অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৮
শ্রাবণী ইয়াসমিন
অ্যাশলি নিষ্পলক তাকিয়ে রইল অ্যালেক্সের দিকে। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত কাঁপুনি কাজ করছে। তার মনে প্রশ্ন জাগছে অ্যালেক্স কি সত্যিই তাকেই এসব বলছে? নাকি নেশার ঘোরে ভ্রান্ত কিছু বলছে?
ধীর, অনিশ্চিত পায়ে এগিয়ে গেল সে। অ্যালেক্সের মাথার শিয়রে বসতেই অ্যালেক্স চোখ তুলে তাকাল। চোখ লাল হয়ে আছে তার, কিন্তু দৃষ্টিটা অদ্ভুত গভীর। এক মুহূর্তও দেরি না করে অ্যালেক্স নিজের মাথাটা রাখল অ্যাশলির উরুর ওপর।
অ্যাশলির বুক ধুকপুক করতে থাকলো। এক ঝটকায় যেন তার পুরো শরীর হিম হয়ে গেল। যেন সে নড়াচড়া করতেই ভুলে গিয়েছে।
অ্যালেক্স দু’হাত বাড়িয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। আর পরক্ষণেই তার মুখ ডুবিয়ে দিল অ্যাশলির পেটে। নাক ঘষতে ঘষতে অস্পষ্ট কণ্ঠে ফিসফিস করল, “থেকে যেও, আমার কাছে?”
অ্যাশলির নিঃশ্বাস আটকে গেল। হাত কাঁপতে কাঁপতে নামল, কিন্তু কোথায় রাখবে তা ঠিক বুঝতে পারল না। হৃদকম্পন যেন গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে।
অবশেষে সে খুব ফিসফিসে কণ্ঠে বলে উঠল,
“আ….আপনি কি ঠ…ঠিক আছেন?”
অ্যালেক্স জড়িয়ে ধরল আরও শক্ত করে। পেটে মুখ লুকিয়ে মগ্ন হয়ে বলল,“প্রথম দিন তোমার সেই নীলাভ চোখ আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তোমার চুলের ঘ্রাণ আমাকে মাতাল করে দিয়েছে।”
অ্যাশলির চোখ বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে যায়। শরীর ঠাণ্ডা অথচ বুকে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে অ্যালেক্সের প্রতিটা শব্দ। এই মানুষটা, যাকে সে এখনো পুরোপুরি চিনতেই পারেনি, হঠাৎ এভাবে তার সমস্ত দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে।
অ্যালেক্স এক লম্বা, ধীরশ্বাস টেনে বলল, “আমি কোনোদিন কারো সামনে নিজেকে মেলে ধরতে পারিনি। জীবনের সবচেয়ে বাজে সময়গুলোতে, যখন আমার কোনো কিনারা ছিল না, তখন বটগাছের মতো একজন দাঁড়াল – আমার বড়ভাই জেভিয়ার।
ওই ছিল যে, আমাকে ভেঙে পড়া থেকে টেনে তুলে নিয়েছিল। আমি নিজেকে শক্ত বানাতে গিয়ে নিজের আসল রূপ প্রকাশ করাই ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে যখন প্রথম দেখেছি, মনে হয়েছিল আমি গলে যাচ্ছি।কেউ আমার ভেতরের আত্মাকে টেনে বের করছে। কেউ বলে উঠছে, ‘এইটা তোর আসল স্বত্বা, অ্যালেক্স। তুই কতদিন নিজের ভেতরের আত্মাকে আড়াল করে রাখবি?”
আশ্লির নিশ্বাস আরও ঘন হয়ে উঠল, সে কোনো উত্তর দিতে পারল না শুধু শুনে যাচ্ছিল। অ্যালেক্স এক মুহূর্ত থেমে আবারও বলল,
“তোমার থেকে আমি এতদিন নিজেকে আড়াল রেখেছি কারণ তোমার সাথে নিজেকে জড়াতে আমি সাহস পাইনি। কিন্তু যতটা হালকা ভাবছিলাম ততটাই ভুল বলেছিলাম। না চাইতেও, আমি জড়িয়ে পড়েছি।”
অ্যাশলির হাত কাপতে থাকে। কোন কথা প্রথম বলবে, কীভাবে তার জীবনের সেই ছোট্ট ভাঙা টুকু অ্যালেক্সের সামনে খুলবে ভেবে পাচ্ছিল না। রুমটা হিমশীতল, তবু এক ধরনের উষ্ণতা তাদের চারপাশে ঘিরে ফেলেছে।
অ্যাশলি কাপাকাপা গলায় বলল, “আপনি ঘুমান, শরীর ভালো নেই। তাইএভাবে উলটো পালটো বলছেন। কাল কথা হবে, আজ আর….”
অ্যালেক্স হঠাৎ উঠে বসলো। ধীরে ধীরে অ্যাশলির একদম কাছে চলে এলো। দুই হাতের আজলায় অ্যাশলির মুখ নিয়ে এক তীব্র আবেদন এর কন্ঠে বলল,
“থেকে যা, অ্যাশ। কথা দিচ্ছি আমি সারাজীবন উন্মাদের মতো ভালোবেসে যাবো। তাও ছেড়ে যাস না আমাকে।”
অ্যাশলির চোখ থেকে এক ফোটা জল চোখের কিনারা ভেঙে নিঃসৃত হয়ে পড়ল অ্যালেক্সের হাতের ওপর । অ্যালেক্স তা দেখে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কাঁদছো কেন, অ্যাশ? আমি কি তোমাকে বেশি জোর করে ফেলছি?”
অ্যাশলি চোখ তুলে তাকাল। চোখ ভর করে পানি টলটল করছে, ভাঙা গলায় বলল, “আমাকে সবাই ঠকায়, মিথ্যে আশা দেয়। আপনার কথাও কি একশ’ভাগ সত্য, বলতে পারবেন? আপনি তো নেশার ঘোরে এসব বলছেন। নেশা কাটলে ভুলে যাবেন সব।”
তার কণ্ঠে তীব্রতা আর কোমলতার মিশ্রণ, “তোমার চেয়ে মারাত্মক অ্যালকোহল আর আছে নাকি, নেশা ধরানোর জন্য?”
অ্যাশলির দু’হাত নিজের দুই হাতে ধরে তাতে ঠোঁট দিয়ে হালকা চুমু খেয়ে বলল, “আর কিভাবে বুঝাই তোমায়, সত্যি ভালোবাসি তো।”
বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জেভিয়ার। রুমটা এমন নির্জন আর ভারী পর্দায় ঢাকা যে সূর্যের আলোও ঢুকতে পারছে না। চারপাশে আধো অন্ধকার, নিস্তব্ধতা।
জেভিয়ার পাশে রাখা ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সময় দুপুর ১২টা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। তার ভ্রু একটু কুঁচকে গেল।
সে পাশ ফিরে তাকাল। আনায়া এখনো গভীর ঘুমে ডুবে আছে। সাধারণত সকালবেলায় খুব তাড়াতাড়ি উঠে যায় সে, অথচ আজ এতটা বেলা পার হয়ে গেছে অথচ চোখ খোলেনি।
জেভিয়ার চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। সেই শান্ত, নিস্পাপ মুখটা যেন নিঃশব্দে তাকে বেঁধে রাখছে। হালকা টান দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে আনায়ার পেট চেপে ধরল, তারপর পেছন থেকে তাকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। একেবারে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল যেন।
তার হালকা দাড়ি-ওয়ালা গালটা এনে ঘষে দিল আনায়ার কোমল ঘাড়ের কাছে। উষ্ণ চামড়ায় দাড়ির খোঁচা খোঁচা স্পর্শে আনায়ার শরীরটা হালকা কেঁপে উঠল।
আনায়ার ভ্রু কুঁচকে গেল, মুখও কষে উঠল বিরক্তিতে। অচেতন ঘুম ভেঙে যেতে যেতে সে হালকা সরে গিয়ে গুঙিয়ে উঠল,
“উমম… কী করছো?”
জেভিয়ার ঠোঁটের কোণে একফোঁটা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
এরপর জেভিয়ার ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল, “গুড আফটারনুন, ম্যাডাম আজ কি ঠিক করেছেন সারাদিনই বিছানায় থাকবেন?”
আনায়া চেষ্টা করল নিজে নড়তে, কিন্তু পারল না তার শরীর যেন ব্যথায় বাধা দিচ্ছিল। হালকা করে দেহ কেঁপে উঠল, আর সে চুপ করে মুখ মুছে বিছানায় স্থির হয়ে রইল।
জেভিয়ার তার দিকে নজর দিল, তখনই কণ্ঠে উদ্বিগ্ন স্বর নিয়ে বলল, “কি হয়েছে?”
আনায়া রেগে গিয়ে তার চোখ ছোট ছোট করে বলল, “জানো না কি হয়েছে? তোমার জন্যই আমার শরীর ব্যথা করছে।”
জেভিয়ার শুধু ছোট করে বলল, “ওহ।”
আনায়া ফুস করে উঠল, “ওহ মানে? একটা মানুষ এত উন্মাদ কি করে হয়, বলতে পারো?”
জেভিয়ার অপরাধী কন্ঠে বলল, “এতদিন পর তোমাকে এমনভাবে কাছে পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারিনি, সরি।”
আনায়া ভ্রু কুঁচকে জেভিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার সরি তুমি কফির সাথে গুলে খেয়ে নাও।”
সে কষ্ট করে নিজেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তার শরীর যেন নিজের ইচ্ছাকে অস্বীকার করল। দাঁড়াতে পারলেও সোজাভাবে হাঁটতে পারছে না। ব্যথা আর অস্বস্তির মাঝেই সে বিছানার পাশে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়াল।
জেভিয়ার তার দশা দেখে প্রথমবারের মতো জোরে হাসতে লাগল। হাসি এত খোলামেলা, এত আন্তরিক, যে আনায়া মুদ্রিত মুহূর্তে থমকে গেল। সে চোখ মুছল, ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল কিন্তু জেভিয়ার এর সেই হাসি দেখে তার ভ্রু ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে গেল।
এটা প্রথমবার যখন জেভিয়ারকে এত খোলামেলা হাসতে দেখে আনায়া নিজের অজান্তেই মৃদু হাসল। এক অদ্ভুত অনুভূতি ভেতরে গড়ে উঠল।তার মন তাকে বলে উঠলো, “বারবার এই লোকেরই প্রেমে পড়তে চাই আমি।’
আনায়া আবার ভাবল, “এই লোকটা এতটা ড্যাশিং কেন? যদি একটু কম সুন্দর হত তাহলে কি এমন হতো?”
জেভিয়ার হাসি থামিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “আমি কি হেল্প করবো তোমাকে?”
আনায়া ঠোঁট উলটে উত্তর দিল, “আমি হাঁটতে পারছি না, জেভিয়ার আর তুমি বলছো হেল্প করবে নাকি! আমাকে ওয়াশরুমে গিয়ে দিয়ে এসো।”
জেভিয়ার বিছানা থেকে নামতে নামতে মৃদু হেসে বলল, “তাহলে আর কি, চলো দুজনে একসাথে শাওয়ার নেই। সেই তো শাওয়ার দুজনেরই নিতে হবে।”
আনায়া চিৎকার করে ওঠল, “নাাাাাাাাা। তোমার সাথে এখন একসাথে শাওয়ার অসম্ভব, জেভিয়ার! একটু তো মায়া করো আমার ওপর।”
কিন্তু কে শোনে তার কথা।ল, জেভিয়ার ইতিমধ্যে তাকে কেলে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “মায়া করছি বলেই তো আমি তোমাকে হেল্প করতে যাচ্ছি। একা শাওয়ার নিবে কি করে?”
আনায়া জেভিয়ার এর ঘাড়, বুক খামচাতে থাকলো। আর পা দাপাতে দাপাতে চিৎকার করতে থাকলো, ” জেভিয়ার তোমাকে আমি খু’ন করে ফেলবো।”
আনায়া শাওয়ার থেকে বেরিয়েছে সবে। তার গায়ে নিখুঁতভাবে টাওয়াল পেঁচানো কিন্তু জেভিয়ার ইতিমধ্যে তার কিছুক্ষণ আগে বের হয়ে গেছে। তার পরনে শুধু ট্রাউজার । তার চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে পিঠে, বুকে। এক হাতে টাওয়াল ধরে সে ধীরে ধীরে সেই পানি মুছছে, আর অপরদিকে চোখ বাইরে তাকিয়ে আছে যেন কোথাও হারিয়ে গেছে তার মন।
আনায়া শাওয়ার শেষে বের হয়ে কিছুক্ষণ তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো যেন সময় থেমে গেছে। সে নিজের চারপাশ দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না, সে কোথায় আছে। কাল রাতের ঘটনা যেন কেবল স্বপ্নের মতো। সব জায়গায় পর্দা টানানো ছিল, নিভু নিভু আলো, আর নিজের চারপাশের বিষয়গুলো সে খেয়ালই করেনি। এমনকি রাতে জেভিয়ার কখন তাকে বেডরুমে নিয়ে এসেছে, তারই কোনো স্মৃতি নেই। সত্যিই, গত রাতের সবকিছু ছিল এক অচেনা ঘুমের মতো অবশেষে জাগিয়ে তুলেছে আজকের সকাল।
আনায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। প্রতি পদক্ষেপে তার মনে বড় এক উত্তেজনা মিশ্রিত বিস্ময় আর কৌতূহল। সামনে এসে সে থেমে গেল, তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। দরজা খোলা থাকায় তার চোখে যা পড়ল, তা যেন শ্বাস থামিয়ে দিল।
সামনের সব কিছু একেবারে খোলা একদম স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সামনে একটি খোলা জায়গা, সেখানে রাখা দুটি আরামদায়ক সোফা, পাশে ছোট একটি টেবিল। আর তার চোখ তখন আটকে গেল এক অপূর্ব দৃশ্যে। সরাসরি বেডরুমের সামনে থেকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ওপর থেকে পড়া এক বিশাল ঝরনা, জলধারার শব্দে ভরা, যা নিচের দিকে অবিরাম বয়ে চলেছে।
পাহাড় আর ঝরনার চারপাশে ছড়িয়ে আছে ঘন সব গাছপালা, আর দূরে দূরে বিস্তৃত পাহাড়ের দৃশ্য। নীচে পানির প্রবাহের ঝর্ণা আর সবুজ প্রকৃতির মিশ্রণে একটি শান্তি ও বিস্ময় যা আনায়ার জীবনে আগে কখনো দেখা হয়নি।
সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিল, যেন সেই দৃশ্যটি তার ও আত্মায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। মনে হলো, এই মুহূর্তটাই তার জীবনের এক অপূর্ব, অনন্য এবং চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এটি এমন একটা দৃশ্য, যা চিরকাল তার মনে লেগে থাকবে।
জেভিয়ার একবার আনায়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “তুমি বিছানায় বসো আমি তোমার খাবার নিয়ে আসছি। তারপর মেডিসিন খাবে।”
আনায়া তার কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করল না। চোখ ভরা বিস্ময়ে চারপাশে তাকাতে তাকাতে বলল, “না, আমি আগে এই পুরো বাড়িটা দেখব, জেভিয়ার। এত সুন্দর কেন সব কিছু!”
জেভিয়ার ঠোঁটে এক মুচকি হাসি ফুটল। চোখে হালকা কোমলতার রেখা টেনে সে বলল,
“তোমার পছন্দ হয়েছে?”
আনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ তার গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। মুখ ভরা উচ্ছ্বাসে ফিসফিস করে বলল,
“খুউউউউব।”
জেভিয়ার ঠোঁটের কোণে আরও গভীর হাসি খেলে গেল। “তাহলে আমি সার্থক।”
আনায়া পায়ের গোড়ালি উঁচু করে জেভিয়ার-এর নাকের মাথায় ছোট্ট একটা চুমু দিল।
“আমাকে বাড়িটা আগে ঘুরিয়ে দেখাও না তারপর আমি খেতে যাবো।”
জেভিয়ার আঙুল বাড়িয়ে আনায়ার নাক টিপে ধরল। চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“আজকাল ন্যাকামি করে আমাকে ভালোই নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে শিখছো।”
আনায়া দাঁত বের করে হেসে বলল,
“হুম, ওই আর কি।”
জেভিয়ার দু’হাতে তাকে কোলে তুলে নিল। এরপর শুরুতে নরম ভাবে বললেও পরবর্তীতে গম্ভীর ভাবে বলে,“ন্যাকামিটা তোমাকে ভীষণ মানায়… তবে মনে রেখো, এই ন্যাকামি যেন শুধু আমাকেই ঘিরে থাকে।”
কথাগুলো বলেই জেভিয়ার ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল, আনায়াকে বুকে জড়িয়ে।
আনায়া তার কাঁধে মুখ গুঁজে চারপাশে চোখ বুলাতে লাগল। প্রতিটি কোণে নতুন বিস্ময়। যেন কোনো কল্পরাজ্যে এসে পড়েছে সে। তার মনে হচ্ছিল, সত্যিই এমনও কি মানুষের বাড়ি হতে পারে? মুহূর্তেই মনে হলো আবার,“অবশ্য টাকা থাকলে সবই সম্ভব।”
পুরো বাড়ির ভেতরে কালো রঙে মোড়ানো দেয়াল, আসবাব, এমনকি আলোকসজ্জার ভেতরেও একটা গাঢ় আবহ। সামনে চোখ পড়তেই সে একেবারে থমকে গেল।
বাড়ির সামনেই বিশাল এক নীল পানির সুইমিং পুল যেন আকাশের টুকরো ভেসে আছে সেখানে। আর সুইমিং পুলের এক পাশে সাজানো কালো লেদারের সোফা সেট, যা জায়গাটিকে দিয়েছে এক আধুনিক ছোয়া।
কিছুটা এগিয়ে যেতেই আনায়ার মনে হলো বাড়িটি যেন কোনো পাহাড়চূড়ার গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে তাকালে বোঝা যায় কতখানি উঁচুতে এই বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশে পাহাড়ের সবুজ, গাছপালা আর নিচে ঝর্ণার অবিরাম স্রোত যেন প্রকৃতি আর আধুনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
আনায়া শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আনন্দের ঝিলিক, সে বুঝে উঠতে পারছে না, এ দৃশ্য স্বপ্ন নাকি বাস্তব।
বসার ঘরে ঢুকতেই আনায়ার চোখ আটকে গেল। সামনে পুরো এক পাশ জুড়ে বিশাল কাচের দেয়াল, যার ওপাশে দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। মনে হলো যেন প্রকৃতি আর এই বাড়ি একসাথে মিশে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লম্বা লম্বা দেবদারু গাছগুলো সেই দৃশ্যকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
বাহিরে গ্যারাজের দিকে তাকাতেই দেখলো গম্ভীর ভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেই কালো রঙের Rolls Royce Boat Tail। গাড়িটার চারপাশে যেন অদ্ভুত এক রাজকীয়তা মিশে আছে। তার পাশেই দেখা গেল জিম করার পুরো একটা এলাকা, আধুনিক সব যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো।
এত কিছু একসাথে দেখে আনায়ার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। যেন একেকটা দৃশ্য তার মনে বিস্ময়ের ঝড় তুলছিল।
সে কৌতূহল সামলাতে না পেরে ধীরে ধীরে বলল,
“এইটা কার বাড়ি, জেভিয়ার? এত সুন্দর…!”
জেভিয়ার কোনো উত্তর দিল না। আনায়াকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে বাইরে নিয়ে গেল। নিচে নেমেই দেখা গেল সবুজ ঘাসের কার্পেটের মতো আঙিনা, তার ভেতর দিয়ে পাথরখচিত রাস্তা চলে গেছে সামনের দিকে।
সামনেই ঝলমলে রোদে চকচক করছে এক কালো রঙের নেইমপ্লেট। সোনালি হরফে তাতে স্পষ্টভাবে লেখা,
“Mr. & Mrs. Draven’s Amoria”
আনায়া থমকে দাঁড়িয়ে গেল। অবিশ্বাস ভরা চোখে হাত বাড়িয়ে নেইমপ্লেটের উপর আঙুল বুলিয়ে দিল।
ঠিক তখনই জেভিয়ার হালকা গলায় বলল,
“এই লেখার মানে কি জানো? এর মানে তোমার আর আমার আলাদা প্রেমের পৃথিবী এইটা। এই বাড়ি তোমার, লাভবার্ড। আগে আমার ছিল… এখন এটা তোমার নামে লিখে দিয়েছি।”
তারপর একটু ঝুঁকে আনায়ার চোখের দিকে তাকাল, “পছন্দ হয়েছে, না?”
আনায়া ফট করে তার দিকে তাকাল, চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই জেভিয়ার গম্ভীর গলায় বলল, “পছন্দ হোক বা না হোক দিয়ে দিয়েছি। এখন আর চেইঞ্জ করার কোনো অপশন নেই।”
তারপর আর কোনো সুযোগ না দিয়ে বলল,
“চলো, এবার খাবার খেতে হবে।”
আনায়া টলমল চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর যেন সব প্রশ্ন, সব বিস্ময় গিলে ফেলল নিজের ভেতর। ধীরে ধীরে দু’হাতে জেভিয়ার-এর গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বিড়ালছানার মতো ছোট হয়ে তার বুকের ভেতর গুটিয়ে গেল।
তার মনে হলো, সে আসলেই কি এই ভালোবাসার যোগ্য? এতকিছু পাওয়ার যোগ্য? কেন এত ভালোবাসে জেভিয়ার তাকে?
জঙ্গলঘেরা নির্জন এলাকায়, জেভিয়ারের বাগানবাড়ির কাছাকাছি একটা পুরোনো কটেজে বসে আছে ডেভিড। গতরাতের পার্টি থেকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল সে। বাগানবাড়ির ভেতরে ক্যামেরা বসানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি, কিন্তু চারপাশে, প্রতিটি কোণায় নজরদারির ফাঁদ পেতেছে সে।
রাতের অন্ধকারে কাচের বারান্দার দরজা অর্ধেক খোলা থাকায় জেভিয়ার আর আনায়ার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় স্পষ্ট ধরা পড়ে। সেসব দেখার পর থেকে নিজের ভেতরের আগুন সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। বুকের ভেতর রক্তে আগুনের ঢেউ উঠছিল শৈশব থেকে যে মেয়েটিকে নিজের ভাবনায় বন্দি করে রেখেছে, যার জন্য এত কিছু করেছে, সেই মেয়েই এখন তার চোখের সামনে অন্য কারও বাহুডোরে।
অসহ্য হিংসা আর ক্ষোভে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিটি দৃশ্য তার চোখে যেন আগুন ঢেলে দিচ্ছে। নিজের শিরায় শিরায় সে রাগ অনুভব করছে মস্তিষ্ক ফেটে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা।
এরপর আজ বিকেলের ঘটনা যে আগুনে ঘি ঢালার মত ছিলো। নেইমপ্লেটে লেখা “Mr. & Mrs. Draven’s Amoria” দেখানোর জন্য জেভিয়ার যখন আনায়াকে বাইরে নিয়ে এলো, সেই মুহূর্তটিও ডেভিড দেখেছে। শব্দগুলো যেন তার বুকের ভেতর শূলে বিঁধলো।
তার হাত কাঁপছে, চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠছে। এখন আর শুধু দেখা বা অপেক্ষা নয় সব ভেঙেচুরে গুড়িয়ে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে গ্রাস করছে।
কাউচে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ নবন্ধ করে কপালে স্লাইড করতে থাকে ডেভিড। আচমকাই সে শব্দ করে হেসে ওঠে। কাঠের টেবিলটায় একটি ঘুষি প্রহার করে বলে ওঠে, ফা*ক, এই বিষয়টা আমার আগে কেন মাথায় আসেনি।
“জেভিয়ার! জেভিয়ার! জেভিয়ার!হাহ্, মাদারফা’কা’র তোর জানেমান কি তোর সম্পর্কে আদৌ কিছু জানে? মনে তো হয়না।”
এরপর একটু থেমে চোয়াল শক্ত করে আনার বলে ওঠে, “ফাইন!এইবার খেলাটা খেলবো আমি। তুই শুধু দেখবি কি করে শেষের দিকে কি করে বাজিমাত করি আমি।”
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অ্যালেক্স। ভেতরে আধো অন্ধকার, কেবল জানালা দিয়ে আসা আলোর সরু রেখা তার কপাল, চোখ আর ঠোঁটে পড়ে অদ্ভুত তীব্রতা তৈরি করেছে। অন্যদিকে অ্যাশলি ব্যাগ হাতে দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে।
“রাস্তা ছাড়ুন না, আমার বোন এসে গিয়েছে।” অ্যাশলির কন্ঠে অস্থিরতার সঙ্গে চাপা রাগও মিশে আছে।
অ্যালেক্স চোখ সরু করে তাকায়, গম্ভীর কণ্ঠে ধীরভাবে বলে, “কাল না বললাম, কোথাও যাওয়া চলবে না তোমার?”
অ্যাশলি ব্যাগটা শক্ত করে ধরে, অস্থির ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, “আরে এখন আমরা একসাথে কীভাবে থাকব? মানুষ কী ভাববে?”
অ্যালেক্স ভ্রু কুঁচকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “যেভাবে এতদিন থেকেছ, সেভাবেই থাকবে।”
অ্যাশলি এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ফোঁস করে বলে ওঠে, “যেতে দিন না, বোন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুদিন পর আবার এসব নিয়ে ভাবা যাবে। আর আমি তো আপনার জীবন থেকে চলে যাচ্ছি না।”
অ্যালেক্স এবার ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলে, “চাইলেই কি যেতে দিই জীবন থেকে? আমাকে না জানিয়েই আমার মনে ঢুকে পড়েছ তুমি এখন আর বের হওয়ার রাস্তা নেই।”
অ্যাশলি বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। “বুঝেছি। এইবার যেতে তো দিন! আমাকে আপনি প্রায় বিশ মিনিট ধরে এখানে আটকে রেখেছেন।”
অ্যালেক্স হঠাৎ যেন তার ভেতরের সব জেদ ছেড়ে দেয়। হঠাৎ হাটুমুড়ে বসে পড়ে, চোখ তুলে তাকায় অ্যাশলির দিকে। অসহায় কন্ঠে বলে, “একটু অক্সিজেন দিয়ে যাও তুমি চলে গেলে আমি অক্সিজেন পাবো কোথায়? তখন তো শ্বাসকষ্টে মারা পড়ব।”
অ্যাশলি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায়। তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। সে একটা ঢোক গিলে বলে, “নাটক কম করুন, আমি যাচ্ছি।” বলেই অ্যালেক্সকে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে দরজা যেতে যায়।
কিন্তু অ্যালেক্স বিদ্যুতের মতো হাত বাড়িয়ে তার কব্জি চেপে ধরে। সে নিচু গলায় বলে ওঠে, “না দিলে যেতে দেবো না। নাও, চয়েজ ইজ ইয়োরস।”
অ্যাশলি থেমে গেল। দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল। অ্যালেক্স ধীরে ধীরে কাছে আসে, শ্বাসের উষ্ণতা বাতাসে ভেসে আসে। অ্যাশলির বুক কেঁপে ওঠে। সে চোখ সরিয়ে ফিসফিস করে বলে, “থামুন প্লিজ।”
একটু থেমে বলে ওঠে, ” আপনি চোখ বন্ধ করুন। আমি দিচ্ছি।”
অ্যালেক্স ভ্রু উচিয়ে সন্দিহান কন্ঠে সুধায়, “সত্যি তো?”
অ্যাশলি মাথা নিচু করে,হালকা নাড়ল। “হ্যা।”
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৭
অ্যালেক্স ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। যেন সেই মুহূর্তের অপেক্ষায়ই ছিল এতক্ষণ ।
অ্যাশলি কাঁপা হাতে নিজের ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে ভিজিয়ে নিল। তারপর চোখ বন্ধ করে ঝট করে এগিয়ে গিয়ে অ্যালেক্সের গালে টুপ করে হালকা একটা চুমু দিল। আর কোনো কিছু না ভেবে দৌড়ে দরজা ঠেলে বাইরে চলে গেল।
পেছন থেকে অ্যালেক্স চোখ মেলে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের পর চিৎকার করে উঠল, “এইটা চিটিং, অ্যাশ!”
দরজার বাইরে করিডোরে অ্যাশলির মুখে লজ্জা মাখা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
