌদ্র বাচ্চা টাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় । জীবনে দ্বিতীয় কোনো নবজাতক’কে কোলে নিলো সে । একেবারে ছোট্ট বিড়াল ছানার ন্যায় বাচ্চা । ঘুমোচ্ছে চোখ বুজে । রৌদ্র সবাইকে তাজ্জব করে বাচ্চার কপালে চুমু খেলো ।
বললো পুরু কন্ঠে…..
” রামিশা তো পুরো আপুর মতো হয়েছে দেখছি । বেবি পুরো তোমার মতো হয়েছে আপু ।
ড্রইং রুমে কারোর মুখে রাঁ নেই । এখনো তাজ্জব বনে হতবাক সকলে । রৌদ্র ফিরেছে ? এতো বছর বাড়ি ফিরেছে রৌদ্র ? এটা অবিশ্বাস্য বটেই । যে ছেলে এতো দিন কারোর সাথে যেচে পড়ে যোগাযোগ অবধি করে নি , সেই ছেলে আজ হঠাৎ করেই ফিরে এসেছে ? কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ফিরেছে রৌদ্র ?
রুবিনা কাবিরের চোখ থেকে টুপ করে পানি গড়ায় । পাঁচ বছর পর তার ছেলে ফিরেছে ? আশ্চর্য তিনি ‌। কতটা বদলে গেছে রৌদ্র । স্বাস্থ্য বেড়েছে , চেহারার গড়ন পাল্টেছে এই পাঁচ বছরে । চামড়ার উজ্জ্বলতা বেড়েছে । ঘন দাঁড়ি উঠেছে চোয়ালে ।
ছুটে আসলেন রুবিনা কাবির । ছেলের বাহু আঁকড়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন এবার….

” রৌদ্র ?
তুই ? তুই, এসেছিস বাবা ! ফিরেছিস তুই ? আমি স্বপ্ন দেখছি না তো ? রৌদ্র তুই সত্যিই আমার চোখের সামনে ?
” ওও মম , কাঁদছো কেনো ?
আই এম হেয়ার । ডোন্ট ক্রাই । ইউ নো , এসব কান্নার সাউন্ড পছন্দ নয় আমার ।
ফুঁপিয়ে ওঠেন রুবিনা কাবির । রৌদ্র বাচ্চা কে কোল থেকে নামায় । সিরাতের কোলে তুলে দেয় ‌। আহিয়ান কে জড়িয়ে ধরে এবার…
” হোয়াটস আপ জিজু ?
কনগ্রাচুলেশনস অন বিং এ নিউ ফাদার…
অতঃপর শুভর দিকে এগোয় । বুক মিলিয়ে বলে…
” ওও ব্রো , কতটা বদলে গেছিস !
কি দেখছিস এভাবে ? আই এম ইউর রুডি, ইয়ার ।
রৌদ্রের আচরণ বড্ড স্বাভাবিক । সবাই বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে শুধু । অতিথি বলতে এখন বাড়িতে আছেন তৌসিফ কাবির আর তোফায়েল কাবিরের কিছু বিজনেস পার্টনার । তৌসিফ কাবির আর তোফায়েল কাবির দাঁড়াতেই তারাও দাঁড়িয়ে গেলেন ক্ষিয় কাল বাদ । এই ছেলেটাকে চিনলেন না কেউই ।
আদ্র শুভ্রর পাশ থেকে ডাকে অবিশ্বাসের সুরে…

” রুডি ?
রৌদ্র পাশ ফিরে চায় । নির্বিকার চাহনি এবার । আদ্র কে দেখেও প্রতিক্রিয়া দেখালো না ও । বরং এভয়েড করলো । তৌসিফ কাবিরের দিকে এগোলো ।
” বাবাই , কেমন আছো ?
তৌসিফ কাবির কে জড়িয়ে ধরে রৌদ্র । সবার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে যেনো । জোর করেও কেউ কথা ফোটাতে পারছেন না মুখে । রৌদ্র তৌসিফ কাবির কে ছেড়ে শাহিনা কাবিরের দিকে এগোলো । আলতো জড়িয়ে ধরলো তাকেও । অতঃপর শেষ পথে দৃষ্টি ফেরালো শাফাহ্’র দিকে । অমনি চোখ বড়বড় করে তাকালো রৌদ্র । শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে আছে হা বনে । রৌদ্র যখন বাড়ি ছাড়লো , তখন ওর বয়স চৌদ্দ পেরিয়ে পনেরোর কোঠায় । এতো বছর রৌদ্র কে স্বচোক্ষে দেখে নি । মুখায়ব স্মৃতিতে অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে । রৌদ্র তো ঠিকঠাক যোগাযোগ ও করতো না । মাঝে মাঝে শুভ্র ফোন করলেও অডিও কলে কথা বলতো । এতো বছরে ভিডিও কলে দুবার কথা হয়েছে কিনা তাও সন্দিহান ।
রৌদ্র শাফাহ্ কে দেখেই কৌতুক স্বরে বললো…..

” আরে টুকটুকি ,, হাউ আর ইউ সিস্টার ?
কত বড় হয়ে গেছিস তুই । তোকে সেই পিচ্চি গাব্বু দেখে গেছিলাম ।
কেউ কোনো কথা বলছে না ।
হলরুমে রুবিনা কাবিরের ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসছে খানিক বাদ বাদ । রৌদ্র গা মোড়ালো । ঘাড় ডললো । নিজের প্রতি কারোর প্রতিক্রিয়া না দেখে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললো….
” আই হোপ , আমার ঘর আমারই আছে । আমি চললাম ঘরে । মম , আমার ল্যাগেজ আমার ঘরে পাঠিয়ে দিও । আপাতত টায়ার্ড আমি ।
বলেই দপাদপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো রৌদ্র ।
নিচে মূর্ত বনে অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল সকলে । রৌদ্র সবার সাথে কথা বললো , অথচ নিজের বাপের দিকে একটা বারও ফিরে চাইলো না ভুল করেও ।
তোফায়েল কাবির আধো ঝাপসা চোখে দেখেই গেলেন ছেলে কে ।

রৌদ্রের এমন হঠাৎ ফিরে আসার ব্যাপারটা সিরাত একটু আধটু জানতো । রৌদ্রের সবচেয়ে কাছের মানুষের মধ্যে সিরাত সবার আগে । সিরাতের সাথে রোজ কন্টাক্ট ছিলো ওর । বাড়ির কারোর সাথে জোর করেও কথা বলার চেষ্টা করে নি । শুভ্রর সাথে কথা বলতো মাঝে মাঝে । সেখানেও শুভ্র নিজে থেকে কন্টাক্ট করতো । আর বাকি একজন তৌসিফ কাবির । তার সাথেও কথা হতো রৌদ্রের । যেখানে নিজের মায়ের সাথেই কথা বলতো না সে ।
সিরাতের বেবি হওয়ার পর সিরাত আবদার করেছিলো ভাইয়ের কাছে । যেনো একটা বার দেশে ফিরে আসে ও । কতদিন দেখা হয় না । বড় আপুর আবদার রেখেছে রৌদ্র । হঠাৎ করেই ফিরে এসেছে কাউকে কিছু না জানিয়ে ।
সিরাত সবটা খুলে বললো সকলকে ।

রৌদ্রের ঘর ওরই আছে । রুবিনা কাবির সবসময় পরিপাটি করে রাখেন ছেলের ঘর । কাউকে ঢুকতে দেন না । ছেলে ছিলো না তো কি হয়েছে , ছেলের রেখে যাওয়া স্মৃতি তো ছিলো । যা আঁকড়ে দীর্ঘ পাঁচটা বছর কাটিয়েছেন তিনি ।
বাড়ির সবার হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঁধার নেমেছে । তবে ভেতর ভেতর অত্যাধিক আনন্দিত সকলে । তোফায়েল কাবির সেই সন্ধ্যাতেই মুখ বুজে ঘরে উঠেছেন , আর নিচে নামেন নি । রাতের খাবারেও নামেন নি ।
রৌদ্র ফিরেই ঘুমিয়েছে । রাতের খাবারে সেও নামে নি নিচে ।
রাত এগারোটা বাজতে চললো । রুবিনা কাবির ট্রেতে খাবার সাজিয়ে ছেলের ঘরে ঢুকলেন । সবুজ রঙা ডিম লাইট জ্বলছে । সুইচ বোর্ড হাতরে আলো জ্বালালেন রুবিনা কাবির । উবু হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে রৌদ্র । পুরোপুরি ঘরে ঢুকতেই মদের গন্ধ ধক্ করে নাকে বিধলো তার । অমনি মুখ কুঁচকে আসলো । রৌদ্র মদ খেয়েছে ? এখনও ? এই স্বভাব বদলায় নি ওর ? বিদেশে এতদিন কি করেছে তা জানা নেই । কেমন ছিলো তার ছেলে জানা নেই । কি করে চলেছে ও ? এতো বছর কিভাবে কাটিয়েছে ? রুবিনা কাবিরের অন্তঃস্থলে হাজার প্রশ্ন ।
ঢোক গিলে নাক সিটকে পা বাড়ালেন তিনি ।
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে খাবারের ট্রে রেখে ডাকলেন ছেলেকে…..

” রৌদ্র ?
এই রৌদ্র । ওঠ….
ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে জবাব দেয় রৌদ্র….
” ওও মম , ডিস্টার্ব করো না । ঘুমাচ্ছি ।
” ওঠ এখন ? কথা আছে তোর সাথে আমার ।
দ্বিতীয় বার ডাকেই উঠে বসে রৌদ্র । গা মুড়িয়ে হাই তোলে । চোখ ডলে মায়ের দিকে তাকায় ।
রুবিনা কাবির বসেন ছেলের পাশে । ছলছল চোখে চেয়ে কান্না চেপে বলেন…..
” বদলাস নি তুই ?
এখনো মদ ….
” ওও মম , আই এম রুডভিক কাবির রৌদ্র , আমি কেনো বদলাবো ? তবে একটু বদলেছি , না বদলালে ফিরে আসতাম না এই বাড়িতে ।

” আমার কথা এতো বছরে তোর একটা বারের জন্যেও মনে পড়ে নি ?
” পড়েছে তো । আপুর থেকে সবসময় খোঁজ নিয়েছি তোমার ।
” খোঁজ নিয়েই কাটিয়েছিস ? দেখার ইচ্ছে হয় নি মাকে ?
” হয়েছে , তোমার ছবি ছিলো আমার কাছে । সেখানে দেখেছি হাজার বার ।
রুবিনা কাবির বাক্ হারালেন এক মুহুর্ত । কন্ঠের রুদ্ধতা ঠেলে বললেন….
” এতো দিন ফিরিস নি কেনো ?
” ইচ্ছে হয় নি তাই ।
আবার চলে যাবো ‌, জাস্ট দু সপ্তাহের জন্য এসেছি ।
” রৌদ্র ।
” ইয়েস মম !
” আবার ফিরবি মানে ?
তোকে আর কোত্থাও যেতে দেবো না আমি । আমার দুই ছেলে । এক ছেলেতে বুক ভরে না আমার । তোর বিরহ খুব কাঁদায় আমার মাতৃ হৃদয়কে । এবার যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাস , তাহলে এবার মরে যাবো আমি ।
” মম , প্লিজ স্টপ । এসব কান্নাকাটি আমার পছন্দ নয় । বিরক্তি লাগে ।
ফুঁপিয়ে থামেন রুবিনা কাবির । ভেজা চোখ মুছে বলেন ভেজা স্বরে…..
” কত বছর পর তোকে পেয়েছি । কান্না আটকাবো কি করে ? আমি তো তোর মা ।
” আই নো ।
বরাবর দায়সারা জবাব রৌদ্রের । রুবিনা কাবির বললেন…
” তোর বাবার সাথে কথা বললি না একবারও ?
” হোয়াট ? কে আমার বাবা ? আমার কোনো বাবা নেই । আই এম রুডভিক কাবির রৌদ্র , বাট কবির পরিবারের সন্তান নই । কাবির পরিবারের সেই সন্তান মরে গেছে । বলেছিলো তোফায়েল কাবির । সো , আমার কোনো বাবা নেই । কারোর সন্তান নই আমি ।

” রৌদ্র ।
রৌদ্রের জবাব নেই এবেলায় । বাবার প্রতি পাহাড় সম অভিমান । রুবিনা কাবির এই মুহূর্তে ছাড় দিলেন । বললেন….
” খাবার এনেছি । খাবি না ?
” খাইয়ে দাও । খিদে পেয়েছে ।
মুচকি হাসলেন রুবিনা কাবির ।
তার ছোট ছেলের স্বভাব এটা । তিনি ট্রে হাতে নিয়ে বললেন….
” এতো দিন ঐ দূর দেশে কে খাইয়ে দিতো তোকে ? না খেয়ে খেয়ে চেহারার কি অবস্থা করেছিস ?
” কি অবস্থা করেছি ?

দেখেছো আমায় , কি সুন্দর হয়েছি আমি ? তোমার বড় ছেলের থেকেও সুন্দর হয়েছি এই পাঁচ বছরে , তাই না ?
রুবিনা কাবির আবারো মুচকি হাসলেন । ছেলের মুখে খাবার তুলে দিলেন । আদ্রের সাথে নিজের এই পার্থক্য করার স্বভাব টা গেলো না এখনো ।
আদ্র আর শুভ্র উজ্জ্বল ফর্সা । সেদিক থেকে রৌদ্র একটু চাপা বর্নের । উজ্জ্বল শ্যামলা সে । তবে বড় দুই ভাইয়ের তুলনায় রৌদ্রের মুখশ্রীর জ্যোতি আলাদা । ইয়াং যুবক হিসেবে এক পলকে যে কারোর দৃষ্টি আকর্ষনের মতো সৌন্দর্যের অধিকারক রৌদ্র । আগের তুলনায় অনেক বদলেছে । পেশি বেড়েছে । এতো বছর পর ছেলেকে দেখে বারবার আনন্দের অশ্রুতে চোখ ভিজে যাচ্ছে রুবিনা কাবিরের ‌। ছেলেকে খাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভরাট চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছেন তিনি ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১

রৌদ্রের দাম্ভিকতা বরাবর বেশি । তাইতো সে বেপরোয়া ‌। এখন কি হবে এই বখে যাওয়া ছেলের ? ও কি একটুও বদলায় নি ? আবার চলে যাবে বিদেশ ? না , কিছুতেই না ? রুবিনা কাবির আর ছাড়বেন না ছেলেকে , কিছুতেই ছাড়বেন না ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩