নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২২
রূপন্তী সরকার
মিহি রিদের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালো। ওর রাগ যেন মুহূর্তের মধ্যে সপ্তম আকাশে চড়ে বসল। ঋষভ ইয়াশফাকে দুচোখে সহ্যই করতে পারেনা।ও নাকি হঠাৎ করে মেয়েটাকে চুমু খেতে যাবে? অসম্ভব। মিহি ভালো করেই চেনে তার ছেলেকে। আর এই ধুরন্ধর স্বামীকেও। লোকটা একটা লুচ্চা। ওকে বাগে পেয়ে চুমু খাওয়ার লোভে রিদ যে নিজের ছেলের নামে এমন গাঁজাখুরি গল্প বানিয়েছে সেটা বুঝতে মিহির এক সেকেন্ডও লাগল না। ঋষভ একদম এক কথার ছেলে। সে যখন ইয়াশফাকে বউ বলে মানবে না বলেছে তখন কিছুতেই এমন কাণ্ড করতে পারে না।মিহি রিদকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল
“কী ভেবেছ আমাকে এসব মিথ্যা গল্প শুনিয়ে ফায়দা লুটবে আর আমি কিচ্ছু বুঝব না? আমার ছেলে তোমার মতো এমন লুচ্চা না যে কথায় কথায় সুযোগ বুঝে বউকে চুমু খেতে যাবে। ও একদম এক কথার ছেলে।”
রিদ ধাক্কা খেয়ে খাটের কোনায় পড়তে পড়তে বাঁচল। মিহির কথা শুনে রিদ একদম স্তব্ধ।
নিজের ৫ বছরের বাচ্চা বউকে কত কষ্ট করে কোলেপিঠে করে মানুষ করল আর আজ বুড়ো বয়সে এসে নিজের বউই তাকে এত বড় অবিশ্বাসটা করল?
রিদ নিজের বুকে হাত দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল
” কী দিনকাল এল। নিজের ছেলের মুখোশ খুলতে এসে বউয়ের কাছে লুচ্চা উপাধি পেয়ে গেলাম?
এই বয়সে এসে এত বড় অপমান কি সহ্য করা যায়?
রিদ মুখটা বাংলা পাঁচের মতো বললো
“প্রিন্সেস তুমি আমাকে লুচ্চা বললা? নিজের ভালোমানুষ জামাইকে তোমার মনে এই মনে হয়? আমি লুচ্চা না তেমার ছেলে লুচ্চা। তুমি আমাকে বিশ্বাস না করে ওই বেয়াদব টাকে বিশ্বাস করছো? কলিযুগ একেই বলে ঘোর কলিযুগ।”
মিহি রিদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে, চোখ দুটো ছোট ছোট করে বললো
“না! আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না।সরি!
রিদের রাগ উঠে গেলো।
এবার হাতেনাতে প্রমাণ দিতেই হবে! রিদ খপ করে মিহির হাত ধরে টানতে টানতে নিজের সাথে নিয়ে গেলো। সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে উঠতে উঠতে রিদ বিড়বিড় করে বলল
“অনেক হয়েছে! চলো, আজকে তোমাকে হাতেনাতে প্রমাণ দিবো। তোমার ছেলে যে কতো বড়ো সাধু সেটা আজকে প্রমাণ করেই ছাড়বো”
মিহি চরম বিরক্ত হয়ে রিদের সাথে টানাহেঁচড়া করতে করতে যাচ্ছে।
ঋষভের ঘরের দরজার সামনে এসে রিদ পর পর কয়েকবার ধুমধাম করে দরজা ঠকঠক করল।
একটু পরেই দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলতেই রিদ মিহির হাত ধরে একদম হুরমুর করে ঋষভের রুমে ঢুকে পড়ল। কিন্তু ঘরে ঢোকার পরেই দুজনের পায়ের ব্রেক যেন নিজে থেকেই কষে গেল।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঋষভের চোখ মুখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
দেখেই মনে হচ্ছে কোনো কারণে ও এই মুহূর্তে চরম রেগে আছে।
রিদ ঋষভের এমন চেহারা দেখে ঠিক বুঝতে পারল না যে ছেলের আসলে কী হয়েছে? কিন্তু রিদ তো রিদ ই। ছেলেকে একটু না জ্বালালে ওর আবার পেটের ভাত হজম হয় না।
রিদ ফোড়ন কেটে বলল “ঋষ? তুমিই এবার তোমার মাকে নিজের মুখে বলো তুমি একটু আগে আমার সামনে এটাম বোমকে খপ করে ধরে ধপ করে চুমু খাওনি? ”
মিহি তখন কৌতুহল নিয়ে ঋষভের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
“বাবু তুমি সত্যিই এমন অসভ্যতা করেছ?”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো “নাহ”
ব্যাস রিদ ধপ করে মাটিতে বসে পড়লো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো “আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম। তুমি এর বিচারডা কইরো। কি পোলা জন্ম দিছি আমি খোদা চুমু খেয়ে বলছে খাই নি। কয়েকদিন পর বাচ্চা জন্ম দিয়েও বলবে জন্ম দেই নি একাই হয়ে গেছে”
মিহি জানতো তার ছেলে এমন বেয়াদবি করবে না। তাই রিদের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকা করে চলে গেলো।
রিদ ঋষভকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো
“আমি আমার ইয়াশফা মাকে একটা সুন্দর ছেলের সাথে বিয়ে দিবো।”
রিদের কথাটা শুনে ঋষভের মাথা আরো গরম হয়ে গেলো। কথাটা কেনো জানি তীরের মতে গিয়ে লাগলো বুকে৷ ভালো লাগলো না কথাটা৷
এখন মনে হচ্ছে ইয়াশফাকে কাঁচা খেয়ে ফেলতে৷ ঋষভ এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বের হয়ে সোজা ইয়াশফার রুমের দিকে হাঁটা ধরল।রিদ চুপচাপ ছেলের চলে যাওয়ার পানে দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ছেলেটা মোটেও ভালো হয় নি।
এদিকে ঋষভ হনহন করে হেঁটে ইয়াশফার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল।
দেখল ঘরের দরজাটা খোলাই আছে। ও কোনো অনুমতি না নিয়েই গটগট করে ঘরে ঢুকল, কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই ও
চুপ হয়ে গেলো।
ইয়াশফা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করে ঢং করছে আর একা একাই আপন মনে বকবক করছে।
ঋষভের রাগ যেন দপ করে জ্বলে উঠল। এই ঘূর্ণিঝড়টা ওর জীবন টা এলেমেলো করে দিয়েছে। ঋষভ খপ করে ইয়াশফার হাতটা চেপে ধরল। হাতটা এতো শক্ত করে ধরেছে মনে হলো ইয়াশফার হাতটা মনে হয় এখনই শরীর থেকে খুলে চলে আসবে। ব্যথায় ইয়াশফার প্রাণ যাওয়া আসা করছে।
ইয়াশফা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ঋষভকে সজোরে একটা ধাক্কা মারল। কিন্তু ঋষভ নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়ল না।
উল্টো নিজের অন্য হাতটা বাড়িয়ে ইয়াশফার নরম গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।ঋষভ দাঁতে দাঁত চেপে বলল
” তোর জন্য আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কেন এসেছিস তুই আমার জীবনে? আমার সামনে একদম আসবি না। আমি তোকে আমার বউ মানি না। ঘূর্ণিঝড় একটা”
ইয়াশফার চোখ দুটো ব্যথায় টলমল করে উঠল। ব্যথার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ও ছটফট করতে লাগলো। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ঋষভের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। ঋষভ হঠাৎ করেই ইয়াশফার হাতের বাঁধন আলগা করে দিল।
ইয়াশফা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য যেমনি উল্টো টান দিলো ওমনি ঋষভ হাত ছেড়ে দিতেই ও ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে গিয়ে শক্ত মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল।
একেবারে বেকায়দায় পড়ার কারণে ওর ডান হাতটা মেঝের সাথে সজোরে আঘাত খেল। হাড় মড়মড় করার মতো তীব্র একটা যন্ত্রণার অনুভুতি হলো মনে হলো হাতটা মচকে গেছে।
ব্যথায় চিৎকার করে উঠল ইয়াশফা
ইয়াশফার আর্তনাদে যেন পুরো ঘর কেঁপে উঠল।ইয়াশফার চিৎকার শুনে ঋষভ দৌড়ে ইয়াশফার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২১
ইয়াশফাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ঋষভের হাত দুটো কাঁপছে। ও বুঝতে পারেনি যে তার সামান্য অসাবধানতায় মেয়েটা এত বড় আঘাত পেয়ে বসবে। ও ইচ্ছে করে ধাক্কা দেয়নি।
এইদিকে ইয়াশফার চিৎকার শুনে রিদ মিহি দৌড়ে ইয়াশফার রুমে আসলো।
দরজায় এসে ইয়াশফাকে মেঝেতে ওভাবে ব্যথায় ছটফট করতে দেখে রিদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ভয়ের চোটে ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঋষভের দিকে তাকিয়ে বললো “কি হয়েছে ওর? তুমি কি করেছো ওর সাথে ঋশ?”
