Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 21

Tell me who I am 2 part 21

Tell me who I am 2 part 21
আয়সা ইসলাম মনি

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটেছে মাত্র। ঘরের জানালার ভারী পর্দাগুলো ভেদ করা ভোরের এক ফালি ম্লান আলোয় কারানের অবিন্যস্ত চুল আর র’ক্তা’ভ চোখ দেখে মিরার মনে হলো, গত কয়েক ঘণ্টায় কোনো একটা অদৃশ্য মহাপ্রলয় ঘটে গেছে।
“মিরা, মনে হচ্ছে আমার জীবনে অশ্রুর দিন এসে গেছে। তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে একটু শান্তিতে কাঁদতে চাই, কাঁদতে দিবে?”
কারানের কণ্ঠস্বর আজ ভাঙা, সেখানে কোনো কর্তৃত্ব নেই, নেই সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। কারান চৌধুরীর মতো একজন মানুষ, যার ব্যক্তিত্বের কাছে পাহাড়ও নতি স্বীকার করে, সে আজ কতটা নিঃস্ব হলে এমন করুণ আর্তি জানাতে পারে! মিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল সেই দুর্ঘটনার রাতের কথা, যখন কারান তাকে হারানোর ভয়ে পা’গলের মতো ডুকরে কেঁদেছিল। কিন্তু আজ? আজ তো আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মতো কিছু ঘটেনি, তবে কেন এই করুণ আত্মসমর্পণ?

তার চোখের নিচে লেপ্টে থাকা কালি, শুকনো ঠোঁট আর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অবয়ব দেখে মিরার হৃৎপিণ্ডে র’ক্তক্ষরণ শুরু হলো। মিরা নিঃশব্দে নিজের দুহাত বাড়িয়ে দিল। কারান মিরার নরম বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মুহূর্তে তার শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়ে এল, ঠিক যেমন দীর্ঘ যুদ্ধের পর একজন পরাজিত যোদ্ধা তার শেষ অস্ত্রটি মাটিতে নামিয়ে রাখে।
জানালার ওপাশে দেবদারু গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মহাকর্ষ বলের টানে নিঃশব্দে নিচে ঝরে পড়ছে। অ্যারিকা পাম গাছটা ভোরের বাতাসে অল্প কাঁপছে। এদিকে ঘরের ভেতর ছন্দময় কোনো শব্দ নেই, শুধু কারানের ভারী নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারান যেন তার সমস্ত অস্তিত্বের ভার আজ মিরার কাঁধে সঁপে দিতে চাইছে। মিরা কারানের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে অনুভব করল, কারানের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি।

হঠাৎই যখন কারানের চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু মিরার কাঁধ বেয়ে পিঠে গড়িয়ে পড়ল, তখন মিরার বুকের ভেতরটা ধক করে কেঁপে উঠল। ভ্রূ যুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। দীর্ঘ একুশ মিনিটের সেই স্তব্ধতা ভাঙল মিরার উদ্‌বিগ্ন কণ্ঠে, “কি হয়েছে, কারান?”
কারান নিশ্চুপ। তার বুকের ভেতরটা এখন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় সে নিজেই আজ প্রধান আসামি। তার চোখের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে সেই অন্ধকার নির্জনতায় তারান্নুমের ছিন্নভিন্ন, র*ক্তাক্ত দেহ, যেখানে মানবদেহের সবথেকে মূল্যবান অঙ্গগুলো উধাও। যদি কেউ তাকে প্রশ্ন করে, তার জীবনের সবথেকে যন্ত্রণার মুহূর্ত কোনটা? তবে সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দেবে—সেই মুহূর্তটা, যখন তাকে বোনের নিথর মাথাটা ঊরুতে তুলে নিতে হয়েছিল। তার নিজের ওপর ধিক্কার জাগছে, কেন সে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করেই দুবাই চলে গিয়েছিল?
কারানের মনে হলো, সে কি তবে অভিশপ্ত? যারাই তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে, হোক সে কৌশিকা, আয়লা কিংবা তারান্নুম, সবাইকে নিষ্ঠুর নিয়তি ছিনিয়ে নিয়েছে। তবে কি এরপরের তালিকায় মিরা? তার অবশিষ্ট পৃথিবী, তার শেষ আশ্রয়, তার ভালোবাসা? এই ভাবনা আসতেই কারানের সারা শরীর শিউরে উঠল, ঠোঁট দুটো কাঁপতে শুরু করল।

আতঙ্কে মরিয়া হয়ে কারান মিরাকে এত জোরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল যে, মিরার শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল। দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি হলেও মিরা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না। সে তার অস্থিরতাটা অনুভব করতে পারছে। কারানের বুকের ধুকপুকানি যেন মিরার শরীরে আছড়ে পড়ছে।
মিরা অতি কষ্টে ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে নিতে ফিসফিস করে বলল, “কারান… কি… কিছু তো বলো? এভাবে পাথর হয়ে থেকো না। হঠাৎ কেন এত অস্থির হয়ে উঠলে? আমাকে কি বলা যায় না?”
কারান তবুও কিছু বলল না, কেবল মিরার তনুমন জাপটে ধরে ওর কাঁধের ভাঁজে মুখ আড়াল করে চোখ বুজল। মিরার ধৈর্য এবার অসহায়ত্বে রূপ নিল। সে কারানের চোয়ালের দুই ধার নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মুখটা তুলে ধরল। কারান স্থির নেত্রে মিরার দিকে চাইল। মিরা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল, “তোমার চোখের জল আমার হৃদয়ে শেলের মতো বিঁধছে, জান। তুমি কি বলবে কেন নিজেকে এতটা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলেছ?”
মিরার আনন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, কারানের বুকের গহিনে যে হাহাকার চলছে, তার উত্তাপ মিরাকেও দহন করছে। মিরার মায়াবী মুখটা এই মুহূর্তে থমথমে হয়ে আছে। মিরা তার ললাটের চুলগুলো পরম মমতায় সরিয়ে দিয়ে তাকে দেখতে থাকলো। মিরার ওষ্ঠাধর কাঁপছে, চোখের কোণে জল টলমল করছে।

“প্লিজ বলো, আমার দুনিয়া! কী এমন হয়েছে? আমার কিন্তু এবার সিরিয়াসলি কান্না চলে আসবে। তুমি কি তোমার মহারানির চোখে জল দেখতে চাও, জাঁহাপনা? কিছু তো বলো, নূরের আলো?”
মিরার এই আকুল আর্তি শুনে কারান এবার তার হাত ধরে ঘরের দক্ষিণ পাশের ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বিশাল বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। মিরা কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো ওর পিছু নিল। জানালার পর্দাগুলো আধখোলা থাকায় ভোরের তির্যক আলো তখন কার্পেটের ওপর আলো-ছায়ার জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে। কারান ওকে বিছানায় বসিয়ে নিজে ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। মুখটা মিরার উদরের দিকে লুকিয়ে সে যেন বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।
মিরা অনুভব করতে পারছিল কারানের এই মুহূর্তের নিঃসঙ্গতা। সে কোনো কথা না বলে কারানের ঘন চুলের ভেতরে আলতো করে আঙুল চালাতে লাগল। প্রায় আট মিনিট পর কারান অবশেষে খুব ক্ষীণ স্বরে আওড়ালো, “তরু চলে গেছে!”

কথাটা শুনে মিরা ক্ষণিকের জন্য বিমূঢ় হলেও পরক্ষণেই একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকের ওপর চেপে বসা বিশাল পাথরটা যেন মুহূর্তেই সরে গেল। মনে মনে ভাবল, “ইয়া আল্লাহ, কী দুশ্চিন্তায় না ফেলে দিয়েছিল লোকটা। আমি তো ভেবেছিলাম কোনো বড়ো ধরনের ক্যালামিটি ঘটে গেছে!”
মিরা কারানের অবিন্যস্ত চুলে বিলি কাটতে কাটতে অবচেতনেই একটু হাসল। আপনমনে স্বগতোক্তি করল, “মুখে তো সবসময় তরুর প্রতি বিরক্তভাব দেখাও, ওকে সহ্যই করতে পারো না। অথচ কী গভীর মমত্ববোধ লুকিয়ে ছিল হৃদয়ে, যার কারণে আজ স্বয়ং কারান চৌধুরীর দু-চোখ লোনা জলে ভিজেছে!”
একটু ঝুঁকে কারানের চুলে আলতো করে একটা উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল মিরা। নিজের থুতনিটা ওর মাথার ওপর ঠেকিয়ে বলল, “অদ্ভুত তো! কারো সাথে দেখা না করেই তরু চলে গেল? ফারহানের তো অন্তত উচিত ছিল সবার সাথে কথা বলে যাওয়া। বাড়ির বড়রা কী ভাববেন বলো তো? আচ্ছা, তুমি ওদের কিছু বলোনি?”
কারান নিরুত্তর। মিরার শেষ বাক্যটা ওর মস্তিষ্কে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, ‘কারোর সাথে দেখা না করেই তরু চলে গেল?’

হ্যাঁ, তারান্নুম সত্যিই চলে গেছে। তবে কোনো বিমানে চেপে ভিনদেশে নয়, বরং এমন এক চিরস্থায়ী ঠিকানায় পাড়ি দিয়েছে যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন অসম্ভব।
কারানের কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে মিরা ওর মুখের একাংশের দিকে তাকাল। দেখল কারানের নয়নপল্লব এখনো অশ্রুসিক্ত। মিরা পরম আদরে ঝুঁকে কারানের সিক্ত চোখের পাতায় একটি চুম্বন দিল। কারানের মনে হলো তার আগ্নেয়গিরি হয়ে থাকা বুকে যেন কেউ এক বালতি বরফ জল ঢেলে দিল। সেই নোনতা জলটুকু শুষে নিয়ে মিরা মুখ তুলে চাইল। আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, “খুব বেশি আপসেট লাগছে তোমার?”
কারান চোখ বন্ধ রেখেই শুধু বলল, “হু!”
“এটা তো জীবনের একটা ফেজ, কারান। মেয়েরা তো একদিন না একদিন পরের ঘরে চলেই যায়। আর ওরা তো জাস্ট কয়েকটা দিনের জন্য ঘুরতে গেছে। সারাজীবনের জন্য তো আর যায়নি। কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে, ওরাও ফিরে আসবে। তাই না?”

কারান এবার মিরার কোল থেকে উঠে বসল। মুখটা সামান্য গোল করে ফুসফুস ভরে বাতাস নিল, তারপর এক ঝটকায় কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়ে দিয়ে নিজেকে কঠোর বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করাতে চাইল।
মিরার সেই চন্দ্রিমা-সদৃশ কোমল মুখখানি নিজের দুই শক্ত হাতের তালুর বন্ধনীতে আবদ্ধ করল কারান। অত্যন্ত গম্ভীর ও ধারালো কণ্ঠে বলল, “সবকিছু প্যাক করতে শুরু করো। আর… ফুপি আর তুব্বাকেও তৈরি হতে বলো, আকবর কাকা তো ঢাকাতে আছেনই। এই অভিশপ্ত গ্রামে আমাদের আর একটা মুহূর্তও থাকা চলবে না। আমরা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শহরে ব্যাক করছি। গট ইট?”
“কিন্তু কারান, হুট করে কেন…” মিরা ওর বাক্যের শেষাংশ উচ্চারণ করার পূর্বেই কারান ঝড়ের বেগে কক্ষ ত্যাগ করল। মিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে সেই খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
মিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপনমনেই আওড়ালো, “আই গেস আমি আমার পুরো লাইফ স্পেন্ড করলেও এই মানুষটার ভেতরের সাইকোলজিক্যাল কমপ্লেক্সিটির সলিউশন পাবো না। ইউ আর টু মিস্টিরিয়াস, আবরার কারান চৌধুরি। তোমার এই ডার্ক অরা আজ আমাকেও ছাপিয়ে গেল!”

কারান তড়িঘড়ি করে দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে সোজা আম্বিয়ার কক্ষের দিকে ধাবিত হলো। ওর মস্তিষ্কের নিউরনগুলোয় তখন অজস্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রতিটি প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর আজ আম্বিয়াকে দিতেই হবে। যে কখনো অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে না, সেই কারান আজ কোনো প্রকার শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করেই তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
প্রবেশ করতেই কারানের চোখের রেটিনায় ভেসে উঠল মক্কার দিকে মুখ করে মখমলের জায়নামাজে বসে আছেন আম্বিয়া। ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা বেজে ১৫ মিনিট। অর্থাৎ তিনি ইশরাকের সালাত আদায় করছেন। কারানের ভেতরের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলো, যখন সে দেখল স্বয়ং আম্বিয়া জমাদ্দার মোনাজাতে হাত দুটো তুলে অঝোরে অশ্রুবিসর্জন করছেন। কারানের চেনা এই ত্রিশ বছরের জীবনে, সে যত নর-নারী দেখেছে, তার মধ্যে যদি কাউকে হিমালয়ের মতো অটল, ইস্পাতের মতো দৃঢ় আর তীক্ষ্ণ চাণক্য বুদ্ধিসম্পন্ন মনে করে থাকে, তবে তিনি নিঃসন্দেহে তার দাদি আম্বিয়া। কিন্তু আজ সেই পাথরেও ফাটল ধরেছে।
দীর্ঘ বারো রাকাতের এই দীর্ঘায়িত আত্মনিবেদনের পর, যখন আম্বিয়া মোনাজাত শেষে দুই হাতের তালু মুখে বুলিয়ে পরম শান্তিতে ‘আমিন’ বললেন, ঠিক তখনই কারানের কণ্ঠস্বর তীরের মতো ধেয়ে গেল, “তুমি প্রথম থেকেই সব জানতে, তাই না দিদা?”

আম্বিয়া চমকালেন না, এমনকি ওনার চোখের পলকটাও কাঁপল না। তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে জায়নামাজটি ভাঁজ করে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে, শ্লথ পায়ে কারানের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। এই বলিরেখা-যুক্ত, কুঞ্চিত মুখশ্রী যদি কারান অন্য কোনো সাধারণ মুহূর্তে দেখত, তবে নিশ্চিত ওর বুকটা কেঁদে উঠত। কারণ ওনার এই বিধ্বস্ত, ভগ্ন রূপ কারান ইতঃপূর্বে কখনো দেখেনি।
আম্বিয়ার তরফ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে কারান এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ও ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিয়ে শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “কেমন লাগছে আমার কলিজাটা এভাবে জীবন্ত ছিঁড়ে খে’তে?”

আম্বিয়ার সেই কুঁচকানো থুতনিটা এবার প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। চোখের কোটরে জমে থাকা লোনা জলের আরও একটি তপ্ত ফোঁটা ওনার শুষ্ক গালের গভীর বলিরেখা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
প্রকৃতপক্ষে, গত রাতে কারানের আকস্মিক আগমন এবং এসেই আম্বিয়ার ঘরে ঢুকে উন্মত্তের মতো তল্লাশি চালানো—এসব দেখেই ওনার প্রখর ষষ্ঠেন্দ্রিয় বিপদের গন্ধ পেয়েছিল। কারণ তিনি যে কারানকে চেনেন, সে শৈশব থেকেই ওনার পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সময় কখনো সামান্যতম বিঘ্ন ঘটায়নি। আম্বিয়া তারপর তিলাওয়াত শেষ করে মিরা আর কারানের শয়নকক্ষের দিকে গিয়েছিলেন। মিরার সেই বিবর্ণ, পাংশুটে মুখ দেখে ওনার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এরপর তিনি পুরো জমিদার বাড়ির অন্দরমহল ঘুরে সবার সাথে কথা বলেন, এবং তখনই আবিষ্কার করেন, তারান্নুম কোথাও নেই!

সন্দেহের শেষ পেরেকটি ঠোকা হয় তখন, যখন উপলব্ধি করেন, ওনার আদরের ‘কলাবতী’, যে কি না ওনার কুরআন পড়ার সময় সবসময় পেছন থেকে হুট করে এসে কোলে শুয়ে পড়ত, কানের কাছে চুলে সুড়সুড়ি দিয়ে দুষ্টুমি করত, সেই চঞ্চল মেয়েটা সারাটি সন্ধ্যা একবারের জন্যও দিদার ঘরে পা রাখেনি! দুর্ভাগ্যবশত, আম্বিয়া তখন তিলাওয়াতে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, এই অস্বাভাবিকতা খেয়ালই করেননি। সেই তীব্র আশঙ্কায় তিনি মাঝরাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে, একটা পুরোনো পিতলের হারিকেন হাতে নিয়ে বের হয়েছিলেন।
বাড়ির বিস্তীর্ণ বাগান, ঘাটের লিলি পুকুর, প্রমত্তা নদীর নির্জন তীর—কোথাও তারান্নুমের চিহ্ন মেলেনি। অবশেষে বাধ্য হয়েই তিনি গ্রামের সেই কুখ্যাত, লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা নিষিদ্ধ জঙ্গলে প্রবেশ করেন। আর তখনই অন্ধকারের বুক চিরে আসা ফারহানের সেই গগনবিদারী আর্তনাদ আর বুকফাটা আহাজারি ওনার কানে আসে। ওদিকে এগিয়ে গিয়েই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড়ো, সবচেয়ে নৃশংসতম কৃষ্ণগহ্বরের মুখোমুখি হন। ওনার চোখের মণি নাতনিটা আর এই ইহজগতে নেই!

গত রাতের সেই হাড়-হিম করা বীভৎস স্মৃতি হঠাৎ মাথায় আসতেই আম্বিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ওনার অবশ হয়ে আসা শরীরটা যখন মাটির দিকে ঢলে পড়তে শুরু করল, কারান পুরুষালি ক্ষিপ্রতায় ওর দীর্ঘ দুহাতে ওনাকে ধরে পতন রোধ করল। সে পাশে থাকা ভিক্টোরিয়ান আমলের রাজকীয় ওক কাঠের আর্মচেয়ারটা টেনে দাদিকে আলতো করে বসিয়ে দিল। আম্বিয়ার ওষ্ঠাধর তখন শুষ্ক, চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হতেই কারান তড়িঘড়ি করে টেবিলে রাখা রুপোর জগ থেকে স্ফটিকস্বচ্ছ পানি কাচের গ্লাসে ঢেলে তার কাঁপাকাঁপা ঠোঁটের কাছে ধরল।
কয়েক ঢোক পানি পান করার পর আম্বিয়ার ফুসফুস আবার স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ফিরে পেল। তিনি একটা দীর্ঘ ও তপ্ত নিশ্বাস ফেলে শুকনো ঢোক গিললেন।
কারান এবার তার সমস্ত আভিজাত্যের খোলস ভেঙে রাজকীয় মেঝেতে হাঁটু মুড়ে তার দাদির পায়ের কাছে বসল। বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে অত্যন্ত করুণ, ভাঙা গলায় বলল, “কেন… কেন এমন করলে, দিদা? মা ঠকালো, আর তুমিও… তুমিও আমার সাথে একই খেলা খেললে?”

কারানের এই চূর্ণ-বিচূর্ণ, বিধ্বস্ত অবয়ব দেখে আম্বিয়া ওনার বার্ধক্যের বলিরেখায় ভরা, কাঁপাকাঁপা হাতটা কারানের ঘন চুলে রাখলেন। এই মুহূর্তে কারানের ঠিক এই স্পর্শটারই বড্ড প্রয়োজন ছিল। ওর ভেতর থেকে একটা তীব্র বুকফাটা কান্না উপচে আসতে চাইল, ইচ্ছে হলো এই দাদির কোলে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কিন্তু পারল না; বনেদি বংশের র*ক্ত আর পুরুষালি অহংবোধ ওকে দাদির সামনে এতটা সস্তা হতে দিল না। সে কেবল আলতো করে নিজের তপ্ত মাথাটা আম্বিয়ার হাঁটুর ওপর গুঁজে দিল। আম্বিয়া পরম স্নেহে ওর মাথায় আঙুল চালাতে লাগলেন।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে হঠাৎ আম্বিয়া অতিপ্রাকৃতিক স্বরে বললেন, “কৌশি ঠকায় নাই।”
এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে হঠাৎ এমন একটি বাক্য কারানের মস্তিষ্কের নিউরনে যেন এক হাজার ভোল্টের আকস্মিক বজ্রপাত ঘটাল! সে একরাশ বিস্ময় আর অবিশ্বাস নিয়ে আম্বিয়ার দিকে তাকাল। আম্বিয়া শান্ত ভঙ্গিতে ওনার পরনের ধূসর সুতি শাড়ির আঁচল দিয়ে নাতির চোখের নোনা জলটুকু পরম যত্নে মুছে দিলেন। কারানের শক্ত চোয়ালে হাত বুলিয়ে আবার বললেন, “আমার কৌশি বাঁইচা আছে, কারান। কৌশি তোরে ঠকায় নাই।”
কারানের বোধশক্তি যেন লোপ পেল। কোনো যুক্তি, কোনো সমীকরণ আর মিলল না। এক ঝটকায় মেঝে থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। মাথার ভেতরটায় তীব্র একটা চাপ অনুভব করছে, সব কিছু ওলটপালট লাগছে। কী হচ্ছে এসব? কিংবা অতীতে কী ঘটেছিল? এতদিন ধরে যে সত্যকে সে ধ্রুবতারার মতো বিশ্বাস করে এসেছে, তার পুরো অস্তিত্বটাই কি তবে একটা সুনিপুণ ভ্রম ছিল?

আম্বিয়া হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে এগিয়ে গেলেন। ঘরের কোণে রাখা মেহগনি কাঠের আলমারিটি খুললেন, যার ভেতর থেকে ন্যাপথালিনের একটা চড়া গন্ধ বেরিয়ে এল। তিনি ভেতর থেকে একটি পার্সিয়ান ঘরানার কারুকাজ করা মখমলের কাঠের বাক্স বের করলেন, এবং সেটি কারানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। কারান জড় বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। নাতির এই বিহ্বলতা দেখে আম্বিয়া নিজেই বাক্সের ডালাটা আলগা করে বললেন, “এর মধ্যে তুই দুই ধরনের চিঠি পাইবি, মানিকচাঁদ। একখান আমার নিজের হাতে লেখা, আরেকখান তোর মা কৌশির। আশা করি এই কাগজগুলা পড়ার পর তোর জীবনের সব ভুল ধারণা দূর হইয়া যাইব। তুই সব উত্তর পাইয়া যাবি।”
কারান বাক্সের গভীরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সেখানে প্রাচীন হলদেটে রঙের কিছু ছেঁড়া কাগজের টুকরো সুবিন্যস্ত করে রাখা, যেগুলো আম্বিয়া আগেরবার কারানের থেকে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারান একটা দীর্ঘ ঢোক গিলে, একটা কাগজের টুকরো স্পর্শ করার জন্য হাত বাড়াতেই আম্বিয়া খট করে বাক্সের ডালাটি বন্ধ করে দিলেন।
কারান চমকে উঠে ওনার চোখের দিকে তাকাতেই আম্বিয়া অত্যন্ত কঠোর গলায় বললেন, “তার আগে একখান মস্তবড়ো কাম বাকি আছে, মানিকচাঁদ।”

গত রাতে যদিও এই বিশাল জমিদার বাড়ির বাগান আর সেই নিষিদ্ধ জঙ্গল হন্যে হয়ে খুঁজেছে তারা। তবুও নিশুতি রাতের নিকষ অন্ধকারে চোখের পলকে এমন অনেক সূক্ষ্ম সূত্র এড়িয়ে যাওয়া স্বাভাবিক, যা এখন ভোরের এই তির্যক আলোয় ধরা পড়তে পারে।
কারান আর আম্বিয়া বনের প্রতিটি ইঞ্চি জমি খুঁজে বেড়াচ্ছে। গাছের ডালপালা, লতাপাতা, এমনকি মাটিতে পড়ে থাকা প্রতিটি শুকনো পাতা পর্যন্ত উলটেপালটে দেখছে। আম্বিয়া একজন অশীতিপর বৃদ্ধা, যার শরীরে দ্রুত ক্লান্তি আসার কথা, পেশিগুলো অবশ হয়ে আসার কথা, কিন্তু আজ তার পায়ে যেন অলৌকিক শক্তি ভর করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি এই কাঁটাঝোপ আর স্যাঁতসেঁতে কাদামাটির ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছেন প্রমাণের সন্ধানে, অথচ তার মুখে বা শরীরে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই।

গত রাতের সেই কালান্তক ঘটনার পর আম্বিয়াকে দেখার সুযোগ ফারহানের আর ঘটেনি। তীব্র মানসিক আঘাতে ওর মস্তিষ্ক কার্যক্ষমতা সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলার কারণে ও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
আম্বিয়া খুব ভালো করেই জানেন, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তিনি নিজে যতটা পাষাণসদৃশ দৃঢ়, ওনার কন্যা ফাতিমা ঠিক ততটাই ভঙ্গুর। যে ফাতিমা একদা নিজের স্বামীকে হ’ত্যা করেছিলেন, সেটি ছিল ওনার জীবনের ব্যতিক্রমী মনস্তাত্ত্বিক বি’স্ফোরণ। কিন্তু আদতে ফাতিমার স্বভাবের মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে সরলতা; ঠিক যেমনটা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল ওনার সদ্যপ্রয়াত কন্যা তারান্নুম। সেই ফাতিমা যদি আজ ওনার এই আদরের চঞ্চল মেয়েটার এমন ক্ষ’তবিক্ষ’ত, র*ক্তাক্ত মৃ*তদেহ দেখেন, তবে অন্দরমহলে এমন এক প্রলয়ংকরী পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যা সামলানো আম্বিয়ার পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। প্রথমে নাতনি, আর তারপরে যদি নিজের গর্ভজাত কন্যাকেও হারাতে হয়, তবে সেই অতিনির্মম আঘাত সহ্য করার মতো ক্ষমতা আম্বিয়ারও নেই।

তাই সমস্ত দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, আপাতত ঘরের বাকি সদস্যদের কাউকেই এই নি’র্মম হ’ত্যাকাণ্ডের কথা জানানো যাবে না। আম্বিয়া নিজের জীর্ণ, কাঁপাকাঁপা হাতে তারান্নুমের নিথর দেহের ক্ষ’তবিক্ষ’ত স্থানগুলো থেকে জমাট বাঁধা সমস্ত কালচে র*ক্ত ধুয়ে-মুছে সাফ করেছিলেন। সেই নিস্তব্ধ শেষ রাতে যখন তিনি ওনার কলিজার টুকরো নাতনির শেষ গোসল করাচ্ছিলেন, তখন ওনার বক্ষের ভেতরে ঠিক কেমন হাহাকার আর কতখানি তীব্র দহন চলেছিল, তা পরিমাপ করার মতো কোনো স্কেল মানবজাতির অভিধানে তৈরি হয়নি। এরপর অত্যন্ত বিশ্বস্ত একজন প্রবীণ ইমামকে ডেকে আনা হয়। সেই হুজুর আম্বিয়া জমাদ্দারকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন; তাই তিনি পবিত্র কোরানের কসম খেয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এই অকালপ্রয়াণের ভেতরের সত্যটা কখনোই বাইরে যাবে না।

কারান নিজের শরীরে লেগে থাকা বোনের ছোপ ছোপ র*ক্ত আর বনের কাদা ধুয়ে, কোনো রকমে নিজেকে বাহ্যিক দিক থেকে পরিচ্ছন্ন করে জানাজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। নিজের শক্ত দু কাঁধে তারান্নুমের সেই হিমশীতল কাফনে মোড়ানো লাশের খাটিয়া একা কাঁধে তুলে নিয়ে সে অন্ধকার কবরের গহিনে শুইয়ে দিয়েছিল। পুরোটা সময় কারানের অবয়ব ছিল নিরেট পাথরের মতো স্তব্ধ, ঠিক যেমন স্তব্ধ ছিলেন আম্বিয়া। দুজনের ওষ্ঠাধর থেকে একটা শব্দও বের হয়নি। অথচ দুজনের ভিতরে তখন হিমালয়ের চেয়েও বিশাল এক একটি হাহাকারের পর্বত ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছিল।

বনের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে পড়ে থাকা পচা পাতা ও বন্য ফার্নের ঝোপগুলোর এদিক-ওদিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তল্লাশি করতে করতেই আম্বিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, “নাতজামাই এহন কেমন আছে? কিছু জানাইছে ডাক্তার?”
কারান একটি ভাঙা গাছের ডাল সরিয়ে মাটির দিকে তাকাচ্ছিল। আম্বিয়ার প্রশ্নে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বভাবসুলভ ভারী গলায় বলল, “কন্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল, দিদা। ডাক্তাররা ওকে ফুল টাইম অক্সিজেন মাস্কে রেখে দিয়েছে। ও আসলে নিজে থেকে নরমালি ব্রিদ করতে পারছে না। ডক্টরস বললেন, এটাকে ‘সাইকোজেনিক হাইপারভেন্টিলেশন’ বলে। মানে মেন্টাল ট্রমাটা এতটাই সিভিয়ার ছিল যে ওর ব্রেন ফুসফুসকে রেগুলার কমান্ড দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

এই এক্সেসিভ শকের কারণে ওর বডিতে অক্সিজেনের ব্যালেন্স পুরো নষ্ট হয়ে গেছে। আসল কথা কী জানো? ও আর বাঁচতেই চাচ্ছে না। ব্রেন যাতে আর কোনো শক না পায়, সেজন্য ডক্টরস ওকে কড়া সিডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। এই অবস্থায় যে-কোনো সেকেন্ডে ওর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। মেডিক্যাল টিম ওদের বেস্ট ট্রাই করছে, কিন্তু… কিন্তু ফারহান আসলে মেন্টালি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে নিয়েছে।”
আম্বিয়া আর কোনো প্রতিপ্রশ্ন না করে কেবল নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখনই মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক বুনো পাখি কিচিরমিচির শব্দে উড়ে গেল। তিনি তার কুঁচকানো, শিরা-উপশিরা জেগে থাকা শীর্ণ হাত দুটো আকাশের শূন্যতার দিকে তুললেন। উপরের দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন, “আমার গুনা ছিল পাহাড় সমান, খোদা… তুই আজরাইল পাঠাইতি আমার দুয়ারে; তা না কইরা হাশরের ময়দানটারেই আমার সামনে নামাইয়া আনলি?”
কথাগুলো শেষ করে তিনি সাধারণ নারীদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন না, বরং তার চোখ বেয়ে কেবল কিছু অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।

বেশ কিছুক্ষণ সময়ক্ষেপণ করে প্রকৃতির এই রুক্ষ হাহাকারকে বুকে ধারণ করেই দুজন আবার সেই ক্লান্তিহীন অন্বেষণে লিপ্ত হল। এই ভেবে যে, নিয়তির এই সুনিপুণ দাবার বোর্ডে খু*নি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো আলগা চাল চেলে গেছে। বনের আরও গহিনে, যেখানে লতাগুল্মের জটলা আলোর প্রবেশপথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে, সেখানে খুঁজতে খুঁজতে আচমকা তারা সেই পরিত্যক্ত, জরাজীর্ণ ঘরটার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। আকস্মিক এই আবির্ভাবে দুজনই থমকে গেল, চোখের মণি স্থির হয়ে রইল।
কারান আলতো করে ঘাড় ঘুরিয়ে, ওর সেই তীক্ষ্ণ চিল-সদৃশ দৃষ্টি সামনের জীর্ণ কাঠামোর ওপর নিবদ্ধ রেখেই প্রশ্ন করল, “এই ঘর কি আগে এখানে ছিল, দিদা?
আম্বিয়ার প্রখর, চাণক্য চোখ দুটো সরু হয়ে এলো। তীব্র সংশয় আর সন্দেহের দোলাচলে কিছুক্ষণ ঘরটার দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি দ্রুত পায়ে ওদিকে অগ্রসর হলেন। কারানও তার পিছু নিল। ঘরের সদর দরজায় তখন মরিচা ধরা একটা ভারী পিতলের তালা ঝুলছে। কারান ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকাল; মাটিতে পড়ে থাকা একটা শ্যাওলাধরা ভাঙা ইট কুড়িয়ে নিয়ে সে পুরো পুরুষালি শক্তিতে তালার ওপর আঘাত করল। ধাতব শব্দে তালাটা ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল।

ভেতরে পা রাখতেই দুজনের বিস্ময়ের সীমা রইল না। ঘরের একদম উঁচুতে অবস্থিত একটিমাত্র ভেন্টিলেটর ব্যতীত অভ্যন্তরীণ পরিবেশ একদম শূন্য—কোনো আসবাবপত্র, কোনো তৈজসপত্র কিংবা গৃহস্থালির ন্যূনতম চিহ্নও সেখানে অবশিষ্ট নেই। আম্বিয়া নিজের চোখ দুটো সরু করে বলে উঠলেন, “এই ঘরে কেউ না কেউ আছিল, মানিকচাঁদ। নাইলে বাইরটা এত্ত পুরাতন, লতা-পাতায় ঢাকা, আর ভিত্রেরটা এত্ত পরিষ্কার কেমনে?”
কারান সূক্ষ্মভাবে মাথা নাড়ল। এই ধরনের ফরেনসিক অ্যানালাইসিস, খু*নাখু*নি আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার কারবারে সে এক জাদুকর। তার প্যান্টের পকেটে সবসময় একটা লুমিনল স্প্রে থাকে, যা বহু পুরোনো কিংবা ধুয়ে ফেলা অদৃশ্য র*ক্তের দাগও অন্ধকারে জেনন আলোর মতো জ্বলে ওঠে। কারান দরজাটা আটকে ঘরটা যথাসম্ভব অন্ধকার করে দ্রুত হাতে পুরো মেঝে আর দেয়ালে লুমিনল স্প্রে ছড়িয়ে দিল।
স্প্রে করা শেষ হতেই পুরো কক্ষের মেঝে আর দেয়ালে র*ক্তের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিটে আর ধস্তাধস্তির তীব্র আঁচড়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। কারানের সুগঠিত চোয়াল যেন ধারালো ব্লেডের মতো শক্ত হয়ে এল, হাত দুটো মুঠো হয়ে কাঁপছে। ও স্পষ্ট আন্দাজ করতে পারছে, ঠিক এই কোণটায় ওর বোনটা জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিল। রাগে, ক্ষোভে আর তীব্র আবেগের আকস্মিক বিস্ফোরণে ওর থুতনিটা কেঁপে উঠল। ও আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না; পকেট থেকে আইফোনটা বের করে অত্যন্ত দ্রুততায় একটা নম্বরে কল লাগাল।

“এমেকা! একটা জরুরি কাজ দিচ্ছি তোমায়।”
ওপাশ থেকে নাইজেরিয়ান অ্যাকসেন্টের গলা ভেসে এল, “ইয়েস বস, কী কাজ?”
“হাই-রেজ্যুলেশন কিছু ছবি আর ভিডিয়ো পাঠাচ্ছি। ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ র..ক্ত…” কথাটি উচ্চারণ করতে গিয়ে কারানের শ্বাসনালি যেন অবরুদ্ধ হয়ে এল। তার পাথুরে চোখ দুটো আবার নোনা জলে আর্দ্র হয়ে গেল।
আম্বিয়া নাতির এই মানসিক ভাঙনটা ওনার প্রখর ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে টের পেলেন। ওনার নিজের বুকের ভেতরটা তখন শতসহস্র টুকরো হয়ে হাহাকার করে উঠলেও, তিনি শক্তভাবে কারানের চওড়া পিঠে ওনার বলিরেখা-যুক্ত হাতটা রাখলেন। দাদির সেই চিরচেনা স্পর্শ পেতেই কারান হালকা ঘাড় বেঁকিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিল। ভেতরের দুর্বলতাকে এক ঝটকায় কবর দিয়ে ও ইস্পাত-কঠিন স্বরে আবার বলল, “র*ক্তের এভিডেন্স আর সাথে একটা হেয়ার স্যাম্পলও পাঠাবো। আমার লোক স্পেশাল রানার দিয়ে স্যাম্পলগুলো জাস্ট আধা ঘণ্টার মধ্যে তোমার ল্যাবে পৌঁছাবে। আই জাস্ট নিড টু নো, ওই ব্লাড আর ফিঙ্গারপ্রিন্টের সাথে ওই চুলের ডিএনএ ম্যাচ করে কি না!”
“আহ্! গট ইট, বস। বাট… ওই চুলটা অ্যাকচুয়ালি কার?”
“আমার বোন… তারান্নুম তাজিন সোহার!”
নামটা ওষ্ঠদ্বয় দিয়ে বের করার সাথে সাথে কারানের মনে হলো তার পাঁজরের ভেতরের হাড়গুলো এক এক করে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে।

ওপাশ থেকে এমেকা বোধহয় এবার পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পেল। সে নিজের শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটটা জিভ দিয়ে আলতো করে ভিজিয়ে নিল। গলায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এনে বলল, “স্যাম্পল পাওয়ার সাথে সাথেই আমি ওটা র‍্যাপিড ডিএনএ সিকোয়েন্সিং মেশিনে ইনপুট দিয়ে দেব। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেটা ৩০ মিনিটের মধ্যে ডেটাবেজে পেয়ে যাবে, বাট ডিএনএ রিপোর্টের জন্য আমাকে মিনিমাম দুই ঘণ্টা সময় দিতে হবে, বস।”
“দুই ঘণ্টা মানে দুই ঘণ্টাই, এমেকা। এক মিনিটও যেন বেশি না হয়।”
খট করে কলটা কেটে দিল কারান। ওর চোখের কোণের অশ্রুর অবসান ঘটেছে। সেখানে এখন দাউদাউ করে জ্বলছে কেবল নির্মম প্রতিশোধের লেলিহান অগ্নিশিখা।
কারান এবার ওর অতীত জীবনের সেই অন্ধকার, প্রচ্ছন্ন অধ্যায় ‘একে চৌধুরী’র রূপের আড়ালে থাকা বিশ্বস্ত নেটওয়ার্কের কথা স্মরণ করল। পকেট থেকে একটি এনক্রিপ্টেড ওয়ান-টাইম বার্নার ফোন বের করে সে তার ঘনিষ্ঠ এবং দুর্ধর্ষ এক অপারেশনাল হেডকে কল লাগাল। রিং হওয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই কারান সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল, “একবার পুষ্পানগর আসতে হচ্ছে।”
ব্যাস, এতটুকু বলেই কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে সে কলটা কেটে দিল।

ক্লান্ত ও র*ক্তাক্ত স্মৃতির ভারে অবশেষে তারা দুজন বনের এক কোণে পড়ে থাকা একটা শতাব্দী প্রাচীন মহীরুহের গুঁড়ির ওপর বসে পড়ল। কারান ওর সুগঠিত ভ্রূ যুগল কিছুটা কুঁচকে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হলো। ওর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক বারবার সংকেত দিচ্ছে, কোথাও একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্লু ওর চোখের সামনে দিয়েই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কপালে তর্জনী ঠেকিয়ে সে একবার পাশে বসা আম্বিয়ার দিকে তাকাল। কেন জানি কারানের মনে হলো, আম্বিয়া এই দৃশ্যমান ট্র্যাজেডির আড়ালেও অন্য কোনো এক জটিল সমীকরণ নিয়ে ভাবছেন।
কারান স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তবুও আম্বিয়া তার দিকে ফিরলেন না, যেন তিনি এই বাস্তব জগৎ থেকে সাময়িকভাবে বিচ্যুত হয়ে কোনো একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন।
কারান হুট করেই তার গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “তোমার কি কাউকে সন্দেহ হচ্ছে, দিদা?”
“হু? কী কইলি?” আম্বিয়া এমনভাবে কেঁপে উঠলেন, যেন কারানের প্রশ্নটা তার মনের সুপ্ত ভাবনায় এসে তীব্র আ’ঘাত করেছে।

আম্বিয়ার সেই চকিত ও অপ্রস্তুত মুখশ্রীর দিকে কিছুক্ষণ অত্যন্ত গভীর, মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কারান। ওনার চোখের ভেতরের সূক্ষ্ম কাঁপনটুকু পড়ে নিয়ে সে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে সামনের অরণ্যের দিকে তাকাল। শান্ত কিন্তু আদেশসূচক গলায় বলল, “ঘরে যাও। সবাই চিন্তা করবে।”
আম্বিয়া কেন জানি বাধ্য শিশুর মতো কারানের নির্দেশ মেনে ধীর পায়ে অন্দরমহলের দিকে রওনা হলেন। আম্বিয়া দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতেই কারান পকেট থেকে তার চিরচেনা ট্রেজারার লণ্ডন ব্র্যান্ডের সেই এক্সক্লুসিভ গোল্ড অ্যালুমিনিয়াম কেসটা বের করল। সেখান থেকে একটা স্টিক বের করে কাস্টমাইজড ডুশম্প লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিল। ফুসফুস ভরে টান দিয়ে নিকোটিনের ঘন সাদা ধোঁয়া বাতাসে ছাড়তে ছাড়তে সে নিজের স্নায়ুগুলোকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু কেন যেন এই পুরো জমিদার বাড়ি, এই চত্বর, এমনকি নিজের চেনা মানুষগুলোকেও তার আর বিশ্বাস হচ্ছে না।

সে ঠোঁটের কোণে এক চরম তাচ্ছিল্যের বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আই থট আমি নিজ থেকে ডেভিল হয়েছি, এখন দেখছি আমার অরিজিনটাই করাপ্টেড। এত হাইড অ্যান্ড সিক কেন তোমাদের?”
ঠিক তখনই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মাঝে ওর মস্তিষ্কে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি দেখা দিল। তারান্নুমের পার্সোনাল ফোনটা কোথায়? ওরা যখন রাতে বাসায় তারান্নুমের খোঁজে তল্লাশি চালিয়েছে, কোথাও তো ওর ফোনটা পাওয়া যায়নি। তার মানে কাল সন্ধ্যায় যখন সে ঘর থেকে বের হয়েছিল, ফোনটা ওর সাথেই ছিল। এই যৌক্তিক ভাবনাটা মাথায় আসতেই কারানের চোখের মণি দুটো শিকারি চিতার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দ্রুত সিগারেটের শেষ জ্বলন্ত অংশটা মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে নিভিয়ে দিল।
ও চারপাশের বনের দিকে আবার নতুন করে চোখ বোলাল। কী এমন জায়গা বাদ গেল, যা ও এখনো ছূঁয়ে দেখেনি?
একপর্যায়ে সে বনের এক কোণে অবস্থিত সেই প্রাচীন ডোবার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল।

কারানের চোখ দুটো সুঁইয়ের মতো সরু হয়ে এলো। এই জলজ অংশটা তো তারা কাল রাত থেকে একবারের জন্যও তল্লাশি করেনি! এই ডোবাটা অত্যন্ত নোংরা, ঘন কচুরিপানায় ঢাকা এবং পচা জলজ উদ্ভিদের কারণে সেখান থেকে একটা তীব্র দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। তাছাড়া এই গ্রামীণ অঞ্চলের পুরোনো ডোবাগুলোতে মারাত্মক বিষাক্ত কোবরা কিংবা জলঢোঁড়া সাপ এবং অন্যান্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। কিন্তু কারানের অবচেতন মস্তিষ্ক আপাতত এই বাহ্যিক জৈবিক ভয় বা নোংরামির ঊর্ধ্বে। তবুও একজন লিডার হিসেবে ও জানে, হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে আবেগের বশে নিজে বিপদে পড়লে প্রতিশোধের এই মিশনটাই মাঝপথে ভেস্তে যাবে। সবার চোখের আড়াল করে সে দ্রুত অন্দরমহল থেকে শক্ত নাইলনের সুতোয় বোনা একটি জাল নিয়ে এলো। ডোবার ঘন কালো, অবরুদ্ধ জলের উপরিভাগে সে নিখুঁত নিশানা তাক করে জালটি নিক্ষেপ করল। ভারী জালটি ডোবার তলদেশের পলিমাটি ছুঁয়ে যেতেই সে এক ঝটকায় তা টেনে পাড়ে তুলে আনল।

যা ভেবেছিল, ঠিক তাই। জালের ভেতর আটকে উঠে এলো জলজ পচা উদ্ভিদ, বিষাক্ত কেউটে সাপ আর র*ক্তচোষা জোঁকের কিলবিলে দলা। ঘেন্নায় সাধারণ মানুষের পাকস্থলী উলটে আসার কথা, কিন্তু কারানের চোখের মণি তখন সম্পূর্ণ নিস্পৃহ। সে অত্যন্ত সাবধানে জালের সব আবর্জনা মাটির এক কোণে ঝেড়ে ফেলে নিজে দুই কদম পিছিয়ে গেল। ঠিক তখনই দুপুরের প্রখর সূর্যের আলো মাটিতে পড়া একটি ধাতব বস্তুর ওপর প্রতিফলিত হয়ে তার রেটিনায় আঘাত করল। নিখুঁত জ্যামিতিক নকশার একটি কানের দুল, যেটা সেবার মিরা ঢাকার একটা বিলাসবহুল শপিং মল থেকে তারান্নুমকে পরম আদরে উপহার দিয়েছিল। কারান একটা শুকনো লাঠি দিয়ে সাবধানে সাপকোপ আর বিষাক্ত কীটপতঙ্গগুলোকে দূরে সরিয়ে কানের দুলটা তুলে নিল। কাদার প্রলেপ মাখা সেই দুলটা স্পর্শ করতেই ওর বুকের ভেতরটা তীব্র বেদনায় ধক করে উঠল, মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডের কোনো অলিন্দে ধারালো ক্ষুর চালানো হলো। কিন্তু না, এখন কান্নার সময় নয়। মুখ গোল করে ফুসফুস খালি করে একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলল সে। দুলটা জিন্সের পকেটে সাবধানে গুঁজে দিয়ে সে অবশিষ্ট কাদার স্তূপটা তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল।
এবং হ্যাঁ, নিয়তি এবার ওকে বঞ্চিত করল না; পেয়ে গেল সেই কাঙ্ক্ষিত বস্তু— তারান্নুমের ফোন। কারান শার্টের হাতা দিয়ে কাদা আর জলীয় অংশটুকু সতর্কতার সাথে মুছে নিল। কিন্তু পাওয়ার বাটন প্রেস করতেই বুঝল, ওয়াটার ড্যামেজের কারণে ফোন অন হচ্ছে না। ও আর কালক্ষেপণ না করে নখ দিয়ে ফোনের সিম ট্রে-র পাশ থেকে মেমোরি কার্ডটা বের করে নিল। এরপর দ্রুততায় সেটা নিজের আইফোনে পুশ করল, যদি কোনো অবশিষ্টাংশ বা ব্যাকআপ ডেটা পাওয়া যায় এই ক্ষীণ আশায়।

ওর ভাগ্য ভালো নাকি মন্দ, তা বলা কঠিন, তবে স্ক্রিনে যে ভিডিয়ো ফাইলটা প্লে হলো, তা দেখামাত্রই কারানের চোখ দুটো কোনো শিকারি বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ আর হিংস্র হয়ে উঠল।
ভিডিয়োর দৃশ্যপট ওর মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরনে দাহ্য অগ্নিকুণ্ডের সৃষ্টি করল। তার মানে এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এই নরপশুদের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন ইব্রাহিম নিষ্পাপ শিশুদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পা’চার করত!
ভাবনাটা মাথায় আসতেই কারান খ্যাপাটে পশুর মতো সামনের একটা প্রাচীন মেহগনি গাছে সজোরে একটা ঘুসি মারল। গাছের ছালটা খসে পড়ল। ও দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, “ফা*কিং পিস অফ শি*ট!”
ওর সুগঠিত চোয়াল ব্লেডের মতো শক্ত হয়ে এল। ও ভেবেছিল, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অপারেশন চালিয়ে ও এই হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের রুট চিরতরে নির্মূল করতে পেরেছে, যার জন্য আয়লা নিজের জীবন অবধি স্যাক্রিফাইস করেছিল। অথচ এই ঘাতক চক্রের মূল শিকড় যে এখনো তারই নিজের মাতৃভূমিতে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছে, তা তার সম্পূর্ণ অজানাই ছিল।

কারান একনাগাড়ে বারবার ভিডিয়োটা রিওয়াইন্ড করে দেখতে থাকলো, এবং এর সাথে তারান্নুমের এই নিষিদ্ধ জঙ্গলে আসার কার্যকারণ মেলাতে চাইল।
সে আবার সেই প্রাচীন গাছের গুঁড়ির ওপর গিয়ে দুই পা ফাঁক করে বসল। ডানহাতের তর্জনীটা ঠোঁটের ওপর চেপে ধরে, এক ভ্রূ উঁচিয়ে সে ভিডিয়োর প্রতিটা ফ্রেমকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
“তরু এই ফুটেজটা নিজে শুট করেছে! দ্যাট মিন্স… ওয়েট আ সেকেন্ড! এরা যদি তারান্নুমের উপস্থিতি টের পেয়ে যেত, তবে ক্যামেরা এত স্থির থাকত না। আর পুরো ফ্রেমের অ্যাঙ্গেলটা দেখে ক্লিয়ার বোঝা যাচ্ছে, এটা বেশ উপর থেকে, একটা নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে শুট করা হয়েছে।”
কারান নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আবার সেই পরিত্যক্ত ঘরটার দিকে হেঁটে গেল। সে ঘরটার চারপাশটা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কাঠামোর একদম পেছনের দিকে যেতেই তার নজর স্থির হলো দেওয়ালের সাড়ে আট ফুট ওপরে থাকা সেই ছোট ভেন্টিলেটরটার দিকে। কারান একটু ঘাড় হেলিয়ে মেপে নিল দূরত্বটা।
“হাউ ডিড শি ক্লাইম্ব দ্যাট হাই?”
ঠোঁট উলটে স্বগতোক্তি করে কারান চারপাশের মাটিতে চোখ বোলাল। ভাঙা গাছের ডাল বা গুঁড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো, তারান্নুমের পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির সাধারণ উচ্চতা অনুযায়ী এই প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর ভর দিয়ে অত উঁচুতে পৌঁছানো অবৈজ্ঞানিক। তবে?
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল কিছুটা দূরে, ঘন লতাগুল্মের আড়ালে হেলে পড়ে থাকা একটা পুরোনো মইয়ের দিকে। কারান কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঞ্চিত করে মইটা টেনে নিয়ে আসলো। এই মুহূর্তে তার ব্রেনকে একদম বরফের মতো ঠান্ডা রাখতে হবে, সামান্য ইমোশনাল হলেই নিখুঁত ক্যালকুলেশনে ভুল হয়ে যাবে। সে মইটা সোজা করে ঘরের পেছনের দেওয়ালে, ঠিক ভেন্টিলেটরের নিচে সেট করল। এরপর সে নিজেই ওটার ওপর এক এক পা ফেলে আরোহণ করতেই মহাকর্ষের সমীকরণটা তার মাথায় পরিষ্কার হয়ে গেল—হ্যাঁ, ঠিক এই পজিশনে দাঁড়িয়েই তারান্নুম ভেতরের সেই পৈশাচিক নরককুণ্ডের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছিল। কিন্তু ঠিক তখনই আরও একটা মারাত্মক অসংগতি কারানের ক্ষুরধার মস্তিষ্কে ঝড় তুলল। মইয়ের ওপরের দিকের তিন নম্বর ধাপটা মাঝখান থেকে মট করে ভেঙে ভেতরের দিকে দেবে আছে।

কারান মইয়ের ভাঙা অংশটা আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে বলল, “ওর অতটুকু মাত্র তন্বী শরীর! মাত্র ৪৫ কেজির একটা মেয়ে এতটাও ভারী নয় যে ওর ভারে আস্ত একটা বাঁশের মইয়ের শক্ত ধাপ এভাবে ভেঙে ধপাস করে পড়ে যাবে! যেখানে আমি নিজে ৮২ কেজির একটা সলিড মাসল বডি নিয়ে অনায়াসে দাঁড়িয়ে আছি!”
কারান মই থেকে নিচে নেমে এলো। এবার ও অপরাধের সুনিপুণ নকশাটা মেলাতে শুরু করল। পকেট থেকে তারান্নুমের কানের দুলটা বের করে সে আলোর বিপরীতে ধরল, যদি কোনো কূল-কিনারা মেলে এই আশায়। সে আবার ভিডিয়োটা প্লে করল। এবার ও জুম করে ভেতরের মুখগুলো স্পষ্ট দেখতে পেল। সেখানে লোকাল পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালী শৌভিক, শৌর্য আর শামসুজ্জামানকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! আর ওনাদের আশেপাশে পাহারায় নিয়োজিত আছে ওনাদেরই কিছু বিশ্বস্ত, লাইসেন্সড ঘাতক।
কারান ওর দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “তোদের জন্য আমার বড্ড করুণা হচ্ছে। শিকার করার আগে শিকারির জাতটা চিনে নিতে হয় রে, জা’নো’য়ারের দল। থাবা বসানোর জন্য শেষমেষ স্বয়ং কারান চৌধুরীর কলিজাটাই তোরা বেছে নিলি? ইউ গাইজ জাস্ট সাইন্ড ইয়োর ওন ডেথ ওয়ারেন্ট।”
হুট করেই কারানের তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে থমকে দাঁড়াল ভিডিয়োর ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা একটা প্রাচীন আমলের দেয়াল ঘড়ির ওপর। এতক্ষণ ভেতরের কুৎসিত ও বীভৎস অপরাধীদের অবয়ব দেখার তীব্র উত্তেজনায় এই আপাত-ক্ষুদ্র উপাদানটি ওর দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। কারানের জোড়া ভ্রূ এবার প্রবল কুঞ্চনে আটকে গেল। সে স্ক্রিনটা ম্যাক্সিমাম জুম করে ঘড়ির রোমান সংখ্যার কাঁটা দুটোর অবস্থান দেখল—সন্ধ্যা ৭টা বেজে ১২ মিনিট।

একটা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক খটকা লাগায় সে সন্দিহান চোখে কিছু একটা ভাবল। গতকাল সন্ধ্যায় মিরাকে সে ঠিক কখন কল দিয়েছিল, এবং ফারহান কখন তারান্নুমের নম্বরে ডায়াল করেছিল, সেই ডিজিটাল টাইমস্ট্যাম্পগুলো নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেখতে লাগল। আর তখনই মহাকালের সবচেয়ে নিষ্ঠুর গাণিতিক সমীকরণটা তার মস্তিষ্কে মিলে গেল।
ফারহান যখন তারান্নুমকে অস্থির হয়ে কল দিচ্ছিল, ঠিক সেই সেকেন্ডেই ঘরের ওপরের ভেন্টিলেটারে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে এই পৈশাচিক দৃশ্য মোবাইল ক্যামেরায় বন্দী করছিল তারান্নুম। সেই শব্দের আকস্মিকতায় ঘাতক দল যেমন চমকে ওপরে তাকিয়েছিল, ঠিক তেমনি তীব্র আতঙ্কে ভারসাম্য হারিয়ে মইয়ের তিন নম্বর ধাপটি ভেঙে পা ফসকে নিচে পড়ে গিয়েছিল তারান্নুম। ঘড়ির কাঁটা আর ফোনের কল হিস্ট্রির এই অমোঘ মেলবন্ধন দেখে কারানের পুরো সুগঠিত শরীরটা যেন এক লহমায় বরফের মতো জমে নিরেট পাথর হয়ে গেল। ফারহানের সেই ভালোবাসার আকুল কলটাই আসলে অবচেতনভাবে তারান্নুমের জন্য মৃ’ত্যুর পরোয়ানা লিখে দিয়েছিল!

কারানের কপালের দুপাশের নীল শিরাগুলো রাগে, ক্ষোভে আর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণায় ছিঁড়ে আসার উপক্রম হলো। একটা দীর্ঘকায় ওক গাছ যেমন বজ্রপাতে ভেঙে পড়ে, ঠিক তেমনি ধপ করে বনের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। হাতের মুঠোয় প্রচণ্ড আক্রোশে পিষে ধরা তারান্নুমের কানের দুলটার ধারালো অংশ ওর হাতের তালু চিরে ফেলল; টপটপ করে তাজা লাল র*ক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল মাটির বুকে। কিন্তু বাইরের এই ক্ষ’তের চেয়েও সহস্র গুণ বেশি র*ক্তক্ষরণ হচ্ছিল ওর বুকের গভীর গহিনে। কারান নিজের শুষ্ক ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে, তীব্র কষ্টের ঢোক গিলে ফিসফিসিয়ে বলল, “এতটা কাঁচা কাজ কীভাবে করলি, তরু? কীভাবে… কীভাবে তুই ফোনটা সাইলেন্ট করতে ভুলে গেলি? কেন তোকে এই ফা’কিং ক্রাইমের সাথে নিজেকে জড়াতে হলো? নাকি অন্যায় দেখে র*ক্ত গরম হওয়ার ওই অভিশপ্ত চৌধুরি বংশের জিনটা তুইও পেয়েছিলি?”

সে হাতের মুঠোয় থাকা র*ক্তমাখা দুলটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ল, “আমার পকেটে আজ পৃথিবীর সব সার্থকতা, আর হাতের মুঠোয় আমার জীবনের সবচেয়ে দামি ব্যর্থতা। যদি একবারের জন্যও বুঝতি এই নিরেট পাথরটার ভেতরে তোকে নিয়ে কী পাহাড় সমান ভালোবাসা আর প্রোটেকশন লুকিয়ে ছিল, তবে ওই একতরফা প্রেমে পা’গল না হয়ে আমাকে ভাইয়ের সিংহাসনে বসিয়ে রাখতি। আমি তোর প্রতি ইচ্ছে করে রুড ছিলাম, সবসময় তোকে ইগনোর করতাম, যাতে তুই আমায় ঘৃণা করে দূরে থাকিস… মানসিকভাবে শক্ত হস। কিন্তু তুই? তুই তো আজ আমাকে এমন এক বি’ষ দিয়ে গেলি, যা আমাকে মা’রবেও না, আবার শান্তিতে বাঁচতেও দেবে না। শেষ সময়ে তোর মাথায় হাত রাখার একটা সুযোগও দিলি না আমাকে? কারান চৌধুরি আজ জীবনে প্রথমবার কারও কাছে ঋণী হলো, আর যাকে এই ঋণ শোধ করব… সে এখন সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে আমার জন্য শেষ বিচার সাজিয়ে নিশ্চুপ ঘুমিয়ে আছে।”

বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিজের বুড়ো আঙুলের নখ কামড়ে ধরে কারান এই তীব্র আফসোসের আগুনে পুড়ল। এরপর সে অবাধ্য ধুলো ঝেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ধীর পায়ে বনের এক প্রান্তে, যেখানে আজ ভোরেই তারান্নুমকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে, সেই নতুন কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আম্বিয়ার কঠোর নির্দেশে কবরটি একদম সাধারণ, কোনো জৌলুস ছাড়া মাটির ঢিবির মতো করে রাখা হয়েছে, যাতে দূর থেকে কেউ বুঝতে না পারে এখানে জমিদার বাড়ির প্রদীপ নিভে গেছে। কবরটার ওপর বনের কিছু শুকনো ঝরাপাতা এসে পড়েছে।
কারান তার পকেট থেকে দুলটি বের করে নিজের ঠোঁটে ঠেকাল, চোখ দুটো বন্ধ করতেই এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু তার চোখ থেকে কবরের শুকনো মাটিতে ঝরে পড়ল। ভেতর থেকে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া ভাঙা গলায় বলল, “মনে হচ্ছে আজ আমি নিজেরই জ্যান্ত লা’শের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি। ফারহানের জাস্ট একটা ফোন কল তোর জীবনটা কেড়ে নিল, আর তোর রেখে যাওয়া এই একটা ভিডিয়ো ক্লিপ আমার বাকি জীবনের বেঁচে থাকাটাই কেড়ে নিল।”

কারান ধীর পায়ে অন্দরমহলে ফিরে এল। সে যখন তারান্নুমের শয়নকক্ষে পা রাখল, তখন দুপুরের তির্যক আলো জানালার কাচ ভেদ করে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। বোনটা নেই, আর সেই শূন্যতায় পুরো কক্ষটি, এমনকি এই শতাব্দীপ্রাচীন বিশাল জমিদার বাড়িটাই যেন শ্মশানে রূপান্তরিত হয়েছে। রুমটা খুব একটা বড়ো নয়। এক কোণে সাধারণ সেগুন কাঠের একটা খাট, পড়ার টেবিল, আর দক্ষিণমুখী একটা মস্ত বড়ো জানালা; যেখান থেকে দক্ষিণের বাতাস এসে ঘরের হালকা সুতি পর্দার ভাঁজে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। আরেককোণে রাখা একটি ভিক্টোরিয়ান আলমারি আর তার ঠিক পাশেই একটি সেগুন কাঠের ড্রেসিং টেবিল।

কারান ড্রেসিং টেবিলটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে এখনো অগোছালোভাবে পড়ে আছে মেকআপের বেশ কিছু বক্স, লিপস্টিক আর প্রসাধন সামগ্রী। তারান্নুম মেয়েটা আসলে তুব্বার মতো অতটা পরিপাটি আর গোছালো স্বভাবের ছিল না; ও নিজের জিনিসপত্র যেভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে গিয়েছিল, এখনো ঠিক তেমনভাবেই অবিকল পড়ে আছে। কারান ড্রেসিং টেবিল থেকে মেকআপের ব্লাশের সেই ছোট বক্সটা নিজের শক্ত হাতে তুলে নিল। আলতো করে ওর ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা সেই ব্লাশের ওপর ছোঁয়াতেই কিছুটা গোলাপি রঙের চূর্ণ ওর আঙুলের ডগায় লেগে গেল। সেই কোমল, গোলাপি আভার দিকে তাকিয়ে কারান যেন তারান্নুমের গালের সেই চেনা চঞ্চল স্পর্শটা অনুভব করতে থাকল। ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরল সে; ওর বুকের ভেতরটা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। ফারহান যেভাবে তারান্নুমের অভাবে ছটফট করতে করতে নিজের বুকে ব্যথার কথা বলেছিল, ঠিক তেমনি কার্ডিয়াক প্রেশার কারান নিজের বুকের ভেতরেও স্পষ্ট অনুভব করতে পারল।

সেখানে কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে, এরপর পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। খাতার স্তূপের পাশে পড়ে আছে একটা আধখাওয়া গ্লুকোজ বিস্কুটের প্যাকেট। কারান সেখান থেকে একটা শুকনো বিস্কুট তুলে নিজের মুখে পুরল। অথচ কারান চৌধুরি ব্যক্তিগত জীবনে বিস্কুট জাতীয় ‘ড্রাই ফুড’ কখনোই পছন্দ করে না। আজ এই সাধারণ বিস্কুটের স্বাদ তাকে মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিয়ে গেল সুদূর অতীতে।
তখন কারানের বয়স মাত্র সাত বছর, আর তারান্নুমের চার। একদিন কৌশিকা শহর থেকে ফেরার সময় বেশ কিছু উন্নত জাতের বিস্কুটের প্যাকেট আর তাজা ফল কিনে এনেছিলেন। তিনি নিয়মানুযায়ী কিছু বিস্কুটের প্যাকেট আর ফল তারান্নুমকে দিয়েছিলেন, আর বাকিটা দিয়েছিলেন কারানকে। কিন্তু তারান্নুমের আবার শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর চরম অনীহা ছিল। সে একরাশ লোভী দৃষ্টি নিয়ে কারানের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। ওর কচি কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে এসেছিল, “ভাইয়া, তুমি যদি আমারে ওই বিস্কুটগুলা দাও, তো আমি তোমারে আমার এই সবগুলা ফল দিয়া দিব। ডিল?”

কারান তখন নিজের ঘরের ওক কাঠের স্টাডি টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে এনসাইক্লোপিডিয়ার কোনো এক জটিল বৈজ্ঞানিক বই পড়ছিল। শৈশব থেকেই কারান ছিল প্রচণ্ড অন্তর্মুখী আর বইপড়ুয়া, সমবয়সিদের চপলতা ওকে টানত না। তারান্নুমের সেই আধো-আধো কণ্ঠস্বর শুনে কারান যখন দরজার দিকে তাকাল, তখন দেখতে পেয়েছিল, ছোট্ট তারান্নুম একটা হালকা নীল রঙের সুতি ফ্রক পরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মাথার পিছনের চুলে একটা সিল্কের লাল ফিতে দিয়ে চমৎকার বো বাঁধা, যা নিশ্চয়ই কৌশিকা পরম মমতায় বেঁধে দিয়েছিলেন। ফরসা, টকটকে পুতুলের মতো মেয়েটাকে দেখতে অসম্ভব মায়াবী লাগছিল; কিন্তু কারান ওর স্বভাবসুলভ উদাসীনতায় মাত্র এক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়েই আবার বইয়ের পাতায় চোখ ফিরিয়ে নিল।
“দাও না বিস্কুটগুলা, ভাইয়া! প্লিজ।” ছোট্ট তারান্নুম দুই হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত আকুল কণ্ঠে মিনতি করেছিল।
কারান তখন প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে নিজের টেবিল থেকে ফলের ঝুড়ি আর বিস্কুটের প্যাকেটগুলো এক হাতে তুলে নিল। দ্রুত দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে তারান্নুমের নরম কবজিটা খপ করে ধরে ওগুলো ওর দুই হাতের আঁজলায় জোর করে ধরিয়ে দিল। অত্যন্ত কর্কশ ও রুক্ষ সুরে বলেছিল, “এসব ফালতু জিনিস নিয়ে নিজের রুমে গিয়ে চিবাও! তাও দ্বিতীয়বার যেন আমাকে ডিস্টার্ব করতে না দেখি।”

কারান যদিও বিরক্ত মুখে কথাগুলো বলেছিল; কিন্তু নিজের কাঙ্ক্ষিত বিস্কুটের প্যাকেটগুলো হাতে পেয়ে তারান্নুমের সেই কচি মুখশ্রীতে স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠেছিল। সে খুশিতে বা দিকে হ্যাঁ সূচক মাথা হেলাল। কিন্তু চার বছরের একটা ছোট্ট বাচ্চার পক্ষে একসাথে ফলের ঝুড়ি আর প্যাকেটের ভারসাম্য সামলানো সম্ভব ছিল না। ফলে এক লহমায় ওগুলো ওর হাত থেকে ফসকে ঘরের মেঝেতে আর দরজার চৌকাঠে পড়ে গেল। ছোট্ট তারান্নুম আশা করেছিল, ওর বড়ো ভাইয়া হয়ত এবার অন্তত বই ছেড়ে নেমে এসে ওকে ওগুলো তুলতে সাহায্য করবে। কিন্তু ও ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল—না, কারান একচুলও নড়েনি। সে শীতল ভঙ্গিতে আবার নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে বইয়ের পাতায় ডুবে গেছে। তারান্নুমের অবুঝ মনে কিছুটা অভিমানের মেঘ জমলেও, সে একা একাই মেঝে থেকে বিস্কুটের প্যাকেটগুলো কুড়িয়ে নিল। কিন্তু ফলগুলো ওভাবেই দরজার চৌকাঠে অবহেলায় পড়ে রইল। তারান্নুম বিস্কুটগুলো বুকে জাপটে ধরে লাফাতে লাফাতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

ওদিকে কারান যখন বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে দেখল যে তাজা ফলগুলো ওভাবে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, ও ওর ছোট্ট গাল দুটো ফুলিয়ে একটা ভারী নিশ্বাস ত্যাগ করল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বিরক্ত মুখে ফলগুলো কুড়িয়ে ঝুড়িতে রাখতে রাখতে স্বগতোক্তি করেছিল, “বেয়াদব মেয়ে, মিনিমাম ম্যানার্স জানে না! একটা ‘থ্যাংক ইউ’ দেওয়া তো দূরের কথা, ফলগুলো লিফট অবধি করেনি!”
বিগত তেইশ বছর আগের সেই স্মৃতিটা এই মুহূর্তে কারানের অবচেতনে কড়া নাড়তেই তার পাথুরে ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে ম্লান, স্মৃতিকাতর হাসি খেলে গেল। আজ তার কেন জানি এই সাধারণ বিস্কুটগুলো খেতে ভীষণ ভালো লাগছে। কেন জানি মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কোনো শেফও হয়ত এই স্বাদের সমকক্ষ কোনো ডেজার্ট তৈরি করতে পারবে না। কারান পরম তৃপ্তিতে প্যাকেটে থাকা বাকি সবগুলো বিস্কুট একে একে সাভার করে দিল।

হঠাৎই কারানের তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে থমকাল টেবিলের এক কোণে হেলে পড়ে থাকা একটা চামড়ায় বাঁধানো ভিন্টেজ ডায়েরির ওপর। জানালার বাইরে থেকে আসা দক্ষিণের দমকা বাতাসের ঝাপটায় সেটার হলদেটে পাতাগুলো মড়মড় শব্দে এদিক-ওদিক উড়ছিল। কারান ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। একদম প্রথম পৃষ্ঠা থেকে সে উলটাতে শুরু করল। প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি ক্যালিগ্রাফিক ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে তাকে নিয়ে তারান্নুমের অবুঝ পা’গলামি। মেয়েটা সেই শৈশব থেকেই কারান চৌধুরীকে নিজের মনে রাজপুত্রের মতো গেঁথে রেখেছিল! কারানকে উদ্দেশ্য করে কত শত কাঁচা কবিতা, কতশত বেনামি চিঠি সে ডায়েরির পাতায় বন্দি করে রেখেছে। কিছু কিছু জায়গায় আবার ছোটোদের মতো ব্যাকরণ ও বানানের ভুল, যা দেখে এই চরম বিষণ্ন ও অশ্রুসজল মুহূর্তেও কারানের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল।
তারান্নুমের ডায়েরির পাতায় ডুব দিতে দিতে কখন যে দুপুরের তপ্ত রোদ ম্লান হয়ে বিকেল গড়িয়ে গোধূলির আলো অন্দরমহলে এসে প্রবেশ করল, কারান তার টেরও পায়নি। একদম ছোট বাচ্চাদের মতো কত রংঢং আর ক্যালিগ্রাফি করে নিজের একান্ত ভাবনাগুলো লিখে রেখেছে মেয়েটা। রঙিন জেল পেনসিল আর মার্কার দিয়ে পৃথিবীর যত বিখ্যাত প্রেমের উক্তি আছে, শেক্সপিয়র থেকে শুরু করে জন কিটস—সব সুন্দর করে সাজিয়ে লিখে রেখেছে। কারান কিছু চপল লেখা পড়ে মৃদু হাসল, আবার কিছু তীব্র আকুলতার লাইন পড়ে গভীর আবেগে স্তব্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ একটি পৃষ্ঠায় এসে ওর চোখ দুটো আটকে গেল; সেখানে একটা সম্পূর্ণ কবিতা লেখা।

কারান ওর সুগঠিত ভ্রূ যুগল উঁচিয়ে, বিড়বিড় করে কবিতার পঙক্তিগুলো পড়তে লাগল,
“কবিতা: অপ্রকাশিত অবেলায়
তারান্নুম তাজিন সোহা
তোমার আঁখির ছায়া পড়েছিল মোর হিয়া-মাঝারে যবে,
আমি বুঝেছিলেম, মোর কোনো কথা বলা হবে না এ ভবে।
তুমি চলে যাও আপন ছন্দে, অলখে ফিরাও আঁখি,
আমি এ ধূলির ধরণি ধরিয়া একাকী বসিয়া থাকি।
তোমার কঠিন অবহেলা যবে বিঁধেছে তীরের মতো,
আমি হাসি মুখে সয়ে নিয়েছি হিয়ায় গোপন ক্ষত।
তুমি ওপাশ ফিরিয়া রুক্ষ স্বরে কথা কয়েছ যতবার,
মোর এই বুকে গুমরে মরেছে কান্নার হাহাকার।
চাহিয়াছি আমি বলিতে তোমারে, “ভালোবাসি প্রাণপণে”,
ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছি তব ভ্রূকুটি আর রূঢ় বচনে।
মোর আকুলতা পৌঁছায়নি কভু তব পাষাণ কানে,
আমি মরু-বিবাগি সুদূর তৃষ্ণা, তুমি বসন্তের গানে।
বানান ভুলে ভরা মোর সেই চিঠিখানি নিও না তুলিয়া মুখে,
তাহাতে আঁকা মোর অশ্রুজল, লেখা আছে কত সুখে।
তুমি দিলে নাকো ধরা মোর কাছে, চিনেছ কি কোনোদিন?
মোর যত গান, যত অভিমান, সবই কি অর্থহীন?
জানি আমি তব চোখের কোণে মোর কোনো ঠাঁই নাই,
এই দহনই হোক মোর প্রাপ্তি, প্রেম যেন চিতা-ছাই।
তুমি নাই জানো, তোমাতেই আছে মোর যত সমর্পণ—
একতরফা এ প্রেমই থাকুক আমার অমর ভূষণ।”

এতক্ষণ কারান যতটা বাহ্যিকভাবে আবেগী হয়েছিল, এই নির্যাসটুকু পড়ার পর ওর ভেতরের পুরুষালি অহংবোধ পুরোপুরি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ও দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ খাটের কোণে বসে রইল। বারবার এই লাইনগুলো পড়তে পড়তে এর অন্তর্নিহিত গভীরতা উপলব্ধি করতে লাগল। অবশেষে কারান সেই কালির অক্ষরের ওপর নিজের শক্ত হাতটা আলতো করে বোলাতে বোলাতে ভারী ও ভাঙা গলায় বলল, “তুই তাহলে এত সুন্দর কবিতাও লিখতে জানতিস? একদম রবীন্দ্রনাথের পাক্কা বউ একটা! এই সিক্রেটটা যদি আগে একবারও জানতে পারতাম, তবে তোকে দিয়ে জোর করে লিখিয়ে তোর কবিতা দেশের বড়ো বড়ো ডেইলি পেপারে ছাপাতাম।”
এরপর ডায়েরির পরের পৃষ্ঠাটা উলটাতেই প্রথমেই ওর চোখে কালো কালিতে বোল্ড করে লেখা একটা লাইন নজরে পড়ল—’ডিয়ার ফারহান জান্স’। সে আর পরের একটা লাইনও না পড়ে দ্রুততার সাথে ডায়েরির মলাটটা বন্ধ করে দিল। একজন আদর্শ ভাই ও বন্ধু হিসেবে কখনোই চায় না ওর প্রিয় বন্ধুর জন্য লেখা বোনের এই ব্যক্তিগত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল চিঠিগুলো পড়তে।

কারান সেখানে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। হঠাৎ ওর ফারহানের কথা মনে পড়ল। ফারহান যদি কোনোদিন মেমোরি কার্ডের সেই অরিজিনাল ভিডিয়োটা দেখে এবং জানতে পারে যে, তার সেই একটা কলের কারণেই আজ তার স্বপ্নের ‘কুইন’ এই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে, তবে সেই তীব্র অপরাধবোধে সে নিশ্চিত হতাশার চরম শিখরে গিয়ে আ’ত্মহ’ত্যার পথ বেছে নেবে।
বন্ধুকে এই নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে কারান ওর ল্যাপটপটা বের করল। সাইবার ফরেনসিক আর ভিডিয়ো এডিটিংয়ের নিখুঁত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সে সেই মূল ফাইলের মেটাডেটা আর ভিডিয়োর ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা ভিক্টোরিয়ান দেয়াল ঘড়ির টাইমস্ট্যাম্পের অংশটুকু পুরোপুরি এডিট করে কেটে বাদ দিয়ে দিল।
ঠিক তখনই একটি বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আমাদের মধ্যে এতটা দূরত্ব কবে থেকে তৈরি হলো, কারান?”
কারান ভেতরে ভেতরে চরমভাবে চমকে উঠলেও তার চেহারায় ঠান্ডা ভাব বজায় রাখল। সে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আইফোনের স্ক্রিন লক করে ডায়েরিটার পাশে রেখে দরজার দিকে তাকাল। দেখল, মিরা এক বুক হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে দরজার ফ্রেমের সাথে হেলান দিয়ে তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। মিরা চোখের মণি দুটো সরু করে পুনরায় প্রশ্ন করল, “কী লুকাচ্ছ আমার থেকে? এমন মলিন, পাংশুটে চেহারা তো আমি আমার কারানের কখনো দেখিনি।”

দীর্ঘ কয়েকটা মুহূর্ত অতিক্রান্ত হয়ে গেল, কিন্তু কারান কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। এই মুহূর্তে মিরাকে কোনো মনগড়া গল্প বলার মতো মানসিক এনার্জি তার নেই। সে কেবল নিজের রুক্ষ কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে বলল, “ক্ষুধা লেগেছে, খাবার হবে?”
মিরা এতক্ষণে তীব্র অপরাধবোধ অনুভব করল।কারান তো আজ সকালেও এক দানা অন্ন মুখে তোলেনি, এমনকি দুপুরেও না। এই হুঁশ আসতেই মিরা দ্রুত ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সুদৃশ্য সিরামিকের পাত্রে করে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর রুই মাছের সুগন্ধি কালিয়া নিয়ে কারানের সামনে এসে বসল। কারান বেশ কিছুক্ষণ শূন্য চোখে সেই খাবারের দিকে তাকিয়ে রইল। কতদিন হলো সে তার মহারানির হাতের রান্না করা খাবার খায়নি! মিরা নিজ হাতে পরম মমতায় এক গ্রাস অন্ন তুলে কারানের ওষ্ঠাধরের সামনে ধরল। কারান এক অসহায়, পরাজিত যোদ্ধার মতো সেই লোকমাটি মুখে নিল। কিন্তু তার সংবেদনশীল গলবিল যেন সেই খাবার গিলতে অস্বীকার করছিল। প্রতিটা চিবুকে তার মনে পড়ছিল তারান্নুমের সেই র*ক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষের কথা। কারান দুই-একবার প্লেট সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু মিরা জেদ নিয়ে একপ্রকার জোর করেই তাকে পুরোটা খাবার খাইয়ে দিল।

পরবর্তী দুই দিন ধরে কারান এই চত্বর থেকে একরকম লাপাত্তা। এমেকা তার ল্যাবের হাই-এন্ড ডিএনএ সিকোয়েন্সার থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত ফরেনসিক রিপোর্ট অলরেডি কারানের এনক্রিপ্টেড মেইলে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওই পরিত্যক্ত ঘরের মেঝে থেকে লুমিনল দিয়ে উদ্ধার করা র*ক্তের নমুনাটি শতভাগ তারান্নুমের, এবং সেখানে আরও বেশ কিছু অনূর্ধ্ব দশ বছর বয়সি নিষ্পাপ শিশুদের র*ক্তের ডিএনএ-এর উপস্থিতি মিলেছে।
কারান খু*নিদের অপরাধের প্রতিটা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ট্রানজেকশন আর ওদের কুৎসিত অতীতের প্রতিটা অন্ধকার ফাইল খুঁড়ে বের করছে। ও চায় না এই জা*নোয়ারগুলোর মৃ*ত্যু কোনো বুলেটের আঘাতে এক সেকেন্ডে হয়ে যাক। সেটা তো একপ্রকার মুক্তি, এক পরম উপহার! কারান ওদের জীবন্ত নরক দর্শন করাতে চায়। তারান্নুম আর ওই নিষ্পাপ শিশুগুলো জীবনের শেষ মুহূর্তে যে পরিমাণ আতঙ্ক আর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে এই ধরণি ত্যাগ করেছিল—কারান প্রতিজ্ঞা করেছে, ওদের প্রতিটা হাড় গুঁড়ো করার সময় ওই ঘাতকগুলো যেন প্রতি সেকেন্ডে সেই একই যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে মরে। ওদের কৃতকর্ম যত বীভৎস হবে, কারানের শাস্তির ব্লুপ্রিন্টও ততটাই ভয়ংকর হবে।

বিকেল গড়িয়ে তখন গোধূলির আলো-আঁধারি নামছে। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের সিসিইউ কেবিনের ডাবল-গ্লেজড অ্যালুমিনিয়াম জানালার ওপারে আকাশে ফ্যাকাশে হলুদাভ আর বেগুনি রঙের অবসান ঘটছে। ফারহান চোখ মেলল। নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করা ক্ষারীয় ডেটল আর তীব্র আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের উৎকট ঘ্রাণটাও কেন যেন তার স্নায়ুতে পৌঁছাচ্ছে না; ঘ্রাণেন্দ্রিয়গুলো যেন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে। কড়া চেতনানাশকের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তার ছয় ফুট দুই ইঞ্চির শরীরটা যেন কয়েক টন ওজনের পাথরের মতো স্থবির, নিথর হয়ে আছে। কারানের কড়া নির্দেশেই তাকে এই তীব্র সম্মোহনী ঘুমে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে চেতনা ফিরে এলে সে নিজের কোনো ক্ষতি বা উন্মত্ত কোনো অঘটন না ঘটিয়ে বসে।
ফারহান টের পেল, নিজের শরীরের ওপর থেকে তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ উবে গেছে। সে তীব্র আক্রোশে ছটফট করতে চাইল, কিন্তু কেবল তার ডান হাতের তর্জনীটা সামান্য স্পন্দিত হলো মাত্র। শরীর অচল হলেও তার মস্তিষ্কটা এখন ভীষণ সক্রিয়, তীব্র সচল। বিমর্ষ, শূন্য দৃষ্টিতে সে সিলিংয়ের একঘেয়ে শ্বেতশুভ্র বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল। তারান্নুমের সেই চঞ্চল হাসিমুখটা চলচ্চিত্রের ফ্রেমের মতো বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কিন্তু মনের ভেতরের অবাধ্য চিন্তাগুলো তাকে একটাই ধ্রুব সত্য মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সে তার কুইনকে সারাজীবনের জন্য হারিয়েছে।

সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকার অবচেতনে নিজেকে সঁপে দিয়ে অক্সিজেন মাস্কের প্লাস্টিক আবরণের ভেতর থেকেই অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কা…রান আসেনি?”
পাশে থাকা কার্ডিয়াক নার্সটি ফারহানের হাতের র*ক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করতে করতে পেশাদার, শান্ত গলায় বলল, “মিস্টার কারান আপনার বেডের পাশের সাইড-টেবিলে এই ব্ল্যাক ডায়েরিটা আর একটা নোট রেখে গেছেন।”

Tell me who I am 2 part 20

তারপর রাবার সোল জুতো জোড়ার মৃদু শব্দ তুলে নার্সটি স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজা ঠেলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। ফারহান সেদিকে তাকাতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, ওই ডায়েরির বাঁধনটা খুললেই জীবন্ত স্মৃতির কৃষ্ণগহ্বর তাকে আস্ত গিলে খাবে। তবুও ভেতরে চলতে থাকা তীব্র মানসিক তাড়নায় অনেক কষ্টে, কাঁপাকাঁপা আঙুলে ডায়েরিটা সে নিজের চওড়া বুকের ওপর টেনে নিল। কভারে কারানের পরিচিত কাটছাঁট হাতের লেখায় একটা চিরকুট সাঁটানো:
“তারান্নুমের খু’নিদের ট্রেস করে ফেলেছি। ওদের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে, আই অ্যাম টেকিং কেয়ার অব দ্যাট। আর তোর জন্য তারান্নুম ১৪২ পাতায় কিছু একটা রেখে গেছে। পড়ে নিস।”

Tell me who I am 2 part 21 (2)