অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪১+৪২
সাজিয়া জাহান সুবহা
অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। উপস্থিত দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ ব্যাতিত অন্য কোনো শব্দ নেই। নেই কিচ্ছুটি চোখে পড়ার মতো ক্ষীণ আলোর দেখাটুকু-ও৷ কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে এই গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে নিজের সম্মুখে দন্ডায়মান যুবকটার অবয়ব একদম স্পষ্ট ভাবে চোখে পড়ছে কিশোরী মেয়েটির। ফ্যালফ্যাল নয়নে সে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে যুবকটির দিকে। তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে যুবকটি৷ পিছাতে গিয়ে শক্তপোক্ত কিছুর সাথে আটকে গেলো কিশোরী। সঙ্গে সঙ্গে অস্থির চিত্তে হাসফাস করে উঠলো তার ছোট্ট দেহশ্রী৷ ঢিপঢিপ শব্দ তুলে লাফাতে লাগল হৃদযন্ত্র। উত্তেজনায় ঘাম জমেছে নাকে,থুতনিতে।
ঘন ঘন পলক ঝাপটিয়ে যেই পুণরায় চোখ তুলে চাইল, অমনি মানুষটাকে তার অতি সন্নিকটে দেখে চমকে উঠলো। বাদামি মণির গভীর দৃষ্টি নাড়িয়ে তুলল তার সর্বাঙ্গ। তাকে আরও বিব্রত করে তুলতে শক্তপোক্ত হাতের আদলে গোলগাল মুখশ্রীটি তুলে নিল যুবকটি। ফুলোফুলো গালদ্বয়ে বৃদ্ধ আঙ্গুল চেপে টেনে নিলো কাছাকাছি। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় টালমাটাল হলো কিশোরী। অদ্ভুত অনুভূতি-তে গুলিয়ে যাচ্ছে সব। মাথা ঘুরছে ভনভন করে। সম্মুখের সুদর্শন মুখশ্রীর মানুষটা নিজের পাতলা অধর নেড়ে কিছু একটা বলল বোধহয়। যা কর্ণগোচর হলোনা কিশোরীর৷ বিমূঢ়, ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল, নিজের মুখের সঙ্গে সুদর্শন মুখটা ছুঁইছুঁই হয়ে আসছে। কিঞ্চিৎ ভয়, ভরপুর উত্তেজনায় গালের উপর থাকা শক্তপোক্ত হাত দুটো খামচে ধরলো সে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ভিতরের অস্থিরতা টুকু দমাতে না পেরে চোখ খিচে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ধরাম শব্দ তুলে তার দেহটি আছড়ে পড়লো কোথাও৷ চট করে চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো ঝকঝকে সাদা টাইলসের উপর৷ কোমরের নিচে পেঁচিয়ে আছে পাতলা চাদর। কনুই এবং কোমরে ব্যাথা উপলব্ধি করতেই ঘোর কাটলো সায়েরীর। খেয়াল হলো স্বপ্ন দেখছিল সে এতোক্ষণ। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে লম্বা দম নিলো সে। হাত পা ছড়িয়ে সেভাবেই শুয়ে পড়লো ঠান্ডা ফ্লোরে। রুমের পাখা বন্ধ। বাতি জ্বলছে না। অর্থাৎ বিদ্যুৎ নেই। ভেপসা গরমে ঘেমে উঠেছে সে। পুণরায় চোখে বুজে আপসা ঝাপসা স্বপ্নটার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুদর্শন সেই চেহারার যায়গায় সাফওয়ানের চেহারা ভেসে উঠতেই চট করে বসে পড়লো সে। উচ্চ কন্ঠে বলে উঠলো, ‘ আসতাগফিরুল্লাহ্! ‘
চট জলদি ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। পায়ে, কোমরে এলোমেলো ভাবে পেছিয়ে থাকা চাদরটা খুলে বিছানায় ছুড়ে মারলো। বিগত কয়েক দিন যাবত নিজের ভাবনা, চিন্তা, অনুভূতি সব কিছুর তালগোলে দিশেহারা অবস্থা তার। নিজের সাথে কি হচ্ছে বুঝে উঠতে পারছে না। সাফওয়ান ভাই নামক কাটখোট্টা মানবটা সর্বক্ষণ ঘুরে বেরাচ্ছে মন, মস্তিষ্কে। এখন আবার তার সবচেয়ে পছন্দের ঘুম নামক ক্রিয়ায় বাগড়া দেওয়া শুরু করেছে। বেহুদা স্বপ্নে হানা দিয়ে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। এই নির্যাতন মেনে নেওয়া যায়! রাগে, দুঃখে বিড়বিড় করে বেশ কিছু কথা শোনাল সে সাফওয়ানকে। বিরক্ত মুখেই ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য৷ এই মুহূর্তে আর ঘুম হবে না তা জানা আছে তার। তাই ফ্রেশ হয়ে বেজার মুখে হেলেদুলে উপস্থিত হলো ডাইনিং স্পেসে। দুই গৃহিণী, কর্তা দুজন সহ আবরার এবং মিনহা উপস্থিত সেখানে। মিনহাকে স্কুল ইউনিফর্মে পরিপাটি অবস্থায় দেখে সায়েরী অনুমান করলো এখন সকাল সাতটা কিংবা সাড়ে সাতটা বাজে। কারণ আট’টায় ক্লাস থাকে মিনহার। এতো সকালে ঘুম থেকে উঠেছে বলে নিজেই অবাক হলো। উপস্থিত সকলের মধ্যে সবার আগে মিনহার নজর পড়লো সায়েরীর উপর। গরম গরম আলুভাজি’র সাথে এক টুকরো পরোটা মুখে দেওয়া মাত্র সায়েরীকে দেখে বেচারি বিষম খেয়ে চিৎকার করে উঠলো,
‘ আআআআ আ আ ভূওওওওত!!! ‘
তার আকষ্মিক চিৎকারে চমকে উঠলো উপস্থিত সকলে। মিনহার দেখাদেখি সায়েরীর উপস্থিতিতে তারাও ভড়কে গেলো। সকলের এমন তাজ্জব দৃষ্টি দেখে হকচকিয়ে গেলো সায়েরী। মিনহা আবরারের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ বড় ভাইয়া! আমি যা দেখতে পারছি তুমিও কি সেটা দেখছো? ‘
বিষ্ময়ের রেশ নিয়েই আবরার জবাব দিলো, ‘ তাই তো মনে হচ্ছে। ‘
সায়েরী বুঝতে পারলো সকলের মনোভাব। খানিকটা বিব্রতবোধও করলো। তবুও বিশেষ পাত্তা না চেয়ার টেনে বসল আবরারের পাশে৷ থমথমে মুখ করে বললো,
‘ আম্মু, আমাকে দেখা শেষ হলে নাশতা দাও। ‘
মেহরিন বেগম সামলে নিলেন নিজেকে। তবুও ঠাট্টার সুরে বললেন,
‘ আজ কি সূর্য দক্ষিণে উঠলো নাকি? ‘
আবরারের বাবাও তাল মিলিয়ে জবাব দিলেন,
‘ আমার তো মনে হচ্ছে সূর্য এখনো উঠেইনি। নাহলে এই চাঁদমুখ এই ভোরে দেখার সুযোগ হয়! তাও বিনা ডাকাডাকি-তে! ‘
সায়েরীর থমথমে মুখ আরও গম্ভীর হলো। ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
‘ আশ্চর্য! একটা দিন কি ঘুমের এদিক সেদিক হতে পারে না নাকি? এমন করলে কিন্তু আমি খাব না বলে দিলাম। ‘
আবরার ঠেশমারা কন্ঠে খেতে খেতে জবাব দিলো,
‘ দুনিয়ায় সব মানুষের ঘুমের এদিক সেদিক হলেও আমাদের বাসার কুম্ভকর্ণটার হয়না। আজ হলো কেনো তবে? এটা তো অষ্টম আশ্চর্যের বিষয়! ‘
মিনহা মাথা নেড়ে বললো, ‘ হুম, হুম সহমত। সহমত। ‘
মিনহার মাথায় সজোরে চড় পড়লো। বড়রা মিটিমিটি হাসছে। সায়েরী কথা বাড়ালো না। থমথমে মুখে খাবার মুখে তুলতে লাগলো। এর মাঝেই আবরার তাকে পরখ করে নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ ব্যাপার কি বলতো? এতো বছরে ধরে বেধে যে অভ্যাস আমরা করাতে পারলাম না। সেটা হুট করে নিজ থেকে এক্সিকিউট হলো কি করে? হয়েছে কি? ‘
বিরক্ত চোখে তাকালো সায়েরী। জবাব দিলো না কোনো। মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘ কি হয়েছে আমার? ‘
বিদ্যুৎতের দেখা নেই। সূর্যের প্রখরতায় অতিষ্ঠ হয়ে আছে চারপাশ। ভেপসা গরমে গা জ্বলছে সায়েরীর। সময় এখন ন’টা। দশটায় ক্লাস আছে। হাতে সময় আছে বলে চটজলদি স্নান সেরে নিল সে। এবার গিয়ে একটু আরাম লাগছে। অফ হোয়াইট জিন্সের সাথে মেরুন লং টি-শার্ট পড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো সে। চুল থেকে ভেজা তোয়ালে খুলে ছুড়ে মারলো রুমের এক কোণায় টেবিলের পাশে থাকা চেয়ারটার উপর। এলোমেলো ভেজা চুল নেড়ে ড্রেসিংয়ের দিকে পা বাড়ালো। বেখেয়ালিতে হুট করে ধাক্কা লাগলো কিছুর সাথে৷ মুখ থুবড়ে পড়তে গিয়েও বাধা পড়লো কারো শক্তপোক্ত হাতের বন্ধনে। বিষ্ময়কর চোখে তুলে তাকাতেই চির পরিচিত মুখখানা দেখতে পেয়ে থমকে গেলো সে। জমে গেলো সে স্থানে। তার সরু কোমরে লেপ্টে থাকা পুরুষালি হাতটা নেড়েচেড়ে উঠলো। সায়েরীর দেহের সবটুকু ভার নিজের আয়ত্তে নিয়ে সোজা করে দাঁড় করালো তাকে। কিন্তু কোমর ছাড়লো না। বরং কাছে টেনে গুছিয়ে নিলো দুরত্ব। সদ্য স্নান করা স্নিগ্ধ, সিক্ত মুখশ্রীতে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলগুলো আঙুলের সাহায্যে সরিয়ে দিলো সে। ডাগরডাগর চোখজোড়ার বিষ্ময় ভাব দেখে স্বভাবগত ভাবেই এক টুকরো হাসি ফোটাল অধর কোণে। নিজের চেয়ে অত্যাধিক খাটো মেয়েটার বিমূঢ় দৃষ্টি উপেক্ষা করে মুখ নামিয়ে আনলো কানের কাছে। উত্তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ফিসফিস কন্ঠে সুধাল,
‘ বলেছিলাম না, এমন ডার্ক কালার পড়ে, খোলা চুলে কখনো সামনে না! এখন যদি নিষিদ্ধ কিছু করে ফেলি, তাহলে দায়ভার কে নিবে, বলতো? ‘
মানুষটার ছোট ছোট স্পর্শে, ঘাড় ছুঁয়ে যাওয়া উত্তপ্ত শ্বাসে সর্বাঙ্গে কম্পনের সৃষ্টি হলো সায়েরীর। শ্বাস আটকে আসছে কানের কাছে ফিসফিস কন্ঠস্বরটা শুনে। টালমাটাল অনুভূতির জোয়ারে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে সে। এমন সময় খট করে দরজা খোলার শব্দ আসলো কানে। ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো চট করে চোখ মেলে তাকাতেই মেহরিন বেগমকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো সায়েরী।
‘ এমন হাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? সেই কখন থেকে ডাকছি। নে ধর তোর মোবাইল। নাজরাত ফোন করেছে। কথা বল। ‘
সচকিত নয়নে রুমের আনাচে কানাচে চোখ বুলালো সায়েরী। নেই , কোথাও সেই মানুষটার দেখা নেই। রুমের দরজা খুলে এই মাত্র তার মা ঢুকেছে। অর্থাৎ সবটা ভ্রম ছিলো! জেগে জেগে কিনা দিবাস্বপ্ন দেখছিল সে! নিজের অস্বাভাবিক কর্মকান্ডে এবার কান্না পেয়ে গেলো তার। অন্যদিকে মোবাইলের অপর প্রান্ত হতে নাজরাতের কন্ঠ ভেসে আসছে,
‘ হ্যালো? সায়ু! আরে কি সমস্যা কথা বলছিস না কেনো? ‘
অতি মাত্রায় অতিষ্ঠ, বিরক্ত, তিক্ত হয়ে সায়েরী চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ পাগল হয়ে গিয়েছি আমি। এই হলো সমস্যা। শুনেছিস? হয়েছে শান্তি? এবার সমাধান দে পারলে। ‘
ফোনের অপর প্রান্তে নাজরাত তাজ্জব বনে গেলো এমন উত্তর পেয়ে। আশ্চর্য হয়ে ভাবলো, এই মেয়ের আবার কি হলো?
মাত্র দুই দিন আগেই পরীক্ষা শেষ হয়েছে সকলের। দুইটা দিন গেপ দিয়ে আজ পুণরায় হাজির হয়েছে কলেজে। আয়ান এবং সাফ্রিন ব্যাতিত বাকিদের পরীক্ষা খারাপ হয়েছে খুব। যাকে বলে মাত্রাতিরিক্ত খারাপ। সাফওয়ানকে নিয়ে উদ্ভট চিন্তা ভাবনায় সায়েরী যেই একটু সিরিয়াস হয়েছিলো, সেটাও গুলিয়ে ফেলেছে এক্সাম হলে। সদ্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নাজরাত পড়াশোনা থেকে মন তুলে সেখানে যত্ন করে ঠাই দিয়েছে সাদিফকে। নতুন নতুন প্রেমানুভূতির মাঝে পড়াশোনা গুলিয়ে ছুঁড়ে মেরেছে একপাশে। তোহা এবং ফায়াজের কাহিনি অনেকটা একই বলা চলে। ভালোবাসার মানুষটার কাছাকাছি থেকেও নিজের অনুভূতি বোঝাতে না পেরে ভিতরে ভিতরে গুমরে মরছে দুজন। এসবের মাঝে পড়াশোনায় মন বসবে কি করে! আর নুহাশ….তার কথা নাহয় আপনারাই বুঝে নিন।
পরপর চারটা তিনটা ক্লাসের পর একঘেয়েমি লাগায় ক্লাস থেকে বেরুনোর জন্য চুকচুক শুরু করলো সায়েরীর ছটফটে মন। বাকিদেরও আজ ক্লাসের মানসিকতা নেই। ফলস্বরূপ সকলেই বেরিয়ে আসলো ক্লাস থেকে। সকলে কেমন ঝিমিয়ে আছে ভেতরে ভেতরে। যার কারণে আড্ডাও জমলো না ঠিকঠাক। দীঘির পাড়ে এলোমেলো হয়ে বসে রইলো সাতজন। সকলের এমন গম্ভীর্য সায়েরীর মন আরও বেজার হয়ে উঠলো। ব্যাগ তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো সে৷ ছোট্ট করে বললো,
‘ তোরা থাক। আমি ক্যান্টিন থেকে আসি। ভালো লাগছে না, খিদে পেয়েছে। ‘
পরপর উঠে দাঁড়ালো আয়ানও। বেশ অনেকদিন ধরেই সায়েরীর সাথে কিছু বিষয় নিয়ে খুলাখুলি আলাপ করতে চাচ্ছিল সে৷ কিন্তু সময়,সুযোগ হয়ে উঠেনি। আজ সুযোগ পেয়েছে বলে হাতছাড়া করতে চাইলো না সে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুদের দৃষ্টি সীমার অতিক্রম করতেই মুখ খুললো আয়ান। অত্যন্ত স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
‘ তুই কি সাফওয়ান ভাইকে পছন্দ করিস, সায়ু? ‘
প্রশ্নটা শুনে হঠাৎ করেই থমকে গেলো সায়েরীর পদযুগল। তার দেখাদেখি আয়ানও থেমে গেলো। সায়েরী অবাক নয়নে তাকালো আয়ানের দিকে। আমতাআমতা করে বললো,
‘ ক..কিসব বলছিস? হঠাৎ এটা কেনো মনে হলো তোর? ‘
‘ মনে হয়েছে বলেই বলছি। শুধু তোর না, সাফওয়ান ভাইকে নিয়েও অনেক চিন্তা ভাবনা আছে৷ ‘
‘ ম..মানে? ‘
‘ আমাদের এক্সামের আগে, দ্বিতীয় তলার দক্ষিণের ছাদে তোর সাথে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন তোকে নিয়ে সাফওয়ান ভাইকে অনেক বেশি ডেস্পারেট হতে দেখেছি আমি। উনার চোখে মুখে যে হারানোর আতঙ্ক ছিল, সেটা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম। এর আগে কখনো , অন্য কারো প্রতি এমন ডেস্পারেট আচরণ দেখিনি আমি। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল, সাফওয়ান ভাই তোর প্রতি দুর্বল। ‘
হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আয়ানের কথাগুলো শুনছে সায়েরী। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার বুকের বাঁ পাশে। অস্থির চিত্তে লাফাচ্ছে হৃদপিণ্ড। ধুকপুকানির শব্দ স্বয়ং নিজে শুনতে পাচ্ছে৷ আয়ানের কথার বিপরীতে সে জোর গলায় বলতে পারলো না কিছু৷ কারণ ছোট ছোট কিছু ব্যাপার সেও লক্ষ্য করেছে৷ সাফওয়ানের পরিবর্তিত রূপ তাকেও ভাবতে বাধ্য করেছে। সায়েরীকে নিশ্চুপ দেখে আয়ান পুণরায় বলে উঠলো,
‘ বান্দরবানের সেই ইন্সিডেন্ট টার পর তুই আমাদের চেয়েও বেশি সাফওয়ান ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিস। এটাকে খারাপ বলছি না, পরিস্থিতি-টাই এমন ছিল যে তুই সাফওয়ান ভাইকে সবার উর্ধ্বে গিয়ে ভরসা করতে বাধ্য হয়েছিস। কিন্তু তার পরবর্তী দিনগুলোতে তোর পরিবর্তন অন্য কারো নজরে না পড়লেও আমার নজরে পড়েছে। তুই আমার কাছে স্বচ্ছ আয়নার মতো সায়ু। বিগত দিনগুলোতে তুই অনেকটা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিস। বাকি কথা বাদ দিলাম। আমাদের এক্সাম শুরু হওয়ার ঠিক একদিন আগে, ইম্পর্ট্যান্ট নোটস গুলো আমার কাছ থেকে নেওয়ার জন্য কলেজে আসার কথা ছিল তোর৷ তুই আসিসনি বলেই কলেজ ছুটির পর আমি তোর বাসায় গিয়েছিলাম। তোর বাসার সামনের রোডে সাফওয়ান ভাইয়ের গাড়ি থেকে নামতে দেখেছি তোকে। কলেজে না এসে তুই সাফওয়ানের ভাইয়ের সাথে ছিলি ব্যাপারটা কি চোখে লাগার মতো না? সেই মানুষটার সাথে ছিলি যাকে তুই ভরসা করলেও সহ্য করতে পারিস না। তোর দিকটা আমার কাছে অনেকটা ক্লিয়ার। কিন্তু সাফওয়ান ভাইয়ের মতো মানুষের সবটা বুঝে উঠা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই আমি শুধু এটুকু জানতে চাচ্ছি, সাফওয়ান ভাই কি তোকে কোনোভাবে প্রেসারাইজ করেছে? জোর করে নিজের সাথে নিয়েছে এমন কিছু? ‘
আয়ানের কথা শুনতে শুনতে একপ্রকার ঘোরে ডুবে গিয়েছিল সায়েরী। কিন্তু শেষের বাক্যটুকু শুনে হুশে ফিরল সে। দ্রুত মাথা নেড়ে জবাব দিলো,
‘ মোটেও না। উনি আমাকে এমন কিছুর জন্য কখনোই জোর করেনি। রেগেমেগে অনেকবার অপমান করেছে ঠিকই। কিন্তু নিজের স্বার্থে কখনোই জোর জবরদস্তি করেনি৷ ‘
সায়েরীর দৃঢ় কন্ঠস্বর শুনে আয়ান অবাক হলো। এতো বছরের বন্ধুত্বে আজ অবধি এমন বিশ্বাস সে হয়তো নিজের জন্যও কুড়াতে পারেনি। পরক্ষণে আবার মাথা নেড়ে বললো,
‘ সেটা হলেই ভালো। আচ্ছা, সেসব কথা থাক। আমি জানতে চাইব না তুই উনার সাথে কোথায় গিয়েছিলি। আমাকে শুধু এটুকু বল, তুই কি সাফওয়ান ভাইকে পছন্দ করিস? ‘
অস্বস্তিতে হাসফাস করে উঠলো সায়েরী। আমতাআমতা করেও জবাব দিতে পারলো না কোনো। আয়ানের সাথে কখনোই এধরণের আলোচনা হয়নি তার। আয়ান হয়তো বুঝতে পারলো তার মনোভাব। মুচকি হেসে সায়েরীর মাথায় হাত রাখলো সে। আশ্বস্ত কন্ঠে বললো,
‘ আমি তোকে কোনো কিছুর জন্য প্রেসারাইজ করছি না সায়ু। বড় হয়েছিস। তোর পারসোনাল ব্যাপারে এভাবে বলার কোনো অধিকার আমার নেই, সেটা আমি জানি। কিন্তু বাধ্য হয়েই জানতে চাইছি। তোর একটা উত্তরের উপর অন্য একজনের লাইফ ডিপেন্ড করে আছে। তাই সরাসরি বলে দে। তুই পছন্দ করিস সাফওয়ান ভাইকে? ‘
আয়ানের বাধ্যবাধকতার মানে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না সায়েরী। কিন্তু মুখ ফুটে যে কিছু জানতে চাইবে সেই ইচ্ছে শক্তিও পেলো না সে। কারণ আয়ানের করা প্রশ্নটাতেই আটকে পড়েছে সে। কি বলবে বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে। তার তো জোরগলায় না বলে দেওয়া দরকার। কিন্তু কোথাও একটা বাধা পড়ছে এই শব্দটা। নিজের সাথে নিরব যুদ্ধে হার মেনে সে অসহায় কন্ঠে বললো,
‘ জানিনা। কিচ্ছু জানি না। আমি…আমি বুঝতে পারছি না কিছু। ‘
আয়ান আশাহত হল এমন উত্তরে। সে আশা করেছিলো পুরোদমে ‘না’ শুনার। কারণ তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুটা যে এই মেয়েটার উপর নির্ভর করে আছে। আশা করে আছে একটা সুন্দর, সম্পর্ক গড়ার৷ বন্ধুত্বের বাইরে গিয়ে দুজন প্রেমিক যুগল হয়ে উঠার। কিন্তু সায়েরীকে দ্বিধায় ভুগতে থেকে আয়ানের মন ক্ষুন্ন হলো খুব। স্পষ্ট চোখে লাগলো সাফওয়ানের প্রতি সায়েরীর দুর্বলতা। নয়তো মেয়েটা স্পষ্ট কন্ঠে নাচক করতে পারলো না কেনো!
আয়ানের ভাবনার মাঝে হুট করে নজর গেলো তাদের থেকে কয়েক হাত দুরত্বে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার উপর। অন্যকেউ নয়। বরং ফায়াজ দাঁড়িয়ে আছে। তার অনুভূতি হীন দুই চোখ সায়েরীর চোপসানো মুখশ্রীতে নিবদ্ধ। আয়ান নড়েচড়ে দাঁড়ালো। বুঝে উঠতে পারলো না ফায়াজের মনোভাব। তিনজনের নিরবতা ভেদ করে ফায়াজের পেছন থেকে ব্যাস্ত পায়ে এগিয়ে আসলো সাফ্রিন। প্রথমে ফায়াজ এবং পরবর্তীতে আয়ান এবং সায়েরীকে লক্ষ্য করে ভ্রুঁ কুঁচকালো সে।
‘ তোদের আবার কি হলো? স্ট্যাচু হয়ে আছিস কেনো সবাই? তোরা দুজন ক্যানটিনে না গিয়ে এখানে কি করছিস আয়ান? ‘
আয়ান ফায়াজের দিকে দৃষ্টি রেখেই জবাব দিলো,
‘ তুই গেলে যা ওর সাথে। আমার একটু ফায়াজের সাথে কথা আছে। ‘
‘ আমি তো লাইব্রেরি যাচ্ছি। সায়ু যাবি আমার সাথে? না আগে ক্যানটিনে… ‘
সায়েরী দ্রুত মাথা নেড়ে বিষন্ন গলায় বললো,
‘ ক্যানটিনে যেতে হবে না। লাইব্রেরিতে চল। কিছুক্ষণ বসবো। ‘
দুজন প্রস্থান করতেই ফায়াজের পাশে এসে দাড়ালো আয়ান। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,
‘ বলেছিলাম আমি, সময় থাকতে ওকে নিজের কথা জানিয়ে দে। দেখলি তো কি হলো? ‘
কপালে ভাঁজ ফেলে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
‘ কি হয়েছে? ও কি বলেছে সাফওয়ান ভাইকে পছন্দ করে বলে? ‘
‘ মানা ও করেনি। ‘
‘ এক্সেক্টলি। অর্থাৎ আমার হাতে এখনো সময় আছে। কিন্তু এবার আর দেরি নয়। ওকে নিজের করেই ছাড়বো। ‘
ফায়াজের কন্ঠের তেজ দেখে মুখশ্রী গম্ভীর হলো আয়ানের। গমগমে গলায় বললো,
‘ তোকে সুযোগ দিয়েছি ঠিকই। কিন্তু সায়ু না চাইলে তুই ওকে জোর করতে পারবি না, ফায়াজ। এমন কিছু করলে কিন্তু আমি সহ্য করবো না। কনফেশন কর, প্রথম বারে না বুঝলে পরের বারে বুঝা। কিন্তু জোর করে নিজের করার চেষ্টা করবি না। আমি ওয়ার্ন করছি তোকে। কথাটা মাথায় থাকে যেন। ‘
নিজের কথা শেষ করেই স্থান ত্যাগ করলো আয়ান। ফায়াজ তখনো ঠাই দাঁড়িয়ে। কেন জানি মনের ভিতরের সুপ্ত একটা ক্ষোভ জমেছে তার সায়েরীর প্রতি। মনে হচ্ছে অন্য দশটা মেয়ের মতোই সাফওয়ানের রূপ,লাবন্য, অর্থ,সম্পদ এসব দেখেই সায়েরী গলে গেছে। নয়তো সায়েরী কেনো সাফওয়ানকে পছন্দ করতে যাবে? যে মানুষটা সায়েরীকে পদে পদে এতোবার হেনস্তা করলো, তার প্রতি দুর্বল হবার অন্য কোনো কারণ খুঁজে পেলো না ফায়াজ। যার কারণে সায়েরীর উপর চাপা রাগের উৎপত্তি ঘটলো মনে। মেয়েটা সর্বাক্ষণ কাছাকাছি থেকেও ফায়াজের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করলো না। এতোগুলো বছরের বিশ্বাস, বন্ধুত্ব সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে বান্দরবানের তিনটা দিন পালটে দিলো সব! ফায়াজ মানতে পারলো না নিজের এই ব্যার্থতা। বিক্ষিপ্ত মনে স্থির করলো, সায়েরীকে নিজের করেই নিবে সে। বুঝিয়ে দিবে, সাফওয়ানের অর্থবিত্ত, বাহ্যিক সৌন্দর্য এসবের চেয়েও ফায়াজের অনুভূতির জোর বেশি৷ সায়েরীকে একথা বোঝাবে সে। বুঝতেই হবে।
লাইব্রেরি রুমে প্রবেশ করা মাত্র চিরপরিচিত পুরুষালি সুঘ্রাণ-টা নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই স্থির হয়ে গেলো সায়েরী। সতর্ক চোখে আশেপাশে তাকালো। হাতে গুনা কয়েক জন স্টুডেন্ট বসে আছে ভিন্ন ভিন্ন যায়গায়। লম্বা লম্বা সেল্ফ গুলোর আড়ালেও কেউ আছে কি না বুঝা গেল না। কিন্তু জেন্টস পারফিউমের এই সুঘ্রাণ নাড়িয়ে তুলছে তার ভেতরতা। সাফ্রিনের ডাকে ঘোর কাটলো। মাথা ঝেড়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ হ্যালোসিনেশন হচ্ছে সায়ু, হ্যালোসিনেশন। ভুলে যা সব। সে নেই এখানে। ‘
মাঝামাঝি একটা টেবিলে গিয়ে ব্যাগ রাখল দুজন। সাফ্রিন এসেছে প্রয়োজনীয় দুটো বইয়ের সন্ধানে। সায়েরীকে বলল খুঁজে দিতে বই দুটো। অগত্যা চেয়ার ছেড়ে সেল্ফের দিকে এগিয়ে গেলো সায়েরী। লাইব্রেরি রুমটা তুলনামূলক বড়। আঁকাবাঁকা ভাবে প্রায় ১০-১২ টা মতো বিশাল বিশাল সেল্ফ দন্ডায়মান এক এক যায়গায়। পরপর দুটো সেল্ফে খোঁজার পর তৃতীয়-টা তে গিয়ে সাফ্রিনের বলা একটি বইয়ের সন্ধান মিলল। সায়েরী হাত বাড়িয়ে নামাতে উদ্যত হলো বইটি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বইটি তার নাগালের চেয়ে খানিকটা উঁচু স্থানে রয়েছে। পায়ের পাতা উঁচু করে সায়েরী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালো তা হাসিল করার। ঠিক তখনই তার ছোট্ট হাতখানা ছুঁয়ে পুরুষালি লোমশ একখানা হাত নামিয়ে আনলো বইটি।
সায়েরী স্তব্ধ হলো কিছু সেকেন্ডের জন্য। মন মাতানো সুগন্ধ-টি এবার তীব্রভাবে নাসারন্ধ্রে ঝংকার তুলছে। কৌতুহলী চিত্তে চট করে ঘাড় ফিরালো সে। সরাসরি দৃষ্টি পড়লো বাদামি চোখজোড়া’র গভীর দৃষ্টিতে। মাত্র ইঞ্চি দুয়েক দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। ডার্ক গ্রীন কালারের ফুল হাতা টি-শার্ট-টা-টা তার গৌড় বর্ণের দেহে জ্বলজ্বল করছে যেন। সায়েরী মুগ্ধতায় ডুবতে গিয়েও দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। বরং পরপর সাফওয়ানকে নিয়ে মস্তিষ্কের এই ভ্রম ভ্রম খেলায় চরম বিরক্ত হলো সে। এক ঝটকায় পুরোপুরি পেছন ঘুরে মুখোমুখি হলো সাফওয়ানের। তার ভাবনার এই সুদর্শন সাফওয়ান তখন বই হাতে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার বিরক্তি ভবা মুখটার দিকে। বোধহয় কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগটা তাকে দিলো না সায়েরী। চোখের পলকে হুট করে খামচে ধরলো সাফওয়ানের বুকের কাছের টি-শার্ট। টেনে আনলো নিজের দিকে৷ আকস্মিক এমন থাবা পড়ায় সাফওয়ান আপনাআপনি ঝুঁকে গেল। বিষ্ময় খেলে গেল তার চোখে মুখে। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর দিল সায়েরী। বরং সাফওয়ানকে নিজের দিকে টেনে সে ঝাঁঝালো কিন্তু চাপা স্বরে ধমকে উঠলো,
‘ সমস্যাটা কি আপনার হ্যাঁ? ‘
সায়েরীর আকস্মিক আক্রমণে সাফওয়ান নিজের ভারসাম্য রক্ষার্থে একহাতে সেল্ফে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখজুড়ে আকাশ সমান বিষ্ময় ভাব। তন্মধ্যে সায়েরী এহেন বাক্যে ভড়কে গেলো সে। অবাক কন্ঠে আওড়াল,’ আমার সমস্যা!! ‘
কথাটায় যেন রাগে ঘি পড়লো। সায়েরী আগের চেয়েও দ্বিগুণ তেজ নিয়ে ফুঁসে উঠলো,
‘ আলবাত আপনার সমস্যা৷ পেয়েছেন টা কি আপনি আমাকে হ্যাঁ? আগে স্কুল, কলেজে ধমকা ধমকি করে শান্তি দেন নি। এখন নরম, গরম হয়ে শান্তি দিচ্ছেন না। আপনি জানেন আপনার এই গিরগিটির মতো পালটে যাওয়া রূপ আমাকে কতটা অশান্তি দিচ্ছে? না ঘুমিয়ে শান্তি পাচ্ছি, না জেগে থেকে শান্তি পাচ্ছি। সব যায়গায় আপনার এই ভালোমানুষি কল্পনা জল্পনা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। অসহ্য লাগছে সব। ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। দম নিলো বড় বড়। সম্মুখে অবস্থানরত সাফওয়ান স্তব্ধ মুখে দাঁড়িয়ে। সায়েয়ী মনের কথাগুলো উগলে দিয়ে গাল ফুলিয়ে হাত নামিয়ে নিলো সাফওয়ানের টি-শার্ট হতে। নিজের এই কল্পনা জল্পনায় অতী মাত্রায় ডিস্টার্ব হয়ে আছে সে। চুপসানো মুখে মাথা উঁচিয়ে পুণরায় চাইল স্তব্ধ, বিমূঢ়, প্রশ্নবিদ্ধ, গভীর চোখগুলোর দিকে। ঘোর লেগে যায় এই দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়লেই। মন, মস্তিষ্কের এই যুদ্ধে এবার হাঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। দু’হাতে মুখ ঢেকে পিঠ ঠেকাল সেল্ফের সঙ্গে। একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে আকুতিভরা কন্ঠে বললো,
‘ এভাবে তাকাবেন না, প্লিজ! ‘
একটু থেমে নিচু কন্ঠে ফের বলে উঠলো,
‘ আমার কাছাকাছি আসা বন্ধ করুন। কল্পনা হয়ে সামনে আসাও বন্ধ করুন। আমি হারিয়ে যাচ্ছি আপনার মাঝে, সাফওয়ান ভাই। আমি…আমি মেনে নিতে পারছি না এসব। এ কোন জালে আটকে ফেলছেন আপনি আমাকে! আমি মানতে পারছি না এসব। একদম পারছি না। ‘
কথা শেষ হলেও সে আগের মতোই চোখ বুজে রইলো। নিজেকে সামলে নিতে সময় নিলো কিছুটা। মনে মনে ধরেই নিলো, চোখ খুলে আর সাফওয়ানের দেখা পাবে না সে। সবটা আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এমনই তো হয়ে আসছে কিছুদিন ধরে। তাই চোখ বুজে মস্তিষ্ক হতে সাফওয়ানের এই কল্পনাটুকু মুছে ফেলার চেষ্টা চালালো সে৷ তখনই কানে আসলো সাফ্রিনের কন্ঠস্বর। ডাকছে তার নাম ধরে। ডাকতে ডাকতে সামনে এসে হাজির হয়েছে। সায়েরী দ্রুত নিজেকে সামলে হাস্যজ্বল মুখ করে ফিরে তাকালো তার দিকে। সাফ্রিন প্রয়োজনীয় বই দুটো হাতে নিয়ে সায়েরীকে বলল,’ চল যায়। ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে সায় দিল। এমন সময় পুণরায় কানে আসলো সাফ্রিনের কন্ঠস্বর, ‘ভাই! এখানে কি করছো তুমি? ‘
বাক্যটি কর্ণগোচর হতেই বিদ্যুতের গতিতে পেছন ঘুরে গেল সায়েরী। তার চেয়ে পাঁচ হাত দূরত্বে বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক টাকে দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়ল সে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হলো পরণের ডার্ক গ্রীন টি-শার্ট টা দেখে। মিনিট খানিক আগে যেমনটা সে ভেবেছিল ঠিক তেমনই। বিন্দু পরিমাণ ভিন্নতা নেই কিছুতে৷ ভেবেছিল! আদো কি ভাবনা ছিল সেটা? উত্তেজনায় হাতে, পায়ে কম্পনের সৃষ্টি হলো সায়েরীর। ভীত নজরে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। যে আগে থেকেই ভ্রুঁ কুঁচকে, গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিজের বিষ্ময় ভাব দমাতে না পেরে সায়েরী চিমটি কাটলো সাফ্রিনের হাতে। ব্যাথায় অস্ফুট স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো সাফ্রিন। তা দেখে সায়েরী অবিশ্বাস্য নয়নে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরলো দুইহাতে। বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ শেষ! শেষ! শেষ! সব শেষ। ‘
সাফ্রিন আশ্চর্য কন্ঠে বললো,
‘ পাগল হলি নাকি? চিমটি কাটছিস কেনো হঠাৎ? ‘
সায়েরী জবাব দিলো না কোনো। নিরব দর্শক হয়ে গভীর চোখে তাকে অবলোকন করতে থাকা সাফওয়ানের দৃষ্টি সীমার বাইরে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো সে। ডানে বামে আর তাকালো না। হতদন্ত হয়ে ব্যাগ নিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলো লাইব্রেরি রুম হতে৷ তার এমন আচরণে সাফ্রিন হতবাক। পেছন পেছন নিজেও বেরিয়ে যেতে যেতে যে হতবিহ্বল কন্ঠে বললো, ‘ হলো কি এই মেয়ের! ‘
রীতিমতো দৌড়ের গতিতে পালিয়ে দোতলার সিড়ির কাছে এসে থামল সায়েরী। হাঁটুতে ভর দিয়ে দম নিলো বড় করে। নিজের কর্মকান্ডে নিজেকেই দুই- চারটা চড়, থাপ্পড় লাগাতে ইচ্ছে হলো। এ কি করে বসলো ঘোরের বশে! সাফওয়ানকে শাসিয়েছে সে! দ্যা গ্রেট রাগের ভান্ডার সাফওয়ান খান’কে! ভাবতেই তো গলা শুকিয়ে আসছে এখন। ওই রগচটা মানব চটে গেলে তো আর আস্ত রাখবে না তার। দেখা গেলো কলার ধরে টান মারার অপরাধে মাথায় তুলে আছাড় মারলো তাকে। না না। এটা হতে দেওয়া যাবে না। সাফওয়ানের দৃষ্টির ত্রিসীমানায় ও থাকা যাবে না। কখন হুট করে যররাজের মতো উদয় হয়ে তার ঘাড় মটকে দেই কোনো ভরসা নেই। এই রিস্ক নেওয়া যাবে না। একদম না।
‘ কি হয়েছে তোর সায়ু? এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছিস কেনো? ‘
সাফ্রিন প্রশ্নের প্রতিউত্তর স্বরূপ সায়েরী হাঁপিয়ে উঠা কন্ঠে জবাব দিলো, ‘ পানি..পানি খাব। ‘
অগত্যা দুজন মিলে পা বাড়ালো ক্যানটিনের পথে৷ প্রবেশ পথে দেখা মিললো আয়ান এবং ফায়াজের সাথে৷ স্বাভাবিকভাবেই চারজন এগিয়ে গেলো একসাথে। ক্যাফেটেরিয়ার মাঝামাঝি একটা টেবিলে গোল হয়ে বসে আছে নীতি,রায়ান,জিমন এবং মিহাদ। সায়েরী এবং সাফ্রিনের দিকে চোখ পড়তেই নীতি ডাক দিলো তাদের। সর্বদা বড় বোনের মতো স্নেহ করা নীতির ডাক উপেক্ষা করতে পারলো না সাফ্রিন কিংবা সায়েরী। দুজনই এগিয়ে গেলো হাসিমুখে। নীতির কথামতো বসলো পাশে। আয়ান এবং ফায়াজ নিকটবর্তী অন্য টেবিলে বসেছে। পরপর সেখানে উপস্থিত হলো তোহা এবং নাজরাত। তারাও যোগ হলো আয়ান, ফায়াজের সাথে। নীতি, জিমন, রায়ান মিলে টুকিটাকি অনেক কথায় বললো সায়েরী, সাফ্রিনের সাথে। এর মাঝে হঠাৎ সেখানে আগমন ঘটলো সাফওয়ানের। নীতি তাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ সেই কখন আসতে বলেছি। এতক্ষণে সময় হলো তোর? ‘
সাফওয়ান গম্ভীরমুখে একপলক তাকালো নীতির পাশের চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা মেয়েটার দিকে। সাফওয়ানকে দেখেই যে জমে গিয়েছে নিজ স্থানে। ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে গোলগাল মুখখানা। চলে যেতে চাইলে নীতির জোরাজুরিতে বসে থাকতে হলো তাকে। সাফওয়ান অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিমায় টি-শার্টের হাতা গুটিয়ে এগিয়ে আসলো। চেয়ার টেনে বসলো মিহদের পাশে৷ একদম সায়েরীর মুখোমুখি হয়ে৷ সাফওয়ানের জবাব না পেয়ে নীতি পুণরায় বলে উঠলো,
‘ তুই আজকাল করিস টা কি বলতো? হাজারটা কল করেও দেখি খুঁজে পাওয়া যায়না। থাকিস কোথায় তুই? ‘
মিহাদের সামনে থেকে কোল্ড ড্রিংকের ক্যান হাতে নিলো সাফওয়ান। মুখোমুখি চেয়ারে অবস্থানরত মেয়েটার দিকে গভীর দৃষ্টি রেখে ক্যান-এ চুমুক দিতে দিতে জবাব দিলো,
‘ আছি হয়তো কারো কল্পনা জল্পনায়। এজন্যই খুঁজে পাচ্ছিস না। বুকিং হয়ে গেছি কিনা। ‘
সবে মাত্র পানির বোতলে চুমুক বসিয়েছিল সায়েরী। এমন সময় সাফওয়ানের বলা কথাটা কর্ণগোচর হতেই বিষম খেয়ে গেলো বেচারি। নাকে মুখে পানি উঠে কেশে উঠলো অস্থির হয়ে। বাকিরা চমকে উঠলো তার অবস্থা দেখে। সাফ্রিন পিঠে চাপড় মেরে শান্ত করলো তাকে। নীতির এগিয়ে দেওয়া টিস্যু খানা হাতে নিয়ে সায়েরী রসগোল্লার মতো চোখ করে চাইলো সাফওয়ানের দিকে।
যে ক্যান-এ চুমুক দিতে দিতে মিটমিটিয়ে হাসছে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সাফওয়ানের এমন কৌতুকপূর্ণ হাসি দেখে লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর। এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ইহজীবনে পড়েনি সে। ইচ্ছে করছে মাঠি ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে যেতে। ছুটে পালানোর ইচ্ছেটাও অপূর্ণ থেকে গেল নীতির জোরাজুরি তে। সে কোনো ভাবে সায়েরীকে ছাড়তে রাজি নেই। সায়েরী বুঝতে পারলো না নীতি মনোভাব। সে যে ইচ্ছে করেই বন্ধুর সামনে সায়েরীকে বসিয়ে রাখতে চাচ্ছে সেটা বুঝতে পারলে হয়তো সেই কবেই সব কিছু উপেক্ষা করে ছুটে পালাত সায়েরী। কিন্তু সিনিয়র হওয়ায় নীতিকে জোর গলায় কিছু বলতে পারছে না।
অগত্যা মুখ মুছে সে ঠাই বসে রইলো নিজ স্থানে। পুণরায় জমে উঠলো আড্ডা। একমাত্র সাফওয়ান এবং সায়েরী ব্যাতিত বাকিদের মুখ থেকে কথার ফুলঝুরি ছুটছে যেন। শান্তি প্রিয় রায়ানের সাথে বরাবরই সাফ্রিনের খুব ভাব। দুজনই টপার, ইন্টেলিজেন্ট, বই পাতায় মুখ ডুবিয়ে রাখা মানুষ। যার কারণে দুজনের ভাব মিলে খুব৷ আজও দুজন বাকিদের কথায় কান না দিয়ে নিজেদের মাঝেই এক্সাম নিয়ে সিরিয়াস ধরনের আলাপে ব্যাস্ত। তাদের কথায় নীতি মুখ কুঁচকে নিজেদের বেহুদা আলাপে ব্যাস্ত হলো। সায়েরীকে অন্যমনস্ক দেখে নীতি ডাকল তাকে। পরপর দুই বার ডাকার পরেও সায়েরীর হেলদোল হলো না দেখে এবার সে মৃদু ধাক্কা দিল কাঁধে। সায়েরী হকচকিয়ে তাকাল। তার অবস্থা দেখে নীতি হেসে উঠলো।
‘ কোথায় হারিয়ে গেলে? কখন থেকে ডাকছি। ‘
‘ খেয়াল করিনি আপু। ‘
নীতি জহুরি চোখে একবার সায়েরীর দিকে তাকালো, আরেকবার তাকালো সাফওয়ানের দিকে। সায়েরীর মুখের অপ্রস্তুত ভাব দেখে বলে উঠলো,
‘ আজকাল এতো অন্যমনস্ক হয়ে থাকো কেনো? সেদিনও এক্সাম হলের বাইরে ডেকেছিলাম, খেয়ালই করোনি। আজ আমাদের মাঝে থেকেও নেই। মনেই হচ্ছে না তুমি সেই ছটফটে মেয়েটা। কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? ‘
সায়েরী জোরপূর্বক হেসে জবাব দিলো,
‘ ন..নাহ! কোন সমস্যা নেই। ‘
নীতির বিশ্বাস হলো না সে কথা। সায়েরীর এমন জড়তা দেখে সে ফট করে বলে উঠলো,
‘ তাহলে দিন দুনিয়া ভুলে কোথায় হারিয়ে যাও? প্রেমে ট্রেমে পড়েছ নাকি? ‘
আকস্মিক এহেন বাক্যে ভীমড়ি খেলো সায়েরী। চোখগুলো ডিম্বাকৃতির ন্যায় বড় বড় করে তাকালো নীতির দিকে। ভীষণ অপ্রত্যাশিত কিছু শুনে ফেলেছে বলে চোয়াল ঝুলিয়ে হা হয়ে গেলো তার। পাশাপাশি উপস্থিত দুটো টেবিলের বাকি সদস্যরাও অবাক চোখে তাকিয়ে। নিজেকে সামলে সায়েরী আমতাআমতা করে বললো,
‘ ক..কিসব বলছো আপু। প্রেমে পড়তে যাব কেনো! ‘
নীতি ঠোঁট চেপে হেসে জবাব দিলো,
‘ পড়লেও পড়তে পারো। কলেজে কিন্তু প্রেমে পড়ার মতো অনেকেই আছে। চোখ, কান খুলে দেখো। কোনো না কোনো সুদর্শন সিনিয়র মন কেড়ে নিলেও নিতে পারে। ‘
নীতির সুক্ষ্ম ইঙ্গিত টুকু কাকে ঘিরে ছিল তা সায়েরীর ছোট্ট মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারলো না। কিন্তু কথাটা শুনে আপনাআপনি সাফওয়ানের দিকে নজর চলে গেল তার। মানুষটা নির্বিকার ভাবে মোবাইলে ডুবে আছে। অন্যদিকে নীতির কথার রেশ ধরে মিহাদ চট করে জবাব দিলো,
‘ এতো ভাবতে হবে না সুন্দরী। তুমি আমার দিকে ফোকাস করো। আই এম সোওও সিঙ্গেল। ‘
মিহাদের বলা ভঙ্গিমা দেখেই হেসে ফেললো সায়েরী। কিন্তু অস্বস্তিকর এই পরিবেশে আর বসে থাকতে পারলো না সে। ব্যাগ তুলে দাঁড়িয়ে বললো,
‘ আমাদের ক্লাস আছে আপু। যেতে হবে। ‘
নীতি আটকালো না এবার। হাসিমুখে বিদায় দিলো। সায়েরী আর তাকালো না ডানে বামে। একপ্রকার ছুটে পালালো ক্যাফেটেরিয়া হতে। পেছনে তার তিন বান্ধবী। আয়ান এবং ফায়াজ ধীর সুস্থে আসছে। বিগত মুহুর্ত গুলোতে ঘটতে থাকা সব কিছু গভীর চোখে অবলোকন করেছে দুই বন্ধু। সাফওয়ানের মতো গম্ভীর মানুষের এমন রসিকতা ভরা জবাব, সায়েরীর অযাচিত লজ্জা, সাফওয়ানের হাসি, নীতির কথা সব কিছু মস্তিষ্কে গেঁথে আছে তাদের। এসবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা। উপর থেকে যা যা দেখেছে সবটা যেন ধোঁয়াশা। ভিতরে অন্য কিছু আছে। অন্য কোনো গল্প গড়ে উঠছে তাদের দৃষ্টির অগোচরে।
আয়ান এবং ফায়াজ প্রস্থান করা মাত্র আচমকা শক্ত হাতের থাবা পড়লো মিহাদের পিঠে। আচমকা আক্রমণে লাফিয়ে উঠলো বেচারা। জ্বলে উঠলো পিঠ। থতমত খেয়ে তাকাতেই সাফওয়ান রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সুন্দরী কি? লাত্থি দিয়ে সব ভাষা ভুলিয়ে দেব৷ ‘
অনিচ্ছা স্বত্তেও পরপর তিনটা ক্লাস শেষ করে কলেজ থেকে বের হলো সকলে। অন্যমনস্ক সায়েরীর ঠিক পাশেই পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটছে ফায়াজ। আড়চোখে বারবার পরখ করছে সায়েরীকে। ক্যানটিনে অবস্থানরত অবস্থায় সায়েরীকে লজ্জায় গুটিয়ে যেতে দেখে সে ভীষণ রকমের অবাক হয়েছিল। কারণ এর আগে কখনো, কিছুর জন্য সায়েরীকে এভাবে লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে যেতে দেখেনি সে। তন্মধ্যে বারবার সাফওয়ানের দিকে চোরা চোখে তাকানো, সবকিছু ভাবতে বাধ্য করছে ফায়াজকে। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে প্রেম নিয়ে নীতির বলা কথায় সাফওয়ানের দিকে তাকানো দেখে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফায়াজের ভিতর না চাইতেও চাপা ক্ষোভ জন্মেছে সাফওয়ানের উপর। ফায়াজ ভেবে পায়না সায়েরী হঠাৎ কি দেখে দুর্বল হয়ে পড়লো সাফওয়ানের উপর? যে মানুষটার নাম শুনলেও বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলতো সে, আজ কিনা তার সামনেই অজানা কোনো কারণে লজ্জায় গাল ফুলিয়ে ছিল! এসব কিছু ফায়াজ ভিতরটা নাড়িয়ে তুলছে বারে বারে। মনে হচ্ছে তার সঙ্গে অনুচিত হচ্ছে। সে এতোগুলা বছর ধরে মেয়েটাকে যত্ন করে আসছে, অগোচরে ভালোবেসে আসছে। অথচ আজ অবধি এসব কিছু সায়েরী লক্ষ্য করার চেষ্টা টুকুও করলো না। সব ফেলে সে দুর্বল হল অপছন্দের মানুষটার উপর। বিষয় টা মেনে নিতে গিয়ে চাপা ক্ষোভে অন্তর স্থল টগবগিয়ে উঠছে তার৷
দুজনের ভাবনার সুতো কাটলো সাফ্রিনের ডাকে। সায়েরীকে ডাকছে সে নিজের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। বাকি বন্ধুদের তুলনায় সায়েরীর বাসা খানিকটা দূরে, সাথে ব্যাতিক্রম পথে বলে তাকে একাই ফিরতে হয় অধিকাংশ সময়। এজন্য প্রায়শ কেউ না কেউ এগিয়ে দিয়ে আসে তাকে। সাফ্রিনের জন্য সর্বদা তার বাবার বরাদ্দকৃত গাড়ি এবং ড্রাইভার হাজির থাকে বলে সে মাঝে মাঝে সায়েরীকে এগিয়ে দিয়ে আসে। আজও ডেকেছে এজন্য। সায়েরী নাচক করলো না। চুপচাপ এগিয়ে গেল। কিন্তু কাছাকাছি যেতেই গাড়িটা দেখে এবং ড্রাইভিং সিটের দরজার হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে পদচারণ থমকে গেল তার। ইতস্তত করে সাফ্রিনকে বললো সে একাই যেতে পারবে। সাফ্রিন আবারো বলতে চাইলো কিছু কিন্তু তার আগেই আচমকা পেছন থেকে সায়েরীর হাত চেপে ধরলো ফায়াজ। সাফ্রিনকে বললো সে নিজে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কথাটা বলে একপ্রকার টেনে নিয়ে যেতে লাগল সায়েরীকে। অবচেতনে এতোটাই জোরে হাত চেপে ধরেছে যে৷ সায়েরী ছটফটিয়ে উঠল ব্যাথায়। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে ব্যাথাতুর কন্ঠে বললো,
‘ আহ! ফায়াজ…কি করছিস! লাগছে আমার। হাত ছাড়। ‘
ফায়াজ ছাড়লো না। রিকশা থামিয়ে সায়েরীকে জোরপূর্বক উঠিয়ে দিলো তাতে। ফায়াজের এমন অস্বাভাবিক আচরণে সায়েরী বেশ অবাক হলো। রিকশায় বসে সে জানালো একাই যেতে পারবে। গাড়ি পেয়ে গেছে যখন আর সমস্যা নেই। কিন্তু এই সামান্য কথাটুকু যেন আজ আগুনে ঘি ঢালার মতো করে ক্রুধে ঘি ঢাললো ফায়াজের৷ তার হিংসাত্মক মন পুণরায় প্রশ্ন তুললো, সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে এতো এতো বার যাতায়াত করতে সমস্যা হয়না। অথচ আজ নিজ বন্ধুকে নাচক করছে! জেদ নিয়েই সে চেপে বসলো রিকশায়। যা দেখে সায়েরী একেবারে গুটিয়ে গেল একপাশে। অস্বস্তিতে গা কাটা দিয়ে উঠল। বুঝে উঠতে পারলো না কিছুই।
অন্যদিকে এতোক্ষণ যাবত ঘটে যাওয়া সব ঘটনা দূর থেকে পরখ করছিল একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ। সায়েরীর রিকশাটা দৃষ্টি সীমা হতে মিলিয়ে যেতেই সে চোখে রোদ চশমাটা লাগিয়ে চেপে বসলো নিজ গাড়িতে৷ দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ব্যাস্ত রাস্তায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। অথচ মস্তিষ্কে তখনো কিলবিল করছে অন্য কিছু। অন্য চিন্তা। চোখে ভাসছে মাত্র কিছুদিন আগে নিজ অধর দ্বারা রাঙিয়ে তোলা ছোট্ট নরম হাতখানা অন্য এক পুরুষের হাতের মাঝে পিষ্ট হওয়ার দৃশ্যটুকু।
সফেদ রাঙা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে লনে, ঘাসের উপর পা ভাঁজ করে বসে আছে ইরা। ঘাস ছিড়ছে আনমনে। পেছন থেকে হইচই শুনা যাচ্ছে একাধিক ব্যাক্তি বর্গের। ইরা সবে এসে বসেছে মিহাদের নির্দেশে। কিন্তু তাকে আসতে বলে মিহাদ উধাও। বিরক্ত চিত্তে বসা হতে উঠতে উদ্যত হলো সে। এমন সময় আগমন ঘটলো মিহাদের। এসে কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল ইরার কোলে মাথা রেখে। তার এমন কান্ডে ইরা অবাক হলোনা খুব একটা। বরং স্বভাবগত ভাবে হাত বুলিয়ে দিতে লাগত চুলে। নরম কন্ঠে সুধাল, ‘ আবারো মাথা ব্যাথা করছে? ‘
মিহাদের মলিন কন্ঠ। ‘ হু! একটু। ‘
‘ রুমে গিয়ে শুয়ে পড়। এখানে থাকলে আরো বেশি লাগবে। রান্না শেষ হয়ে গেছে প্রায়। আমি রুমে নিয়ে আসবো। ‘
‘ উঁহু। এখানে থাকি। ‘
‘ এভাবে! কেউ দেখলে কি ভাববে মিহাদ? রুমে যা। ‘
‘ সবাই রান্নায় ব্যাস্ত। কে আছে দেখার? ‘
বলতে না বলতেই আগমন ঘটলো রায়ানের। তাকে দেখে মিহাদ বিরক্ত হলো বেশ। ইরা ইশারা করলো রায়ানের দিকে। অর্থাৎ, দেখ কে না আছে দেখার? মিহাদ থমথমে গলায় রায়ানকে বললো,
‘ এ্যাঁই! তুই কি দেখতে পাচ্ছিস কিছু?
বিপরীতে শুনা গেলো রায়ানের ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠ,
‘ নাহ! দেখব কি করে? আমি তো কানা। চোখ শুধু তোকে দিয়েছে আল্লাহ্। খোলা ময়দানে প্রেম পিরিতি করার জন্য। ‘
‘ দেখতেই যখন পাচ্ছিস প্রেম করছি। তাহলে বাগড়া না দিলে হয়না? আমার শান্তি সহ্য করতেই পারোস না তোরা শালা। যা দূর হ সামনে থেকে। ‘
মিহাদের অযাচিত কথায় রায়ান কান দিলো না। ফিরে যেতে যেতে বললো,
‘ রান্না শেষ। খেতে ডাকছে তোদের। ‘
রায়ানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে পুণরায় মিহাদের চুলে হাত ডোবাল ইরা। তীব্র মাথা ব্যাথায় প্রায়শই কাতর হয়ে থাকে মিহাদ। চোখ, মুখ লাল হয়ে ভয়ংকর আকার ধারণ করে। আজ হয়তো পূর্বের চেয়ে কম লাগছে। নয়তো এমন সাবলীল হয়ে থাকতে পারতো না। তপ্ত শ্বাস ফেলে ইরা বললো,
‘ বারে বারে এমন ব্যাথা উঠে কেনো? ডাক্তার দেখা। ‘
ইরার চিন্তিত কন্ঠ শুনে মিহাদ হাসল। হাত বাড়িয়ে ইরার গাল ছুঁয়ে বললো,
‘ মাইগ্রেনের ব্যাথা, জান। অস্বাভাবিক কিছু না। অনেকেরই আছে। সাফওয়ানেরও। ওর প্রায় রাতের বেলা ব্যাথা উঠে, আর আমার যখন তখন। এতো চিন্তা করার কিছু নেই। ‘
প্রতিউত্তর করলো না ইরা। নিরবে কথা চললো দুজনের চোখে চোখে। এর মাঝে আচমকা ঘোর কাটলো সাফওয়ানের গর্জে উঠা কন্ঠের ডাকে। ইরা এবং মিহাদের আসতে দেরি হচ্ছিল বলে চটে গিয়েছে সে। গর্জন শুনে তাড়াক করে লাফিয়ে উঠলো মিহাদ। বুকে থু থু দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ এই হিটলারের নানার তর্জন, গর্জনে কবে না হার্ট ফেইল করে বসি। ব্যাটা নিজে ত জন্মান্তরের সিঙ্গেল। আমার প্রেমটাও সহ্য হয়না তার। ‘
ইরা ঠোঁট চেপে হাসে। তার হাসি দেখে মিহাদ পুণরায় বলে উঠলো,
‘ হাসি পাচ্ছে তাইনা? পাবেই তো। যত জ্বালা হয়েছে সব আমার। এদের জন্য শান্তিতে প্রেমটাও করতে পারছি না। সাফওয়ান বিয়েটা করুক খালি। এই ব্যাটার মেয়ের পেছনে জুটিয়ে দিব আমার ছেলেকে। তারপর বুঝবে শালা মিহাদের প্রেমে বাগড়া দেওয়ার ফলাফল। ‘
‘ ছেলে? কার ছেলে? কোন ছেলে? ‘
ইরার অবাক মুখশ্রী দেখে মিহাদ শব্দ করে হাসে। হাত বাড়িয়ে ইরাকে কাছে টেনে দুষ্টু হেসে বললো,
‘ কার আবার! মিহাদ শেখ এবং তার ইরাবতী’র ছেলে। যাকে উসকে দিব সাফওয়ান ব্যাটার মেয়ের সাথে প্রেম করার জন্য। অবশ্য ভাগিয়ে আনতে পারলে ব্যাপারটা আরো জমবে৷ এই নাক উঁচু ব্যাটার নাকটা নিচু হবে। ‘
মিহাদের বাহুবন্ধন হতে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে ইরা বলে উঠলো,
‘ যত্তসব বাজে কথা। আগে বিয়ে করার মতো যোগ্যতা নিয়ে বাবার সামনে দাড়া। তারপর দেখা যাবে বাকি সব৷ ‘
মিহাদ চোখ পাকিয়ে তাকায়। পুণরায় ইরাকে নিজের সঙ্গে ঝাপটে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘ তোর কি আমার অ্যাবিলিটি নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে? একবার রাজি হ শুধু। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি আমার যোগ্যতা ক…. ‘
‘ অসভ্য ছেলে! চুপ কর। ‘ বাকি কথাটুকু বলার আগে মিহাদের মুখে হাত দিয়ে আটকে ফেললো ইরা। মিহাদ মিটমিটিয়ে হাসে ইরার রক্তিম মুখশ্রী দেখে। ইরা ছাড়াতে চাই নিজেকে। বিড়বিড় করে আরো কিছু বকাঝকা করে। কিন্তু মিহাদ নাছোড়বান্দা হয়ে দৃঢ়তার সাথে আটকে রেখেছে তাকে। ইরার চলতে থাকা হাতদুটো এই পর্যায়ে নিজের এক হাত দ্বারা মুঠোবন্দি করে ফেললো সে। রসিকতা থামিয়ে গম্ভীর মুখ করে কপালে কপাল ঠেকাল। ইরাও শান্ত হয়ে গেলো। মিহাদ শান্ত, শীতল কন্ঠে বললো,
‘ বাজে কথা নাহ। এটা আমার স্বপ্ন। আমার ইরাবতী’কে নিয়ে সুন্দর সংসার বাঁধব। ছোট্ট দুজন মিহাদ,ইরা আসবে৷ সারা ঘর মাতিয়ে রাখবে। আমাদের ভালোবাসার অংশ হবে তারা। স্বপ্নের সংসার হবে আমাদের। ‘
ইরার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে। চোখ বুজে শ্বাস ফেলে সে। আনমনেই প্রশ্ন করে, ‘ সত্যিই এমন হবে তো? ‘
মিহাদ মাথা তুলে তাকায়। সম্মুখে অবস্থানরত প্রেয়সীর কপালে চুমু আঁকে নিঃশব্দে। চমৎকার হেসে জবাব দেয়,
‘ অবশ্যই হবে। আর যাইহোক। পালিয়ে যাওয়ার মতো প্রেমিক তো আমি নয়। প্রেম যখন করেছি, তোকে বাচ্চার মা বানিয়ে-ই ছাড়বো। ‘
বলেই শব্দ করে হেসে উঠে সে। ‘ অসভ্য ছেলে। সবসময় আজেবাজে কথা।’ বলতে বলতে ইরা লাগাতার থাপ্পড় লাগায় তার বাহুতে। মিহাদ আরো জোরে হেসে উঠে। দুজনের খুনসুটি’র মাঝে পুণরায় শুনা যায় সাফওয়ানের কন্ঠের ডাক। মিহাদের নাম ধরে ডাকছে সে। এই পর্যায়ে ভীষণ মেজাজ হলো মিহাদের। ঘাসের উপর থেকে উঠে রাগে গজগজ করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বললো,
‘ এই হারামজাদা জীবনেও শুধরাবে না। এর মেয়েকে তো ভাগিয়েই ছাড়বো আমি। আমার রোমান্সে বাগড়া দেওয়ার স্বাদ আমি মিটিয়েই ছাড়বো শালার। ‘
তার কথাগুলো পেছন থেকে ইরা হেসে উঠে শব্দ করে।
‘ ইরাপু!!!! কবে থেকে ডাকছি৷ শুনতে পাওনা নাকি? ‘
ছোট বোন ইরিনা’র ধাক্কায় মোবাইল স্ক্রিন হতে চোখ সরাল ইরা। ইরিনা তার এমন নির্লিপ্ত মুখ দেখতে দেখতে ইদানিং বেশ বিরক্ত হয়। আজও বিরক্ত কন্ঠে বললো,
‘ তিনটা বাজে। না খেয়ে বসে আছো কেনো? খাবার রাখলাম। খেয়ে নিও। ‘
বেড সাইড টেবিলে ভাতের প্লেট-টা রেখে পুণরায় চলে গেল ইরিনা। মেডিকেল ২য় বর্ষের স্টুডেন্ট সে। ইরিনার দিক হতে চোখ ফিরিয়ে আবারও মোবাইলে নজর দিলো ইরা। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটা ভিডিও। আজ থেকে প্রায় ছ’মাস আগে সাফওয়ানদের ফার্ম হাউসে ছয় বন্ধু বান্ধব মিলে ছোট খাটো পিকনিকের আয়োজন করেছিল। সকলে মিলে রান্না করেছে, আড্ডা দিয়েছে, একসাথে খেয়েছে। খাবারের টেবিলে মিহাদ এবং সাফওয়ানের ঝগড়া দেখে বাকিদের হাসাহাসি। এসবেরই ভিডিও দেখতে দেখতে অতীতের ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল ইরা। বাস্তবে ফিরে মিলিয়ে গেলো এতোক্ষণের হাসিমুখ। বান্দরবান থেকে ফিরেছে আজ একমাসেরও বেশি সময় হচ্ছে। এর মাঝে প্রায় মাসের অর্ধেক কাটিয়েছে তার মামা বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। কিন্তু মন, মস্তিষ্কের কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দিনের পর দিন এই শূন্যতা ভিরর থেকে চুষে নিচ্ছে তার সকল অনুভূতি। তার এমন উদাসীনতায় আজকাল পরিবারের সকলেই অতিষ্ঠ। কম চেষ্টা তো করেনি। তবুও পুরনো ইরাকে ফিরে পেতে ব্যার্থ হয়েছে তারা।
মোবাইলের রিংটোনে ইরার ঘোর কাটে। আননোন নাম্বার। কিন্তু নাম্বারটা তার পরিচিত। তপ্ত শ্বাস ফেলে কল রিসিভ করলো সে৷ উপাশ থেকে শুনা গেলো নমনীয় পুরুষালি কন্ঠস্বর,
‘ হ্যালো, মিস ইরা! ‘
‘ জ্বি, শুনছি৷ ‘
‘ আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, ইরা। হঠাৎ করেই একটা ইমার্জেন্সি কেইস এসে গিয়েছে। আধ ঘন্টা পরই সার্জারি। আজ আপনার সাথে দেখা করতে পারছি না। হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড। ‘
স্বস্তির শ্বাস ফেললো ইরা। পূর্বের ন্যায় নরম কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ ইটস অলরাইট, ডক্টর জাদিদ। আমি কিছুই মনে করিনি। ‘
‘ থ্যাঙ্কিউ। আরও একটা কথা বলার ছিল। আসলে.. ‘
ইতস্তত করে থেমে গেলো জাদিদ। ইরা চুপচাপ অপেক্ষায় রইল তার পরবর্তী কথা শুনার জন্য। জাদিদ জড়তা নিয়েই পুণরায় বলে উঠলো,
‘ আসলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমি শহরের বাইরে যাচ্ছি কিছু দিনের জন্য। কাল ভোরে ফ্লাইট। মনে হয়না দশ দিনের আগে ফিরতে পারবো। আপনার বাবা খুব করে চাচ্ছিল যেন আপনার সাথে আমি পারসোনালি দেখা করি। আন ফরচুনেটলি, আমার মনে হচ্ছে না দশ পনেরো দিনের আগে সেটা সম্ভব। আপনি প্লিজ আঙ্কেল কে একটু বুঝিয়ে বলবেন এই ব্যাপারে। আই হোপ হি উইল আন্ডারস্ট্যান্ড মাই সিচুয়েশন। ‘
‘ সিউর। আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলবো। ‘
‘ থ্যাঙ্কিউ সো মাচ। রাখছি তাহলে। ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ। ‘
ইরা প্রতিউত্তর করলো না কোনো। সেকেন্ড দুয়েক অপেক্ষা করে কল কেটে দিলো জাদিদ। ইরা বিষন্ন মুখে বসে রইলো। তার বাবা বেশ কয়েকদিন যাবত উঠে পড়ে লেগেছে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। পাত্র হিসেবে আছে ইরার কাউন্সিলর এহসান সাহেবের এর ছেলে কার্ডিওলজিস্ট জাদিদ এহমাদ। পাত্র হিসেবে নিঃসন্দেহে জাদিদ কে সুপাত্র বলা যায়। দেখতে, শুনতে, যোগ্যতায় সব দিক দিয়েই পারফেক্ট। এমন যোগ্যতা সম্পন্ন ছেলে স্বয়ং ইরার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সুযোগটা মোটেই হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না ইরার বাবা। একপ্রকার উতলা হয়ে উঠেছেন ইরাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। এই পর্যায়ে এসে ইরা আপত্তি করতে চেয়েও বাবার অনুরোধের কাছে হার মেনে নিলো। পিষে ফেললো নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে। কার জন্য বাঁচিয়ে রাখবে এই অনুভূতি? যার জন্য যত্ন করে এই অনুভূতি জন্মিয়েছে সে নিজেই যখন চাচ্ছে না তাকে, তবে এই অনুভূতি-দের বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ?
বেলা এগারোটা। নিজের রুমের বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সারছিল সাফওয়ান। সেই সাথে ভাবছিল মাস খানিক পরের ইলেকশনের কথা। রাজনৈতিক জীবন মোটেও সহজ নয়। নওশাদ খান এমপি পদের জন্য দাঁড়ানোর পর থেকেই চারদিকে হাজারো শত্রু ওঁৎ পেতে আছে উনার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে। নয়তো পরিবারের কারো ক্ষতি করে নওশাদ খান’কে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে। যাদের একমাত্র চাওয়া এমপি প্রার্থী আসন হতে নওশাদ খান’কে সরিয়ে দেওয়া। বাবা,ছেলে দুজনেই জানে সবটা। রাজনীতি রগে রগে মিশে আছে যেন দুজনের৷ চাইলেও কেউ সহজে দুর্বল করতে পারবে না একই মনোবলের এই দুজনকে। কিন্তু ব্যাতিক্রম ঘটছে গত দুই দিন যাবত।
কোনো এক অজানা ঠিকানা হতে স্পষ্ট হুমকি এসেছে। যার ইঙ্গিত ছিল সাফ্রিনকে ঘিরে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাফওয়ান এবং নওশাদ খান দুজনই চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন। কেউ কাউকে বুঝতে না দিলেও বিষয়টা তারা মোটেও হালকা ভাবে নিতে পারছে না। কারণ যাকে ঘিরে এই হুমকি এসেছে সে যে দুজনেরই চোখের মণি৷ তাই বিষয়টা হালকা ভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। না চাইতেও চিন্তিত হয়ে উঠছে অন্তরস্থল। ইলেকশনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, চিন্তা ততই গাঢ় হচ্ছে। বাসায় তারা আট জন মানুষ। দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে নওশাদ খান এবং উনার স্ত্রী৷ সঙ্গে আছেন ছোট ভাই নেওয়াজ খান, উনার স্ত্রী সহ বারো বছরের দুই জমজ সন্তান৷ সকলের জন্য কড়া সিকিউরিটির ব্যাবস্থা করেছে সাফওয়ান নিজেই। তবুও মনে একটা কিন্তু বোধ রয়ে গেছে। সাফ্রিনের সেইফটি নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছে না সে। দুই দিন যাবত এই চিন্তাটা খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে তাকে।
মোবাইলের তীক্ষ্ণ শব্দে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো সাফওয়ানের। বেডরুম হতে আসছে শব্দ। ধীরে সুস্থে ল্যাপটপ নিয়েই সে পা বাড়ালো রুমের মধ্যে। বালিশের পাশ থেকে মোবাইল হাতে নিয়ে কল রিসিভ করে কানে চাপলো। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসলো এক যুবকের উত্তেজিত কন্ঠস্বর,
‘ ভ..ভাই! ম্যাডাম.. মানে সাফ্রিন ম্যাডাম তো কলেজে নেই। ‘
চিন্তিত মস্তিষ্ক নিয়ে এহেন বাক্য শুনে বোবা বনে গেলো সাফওয়ান। হঠাৎ করেই যেন ভাষা হারিয়ে ফেললো। ঠাহর করে উঠতে পারলো না ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো প্রয়োজন তার।
‘ কলেজের সব যায়গায় চেক করেছি ভাই। কোথাও নেই। ‘
পুণরায় কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই সাফওয়ান শ্বাস আটকে আসলো। এতোক্ষণে বোধগম্য হলো সাফ্রিনের হারিয়ের যাওয়ার বিষয়টা। মস্তিষ্ক চঞ্চল হয়ে উঠতেই সে হুংকার ছাড়লো এপাশ থেকে,
‘ নেই মানে কি? তোমাদের কি ঘাস কাটতে রেখেছি আমি? বলেছিলাম না ক্লাসরুমের আশেপাশে থাকতে? চোখের সামনে থেকে সাফা উধাও হলো কি করে? ছিলিস কোথায় তোরা ইডিয়টস? ‘
‘ ভ..ভাই আসলে আমরা… ‘
‘ কতোক্ষন ধরে নেই কলেজে? ড্রাইভার কোথায়? ওর বন্ধুরা নেই? ওদের কাছ থেকে ইনফরমেশন নে। ‘
‘ আধ ঘন্টা ধরে দেখছি না ভাই। ড্রাইভার পার্কিং-এ আছে। সেও জানে না কিছু। আর ম্যাডামের বন্ধুরা কেউ নেই। সকালেই দেখেছিলাম সবাইকে। সব সময় যে ছ’জনের সাথে থাকে আজ ওরা কেউ নেই। ‘
এই পর্যায়ে এসে একটুখানি স্বস্তি পেলো সাফওয়ান। বুঝল, বন্ধুদের সাথে বের হয়েছে সাফ্রিন। কিন্তু এভাবে না বলে তো কখনো বের হয় না সে। হলেও সর্বদা ড্রাইভার সঙ্গে থাকে। বাবার প্রফেশন সম্পর্কে খুব ভালো ভাবেই অবগত বলে এমন খামখেয়ালি সে কখনোই করে না। তবে আজ কেনো?
বেশি কিছু ভেবে সময় নষ্ট না করে গাড়ি চাবি নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো সাফওয়ান। গাড়ি স্টার্ট করে কল লাগালো সাফ্রিনের নাম্বারে। পরপর তিনবার কল করলো। প্রতিবার রিং বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না।
কোলাহলে ভরপুর রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে সাত বন্ধু বান্ধব। সকলের দৃষ্টি সামনের রাস্তার অপর প্রান্তে গড়ে উঠা মেলার দিকে। চারিদিকে শত মানুষের আনাগোনা,হইচই-এ মুখরিত পরিবেশ। পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া হুট করে মেলায় আসার ইচ্ছেটা ছিলো তোহা,সায়েরী এবং নুহাশের। কলেজের নিকটবর্তী স্থানে মেলা উঠেছে শুনে তোহা এবং সায়েরী একপ্রকার জেদ ধরে বসেছিল৷ এবং দুজনকে উষ্কে দেওয়ার জন্য ছিলো নুহাশ। তিনজনের জোরাজুরিতে হার মেনে অগত্যা সাতজন হাজির হয়েছে মেলায়। সাফ্রিন চেয়েছিল ড্রাইভার সাথে আনতে। কিন্তু বন্ধুরা বাঁধ সাজতেই সেও আর বেশি কিছু ভাবলো না। মেলায় সে খুব কমই এসেছে। কিংবা বলা যায় আসেইনি। আজ এতো গরমের মাঝে এমন হৈচৈপূর্ণ স্থানে হাজির হয়ে হাসফাস করে উঠলো সে৷ রোদের উত্তাপে তার ফর্সা ত্বক টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
গন্তব্যে হাজির হয়েছে মাত্রই। এখনই হাপিয়ে উঠেছে সে। তাছাড়া মনে একটা কিন্তু বোধ বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে এভাবে না জানিয়ে চলে আসাটা মোটেও ঠিক হয়নি। তার ভাবনার মাঝে তার হাত টেনে ধরলো সায়েরী। খুশিতে গদগদ হয়ে ছুটলো মেলার ভিতরে। সাথে নাজরাত এবং তোহা। তোহাও আজ খুশিতে বাক-বাকুম হয়ে আছে একেবারে। একে একে সকলেই মেলার ভিতরে প্রবেশ করলো। সবার শেষে প্রবেশ করেছে আয়ান। এমন সময় তার মোবাইল ভাইব্রেট করে উঠলো। পকেট হাতড়ে মোবাইল হাতে নিতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠা নামটা দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো তার। মুখ ফসকে বলেই ফেললো,
‘ সাফওয়ান ভাই ফোন করছে কেনো হঠাৎ? ‘
এতো কোলাহলের মাঝে কিছুই শুনা যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে আয়ান পুণরায় ফিরে আসলো রাস্তায়। কল ব্যাক করা মাত্রই শুনা গেলো সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর।
‘ হ্যালো, আয়ান! ‘
‘ জ্বি ভাইয়া। ‘
‘ কোথায় তোমরা? সাফা কোথায়? ঠিক আছে? ‘
‘ জ্বি ভাই। সাফা ঠিক আছে। কোনো সমস্যা হয়েছে কি? ‘
‘ তোমরা আছো কোথায়? ‘
‘ কলেজের আশেপাশেই আছি ভাইয়া। বেশিদূর যায়নি। দক্ষিণের রোডে যে মেলা বসেছে সেখানেই এসেছি। ‘
মেলার কথা শুনে অস্থির ভঙ্গিতে কপাল ঘষে সাফওয়ান। এতো কোলাহলের মাঝে কারো ক্ষতি করা অত্যন্ত সহজ ব্যাপার। চিন্তাগ্রস্ত মস্তিষ্ককে শান্ত করে সে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ সাফাকে ভীড় থেকে বের করো আয়ান। রাইট নাও। ‘
সাফওয়ানের এহেন বাক্যে আয়ান নিজেও চিন্তায় পড়ে গেলো। অস্থির কন্ঠে বললো,
‘ কি হয়েছে ভাইয়া? সাফা তো ঠিকই আছে। ‘
‘ ওকে স্টক করা হচ্ছে। আমি যদি ভুল না হয় তবে, মেলায় সুযোগ পেলেই কেউ না কেউ ওর উপর অ্যাটাক করবে। জাস্ট গো অ্যান্ড টেক হার অ্যাওয়ে আয়ান। আমি পৌঁছে গিয়েছি প্রায়। তুমি যাও। গো! ‘
কথাগুলো শুনে আয়ান আর একমুহূর্ত দেরি করলো না। ‘যাচ্ছি ভাইয়া।’ বলতে বলতে কল কাটতে উদ্যত হলো সে। এমন সময় সাফওয়ান পুণরায় ঢেকে উঠল তাকে।
‘ আয়ান? ‘
‘ জ্বি ভাইয়া? ‘
সাফওয়ান একটু থেমে গমগমে গলায় বলে উঠলো,
‘ সুবহা’কে ও দেখে রেখো। ‘
টুট টুট শব্দ তুলে কল ডিসকানেকটেড করে গেল। সাফওয়ানের শেষের বাক্যটুকু শুনে আয়ান স্তব্ধ, বিমূঢ়। পরমুহূর্তে আবার মাথা ঝেড়ে ছুটে গেল মেলার ভিতরে। বন্ধুদের খুঁজে পেতে খানিকটা বেগ পেতে হলো তাকে। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে সাফ্রিনের হাত টেনে ধরলো। উল্টো পথে পা বাড়িয়ে বাকিদের উদ্দেশ্যে বললো এক্ষুনি ফিরে আসতে। তার এহেন বাক্যে বাকিরা চমকে উঠলো। সাফ্রিন কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,
‘ হঠাৎ কি হলো? মাত্রই আসলাম, এখনি চলে যাব? ‘
আয়ান কিছু বলবে এমন সময় দেখল সাফ্রিনের পেছনে ভীড়ের মাঝে এক ব্যাক্তি চাকু হাতে এগিয়ে আসছে। আয়ান যতক্ষণে লক্ষ্য করছে ততোক্ষণে লোকটা প্রায় ছুয়ে যাচ্ছিল সাফ্রিনকে। এমন সময় হুট করেই সাফ্রিনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে লোকটার পেট বরাবর লাথি বসিয়ে দিলো আয়ান। আকস্মিক আক্রমণে উপস্থিত সকলে চমকে উঠলো। আশেপাশের অনেকেরই নজরে এসেছে এই দৃশ্য। মুহুর্তেই হইচই বেড়ে দ্বিগুণ হলো। মানুষ জান বাঁচানোর তাগিদে ছুটছে এদিক সেদিক। আয়ান পুণরায় হাত ধরলো সাফ্রিনের। সবাইকে তাগিদ ছিলো ছুটার। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারলো না তারা।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হঠাৎ আরো তিনজন এগিয়ে আসলো তাদের দিকে৷ লোকগুলোর বেশভূষা দেখেই মেয়েরা সিটিয়ে গেল আতংকে। ছেলেরা যে ভয় পায়নি এমন না। কিন্তু দায়িত্ববোধ নিয়ে তারা বান্ধবীদের আগলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখা গেল আয়ান, ফায়াজ এবং নুহাশকে কিছুই করতে হলো না। তার আগেই কালো পোষাক ধারী প্রায় ৭-৮ জন লোক এসে ঘিরে ধরলো তাদের। তন্মধ্যে চারজন মিলে আটক করেছে আক্রমণকারী ব্যাক্তিদের। সদ্য উপস্থিত হওয়া ব্যাক্তিগুলোর পোষাক এবং হাতের বন্ধুক দেখে কারোরই বুঝতে বাকি রইলো না যে এরা নওশাদ খান’র গার্ড। স্বস্তির শ্বাস ফেললো সকলে। কিন্তু হাঙ্গামা তখনো চলছে।ভীড়ের মধ্যে আরো অনেকেই উৎ পেতে আছে সুযোগ বুঝে আক্রমণ করার। কেউ কেউ করছেও। আতংকিত হয়ে সকলে দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে পালাচ্ছে। এমন সময় দ্রুত পায়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলো সাফওয়ান। তাকে দেখেই সাফ্রিন ছুটে আসলো। সাফওয়ান অস্থির চিত্তে বুকে জড়িয়ে ধরলো বোনকে। উত্তেজিত কন্ঠে আওড়াল,
‘ তুমি ঠিক আছো? কোথাও লাগেনি তো? ‘
সাফ্রিন মাথা নেড়ে বুঝালো লাগেনি কোথাও। কিন্তু ভয়ে তটস্থ হয়ে সে কাঁপছে তখনো। ফর্সা মুখখানা রক্তিম,ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে আতংকে। সবটা অনুভব করে সাফওয়ান পুণরায় একহাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে। নরম কন্ঠে বললো,
‘ সব ঠিক আছে। ডোন্ট প্যানিক। গাড়িতে গিয়ে বসো। ‘
ফিরার উদ্দেশ্যে সবাই একত্রে পা বাড়ালো। সকলের দিকে একপলক তাকিয়ে ফায়াজ আচমকা বলে উঠলো, ‘ সায়ু কোথায়? ‘
একথা শুনে সকলেই চমকে উঠলো। লক্ষ্য করে দেখলো আসলেই সায়েরী নেই তাদের সাথে। দৌড় ঝাপের মাঝে কখন সায়েরী পিছনে থেকে গিয়েছে, কেউ লক্ষ্য করতে পারেনি। সাফওয়ানের চলতি পদচারণ থমকে গেল সেটা শুনে। ধ্ক করে উঠলো বুকের ভিতরটা। এমন বিপদ মাথায় নিয়ে কোথায় হারিয়ে গেল মেয়েটা? সব যায়গায় মানুষের ধাক্কাধাক্কি, ছুটাছুটি। একদল ক্ষিপ্ত ব্যাক্তি বর্গ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে দোকানপাট উলোটপালোট করছে৷ এমন মুহুর্তে সায়েরী একা ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গিয়েছে, বিষয়টা মস্তিষ্কে হানা দিতেই সাফওয়ানের চোখ মুখ অন্ধকার ঠেকল। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো সে। বাকিদেরকে গাড়ির দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুজন গার্ড নিয়ে নিজেই ছুটল ভীড়ের মাঝে। পেছনে আয়ান এবং ফায়াজও উদ্যত হলো আসার জন্য। কিন্তু সাফওয়ান জোর করে তাদের পাঠিয়ে দিয়েছে। একপ্রকার ধমকা ধমকি করেই আয়ান এবং ফায়াজকে গাড়ির কাছে পাঠিয়েছে সে। কিন্তু নিজে বুঝে উঠতে পারলো না কীভাবে কি করবে। কোথায় খুঁজবে সায়েরীকে!
ভাগ্য বোধহয় সহায় ছিল তার সাথে। যার কারণে বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না। বরং নিজ থেকেই কাঙ্ক্ষিত মুখখানা ধরা দিলো চোখের সামনে। একটি দোকানের আড়ালে, দুইহাতে কান চেপে ধরে বসে আছে সায়েরী। গোলগাল মুখশ্রীটা রক্তশূণ্য, ফ্যাকাসে হয়ে আছে। দূর থেকেই লক্ষনীয় তার দেহের মৃদু কম্পন। সুস্থ শরীরে তার দেখা পেয়ে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। কিন্তু উত্তেজনায় তখনো বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করছে তার। আনমনেই যে উচ্চ কন্ঠে ডেকে উঠলো,
‘ সুবহা! ‘
সু-পরিচিত কন্ঠের ডাকটা কর্ণগোচর হতেই চট করে চোখ মেলে তাকালো সায়েরী। দশ হাত দুরত্বে দন্ডায়মান মানুষটাকে দেখে জ্বলজ্বল করে উঠলো চোখজোড়া। দাঁড়িয়ে পড়লো অবচেতনে। সবে মাত্র এক কদম বাড়িয়েছে, এমন সময় দ্রুত বেগে ছুটে আসলো সাফওয়ান। স্থান, কাল, অবস্থা কিছুর তোয়াক্কা না করে আচমকা বুকে টেনে নিলো সায়েরীকে। শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো তার ছোট্ট দেহশ্রী। চোখ বুজে প্রশান্তির শ্বাস ফেলে গমগমে শুধাল,
‘ তুমি মেয়ে আস্ত একটা ঝামেলা। ‘
শক্তপোক্ত বুকটাতে লেপ্টে থাকা সায়েরী এহেন বাক্যে হেসে ফেললো আচমকা। জীবনে প্রথম বারের মতো অনুভব করলো, বুকে আগলে রাখা মানুষটার এই অস্থিরতা তাকে ঘিরে। কঠোর এই বক্ষস্পন্দনের অস্বাভাবিক ঢিপঢিপ ধ্বনি স্পন্দিত হচ্ছে তার নামে। সুন্দর, বাদামি, গভীর চোখজোড়ার সকল ব্যাকুলতা তার জন্যই৷ এই যে মানুষটা তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। ঘাড়ের কাছে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার অস্থির চিত্তের ভারী ভারী এক একটা শ্বাস – প্রশ্বাস। যেনো স্পষ্ট কন্ঠে বলছে, ‘ কতোটা ভয় পেয়েছিলাম জানো? ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৯+৪০
ব্যাপারগুলো উপলব্ধি করতে পেরে চোখ বুজে শ্বাস ফেললো সায়েরী । সরাসরি উষ্ণ বুকটাতে মুখ ডুবিয়ে কম্পিত হাতে খামচে ধরলো পুরুষালি পৃষ্ঠদেশ। সাফওয়ানের বলা কথাটার রেশ ধরে থমথমে কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আপনি আবার আমাকে অপমান করছেন! ‘
