Home unpredictable Unpredictable part 5

Unpredictable part 5

Unpredictable part 5
Jannatul firdaus mithila

কুয়াশায়জড়ানো চারপাশ!বিশাল বড় কনক্রিটের রাস্তায় জমেছে বরফের স্তুপ!চকচকে কালো রঙা রোলস রয়েস গাড়িটি আপাতত ধীরগতিতে ছুটে চলছে আমেরিকার ওরেগন স্টেটের অন্ধকার এবং কুয়াশায় ঢেকে থাকা রাস্তায়। রাত গভীর! চারিদিকে সুনশান নিস্তব্ধতা।ওয়াশিংটন থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ২ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করলেই দেখা মিলে ওরেগনের একটি গহীন এবং দূরবর্তী অঞ্চল! যেখানে মানুষ তো দূর কি বাত, মোবাইল নেটওয়ার্কেরও দেখা মেলা ভার! এমনকি শহরের পরিচিত ব্যাস্ততম কোলাহলটাও এখানে প্রায় দূর্লভ বৈকি! নির্জন এই এলাকার চারপাশটা কেমন অদ্ভুত শান্ত ঘন জঙ্গলে পরিবেষ্টিত।

যেখানে রয়েছে অসংখ্য ওক, ম্যাপল, আর পুরনো উইলো গাছের আধিক্য। রাত হয়েছে প্রচুর, গভীর রাতের অন্ধকার যখন চারপাশটাকে গিলে নিচ্ছে ঠিক তখনি ড্রাইভার মহাশয় গাড়ির ফ্রন্ট লাইটের আলো জ্বালালেন।মুহুর্তেই চারিদিকের অন্ধকার কিছুটা কমে গিয়ে আলোর দেখা মিললো।গাড়ি এগুচ্ছে ধীরগতিতে,সরু রাস্তার দু’ধারে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার গাছগুলো বাতাসের সংস্পর্শে এসে কেমন মড়মড় শব্দ তুলছে! যা ঘন জঙ্গল! বিকেল হতেই তো এলাকাজুড়ে নেমে আসে বিদঘুটে অন্ধকার!সেক্ষেত্রে দিনের বেলার নিস্তব্ধতাও কিন্তু বেশ শ্বাসরুদ্ধকর! ড্রাইভার আশেপাশে এক-দুবার নজর বুলিয়ে ক্ষনে ক্ষনে ভয়ার্ত ঢোক গিলছেন। এই রাস্তায় আসতে গেলেই হাত-পা কেমন অসার হয়ে আসে তার! গাড়িতে বসে থেকেও বেচারার ভয়- ভীতির কোনো কমতি নেই।তা কেমন তরতর করে বাড়ছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার গাছগুলোর দোদুল্যমান দৃশ্য দেখে!

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

গাড়ির ব্যাকসিটে উম্মুক্ত শরীরে, গা এলিয়ে বসে আছেন সুদর্শন যুবক।যুবকের ঘাড় সমান ওলফ কাট দেওয়া গোল্ডেন ব্রাউন চুলগুলো পেছনের দিকে টেনে ঝুটি বেঁধে রাখা।ফর্সা কপাল খানার ওপরে গোটাকতক অবাধ্য চুল এসে লেপ্টে আছে বেহায়াদের মতো। বাইরে ওমন বরফ পড়া ঠান্ডা পরিবেশ, সেই সাথে গাড়ির ভেতরে বহমান মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা আবহ স্বত্বেও যুবক কেমন খালি গায়ে বসে আছে! ভাব এমন, এটুকু ঠান্ডা বুঝি কিছুই না তার জন্য। যুবকের চোখদুটো বুঁজে রাখা।টকটকে গোলাপি অধরজোড়ার কোণে স্পষ্ট ফুটে আছে এক চিলতে মৃদু হাসির রেশ। ছেলে মানুষের ঠোঁটও বুঝি এতো সুন্দর হয়,তা এই যুবককে না দেখলে কেউ বোধহয় বিশ্বাসই করবে না! ড্রাইভার এক-আধ ফ্রন্ট মিররে চোখ রেখেছে, যুবককে এমন উদোম গায়ে বসে থাকতে দেখে তার নিজেরই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাবার যোগাড়! অথচ তার মালিককে দেখো!কি সুন্দর ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বসে আছে।

ড্রাইভার আর ভাবলেন না ও বিষয়ে।চুপচাপ ফোকাস করলেন গাড়ি চালানোতে। নির্জন এলাকাটিতে আশেপাশে কারোরই তেমন বসবাস নেই। শুধুমাত্র অদূরেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে Mourningvale Manor. নামের সাথে প্রাসাদের মতো বাড়িটিও যেন এক অপার সৌন্দর্য এবং রহস্যে ঘেরা! অদূরের ঘন-জঙ্গল ছাপিয়ে দূরের সরু রাস্তাটি থেকে যে কারোরই খুব সহজে প্রাসাদের পুরনো ব্রিটিশ স্টাইলের স্টোন ক্যাসেলটি নজরে পড়বে। যদিও প্রাসাদটি দূর থেকে দেখলে যে কেউ কৌতুহলী হবে তবে প্রাসাদের সামনে অবস্থিত ঘন-জঙ্গলটি পেরিয়ে প্রাসাদের কাছে আসার সাহস আদৌতেও কারো হবে না,এ-তো জানা কথাই!
কিয়তক্ষন বাদেই ড্রাইভার মহাশয় ঘন-জঙ্গল থেকে কয়েক হাত দূরে গাড়িতে ব্রেক কষলেন। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে না ফিরে বললেন,

“ স্যার! আমরা চলে এসেছি!”
যুবকের কান খাঁড়া। সে স্পষ্টত শুনলো সবটা। সে সময় নিয়ে চোখ মেললো। হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে কালো রঙা জ্যাকেটটা তুলে নিয়ে পা বাড়ালো বাইরে। কয়েক হাত সামনেই পাথরের তৈরি সরু একটা প্রাইভেট রোডের শুরু ভাগ। যার দু’পাশে উঁচু পাথরের দেয়াল।ফটকে লোহার গেইট ঝুলছে যেখানে লাতিনে (ল্যাটিন) শব্দে লেখা:
“Silencio mortis est musica mea”
(মানে, “ মৃত্যুর নিরবতাই আমার গান!”)

যুবক গম্ভীর মুখে পা বাড়ায় রোডের দিকে। পেছন থেকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ড্রাইভার। এমুহূর্তে তাকে যদি কেউ কোটি খানেক টাকাও সাধে এই রোডে যাওয়ার জন্য, তবে সে কান ধরে তা নাকচ করে দিবে। জীবনের চাইতে টাকার মূল্য থোড়াই বেশি! যেখানে রোডের অগ্রভাগ দেখেই ভয়ে গা হিম ধরে আসছে তার সেখানে মালিক কীভাবে এই রোড একা একা পাড়ি দেয় কে জানে! ড্রাইভার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।ধীরে ধীরে যুবক অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। এখন আর তাকে দেখা যাচ্ছে না।ড্রাইভার ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো। পুনরায় গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রাখলো,স্টার্ট দিলো গাড়িটায়।এখন আর এখানে থেকে লাভ নেই তার। চলে যেতে হবে, মেইন রোডে!

চারিদিকে নিশির ডাক! কোথাও কোথাও থেকে ভেসে আসছে হিংস্র নেকড়েবাঘেদের গর্জন। শুকনো পাতায় পা পড়তেই কেমন মরমর শব্দ হচ্ছে চারপাশে। যুবক খালি গায়ে এগুচ্ছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। একহাতে তার অবহেলিত আকারে ধরে রাখা জ্যাকেটটা। আশ্চর্য! চারিদিকে নেই কোনো বিন্দুমাত্র আলোর ছটাক তারপরও যুবক কতই না সহজে হেঁটে যাচ্ছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। মনে হচ্ছে এ জঙ্গলের প্রতিটি পথ যেন খুব কাছ থেকে চেনা তার। যুবক হাটতে হাটতেই হাত বাড়িয়ে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে ব্যাকউডস ব্র্যান্ডের মোটা সিগারেটটা হাতড়ে বের করে আনে।পরক্ষণেই অন্য পকেট থেকে লাইটারটাও বের করে আনে। পায়ের গতি না থামিয়ে বামহাতের দু-আঙুলের ভাঁজে সিগারেটটা ধরে ঠোঁটের কোণে আলতো করে চেপে ধরলো।

লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে এক লম্বা সুখটান টেনে, লাইটারটা ফের পকেটে গুঁজে নেয় যুবক। ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারেটের আলোয় চকচক করছে যুবকের ধূসর রঙা চোখদুটো। সে হাঁটছে নিজের মত। কয়েক কদম সামনে এগুতেই ঘটলো আরেক কান্ড! সামনের মোটা ওক গাছের পেছন থেকে লেজ নাড়িয়ে বেরিয়ে এলো এক হিংস্র নেকড়েবাঘ। যুবক থামলো একমুহূর্তের জন্য। মুখভঙ্গিতে তেমন কোনো পরিবর্তন না টেনে, ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে একহাত কোমরে চেপে অন্যহাতে সিগারেটটা ঠোঁটের কোণ থেকে আঙুলে গুঁজে নিলো। ঠোঁট গোল করে সিগারেটের কালো ধোঁয়া বাইরে বের করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বাঘটার দিকে। ওদিকে বাঘটা কেমন হুংকার ছুড়লো তাকে দেখে।

নিজের হিংস্র লম্বা লম্বা দাঁতকপাটি বের করে ধীর পা ফেলে এগিয়ে এলো যুবকের কাছে।যুবক ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। একটু নড়লোও না দৃঢ় মানব। এদিকে বাঘ মামা যেভাবে লেজ নাড়িয়ে সামনে এগুচ্ছিলেন সেক্ষেত্রে মনেই হচ্ছিল এই বুঝি তিনি এসে হামলে পড়বে যুবকের ওপর। তবে বালাইষাট!ঘটনা ঘটলো পুরো উল্টো। হিংস্র নেকড়েবাঘটা যুবকের পায়ের ধারে এসে কুর্নিশ করার ন্যায় ঝুঁকে দাঁড়ালো। তা দেখে বাঁকা হাসলো যুবক। খানিক নিচু হয়ে আলতো করে হাত রাখলো বাঘটার নরম পিঠের ত্বকে।রাশভারী গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“ হাউ আর ইউ টারসেল?”
বাঘটা মানুষের মতো জবাব দিতে না জানলেও হুংকার ছুড়ে, লেজ নাড়িয়ে ঠিকই জানালো — সে ভালো আছে! যুবক ফের সটান হয়ে দাঁড়ায়। বাঘটাকে পাশ কাটিয়ে সিগারেটটা ঠোঁটের কোণে চেপে রেখে পা বাড়ায় সামনের দিকে। বাঘটাও পিছুপিছু আসছে। যুবক বাঁধা দিলোনা মোটেও!

প্রায় মিনিট বিশেকের পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে জঙ্গলের শেষ মাথায় এসে দাঁড়ালো যুবক। কয়েক হাত সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ Mouringvale manor। পুরনো ধাঁচের প্রাসাদটির বাহ্যিক গঠন পুরনো ব্রিটিশ-স্টাইলের স্টোন ক্যাসেলের মত। পাঁচতলা বিশাল বিল্ডিং, যার ছাদ গথিক স্টাইলে বাঁকানো। বাইরের শেওলা পড়ে যাওয়া দেয়ালটা পাথরের তৈরি, সেথায় ঘষামাজার কাজ নেই বরং রয়েছে পুরনো দাগ-খোদাইয়ে আবৃত এবং কিসব অদ্ভুত প্রতীক আকাঁ! যুবক পা বাড়ালো বাড়ির দিকে।তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এতক্ষণ তার পেছন পেছন আসা বাঘটা এখন কেন যেন আর এগুচ্ছে না।

ভাব এমন, এর আগে যাওয়া যেন নিষেধ তার জন্য। যুবক নির্বিকার ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো বাড়ির সুউচ্চ গেটের দিকে। গেঁটের গায়ে ঝুলছে বেশ বড়সড় একটি তালা,একদম পুরনো ধাঁচের যাকে বলে।যুবক আলগোছে গেঁটের ঠিক মাঝ বরাবর কালো ফুটোর গায়ে আলতো করে হাত রাখলো।মুহুর্তেই গেটের গা থেকে সরে গেলো আলগা এক প্রলেপ যা দেখতে হুবহু গেঁটের ডিজাইনের মতো। অতঃপর সেথায় উম্মুক্ত হলো একটি ডিজিটাল সেন্সর। যুবক সেন্সরের দিকে চোখ রাখলো। তার চোখদুটো স্ক্যান হতেই আপনা-আপনি বন্ধ তালাটি খুলে গেলো! যুবক গম্ভীর মুখে গেট থেকে তালা খুলে নিয়ে প্রাসাদের ফটিক ছাড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো।

সুউচ্চ লিভিং রুম! যার পুরোটা মেঝে তৈরী ঝকঝকে মার্বেল পাথরে। আধুনিক সুসজ্জিত বাড়িটির বাইরে থেকে দেখলে যেমন-তেমন তবে ভেতরের লিভিং রুমে একবার চোখ রাখলেই চোখ আঁটকে আসার উপক্রম হবে নিসন্দেহে! যুবক ধীরে ধীরে পা ফেলে চলে গেলো সিঁড়ির দিকে। দোতলায় পাশাপাশি অসংখ্য কামরা। কোনো কোনোটি তালাবদ্ধ, তো আবার কোনোটি খুলে রাখা। Mourningvale Manor -এর অপার সৌন্দর্যে মোড়ানো অসংখ্য ঘরের মধ্যে রেড চ্যাম্বার অন্যতম! এই ঘরটি বাড়ির সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারে অবস্থিত। একান্ত নির্জন,যার তিন দিকেই শুধু জানালা, আর একপাশে বিশাল ব্যালকনি, যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় অদূরের পাহাড় আর ধূসর লেকের রূপ। যুবক হেঁটে চলে গেলো চারতলার সে-ই রেড চ্যাম্বারের দিকে।

সুবিশাল ঘরটির দেয়াল কেমন রক্তমাখা গাঢ় ক্রিমসন রঙে আঁকা, ছাদে ঝুলছে একটা বিশাল প্রাচীন ক্রিস্টাল চ্যান্ডেলিয়ার। যুবক ঘরে ঢুকে সবার আগে আলো জ্বালায়।মুহুর্তেই চ্যান্ডেলিয়ারের বাতিগুলো মোমের মতো হলুদ আলোয় সুসজ্জিত হয়ে ওঠে । যদিও সেই আলো চোখের আরাম টানছ তবে সেই সাথে এক অদ্ভুত মানসিক অস্থিরতাও তৈরি করছে!
ঘরটির চার কোণে খোদাই করা পুরনো শিল্পকর্ম যেখানে স্পষ্ট ফুটে আছে একজোড়া রাজা-রানির ছবি, যারা কিনা একে অপরকে হত্যা করছে! বিশালাকার ঘরটির পুরোটা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য মাটির তৈরি শিল্পকর্ম। প্রতিটি শিল্পকর্মের গায়ে জড়িয়ে আছে পাতলা ফিনফিনে পর্দা! ঘরটির ঠিক মাঝ বরাবর রাউন্ড, চারপোস্টারের বিছানা; যার চারপাশের স্ট্যান্ডে মশারির বদলে ঝুলছে ভারী, মেরুন মখমলের পর্দা।বিছানার চাদর কালো রেশমের তৈরি, বালিশগুলোতে সোনালি আভার সূচিকর্মে লেখা লাতিন শব্দ:

“Amor aut mors”
(অর্থ: “ভালোবাসা অথবা মৃত্যু”)
ঘরটির সম্পূর্ন মেঝে তৈরি মেহগনি কাঠের, আর তার উপর রাখা এক বিশাল পার্সিয়ান কার্পেট যার মাঝখানে ফুল নয়, আঁকা আছে এক সুন্দরীর অর্ধেক মুখ যার চোখ ঢাকা।রেড চেম্বারের একপাশের দেয়ালে ঝুলছে বিশাল আয়না, যার গায়ে কেমন ধোঁয়াশা লেগে আছে। হয়তো বহুদিন পরিষ্কার করে না বলেই এমন হয়ে আছে!

যুবক নিজের জ্যাকেটটা হাত থেকে ছুড়ে ফেললো বিছানায়। তারপর কদম বাড়িয়ে চলে গেলো জানালার কাছে। হাত বাড়িয়ে জানালার পাশে থমকে থাকা গাঢ় মখমলের পর্দাগুলো সরিয়ে দিলো আলগোছে। ভারী পর্দাগুলো ঘরটিতে সূর্যের আলো ঢুকতে দেয় না সচরাচর। যতক্ষণ না কেও নিজ থেকে এসে পর্দাগুলোকে সরায়। পাশেই পড়ে আছে এক কোণে ঠেসে রাখা একটা পুরনো পিয়ানো। কেউ বাজায় না, তাইতো কেমন অবহেলায় পড়ে আছে তা! তার ঠিক পাশেই দেয়াল জুড়ে অবস্থিত কয়েক স্তর বিশিষ্ট বইয়ের তাক!তাতে সাজিয়ে রাখা সব প্রেমের বই।যুবক বইয়ের তাকের সামনে এসে দাঁড়ালো।

হাত উঁচিয়ে পছন্দসই একটি বই তুলে নিয়ে চলে গেলো বইটির একেবারে শেষ পৃষ্ঠায়।আশ্চর্যজনক কান্ড ঘটিয়ে সে আলগোছে ছিড়ে ফেললো বইটির শেষ পৃষ্ঠা! এ-তো নতুন নয়!তা’কে সাজিয়ে রাখা সবকটি বইয়ের পাতাই তো ছেঁড়া শেষ অংশে! যুবক কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সদ্য ছিড়েঁ আনা বইয়ের পৃষ্ঠাটির দিকে। পরক্ষণে কী মনে করে সে তৎক্ষনাৎ টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললো পুরো পৃষ্ঠাটা। তারপর টুকরোগুলো ছুড়ে ফেললো মেঝেতে। রহস্যময় মানব এরপর এগিয়ে গেলো বইয়ের তাকের বা-দিকে। তা’কের চতুর্থ স্তরে সাজিয়ে রাখা চিকন নীল রঙা বইটিতে হালকা টান দিতেই মুহুর্ত ব্যায়ে তাকটি দু’ধারে সরে গিয়ে উম্মুক্ত হলো এক গোপন কামরার। যুবক বাঁকা হেসে পা বাড়ালো সেদিকে।

দরজা-জানালা বিহীন গোপন ঘরটির চারিদিকে সাজিয়ে রাখা অসংখ্য ক্যানভাস।যেখানে একদম জীবন্তের ন্যায় ফুটে আছে এক নারী চিত্র! অদূরের দেয়ালে ঝুলছে সে-ই নারীর অসংখ্য ছোট ছোট নিত্যদিনকার ছবি।কোনোটায় সুন্দরী হাসছে,তো আবার কোনোটায় গম্ভীর মুখে হাঁটছে।সবগুলো ছবি দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, ছবিগুলো রমণীর অলক্ষ্যে তোলা হয়েছে। পাশেই ঝুলছে বেশ বড়সড় একটা চার্ট।যেখানে মার্কিং লাইন টেনে ছবি সংযুক্ত করে রাখা। সবকিছুই সে-ই রমণীর নিত্যদিনকার কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত!

দেয়ালের ঠিক ডানদিকে সাজিয়ে রাখা বেশ কয়েকটি কম্পিউটার, ডিভাইস। যুবক সেদিকে পা বাড়ায়। হাত বাড়িয়ে চেয়ার টেনে কম্পিউটারের সামনে বসে লাইন কানেক্ট করতেই সদৃশ্য হলো অসংখ্য সিসিটিভির লাইভ ফুটেজ। কোনোটিতে দেখা যাচ্ছে ওমেন্স হোস্টেলের ভেতরকার দৃশ্য, তো আবার কোনোটিতে দেখা যাচ্ছে সে-ই বাদামী চুলের সুন্দরীর ঘরের দৃশ্য! কয়েকটায় দেখা যাচ্ছে বোস্টন ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টের ক্লাসরুমের দৃশ্য। যুবক গভীর চোখে তাকিয়ে রইলো কম্পিউটারের স্ক্রিনে। কিয়তক্ষন বাদেই সে চোখ তুলে চাইলো দেয়ালে ঝুলন্ত নারী ছবিটির পানে। কী মনে করে যুবক কেমন বাঁকা হেসে বিরবির করে বলল,

“ আমাকে ছেড়ে কোথায় পালাবে তুমি টুইঙ্কেল? কোথায়?”
একা একা ছবিটির সাথে কথা বলছে যুবক।ঠিক তখনি তার পকেটে পড়ে থাকা ফোনটা কেমন কর্কশ শব্দ তুলে বেজেঁ উঠে! যুবক এবার বেজায় অসন্তুষ্ট!কার ওমন দুঃসাহস তার টুইঙ্কেলের সাথে কথা বলার সময় তাকে ডিস্টার্ব করে! যুবক শক্ত চোয়ালে পকেট হাতড়ে ফোন বের করে আনে।স্ক্রিনে চোখ রেখে পরিচিত নম্বর দেখে রাগটা খানিক প্রশমিত হলেও পুরোপুরি কমলো না তার। সে সময় নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকায়। ওপাশ থেকে তক্ষুনি ভেসে আসে একজনের বিচলিত কন্ঠ!
“ জেডি! কোথায় তুই ম্যান? সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম তোকে! অথচ তুই কোথায় গা ঢাকা দিয়ে বসে আছিস ব্রো? আজ কী বাড়িতে ফিরবি না?”
জেডি দেয়ালে ঝুলন্ত আয়রার সুশ্রী মুখখানায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বাঁকা হাসলো। গম্ভীর কন্ঠে অল্প করে বলল,
“ আ’ম বিজি নাউ!”

“ আরু! তুই এটা কী বললি?”
কাবার্ড থেকে কাপড় বের করতে ব্যস্ত আয়রা। ওদিকে কারো মৃত্যু সংবাদে আয়রাকে ওমন আলহামদুলিল্লাহ বলতে শুনে হোঁচট খেয়েছে আরোহী এবং স্নেহা।দু’জনেই কেমন এগিয়ে এসে জেঁকে ধরেছে মেয়েটাকে। একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ছে মেয়েটার দিকে। অথচ আয়রা কেমন গম্ভীর হয়ে নিজ কর্মে ব্যস্ত! পাশ থেকে মেয়েগুলোর এতো এতো হাঁক ডাকেও কোনো সাড়া নেই তার। স্নেহা এবার হার মানলো।চোখের ইশারায় আরোহীকেও থামালো।বুঝে গেলো — আয়রাকে আর প্রশ্ন করে লাভ নেই। কেননা এ মেয়ে কী আর ওতো সহজে মুখ খোলে? যে আজ খুলবে! আয়রা কাবার্ড থেকে কাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। পেছন থেকে স্নেহা তক্ষুনি বলল,
“ আমরা এখানে ওয়েট করবো? না-কি নিচে চলে যাবো?”
আয়রা যেতে যেতেই প্রতিত্তোরে বললো,
“ এজ ইউর উইশ!”

কোমর সমান বাদামী চুলগুলো থেকে চুইয়ে পড়ছে পানির ফোঁটা। মুখে,এবং কন্ঠাতেও জমে আছে বিন্দু বিন্দু পানির উপস্থিতি।আয়রা একহাতে কোনোমতে চুলগুলো মুছতে মুছতে এগিয়ে আসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। আয়নায় খুব একটা না তাকিয়েই তোয়ালেতে ভেজা মুখটা আলতো করে মুছে নিয়ে, ব্যস্ত হলো স্কিন কেয়ারে। প্রায় মিনিট দশেক চললো সে-ই কাজ! ঠিক তার পরপরই আয়রার ফোনে কল এলো! আয়রা আয়রা মোটেও তারাহুরো করলোনা, সে সময় নিয়ে ফোনের দিকে এগিয়ে আসে। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটলো তার।চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো নিমিষেই! শক্ত মুখেই কল রিসিভ করে ফোন কানে ঠেকায় মেয়েটা।গম্ভীর মুখে বলে,

“ আসসালামু আলাইকুম!”
ওপাশ নিশ্চুপ! ক্ষনে ক্ষনে কারও ঘন নিশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে শুধু। আয়রা বুঝি এহেন নিরবতায় ভীষণ বিরক্ত! সে কেমন গম্ভীর মুখে ফের বলল,
“ হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম।”
ওপাশের ব্যাক্তি এবার খানিক ঢোক গিললেন। নাক টানার শব্দ আসছে সেই সাথে। বোধহয় কাদঁছেন তিনি। কান্নার তোপে হেঁচকি উঠার যোগাড়! আয়রা সময় নিয়ে ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে ফের ডেকে ওঠে,
“ আম্মু! এটা কী আপনি?”
ওপাশের নাহিদা বেগম এতক্ষণে গলার স্বর বার করলেন। উপচে পড়া কান্নাগুলো কোনমতে গিলে নিয়ে মোটা হয়ে আসা কন্ঠে বলতে লাগলেন,

“ কেমন আছিস মা?”
আয়রা কেমন শ্লেষাত্মক হাসলো। কিয়তক্ষন চুপ থেকে বলল,
“ যেমনটা আপনারা দোয়া করেছেন!”
নাহিদা বেগম মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলছেন। চোখদুটো তার আর ধরা-বাধা মানছেনা, কান্নায় ফেটে পড়ছে তারা। পাশ থেকে রশিদ আজিম আলগোছে স্ত্রীকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরলেন। নাহিদা বেগমের হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে নিজে বলতে লাগলেন,
“ কেমন আছিস হুমায়রা?”
আয়রা থমকায় একমুহূর্তের জন্য। বাবার কন্ঠ কানে যেতেই নাক ধরে আসছে তার।চোখদুটোও কেমন ঘোলাটে হয়ে গেলো আপনা-আপনি। শক্ত মেয়েটা তবুও বাইরে থেকে নিজের গম্ভীর মুখাবয়ব ধরে রেখে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

“ আলহামদুলিল্লাহ! ভালো আছি আব্বু।আপনি কেমন আছেন?”
রশিদ আজিম শক্তপোক্ত মানুষ। গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন,
“ হুম আছি কোনোরকম। তা বলছিলাম কী… তুই দেশে ফিরবি না মা?”
“ বলতে পারছিনা।”
মেয়ের ওমন সোজাসাপটা উত্তরে থেমে গেলেন রশিদ আজিম। বলার মত কিছু না পেয়ে ফোন বাড়িয়ে দিলেন স্ত্রীর দিকে। কাঁদতে কাঁদতে এতক্ষণে চোখমুখ লাল করে ফেলেছেন নাহিদা বেগম। তিনি কেমন থেমে থেমে মেয়েকে বললেন,
“ এবার দেশে ফিরলে বাড়িতে আসবি তো মা? একটু দেখা দিবি তো আমাদের?”
ব্যাথাতুর হাসলো আয়রা। ফোন কানে নিয়েই পা বাড়ালো জানালার দিকে। বাইরের কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে,

“ দেখা যাক!”
“ আমাদের ওপর এখনো এতো রাগ তোর মা? এখনো ক্ষমা করতে পারিসনি আমাদের?”
“ ক্ষমা করার আমি কে আম্মু? আমিতো কেউ না! আজিম পরিবারের বড় মেয়ে, হুমায়রা আজিম আয়রা সে-তো কয়েকবছর আগেই মারা গেছে। এখন এসে তার মৃত আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়ে কী লাভ আপনার? বাদ দিন এসব।”
নাহিদা বেগম এবার কেমন হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।কান্না জড়ানো কন্ঠে মেয়েকে অনুনয় করে বলতে লাগলেন,
“ শেষবারের মত মাফ করে দে মা! এটুকু দয়া কর! এই বোঝা আর সহ্য হয়না!”

আয়রা কেমন অদ্ভুত শান্তভাবে হাসলো।খট করে কলটা কেটে দিয়ে মোবাইলটা ছুড়ে ফেললো বিছানায়। দু’হাত কোমরে চেপে হাটতে লাগলো পুরো ঘরজুড়ে। কিয়তক্ষন বাদেই সিলিংয়ের দিকে মুখ তাক করে চোখ বুঁজে রইল, মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলতে লাগলো মেয়েটা।এমুহূর্তে কেন যেন নিশ্বাস ফেলতেও কষ্ট হচ্ছে তার। চোখদুটোর সামনে হঠাৎ করেই ভেসে উঠেছে অতীতের কিছু কালো অধ্যায়। বিয়ের লাল টকটকে শাড়ি, ছেড়াঁ ফুলের মালা,মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাজা রক্ত, মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হাত-পা। চারদিকের ভয়ার্ত চিৎকার, কেউ কানের কাছে এসে চিৎকার দিয়ে বলছে — তুই মর! তুই মর,তুই মর!

Unpredictable part 4

তৎক্ষনাৎ চোখদুটো খুলে নেয় আয়রা। কাঁপতে কাঁপতে নিজের কানদুটোতে দু’হাত চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়লো মেয়েটা। ভয়ার্ত ঢোক গিলে এলোমেলো স্বরে বলল,
“ আমি মরিনি! আমি মরবো না,আমার কোনো দোষ নেই। আমি ক্ষমা করবোনা। কাউকে ক্ষমা করবোনা। কোনোদিনও ক্ষমা করবোনা!”

Unpredictable part 6