অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৭+৫৮
সাজিয়া জাহান সুবহা
সকাল ৮টা নাগাদ নতুন ফ্ল্যাটে সিফট করেছে জাদিদ এবং ইরা। ফ্ল্যাট টা বেশ বড়সড়। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। মোটে তিনটে বেডরুম রয়েছে। সঙ্গে লিভিং রুম, ডাইনিং, এবং কিচেন। জাদিদ পূর্বেই ভেবে রেখেছিল, ইরা’র এবং তার রুম আলাদা আলাদা রাখবে। যেন ইরা’র অস্বস্তি না হয়। বিগত দুই দিন সে লক্ষ্য করেছিলো। তার সম্মুখে বেশ গুটিয়ে থাকে মেয়েটা। তাছাড়া দুজনের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতেও তো সময়ের প্রয়োজন অনেক। আদো স্বাভাবিক হবে কি না তাও প্রশ্ন। সব দিক বিবেচনা করে দুজনে আলাদা আলাদা থাকলেই ভালো হবে বলে ভাবনা তার।
গতকালকেই সে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু কিনে ফেলেছিলো। তন্মধ্যে রয়েছে দুটো খাট। একটা ডাবল বেড, অন্যটা সিঙ্গেল বেড। ডাবল বেড টা ইরা’র রুমের জন্য। সঙ্গে কিনেছে দুটো কাবার্ড। সেই সঙ্গে রান্নার বেশ কিছু সরঞ্জাম। পড়াশোনার সূত্রে অনেক দিন পরিবার হতে আলাদা বাসায় থেকেছিল বলে রান্নায় মোটামুটি পারদর্শী সে। তাই সেসব নিয়ে চিন্তা নেই। বউ চালানোর যোগ্যতা তার ঢের আছে। গতরাতেই দুজন বন্ধু এবং দুজন কর্মীর সহযোগিতা নিয়ে মোটামুটি গোছগাছ সেরে ফেলেছে সে। ইরা এসেই অনুভূতিহীন চোখে দেখতে লাগলো সবকিছু। দুটো দিন৷ মাত্র দুটো দিনের পার্থক্যে আজ কোথা হতে কোথায় এসে পড়ল সে!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দুই দিন আগেও বাবা-র বাড়িতে মেয়ের পরিচয়ে ছিল৷ এরপর দুটো রাত ছিল জাদিদের বাবার বাড়িতে, পুত্রবধূর পরিচয়ে। আর আজ! আজ কেবল জাদিদের স্ত্রী পরিচয় টা ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় নেই তার। না কারো মেয়ে। না কারো পুত্রবধূ। গুমোট অনুভূতি সব ফের একবার চোখ বেয়ে গড়াতে চাইলে জাদিদের বলা পথ অনুসরণ করে নিজের রুমে ঢুকে পড়ল সে। জাদিদ চেয়ে চেয়ে দেখল কেবল। মেয়েটা যেন নিষ্প্রাণ কোনো জড়বস্তু। গতকাল থেকে অজ্ঞাত কোনো কারণে আর কাঁদছে না। কিন্তু বদলে গিয়েছে অনেক। এসব হওয়া যদিও স্বাভাবিক। কিন্তু জাদিদ চিন্তিত বাচ্চাটার জন্য। মায়ের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া যে বাচ্চার উপর প্রভাব ফেলে। এজন্য অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সর্বদা হাসিখুশি, চিন্তামুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু ইরা! সে তো বাচ্চাটা দেহে আসার পূর্বেই হাসি জিনিসটা ভুলে গিয়েছে। এখন তো নির্জীব হয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। এসবের মাঝে এই বাচ্চা একমাত্র উপর ওয়ালার কৃপায় সার্ভাইব করলে করবে। নয়তো…!
দুপুর বারোটা নাগাদ নিজেই রান্নার তোরজোর শুরু করল জাদিদ। এর পূর্বে কয়েক ঘন্টা সময় ব্যায় হয়েছে নিজেদের জিনিসপত্র সব গোছগাছ করে নিতে নিতে। মাঝে অবশ্য ইরার জন্য কিছু হালকা খাবারের ব্যাবস্থাও করেছিলো সে। সাথে মেডিসিন খাইয়েছিল জোরপূর্বক। মেয়েটার কপালে তখন অসম্ভব রকমের বিরক্তিকর ভাঁজ। জাদিদ সেসব দেখেও অগ্রাহ্য করেছে। ইরা বারকয়েক বলেছিলো রেখে যেতে, সে খেয়ে নিবে৷ জাদিদ পাত্তা দেয়নি সেকথায়। তাকে এমন ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অগত্যা খাবার খেয়ে মেডিসিনও খেতে হয়েছিল ইরা’কে। তখন ইরা’র চোখের মুখের অসন্তুষ্টি ভাবটা ফুটে উঠেছিলো স্পষ্ট ভাবে। সেসব মনে করে মিটমিটিয়ে হাসল জাদিদ। এই একদিনে সে এটুকু বুঝেছে, ইরা’র সাথে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনই কঠোর হতে হবে। সবসময় ওই অসহায় মুখশ্রী দেখে গলে গেলে চলবে না। এমন হলে ইরা আরও বেশি আশকারা পেয়ে যাবে নিজের এবং বাচ্চার হেলথের ব্যাপারে অবহেলা করার।
রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দিয়ে সবজি কেটে নিল জাদিদ। পাকা রুই মাছ কিনে, কেটে নিয়ে এসেছে বাজার থেকে। আজ সেটাই রান্না করবে। সবজি কাটা শেষ হতেই ফের ইরা’র কথা মনে পড়ে তার। এমন একা একা রুমে বসে থাকলে তো দুশ্চিন্তা ছাড়বেই না তাকে। হাড়িতে নেওয়া মাছ, সবজি গুলোর দিকে তাকিয়ে ধূর্ত মস্তিষ্ক কিলবিল করে উঠলো তার। সেসব রেখে ছুটল ইরা’র রুমের দিকে। নক করতেই ভেসে আসল ইরা’র নিম্ন কন্ঠস্বর। জাদিদ ভেতরে ঢুকে নাটকীয় ব্যস্ততা দেখাল,
‘ ইরা! খুব বড় ঝামেলায় ফেঁসে গিয়েছি। আপনি একটু আসবেন আমার সাথে? এই মুহূর্তে আপনি ছাড়া আর কেউ নেই সাহায্য করার জন্য। প্লিজ হেল্প! ‘
কন্ঠে ব্যস্ততা, অসহায়ত্ব তার। ইরা খানিকটা চমকালো এহেন দৃশ্যে। কিছু যে বলবে সেই সুযোগ টাও দিলনা জাদিদ। বিনা বাক্যে হাত টেনে বেড থেকে নামিয়ে ফেললো তাকে। তারপর নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। ইরা হতভম্ব! পূর্বে কখনো এমন কিছু করেনি জাদিদ। এমন অনুমতি ব্যাতিত হাত-ও ধরেনি। হলো টা কি আজ! আর কিসের ঝামেলা?
কিচেনে প্রবেশ করে ইরা’র হাত ছাড়লো জাদিদ৷ ইরা আশেপাশে তাকাল অবুঝ নয়নে। সব ঠিকঠাক। ঝামেলা হলো কোথায় তাহলে?
‘ কি হয়েছে? এখানে কেনো এনেছেন আমাকে? ‘
‘ হেল্প লাগবে আপনার৷ দেখুন তো এগুলো৷ আমি বুঝতে পারছি না মরিচ,মশলা কি পরিমাণ দিব? আর কোনটার পর কি ঢালব সেটাও মাথায় আসছে না। আপনি একটু বলে দিন, প্লিজ! ‘
ইরা চোখ কুঁচকে পরখ করে সব কিছু। রান্নাবান্না সম্পর্কে সে অভিজ্ঞ বেশ। জাদিদও জানে সেটা। এবং ইরা এটাও জানে যে জাদিদ নিজেও আনাড়ি নয় এসবে। সে নিজেই কথায় কথায় একদিন বলেছিলো রান্নাবান্না ভালো পারে বলে। কথাটা মনে পড়তেই জাদিদের দিকে জহুরি নজরে তাকাল ইরা। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
‘ আপনি তো বলেছিলেন রান্নার ব্যাপারে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা আছে। আজ তাহলে আমার সাহায্য লাগছে কেনো? ‘
ধরা পড়ে গিয়ে ফাটা বেলুনের ন্যায় চুপসে গেল জাদিদ। কিন্তু মুখ দেখে বুঝা গেল না তা। মনে মনে নিজেই নিজেকে বকে দিল। সব কথা এত মাতব্বরি করে কেনো বলে দিয়েছে আগেই? মেয়ে পটানোর এত তাড়া ছিল!
‘ অ..ব..আপনি! আপনি ভুল বুঝছেন। আমি..আমি জানি তো। কিন্তু, ওইযে অনেক দিন হলো রান্না করিনি। এজন্য আসলে সব ভুলে গিয়েছি। একটু আধটু দেখিয়ে দিলেই পেরে যাব। ‘
ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শরীর, মন সায় না দিলেও ভদ্রতার খাতিরে বলে,
‘ আপনি যান। আমি পারব এসব। ‘
‘ একদম না। আমাকে একটু শিখিয়ে দিলেই আমি সব পারব৷ আপনি শুধু বসে বসে বলে দিন..এক মিনিট! বসবেন কোথায়..দাড়ান, আমি কিছু নিয়ে আসছি। ‘
অনেকটা তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে এদিক সেদিক খুঁজতে খুঁজতে কিচেন থেকে বের হয়ে গেল জাদিদ। আজ সকালে বন্ধুকে দিয়ে কিনিয়েছিলো আর এফ এল এর ছোট্ট একটা ডাইনিং টেবিল। মাত্র চারটে চেয়ার তাতে। সেসব এখনো প্যাকেট হতে বের করা হয়নি। জাদিদ ব্যাস্ত হাতে প্লাস্টিক ছিড়ে একটা চেয়ার এনে রাখল কিচেনে। চুলা হতে অনেকটা দূরে বসতে দিল ইরাকে। ইরা নিরব চোখে কেবল পরখ করল সব কিছু। জাদিদ ফের ব্যস্ত হলো রান্নায়। ইতোমধ্যে অনেক সময় ব্যয় হয়ে গিয়েছে। না জানে রান্না শেষ হতে হতে কত সময় লাগবে! ইরা একে একে নির্দেশনা দিতে লাগল। সেই মোতাবেক হাত চালাচ্ছে জাদিদ৷ সঙ্গে চলছে মুখ। তার ইন্টার্নি জীবনের কতশত স্মৃতি বলে বলে শোনাচ্ছে ইরাকে। আড়চোখে আবার লক্ষ্য করেও দেখছে, যদি মেয়েটা একটুখানি চিন্তামুক্ত হয়ে হাসে। কিন্তু না। হাসির ছিঁটেফোঁটাও নেই ইরা’র মুখশ্রী-তে। তবে তাকে চিন্তামুক্ত দেখাল বেশ। আপাতত মস্তিষ্কে রান্নার চিন্তা কেবল। জাদিদ স্বস্তি পেল এতেই।
দুপুর একটা নাগাদ রান্নার কাজ সেভাবেই রেখে দুটো আপেল কেটে প্লেট সমেত ইরা’র হাতে ধরিয়ে দিয়েছে জাদিদ। মেয়েটার শত বারণ কানে তুলেনি। বরং এই প্রথমবার খানিকটা রুক্ষ কন্ঠে আদেশ ছুড়েছে সবটা শেষ করার। সেই সাথে বলেছে সব খেয়ে তারপর যেন স্নান সেরে আসে। ততক্ষণে রান্না শেষ হলে দুজন একসাথে খেয়ে নিবে। ইরা নিরবে মেনে নিল সব কথা। মন সায় দেয়না কিছুতে। তবুও খেতে হয়। ছোট্ট প্রাণ -টা বাধ্য করে খেতে। টুকরো টুকরো আপেল মুখে তুলে জাদিদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো ইরা। সে জানত, জাদিদ স্বল্পভাষী একজন পুরুষ। কিন্তু আজ এই স্বল্পভাষী পুরুষটা অবিরত কথা বলে যাচ্ছে। ইরা বুঝে, এসব তার মন ভুলানোর প্রচেষ্টা। এই দুঃসময়ে অন্তত কেউ পাশে আছে, খেয়াল রাখছে,তাকে ঠাঁই দিয়েছে এসব ভেবেই মন শান্ত হয় তার। ফের অবচেতন মন তুলনা করে বসে জাদিদের সঙ্গে মিহাদের। এই যে জাদিদ তাকে রেঁধে বেড়ে খাওয়াচ্ছে। এমনটা মিহাদ হলে করত কি? বেড়ে খাওয়াত অবশ্যই। কিন্তু রেঁধে! হুহ, স্বপ্নে! ওই আনাড়ি তো কেবল কথা পাকাতে উস্তাদ। একবার ইরা বলেছিল মিহাদকে,
‘ এত বিয়ে বিয়ে যে করছিস, বর হওয়ার মতো যোগ্য হ আগে। আমাকে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। রান্না করে খাওয়াতে হবে, সব মুড সুয়িং মেনে নিতে হবে, বাসার সব কাজে পারদর্শী হতে হবে। আর….
কথাটুকু সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই চালাকচতুর ছেলেটা কাছে টেনে নিয়ে দ্রুত গলায় প্রতিউত্তর করেছিল,
‘ আহ, জান! এত এত শর্ত মানা যায়? জানিস না আমি এসবে আনাড়ি? আমার জন্মই হয়েছে কেবল ইরাবতী কে ভালোবাসায় ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য। এসব রান্না টান্না আমার সাবজেক্ট না। চুমু টুমু খেতে চাইলে তখন বলিস। মিহাস সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকবে। ‘
‘ ফালতু কথা। এসব না শিখা অবধি আমি তোকে বিয়ে করছি না। চুমু খেয়ে পেট ভরাবে এমন বউ খুঁজে নে, যা। ‘
‘ আরে চুমু খেয়ে মন ভরলেই হলো। আর এসব কাজের জন্য অন্য মানুষ রাখব, যা। এত ফালতু কাজে টাইম ওয়েস্ট করে লাভ আছে? দেখা গেল রান্নার সময়টুকু তে আমি তোকে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দিলাম। স্পেশাল ভাবে একটা ছোট্ট মিহাদ পেয়ে যাবি। ব্যাপারটা দারুণ না? ‘
‘ মিহাদ!!! ‘
ইরা নাক ফুলিয়ে জোরে কিল বসাল মিহাদের বুকে। মিহাদ উচ্চস্বরে হাসল তখন। ইরা’কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে চুমু খেয়েছিল গালে। হাসতে হাসতে বলে উঠেছিল,
‘ উফ! জান। রাগলে তোকে অস্থির লাগে। ‘
প্লেটের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো ইরা। কিছু কিছু স্মৃতি এত মধুর যে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা আপনাআপনি ফুটে উঠে। ভুলিয়ে দেয় বর্তমান পরিস্থিতি। ইরাও ভুলে বসল মিনিট খানিকের জন্য৷ হুশ হলো জাদিদের কন্ঠে,
‘ খাওয়া শেষ? বেলা হওয়ার আগে গোসল করে ফেলুন। আমার রান্নাও প্রায় শেষ। ‘
ইরা চমকে উঠলো খানিকটা। মনে পড়ে গেল নিষ্ঠুর নিয়তি। সঙ্গে সঙ্গে বুকে উথাল-পাতাল ঢেউ জমা হলো। অস্থির হলো মন। চোখ জ্বলছে। এই নিয়তি সে সইতে পারছে না কেনো? আর কত অশ্রু ঝড়াতে হবে? কেনো আজ মিহাদের যায়গায় জাদিদ দাঁড়িয়ে আছে? এই স্থানটাতে তো সর্বদা মিহাদকে কল্পনা করেছিলো সে। তবে আজ কেনো জাদিদকে মেনে নিতে হচ্ছে? উপর ওয়ালা কেনো তাকেই ফেললো এই বিড়ম্বনায়?
বিকাল সাড়ে চারটা। ডাইনিং টেবিলের দুইপ্রান্তে চেয়ারে বসে আছে জাদিদ এবং ইরা। দুপুরের পর থেকে ইরার শরীর খারাপ লাগছিলো। দুর্বল লাগছিলো বেশ। সে না বললেও জাদিদ খেয়াল করেছিলো ব্যাপার গুলো। তাই এখন জোরপূর্বক বসিয়ে প্রেসার চেক করছে ইরার৷ যা ভেবেছিল তাই। প্রেসার একদম ডাউন হয়ে আছে। নিশ্চয়ই আবারও দুশ্চিন্তা করেছে কিছু নিয়ে। জাদিদ গম্ভীর হলো খুব। মেশিন গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো,
‘ ইরা! আমি জানি আপনি খুবই ডিপ্রেশনে আছেন। থাকারই কথা। যা কিছু হয়েছে সেটা থেকে এত সহজে মুভ অন করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনারও বুঝতে হবে যে আপনি এখন আর একা নেই। নিজের জন্য না হলেও অন্তত বাচ্চাটার জন্য একটু কনসিয়াস হোন। আপনি কি মিহাদের মতো ওকেও হারাতে চাইছেন? ‘
ইরা চমকিত নজরে তাকাল। তার আহত দৃষ্টি বুঝতে পেরে নরম হলো জাদিদ। ইরার হাতের উপর হাত রেখে বলে উঠলো,
‘ আমি জানি আপনি ইচ্ছে করে করছে না এসব৷ কিন্তু বুঝার চেষ্টা করুন। আপনার অবহেলা,অভুক্ত থাকা আর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকা সব কিছু বেবির উপর বাজে প্রভাব ফেলবে৷ অন্তত ওর জন্য হলেও নিজের প্রতি যত্নশীল হোন, প্লিজ। ‘
ইরা প্রতিউত্তর করলো না। নিরবে জাদিদের হাতের নিচ হতে ছাড়িয়ে নিল নিজের হাত। জাদিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ মেশিন গুছিয়ে নিজের রুমে রেখে আসতে গেল সে৷ তখনই কলিং বেল বেজে উঠলো। ইরা। কাছেই ছিল বিধায় সে উঠে দরজা খুলে দিল৷ অনুভূতি হীন চোখে সম্মুখে তাকালেও দরজার উপাশে দন্ডায়মান মানুষটাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল সে। বুক কাঁপল বোধহয় একটুখানি। হতবিহ্বল হয়ে সে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
‘ তুমি? তুমি কোন সাহসে এখানে এসেছো? ‘
কলিং বেলের শব্দ পেয়ে জাদিদ-ও আসছিলো। ইরা’র চিৎকার শুনে প্রায় দৌঁড়ে আসল সে। দরজার অপর প্রান্তে ফারিহা দাঁড়িয়ে। সেই ফারিহা যাকে কোনো একদিন নিজের প্রেমিকা বলে স্বীকার করেছিলো মিহাদ। ইরা ক্রোধে ফেটে পড়েছে প্রায়। মিহাদের অস্তিত্ব নেই এই পৃথিবীতে। তবুও এই মেয়েকে তার সহ্য হচ্ছে না। না কখনো সহ্য হবে। ফারিহা আমতাআমতা করে বলতে চাইলো কিছু,
‘ ভাবি! আমি..আমি আসলে… ‘
‘ চুপ! তোমার কোনো কথা শুনতে চাইনা আমি। বের হও এখান থেকে৷ দূরে যাও… ‘
ইরা প্রায় তেড়ে গেল ফারিহার দিকে। মেয়েটা ভয় পেয়ে পিছু হাঁটল। অবস্থা বেগতিক দেখে পেছন থেকে ইরাকে টেনে ধরল জাদিদ।
‘ ইরা! ইরা..শান্ত হোন। আমার কথা শু… ‘
‘ ওকে আমার সামনে থেকে যেতে বলুন, জাদিদ। নয়তো এই মেয়েকে আমি খুন করব। সত্যি বলছি ওকে আমি… ‘
‘ ইরা প্লিজ চিৎকার করবেন না। কথা শুনুন, ও আমার কাজিন হয়। মিহাদের প্রেমিকা না, কিছুই না। মিহাদ ওকে ভালো করে চিনে না অবধি। শান্ত হোন প্লিজ! ‘
জাদিদের এহেন বাক্যে ছোটখাটো বজ্রপাত ঘটল যেন ইরার উপর। মেয়েটা থমকে গেল আচমকা। অবিশ্বাস্য নজরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল জাদিদের দিকে।
‘ ক..কি বললেন আপনি? ‘ শ্বাস আটকে প্রশ্ন করলো ইরা।
জাদিদ তপ্ত শ্বাস ফেললো৷ ইরা’র হাত টেনে ভেতরে ঢুকিয়ে চেয়ারে বসাল৷ এরপর ফারিহাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ ভেরতে এসো। ‘
ফারিহা ঢুকলো গুটিগুটি পায়ে। ইরা’র কাছ ঘেঁষতেও ভয় লাগছে তার। জাদিদ চেয়ার বাড়িয়ে দেওয়া মাত্র বেশ অনেকটা দুরত্ব রেখে বসে পড়ল সে। হাতের প্যাকট-টা জাদিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নম্র কন্ঠে জানাল,
‘ এটা রাখো। ভা..না মানে তোমাদের জন্য এনেছি। ‘
খানিকটা বড়সড় কোনো বক্স প্যাকেটে মোড়ানো। সম্ভবত খাবার জাতীয় কিছু রয়েছে এতে৷ সেটা টেবিলে রেখে দরজা বন্ধ করে এসে, ইরার পাশে চেয়ার টেনে বসল জাদিদ। ফারিহাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ আপাতত দেওয়ার মতো কিছু নেই। তাই অফার করতে পারছি না, স্যরি। ‘
‘ না না। আমি শুধু তোমাদের কে দেখতে এসেছি ভাইয়া। কিছু খাবনা। ‘
‘ এড্রেস কে দিল? ‘
‘ মেঝো ভাইয়া দিয়েছে। তোমার বন্ধু ড. ইশতিয়াকের কাছ থেকে নিয়েছে। ‘
‘ ওহ! বাসায় কেউ জানে কিছু। ‘
ফারিহা আড়চোখে ইরা’র দিকে তাকায়। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,
‘ মামা, মামী কাউকে কিছু জানতে দেয়নি। আর বিয়েতে তো তেমন কেউ ছিলনা। রিসেপশনের জন্য শুধু কাছের কয়েক জনকে বলেছিলো। বাকিদের বলার আগেই তো এসব ঘটে গেল। কেউ কেউ ভেবে নিয়েছে তুমি ফ্যামিলির অমতে বিয়ে করেছ। তাই কেউ মেনে নিচ্ছে না বলে বউ নিয়ে আলাদা থাকছ। ‘
জাদিদ মলিন হেসে জবাব দেয়,
‘ বাহ! ভালো তো। যা ভাবার ভাবুক। আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে যাবনা৷ ‘
দুজনের কথার মাঝে ইরা তীক্ষ্ণ কন্ঠে জাদিদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
‘ এই মেয়ে আপনার কি হয়? ‘
‘ ফুপাতো বোন। ‘
‘ আপনার বোন হলে ওর সাথে মিহাদের সম্পর্ক হলো কি করে? আর আপনি এত সিউর হয়ে কি করে বলছেন যে ওদের মাঝে কিছু ছিল না? মিহাদ নিজে বলেছিল আমাকে। এই মেয়েটা সেদিন… ‘
কথা আটকে গেল ইরা’র। মিহাদের পাশ ঘেঁষে এই মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল তা ভাবতেই রাগে শরীর কাঁপছে তার। ইরা’র মুখভঙ্গি দেখে ফারিহা ঢোক গিলল। মিনমিন কন্ঠে শুধালো,
‘ ভাবি! সত্যিই মিহাদ ভাইয়ার সাথে আম… ‘
‘ এই চুপ! তোমার মুখে ওর নামটাও শুনতে চাইনা আমি। ‘ রীতিমতো গর্জে উঠেছে ইরা।
ইরাকে এমন উত্তেজিত হতে দেখে জাদিদ দিশেহারা। উপায়ান্তর না পেয়ে সে হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ ইরা! ইরা, প্লিজ শান্ত হোন। সত্যিই ওদের মাঝে কোনো সম্পর্ক ছিলনা। আপনি যা দেখেছেন, যা শুনেছেন সব প্রি-প্লান ছিল। মিহাদ এমটা বলেছিল যেন ওর উপর জেদ করে হলেও আপনি বিয়ে করার জন্য রাজি হয়ে যান। ‘
দ্বিতীয় বারের মতো ধাক্কা খেলো ইরা। তার বিমূঢ় দৃষ্টি জাদিদের দিকে নিবদ্ধ। এই মুহূর্তে কি বললো জাদিদ? মিহাদ চেয়েছে যেন সে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলে? এজন্য এত নাটক? কেন? অন্য কাউকে যদি ভালো না-ই বা বাসত, তবে কেনো ইরাকেও ছাড়ল সে?
‘ মিথ্যে। মিথ্যে বলছেন আপনি। ও কখনো এমন করতেই পারে না। ‘
পূণরায় ইরা’র হাত টেনে চেয়ারে বসিয়ে দিল জাদিদ। কথাগুলো কীভাবে উপস্থাপন করবে তা ভেবে পাচ্ছে না সে। এসব শুনলে তো ইরা ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে পুরোপুরি। কিন্তু তবুও, তাকে জানতে হবে। অধিকার আছে তার জানার। বার কয়েক ঢোক গিলে নিজেকে প্রস্তুত করলো জাদিদ। পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করলো। নির্দিষ্ট ছবিটা বের করে মোবাইল বাড়িয়ে দিল ইরা’র দিকে। ইরা প্রশ্নবিদ্ধ ভঙ্গিতে নিয়ে নিল তা। অনাগ্রহী চোখে স্ক্রীনে দৃষ্টিপাত করলো ঠিক। কিন্তু সেকেন্ড কয়েক পর থরথর করে কেঁপে উঠল হাত। হতবিহ্বল দৃষ্টি আটকে গেল মোবাইল স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা সাদা কাগজটার দিকে। রিপোর্ট! মিহাদের রিপোর্ট! কি ভুলভাল লিখে রেখেছে এসব! এ অসম্ভব!
তাকে উত্তেজিত হতে দেখে জাদিদ মোবাইল নিয়ে নিল। একহাতে ইরার হাত চেপে ধরল ভরসা সরূপ। নম্র কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ এটাই আসল সত্য ইরা। মিহাদের ব্রেন টিউমার ছিল। ঠিক কত দিন যাবত নিজের মধ্যে এটা ধরে রেখেছে সেটা ও নিজেও জানে না। মাথাব্যথা কে মাইগ্রেনের ব্যাথা ভেবে স্বাভাবিক ঔষধ খেয়ে খেয়ে দিনের পর দিন পার করেছিল। কিন্তু গত ছয় মাস আগে, মাথা ব্যাথার সাথে প্রায়ই বমি হচ্ছিল, শরীরে কাঁপুনি দিত, চোখে ঝাপসা দেখত, মুখের স্বাদ চলে গিয়েছিল সেই সাথে দুই দুইবার জ্ঞান হারিয়েছিলো বলে ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হয়েছিলো তার। চেকআপ করানোর পর জানতে পেরেছিলো এই নির্মম সত্য। ও নিজেই মেনে নিতে পারেনি। সবটা অবিশ্বাস্য লাগছিলো। চেয়েছিলো সবটা ঠিক করতে। অপারেশন করানোর কথাও ভেবেছিলো। কিন্তু.. কিন্তু লাস্ট স্টেজ ছিল তখন। অপারেশন সাকসেস হওয়ার চান্স একদমই ছিলনা। ডাক্তার-রা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে অপারেশন করালে সেখানেই মৃত্যু হতে পারে। না করালেও মৃত্যু নিশ্চিত। তবে হাতে সময় ছিল মাত্র কিছু মাস। পাওয়ারফুল কিছু মেডিসিন দিয়েছিল। যেগুলো ওকে অল্প সময়ের জন্য সুস্থ রাখত, পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। অসম্ভব ছিল সেটা। ‘
জাদিদ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল। তার হাতের নিচে চাপা পড়া ইরার হাতটা মৃদু মৃদু কাঁপছে। দেহ শীতল হয়ে এসেছে। মেয়েটা বিবশ হয়ে আছে। কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া করছে না। জাদিদ চেয়ার টেনে আরও একটু কাছে আসল। ফের বলা আরম্ভ করলো,
‘ আপনাদের যেদিন বিচ্ছেদ হলো, ঠিক তার দুই সপ্তাহ আগেই এসব জানতে পেরেছিলো মিহাদ। এসব জানার পর ওর মনে সবার আগে আপনার চিন্তা উঁকি দিয়েছিল। ও জানত আপনি ওকে কতটা ভালোবাসেন সেটা। এসব জানতে পারলে আপনি ওকে কখনোই ছাড়তে চাইতেন না। পারলে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতেন, নয়তো অপারেশন করাতেন একটুখানি আশা নিয়ে। কিন্তু মিহাদ সেটা চায়নি। ও অপারেশন করিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিদায় নিতে চায়নি। আরও কিছুদিন আপন মানুষ গুলোর সাথে বাঁচতে চেয়েছিলো। যাওয়ার আগে আপনার ভবিষ্যৎ গড়ে যেতে চেয়েছিলো। আপনাদের বিচ্ছেদের পরেও সে আপনার সব খোঁজ রাখত। আপনার ছোট চাচ্চুর ছেলের কাছ থেকে সবসময় আপনার খোঁজ নিত। আপনাদের বিচ্ছেদের একমাসের মাথায় আপনি আমাদের হাসপাতালে পেশেন্ট হয়ে এলেন। ঠিক তার কিছুদিন পরেই আমি প্রপোজাল পাটিয়েছিলাম।
তার পাঁচ দিনের মাথায় হঠাৎ একদিন মিহাদ আসল আমার কাছে। সরাসরি জানাল, সে আপনার প্রাক্তন প্রেমিক। কথা বলতে চাইল আমার সাথে। আমি বুঝলাম সে বিয়ে ভাঙ্গতে এসেছে। সেই মনোভাব নিয়েই কথা বলতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ও জানাল আমি যেন আপনাকে বিয়ে করে নিই৷ সেই পাঁচদিন ও আমার ব্যাপারে সব খোঁজ নিয়েছিলো। ও জানত আমি ব্যাক্তিগত ভাবে আপনাকে পছন্দ করে প্রপোজাল পাঠিয়েছিলাম। আমি যখন জানতে চাইলাম, নিজের প্রেমিকাকে কেন আমার সাথে বিয়ে দিতে চাইছে। তখন ও এই রিপোর্ট গুলো দেখিয়েছিল আমাকে। বলেছিল যেন কাউকে না বলি। সেদিন ওর চোখে এক সমুদ্র অসহায়ত্ব দেখেছিলাম আমি ইরা। ছেলেটা কত নিষ্ঠুর ভাবে চোখের অশ্রু আটকে রেখেছিল তা আমি দেখেছি কেবল। নিজের ভালোবাসাকে এভাবে অন্যের কাছে সপে দেওয়া মোটেও সহজ না। অন্য জনের সাথে দেখার চেয়ে তো মৃত্যু শ্রেয়। কিন্তু মিহাদ! সে ভালোবাসার সব স্তর পার করে গিয়েছে। আমাকে সে হাত জোর করে অনুরোধ করেছে আমি আপনাকে বিয়ে করে নিই। সুখে রাখি। মিহাদ জানত, ওর মৃত্যুর পর আপনি কোনোভাবেই অন্য কাউকে বিয়ে করার জন্য রাজি হবেন না। তাই তো এত এত ছলনা করেছে সে। আমি সেই প্রেমিক পুরুষের অনুরোধকে অগ্রাহ্য করতে পারিনি। তাছাড়া ভালোবেসে ফেলেছিলাম আপনাকে। এই সুযোগ কীভাবে হাতছাড়া করতাম তবে!
সেদিনের পর প্রায়-ই মিহাদের সঙ্গে দেখা হতো আমার। আমি যেহেতু কার্ডিওলজিস্ট (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ) তাই ওর ব্যাপার গুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। সেজন্য আমি আমার বন্ধু ড. ইশতিয়াক আহমেদ এর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিলাম। যে একজন নিউরোলজিস্ট। গত চার-পাঁচ মাস যাবত মিহাদ ওর অবজারভেশনে ছিল। একদিকে আপনি ওর উপর অভিমান করে ছিলেন। আর অন্য দিকে আপনাদের বন্ধুরাও পিছে পড়ে ছিল মিহাদের সত্য উদঘাটন করার জন্য। মিহাদ ওর বেস্ট ফ্রেন্ডদের কে বেশ ভালো করেই চিনত। মিহাদের কাছে কিছুর উত্তর না পেরে তারা ওর ছোট ভাইকে দিয়ে দুই দুইবার মিহাদের রুম সার্চ করিয়েছিলো। বাই চান্স, কোনো ক্লু যদি পায় এই উদ্দেশ্যে। এসব মিহাদ জানতে পেরে ওর ফাইল পত্র সব সরিয়ে ফেলেছিলো গোপন যায়গা হতে। রিপোর্ট সব ইশতিয়াকের কাছেই ছিল।
আপনাকে শত অবহেলা করার পরেও আপনি বিয়েতে রাজি হচ্ছিলেন না দেখে, মিহাদ নিজেই পরিকল্পনা করেছিলো ওর অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে একথা জানানোর। ওর চেনাজানা সব মেয়েকে আপনিও চিনতেন তাই আমিই হেল্প করলাম ফারিহা কে এনে। ফারিহার সাথে ওর মাত্র দুইবার দেখা হয়েছে। প্রথম বারে আমিও ছিলাম সাথে। যেদিন আপনি ওকে ফোন করে শেষ বারের মতো দেখা করতে চাইলেন, সেদিন পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম। সেই মোতাবেক এগিয়েছে সব। মিহাদ জানত আপনি ওর ব্যাপারে ভীষণ সেনসিটিভ। ওকে কখনো,কোনো মেয়ের সঙ্গে মেনে নিতে পারবেন না। তাই তো, ওই পরিকল্পনা। আর হলোও তাই। আপনি মিহাদের সঙ্গে জেদ করে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন। সেদিন রাতে মিহাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো আমার। আমাকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে ও সেদিন ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছিলো। আমি আপনাকে পাব সেটার জন্য বিন্দুমাত্র খুশি হতে পারছিলাম না মিহাদের অসহায়ত্ব দেখে। ছেলেটা বুকে হাত চেপে আমাকে বারবার বলছিল,
‘ আমি ওকে সুখী থাকতে দেখতে চাই জাদিদ ভাই। আমি তো এটাই চেয়েছি যেন ও বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু..কিন্তু এখন যখন ও রাজি হলো, আমার ভেতরটা এত পুড়ছে কেনো? ইচ্ছে করছে যতদিন বাঁচব, ওকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে। আমি এতটা স্বার্থপর! ‘
‘ আপনি ওকে সেদিন বিয়ে করবেন। আমি বেঁচে থাকলে কখনো সেদিন থেকে আর আমার সামনে আসবে না। আমি ওর স্বামী রূপে আপনাকে সহ্য করতে পারব না। সত্যি বলছি, এত বেশি সহ্য ক্ষমতা নেই আমার মধ্যে। আপনারা ভালো থাকবেন। আমার ইরাব.. মানে আপনার ব..বউকে অনেক সুখে রাখবেন। ও তো ভীষণ আবেগী। আমাকে ভুলতে নিশ্চয়ই অনেক বেশি সময় লেগে যাবে। আপনি প্লিজ এসব নিয়ে কখনো ঝামেলা করবেন না। কখনো ওকে ভুল বুঝবেন না। এটা আমার অনুরোধ। প্লিজ! ‘
দৃশ্য গুলো ফের চোখে ভেসে উঠতেই জাদিদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ঠোঁট কামড়ে ধরে সে। ঘনঘন ঢোক গিয়ে পূণরায় বলতে শুরু করে,
‘ বান্দরবান ট্রিপের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রাতটার ব্যাপারে আমাকে কিছুই জানায়নি মিহাদ। কিন্তু যেদিন আমি জানতে পারলাম আপনার প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে। সেদিন না চাইতেও মিহাদের উপর রাগ হয়েছিল ভীষণ। আমি এই খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে মনস্থির করে ফেলেছিলাম যে আপনাকে আমি বিয়ে করব না। আমি কেনো! কোনো পুরুষই প্রাক্তন প্রেমিকের বাচ্চা ধারণ করা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হবে না৷ রাগ নিয়েই সপ্তাহ খানিক সব যোগাযোগ বন্ধ রাখলাম। এরপর মিহাদ নিজেই আসলো আমার কাছে। সেদিন রাগ করে বেশ বাজে কথা শুনিয়েছি ওকে। আমি চাইনি শুনাতে। তবুও, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আমার মুখ থেকে আপনার প্রেগন্যান্সির কথা শুনে মিহাদ সেদিন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছিলো। পাঁচ মাসের পরিচয়ে নিজেকে বেশ শক্ত দেখানোর প্রচেষ্টা করত সে। কখনো আমাকে বা অন্য কাউকে বুঝতে দেয়নি ভেতরে ভেতরে সে কতটা দুর্বল, কতটা ভঙ্গুর। কিন্তু সেদিন..
বলতে বলতে সেই দিনটার ভাবনার ডুবে গেল জাদিদ। তার কন্ঠে কাঁপছে মিহাদের সেদিনের চেহারাটা মনে পড়তেই। বদ্ধ কেবিনের সোফায় হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড বসে ছিল মিহাদ। তারপর জাদিদের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য কন্ঠে জানতে চেয়েছিল,
‘ অ..আমার বাচ্চা! আমার ইরাবতী প্রেগন্যান্ট! ‘
জাদিদ তখন বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলো। হতবিহ্বল মিহাদ অপ্রত্যাশিত এই খবর শুনে নিজেকে সামলানোর সব শক্তি হারিয়ে বসল। গুড়িয়ে গেল পুরুষ সত্তা। দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। আকস্মিক এমন প্রতিক্রিয়ায় জাদিদ হকচকিয়ে গেল৷ বুঝে উঠতে পারল না কি বলবে। মিহাদ করুণ সুরে কাঁদছে। ভাগ্যের এক পরিণতি তো মেনে নিয়েছিল সে। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে প্রিয়তমা কে সুখী করতে চেয়েছে। কতটা দহন বুকে চেপে একেকটা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা কেউ জানে না। কেউ না। কিন্তু আজকে নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়েছে। উপর ওয়ালা যদি তার আয়ু এতটা অল্প সময়ের জন্য বরাদ্দ করেছিলো, ইরাবতী’র সঙ্গে তার পূর্ণতা যদি না-ই বা নির্ধারণ করেছিলো তবে এই বাচ্চাটা কেন দিল? মিহাদ তো সবসময় স্বপ্ন দেখে এসেছে ইরাবতী এবং তার ছোট্ট একটা বাচ্চা হবে। কানায় কানায় পরিপূর্ণ হবে সুখ,ভালোবাসা। তবে আজ এই সুখবর শুনেও কেনো খুশি হতে পারছে না সে? ভাগ্যের এ কেমন নিষ্ঠুরতা? তার ইরাবতী কি করে সামলাবে নিজেকে? যে মুহুর্তে ইরা’র পাশে সারাক্ষণ মিহাদকে উপস্থিত থাকার কথা। সেখানে আজ মিহাদ ইরা’র কাছে থেকে যোজন যোজন দূরে। আর কিছু মাস পর হয়ত একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবে পৃথিবী হতে। তখন! তখন মিহাদের সন্তান এবং সন্তানের মায়ের ঢাল হবে কে? কে মিহাদের মতো করে আগলে রাখবে তাদের?
কথাগুলো ভেবেই চোখের অশ্রু বাদ মানছে না মিহাদের। আজ সে ভেঙ্গে পড়েছে সম্পূর্ণ রূপে। এই নির্মম সত্য সে মানতে পারছে না। মনে প্রাণে চাইছে, এসব মিথ্যে হয়ে যাক। কোনো এক দুঃস্বপ্ন রূপে ভেঙ্গে যাক ঘুম। কিন্তু এমন কিছুই যে হওয়ার নয়। না সে এই নিয়তি মেনে নিতে পারবে, আর না পারবে স্ব-চক্ষে নিজ সন্তান দেখে তৃপ্তি নিয়ে মরতে। এত এত অপ্রাপ্তি নিয়ে কেনই বা তার ভাগ্য লিখল সৃষ্টি কর্তা? এমনই যদি হওয়ার ছিল, তবে এতটা ভালোবাসার জন্ম দিল কেন বুকে? এই দুজনকে ছাড়া যে মরেও শান্তি পাবে না সে।
জাদিদ কাঁধে হাত রেখে স্বান্তনা দিতেই দুই হাতে মুখ ঘেঁষল মিহাদ। অশ্রু মুছলেও ফের ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি। কাঁধে থাকা জাদিদের হাতটা নিজের দুইহাতের মধ্যে নিয়ে যে আকুতিভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ জাদিদ ভাই! অ..আমি আমি ইচ্ছে করে লুকাইনি বিষয়টা। আসলে যা হয়েছে তা একটা এক্সিডেন্টে ছিল শুধু। আমরা দুজনেই ড্রাংক ছিলাম৷ আমি জানি আপনার খারাপ লাগছে। কিন্তু, বিশ্বাস করুন, সেই এক্সিডেন্ট-টাই ছিল প্রথম, এবং শেষ বার। আমাদের মধ্যে এমন কোনো ঘনিষ্ঠতা কখনো ছিলনা। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি ঠিক। কিন্তু কোনো ধরনের নোংরামি তে কখনো মেতে ছিলাম না। আপনি ভুল বুঝবেন না। ‘
‘ আমার যায়গায় তুমি থাকলে কি করতে মিহাদ? এমন মেয়েকে নিজের বউ করতে রাজি হতে? আ’ম স্যরি টু সে। কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বোঝার চেষ্টা করো। ‘
‘ আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু! কিন্তু আমি নিরূপায়। আপনি পাশে না থাকলে আমার ইরা মরেই যাবে। এসব জানাজানি হলে ওকে কেউ সাপোর্ট করবে না। যা হয়েছে তাতে তো ওর দোষ ছিলনা। সবটা আমার ভাগ্যের দোষ। আজ আমার জন্য ওকে সাফার করতে হচ্ছে। আপনি তো ওকে ভালোবাসেন তাই না? তাহলে এটুকু তেই কেনো পিছিয়ে যাচ্ছেন? আপনি ছাড়া আমি আর কারো উপর ভরসা করতে পারছি না। দয়া করুন। ইরাকে মেনে নিন প্লিজ।
মিহাদের আকুতি মিনতির কাছে জাদিদ না চাইতেও গলে গেল। তাছাড়া সে মন থেকেই ভালোবেসেছে ইরাকে। ভালোবাসা সত্যি হলে ভালোবাসার মানুষকে সব রূপেই ভালোবাসা যায়। জাদিদ নিজেও চাই ইরাকে ভালো রাখতে। অন্তত এই মৃত্যু পদযাত্রী মানুষটার শেষ ইচ্ছে হিসেবে হলেও সে ইরাকে সুখী করতে চায়।
জাদিদের হাত ধরে ভাঙ্গা গলায় মিহাদ বলে উঠলো,
‘ আপনার কাছে আমার শেষ আবদার জাদিদ ভাই। আপনি প্লিজ আমার বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমি জানি ইরা’র পরিবার এসব জানতে পারলে হয়তো অ্যাবোর্শন করাতে বলবে৷ কিন্তু আমি চাই ও বেঁচে থাকুক। আপনার যদি ওকে নিজের কাছে রাখতে সমস্যা হয় তাহলে আমার মা’য়ের কাছে দিয়ে দিবেন। তবুও আমার বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখাবেন প্লিজ। এ আমার শেষ অনুরোধ। আমি জানি আপনি পারবেন। আমার আমানত দুটো আমি আপনাকে সপে দিলাম। ‘
জাদিদের এখনো বুক কাঁপছে দৃশ্যটা ভেবে। সেদিনও কেঁপেছিল। কি করে নিষ্ঠুর হতো সে! ওর স্থানে অন্য কেউ হলেও বোধহয় সাধ্য থাকত না মিহাদের এই আকুতি অগ্রাহ্য করার। জাদিদও পারেনি। ফারিহা আবেগী হয়ে নাক টেনে টেনে কাঁদছে। সে খানিকটা অবগত ছিল ঠিকই। কিন্তু মিহাদের এত বড় ত্যাগের ব্যাপারে জানতে পেরে অশ্রু বাঁধ মানছে না তার।
‘ আমি মিহাদের শেষ আমানত রক্ষা করার দ্বায়িত্ব নিয়েছি ইরা। সৃষ্টি কর্তা হয়তো আমাকেই উত্তম মনে করেছেন, আমার মাঝেই দিয়েছেন আপনাদের দুজনকে ভালো রাখার সকল যোগ্যতা। তাই আমি মিহাদকে না করতে পারিনি। সেদিনের পর দিনই আপনার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করেছি। মিহাদ এসেছিলো সেদিন। আপনি হয়তো অনুভব করতে পেরেছিলেন তাকে। ও তো কেবল বাচ্চাটার অস্তিত্ব একটাবার ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কে জানত! সেটাই প্রথম এবং শেষ বার হবে! আপনি হয়তো জানেন না, হার্ট অ্যাটাক এবং ব্রেন স্ট্রোক একসঙ্গে হওয়ার দরূণ মৃত্যু হয়েছিলো মিহাদের। ইশতিয়াক বলেছে দুই দিকেই অত্যাধিক দুশ্চিন্তার চাপ পরেছিল বলেই এমনটা হয়েছিলো। তাও আমাদের বিয়ের রাতেই। সে আপনাকে ছাড় তো দিয়েছিল, কিন্তু ছেড়ে দিতে পারেনি।। মেনে নিতে পারেনি আপনাকে আমার সঙ্গে। তাই তো….! মিহাদ আপনাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসত ইরা। যতটা ভালোবাসলে আপনার সুখের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেওয়া যায়, ততটা ভালোবেসেছে।
জাদিদ থামল। পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেল ঘরজুড়ে। থেমে থেমে কেবল ফারিহার নাক টানার শব্দ আসছে কানে। ইরা বিমূঢ়, বিবশ৷ রক্তিম আঁখিদুটি সফেদ টাইলসে নিবদ্ধ। ফারিহা এগিয়ে আসলো তার দিকে। ভাঙ্গা স্বরে বলে উঠলো,
‘ আমাকে ভুল বুঝবেন না ভাবি। আমার সঙ্গে সরাসরি কখনো কথা হয়নি মিহাদ ভাইয়ার সঙ্গে। একবার আপনার সামনে দেখা হলো। অন্যবার জাদিদ ভাইয়া সাথে। মিহাদ ভাইয়া কখনো ঠিক করে ফিরেও তাকায়নি আমার দিকে। সে শুধু আপনাকে ভালোবেসেছিল। আর তাছাড়া, আমি এংগেইজড। ‘
ইরা শুনেও যেন শুনেনি কথাগুলো। সেকেন্ড দুয়েক কাটলো গুমোট নীরবতায়। জাদিদ মনে মনে বেশ ভয় পেল ইরাকে এমনা দেখে। সে মৃদু কন্ঠে বারকয়েক ডাকলো, ইরা!
ইরা’র চোখের পাতা কাঁপল এবারে। আটকে রাখা শ্বাসটা ফেলল। হাত নড়াচড়া করতেই জাদিদ তার হাতটা ছেড়ে দিল। তখনই দাঁড়িয়ে গেল ইরা৷ জাদিদ চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
‘ কোথায় যাচ্ছেন? ‘
‘ আমাকে একটু একা থাকতে দিন। ‘
নিষ্প্রাণ কন্ঠের আকুতি। জাদিদ চুপসে গেল একথার বিপরীতে। ইরা নিজের রুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল। তাতে পিঠ ঠেকিয়ে শ্বাস ফেলছে অস্বাভাবিক ভাবে। চোখ জ্বালা করছে ভীষণ। গলায় অসম্ভব রকমের ব্যাথা লাগছে। কানে বাজছে জাদিদের একটা একটা কথা। সহ্য হচ্ছে না। একেবারে সহ্য হচ্ছে না সেসব। জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে দুইহাতে চুল খামচে ধরল সে। দাঁতে দাঁত চেপে কান্না চাপা বৃথা চেষ্টায় মুখ দিয়ে ‘ইইইই’ ধরনের অদ্ভুত, জেদি স্বর বের হলো। তপ্ত অশ্রুতে সিক্ত হলো গাল। অসম্ভব ধরনের রাগে, অভিমানে রুমের জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলছে সে। সব কিছু তছনছ করে দিয়ে ফের নিজের চুল টেনে ধরল। কেঁদে উঠল উচ্চ কন্ঠে। হাউমাউ করে কান্না করতে করতে ফ্লোরে মাথা ঠেকল তার। পেটে একহাত চেপে করুণ সুরে আহাজারি করে উঠলো,
‘ আমি তোকে ক্ষমা করব না মিহাদ। কক্ষনো ক্ষমা করব না। ‘
‘ এত বড় সত্যিটা একটাবার জানালি না? এতগুলো মাস ধরে নিজের সাথে আমাকেও কেন নরক যন্ত্রণা ভোগ করালি তুই? কেন একটাবার জানালি না? কেনো শেষ সময়ে পাশে থাকার সুযোগ দিলি না? কেনো?? ‘
‘ তোকে ভালোবাসার এই প্রতিদান পাব জানলে আমি কখনো তোকে ভালোবাসতাম না। তুই এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হলি? কি করে পারলি আমাকে অন্যের কাছে সপে দিতে? ‘
‘ আমি ওকে কি করে বড় করব? তোর বাচ্চাকে সামলানোর দ্বায়িত্ব তো তোর ছিল তাইনা? কথা দিয়েছিলি, আমাদের বাচ্চাকে তুই মানুষ করবি। পালন করতে না পারলে কেনো ওয়াদা করেছিলি? কেনো স্বপ্ন দেখালি আমাকে? আমি ওকে কি করে সামলাব? ও যদি তোর অবয়ব নিয়ে আসে তাহলে তো রোজ একটু একটু করে মরব আমি। এ কোন যন্ত্রণা দিয়ে গেলি মিহাদ? এর চেয়ে ভালো ছিলো আমরাও তোর সঙ্গে চলে যেতাম। ‘
জানি না কখন এই চিঠি হাতে পাবি তুই। কিন্তু যখন পড়ার সুযোগ হবে, তখন আমি থাকব তোর ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। এখন নিশ্চয়ই তুই সুখ নীড়ের অগোছালো বেডরুম টা তে পড়ে আছিস, তাই-না? আমার উপর রাগ,অভিমান জমে আছে বলে বাকিদের কাছ থেকেও মুখ ফিরিয়ে রেখেছিস নিশ্চয়ই। তোকে জানা আছে আমার। আমি সিউর এমনটাই হয়েছে। কি করতাম বল! যেদিন প্রথম রিপোর্ট হাতে পেয়েছিলাম, মনে হচ্ছিলো সেখানেই জীবন থেমে গেছে আমার। মা’র জন্য, ইরা’র জন্য, তোদের জন্য ভীষণ মন পুড়ছিলো। ভেবেছিলাম অন্তত তোকে জানিয়ে দিই৷ কিন্তু কেন জানি না সাহস হয়নি। তোদের চোখে আমার জন্য করুণা, সহানুভূতি দেখতে চাইনি আমি। জানালে তো তোরা জোর করে হলেও অপারেশন করাতি। সেই সাহস আমার ছিলনা। ডাক্তার বলেই দিয়েছিল এতে লাভ নেই। চান্স একেবারে কম। অপারেশন করে সাথে সাথে মরার চেয়ে তোদের সাথে আরও কিছু স্মৃতি জমাতে চেয়েছি। সত্যটা লুকিয়ে নিজেও সেসব ভুলে থাকতে চেয়েছি। আমি জানি তুই কত ছলচাতুরী করেছিস আমার বদলে যাওয়ার কারণ জানার জন্য। তোর অভিযোগ গুলো শুনেও বলতে পারিনি রে। অন্তত তোর চোখে আমি কোনো অসহায়ত্ব দেখতে চাইনি। আমি জানি এখনও তুই রেগে আছিস। আমার উপর, নিজের উপর। অনেক অভিযোগ জমে আছে তাইনা? কিন্তু আমি যে নিরূপায় ছিলাম। চাইনি শেষ মুহুর্ত গুলোতে সবার কষ্ট দেখে যেতে।
কিন্তু না চাইতেও আমি আমার ইরাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। ওকে দেওয়া প্রত্যেকটা কথার আঘাত আমাকে রোজ একটু একটু করে মেরেছে। আজ যখন জাদিদ ভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম, আমার ইরা মা হতে চলেছে। মনে হচ্ছিলো এর চেয়ে বেশি যন্ত্রণা আর কখনো হয়নি আমার। যে খবর টা শুনে আমার খুশি হওয়ার কথা,ইরাকে খুশি রাখার কথা। সেখানে আমার নিজেকে উন্মাদ মনে হচ্ছিলো। আমি তো চাইনি এমনটা হোক। এই খবর শুনে কতটা ভেঙ্গে পড়েছি আমি নিজেও অনুমান করতে পারছি না। বাড়ি ফিরতেই তোর সাথে দেখা। একই ব্যাপার টা নিয়ে তোর কতশত কথা শুনলাম আজ। বন্ধুত্ব-টাও ভেঙ্গে দিলি। শেষ মুহুর্তে এসে আমি নিজেও হারিয়ে যাচ্ছি, তোদের কেও হারাচ্ছি। জানি না আজকের পর আদো তুই আমার কাছে কখনো আসবি কিনা। কিন্তু আমি একটা শেষ অনুরোধ রেখে গেলাম তোর কাছে। আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে দিস, ভাই। ওকে নিয়ে আমার কতশত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এতটা দুর্ভাগ্য নিয়ে ও আসবে তা আমি কখনো কল্পনা করিনি রে। জানি না জাদিদ ভাই মন থেকে ওকে আপন করবে কি না। কিন্তু আমি জানি তুই পারবি। ওকে আমার মায়ের কাছে হলেও দিয়ে দিস। তোরা আগলে রাখিস। আমি মানিনা আমার সন্তান অপবিত্র, নাজায়েজ। এমন কোনো কথা যেন ও কখনো না শুনে৷ দরকার হলে কখনো জানতেই দিস না ওর বাবার আসল নামটা কি। শুধু জানিয়ে দিস, বাবা ওকে ভীষণ ভালোবাসে।
আমার ইরাবতী-কে দেখে রাখিস। জাদিদ ভাই মানুষ টা ভীষণ ভালো। আমি জানি সে ভালো রাখবে ইরাকে। কিন্তু আমি যাওয়ার পর ইরাকে তোদের খুব দরকার পড়বে। বিশেষ করে তোকে ওর ভীষণ প্রয়োজন। তুই তো জানিস ও তোকে কতটা মানে। তুই বললে ও খুব দ্রুত সামলে নিবে নিজেকে। আমার বাচ্চাটার জন্য হলেও ওর ভালো থাকাটা প্রয়োজন। ওর পাশে থাকিস সবসময়, প্লিজ। আমার মা’কে, মাহাদীকে দেখে রাখিস। বাবা তোকেও নিজের ছেলে মানে। আমার অনুপস্থিতিতে তুই উনার ছেলের কমতিটা পূরণ করিস। মাহাদী টা এখনো ভীষণ ছোট। এই ছোট বয়সে ওর উপর কত বড় দ্বায়িত্ব দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি আমি। ভাইটাকে আগলে রাখিস।
যেতে যেতে তোর কাঁধেও কতশত দ্বায়িত্ব সপে দিতে হচ্ছে। তুই ছাড়া এসব বলার মতোও কেউ যে নেই। আমি জানি তুই পারবি। সব কথা রাখবি।
আরও অনেক কিছু বলার ছিলো। আজ আর শক্তি কুলাচ্ছে না। এই চিঠি হাতে পাওয়ার পর একদম মন খারাপ করবি না। ভেঙ্গে পড়া রূপে তোকে মানায় না। আমার আমানত গুলো রক্ষা করার জন্য, আমার আত্মার শান্তির জন্য, আর তোর সুবহা’র জন্য হলেও তোর ভালো থাকাটা প্রয়োজন। যেতে যেতে তোর ভালোবাসার মানুষ হিসেবে সায়েরীকে দেখে যেতে পারছি এটা আমার জন্য সৌভাগ্যের। ভালো থাকিস ভাই আমার। আর, পারলে মাফ করে দিস। আমি চেয়েও পারিনি তোকে বলতে।আমি চিনি তোকে, নিজেকে দোষারোপ করবি তুই। আমার মরণব্যাধি রোগটা উপর ওয়ালার ইচ্ছে ছিল। এটাকে তুই নিজের ব্যার্থতা ভাববি না। নিজের উপরে দোষ চাপাবি না একদম।
কখনো বলার সুযোগ হয়নি। আজ বলছি, মিহাদ তোকে ভীষণ ভালোবাসে। আবরার, নীতি, রায়ান, জিমন তোরা সবাই আমার শেষ সময়ের আরেকটু বাঁচতে চাওয়ার কারণ। তোরা কষ্ট পাবি বলেই তো জানাইনি কিছু। তাই আমাকে হারানোর পরেও কষ্টগুলো দীর্ঘস্থায়ী করিস না। সবাই মিলে আমার ইরাবতীর আমার বাচ্চাটার খেয়াল রাখিস। মা’কে দেখে রাখিস।
_মিহাদ
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম শব্দগুচ্ছের, যন্ত্রণাদায়ক চিঠি বোধহয় এটি। যার প্রতিটি বাক্য বুক তীরের ফলা হয়ে বিঁধছে। টলমল দৃষ্টিতে কাগজের অধিকাংশ বাক্য-ই ঝাপসা ভাবে পড়েছে সাফওয়ান। তার বাদামী চোখজোড়া অসম্ভব রকমের লাল হয়ে আছে। চোখ দিয়ে যেন অশ্রু নয়, রক্ত গড়াচ্ছে। তপ্ত রক্ত। যা বুকের রক্তক্ষরণ। এই চিঠি টা মাত্র কিছু মুহূর্ত পূর্বে জিমন এসে দিয়ে গেছে। মিহাদের বাসায় গিয়েছিল সে। সেখানে মাহাদী মোট তিনটে চিঠির সন্ধান পেয়েছে মিহাদের রুম হতে। প্রতিটা খামে নাম বরাদ্দ করা। সাফওয়ান, আবরার এবং ইরা। প্রিয় তিন মানুষের জন্য শেষ মুহুর্তে মনের কথাগুলো ব্যক্ত করে গিয়েছে সে। চিঠিটা পড়ে থম মেরে রইলো সাফওয়ান। কেবল পুরুষ মানুষ ট্যাগ টা আছে বলেই হয়তো এমন গুমোট অনুভূতি নিয়ে থমকে আছে সে। মেয়ে হলে এই মুহুর্তে হাউমাউ করে কাঁদতো। কেঁদে কেটে বুকের হাহাকার বিসর্জন দিতো অশ্রু রূপে। কিন্তু সেটা যে সম্ভব নয় তার পক্ষে। তাছাড়া মিহাদ তো বলেই গেল, যেন ভেঙ্গে না পড়ে। তার উপর এখন অনেক দ্বায়িত্ব। অনেক। মিহাদের বাবা-মায়ের ঢাল হতে হবে তাকে। ইরা’র সাহস,শক্তি হয়ে পাশে থাকতে হবে। আর সায়েরী… ভাবতে গিয়ে আকস্মিক সায়েরীর চিন্তা ধাক্কা লাগল মস্তিষ্কে। মনে পড়ে গেল সেদিনের আচরণ। রাগের বশে ফুলদানি ছুড়ে মেরেছিল সে। কত জোরে ধমক দিয়েছিল! মেয়েটার লাগেনি তো? আর তো আসলো না এই দুইদিনে। ঠিক আছে কি সে?
চিন্তিত মস্তিষ্কে হাতের চিঠিটা যত্ন করে ভাঁজ করে ড্রয়ারে তুলে রাখল সাফওয়ান। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল কেমন অগোছালো বেশভূষা তার। কাল রাত একটার দিকে শাওয়ার নিয়েছিলো। মাইগ্রেনের ব্যাথায় ঘুম হয়নি সারা রাত। গোসল করে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট এবং হাতের কাছে থাকা ড্রপ সোল্ডার টি-শার্ট জড়িয়েছিল গায়ে। এখনো সেসব-ই রয়েছে। সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিজের হাল দেখে৷ কাবার্ড থেকে পছন্দসই কাপড় বের করে, গোসল করে পরিপাটি করলো নিজেকে। রুম থেকে বের হয়ে নিচে এসে লক্ষ্য করলো সম্পূর্ণ ঘরজুড়ে পিনপতন নীরবতা। কেউ নেই! বন্ধুরাও চলে গেছে সকলে? অবশ্য থেকেও তাদের কাজের কাজ তো কিছু হচ্ছিলো না। ভালোই হলো।
চাবি নিয়ে গ্যারেজের দিকে এগোতে এগোতে সে কল করল আবরারকে। ভালো মন্দ খোঁজ নেওয়ার পর বললো,
‘ জাদিদ ভাইয়ের বাড়ির এড্রেস জানা থাকলে বল। ‘
‘ উনার বাড়ির এড্রেস দিয়ে কি করবি তুই? ‘
‘ ইরা’কে দেখতে যাব। ‘
‘ ইরা নেই ওখানে। জাদিদ ভাই নিজেদের বাড়ি ছেড়ে ইরাকে নিয়ে অন্য ফ্ল্যাটে শিফট করেছে। ‘
‘ ছেড়ে দিয়েছে মানে? কেনো? তুই জানলি কি করে? ‘
‘ কারণ জানা নেই। ইরা’র বোধহয় শরীর খারাপ ছিল কাল বিকেলে। ভাইয়া নীতিকে ফোন করে বললো ইরা’র কাছে থাকার জন্য। সেখান থেকেই জানলাম। ‘
‘ এড্রেস সেন্ড কর। আর তুই কোথায়? বিজি না থাকলে চলে আয় সেখানে। ‘
‘ তেমন বিজি না। সায়ুর মেডিসিন কিনতে এসেছি। আচ্ছা, আমি এসব বাসায় রেখেই আসছি। ‘
গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে থমকাল সাফওয়ান। কানে বিঁধল আবরারের শেষ কথাটা। সায়েরী অসুস্থ! কি হয়েছে? নিজের অস্থিরতা টুকু যথাসম্ভব চেপে রাখার চেষ্টা করে সে বলে উঠলো,
‘ কি হয়েছে তোর বোনের? ‘
‘ আর বলিস না। মেয়েটা স্থীর থাকে কোথাও? দুই দিন আগে দেখলাম ডান পা কেটে যা তা অবস্থা। না জানি কি ফেলেছে পায়ে। এত জিজ্ঞেস করেছি তবুও বলেনি। জোরাজুরি করেও এই দুই দিনে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যেতে পারিনি৷ আজ নিলাম। এখন মেডিসিন কিনছি। ‘
সাফওয়ান চোখ খিচে ফেলে প্রতিউত্তর টুকু শুনে৷ মাথা ঠেকায় সিটের সঙ্গে। দুই দিন আগের দৃশ্য ভেসে উঠে চোখের দৃশ্যপটে। তাতেই সে ক্ষুব্ধ হয় নিজের উপর। মেয়েটা নিশ্চয়ই তার দেওয়া আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে! ফুলদানি টা কি তবে তার পায়ের উপরেই পড়েছে? কতখানি ব্যথা পেয়েছে নাজুক প্রেয়সী?
বিয়ের সূত্রে সপ্তাহ খানিকের ছুটি নিয়েছিল জাদিদ। কেবল ইমার্জেন্সি হলে তবে যেতে হবে। কিন্তু সে ভেবে রেখেছে উক্ত হাসপাতালের চাকরি সে ছেড়ে দিবে। রোজ রোজ বাবা,ভাই,ভাবির মুখ দর্শন করে তাদের কাছ থেকে বউ, বাচ্চা নিয়ে কটুবাক্য শুনার চেয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়াটাই উত্তম। ইতোমধ্যে সে অন্য এক হাসপাতালের এম ডি’র সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সামনাসামনি সি ভি দেখে যাচাই করা বাকি। জাদিদের আত্মবিশ্বাস রয়েছে নিজের উপর। তার কোয়ালিফিকেশন যথেষ্ট ভালো৷ অভিজ্ঞতা ভালো৷ আশা রাখছে চাকরি টা হয়েই যাবে। সময় এখন সাড়ে এগারোটা। ন’টার দিকে নীতি কে বলতে শুনেছিল সাফওয়ান সহ আরও কে কে আসবে বাসায়। সেজন্য জাদিদ অল্প সল্প নাশতার আয়োজন করেছে। নীতি কাল রাতটা এখানেই ছিল৷ ইরা’র পাশে এই মুহুর্তে কাউকে না কাউকে থাকতে হচ্ছেই। তাছাড়া কাল জাদিদের বলা কথাগুলো শুনার পর থেকে মেয়েটা জ্যান্ত লাশ হয়ে আছে। ওর অবস্থা দেখে নীতির সাহস হয়নি একা রেখে যাওয়ার। জাদিদও স্বস্তি তে ছিল নীতি ছিল বলে।
বাসার বাহিরে থেকে ভেসে আসা হৈচৈ শুনে জাদিদ কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই কানে বাজল পরিচিত একটা কন্ঠ। সেকেন্ডের মধ্যে নজরে আসল দুজন কর্মচারী মিলে তিন সিটের একটি সোফা বের করছে লিফট থেকে। পেছনে তাদের নির্দেশনা দিচ্ছে জিমন। জাদিদ হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। তাকে পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিমন বলে উঠলো,
‘ আরে দুলাভাই! পথ ছাড়েন। মেলা কাজ বাকি। ‘
আশ্চর্য চিত্তে সেকথা মেনে নিল জাদিদ। জিমন এগিয়ে গেল তার দিকে। নিজ থেকেই হ্যান্ডশেক করে শুধালো,
‘ কেমন আছেন? সব ঠিকঠাক? ‘
‘ সব তো ঠিকঠাক আছেই। কিন্তু এসব কি করছ? আমাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাচ্ছে কেনো এসব? ‘
‘ আপাতত বলার সময় নেই। সব সেট করে নি। তারপর বলবনে। আসছি একটু পর আবার। ‘
এটুকু বলেই দ্রুত পায়ে সিড়ি বেয়ে নেমে গেল জিমন। সে এদিকে যেতেই অন্যদিকে ফের লিফটের দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে আসল রায়ান, আবরার। তাদের সাথে একই ডিজাইনের দুটো সিঙ্গেল সোফা। তারাও হাসিমুখে কুশলাদি সারল। জাদিদ জানতে চাইলেও তারা জানালো না কিছু। এর খানিকটা পর দেখা মিলল সাফওয়ানের। কর্মচারী দুজনকে নির্দেশনা দিচ্ছে সাবধানে ফ্রিজ টা ফ্ল্যাটে ঢুকানোর। জাদিদ এগিয়ে গেল। সাফওয়ান হ্যান্ডশেক করতেই সে অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলো,
‘ এসব কি হচ্ছে? আমার ফ্ল্যাটে এসব কেনো? ‘
সাফওয়ান একটুখানি হেসে জবাব দিল,
‘ ওয়েডিং গিফট। আমাদের তরফ থেকে। ‘
‘ আমি তো চাইনি কিছু। এসব কিনার সামর্থ্য কি আমার নেই? তোমরা এসব দিয়ে আমাকে লজ্জিত করছ। ‘
‘ ভুল বুঝছেন ভাইয়া। আমরা জানি আপনার সামর্থ্য আছে ইরা’র জন্য সবটুকু সুখ ক্রয় করার৷ কিন্তু এসব ওর ভাই,বোনেরা দিয়েছে। বিয়েতে সাধারণত বাবারা এসব দেয়। আপনি না করেছেন দেখে ইরা’র বাবা দেয়নি কিছু। তখন অবশ্য প্রয়োজনও ছিলনা। কিন্তু এখন তো প্রয়োজন আছে। তাই বাবা না দিয়ে ভাইয়েরা মিলে দিয়ে দিলাম। ‘
‘ কিন্তু…. ‘
‘ আমি বাড়তি কথা শুনতে চাচ্ছি না। আজ দিয়েছি বলে সবসময় তো আর দিব না। ভবিষ্যতে সব কিছু তো আপনাকেই জুড়িয়ে নিতে হবে। তাই আপনার সামর্থ্য সব ভবিষ্যতের জন্য বাঁচিয়ে রাখুন। ‘
জাদিদ অন্য কোনো প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলনা। সাফওয়ান কে দেখে মনেও হলো না সে কিছু শুনার জন্য আগ্রহী। জাদিদ মনের কিন্তু বোধ চেপে গেল। ‘ভাইয়েরা দিয়েছে’ কথাটার আগে অন্য কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না সে৷ তবে দারুণ আশ্চর্য, পুলকিত হলো ইরা’র এই চমৎকার বন্ধু গুলোকে দেখে। নিজেরা নিজেরা কত সুন্দর সব কিনে, এখন সেট-ও করে ফেলছে। জাদিদকে বিন্দুমাত্র অনুভব করতে দিচ্ছে না কোনো অস্বস্তি। বন্ধুরা এমনও হয়!
নিজ রুমে বিছানার কিনারায় হাঁটুতে মাথা রেখে বসে আছে ইরা। চোখদুটো ফুলে রক্তিম হয়ে আছে। পাশেই বসে আছে নীতি। ইরা’র কপাল চেপে দিচ্ছে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। এমন সময় দরজায় নক করলো কেউ। নীতি ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিতেই দরজা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করলো সাফওয়ান। তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো ইরা’র দিকে। বুক ছিড়ে বের হলো দীর্ঘশ্বাস। নীতি বেড থেকে নেমে পড়ল তাকে দেখে। সাফওয়ানের ইশারা পেয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। হালকা চাপিয়ে দিয়ে গেল দরজাটা। সে যেতেই সাফওয়ান গিয়ে বসল ইরা’র সম্মুখে। চোখ বুজে বসে থাকা ইরার মাথায় হাত রেখে নিম্ন কন্ঠে ডাকল, ইরা!
কন্ঠটা শুনামাত্র ইরা চট করে মাথা তুলে তাকাল৷ ফুলোফুলো চোখজোড়া সাফওয়ান কে দেখে মুহুর্তেই টলমল অশ্রুতে ভরে উঠল। গতরাতের পর নিজেকে সামলে রেখেছিলো সে। মিহাদ যাওয়ার পর এই কয়েকদিনে আর কারো সামনে দুর্বল না হওয়া মেয়েটা সাফওয়ানের সম্মুখে ভেঙ্গে পড়ল বাজেভাবে। সাফওয়ানের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। মিহাদকে নিয়ে জমানো অভিযোগের টুকরো অংশ মেলে ধরল সাফওয়ানের কাছে। ক্রন্দনরত, অসহায় গলায় বলে উঠলো,
‘ তুই জানিস ওর ব্রেন টিউমার ছিল? ব্রেন টিউমার! এতবড় কথাটা ও কি করে চেপে যেতে পারল, বল? কীভাবে পারল? ‘
সাফওয়ান আহত চোখে তাকিয়ে। হাত রাখে ইরা’র মাথায়। নিভু নিভু কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ জানি। সব জানি। ‘
ইরা দুর্বল হাতে সাফওয়ানের বাহু চেপে ধরে। শ্বাস আটকে আসছে কান্নার বেগে। অভিমানী গলায় সে ফের বললো,
‘ আমি ওকে কক্ষনো ক্ষমা করবো না। কক্ষনো না। ওর এত সাহস কি করে হলো আমাকে নিজের কাছ থেকে দূর করার? কীভাবে পারল আমাকে অন্য জনের কাছে সঁপে দিতে? ও জানত না আমি ওকে কতটা ভালোবাসি? আমি কীভাবে মেনে নিব ওর যায়গায় অন্য কাউকে? কীভাবে বাঁচবো? ও কেন একটাবার জানতে চাইল না আমি কি চাই? আমার শান্তি টা কিসে সেটা ও কেন বুঝল না? ‘
সাফওয়ান বড় কষ্টে নিজেকে শক্ত রাখে। চিঠিতে লিখা মিহাদের কথাগুলো জীবন্তভাবে কানে বাজছে। সেসব ভেবেই নিজেকে সামলে নিল সে। ইরার মাথা তুলল বাহু থেকে। ভেজা গাল মুছে বলে উঠলো,
‘ তুই ক্ষমা না করলে ওর উপর কতশত শাস্তি প্রয়োগ হবে, জানিস? ক্ষমা করে দে। ওকে মুক্তি দে সবকিছু থেকে। ও যা করে গিয়েছে সব তো শুধুমাত্র তোর ভালোর জন্যই। এখন চাইলেও আমরা কেউ বদলাতে পারবো না এসব। তাই ভালো হবে, সত্যিটাকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে। আর কারো জন্য না, শুধু মাত্র তোর বেবির জন্য হলেও এসব ভুলে থাকাটা প্রয়োজন তোর। ‘
ইরা’র অবাধ্য অশ্রু ফের গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে৷ শোনা গেল মেয়েটার অসহায়, ভঙ্গুর কন্ঠ,
‘ অ-আমি একা কীভাবে বড় করবো এই বাচ্চাটা? পারব না। আমাকে দিয়ে হবে না। ‘
‘ একা কোথায়? আমরা আছি। সবচেয়ে বড় কথা জাদিদ ভাই তোর পাশে আছে। ‘
‘ তবুও আমি.. ‘
ইরার হাতে একটা লকেট ধরিয়ে দিয়ে তার কথা আটকে দিল সাফওয়ান। লকেট সাথে একটা খাম। তাতে আবার ‘ইরাবতী’ লেখা৷ লেখার ধরণ দেখেই ইরা চমকে উঠলো। কেঁপে উঠলো বক্ষপিঞ্জর। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকাতেই জবাব পেল,
‘ তোর জন্য মিহাদ শেষ প্রেমবার্তা রেখে গেছে। ওর শেষ আবদার, তোদের বাচ্চাটা যেন ওর হয়ে বাকি জীবন তোর সাথে বাঁচতে পারে৷ এই আবদার তুই রক্ষা করবি না? মিহাদের জন্য নিজের খেয়াল রাখবি না? ‘
ইরা জবাব দিতে পারলো না। ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইল চিঠি আর লকেট টার দিকে। সাফওয়ান ওর হাতের উপর হাত রেখে নরম স্বরে বলে উঠলো,
‘ মিহাদকে তো হারিয়ে ফেলেছি। অন্তত ওর শেষ অংশটাকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিস না, ইরা। ‘
ইরা’র বুক কাঁপে একথায়। ভাবে, মিহাদের অংশ হিসেবে এখনো কেউ রয়েছে তার সাথে, তার মধ্যে। ওকে অন্তত সঙ্গে রাখতে হবে। বেঁচে থাকার সম্বল হিসেবে আকড়ে ধরতে হবে এই নিস্পাপ প্রাণটাকে। ভাবনা চিন্তায় পার হলো কিয়ৎ ক্ষণ। ইরার চোখে ভাসলো মিহাদের নিষ্পাপ মুখশ্রী। হাতের উল্টো পিঠ দ্বারা গাল মুছল সে। লকেট টা নিয়ে পেটে হাত রেখে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কেড়ে নিব না। এখন থেকে কোনো অবহেলা করবো না। আমার মিহাদের জন্য হলেও ওকে আমি রক্ষা করবো। ‘
সাফওয়ান মলিন মুখে হাসে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে। অন্তত ইরা’কে বুঝাতে পেরেছে, এটাই অনেক। নীতি খাবারের প্লেট নিয়ে রুমে ঢুকতেই পুণরায় ইরা’র মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে গেল সাফওয়ান। নীতি নিজেই ইরাকে খাইয়ে দিবে বলে সব প্রস্তুতি নিয়ে সম্মুখে বসেছে, কিন্তু ইরা তাকে অবাক করে দিয়ে নিজেই প্লেট টেনে নিল। বিনা বাক্যে খাবার মুখে তুলতে লাগল একের পর এক। নীতি তাজ্জব চোখে দেখে গেল কেবল। খাওয়ার পর নিজ থেকেই মেডিসিনের খুঁজ করলো ইরা। নীতি ছ্যাবলার মতো তাকিয়ে থেকে জবাব দিল এই সময়ে কোনো মেডিসিন নেই খাওয়ার জন্য। ইরা আর কথা বাড়াল না। শরীর খানিকটা দুর্বল লাগছিলো। কিন্তু খাওয়ার সাথে সাথে শুয়ে পড়ল না সে। নীতিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ চল, বাহিরে যেয়ে বাকিদের সাথে দেখা করে আসি। ‘
সাফওয়ানের সঙ্গে কথা বলার পরেই যে ইরা’র এই পরিবর্তন তা এতক্ষণে বুঝতে পারল নীতি। বরাবরেই ন্যায় সাফওয়ান তবে আরও একবার মানিয়ে নিল ইরাকে? মেয়েটাও তো কত মান্য করে সাফওয়ানকে। নিশ্চয়ই বাচ্চার ব্যাপারে বুঝিয়েছে সাফওয়ান। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নীতি খুশিতে ফেটে পড়ল। আবেগে চোখ ছলছল করে উঠল তার। চঞ্চল সে নিজের উচ্ছ্বাস টুকু দমাতে না পেরে ঝাপটে ধরল ইরা’কে। তার এহেন কান্ডে ইরা হকচকিয়ে গিয়ে বিছানায় হেলে পড়তে গিয়েও দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। রাগত্ব স্বরে বলে উঠলো,
‘ পাগল হলি নাকি? পেটে চাপ পড়লে কি হতো এখন? ‘
নীতি দ্রুত ছেড়ে দিল তাকে। ফের আবার ইরা’র পেট ছুঁয়ে বলে উঠলো,
‘ এই উড়নচণ্ডী খালামণি একটুর জন্য আপনাকে ভুলে গিয়েছিল। সরি হ্যাঁ, আগে থেকে খেয়াল রাখব। হয়েছে এবার চল বাইরে, আয় আয়। সবাই তোকে দেখে ভীষণ খুশি হবে। ‘
ইরা নিরব চোখে দেখে বান্ধবীর হাসিমুখ। সে জোরপূর্বক নিজেকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে বলে সকলে কতো খুশি! অন্তত এই বন্ধু গুলোর জন্য হলেও তাকে যে স্বাভাবিক থাকতেই হবে। নীতির হাত ধরে সাবধানে বের হয়ে আসল সে। নতুন ডাইনিং টেবিল, ফ্রিজ,তিন সেট সোফা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা নিজ নিজ স্থানে। সাথে আরও খুটিনাটি অনেক কিছু। ইরা অবাক চোখে দেখল সব। বন্ধুরা তাকে দেখে সত্যিই ভীষণ খুশি হলো। ড্রয়িংরুমে বসে জাদিদ সহ আলাপ করল অনেক কিছুরই। বেশির ভাগ কথা চলল জাদিদ কোন হাসপাতালে জয়েন করবে? আগামীতে জাদিদ হাসপাতালে থাকলে ইরা’র সঙ্গে থাকবে কে? ইরা’র জন্য কোন গাইনোলজিস্ট বেস্ট হবে.. এসব ব্যাপারে৷ নীতির কাঁধে মাথা রেখে ইরা কেবল শুনে গেল সবটা। হাতের মধ্যে লুকিয়ে রাখা লকেটার দিকে তাকিয়ে বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো তার। ফের তাকাল জাদিদের দিকে। তারপর বন্ধুদের দিকে। পরপর আবার পেটে হাত রেখে ভাবল, এখন থেকে কোনো কিছুর প্রভাব সে এই বাচ্চাটার উপর পড়তে দিবে না। মিহাদ চেয়েছে যেন তার ইরাবতী সুখে থাকে। এজন্য সে সুখ কুড়াবে। বাচ্চাটার মাঝে খুঁজে নিবে সব টুকু সুখ, সকল অপ্রাপ্তির বড় প্রাপ্তি। জাদিদ আছে, বন্ধুরা আছে পাশে। আর কি চায় তার! বেঁচে থাকার জন্য এইতো অনেক।
ধরনীতে সন্ধ্যা নেমেছে। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে এখন সময় পাঁচটা বেজে একান্ন মিনিট। একে তো সন্ধ্যা, তন্মধ্যে আকাশে গুমোট ভাব। খন্ডে খন্ডে দেখা মিলছে ধূসর মেঘের। জানান দিচ্ছে বৃষ্টির আগমনী বার্তা। যেকোনো সময় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি জল গড়াতে পারে এমন অবস্থা। রেস্টুরেন্টের পার্কিং এরিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরীর মনে দুশ্চিন্তা উঁকি দিল। কি দরকার ছিল পিউ’র আবদারে রাজি হয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার! অবশ্য তার-ই বা দোষ কোথায়? বিকেলের দিকে পিউ নিজেই তো এসে জোরজবরদস্তি করলো তার সঙ্গে বের হওয়ার জন্য। সায়েরী না করেছে দেখে মেহরিন বেগমকে ধরেছিলো সে। বলেছিলো বাহিরে গেলে মন কিছুটা ফুরফুরে হবে সায়েরীর। তাছাড়া তার ভাই পিয়াসও যাচ্ছে সঙ্গে।
পায়ের ব্যাথা কমেছে বলে সায়েরীকে না করলেন না মেহরিন বেগম। পিয়াস তো আছেই মেয়ে দুটোকে দেখে রাখার জন্য। মেহরিন বেগমের আশকারা পেয়ে পিউ আর সায়েরীর কোনো কথায় কান দেয়নি। একপ্রকার ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে তাকে। কিন্তু বাহিরে এসে সায়েরী আশ্চর্য হয়ে গেল। একে তো পিয়াস সাথে ছিল না তাদের। রিকশা করে দুজন পৌঁছেছিল একটি রেস্টুরেন্টের সম্মুখে। যেখানে পূর্ব থেকেই অপেক্ষারত ছিল জিমন। সায়েরী ভেবে পেল না এহেন কান্ডের মানে। দুজনের ব্যাক্তিগত সময়ে তাকে টানার কি দরকার ছিল! কিন্তু নিরূপায় সে বলতে পারল না কিছু। প্রায় ঘন্টাখানিক তিন জনের আলাপ চলেছে রেস্টুরেন্টে বসে। আজ ইরাদের ফ্ল্যাটে কি হলো না হলো মূলত এসব ব্যাপারেই কথা বলছিলো জিমন।
সায়েরীও আগ্রহ নিয়ে শুনে যাচ্ছিলো সব। তার অবচেতন মন স্বস্তি পেয়েছিল সাফওয়ানের উপস্থিতির, সুস্থতার কথা শুনে। আবার পরক্ষণেই ছোট্ট হৃদয়ে অভিমান জমলো তার। সাফওয়ান ভাই একটাবার তার সঙ্গে দেখা করতে চাইল না! অন্তত ফোন করে হলেও কথা বলত! সে কি ভুলে বসল সেদিনের ব্যাবহার! না কি এখন সায়েরীর সঙ্গও বিরক্ত ঠেকছে তার কাছে? এসকল ভাবনায় মনটা আরও বিষিয়ে উঠেছিল। সে ভেবেছিল পিউ এবং জিমন ডেটে এসেছে। হয়তো তাকে রেখে দুজন আলাদা কোথাও বসবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। আসার পর থেকে দুজন তার সাথে বসে নানান কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সায়েরী বাধ্য হলো সেই আড্ডায় মশগুল হতে। কথায় কথায় মন হালকা হলো কিঞ্চিৎ। ফাঁকে ফাঁকে অবশ্য জিমন কাকে যেন কল করছিলো বারবার।
‘ আর কতক্ষণ? সন্ধ্যা হয়ে যাবে তো।’
এমন করে একাধিকবার ফোনের অপর প্রান্তের ব্যাক্তিকে শাসাচ্ছিল সে। অবশেষে ছয়টার একটু আগে তিন জন বের হলো রেস্টুরেন্ট হতে। আকাশের অবস্থা তখন বেজায় খারাপ। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব। জিমন গাড়ি বের করতেই দুজন গিয়ে উঠে বসলো। ব্যাকসিটে বসা সায়েরী সবে মাত্র সিটে দেহ এলিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে। এমন সময় কিছুদূর যেতেই থেমে গেল গাড়িটি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তখন গাড়ির কাঁচ ঝাপসা হয়ে উঠেছে। সায়েরী বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো জিমন,পিউ দুজনেই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে হতবিহ্বল হয়ে বলে উঠলো,
‘ কোথায় যাচ্ছেন ভাইয়া? ‘
‘ এইতো পাশের শপিংমলে। ওখানে পিউর জন্য একটা জিনিস কিনে রেখেছিলাম। ওটা নিয়েই চলে আসছি। পাঁচ মিনিট লাগবে। তুমি বসো, আমরা আসছি। ‘
সায়েরীকে প্রতিউত্তর করার সময়টুকু আর দিল না তারা। বেরিয়ে গেল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। সায়েরী ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখল দুজন মিলে খানিকটা দূরের শপিংমল টার দিকে যাচ্ছে। গাড়ির হেডলাইট, ভেতরের লাইট সবই বন্ধ। তাও আবার এমন নিরিবিলি যায়গায় দাঁড় করিয়েছে যে স্ট্রীট লাইটের আলো টুকুও আসছে ভীষণ ক্ষীণভাবে। আবছা অন্ধকারে সায়েরীর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ভয়ে। বান্দরবানের সেই ঘটনার পর থেকে অন্ধকার জিনিসটা একপ্রকার ফোবিয়ার মতো তার কাছে। দম বন্ধ হয়ে আসে তার। সে সামনের দিকে ঝুঁকল গাড়ির লাইট অন করার প্রচেষ্টায়। এমন সময় হ্যাঁচকা টানে খুলে গেল ব্যাক সিটের দরজা। ঝড়ের গতিতে সিটে এসে বসলো এক পুরুষালী অবয়ব। কানে আসল বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ। পুণরায় শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা।
আকস্মিক এই কান্ডে কিংকর্তব্যবিমুঢ় সায়েরী ভয়ের চোটে চোখ খিচে, দিকবিদিকশুন্য হয়ে অস্পষ্ট স্বরে চিৎকার করে উঠলো। লেপ্টে গেল দরজার সঙ্গে। মাত্র সেকেন্ড দুয়েকের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায়, অতিরিক্ত ভয়ে সে কেঁদেই ফেললো। ঠিক তখনই কড়া পারফিউমের সুপরিচিত সুঘ্রাণটি প্রবেশ করলো তার নাসারন্ধ্রে৷ ঘ্রাণ-টা যেন সোজা বুকে গিয়ে ধাক্কা খেলো। সেই সঙ্গে তার কর্ণগোচর হলো চিরপরিচিত, প্রিয় কন্ঠস্বর হতে নির্গত হওয়া বহু প্রতিক্ষিত প্রিয় ডাকটি, ‘ বোকাপাখি! ‘
সায়েরীর তনু কম্পিত হলো। চোখ মেলে আঙ্গুলের ফাঁকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো সত্যিই মানুষটা উপস্থিত কিনা। আবছা অন্ধকারে কেবল কালো অবয়ব চোখে পড়ল তার। কিন্তু সব ছাপিয়ে ঠিকই দৃষ্টি মিলন হলো জ্বলজ্বল করতে থাকা বাদামি চোখজোড়ার দিকে৷ সায়েরীর চোখে ভয়, বিষ্ময়, অবিশ্বাস। সম্মুখে অবস্থানরত সাফওয়ান স্পষ্ট টের পেলো মেয়েটার দেহের মৃদু মৃদু কম্পন। সাফওয়ানকে একটুখানি ছুঁয়ে দিয়ে অবিশ্বাস টুকু বিশ্বাসে রূপান্তর করার আশায় হাত বাড়ালো সায়েরী। সাফওয়ান অগোচরে হাসল তা দেখে। ঝুঁকে এসে দুইহাতে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো ভিতু প্রেয়সীকে। পিঠে আদুরে ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিনাবাক্য ঠোঁট ছোঁয়াল কপালের একপাশে। আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘ কাম ডাউন সুবহা! আমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। ডোন্ট প্যানিক, হুহ! টেক অ্যা ডিপ ব্রিথ। ‘
নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটার সান্নিধ্য পেয়ে সায়েরীর ভয় সব মিলিয়ে গেল মুহুর্তেই। সে দুইহাতে গলা জড়িয়ে ধরলো সাফওয়ানের। তীব্র অভিমানী মন এবার বাধন হারা হয়ে অশ্রু রূপে ঝড়তে আরম্ভ করলো। শব্দহীন কান্নায় সিক্ত হলো গাল, সাফওয়ানের কাঁধ। উষ্ণ তরল টুকু অনুভব করতে পেরে সাফওয়ানের মন ভাড় হলো। সে আলিঙ্গন মুক্ত করতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। সায়েরী শক্ত করে গলা জড়িয়ে রেখেছে তার। উপায়ান্তর না পেরে সেই অবস্থাতেই সোজা হয়ে বসলো সে। সায়েরী টেরও পেলো না কবে তার ছোট্ট দেহশ্রী সিট থেকে উঠে গিয়ে ভর ছেড়েছে সাফওয়ানের উরুতে। মেয়েটা কাঁদছে তখনও। তাকে আটকালো না সাফওয়ান। সায়েরীর পাঞ্চ ক্লিপটা খুলে দীঘল কেশসব পিঠময় ছড়িয়ে দিয়ে তাতে মুখ ডুবাল সে। নম্র কন্ঠে শুধালো,
‘ স্যরি, সুবহা। এই কয়েক দিন ভীষণ ডিপ্রেসড ছিলাম। আমি ইচ্ছে করে বকিনি তোমাকে। না জানি কি হয়ে গিয়েছিলো। অন্যের রাগ তোমার উপর ঝেড়েছি। আ’ম স্যরি, সুইটহার্ট। ভীষণ স্যরি। ‘
সাফওয়ানের অবচেতন মনের নতুন এই সম্মোধনে বুক কাঁপল বোধহয় সায়েরীর। কান্না থেমে গেল তার। কান গরম হয়ে উঠল। সাফওয়ানের কাঁধে মুখ গুজে রাখা অবস্থায় সে মিনমিন কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি জানি আপনার মন ভালো ছিলনা। ওসব আমি মনে রাখিনি। ‘
সাফওয়ান এবারে জোর করে মুখ তুললো সায়েরীর। আবছা আলোয় দেখে দেখে দুইহাত দ্বারা ভেজা গাল মুছল সে। একহাতে ফের কাছে টেনে শুধালো,
‘ তাহলে কাঁদছো কেনো? ‘
সায়েরী নাক টেনে জবাব দিল, ‘ জানি না। ‘
পরক্ষণেই আবার সাফওয়ানের দিকে চোখ তুলে তাকাল৷ আবসা-ঝাপসা দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে অভিমানী গলায় বলে উঠলো,
‘ আপনি সেদিন তিন ঘন্টা ধরে বৃষ্টিতে ভিজেছেন কেনো? আপনাকে সেন্স হারাতে দেখে আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম জানেন! ওখানে কেউ ছিল না। যদি ফোন না থাকত সাথে, কাউকে জানাতে না পারলে কি হতো? কি করতাম আ…. ‘
বাকি কথাটুকু সম্পূর্ণ করার পূর্বেই সাফওয়ান পুণরায় কাছে টেনে নিল তাকে। চুলে মুখ ডুবিয়ে দিলো৷ শোনা গেলো তার নিভু নিভু কন্ঠ,
‘ হুশ!! কিছু হয়নি তো। ভুলে যাও সেসব। একটু চুপটি করে বুকে থাকো।
সায়েরী সত্যিই চুপ মেরে গেল। সাফওয়ানের বলার ধরণ শুনেই গাল ফোলাল সে। সরে আসতে গিয়ে খেয়াল হলো নিজের অবস্থানের। লজ্জায় সে হতভম্ব। ছিঃ ছিঃ এ কোথায় বসে আছে! ছটফটিয়ে নামতে চাইল সে। সাফওয়ান মুখ তুলে চাইল বিরক্ত চোখে,
‘ কি সমস্যা? ‘
‘ চ..ছাড়ুন। জিমন ভাইয়ারা আসবে এক্ষুনি। ‘
‘ আমি না বলা অবধি কেউ আসবে না৷ চুপচাপ বসে থাকো। ‘
সায়েরী থমকায়। আশ্চর্য কন্ঠে বলে,
‘ মানে কি? আপনি! আপনার কথায় ওরা আমাকে রেখে গিয়েছে? ‘
‘ হুহ্। ‘
‘ কেনো? এই ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমার কাছেই বা আসতে হয়েছে কেনো? ‘
সাফওয়ান সিটের সঙ্গে মাথা ঠেকাল এই প্রশ্ন শুনে। অদ্ভুত এক কন্ঠে জবাব দিল,
‘ একটুখানি শান্তির শ্বাস নেওয়ার জন্য৷ ‘
সায়েরী আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সে স্পষ্ট টের পেল সাফওয়ানের অসহায়ত্ব। প্রেমময়ী হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলো তার। পূর্বে যেমন করে সাফওয়ান তার মন ভোলাত, ঠিক সেই কৌশল অবলম্বন করলো আজ সে৷ নিজ থেকেই সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে গাল গাল ঠেকাল। আশ্বস্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ মিহাদ ভাই গেলো এখনো এক সপ্তাহ হলো না। এটুকু তেই আপনি হাঁপিয়ে গিয়েছেন? আপনি তো এমন ছিলেন না। সব কিছু ঠান্ডা মাথায় সামলে নিতেন। তাহলে এবার কি হলো? ‘
সাফওয়ান জবাব দিল না কোনো। চোখ বুজে অনুভব করতে লাগলো প্রেয়সীর প্রেয়ময়ী স্পর্শ। তার জবাব না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সায়েরী। ফের শোনা গেল তার আবছা কন্ঠ,
‘ নিজেকে একা একা লাগছে? ‘
‘ হুমম। ‘ সাফওয়ান আনমনেই জবাব দিলো।
এই জবাবের বিপরীতে তাকে আরও দৃঢ় ভাবে জড়িয়ে ধরল সায়েরী৷ সাফওয়ানের মাথাটা নিজ দ্বায়িত্বে কাঁধে টেনে নিলো। বোকাসোকা রমনী বেশ বুঝদার কন্ঠে বললো,
‘ একা লাগছে কেনো? আমরা আছি না! ভাইয়া, জিমন ভাইয়া, রায়ান ভাইয়া, নীতি আপু সবাই তো আছে পাশে। আপনি না বললে-ও উনারা সবসময় পাশে থাকবে। আর ইরাপুর জন্য তো জাদিদ ভাইয়া আছেই। তাহলে এত চিন্তা কিসের? ‘
‘ নিজেকে নিয়ে চিন্তা করারও কোনো দরকার নেই। আপনার জন্যও আমি আছি, সবসময়। ‘
চোখ বুজে সব কথা শুনতে থাকা সাফওয়ান শেষের কথাটা শুনে হেসে ফেললো। ছোট্ট করে ঠোঁট ছোঁয়াল মেয়েলি কাঁধে। মেয়েটার কোমর জড়িয়ে সেই অবস্থাতেই প্রশ্ন করলো,
‘ তুমি আমাকে প্রোটেক্ট করবে? ‘
‘ অবশ্যই। সন্দেহ আছে আপনার? ‘ দাম্ভিক কন্ঠ তার।
‘ নো ম্যাম। সেই সাধ্য আছে আমার? ‘
সাফওয়ানের কন্ঠে স্পষ্ট হাসির ছাপ৷ সায়েরীও বুঝতে পারল সেটা৷ সে নিজেও হেসে ফেললো। বাহিরে বৃষ্টির গতি বেড়েছে৷ ঝুমঝুম বৃষ্টি ধ্বনিতে মুখরিত পরিবেশ। আবছা অন্ধকার রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আছে বৃষ্টিকণায়। বদ্ধ গাড়িতে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ একজোড়া প্রেমিক যুগল। একে অপরের উষ্ণতায় মিশে রয়েছে যেন তারা। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ ব্যাতীত কেবল বৃষ্টির শব্দ কানে বাজছে। বড্ড বেশি রোমাঞ্চিত আজকের এই পরিবেশ। প্রেয়সীর কাঁধে মাথা রেখে বুক ভরে শ্বাস টানল সাফওয়ান।
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৫+৫৬
খানিকটা অবুঝ, বাচ্চামো স্বভাবের মেয়েটা তার এই খারাপ মুহুর্তে কীভাবে যেন বুঝদার বনে গেছে। সেদিনও কত সুন্দর করে সামলে নিয়েছিল তাকে! আর আজকে আবারও বুঝিয়ে দিল, ভাই সমতুল্য কিছু বন্ধু থাকতে সে নিজেকে একা অনুভব করাটা নিতান্তই বোকামি। তাছাড়া নতুন এই লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে শান্তির শ্বাস নেওয়ার জন্যও নির্দিষ্ট একজন আছে তার। অন্তত এই মেয়েটা থাকতে সে কখনো ভেঙ্গে পড়তে পারে না৷ কখনো না।
