এক দেখায় পর্ব ৩৭
সুরভী আক্তার
দশটার দিকে ক্যাফের নতুন মালিক আসবে । সবটা সাজানো শেষ করে মাহি,রেহা, জেরিন – ওরা সবাই কিচেনে গেছে । রোজ মোটামুটি কাস্টমারের ভিড় লেগে থাকে ক্যাফে তে । আজও তাই । তবে আজ , ক্যাফের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি কাউকে । বাইরের টেবিলে সবার অর্ডার সার্ভ করা হচ্ছে । জারিফ আর নিহার আছে সেদিকটায় । ওরা পাঁচ জন বাদে আরো দুজন মধ্যবয়সী লোক আছে এই ক্যাফের দায়িত্বে । ঠিক দশটা বাজার আগ মুহূর্তে সবাই একসাথে হয়েছে । রেহা, জেরিন,মাহি, ওদের হাতে গাঁদা আর গোলাপের পাপড়ি সমেত ডালা । তখনকার সেই কোর্ট প্যান্ট পড়া লোকটা এসেছে আবারো । উনিই এসব ধরিয়ে দিয়েছেন ওদের হাতে । বলেছেন – নতুন মালিক আসার সাথে সাথে যেন পুষ্প বৃষ্টি করা হয় তার উপর । জেরিন এসবে বিরক্ত । সকাল থেকেই দেখে যাচ্ছে এসব । শুনে যাচ্ছে এই নতুন মালিকের কথা । সে বিরক্তি মাখা চাপা স্বরে বললো…
” উফফফ,, কে এই ক্যাফের নতুন মালিক ? কোন মহারাজা সে , যে এভাবে বরন করে নিতে হবে তাকে ? জানিনা ঐ কিপ্টে বুড়োর জায়গায় আবার কোন বুড়ো কপালে জুটল ! আচ্ছা,, উনি যদি আমাদের চাকরি থেকে বের করে দেন , তাহলে কি হবে ?
শেষের কথাটা বিস্ময়কর সংকিত হয়ে বললো । রেহা শীতল কন্ঠে বলল…
” বের করবেন কেনো ?
” না মানে , যদি বের করে দেন ? বলা তো যায় না , কোন মক্কেল জোটে কপালে…!
মাহি প্রশ্ন করলো…
” তুই এই সামান্য ক্যাফে তে ওয়েটার হিসেবে চাকরি করিস কেনো ?
” এমনি , টাইম পাস করার জন্য…
জেরিনের তৎক্ষণাৎ উত্তরে মাহি ফের বললো…
” তাহলে , চাকরি থাকবে কি থাকবে না এটা নিয়ে অতো টেনশন কিসের ? আমাদের ইনটেনশন টাইম পাস করা , সেটা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই করতে পারি । যদি তেমন হয়, তাহলে প্রয়োজনে এবার মোড়ের মাথায় নিজেদের একটা চায়ের দোকান দেবো , কি বলিস ?
খানিক রসিক শোনালো কথা গুলো । সচরাচর এমন করে কথা বলে না মাহি । রেহা মুচকি হাসলো । জেরিন লাফিয়ে উঠলো ….
” গুড আইডিয়া ! ক্যাফের এই নতুন মালিক যদি মাইনে না বাড়ায় তাহলে নিজে থেকেই এই ওয়েটার গিরি ছেড়ে দেবো আমি । ঐ কিপ্টে বুড়ো তো একশো এক টাকা বোনাস দিতো , দেখি এই নতুন মালিক কি করে !
আচ্ছা ঐ বুড়োর এই একশো এক টাকায় কি এমন লক্ষ্যির মন্ত্র আছে বলতো ? একশো এক টাকা বেশি নিয়ে এই ক্যাফে টাও সেল করেছে ও ! গুনে গুনে একশো এক ধাপ এগোলেই ওর বাড়ি , আবার বাড়িতে গুনে গুনে একশো এক টা মুরগিও পালে কিপ্টে বুড়ো । শুনেছি একশো এক টা বিয়েও করেছে , লাস্ট একশো এক নম্বর টার সাথে সংসার করছে এখন । ভাবা যায় , এই পঁয়ষট্টি বছরে একশো এক টা বিয়ে ! বুড়োর তো বয়সের থেকে বিয়ের সংখ্যা বেশি রে ! মাসে কয়টা বিয়ে করতো কে জানে ? আচ্ছা,আগের বউ গুলো কোথায় এখন ? বাচ্চা কাচ্চা হয়েছে নিশ্চয়ই ? তার মানে , প্রত্যেকটা বউয়ের একটা করে বাচ্চা হলে , ঐ বুড়ো তো একশো এক টা বাচ্চার বাপ ! ওওওওহহহহ….
ওর মোর খোদা ,,, ঐ বুড়োর এলেম আছে বলতে হবে…..
এক ধ্যানে এতগুলো কথা বলে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো জেরিন । আবারো কিছু বলার জন্য উদ্যত হতে হতে পাশ ফিরলো এবার । অমনি তড়াৎ গতিতে কপাল কুঁচকালো । পাশে মাহি বা রেহা কেউ নেই ! ওরা কোথায় গেলো ? জেরিন চঞ্চল হয়ে সামনে তাকালো । রেহা, মাহি সামনে এগোচ্ছে । জেরিন পেছন থেকে চিৎকার দিয়ে ডাকতে ডাকতে ছুটলো…
ইতিমধ্যে ক্যাফের সামনে দুটো কালো গাড়ি এসে থেমেছে । বাইরে অনেক ভিড় । দরজার কাছেও অনেকে আছে । অন্যদিনের তুলনায় আজ চারপাশটা মানুষে গিজগিজ করছে । মাহি, রেহা, জেরিন ওরা তিনজন পিছনে । গাড়ি থেকে নেমেছে হয়তো কেউ । মানুষের শরীরের আড়ালে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে না ভেতর থেকে । জেরিন গলা উঁচিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে । এমন সময় তখনকার সেই কোর্ট প্যান্ট পড়া লোকটা এসে তাড়া দিয়ে বলল…
” তোমাদের মধ্যে কেউ একজন এসো আমার সাথে । স্যারকে ফুলের বুকে দিয়ে ওয়েল কাম করতে হবে ।
রেহা জেরিন কে ইশারা করে বললো যাওয়ার জন্য । জেরিন মুখ কুঁচকালো । যাওয়ার ইচ্ছে নেই ওর । লোকটা হাবভাব দেখে মাহি কে উদ্দেশ্য করে শান্ত কন্ঠে বললো…
” তুমি এসো মামনি ! শুধু ফুলের বুকে টা স্যারের হাতে দেবে । ওরাও তো আছে , ওরা ফুল ছেটাবে । তুমি এসো আমার সাথে …
মাহি দ্বিমত করলো না । লোকটা এগোতে নিলে, আবারো ঘাড় ঘুরিয়ে বললো…
” আর হ্যাঁ , তোমরাও এসো । দরজার কাছটায় দাঁড়াও , তাহলে সুবিধা হবে । স্যার এর অভ্যর্থনায় যেন ত্রুটি না থাকে ।
সবাই এগোলো । দরজার বাইরে জারিফ আর নিহার হাঁ বনে দাঁড়িয়ে আছে । আশেপাশের গুটি কয়েক জন ও নিস্তব্ধ । কথার শোরগোল নেই তেমন । এতো গুলো মানুষের উপস্থিতিতেও আশপাশটা বেশ শান্ত । দরজার সামনে থেকে সবাইকে সরিয়ে মাহি কে সম্মুখ বরাবর দাঁড় করালো লোকটা । মাহি মাথা নিচু করে আছে আলতো করে । সামনে কেউ একজন দাঁড়াতেই নাকে একটা গন্ধ বিধলো । তড়াৎ চোখ তুললো মাহি । অমনি বৃহৎ আকার ধারণ করলো অক্ষি যুগল । দৃষ্টিতে অবিশ্বাস । সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বুঝতেও ঘোর লাগছে । ঠিক সম্মুখ বরাবর দুহাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে কেউ । সুঠাম শরীর টানটান , একহাত পকেটে অন্য হাতে ফোন । তার দৃষ্টি ফোনের দিকে । সানগ্লাসের আড়ালে এটাই বোধগম্য হলো তার দৃষ্টি সম্পর্কে । কপালে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে । পড়নে সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার । একই পোশাক পরিহিত আরো দুজন পাশে । তারা অপরিচিত । তবে সামনের মুখটা পরিচিত । মাহি বৃহৎ নয়নে তাকিয়েই শুকনো ঢোক গিললো । সামনের জন এখনো চোখ তোলে নি , তার দৃষ্টি এখনো ফোনের দিকে । মাহি কাঁপা পায়ে একটু জায়গা পরিবর্তনের চেষ্টা করলো । পা পেছাতেই পিছন থেকে বিকট এক শব্দ ভেসে আসলো । চমকে পিছন ফিরলো মাহি । সাথে সাথে উপস্থিত সবাই । জেরিনের হাত থেকে ফুলের পাপড়ি সমেত স্টিলের বোলটা ফ্লোরে পড়ে শব্দ হয়েছে বিকট । শব্দে সবাই নড়লেও জেরিন এখনো থ বনে দাঁড়িয়ে আছে । ওর চক্ষু জোড়াও অত্যাধিক বৃহৎ । দুহাত দুগালে । ঠোঁট জোড়া প্রসস্থ হয়ে হাঁ হয়ে আছে । সবার এতো গুলো দৃষ্টি এখন ওর দিকেই । তবুও ওর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই । সে এখনো অনড় । চোখে মুখে বিস্ময় । ও বিস্মিত অবিশ্বাস্য কন্ঠেই বিড়বিড় করলো….
” রুজান রাফি চৌধুরী…?
রেহা পরিস্থিতি বুঝে এবার একটা চিমটি কাটল ওকে । অমনি ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো জেরিন । তবুও চিমটির হেলদোল না দেখিয়ে আবারো সবেগে সামনে তাকালো । এবার স্বশব্দে চিৎকার করে উঠলো….
” রুজান রাফি চৌধুরী ! আর ইউ রুজান রাফি চৌধুরী ? ওও মাই গড ,, সিরিয়াসলি ? আমি ঠিক দেখছি তো ? এই রেহা , আমারে আর একটা চিমটি কাট বোইন , আই কান্ট বিলিভ দিস ! সত্যি আমার সামনে রুজান রাফি চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছে !?
ওর এমন কথায় কয়েকজন হাসলো মুখ লুকিয়ে । রাফি বিরক্ত হলো । মাহি এখনো আর পিছন ফেরে নি । সে এখনো মুখ ফিরিয়ে আছে । বুক ধড়ফড় করছে ওর । গলা শুকিয়ে আসছে । জেরিনের কথা গুলোও কানে পৌঁছায় নি ঠিকমতো ।
এবার রাফির বিরক্তি ভরা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসলো….
” মি. নেওয়াজ…
যা করার তাড়াতাড়ি করুন ! এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখার সময় নেই আমার…
মাহির বক্ষ স্থল আঁতকে উঠলো তার কন্ঠস্বরে । মি. নেওয়াজ কিছু বলার আগেই আবারো উত্তেজিত হয়ে জেরিন বলল…
” আরে, রুজান রাফি চৌধুরী । এতো তাড়া কিসের সিঙ্গার সাহেব ? বিশ্বাস করুন , আমি আপনার অনেক বড় পাংখা । আই মিন ফ্যান আরকি । যাওয়ার আগে আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লিজ , শুধু অটোগ্রাফ না একটা ,না না কয়টা সেলফি ও তুলবো ।
মি. নেওয়াজ থামালেন…
” সেসব পরে হবে । আগে স্যার কে ভেতরে আসতে দাও । মামনি , তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? স্যারের হাতে বুকে টা দাও..
দাঁড়িয়ে আছেন তো উনি..
শেষের কথা গুলো মাহি কে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি । মাহি পুনরায় ছ্যাঁত করে উঠলো । জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে সামলালো নিজেকে । ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে পিছন ফিরলো অতঃপর । তবে চোখ তুলে তাকালো না । পারলো না তাকাতে , দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলাতে । কোনো রকমে কাঁপা হাতে ফুলের বুকে টা এগিয়ে দিলো সে । রুদ্ধ অস্পষ্ট স্বরে বলল…
” ও.. ওয়েলকাম স্যার…
রাফি ফুলের বুকে টা হাতে নেওয়ার সময় এক আঙ্গুল স্পর্শ হলো মাহির হাতে । অমনি কেঁপে উঠলো মেয়েটা । আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না মাহি । দ্রুত পিছন ফিরে এক প্রকার ছুটে সবার মধ্য থেকে স্থান ত্যাগ করলো সে । এক বারের জন্যেও তাকালো না পর্যন্ত । ওকে এভাবে দৌড়ে যেতে দেখে মি. নেওয়াজ কপাল গোটালেন । পরিস্থিতি সামাল দিতে বললেন….
” আসুন স্যার….
রাফি শ্বাস ছেড়ে ভেতরে ঢুকলো । বাইরেটা এতক্ষণ শান্ত থাকলেও এখন হইচই শুরু হয়ে গেছে । রাফি চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখে নিলো । বেশ ভালোই সাজানো হয়েছে ।
পাশেই একটা মাস্টার কেবিন । সেটাও সাজানো হয়েছে । মি. নেওয়াজ রাফি কে কেবিনের দিকে নিয়ে যেতে গেলে জেরিন হন্তদন্ত হয়ে সামনে দাঁড়ালো । উত্তেজিত বোকা বোকা স্বরে বলল….
” মি. রুজান রাফি চৌধুরী ,, আপনাকে কি ক্যাফে উদ্বোধনের জন্য ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে ? মানে , আমাদের নতুন মালিক, আপনাকে টাকা দিয়ে ভাড়া করে নিয়ে এসেছেন এখানে ? তার মানে আমাদের নতুন মালিক , ঐ বুড়োর মতো কিপ্টে নয় ? আচ্ছা কতো টাকা দিয়েছে আপনাকে ? না মানে , আপনি তো নামিদামি ব্র্যান্ডের মানুষ !
উফফ , আমি তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না , আপনি সত্যিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ?
রাফি ভ্রু যুগল কুঁচকে তাকিয়ে আছে । মি. নেওয়াজের হাসি পেলো ওর কথায় , তিনি ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করে বললেন…
” তোমাদের এই ক্যাফেতে ওনাকে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় নি । উনি নিজেই এই ক্যাফে টা কিনেছেন ।
জেরিন হতবাক । পুনরায় হাঁ বনে গেলো সে । চোখ কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার দশা । মাহি কিচেনের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনলো কথা গুলো । রাফি কেবিনের দিকে এগোতে এগোতে গম্ভীর গলায় বললো,,
” এক কাপ কফি চাই আমার , ফাস্ট….
মি. নেওয়াজ পুনরায় জেরিন কে কফির কথা বলে তিনিও রাফির পিছু নিলেন । জেরিন এখনো থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে । পা দুটো যেন চিপকে আছে ওর । রেহা এতক্ষণ নীরবে শুনছিলো আর দেখছিলো সবকিছু । মাহি এখানে নেই । ও একবার কিচেনের দিকে তাকালো । অতঃপর জেরিনের দিকে এগিয়ে কনুই দিয়ে গুঁতিয়ে বললো…
” হয়েছে নাটক ? নাকি আরো বাকি আছে ? বাকি থাকলে, বাকিই রাখ ? অনেক সময় আছে নাটক করার । এবার চল , নিজের কাজে মন দে….
বলেই হনহনিয়ে চলে গেছে রেহা । জেরিনের মতো এসবে ওর মন নেই । জেরিন থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে লাফিয়ে উঠলো । এক ছুট লাগালো কিচেনে । মাহি একপাশে দাঁড়িয়ে আছে । মাথা নুইয়ে চোখ নামানো ওর । বুকে তোলপাড় চলছে । বাইরে থেকে অদৃশ্য মান তা । জেরিন হুড়মুড়িয়ে ঢুকেই ধড়ফড়িয়ে বললো…
” ওরে মাহি রে । আমি আর চাকরি ছাড়ছি না এ জীবনে । মাইনে বাড়ানো তো দূরের কথা , মাইনে না দিলেও এই ওয়েটার গিরি করতে রাজি আছি আমি ।
একটু থেমে ফের বললো….
” আমি তো ভেবেছিলাম নতুন মালিক হবে কোনো বুড়ো খাটাশ । কিন্তু এ তো বুড়োর জায়গায় হিরো বেরোলো রে । ইশশ্, আই এম ইমপ্রেসড । রুজান রাফি চৌধুরী কিনা , আমাদের এলাকায় ! তাও আবার আমাদের এই ছোট্ট ক্যাফের নতুন মালিক ! আমার ক্রাশ…সামনা সামনি কতো সুন্দর উনি । কি বডি মাইরি , কি ফিগার , আই এম তো ফিদা !
উফ , আমি যাই , স্পেশাল কফি বানাই তার জন্য…
কথা শেষ করে গুনগুনিয়ে কফি মেকারের দিকে এগোলো সে । রেহা তপ্ত শ্বাস ফেললো । জেরিনের ক্রাশ লিস্ট বিশাল বড় , লিস্টের শেষ কতো নাম্বারে আছে তা বোধহয় ও নিজেও জানে না । যখনই কোনো সুদর্শন পুরুষ দেখে, তখনই তাকে নিজের ক্রাশ লিস্টে জায়গা দিয়ে দেয় । ওর সম্বন্ধে কোনো কিছুই অজানা নয় রেহার ।
রেহা এবার তাকালো মাহির দিকে । মাহি কে আনমনা দেখে, এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো…
” কি রে মাহি , কি হয়েছে ? তখন ওভাবে দৌড়ে চলে আসলি যে ?
মাহি মাথা ঝাঁকালো । চোখ চুরিয়ে জিভে অধর ভিজিয়ে মিনমিন করলো…
” কিছু না । ভালো লাগছে না আমার !
রেহা শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করলো…
” আমাদের ক্যাফের নতুন মালিক, মানে ঐ রুজান রাফি চৌধুরী, চিনিস ওনাকে !
” না…
মাহির স্পষ্ট জবাব । রেহা উত্তর হিসেবে এটাই আশা করেছিল স্বাভাবিক ভাবে । সে বোঝানোর স্বরে বলতে লাগলো…
” উনি , মানে রুজান রাফি চৌধুরী অনেক বড় মাপের একজন সিঙ্গার । তবে সিংগিং জগতে অতটা একটিভ নন । আগে অনেক নামডাক ছিলো ওনার, এখনো আছে । ফ্যান ফলোয়ারের হিসেব নেই । কয়েক বছর আগে গান নিয়ে পিছিয়ে এসেছেন উনি , এখন অতটা এফোর্ড দেন না গানের জগতে । জানিনা কেনো , বেশ ভালোই তো গানের গলা ওনার । জানিস , ওনার অনেক গান শুনেছি আমি..
” ওও…
রেহা আর কিছু বলার আগে মাহি ছোট্ট বাক্য উচ্চারণ করে ওর কথা থামিয়ে দিলো । বাইরে কাস্টমারের ভিড় । জারিফ আর নিহার সহ বাকি দুজন সামলে নিচ্ছে সেদিকে ।
জেরিন এক কাপ কফি বানিয়ে এগিয়ে এসে সন্দিহান কন্ঠে নিজেই নিজেকে শুধালো…
” আচ্ছা , কফিতে ক চামচ চিনি দেবো ? না মানে , স্পেশাল মানুষের জন্য স্পেশাল কফি , যদি কোন ভুল হয় ? উনি কতটুকু মিষ্টি খেতে পারেন বলতো রেহা ? জিজ্ঞেস করে আসবো..?
ওর কথা শেষ হতেই মাহি আচমকা বললো….
” উনি কফিতে চিনি খান না….
অমনি চকিতে চাইলো জেরিন । তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করলো…
” তুই কি করে জানলি ?
মাহি থতমত খেলো নিজেও । মুখ দিয়ে আচমকা অস্ফুটে বেরিয়ে গেছে কথাটা । নিজেও বুঝতে পারে নি ও । জেরিনের তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন আর প্রশ্ন সূচক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো আরো । পরক্ষনে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল….
” ওনাকে দেখে কি মনে হয় উনি মিষ্টি জাতীয় কিছু খেতে পারেন ? এসব, নায়ক-গায়কেরা সুগার এড়িয়ে চলে । জানা নেই তোর….
জেরিন বোকার মতো বললো….
” ও আচ্ছা….
তাহলে কফিটা দিয়ে আসি বল , অপেক্ষা করছে হয়তো । যাই আমি , এই সুযোগে আর এক পলক দেখে আসি ওনার চাঁদ মুখখানা…
বলেই ফিক করে হেসে চোখ মারল । অতঃপর নাচতে নাচতে কোমর দুলিয়ে বের হলো কিচেন থেকে । মাহি বা রেহা কেউই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না এতে । জেরিন রাফির কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বাস টানলো বুক ভরে । আজ আর ওর খুশি দেখে কে । ও বাইরে থেকে ডোরে টোকা মারলো দুবার । ডোর খুললেন মি. নেওয়াজ । খুলেই আলতো হাসলেন তিনি । অতঃপর বের হতে হতে বললেন….
” স্যারকে কফি দাও , আমি আসছি…
জেরিন যেন সুযোগ পেয়ে গেল । লাফিয়ে উঠলো বক্ষ স্থল । রাফি এখন কেবিনে একা । খুশিতে চিকচিক করে উঠলো জেরিনের অক্ষি যুগল । সে ভেতরে ঢুকলো উদ্যমে । লাজুক আভায় রক্তিম ওর গাল দুটো । রাফি কিছু একটা করছে চোখ নামিয়ে । সামনের ডেস্কে ল্যাপটপ , হাতে মোবাইল । জেরিন সামনে দাঁড়িয়ে নরম কন্ঠে ডাকলো….
” সিংগার স্যার…আপনার কফি !
রাফি তাকালো সচকিতে । চোখে সানগ্লাস না থাকায় এবার চোখ দুটো সহ পুরো মুখ খানা ভালো ভাবে দেখতে পেলো জেরিন । অমনি হাঁ বনে গেলো পুনরায় । অস্ফুটে বিড়বিড় করলো….
” ইশশশ… কি কিউট আপনি…!
” হোয়াট..?
রাফির গম্ভীর প্রশ্নে সম্বিত ফিরল জেরিনের । তব্দা খেলো ও । শুকনো কেশে উঠলো.. বললো…
” কিছু না , আপনার কফি …
বলতে বলতে বাড়িয়ে দিলো কফির মগ । রাফি স্বাভাবিক ভাবেই মগ হাতে তুলে বললো…
” থ্যাংকস…
” ওয়েলক্যাম , সিংগার স্যার…
রাফি পাত্তা দিলো না । পায়ে পা তুলে বসে একহাতে ফোন নিয়ে অন্য হাতে কফির মগ তুলে চুমুক বসালো । কফি গলাধঃকরণ হয়েছে কি না সন্দেহ । মুখে যাওয়া মাত্রই চোখে মুখে পরিবর্তন আসলো রাফির । কফির মগ দুরে ঠেলে তিক্ত অনুভূতিতে চোখ মুখ কুঁচকালো । জেরিন বুঝলো না কিছু । রাফি চোখ টাটিয়ে তীব্র রুক্ষ কন্ঠে ঝাড়ি মারলো….
” স্টুপিড,,, কি বানিয়েছো এটা ? কফিতে চিনি দিতে হয় জানো না …?
জেরিন চমকে উঠলো । ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাফির দিকে । এতো জোরে ঝাড়ি মারে কেউ ? বাইরে থেকেও শোনা গেছে বোধহয় । হঠাৎ রাফির এমন রাগি কন্ঠ আশা জনক নয় । জেরিন চুপসে গেল মুহুর্তেই । রাফি রাগি দৃষ্টিতে চেয়ে আছে চোখ কুঁচকে । জেরিন বোকার মতো মিনমিন করলো….
” কফিতে চিনি খান আপনি ? নায়ক আর গায়করা তো সুগার খায় না…
রাফি অতিরিক্ত মাত্রায় চোখ সরু করে অগ্নি দৃষ্টিপাত করতেই জেরিন ভড়কালো । সাফাই গাওয়ার স্বরে বলল…
” আমি বলি নি এটা । মাহি বলেছে । ও বলেছে আপনি কফিতে চিনি খান না , তাইতো চিনি দেই নি । বিশ্বাস করুন, আমার দোষ নেই , আপনার জন্য স্পেশাল করেই কফি বানিয়ে এনেছিলাম আমি….
মাহি নামটা শুনতেই কপালের তীক্ষ্ণ ভাঁজ শিথিল হলো রাফির । মুহূর্তেই বাঁকা হাসি ফুটলো ঠোঁটের সূক্ষ্ম কোণে । এই নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে চোখে মুখে রাগান্বিত ভাব বজায় রেখেই গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বললো….
” যাও , আবারো কফি বানিয়ে নিয়ে এসো আমার জন্য !
জেরিন আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়ালো না । ধড়ফড়িয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে বুকে হাত রেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । এক মুহুর্তে আঁতকে উঠেছিল সে । হঠাৎ ধমকের জন্য একেবারে কল্পনাতেও প্রস্তুত ছিল না ও ।
এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে এক দৌড়ে কিচেনে ঢুকেছে জেরিন । মাহি কফি বানাচ্ছে । রেহা নেই , বাইরে গেছে হয়তো । আজকে ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না । সব কাস্টমার সার্ভিস বাইরে হচ্ছে । জেরিন কে হাঁসফাঁস করতে দেখে মাহি তাকালো অবিলম্বে । ভ্রুক্ষেপ দেখালো না । জেরিন ঠোঁট উল্টে নেকি স্বরে বলল….
” মাহির বাচ্চা ,, তোর জন্য ধমক শুনতে হলো আমায় ।
মাহি না বুঝে অবুঝের ন্যায় তাকালো । জেরিন ফের বললো….
” কে বলেছে তোকে , নায়ক আর গায়করা কফিতে চিনি খায় না ? উনি তো কফিতে চিনি খান । চিনি দেই নি দেখে , ইয়াব্বড় একটা ঝাড়ি মারলো আমায় ! বাপরে , ওমন সুন্দর হিরোর সুন্দর চেহারায় কি রাগ….
মাহি কপাল গোটালো । স্বাভাবিক শীতল কন্ঠে সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করলো…
” উনি , কফিতে চিনি খান ?
” হুম ,, আমি কি আর এমনি এমনি বলছি নাকি ! আবার নতুন করে কফি চেয়েছেন , আমি আর এখন যাচ্ছি না ওনার সামনে , এভাবে ঝাড়ি মারলো আমায় , আমার বুঝি লজ্জা নেই ! লজ্জা ভুলবো তার পর যাবো…
আমি বাইরে যাচ্ছি , তুই গিয়ে এক কাপ কফি দিয়ে আয়…
বলেই বেরিয়ে গেল সামনে থেকে । মাহি কিছু সময় থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল । এক কাপ কফি বানিয়েছিলো নিজের জন্য , সেই কফির কাপে পরপর চার চামচ চিনি ঢাললো । চোখ মুখ স্বাভাবিকের তুলনায় শক্ত । দুর্বোধ্য ভঙ্গিমা । সে কোনো প্রকার সংশয় না করে রাফির কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো । নক করল বাইরে থেকে । ভেতর থেকে রাফির কন্ঠ ….
” কাম ইন…
মাহি ঢুকলো ভেতরে ! রাফি পেছন ফিরে বসে আছে । মাহি শব্দ করে কাঁচের ডেস্কের উপর কফির মগ টা রাখলো । শব্দে চেয়ার ঘুরিয়ে পিছন ফিরলো রাফি । মাহি কে দেখেও ভাব ভঙ্গি পাল্টালো না । মাহি স্থান ত্যাগের জন্য পা বাড়াতেই ডাকলো….
” মিস. মাহি….
দাঁড়ালো মাহি । তবে উত্তরে টু শব্দও করলো না । রাফি ফের বললো….
” ভুল করে আপনার সাথে দেখা হওয়ার ভুলটা দেখছি আবারো হয়ে গেল !
মাহি শুনেও যেন শুনলো না । ফের পা বাড়ালো । রাফি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো…
” আমি কফিতে চিনি খাই না , এটা কে বললো আপনাকে ?
মাহি থামলো । গিললো দু-ঢোক । দূর্বলতা ঠেলে শক্ত করলো কন্ঠস্বর…
” আমি তো বলিনি আপনি কফিতে চিনি খান না ! আমি শুধু ধারনা প্রকাশ করেছি মাত্র । তবে ভুল ছিলাম ।
এখন ভুল শুধরে নিয়েছি , নতুন করে কফি বানিয়ে এনেছি । খেয়ে দেখুন , আশা করি মিষ্টি কম হয়নি…
রাফি ঠোঁট পিষে হাসলো । কফির মগটা হাতে তুলে দেখলো কয়েক পলক । অতঃপর একটা চুমুক বসালো । মিষ্টি পছন্দ নয় ওর , ও একেবারে মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে পারে না । কফিতে অতিরিক্ত মিষ্টি , এক চুমুকেই ঢোক গিলে যেটা গলা দিয়ে নামানো দায় হয়ে পড়লো ওর কাছে । মুখের আকৃতি পরিবর্তন হলো খানিক । অতিরিক্ত মিষ্টি, যা না ওগলাতে পারছে আর না গিলতে । কষ্ট করে হলেও জোরপূর্বক সময় নিয়ে কোনো রকমে ঢোক গিললো তবুও । গলাধঃকরণ করে ক্রুর মেকি স্বরে বললো….
” মিষ্টি কম হয়নি , বরং বেশিই হয়েছে । মিষ্টি মিষ্টি দুহাতে বানিয়েছেন তো , তাই বোধহয় ! এর আগেও এমন হাতের কফি একবার খেয়েছিলাম আমি । অভিজ্ঞতা আছে , খেয়ে নিতে পারবো এটাও ।
মাহি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো একবার । রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে । ও তাকানোতে একবার ভ্রু নাচালো । মাহি তৎক্ষণাৎ চোখ সরালো , দ্রুত পায়ে বের হলো ঘর থেকে । ও বেরোতেই ফিচেল হাসলো রাফি । কাঁচের দরজা ভেদ করে ওর যাওয়ার পানে অনিমেষে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো কিছু একটা । বাঁকা হাসি নরম হলো এ পর্যায়ে ।
দুপুরের খাবারে বসেছে চৌধুরী বাড়ির সবাই । হেনা বেগম আর হালিমা বেগম খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত । খাবারের টেবিলটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে আজ । রাফি নেই , রাফি থাকলে শান্তও থাকতো । সেও নেই । দুটো চেয়ার ফাঁকা । হেনা বেগম বারবার করুন চোখে তাকাচ্ছেন নিজের ছেলের জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ার টার দিকে । গত সাত মাসে ছেলে দূরে থাকে নি তার থেকে । সকাল সন্ধ্যা ছেলের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি । তবে কাল থেকে বাড়ি নেই রাফি । সিলেটে গেছে । একা গেছে এবার , শান্ত যায় নি । ও যাবে আগামী কাল । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী খাবারে মনোযোগী । রুহি আর জেনিও একপাশে বসে খাচ্ছে । খাবারের মাঝে হঠাৎ ফোন খানা বেজে উঠলো রাশেদ রায়হান চৌধুরীর । খাওয়া ছেড়ে সেদিকে খেয়াল দিলেন তিনি । খাওয়া প্রায় শেষ , স্ক্রিনে ভেসে থাকা নাম্বার টা দেখে আরো তড়িঘড়ি করে খাবার শেষ করলেন তিনি । বেসিনে হাত ধুয়ে দ্রুত ফোন কল ব্যাক করলেন । কথা বলতে বলতে সোফায় গিয়ে বসলেন । ফোনের ওপাশ থেকে একনাগাড়ে কথা বলেই যাচ্ছে কেউ । রাশেদ রায়হান চৌধুরী শুনলেন শুধু । সব শুনে পাল্টা কিছু একটা বলে কান থেকে ফোন নামালেন । ভারী শ্বাস ফেলে এক চিলতে নরম হাসলেন । রুহির খাওয়া হয় নি এখনো । জেনি খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে চলে গেছে । রুহিকে ভাতের প্লেটে হাত নাড়তে দেখে হেনা বেগম চাপা স্বরে শুধালেন….
” কি হলো , হাত নাড়ছিস কেনো এভাবে ? খাবি না ? কিছুই তো খাসনি এখনো !
রুহির নরম জবাব….
” খেতে ইচ্ছে করছে না আম্মু । আর খাবো না ।
হেনা বেগম জোর করলেন না । নরম সুরে বললেন….
” খেতে হবে না । যা , হাত ধুয়ে আয় গিয়ে ।
মায়ের কথা মতো বেসিনের দিকে চলে গেছে রুহি । এদিকে রাশেদ রায়হান চৌধুরী ডাকলেন হেনা বেগম কে । হেনা বেগম এগোলেন সেদিকে । সোফায় বসে আছে দুই ভাই । তিনিও বসলেন এক পাশে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী শান্ত কন্ঠে শুধালেন…
” রাফির সাথে কথা হয়েছে আজ ?
হেনা বেগম মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিলেন । সকালেই কথা হয়েছে রাফির সাথে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ফের বললেন…
” শুনলাম , রাফি নাকি ওখানে একটা ক্যাফে শপ পার্সেস করেছে ।
তিনি বেগম তড়িতে চাইলেন । বিস্মিত হয়ে শুধালেন….
” কি ! কে বললো আপনাকে ?
” ফোন করেছিল , শুনলাম । তবে রাফির কাছে শুনিনি । ও কি করছে কে জানে ? তবে যা করছে করতে দাও , নিজের মতো চলতে দাও ওকে । ফোন করো , কথা বলো ছেলের সাথে । বিজনেস মিটিংয়ে গেছিলো ওখানে , কাল ফিরে আসার কথা । এখন তো মনে হয় না তাড়াতাড়ি ফিরবে বলে…
হেনা বেগম চিন্তায় পড়লেন । রাফির আবার কি হলো কে জানে ? ছেলেটা এই ক’মাসে কতোটাই না পরিবর্তন হয়ে গেছে ! চেনা যায় না আজকাল ওকে ।
হেনা বেগম উঠে দাঁড়ালেন রাফি কে ফোন করার জন্য । রুহি হাত ধুয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেও শুনলো আব্বুর কথা গুলো । কাল থেকে কথা হয়নি ভাইয়ার সাথে । সে একাই গেছে সিলেট , শান্ত কে সাথে নেয় নি । রুহি বুঝলো না হঠাৎ রাফির এমন কাজের কারন । রাফি আজকাল বিজনেস ব্যতীত অন্য কোন কিছুতেই মাথা ঘামায় না । সটান পরিবর্তন হয়েছে সে । তবে এখন, এই সময়, এইভাবে অন্য জায়গায় , অন্য শহরে একা হঠাৎ গিয়েই রাফির হঠাৎ এই ক্যাফে কেনার বিষয়টা ঠিক হজম হলো না রুহির । শেষমেষ কিনা , ক্যাফে ? তাও আবার রাফি ? এটা অসম্ভব ! একেবারেই অসম্ভব ! রাফির সম্পর্কে অবগত সে ! কিছু তো একটা হয়েছে , নিশ্চয়ই কোনো বড় রিজন আছে এর পেছনে । রুহি ভাবতে পারলো না বেশি কিছু । বেশি কিছু ভেবে নিজেকে গুলিয়ে ফেললো না । ঘরে ফোন , গিয়ে রাফি কে ফোন করে জানতে হবে সবটা । রুহি পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে । কয়েক ধাপ সিঁড়ি এগোতেই রাশেদ রায়হান চৌধুরীর চোখে পড়লো সে । অমনি ডাকলেন তিনি….
” রুহি…
” জ্বি আব্বু …
চকিতে চেয়ে উত্তর করলো রুহি । রাশেদ রায়হান চৌধুরী মেয়েকে কাছে ডাকলেন । রুহি এগোলো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ধীর মোলায়েম কন্ঠে বললেন…
” কলেজ কেমন চলছে মামনি ? আজ যাও নি ?
রুহি শীতল হাসলো । বললো….
” ভালো আব্বু । আজ তো ভাইয়া নেই , তাই যাইনি । ভাইয়া যেতে বারন করেছে….
রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না । রুহি চলে যেতেই লম্বা শ্বাস ফেললেন তিনি । হতাশ লাগলো তাকে । জুবায়ের চৌধুরী ভাইকে অবলোকন করে বললেন….
” রাফি তো ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছে ভাইয়া । টাকার পরিমাণ অনেক , কোটি টাকা….
রাশেদ রায়হান চৌধুরী স্মিথ হাসলেন… বললেন…
” তুলুক , আমার কোনো সমস্যা নেই । আমার সবকিছুই ওর । ও যা করছে করুক । আমি বাঁধা দিতে চাই না ওকে । ওর প্রতি আস্থা আছে আমার ।
” খোঁজ নেবে না কোনো ?
” ওকে তো দেখছিস কয়েক মাস থেকে , কিছু বলে না বলে এটা নয় যে আমি কিছু বুঝি না । ওকে বোঝার যথেষ্ট ক্ষমতা আছে আমার । ছেলে মেয়ে দুটোই আমার ।
খোঁজ নিতে হবে না আমায় , খোঁজ আপনা আপনি চলে আসবে….
এদিকে ঘরে এসে ভাইয়া কে ফোন করেছে রুহি । ফোন বিজি । কিছুক্ষণ পর রাফি নিজেই ফোন ব্যাক করেছে । এতক্ষণ হেনা বেগমের সাথে কথা বলছিল সে । ভাইয়ার ফোন পেয়ে রুহি রিসিভ করেই বললো..
” ভাইয়া ,,, কবে আসবে ? কি শুনলাম আমি , তুমি নাকি কফির দোকানদারি করছো ওখানে গিয়ে….
রাফি মুচকি হাসলো । সশব্দে বললো…
” হুম ,, শুরু করেছি দোকান দারি !
রুহিও প্রশান্ত হাসলো । ভাইয়ার এই শীতল অভিমান হীন কন্ঠটা বেশ স্বস্তি দেয় ওকে । রুহি ফের শুধালো…
” আসবে কবে ? আমি কিন্তু আজ কলেজ যাই নি…
” আমার আসতে দেরি হবে sissy । কি বলতো , জায়গা টা বেশ সুন্দর । পছন্দ হয়েছে আমার । জানিস , অনেক দিন পর স্বস্তি লাগছে এখানে…
রাফির গলাটা ক্ষীন নির্লিপ্ত শোনালো । রুহি তৎক্ষণাৎ বললো…
” তাহলে , যতদিন ইচ্ছে ততদিন ওখানে থাকো । এখন আসতে হবে না তোমায় । আমি কলেজে যাবো না , এমনিতেও যেতে একদম ভালো লাগে না আমার..
রাফি মুচকি হাসলো । বললো….
” তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে । কদিনের মধ্যে পেয়ে যাবি ।
রুহি জিজ্ঞেস করলো কি সারপ্রাইজ । ফোন কেটেছে রাফি । হাতে গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়েছে কেবিন থেকে । বেরোতে বেরোতে চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে নিয়েছে । ক্যাফের ভেতরটা আজ পুরো ফাঁকা । রাফি বাইরে পা রাখার আগেই ভেতর থেকে বাইরের উপচে পড়া ভিড় নজরে আসলো । সে থামলো দরজার সামনে । অতঃপর কোনো দিকে না তাকিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে । একেবারে গাড়িতে উঠে ছুটে গেল কোথাও । পেছনে সবাই হাঁ বনে তাকিয়ে আছে ।
বিকেলের দিকে চৌধুরী বাড়িতে এসেছিল শান্ত । এসেই রুহিকে নিয়ে বেরিয়েছে ও । এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পর ফুসকা খেতে নিয়ে গেছে ওকে । রুহি বসে বসে নিঃশব্দে আনমনে ফুসকা খাচ্ছে । বেশি কথা বলে নি এপর্যন্ত । শান্ত বলেছে ,ও শুনেছে । টুকটাক উত্তর করেছে শুধু । শান্ত ওর খাওয়ার দিকে অপলক চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । মোহিত দৃষ্টি তার । চেয়ে থেকেই ধীর কন্ঠে বলল…
” কাল আমিও যাচ্ছি সিলেট !
” জানি !
রুহির সোজাসুজি উত্তর । শান্তর দৃষ্টি আহত হলো । সাথে গলার স্বর ও….
” তোমার ভাইয়া ওখানে কি করছে কে জানে ? আমি গেলে কিন্তু এখন ফিরবো না !
” তাতে আমার কি ?
” কিছু নেই তোমার ?
” না , নেই কিছু ! নিজের ফুফির ছেলে কে অতো বেশি মিস করতে নেই ! বুঝলেন..?
শান্ত হেসে ফেললো । মিটিমিটি হেসে বললো…
” কিন্তু মামার মেয়ে কে মিস করতে আছে ! বুঝলে ? যেটা আমি সবসময় করি । আমার হবু মিসেস কে মিস করি সবসময় । মিস করা বাদ দেওয়ার জন্য তাকে হবু মিসেস থেকে একেবারে মিসেস বানাতে হবে ।
” শুধু বলতেই পারবেন , বানাতে আর পারবেন না । সিস ( সিস্টার ) সিসই রয়ে যাবো , মিসেস আর হবো না ।
” হবে হবে , আর একটু অপেক্ষা করো জান । আমার মিসেস হবে তুমি । মামাতো বোন থেকে মামাতো বউ…। অবশ্য আমি তোমাকে মামাতো বোন থোরিই না ভেবেছি , আমি তো সবসময় বউ ভেবেছি তোমায়…। শুধু তোমার থেকে স্বামীর অধিকার পাওয়া টা বাকি…
এক দেখায় পর্ব ৩৬
রুহি সরু চোখে তাকালো । শান্ত ঠোঁট কামড়ে হাসছে মিটিমিটি ।
চারটার দিকে রাফি ফেরার আগেই বাড়ি চলে গেছে মাহি । একাই গেছে সে । বাকিরা আছে । রাফি ফিরে সবাইকে দেখালেও মাহি কে দেখে নি । রাফির আসার পর পর আরো কয়েক জন লোক এসেছে । পুরো ক্যাফে তে সিসি ক্যামেরা লাগানো হবে । মি. নেওয়াজ কিচেন থেকে শুরু করে কোথায় কোথায় লাগানো হবে সবটা বুঝিয়ে দিয়েছেন তাদের ।
