আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪
সুরভী আক্তার
সকাল সকাল উঠে পড়েছে মেঘা ।
তড়িঘড়ি করে শাওয়ার নিয়ে রেডি হয়ে নিচে নেমেছে শাফাহ্ কে টেনেটুনে । আটটা বাজতে চললো । নয়টায় ফার্স্ট ক্লাস আছে । আদ্র রেডি হয়ে ব্রেকফাস্টের টেবিলে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলো ওদের জন্য । ওরা নামতেই খেতে বসে পড়লো তিনজনে । খানিক বাদ ফর্মাল ড্রেসআপে শুভ্র ও যোগ দিলো ওদের সাথে । অফিসে বেরোবে শুভ্র । তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছে মেঘা আর শাফাহ্ । রুবিনা কাবির এতক্ষণে ছেলে মেয়েদের পাতে একটা করে সেদ্ধ ডিম তুলে দিলেন । মেঘা সেদ্ধ ডিম পছন্দ করে না । ওর জন্য রোজ রোজ আলাদা করে অমলেট করতে হয় । রুবিনা কাবির অমলেট টা তুলে দিলেন মেঘার পাতে । সহসা বললো মেঘা…..
” থ্যাঙ্ক ইউ মামনি !
রুবিনা কাবির নিরুদ্বেগ ।
এ বাড়ির মধ্যে তিনিই একজন , এবং একমাত্র কেউ , যে মেঘার সাথে কথা বলে না দু অক্ষরেও । পাঁচ বছর আগে রৌদ্রের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য আপাত দৃষ্টিতে অযৌক্তিক ভাবে তিনি দায়ি করেন মেঘা কে । অথচ মেঘার কোনো হাত নেই এসবে ।
মেঘা এই পাঁচ বছরে এ বাড়ির সবার চোখের মণিতে পরিনত হয়েছে । সবার আদুরে মেঘা । মিশুক মেয়েটা বাড়ির মেয়ের মতো মিশে গেছে সবার সাথে । এমনকি বাড়ির মেয়ের পরিচয়েই রয়েছে পাঁচ টা বছর ধরে ।
চটপট খেয়ে নিলো ওরা । একসাথে বেরোবে । একেই লেট হয়ে গেছে আদ্রের ভাস্য মতে ।
খেয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠলো ওরা । আদ্র খাওয়া শেষ করে ইতিমধ্যেই পা বাড়িয়েছে বাইরের দিকে । কয়েক কদম এগিয়ে কন্ঠ চড়িয়ে বললো ও …..
” দুটোতে তাড়াতাড়ি আসবি , গাড়িতে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারবো না আমি । দেরি করলে দুটোকে রেখেই চলে যাবো ।
সোফার উপর থেকে ব্যাগ হাতে নিতে নিতে চেঁচালো মেঘা….
” মনি , মামনি , আমরা গেলাম ।
বলেই টুকটুকির হাত টেনে ধরে দিলো এক ছুট । পেছন থেকে সাবধান করলেন শাহিনা কাবির….
” আরে ধীরে যাবি তো । ছুটছিস কেনো ওভাবে ? পড়ে গেলে কি হবে …
সদর পেরিয়ে একই ভাবে চেঁচিয়ে উত্তর করলো মেঘা….
” দেরি হলে তোমাদের ছেলে আমাদের রেখে চলে যাবে !!
হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে গেলো ওরা দুটোতে ।
দুদিকে মাথা নাড়িয়ে শ্বাস ফেললেন শাহিনা কাবির । অতঃপর কিচেনে ঢুকলেন তিনি । বাড়ির অন্যদের ব্রেকফাস্ট হয় নি । সবাই খেতে বসবেন এখন । করিডোরের উপরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখা রৌদ্র প্রখর নেত্রে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে । মেঘা ড্রইং রুম ছাড়তেই চোয়াল খিচে হাত মুঠো করলো ও । চেপে ধরলো রেলিংয়ের রোলার ।
পিছন থেকে সিরাতের কন্ঠের ডাক ভেসে আসলো এর মাঝেই । ডাকে ধ্যান কাটলো রৌদ্রের ….
” রৌদ্র ।
রৌদ্র নিজেকে সামলে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছনে তাকালো । শিথিল করলো চোয়াল । সিরাত ঠোঁট চওড়া করে বললো….
” এখানে কি করছিস ? নিচে চল । ব্রেকফাস্ট করবি না ?
দাঁত খিচলো রৌদ্র । তর্জনী দিয়ে নিচে ইশারা করে চিবিয়ে বললো….
” ও..ঐ মেয়েটা ! ঐ ইভারা…
” কোন মেয়েটা ?
নিচে তাকালো সিরাত । এতক্ষণ রৌদ্রের পিছনে দাঁড়িয়ে সে নিজেও দেখেছে মেঘাকে । তবুও অবুঝের ভান ধরলো । রৌদ্রের ক্ষিপ্ত প্রতিবিম্ব দেখে বললো স্বাভাবিক ভাবে….
” মেঘার কথা বলছিস ? ও তো ভার্সিটিতে বেরোলো । টুকটুকি আর ও একসাথে আদ্রের ভার্সিটিতে পড়ে । এক ডিপার্টমেন্টে । দেখলি তো একসাথে বেরোলো ওরা ।
” ও এখানে কি করছে ?
রৌদ্রের কন্ঠে ধমকের সুর । সিরাত বললো….
” ও তো আমাদের সাথেই থাকে । গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের বাড়িতেই থাকে মেঘা । ওকে তো রেখে গেছিলি আমাদের কাছে । চিনতে নিশ্চয়ই পেরেছিস ও কে ? যে মেয়েটাকে নেশার ঘোরে জেদ দেখিয়ে বিয়ে করেছিলি , মেরে অজ্ঞান করে রেখে গেছিলি , সেই মেয়েটাই ও । তোর জেদের ভিকটিম । তোর বিয়ে করা বউ….
” ওওও শাটআপ আপু । কিপ ইউর মাউথ শাট্ ।
ইরিটেটিং কথাবার্তা বলবে না একদম ।
” রৌদ্র ।
সিরাত চোখ রাঙানি দিলো । সংযত হলো রৌদ্র ।
ঘাড় ডললো । সিরাত চড়া গলায় বলল….
” ইরিটেটিং কাজকর্ম করেছিস , এখন শুনতে কানে বাজছে কেনো ?
হিসহিসিয়ে উঠলো রৌদ্র ।
সহ্য ক্ষমতা খুব কম তার । সিরাত কে টপকে ধুপধাপ পা ফেলে ঘরে ঢুকলো ও ।
দুপুরের পর ভার্সিটি থেকে ফিরেই লম্বা শাওয়ার নিয়েছে আদ্র । পড়নের ড্রেসসহ আরো কিছু জমিয়ে রাখা ড্রেস ওয়াশ করেছে নিজে । সে এমনই , নিজের কাজ নিজে করতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে । রৌদ্র যতটা অগোছালো , আদ্র ঠিক ততটাই গোছালো । সব ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে পরিপাটি হওয়া চাই ওর । ও নিজেই পরিপাটি করে রাখে । রুবিনা কাবির এদিক থেকে মুক্ত । বড় ছেলের দিকে তার অতটা নজরদারি চালাতে হয় না , ধ্যান দিতে হয় না । বড় ছেলে নিজেই ম্যাচিউর ।
আদ্র শাওয়ার নিয়ে ছাদে উঠেছে । হাতের ফোনটা কানে চেপে ধরে সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো ও । মুখের ভঙ্গিমা গুরুত্বর । কথা বলতে বলতে ফোনের ওপাশের জনকে ধমকালো আদ্র । তড়তড়ে মেজাজ দেখিয়ে রাগ ঝেড়ে ফোন কাটলো । রেলিংয়ের উপর ফোন রেখে হাতের ভেজা কাপড় গুলো ছাদের রশিতে মেলে দিলো । ফর্সা উদ্দাম শরীরে বিন্দু বিন্দু জল কনা গুলো মুক্তোর দানার ন্যায় চিকচিক করছে সূর্যালোকের সোনালি আলোয় ।
কাপড় মেলে দিয়ে গলায় ঝোলানো টাওয়েল টেনে শরীর মুছলো আদ্র । অমনি ছাদে আগমন এ বাড়ির ছোট ছেলের । সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে হেলে দুলে ছাদে উঠলো রৌদ্র । এ বাড়িতে সিগারেট খেয়েও শান্তি নেই । একটার আবার সিগারেটের ধোঁয়ায় এলার্জি আছে । একটু ধোঁয়া পেলেই চোখ মুখ উল্টে ফেলে । রৌদ্রের সব জানা ।
পরোয়া করতে না চাইলেও পরোয়া এসে যায় আপনা আপনি । শাফাহ্’র চিন্তা করে যতবার সিগারেট খেতে হয় , ততবার ছাদে উঠতে হয় রৌদ্র কে । সেদিক থেকে দেখতে গেলে , মিনিট পাঁচেক পর পর ছাদে উঠতে হয় ওকে । পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর সিগারেটের পাছা কে ঠোঁটে চেপে ধরতে না পারলে ঠোঁট চুলকায় ওর ।
সিগারেটের গন্ধে ভ্রু কুঁচকে তাকালো আদ্র । রৌদ্র এক পাশে দাঁড়িয়েছে আদ্র কে দেখেও না দেখার ভান করে । আদ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেললো ।
দুই ভাইয়ের মধ্যে নীরব দ্বন্দ্ব আছে । তবে সেটা শুধু রৌদ্রের দিক থেকে । রৌদ্রের বখাটে বেপরোয়া পনার জন্য এ যাবৎ অনেক কথা , অনেক তিরস্কার , অনেক খোঁটা শুনতে হয়েছে । তোফায়েল কাবির সর্বদা বড় ছেলের সাথে ছোট ছেলের তুলনা করে তিরস্কার করতেন ছোট ছেলেকে । যদিও আদ্রের ভালো দিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে রৌদ্র কে সঠিক পথে আনার সামান্য চেষ্টা করতেন এই থেকে । কিন্তু রৌদ্র উল্টো বুঝতো । ভাবতো আদ্র কে সবাই বেশি ভালোবাসে ।
এই থেকে আদ্র অপছন্দ রৌদ্রের নিকট ।
দুটো কথাও হয় না দু ভাইয়ের । গত পাঁচ বছর আদ্র অনেক চেষ্টা করেছে রৌদ্রের সাথে যোগাযোগ করার , কিন্তু লাভ হয় নি ।
আদ্র গা মুছে কথা বলার বাহানা খুঁজে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে নরম কন্ঠে বললো….
” তুই কিন্তু অনেক বদলে গেছিস রুডি !
সিগারেটের ধোঁয়ায় টুকটুকির এলার্জি আছে, তাই এখানে আসলি , তাই তো ?
রৌদ্র পাত্তা দিলো না ।
একটা সিগারেট নিভিয়ে ছুড়ে ফেললো নিচের দিকে । অতঃপর আরেকটা ধরালো । আদ্র খানিকক্ষণ চেয়ে রইলো । আবার বললো….
” টুকটুকি এখনো ভার্সিটি থেকে ফেরে নি ।
নিচে গিয়ে যত খুশি সিগারেট ফুঁকতে পারিস । এখানে রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না ।
বলেই প্রস্থান করে ছাদ থেকে নামলো আদ্র ।
এখানে থেকে , আর বেশি কথা বলে লাভ নেই । রৌদ্র তাচ্ছিল্য হাসলো আদ্র চলে যেতেই । মিনিট কয়েক বাদ ছাদের কোথাও থেকে ফোনের রিংটোন ভেসে আসলো রৌদ্রের কানে । এদিক ওদিক তাকিয়ে রেলিংয়ের উপর একটা ফোন দেখতে পেলো রৌদ্র ।
এটা যে আদ্রের , তা বুঝতে বাকি রইলো না । ফোন বাজতে বাজতে কেটে গেলো । আর ফিরেও চাইলো না রৌদ্র । বেশ কবার একই ভাবে বেজে বেজে কেটে গেলো রিংটোন । ষষ্ঠ বার ফোনের রিংটোন কানে আসতেই চরম বিরক্তিতে মুখ খিচলো রৌদ্র । এটার শব্দ কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে একদম , ও এক্ষুনি ছুড়ে মারবে এটাকে ।
দম্ভভরে পা চালিয়ে ফোনটা হাতে নিলো রৌদ্র । সবেগে ছুড়ে মারার আগেই আকস্মিক দৃষ্টি পড়লো ফোনের স্ক্রিনে । সেভ করা একটা নাম জ্বলজ্বল করছে । ‘মেঘবুড়ি’ । রৌদ্র স্থগিত হলো । ভাঁজ পড়ে কপাল কুঁচকে আসলো তীক্ষ্ণ ভাবে । এবারো চোখের সামনে বাজতে বাজতে কেটে গেলো ফোনটা । বিলিন হলো স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা ।
তাকিয়ে থাকার মাঝেই পরের সেকেন্ডে আবার বেজে উঠলো । একই নাম ভেসে উঠলো দৃষ্টির সম্মুখে ।
না চাইতেও ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকালো রৌদ্র । অমনি ফোনের ওপাশ থেকে এক রমনীর বিরক্তি সূচক তপ্ত ঝাড়ি ভেসে আসলো একনাগাড়ে….
” উফফফ , কখন থেকে ফোন করছি তোমায় ? ধরছিলে না কেনো ? কোন মহা কাজে বিজি আছো , বলতো ? আমাদের একা রেখে চলে গেছো কেনো আজ ? সেই কখন ক্লাস শেষ হয়েছে , ক্যাম্পাসে বসে আছি । কোথায় তুমি ? তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ । খিদে পেয়েছে ভীষণ , বাইরের খাবার খেলেও বকবে আবার ।
বলেই চুপ করলো । গুটানো কপাল আরো বেশি গুটিয়ে আসলো রৌদ্রের । দপ করে কপালের পাশের রগ ফুলে উঠলো । প্রখর তপনের সাথে সাথে তামাটে হয়ে আসলো উজ্জ্বল শ্যামলা মুখশ্রী । হাতের ফোনটা কান থেকে নামিয়ে কেটে দিলো রৌদ্র । মুঠোতে পিষে ফেললো সেটা । অতঃপর দৃঢ় পদক্ষেপে ফোনটাকে হাতে নিয়েই ছাদ ত্যাগ করলো ।
সন্ধায় ড্রইং রুমে বসে আছে বাড়ির গিন্নিরা । পুরুষদের অফিস থেকে ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছে । মুড়ি মাখিয়ে নিয়ে বসেছেন দুজন । রুবিনা কাবির আর শাহিনা কাবির মুড়ি চিবুচ্ছে, দৃষ্টি তাদের টিভির পর্দায় । সন্ধ্যার সময় টুকু স্বস্তি নিয়ে টিভির সম্মুখে বসেন দুই ভদ্রমহিলা ।
সিরাত ও যোগ দিয়েছে মা আর মনির সাথে । ওর ও অভ্যাস হয়ে গেছে ।
মেঘা আর টুকটুকি ফোন ঘাটছে । সোফায় পা তুলে বসে আছে মেঘা । আর টুকটুকি ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছে ।
আদ্র নিচে নামলো । মেঘার পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল চিন্তিত মুখে….
” আম্মু , আমার ফোনটা দেখেছো ? সেই দুপুর থেকে খুঁজে পাচ্ছি না । বন্ধ দেখাচ্ছে ফোন ।
রুবিনা কাবির আঁতকে চাইলেন । সবে সপ্তাহ গড়ালো নতুন ফোন কেনার । আর এখন নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ।
” কোথায় রেখেছিলি ফোন ?
” এক্সাট মনে পড়ছে না ।
” ভার্সিটিতে ফেলে আসিস নি তো কোথাও ?
ঘরে দেখেছিস ভালো করে ? হয়তো কোথাও পড়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে !
” ভার্সিটিতে ফেলে আসবো কেনো ?
রুমেই তো রেখেছিলাম লাস্ট বার । মনে পড়ছে না আর ।
টুকটুকি কথার মাঝে ফোড়ন কাটল….
” দেখেছো ভাইয়া , তুমি প্রফেসর হয়ে লাভটা কি হলো ? নিজের একটা ইম্পর্ট্যান্ট ডিভাইস কোথায় রেখেছো , সেটাই মনে করতে পারো না । আর আমরা , অতো শত ইংরেজি পড়া মনে রাখবো কি করে ? তুমি আমাদের দিকটা বোঝো না ! ক্লাসে বেকার বেকার ধমকাও সকলকে ।
” চুপ করবি ! আমি আছি টেনশনে , ফোনে কত ইম্পর্ট্যান্ট ডকুমেন্ট ছিলো জানিস । কোথায় যে রাখলাম ফোনটা ।
মেঘা হাত থেকে ফোন নামিয়ে বললো….
” দুপুরে যখন ফোন করলাম , তখন তো রিসিভ করেছিলে । কিন্তু কথা বলো নি , কেটে দিয়েছিলে । ভাবলাম ড্রাইভ করছো তাই । তারপর হারিয়েছে ফোন ? কোথায় রেখেছো , মনে নেই ?
” দুপুরে ফোন করেছিলি কখন ?
” আমাদের ভার্সিটি থেকে নিয়ে আসার আগে । কেনো , এটাও ভুলে গেছো ?
টুকটুকি আবার কথার মাঝে ফোড়ন কাটল নিজের ফোনে চোখ ডুবিয়ে…
” দেখো মামনি , তোমার ছেলে দিন দিন বুড়ো হয়ে যাচ্ছে । ভুলে যাওয়ার রোগ ধরেছে । তাড়াতাড়ি বিয়ে দাও ছেলের । নয়তো কদিন পর তোমার এই ভুলোমনা ছেলে কে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না । মেয়েরা ভয় পাবে বিয়ে করতে । যদি তোমার ছেলে বিয়ের পর বউকে ভুলে যায়,, তখন ? বুঝেছো , গরীবের কথা বাশি হলেও ফলে । আমি বলছি , মেনে নাও , তাড়াতাড়ি বিয়ে দাও ছেলের ।
টিভি দেখতে দেখতে খানিক হাসলেন রুবিনা কাবির । আদ্র ক্ষেপে গেলো । উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে যেতে নিলো টুকটুকির দিকে । দাঁত খিচে উচ্চারণ করলো….
” টুকটুকির বাচ্চা….
শাফাহ্ চমকায় । মুহুর্তেই ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ায় মেঘার কোল থেকে । সোফা থেকে লাফ দিয়ে নেমে দৌড় লাগায় সিঁড়ির দিকে । একই ভাবে আদ্রকে নকল করে উচ্চারণ করে….
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চা…..
মধ্যরাত্রি । রাত প্রায় তিনটে পেরিয়ে চারটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই করছে । মেঘার ঘুম ভেঙ্গে গেছে । এমনটা হয় প্রায়শই । হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙ্গে যায় । কখনো কখনো দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে মেঘা । আর ঘুম আসতে চায় না সহজে । সেই মাঝ রাত্রি থেকেই পায়চারি করে , এটা ওটা করে রাত কাবার করে মেঘা ।
আজ ও ঘুম ভেঙ্গে গেছে আচমকা । অনেক চেষ্টার পর ও আর ঘুম আসলো না । শুয়ে এপাশ ওপাশ করলো কিছুক্ষণ । ঘুম আসলো না বিধায় বিছানা ছাড়লো মেঘা । পাশেই শাফাহ্ ঘুমিয়ে বেঘোরে । এই মুহূর্তে বোম ব্লাস্ট হলেও এই মেয়ে ঘুম থেকে জাগবে না । মেঘা নিঃশব্দে ঘর ছাড়লো । চুল খোলা রেখেই ঘুমিয়েছিলো । বাঁধার ফুরসৎ মেলে নি । ঘর ছাড়ার আগে হাতে একটা চুলের কাঁটা নিয়ে বেরিয়েছে মেঘা । সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হাঁটু ছড়ানো লম্বা চুল গুলো দুহাতে পেঁচিয়ে একটা ঢিলে ঢালা খোঁপা বাঁধলো । খোঁপা টাকে আটকালো কাঁটা দিয়ে । পড়নে একটা ঢিলেঢালা লেডিস টিশার্ট আর ট্রাউজার ।
মেঘা সোজা কিচেনে ঢুকলো । নিজের জন্য কড়া করে এক কাপ কফি বানালো চিনি ছাড়া ।
অতঃপর কিচেন থেকে বেরিয়ে আসলো । ড্রইং রুমের লাইট নিভিয়ে আধো অন্ধকারে উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । করিডোর পেরিয়ে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে এগোতে লাগলো নিজের ঘরের দিকে । লম্বাটে পুরো করিডোর মিলে একটা আলো জ্বলছে ।
মেঘা এগোতে এগোতে দ্বিতীয় চুমুক বসালো কফির মগে । মগ থেকে ঠোঁট সরানোর আগেই হুট করে হেঁচকা টানে ভিমড়ি খেলো মেঘা । কফির মগটা রাতের নিস্তব্ধতায় বিকট শব্দ তুলে ঠাস করে করিডোরের মেঝেতে পড়লো । চার টুকরো হলো ভারী কাঁচের মগটা ।
ভড়কে গিয়ে ভয়াতুর কন্ঠে চেঁচানোর আগেই ওর নরম ওষ্ঠ জোড়া শক্তপোক্ত একটা হাতের তালুতে পিষ্ট হলো । কেউ শক্ত করে চেপে ধরলো মেঘার মুখ । ওকে টেনে আছড়ে ফেললো দেয়ালে । অকস্মাৎ কান্ডে চোখ মুখ খিচে ফেললো মেঘা ।
শ্বাস প্রশ্বাস ছুটতে লাগলো বেগতিক ।
বাড়লো বক্ষ স্পন্দন । মুখের উপর গরম নিঃশ্বাসের সাথে সাথে অদ্ভুত বিদঘুটে গন্ধ আছড়ে পড়তেই তড়াক করে চোখ খুললো মেয়েটা ।
মুখ সম্মুখে অযাচিত , অনাকাঙ্ক্ষিত একজন কে ঝুঁকে থাকতে দেখে দৃষ্টি বৃহৎ হলো ওর ।
এক নিমিষেই চোখ মুখ টাটিয়ে হাত উদ্যত করলো মেঘা । সর্বশক্তি দিয়ে দুহাতে ঝটকা মেরে ঠেলতে চাইলো রৌদ্র কে । সম্পুর্ন ভাবে দূরে সরাতে না পারলেও খানিক সরানো গেলো । নিজের মুখ থেকে রৌদ্রের হাত নামিয়ে শ্বাস টানলো মেঘা ।
ঠোঁটের উপর রৌদ্রের হাত স্পর্শিত হয়েছে । ঠোঁট ডলে তীব্র ঘৃণা দেখিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বলে উঠলো ….
” হোয়াট রাবিশ । আর ইউ ম্যাড ?
” হুসসসস , শাট আপ ! গলা নিচে ।
এখানে কি করছিস তুই ? হোয়াট দ্যা হেল আর ইউ ডুয়িং ইন মাই হাউস ? হোয়াট ?
খিচুনি দেওয়া কন্ঠে অতি ক্ষীণ স্বর বেরোলো রৌদ্রের জবান চিরে । মেঘা মুখ বিকৃত করলো । মদের গন্ধে গা গুলিয়ে উঠলো ওর । রৌদ্র এখনো ঝুঁকে ওর উপর । করিডোরে জলন্ত একটা বাল্বের আলোয় রৌদ্রের মুখশ্রী দেখেও না দেখার যথেষ্ট কসরত করলো মেঘা । চোখ ফিরিয়ে সজোরে ধাক্কা মারলো রৌদ্র কে । প্রথম ধাক্কায় কাজ না হলেও এবার কাজ হলো । টলতে থাকা পায়ে পিছিয়ে গেলো রৌদ্র । মেঘা কিড়মিড়িয়ে উঠলো ….
” আপনার সাহস কি করে হলো আমাকে ছোঁয়ার ।
” স্টুপিড , তোর সাহস কি করে হলো আমাকে দূরে সরানোর ?
” আজব , তুই তুকারি করছেন কেনো আমার সাথে ? হু দ্যা হেল আর ইউ ?
” আমাকে জানিস না আমি কে ?
ফটাফট আমার প্রশ্নের উত্তর দে , তোর সাথে ফাও কথা বলার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই আমার । কি করছিস এ বাড়িতে ? কেনো আছিস এখানে ? কে তুই ?
মেঘা হাসলো । দেয়ালের কাছ থেকে সরে আসতে আসতে বললো দায় সারা ভঙ্গিতে….
” আমি ? আমি তো মেঘা !
আর এ বাড়িতে কি করছি ? খাচ্ছি দাচ্ছি, পড়ছি , ঘুমাচ্ছি !
কেনো আছি এ বাড়িতে ? কারন আমার কোনো বাড়ি নেই তাই । বাবা আর বাবাই এ বাড়িতে রেখেছে আমায় । হয়েছে ? অর এন কোয়েসশন ?
মেঘার ভনিতা বিহীন গা ছাড়া দাপুটে জবাব । হাবভাবে কোনো কিছুর রেশ মাত্র নেই । যেনো খুব স্বাভাবিক ভাবেই স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর দিলো সে । রৌদ্রের সামনে নির্লিপ্ত ভঙ্গিমা । অথচ হিতে বিপরীত হওয়ার পরিস্থিতি এখন । মেঘা কে স্বাভাবিক দেখে কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে রৌদ্রের । ছুরির ন্যায় ধারালো দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে মেঘা কে । এই দৃষ্টিতে কেটে টুকরো হওয়ার কথা মেঘার । কিন্তু না , মেঘা নর্মাল । রৌদ্র পরখ করলো ওকে , পাঁচ বছর আগে যে ছিপছিপে গড়নের ভীতু একটা মেয়েকে দেখেছিলো , সেই মেয়েটা এখন একবিংশির দারে পৌঁছাতে চললো ।
সেই ছিপছিপে গড়ন নেই আর । চেহারার আদল রৌদ্রের মনে থাকার কথা নয় । পাঁচ বছর আগে নেশার ঘোরে নিভু চোখে একটা টকটকে ষোড়শী কন্যা কে দেখেছিলো , নেশা কাটতে কাটতে মুখের অবয়ব বিলিন হয়েছে স্মৃতি থেকে । পরদিন যেতে না যেতেই মেঘার সম্পুর্ন মুখশ্রী ভুলে গেছিলো রৌদ্র । কিছুই মনে পড়ে নি , মনে করার চেষ্টাও করে নি কখনো । একটা উটকো ভুল করে বসেছিল সে । নেশা কাটতেই মাথায় এসেছে নিজের করা বিভ্রান্তিমূলক কর্মকাণ্ড । এটা মাথায় আসতেই আরো বেশি বিভ্রান্ত হয়েছে সে ।
রৌদ্র তো আর দেশে থাকে নি । দ্বিতীয় বার বাড়ি মুখোও হয় নি । বিদেশে গিয়েও দেশের কোনো কিছুতে পিছুটান আসে নি । সে যে একটা কান্ড ঘটিয়ে দেশ ছেড়েছে , দুদিনের মাথায় বেমালুম ভুলে গেছে তা । কোনো একটা মেয়েকে নিজের সাথে জোরপূর্বক জড়িয়ে ছুড়ে ফেলে রেখে গেছে , তা আর মনে পড়ে নি কখনো । আবার হয়তো মনে পড়লেও পরোয়া করে নি ।
কিন্তু সেদিন যখন ছাদে নৃত্যরত তালে মেঘা কে দেখলো । তখন বিগড়ে গেছে স্মৃতিরা । পুনরায় ফুঁসে উঠেছে মস্তিষ্ক । মেয়েটা কে প্রথম পলকে না চিনলেও দ্বিতীয় পলকে চিনতে অসুবিধা হয় নি মোটেই । যেই মেয়ের মুখশ্রী গত পাঁচ টা বছর চোখের কোণেও উঁকি দেয় নি , সেই মেয়েকে এক ঝলকেই চিনে ফেলেছে রৌদ্র । সেই মুহুর্ত টায় থমকে গেছিলো ওর অবাধ্য গামী হৃদয় ।
মুহুর্তেই সব উলট পালট হয়ে গেছিলো । এই মেয়ে এখনো এখানে কি করে ? কে এই মেয়ে ? নামটা তখন মনে আসলেও মুখে আসে নি ওর । জবানে কোথায় একটা আটকে গেছিলো ।
পরে যখন মনে ও মুখে উভয়েই আসলো , তখন হিসেব মেলাতে পারে নি । বাড়ির কারোর সাথে ঠিকঠাক যোগাযোগ করে নি গত দিন গুলোতে । যে টুকু কন্ট্যাক্ট ছিলো , সেটুকুতে এসব জানার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট দেখায় নি । এই পাঁচ বছরে কি হয়েছে না হয়েছে জানে নি । খবর রাখে নি ।
এই মেয়েটার এই বাড়িতে থাকার কারনটা কি ?
রৌদ্র ফের টেনে ধরলো মেঘা কে । ডান হাতের সাহায্যে মেঘার এক হাত পেছনের দিকে মুচড়ে ধরলো ওকে রুখতে । অতঃপর নিজের বাম হাত দিয়ে চেপে ধরলো মেয়েটার ঢিলেঢালা খোঁপাটা । দুই হাতেই শক্তি খাটিয়ে একেবারে নিকটে এনে দাঁড় করালো মেয়েটাকে । মাথা নামিয়ে মেঘার মুখের উপর ঝুঁকে পড়লো ।
ছটফটিয়ে উঠলো মেঘা । রৌদ্র ফের হিসহিসিয়ে উঠলো নেশাতুর কন্ঠে…..
” এইইই , কি চাই তোর এখানে ? কেনো পড়ে আছিস এ বাড়িতে ? কোন অধিকারে এখনো আছিস এখানে ? আমার অধিকারে ? লিসেন , যদি আমার অধিকার থেকে এ বাড়িতে পড়ে থাকিস , তাহলে তোর থাকাটা জাস্ট ইন ভেইন । আমার আশায় পড়ে আছিস তো এখানে ? স্টুপিড গার্ল…
মেঘা ফুঁসে ওঠে । রৌদ্র শক্ত করে পেঁচিয়ে মুচড়ে ধরেছে ওর হাত । মেঘা এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় । রৌদ্র কে ঠেলতে গেলেই পিছিয়ে যায় রৌদ্র । তবে ওর বাম হাতের মুঠোয় থাকা মেঘার খোঁপার কাঁটা’টা মাটিতে খসে পড়ে হাত সরানোর সাথে সাথে । নিমিষেই মেঝে ছোঁয়া অজস্র কেশরাশী ঝাঁপিয়ে পড়ে পিঠে । সিল্কি কুন্তল ঢেউ খেলে ছাড়িয়ে যায় উরুসন্ধি । ঔদ্ধত্যের সহিত উপেক্ষিত হওয়া মাত্রই ক্ষিপ্ত হতে চাইলো রৌদ্র । তবে হলো না । খোলা চুলের এই এলোকেশিকে দেখে বোধহয় হৃদযন্ত্র থমকালো । স্তব্ধ হলো হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া । এদিকে নিজেকে ছাড়িয়ে সামনা সামনি দূরত্ব বাড়িয়ে দাঁড়ায় মেঘা , দাঁত পিষে চোখ মুখ শক্ত করে টাটিয়ে তেঁতে ওঠে….
” মাথার স্ক্রু কি ঢিলে নাকি আপনার ? আর নাকি নেশার ঘোরে উল্টো পাল্টা বকছেন ? আমাকে চেনেন আমি কে ? আমি তো আপনাকে চিনি না ! হু আর ইউ ? এই বাড়ির কেউ আপনি ? কে এই বাড়ির , কি হন এ বাড়ির লোকদের ? আপনার আশায় আমি এ বাড়িতে থাকবো ? হোয়াট এ জোকস্…
হোয়াটেভার…..
বাড়ির মেহমান হয়তো আপনি ! দুদিনের জন্য এসেছেন , তাই কিছু বললাম না ! নয়তো এমন উশৃঙ্খল বিহেভিয়ার এর জন্য সপাটে দুটো চড় বসিয়ে দিতাম । রাত বিরেতে মদ খেয়ে মাতলামো করতে এসেছেন ? যত্তসব ডিজগাস্টিং সেন্সলেস লোক….
কথাটা মুখ থেকে উচ্চারণ করেই চরম বিরক্তি দেখিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো মেঘা । রৌদ্র আহম্মক বনে তাকিয়ে রইল । এই মেয়ে কি সব ফটর ফটর করলো । মাথায় ঢুকেও বোধগম্য হলো না রৌদ্রের । আর কিছু বলার সুযোগ ও পেলো না । কেবলই তাকিয়ে রইল নিস্পৃহ চোখে । মেঘা ঘরে ঢুকলো এর মধ্যেই । এদিকে ফেলে গেলো এক জোড়া স্তব্ধ দৃষ্টি ।
সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসেছে সকলে । তোফায়েল কাবির, তৌসিফ কাবির আর শুভ্র অফিসে বেরোবেন । আহিয়ান বেরিয়ে গেছে অলরেডি ।
আদ্র , শাফাহ্, মেঘা , এরা বেরোবে ভার্সিটিতে । একসাথে খেতে বসেছে সকলে । সিরাত বাচ্চা কে নিয়ে সোফায় বসে আছে । আটটা বাজে সবে । খাওয়া দাওয়া সেরে আদ্র উঠলো সবার আগে । সিরাতের থেকে বাচ্চা কে কোলে নিলো সাবধানে । বললো….
” আজকে চেকআপের জন্য হসপিটালে যাওয়ার ডেট আছে আপু । আহিয়ান ভাইয়ার ফিরতে লেইট হবে । আমি দুপুরে ভার্সিটি থেকে ফিরে নিয়ে যাবো । তৈরি থাকবে ।
সিরাত ছোট্ট করে উত্তর করলো শুধু…
” আচ্ছা !
মেঘা আর শাফাহ্ তড়িঘড়ি করে খাওয়া শেষ করলো । বেরিয়েও পড়লো ওরা । রাজধানীর নামকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় । পার্কিং লটে গাড়ি থামিয়ে নামলো আদ্র । চোখে সেই শুরু থেকেই কালো সানগ্লাস । পড়নের কালো শার্ট ইন করা । গাড়ির ব্যাক সিট থেকে ব্লেজার হাতে নিয়ে ডোর লক করলো সে । শাফাহ্ আর মেঘা ইতোমধ্যে নেমে গেছে । পাশে দাঁড়িয়েছে গুটিসুটি হয়ে । ওরা দুজন আদ্রর সামনে বাড়িতে এক আর ভার্সিটিতে আরেক । আসল কথা ওরা অভিন্ন , তবে আদ্র ভিন্ন । ভার্সিটিতে আরেক সত্বা তার ।
ভার্সিটির সবার সামনে আরেক দাম্ভিক সত্বার অধিকারক লেকচারার আদ্রিয়ান কাবির আদ্র । সবার কাছে গুরুগম্ভীর প্রফেসর সে । রুপ সৌন্দর্যে অতুলনীয় । প্রত্যেকটা মেয়ের অন্তর্নিহিত আবেগ বলা চলে । ওর এই দাম্ভিকতা টাই আরো বেশি চার্মিং সব মেয়ের নিকট । ভার্সিটির সর্বকনিষ্ঠ স্মার্ট প্রফেসর সে । প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্র বলতে অজ্ঞান সকলে । ইংরেজি লেকচারার আদ্র । ভার্সিটিতে পা রাখা মাত্রই সে কাউকে পরোয়া করে না । মেঘা আর শাফাহ্ কে চেনে না এমন ভাব ধরে । এই যে গাড়ি থেকে নামলো , এরপর থেকে কেউ কাউকে চেনে না । আবার ছুটির পর গাড়িতে উঠার পর ফের আগের মতো । আদ্র ভার্সিটিতে নিজের আলাদা ফিগার ফুটিয়ে তোলে । সেটাতেই হেবিটেড সে ।
গাড়ি থেকে নেমেই নিজেদের পথে হাঁটা শুরু করলো মেঘা আর শাফাহ্ । প্রথমেই আদ্রের ক্লাস । শুরু হবে পনেরো মিনিটের মধ্যেই । আর্দ্র এদিক থেকে টাইম রেসপন্সিবেল । নিজের ক্লাসে টাইম ইঞ্চিতেও মেইনটেইন করে সে । ঠিক কাঁটায় কাঁটায় ক্লাসে উপস্থিত হয় । লেইট স্টুডেন্ট ওর ক্লাসে এটেন্ড করতে পারে না আর ।
সবাই ওর ক্লাসের ক্ষেত্রে এলার্ট । দু মিনিট দেরি হলে আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের ক্লাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ । যথেষ্ট রিজন ব্যাতিত লেইট স্টুডেন্ট কে নিজের ক্লাসে অ্যালাউ করে না আদ্র ।
মেঘা আর শাফাহ্ সোজাসুজি ক্লাসে ঢুকেছে । পাশাপাশি বসলো ওরা । এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে কাঙ্ক্ষিত একটা মুখকে খুঁজলো । পেলো না । মেঘা ভ্রু যুগল জড়ো করে শাফাহ্ কে উদ্দেশ্য করে বললো….
” শিশির আজকেও আসে নি ?
” দেখতে তো পারছি না । দুদিন ধরে আসছে না , ফোনেও কথা হচ্ছে না ওর সাথে । কে জানে আবার কি হলো ।
” ওর আপু কে কাল ফোন করেছিলাম , বললো তো আজ আসবে । কিন্তু এখনো আসলো না কেনো ? আদ্র ভাইয়ার ক্লাসের সময় হয়ে গেছে । এক্ষুনি ক্লাসে হাজির হবে ভাইয়া । এই মেয়েটা আজকেও ভাইয়ার ক্লাসে লেইট করবে । দেখিস , আজও ক্লাস করতে পারবে না ও । ভাইয়া ওকে ঢুকতেই দেবে না ক্লাসে ।
মেঘার কথা শেষ হতেই এক মেয়েলি মেকি স্বর কানে আসলো….
” হায় গাইজ !
কেমন আছো ?
মেঘা আর শাফাহ্ চকিতে চায় । সামনে ফারিন দাঁড়িয়ে । ওদেরই ক্লাসমেট । নেকি স্বভাবের গায়ে পড়া একটা মেয়ে । টুকটুকির চোখের বিষ । ও একদম সহ্য করতে পারে না এই মেয়েটাকে । বড় লোকের বখে যাওয়া মেয়ে । ড্রেসআপের ঠিক নেই । শালিন পোশাক গায়ে চড়ে না কখনো । ক্লাস করতে তো আসে না , আসে আদ্রের সাথে ফ্লার্টিং করতে । সবার আগে এই মেয়ে ক্লাসে উপস্থিত হয় । শাফাহ্ ওকে দেখা মাত্রই চোখ মুখ কুঁচকে মুখ ঝামটালো , খ্যাক খ্যাক করে বললো….
” আমরা খুউউউউব ভালো আছি ।
ফারিন হেসে বলল…..
” আদ্র স্যার আসবে না ?
” কোনো দিন কি এমন গেছে , যেদিন আদ্র স্যার আসে নি ? আর কোনো দিন এমন ও যায় নি , যেদিন তুমি এই প্রশ্নটা করো নি । রোজ রোজ এক প্রশ্ন করে কি পাও বলতো ?
ফারিন তবুও হাসলো । ওর হাসিতে বিরক্তিতে চোখ উল্টালো শাফাহ্ । মেঘা অনড় । ফারিন আবার মুখ খুলতে গেলে শাফাহ্ বিরক্তি দেখিয়ে বললো রুক্ষ স্বরে …..
” যাও তো এখান থেকে । এক্ষুনি স্যার ক্লাসে আসবেন । আজ স্যার কে হেব্বি ড্যাসিং লাগছে । স্যারের এন্ট্রি টা মিস করবে তুমি । যাও যাও , গিয়ে দরজার দিকে নজর রাখো ।
হকচকিয়ে চিকচিক করে জায়গা ত্যাগ করলো ফারিন । ও চলে যেতেই শাফাহ্ আবার বললো কটাক্ষ করে….
” ঢং , তোমার ছল চাতুরি আমি বুঝি মনা । তুমি যে আদ্র ভাইয়াকে পটানোর জন্য আমাদের সাথে খাতির করতে আসো এটাও জানি । যত্তসব গায়ে পড়া মেয়ে । আদ্র নামটাও ওর মুখে সহ্য হয় না আমার ।
এর মধ্যেই ক্লাসে গটগটিয়ে আগমন আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের । উপস্থিতির কোনো আগাম বার্তা নেই । গটগটিয়ে ক্লাসে ঢুকে সোজা ডেস্কের সামনে দাঁড়ালো ও । অমনি চুপ মেরে শান্ত হয়ে গেলো পুরো ক্লাসরুম ।
গুটিসুটি মেরে বসে তব্দা খেয়ে সামন পানে তাকিয়ে রইলো সকলে । রোজকার মতো আজকেও দৃষ্টি থমকালো মেয়েদের । সব মেয়ে অপলক দৃষ্টিতে ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে রইল আদ্রের দিকে । এই প্রফেসরের ট্যাগ লাগানো লোকটা এতো সুন্দর কেনো ?
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩
আদ্রের জন্যই ওর ক্লাস কেউ কখনো মিস দেয় না । যথাসম্ভব এটেনডেন্স থাকে আদ্রের ক্লাসে । এর মধ্যে বেশির ভাগই ফিমেল স্টুডেন্ট ।
আদ্র ভার্সিটিতে এক রোখা , গুরুগম্ভীর । লেকচার ব্যাতীত বাড়তি কোনো টু শব্দও হয় না ওর ক্লাসে । এসাইনমেন্টে এসে রাইটিং ছিলো । আদ্রের ডেস্কের সামনে মুহুর্তেই এসাইনমেন্টের হার্ড কপি হাজির হলো ।
এর মধ্যেই এসাইনমেন্ট চেক করতে করতেই ক্লাসে পনেরো মিনিট পেরিয়ে গেছে ।
দরজার কাছ থেকে হন্তদন্ত একটা চিকন মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসলো এ পর্যায়ে ….
” মে আই কাম ইন, স্যার ?
