Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯ (২)

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯ (২)

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯ (২)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

মিররের সামনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছে হীরা। পরনে তার অনিলের দেওয়া ডাক্তারি অ্যাপ্রন, সেদিন গিফট্ পাওয়ার পর এতো এতো সমস্যার মধ্যে সেটা পড়ে দেখার আর সুযোগ হয়নি তার। আজকে অনিল এখনো বাসায় আসেনি, আবার আনিকাও বাড়িতে নেই। তাই এসব করেই সময় কাটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। স্টেথোস্কোপ টা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করছে সে। এর মাঝেই বরাবরের নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো অনিল। হীরার সেদিকে খেয়াল নেই সে নিজের কাজে মত্ত। সহসা ঘাড়ের উপর কারো তপ্ত শ্বাসের অস্তিত্ব অনুভব করতেই কেঁপে উঠলো মেয়েটা। তবে অস্তিত্বের মালিককে চিনতে সময় লাগল না তার। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে তাকাতে ডাকলো,

“ ডাক্তার সাহেব? ”
“ বলুন রোগী সাহেবা। ”
“ আপনি কখন এলেন? আর আজকে এতো দেরী হলো কেন? ”
“ মাত্রই আসলাম। একটু কাজ ছিলো তাই দেরী হলো। ”
বলেই হীরাকে মিররের দিক ঘুরালো। ব্লু জামার উপর সাদা অ্যাপ্রন পরিহিতা হীরাকে দেখলো মন দিয়ে। তার কাঁধ অব্দি লম্বা ছোট্ট রমনীটিকে এখন পুরো ডাক্তার মনে হচ্ছে। কেউ বলবে না সে মাত্র কলেজে পড়ে। অনিলের গভীর দৃষ্টিতে সবসময়ের মতোই গালে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে হীরার। এতে যেনো আরও বেশিই মোহনীয় লাগছে মেয়েটাকে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ আপনি আমায় কবে থেকে ভালোবাসেন ডাক্তার সাহেব? ”
অকস্মাৎ হীরার এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে মনোযোগে ব্যঘাত ঘটলো অনিলের। নিজেকে স্বাভাবিক করে সে উত্তর করল,
“ তা ঠিক বলতে পারি না। তবে যেদিন নিরবদের বাড়িতে গিয়ে যখন তোমায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম হৃদগহীনের সর্বাধিক আসন এই পিচ্ছিপরীর মালিকানায় বন্দি হয়ে গেছে। ”
“ ঈশ,, আমার না আরও একবার হারাতে ইচ্ছে করে। আপনার…”
“ ইঞ্জেকশান খাওয়ার শখ জেগেছে? ”
হীরার মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলো অনিল। মুখটা চুপসে গেল হীরার। মিররের দিক তাকিয়েই পিছনে থাকা অনিলের উদ্দেশ্যে বলল,

“ আপনিময় সময়টাকে, ইঞ্জেকশানময় করে দিলেন তো! আপনার মন কী শুধু আমাকে ইঞ্জেকশান দেওয়ার কথা জপে? ”
বলেই অনিলের দিক ঘুরে দাঁড়ালো হীরা। তারপর গলায় থাকা স্টেথোস্কোপটা হাতে নিয়ে ইয়ার পিসগুলো কানে পুরে, চিস্ট পিস টা অনিলের বুকে রাখতে যেতেই অনিল কপাল কুঁচকে বলল,
“ কী করছো? ”
“ আপনার হৃদয়ে সমস্যা আছে কিনা- তা চেক করছি। ”
“ আমার হৃদয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তোমার পিচ্ছি ব্রেনে। ”
অনিলের কথায় একদম লা পাত্তা হীরা। সে চিস্ট পিস টা অনিলের বুকের বা পাশটায় রাখল। অনিলও আর বাধা দিলো না, চুপচাপ হীরার কান্ড দেখতে লাগলো। কিছুক্ষন দক্ষ ডাক্তারদের মতো পরীক্ষা করলো হীরা। পরীক্ষা শেষ হতেই সে একদম সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

“ হায় আল্লাহ, আপনার হৃদয়ে তো অনেক বড়ো সমস্যা। ”
ভ্রূ উঁচিয়ে সন্দিহান চোখে তার দিক তাকালো অনিল। বলল,
“ কী সমস্যা? ”
“ এ কোনো সাধারণ সমস্যা নয় লা, এ হলো হীরাময় সমস্যা। আপনার হৃদয় তো শুধু হীরা, হীরা বলে স্পন্দন করছে। ”
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো সে। তার কথা বলার ভঙ্গিমা ও হাসি দেখে অনিলও শব্দ করে হেসে ফেললো। বলল,

“ অভিজ্ঞ ডাক্তারনী। ”
হীরার হাসি থামল এবার। এতক্ষনের উজ্জ্বল মুখটা হঠাৎ করেই নিভে গেল তার। মন খারাপ করে বলল,
“ আচ্ছা আমি যদি ডাক্তার না হতে পারি? ”
“ কেন হতে পারবে না! সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস রেখে চেষ্টা করে যাও, ইনশাআল্লাহ অবশ্যই হতে পারবে। ”
মুখের মলিন ভাবটা মুহূর্তেই বিলীন হয়ে গেলো হীরার। অনিলের দু হাত টেনে নিয়ে নিজের আঙুলগুলো গুঁজে দিলো অনিলের আঙুলের ভাঁজে। বলল,

“ আমাকে দেওয়া সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ উপহার- আমার ডাক্তার সাহেবের এই বিশ্বস্ত হাত আমার হাতে থাকলে আমি সব চেষ্টায় সফল হবো ইনশাআল্লাহ। ”
হীরার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে তাকে কাছে টেনে নিলো অনিল। এরপর পুরুষালী কন্ঠে উচ্চারন করল কিছু মনোমুগ্ধকর বাক্য,
“ যতদিন আমায় বাঁচিয়ে রাখেন আমার প্রভু,
ততদিন এই অনিল এহসানের হাতের বন্ধন থেকে তার অবুঝাখির হাত ছাড়া পাবে না কভু! ”

ঘড়িতে তখন রাত প্রায় বারোটা। বিছানায় অপেক্ষারত অবস্থায় বউ সাজে বসে আছে তাপসি। তবে আর দশটা মেয়ের মতো স্বামীর আসার অপেক্ষায় নয় – বাড়ির লোকের ঘুমানোর অপেক্ষায় বসে আছে সে। নিচ থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে এবার বিছানা ছেড়ে নেমে পরল সে। এরপর ধীর পায়ে রুম ত্যাগ করে এগিয়ে গেলো ছাদের উদ্দেশ্যে। ছাদে গ্রিলে পিঠ ঠেকিয়ে আকাশের দিক তাকিয়ে বসে আছে নিরব। নিস্তব্ধ রাতের মতোই শান্ত হয়ে আছে তার মন। যার প্রধান কারণ তাপসি। তখন আসার সময় গাড়িতে বসে তাপসির সাথে কথা হয়েছে তার। এতো অশান্তির ভিড়ে তাপসিকে বউ রূপে দেখে কিছুটা শান্তি পেয়েছে সে। কারণ তাপসি তার সম্পর্কে সবই জানে, তাই ওকে আর কিছুই বুঝিয়ে বলতে হবে না। অন্য মেয়ে হলে আরও অশান্তি বাড়ত তার।
সহসা ছাদের দরজায় তাপসিকে দেখে কপাল কুঁচকে গেল তার। তাপসি তার দিকেই ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে। নিরবের সামনে এসে বলল,

“ একটু বসতে পাড়ি? ”
“ এখানে কেন এসেছো? তোমাকে না ঘুমিয়ে যেতে বলেছিলাম। ”
নিরবের কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল তাপসি। নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে নিরবের পাশে বসল। বলল,
“ আমিই মনে হয় এ জগতে একমাত্র বউ, যার বিয়ের রাতে তার স্বামী তার কাছে যায়নি বরং সে নিজেই স্বামীর কাছে এসেছে। ”
কিছু বলল না নিরব। যেভাবে ছিলো ঠিক সেভাবেই বসে রইল। তাকে চুপ থাকতে দেখে তাপসি বলল,

“ আপনি আনিকাকে কতো বছর ধরে ভালোবাসেন তা আমি জানিনা। ভালোবাসা যতোদিনেরই হোক তা ভুলা খুবই কঠিন। আমরা একজন মানুষকে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবাসে ফেলি, অথচ তাকে ভুলে যাওয়ার অগণিত কারণ থাকলেও তাকে ভুলতে পারি না। আমি কখনো বলবো না আপনি আনিকাকে ভুলে যান, কারণ ভুলে যাওয়ার খেলাটায় আমরা মানবজাতিরা সবসময় পরাজিত সৈন্য। যাকে নিয়ে ভাববো না বলে পণ করি- তাকে নিয়েই আমাদের মস্তিষ্ক মেতে থাকে সর্বদা। অথচ সেই মানুষটার মস্তিসের এক কোণায়ও আমাদের স্থান নেই।

এইযে দেখুন না, আমার কথাগুলো আপনি শুনছেন কিনা এটাও সন্দেহ অথচ আমি নিজের মস্তিষ্কের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের কথা থামাতে পারছি না। আপনি আমায় ভালোবাসুন বা বউ হিসেবে দেখুন সেটা আমি কখনোই চাইবো না। শুধু এইটুকু চাইব, আপনি আমাকে নিয়ে অস্বস্তি অনুভব করবেন না। আমার উপস্থিতি আপনাকে পীড়া দেক সেটা আমি কখনই চাইনা। আপনি চাইলে আমি অন্য রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো তবুও আপনি রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ুন। সব সম্পর্ক মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে আমাকে নিজের বন্ধু ভাবতে পারেন। তাহলে হতে পারে আপনি কমফোর্ট ফিল করবেন। ”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯

বলেই উঠে পরল তাপসি। তার যাওযার পানে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইল নিরব। অতঃপর কিছু একটা ভেবে সেও রুমে চলে গেলো। সে রুমে আসতেই রুম থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল তাপসি। তবে তাকে বাধা দিয়ে নিজের বিছানাতেই শুতে বলল নিরব। তাদের মধ্যকার দূরত্বের মতোই দূরত্ব বজায় রইল তাদের মনের। এ দূরত্ব কী মিটবে আদৌ?

অকস্মাৎ প্রণয় শেষ পর্ব