Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৫

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৫

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৫
তোনিমা খান

তানশানকে গেটের কাছে নামিয়ে দিয়ে তপোবন সেখান থেকেই আবার অফিসের উদ্দেশ্যে চলে যায়। ছেলেকে কখনো ড্রাইভারের ভরসায় ছাড়ে না। কারণ ড্রাইভারের উপর ছাড়লেই ছেলে ড্রাইভারকে ভুলিয়ে কে এফ সি, নয়তো রুবার্স ক্যাফেতে চলে যাবে আর আনহেলদি খাবার খাবে। যেগুলো কোনো এক স্পেসিফিক সময়েই সে খেতে অ্যালাউ করে।
তানশান চটজলদি পোশাক ছেড়ে নিচে নামে। সোজা রান্নাঘরে ঢুকে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
–“মেজো মা, কিছু খাবার বানিয়ে দাও।”
রূপকথা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ব্যস্ত কণ্ঠের মালিকের দিকে। জবা চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“তোমার মেজো মা নায়েলরে গোসল করাইতে গেছে, তানশান। কি খাইবা আমগো কও। আমরা বানাইয়া দেই।”
তানশানের মধ্যকার চঞ্চলতা মিলিয়ে গেল। এই বাড়িতে তার খাওয়া দাওয়ার ছোট ছোট আবদারগুলো মেজো মাই পূরণ করে। সে বলল,

–“দরকার নেই। মেজো মা আসুক।”
সে বেরিয়ে যেতে নিলে রূপকথা পিছু ডাকে,
–“আমায় বলো কি খাবে, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
তানশান আড়চোখে ফিরে তাকায়। আনত মুখে বলল,
–“আমার খাবার মেজো মা ছাড়া কেউ বানাতে পারে না।”
সে চলে যায়। রূপকথা সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
–“আমায় শিখে নেয়ার একটা সুযোগ দিলে আমি পারতাম।”
রূপকথার মুখ মলিন হয়ে যায়। সে খেয়াল করেছে তাকে দেখলেই ছেলেটার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। এক পথে তাকে দেখলে সে উল্টোপথে চলে যায়। জবা খেয়াল করে রূপকথার স্থবিরতা। সে বলে,
–“ভাবিজান কিছু হইছে? আফনে কিছু মনে কইরেন না, আসলেই তানশান বাবার খাবার মাইজ্জা ভাবিই বানায়।”
রূপকথা নিজের অভিব্যক্তি তৎক্ষণাৎ লুকিয়ে কৃত্রিম হেসে বলে,

–“না না আপা, আমি কিছু মনে করব কেন!”
সে আবার নিজের কাজে মগ্ন হয়। তন্মধ্যে মৌনতা নিচে নামে। তানশানকে দেখেই ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
–“তানশান এসে গিয়েছ আব্বু? কি খাবে, ফল কেটে দেই?”
তানশান এগিয়ে আসে তার কাছে। আলগোছে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি সুরে বলে,
–“একটা বার্গার বানিয়ে দেবে, মেজো মা?”
মৌনতা হাসল আবদার শুনে। এই অনৈতিক আবদারগুলো শুধু তার কাছেই করে তানশান। নয়তো বড় ভাইজান শুনলে খবর আছে! সে গাল টিপে বলল,
–“এত সুন্দর করে আবদার করলে কেউ না দিয়ে পারে? এসো, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
মৌনতা ইনস্ট্যান্ট বার্গার বানিয়ে দিল তাকে। ঘরে রেডিমেড সবকিছু আনাই থাকে, সে শুধু এসেম্বল করে দেয়। পুরোটা সময় তানশান উচ্ছ্বাস নিয়ে মৌনতার পাশে ঘুরঘুর করেছে।
রূপকথা এই সুযোগে বার্গার বানানো শিখে নেয়। আর আড়চোখে অবলোকন করে ছেলেটিকে। কেমন আঁচল ধরে ঘুরঘুর করছে মৌনতার, মাঝেমধ্যে আবার হাসিমুখে আহ্লাদি দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। ছেলেটাকে এখন কত স্নিগ্ধ দেখতে লাগছে! অথচ তাকে দেখলেই কেমন বিবর্ণ হয়ে যায় ছেলেটার মুখটি! এত মানুষের মাঝে কেউ বিশেষ ভাবে তাকে ঘৃণা করছে ভেবেই রূপকথা মন খারাপ করে নেয়। এই ঘৃণা কেন? সে সৎ মা বলে? তবে কি সারাজীবন ছেলেটির ঘৃণ্য দৃষ্টির তোপেই তাকে জীবন কাটাতে হবে? এমনটা হলে জীবন যে গলায় বেঁধে থাকা কাঁটার ন্যায় দুঃসহ হয়ে উঠবে।

–”তিন ভাই এক মায়ের গর্ভ অথচ তাদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বড় ভাইজান মাটির মানুষ আর ছোট ভাইজান আগুনের গোলা।”, মৌনতা দক্ষ হাতে গরুর মাংস কসাতে কসাতে বলল।
–”আর মেজো ভাইজান?”, রূপকথার কৌতূহলী প্রশ্নে মৌনতার মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেল। রান্নাঘর গোছাতে থাকা রূপকথা জবাবের প্রতিক্ষায় তাকিয়ে আছে মৌনতার দিকে। মৌনতা নিরবতা ভেঙে ঠোঁট উল্টে বলল,
–”বুঝে উঠতে পারি না, কমপ্লিকেটেড!”
–”খাড়ান! আমি কই বড় ভাবিজান। মাইজ্জা ভাইজান কেমন জানেন? ঘরের সদর দরজা দিয়ে ঢোকা থিকা বাইর হওয়া পর্যন্ত ‘মৌনতা উপরে আইসো, মৌনতা উপরে আইসো।’ আর সদর দরজার বাইরে গেলে ‘মৌনতা কেডা? আমি তো মৌনতারে চিনিই না।’ এমন মানুষ মাইজ্জা ভাইজান। ঐ যে কয় না গিরগিটি? সেইগুলি!”
জবা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে নানা আঙ্গি ভঙ্গি করে বলল। মৌনতা কড়া চোখে তাকায় জবার দিকে। তা দেখে জবা মুখ বাঁকালো। রূপকথা মৌনতার দিকে তাকিয়ে শুধায়,

–”এমন কেন? কাজে খুব ব্যস্ত থাকে?”
মৌনতাকে উদাসীন দেখা গেলো রূপকথার কথায়। কণ্ঠ খাদে এনে বলল,
“জানি না, তবে জানো আমি প্রাণপণে আশাকরি যেন সে কাজে ব্যস্ত থাকুক।”
বলতে বলতেই মৌনতা হাতের মটরশুটি গুলো বেছে নিতে লাগল। দৃষ্টি তার টলমলে। তার সংসারটা ছারখার হয়ে গেলে সংসার ভাঙার সব ভোগান্তি তো তার মেয়েটার উপর পড়বে। তার নায়েলের জীবনটা আর পাঁচটা স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো থাকবে না। নিজের কথা ভাবলে হবে না, সে মা। তাকে তার সন্তানটির জন্য হলেও শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করতে হবে। নিজের সর্বোচ্চ টুকু দিয়ে নিজের সংসারটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে সে। রূপকথার মুখশ্রী মলিন হয়ে গেল। তার কেন জানি মনে হয় মানুষটা ভালো নেই!
দুপুর আড়াইটা। আজ অদ্ভুত মনোরম পরিবেশ সিকদার বাড়ি জুড়ে। কেননা আজ খাবার টেবিলে ঘরের সকল সদস্যরা হাজির হয়েছে। ঘরের বউদের আজ কাজের চাপ ও খানিক বেশি। তপোবন বাড়ি ফিরে গোসল করে ছেলে আর ছোট ভাইকে সমেত নিচে নামে। রোজ ও ভার্সিটি থেকে এসে চটজলদি গোসল করে নিচে নামে। এসেই মৌনতা আর রূপকথার সাথে হাত বাটায়। নায়েলকে মৌনতা আগে খাইয়ে নিয়েছে কিন্তু তবুও সে এখন বাবার সাথে বসবে। সে ছুটতে ছুটতে এসে ইমরোজের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

–“পাপা কোলে!”
ইমরোজ পাশে ফিরে তাকিয়ে বলল,
–“পাপা ভাত খাচ্ছি, মা। তুমি পরে কোলে উঠবে, এখন খেলো ওখানে বসে।”
–“আমি তোমাল সাথে বসব আল একটু খাবাল খাব।”, নায়েলের করুন আবদারে তপোবন চোখ তুলে তাকায়। ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
–“কোলে নে, আগ্রহ করে যখন খেতে চাইছে একটু খাইয়ে দে।”
–“এভাবে একহাতে কোলে নিয়ে খাওয়া যায়?”, ইমরোজ বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে নায়েলকে কোলে তুলে নেয়। নায়েলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে বাবার প্লেট থেকে একটু একটু করে নিয়ে মাংস খেতে লাগল। মৌনতা ডানে বামে মাথা নাড়ে, এমনি সময় এর এক আনা আগ্রহ ও দেখা যায় না খাবারের প্রতি। তবে বুক জুড়ে প্রশান্তি অনুভব হয় বাবা মেয়ের সুন্দর মুহূর্ত দেখে।
খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই তপোবন আর ইমরোজ বেরিয়ে যায় অফিসের উদ্দেশ্যে। রূপকথা ব্যস্ত মানুষটির দিকে একবার ফিরে তাকিয়েছিল আশাভরা নয়নে। যদি কিছু বলে পড়াশুনার বিষয়ে! কিন্তু কিছুই বলল না। আশাহত মন নিয়ে রূপকথা একনিষ্ঠভাবে শাশুড়ির আদেশ পালন করে যায় আর সুযোগ পেলেই বইয়ের কাছে ছুটে যায়। বইগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। ইতিমধ্যেই বায়োলজির প্রথম অধ্যায়ের অর্ধেক তার পড়া শেষ। তবে সন্ধ্যার পর থেকে আর পড়তে পারেনি, শাশুড়ির পাশে বসতে হয়েছে।

রোজকার নিয়মানুযায়ি তপোবন সাড়ে নয়টার দিকেই বাড়ি ফেরে। বাড়ি ফিরে তার কাজ হয় ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে পড়াতে বসানো আর নিজের অফিসের কোন কাজ থাকলে সেটা করা। তপোবন উপরে যেতে যেতে জবাকে বলল,
–”জবা, এক কাপ কফি পাঠা।”
হাতের কুশিকাটা রেখে নির্জনা বেগম চোখ তুলে তাকায় ছেলের গমনের পথের দিকে। পরপরই ঝিমিয়ে বসে থাকা রূপকথার দিকে। সে গম্ভীর গলায় বললো,
–”তোমার স্বামী কাজ থেকে ফিরেছে আর তুমি এমন ঝিমুনি দিয়ে বসে আছো কেন? তার কোথায় কি লাগে উঠে দেখবে না? জবাকে ডাকা মানে তোমায় ডাকা, এটা কি বলে বোঝাতে হবে?”
রূপকথার আড়ষ্টতা ভঙ্গ হলো। তবে আজ আর খারাপ লাগা দেখা গেল না তার মাঝে। ঐ মানুষটা যখন তার সবদিকে খেয়াল রাখছে তখন তার ও তো উচিত মানুষটার সংসার গুছিয়ে নেয়া, তার খেয়াল রাখা। সে নীরবে উঠে চলে যায় রান্নাঘরে।
অপর পাশের সোফায় বসে নায়েলকে পড়াচ্ছে মৌনতা। অনেকক্ষণ যাবৎ পড়াশুনা করে নায়েল অবসাদ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,

–”তুমি না বলেছিলে, পাপা আজ আমাদেল ঘুলতে নিয়ে যাবে?”
মৌনতা অনুতপ্ততা নিয়ে বলল,
–”তোমার পাপার গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে গিয়েছে মা, তাই বাইরে যেতে হয়েছে। আমরা বরং কাল যাব।”
নির্জনা বেগম নাতনির ছোট মুখটি দেখে বলল,
–”মন খারাপ করো না দাদুমনি। আগামীকাল পাপা নিয়ে যাবে বাইরে ঘুরতে।”
নায়েল জবাব দিল না। মন খারাপ করে সোফা থেকে নেমে উপরে চলে যায় ফুপির কাছে।
তপোবন ফ্রেশ হয়ে বের হতেই রূপকথা কফি হাতে ঘরে ঢুকল। সে তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে তাকে এক পলক দেখে বলল,
–”তুমি এনেছ? আমি জবাকে বলেছিলাম।”
–”এটা আমার কাজ।”
তপোবন মৃদু থমকালো সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তিতে। কিয়ৎকাল সময় নিয়ে মিহি স্বরে শুধায়,
–”এটা তোমার কাজ, তুমি মন থেকে মেনে নিয়েছ?”
–”না নেয়ার কি আছে?”, রূপকথার বিভ্রাট বিহীন কণ্ঠ।
–”প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে প্রশ্ন?” ,তপোবনের কথায় রূপকথা চুপ করে রইল। তপোবন মুখ মুছে তোয়ালে হাতে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। দম ফেলে বলল,
–”সকালে আমায় ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। আমি তো ভেবেছিলাম তুমি উল্টাপাল্টা কিছু করবে। আর নিঃসন্দেহে এর জন্য দোষী আমি হতাম। হওয়ার-ই কথা, আমার মতো জীবনসঙ্গী কারোর কাম্য নয়। তবে এখন মনে হলো তুমি বয়সের থেকেও স্ট্রং। তার থেকেও স্ট্রং তোমার চিন্তা ভাবনা। এত কঠিন পরিস্থিতি! অথচ তুমি পরিস্থিতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমার সামনে এক সহজ ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ।”
রূপকথা তখনো কফি হাতে দাঁড়িয়ে। সে তপোবনের হাত থেকে ভেজা তোয়ালেটা নিয়ে কফির কাপটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

–”বয়স আমাদের স্ট্রং, ব্যক্তিত্ববান বানায় না। বানায় পরিস্থিতি। পরিস্থিতি যতটা কঠিন হয়, একটা মানুষকে টিকে থাকার জন্য ঠিক ততটা স্ট্রং হতে হয়। তাই আমার পরিস্থিতি অনুযায়ী আমি নিজেকে তৈরি করে নিয়েছি। এবং আমার পরিস্থিতি এটাই যে আমার জীবনের ভিত্তি এখন এই সংসার আর আপনি। বিষয়টা যত তাড়াতাড়ি এবং সহজভাবে আমি নিতে পারব, জীবনে হয়ত তত তাড়াতাড়ি এবং সহজভাবে এগিয়ে যেতে পারব।”
রূপকথা দম নেয়। ফের ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“আর আপনি সহজ বলেই আমিও সহজ হতে পেরেছি।”
মেয়েটির নিষ্প্রাণ মুখটিতে স্থির দৃষ্টি রেখেই কফিতে চুমুক দিল তপোবন। কথাগুলোর গভীরতা বুঝলেও সেই বিষয়ে আর কথা তোলে না। শুধু বলে,
–”সবকিছু পেছনে ফেলে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলো। জীবনে অনেক বড় হতে হবে। যতটা বড়ো হলে জীবনের দুঃখ, অপ্রাপ্তিগুলো একদিন স্মৃতির পাতায় উঠাতে পারো।”
–”অপ্রাপ্তি বলে কিছু নেই আমার জীবনে। যা আছে তা অপ্রাপ্তির থেকে সুন্দর। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার উপর প্রশ্ন তুলতে নেই।”, রূপকথা বারান্দার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল। এযাত্রায় তপোবনকে ভাবুক দেখাগেল। অন্তঃস্থলে একটা প্রশ্ন জেঁকে বসল,
–”সে কি মেয়েটির অপ্রাপ্তিগুলোর থেকে সুন্দর? না-কি সে কথাটির মর্মার্থ বুঝতে ভুল করছে?”
রূপকথা বারান্দা থেকে আসলে তপোবন তার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিল। রূপকথা সেটি নিয়ে শুধায়,

–”এটা কি?”
–”কলেজের ভর্তির ফর্ম। ঠান্ডা মাথায় বসে পূরণ করো। আমি একটু আসছি নিচে থেকে। কোনোকিছু না বুঝলে রেখে দিও আমি আসলে পর করবে।”
রূপকথার মধ্যকার উদাসীনতা, জড়তা নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল। ভঙ্গুর, বলহীন দেহে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস আঁকড়ে ধরল। আবার সেই আগের মতো কলেজ ইউনিফর্ম পড়ে সে কলেজে যেতে পারবে, পড়াশুনা করতে পারবে। সে কি আনন্দ! সামনের মানুষটির দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাতে ভুললো না—তবে মুখ থেকে কোন কথা আর বের হলো না। দৃশ্যমান অত্যধিক সহজ এই সম্পর্কটিতে এখনো সুপ্ত জড়তার কমতি নেই! বরং দুজনেই নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সম্পর্কের এই অস্বাভাবিকতা, দূরত্ব লুকানোর। তবে এই জড়তা, দূরত্বগুলো সর্বদা অপপ্রকাশিত-ই থেকে যাবে — এই দৃঢ় প্রত্যয় দু’জনের মাঝেই রয়েছে। এগুলো প্রকাশ করা মানেই সম্পর্কটিকে জটিল করে তোলা।
তপোবন যেতে গিয়েও আবার ফিরে আসলো। পাঞ্জাবির পকেট থেকে নিজের ফোনটি বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল,

–”পাসওয়ার্ড 324shan, তোমার মা তোমার সাথে কথা বলতে চায়। তাকে ফোন দাও।”
তপোবন বেরিয়ে যেতেই রূপকথা মাকে ফোন দেয়। এখন সে ফোন দিতে পারে। নিলীমা যেনো ফোন হাতে নিয়েই বসেছিল। মেয়ের ফোন পেতেই সে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে শুধায়,
–”কথা মা?”
রূপকথার বুক জুড়ে প্রশান্তির ছোঁয়া লাগে এই ডাকটি, এই কণ্ঠটি শুনলে। সে মিহি স্বরে শুধায়,
–”ভালো আছো, আম্মা?”
–”আমি বেশ আছি। তুই কেমন আছিস, মা?”বিছানায়় বসা নিলীমা হাসিমুখে শুধায়। শুকতারা উদ্‌গ্রীব হয়ে শোয়া থেকে উঠে আসে মায়ের কাছে। বুবুর সাথে কথা বলবে।
–”ভালো আছি, আম্মা।”
নিলীমা বলল,
–”তারা, তোর সাথে কথা বলার জন্য সেই থেকে আমার চারিপাশে ঘুরেছে। এখনো আমায় ঠিকভাবে কথা বলতে দিচ্ছে না। নে ওর সাথে আগে কথা বল, পরে আমি বলব।”
তারা ফোনটি নিয়েই চেঁচিয়ে উঠল,
–”বুবু? বুবু? তুই আমাকে ছাড়া কেমন আছিস? আমি একটুও ভালো নেই বুবু। মন কেমন করে তোর জন্য। তোর ওখানে কেমন জায়গা, হ্যাঁ? শুনেছি খুলনা না-কি শহর! তুই কি দেখেছিস শহর? ওখানে সব বড় বড় দালান? শিশুপার্ক? তুই ও কি বড় দালানে থাকিস বুবু? কত বড়? আর বুবু…”
আচমকাই তারা থেমে গেল। সে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায় মায়ের দিকে। নিলীমা এক পলক থেমে যাওয়া তারার দিকে তাকিয়ে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায়। চুলোয় চা বসিয়েছে। শীতের রাতে এক কাপ চা না খেলে ভালো লাগে না। নিলীমা যেতেই শুকতারা পুনরায় নিচু স্বরে বলতে শুরু করল,

–”বুবু? শহরে তো বাবা কাজ করত। তুই কি বাবার কোনো খোঁজ পেয়েছিস, বুবু?”
বোনের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ শুনে যতটা আনন্দিত হয়েছিল, শেষের নিচু কণ্ঠে ঠিক ততটাই বিমর্ষ হয়ে গেল। সে বিমর্ষ মুখে বলল,
–”শহর তো অনেক বড় হয়, তারা। এত মানুষের ভিড়ে কোনো একজনকে খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
শুকতারা মিইয়ে গেল। ভেবেছিল বুবু শহরে গিয়েছে এখন‌ বাবার খোঁজ পাবে হয়তো। বাবার খোঁজ পেলেই তাদের সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে। তারাও আর পাঁচটা মানুষের মতো বাঁচতে পারবে, লুকিয়ে বাঁচতে হবে না। ভালো ভালো খাবার ও হয়ত পাবে।
সে মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
– “ওহ্!”
রূপকথা কণ্ঠেই বুঝতে পারলো বোনের মিইয়ে যাওয়া। সে বলল,

–”মন খারাপ করিস না। আর ক’টা দিন পর আমি তোকে আর মাকেও শহরে নিয়ে আসব। বুবু পড়ালেখা শুরু করছি, তারা। ডাক্তার ও হতে পারব। আর কয়টা বছর কষ্ট করতে হবে তারপর বুবু সব কষ্ট দূর করে দেব। আমি শুনেছি এখানে একজন মেডিকেল স্টুডেন্টের টিচার হিসেবে অনেক চাহিদা। বিনিময়ে অনেক টাকাও দেয়। তাই ডাক্তার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা ও করতে হবে না, তার আগেই আমি ইনকাম করতে পারব। আর আমাদের সব দুঃখ দূর করে দিতে পারব।”
নিঃশব্দে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে চাদর খুঁজতে থাকা তপোবনের হঠাৎ করেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল আশ্বাসভরা কণ্ঠে। সে পা থামিয়ে ফিরে তাকায় বারান্দার দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার দিকে। ঘরের বড় ছেলে, একজন বাবা, একজন স্বামী হওয়ায় খুব ভালো করে উপলব্ধি করতে পারল এই যন্ত্রণা। আর্থিক সংকটে তাদের কোনোদিন পড়তে না হলেও সে অনুভব করার চেষ্টা করে, এই পরিস্থিতিতে তানশান থাকলে তার কেমন লাগত। সে ভাবতেই পারল না তার তানশানকে এমন পরিস্থিতিতে। সোফার উপর থাকা চাদরটি নিয়ে সে নীরবে বেরিয়ে যায়।
–”ওহ্!”, শুকতারা পায়ের নখ খুঁটতে খুঁটতে জবাব দেয়। মাত্রই তো বুঝতে পারল তাদের জন্য ভালো থাকা স্বপ্ন বৈকি আর কিছু না। তাই এই কথাগুলো মন ভোলানো কথাই মনে হলো তার কাছে। রূপকথা পুনরায় শুধায়,

–”কি হলো কথা বলবি না?”
–”কি বলব?”
–”মায়ের শরীর কেমন? বাইরে বের হয়েছিল? গজা, মিন্টুর সামনে পড়েছিল?”
শুকতারা নিচু স্বরে বলল,
–”আম্মা বাইরে বের হয় না, বুবু। তার শরীর খারাপ। কোমর ব্যথা, গায়ে ব্যথা। এই পুরো কাছারি ঘর একা পরিষ্কার করেছে। দুলাভাই মানুষ পাঠাইছিল তা আম্মা না করে দিছে। এখন ভুগছে অসুখে। আমি কত করে বললাম, পাঠিয়েছে যখন করুক কাজগুলো। তুমি একা কিভাবে করবে? তা সে শুনলো না আমার কথা।”
পরিস্থিতি আর দারিদ্রতা যে ছোট্ট শুকতারাকেও অনেক বড় করে দিয়েছে সেটা আজ বুঝতে পারে রূপকথা। সে কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
–”দুলাভাই মানে? তপোবন সিকদার পাঠিয়েছিল মানুষ?”
–”হু, দুলাভাই অনেক ভালো মানুষ, তাই না বুবু?”
–”হুঁ।”, রূপকথা সাথে সাথে জবাব দিল। তাকে মোটেও সময় নিতে হয় না। নিজের এমন জবাবে রূপকথা নিজেও কিছুটা থতমত খেয়ে গেল।
–”বাইরে না বের হলে খাচ্ছিস কি? বাজার করেছিল? মা ওষুধ আনেনি? ”
শুকতারা এবার চুপ করে রইল। বলার মতো কিছু পেল না। রূপকথা পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
–”শুকতারা কিছু জিজ্ঞাসা করেছি।”
–”এখানে দিঘির পাড়ে অনেক ভালো কঁচু শাক পাওয়া যায় বুবু। চুলকায় না, খেতে মজা। তুই তো জানিস আম্মার হাতের রান্না কত মজা! আর আম্মার ব্যথাও একটু বিশ্রাম নিলে কমে যাবে।” , শুকতারা কণ্ঠে মেকি প্রফুল্লতা এনে বলল।

পড়াশুনার সেই অবর্ণনীয় আনন্দ যেন ফিকে পড়লো মা বোনের কষ্টের কছে। রূপকথার দেহাবয়ব ম্লান হয়ে আসল। সে ধীর পায়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। গা ভর্তি গহনা, হাতে মোটা মোটা বালা, এই দুদিনেই চোখেমুখে এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা দেখা যাচ্ছে। এই বাড়িতে আসার পর থেকে এক বেলাও সে মাছ মাংস ছাড়া খায়নি। ভাত সে কি চিকন! যেন পোলাও চাল। এক নিমিষেই অনেকগুলো ভাত খেয়ে ফেলা যায়। আজ দুপুরেও তো গরুর মাংস, বড় ইলিশ মাছ, সবজি দিয়ে ভাত খেলো। গলার কাছে না বলতে পারা দুঃখরা দলা পাকাতে লাগল। চোখের প্রাচীর ভেদ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে সমানতালে। সে কত ভালো ভালো খাবার খাচ্ছে আর সেখানে তার মা বোন খাবার, ওষুধের অভাবে ভুগছে। এর জন্যই কি আম্মা তাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে? অপরাধ বোধ, দুঃখ বাড়াতে? এই খাবার তার গলা দিয়ে নামবে কি করে? আম্মা তো তাকে শাস্তি দিচ্ছে। একসাথে থাকলে যা খেতো তাতেই মন ভরে যেতো, অন্তত এই দুঃখ তো পেতে হতো না।
তার কাছে সকলের দেয়া অনেকগুলো টাকাও আছে কিন্তু সেগুলো সে দেবে কি করে? কেনই বা দেবে? ওগুলো তার ইনকামের টাকা নয়, অন্যের টাকা। অন্যের টাকা দিয়ে মাকে কথার নিচে রাখতে সে পারবে না। কিন্তু ইনকাম ও বা করবে কি করে? এই বাড়ির বউদের যেখানে পড়াশোনা করাই নিষেধ, সেখানে টাকা ইনকাম করা তো দুঃস্বপ্ন!

–”তুমি কি বলছ, তপোবন? রূপকথা পড়াশুনা করবে মানে? এই কথা তুমি মাথাতে আনলে কি করে? ও পড়াশুনা করলে ঘর সংসার দেখবে কে? তোমার খেয়াল রাখবে কে?”, নির্জনা বেগমের বিস্ময় ভরা কণ্ঠে তপোবনকে আরো দৃঢ় দেখাগেল। সে অনঢ় গম্ভীর, শক্ত গলায় বলল,
–”আম্মা আমার ওকে বিয়ে করার মূল কারণ-ই ছিল একটা সুন্দর, ভয়মুক্ত জীবন দেওয়া। নাকি সংসারের গন্ডিতে আটকে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটির গলা টিপে হ’ত্যা করা! আপনি বুঝদ্বার আম্মা! পড়াশুনা আপনিও করেছেন। একটা মেয়ে হয়ে, এই সময়টা আপনিও পার করেছেন। আপনি বোঝেন এই বয়সটা একটা মেয়ের বিকাশের সময়, লক্ষ্য পূরণের সময়। আশাকরি এই বিষয় নিয়ে আর বাঁধা প্রদান করবেন না।”
–”আমিও এই সময়টা পার করে এসেছি, আর সেইজন্যই বলছি, এই কথা নিজের মাথা পর্যন্ত-ই রাখো এটা বাস্তবায়ন করার চিন্তা করো না। নয়তো একদিন শুনতে পাবে তপোবন সিকদারের স্ত্রী অন্য ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে।”
তপোবনের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে পুরোনো ঘা তাজা হতেই। সে শক্ত কণ্ঠে বলল,

–”সবসময়, সব বিষয়ে এই কথা টানা কি খুব বেশি প্রয়োজন, আম্মা? আমি কাউকে ধরে বেঁধে সংসার করাতে ইচ্ছুক নই, আম্মা। তাই বলে নিজের দায়িত্ব কর্তব্য থেকে পিছুপা ও হবো না। সে আমার স্ত্রী! তার সম্মান রক্ষা করা, শখ আহ্লাদ পূরণ করা আমার দায়িত্ব। তাই আমি আবারও বলছি রূপকথাকে নিয়ে এমন কথা আর বলবেন না। ও তেমন মেয়ে নয়। আর যদি যেতেও চায় তবে আমার কোনো বাঁধা থাকবে না। ও আমার হয়ে বাঁচতে চাইলে আমি শক্ত হাতে আগলে নেবো, মুক্তি চাইলে মুক্ত করে‌ দেব।”
–”বাহ্, বিয়েটা তোমার কাছে ছেলেখেলা? না-কি তুমি উদার সাজতে গিয়ে বোকার মতো আচরণ করছো, তপোবন?”

–”হয়তো মনে হচ্ছে আমি বোকার মতো আচরণ করছি, আম্মা। কিন্তু একটাবার আমার জায়গায় থাকলে বুঝতেন আমি কোন পরিস্থিতি দিয়ে যাচ্ছি। যেখানে দ্বিতীয়বার জীবন শুরু করাতেই আমার নারাজি, সেখানে জোরপূর্বক কাউকে নিজের সাথে বেঁধে রাখা আমার জন্য দমবন্ধকর অনুভূতির সমান। বিগত তিনদিন যাবৎ আমার ছেলেটার মাঝে থেকে কি গিয়েছে তা আপনি জানেন না। ছেলের সামনে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে দাঁড়াতে যে শক্তি, সাহস লাগে সেটা জোগাড় করা কতটা কঠিন সেটা আমি জানি। জীবনটা আমায় বয়ে চলতে হবে, তাই এই পুরো বিষয়টা আমায় আমার মতো করে সামলাতে দিন। বহুকষ্টে ছেলেটাকে এবং এই অসম সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক করেছি।”
নির্জনা বেগম শোনার পাত্রী নয়। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন,
–”তুমি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছ, তপোবন। মৌনতা কি একা এই বাড়ির বউ? ও কেন সব করবে? ওর শরীর কতটা খারাপ যাচ্ছে তা তুমি নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছো না? এমতাবস্থায় তুমি তোমার স্ত্রীকে স্কুলড্রেস পড়িয়ে ঢং ঢং করতে করতে স্কুলে পাঠাবে? নিজেকে জোকার বানাতে চাইছো? কোন দরকার নেই এই সব পড়াশুনার। যতটুকু পড়েছে তাতে পরবর্তী প্রজন্ম ভালো শিক্ষাদীক্ষা পাবে। তাকে বলো ঘরসংসারে মনোযোগী হতে। এসেছে আর তোমার কান ভাঙানো শুরু করেছে, তাই না?”

–”ঐটুকুন মেয়ে আমার কান ভাঙাবে? আম্মা বয়স হয়েছে বুঝেশুনে কথা বলুন। রূপকথা পড়াশুনা করবে এই নিয়ে আমি বাড়তি কোনো ঝামেলা চাই না, তাই আপনাকে জানানো। আমার করা শ্রদ্ধার মান নষ্ট করবেন না, আম্মা।”
–”আমার বাড়ির বউয়েরা বিয়ের পর পড়াশুনা করেনা, তপোবন। এটা তুমি ভালো করে জানো। পূর্বা আর মৌনতাও করেনি।”, নির্জনা বেগমের শক্ত কণ্ঠ।
–”কারণ তাদের দু’জনের স্নাতক শেষ বর্ষে পড়াকালীন বিয়ে হয়। তাই তারা অনায়াসেই সেটা শেষ করতে পেরেছিল। কিন্তু রূপকথা? ও তো উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাশ করেনি, আম্মা। আর সবচেয়ে বড় কথা— আমার স্ত্রী কি করবে, না করবে সেটা এই বাড়ির নিয়ম নয় আমি ঠিক করব। আশাকরি বুঝতে পেরেছেন। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, আম্মা। আপনাকে কষ্ট দেয়া আমার অভিপ্রায় নয়। কিন্তু অযৌক্তিক কোনোকিছুতে আমি সায় দেব না। আর একজন যেই পাপ করেছে সেই পাপের বোঝা সকলে বহন করবে, এটা অযৌক্তিক। আসছি, খাওয়ার আগে ওষুধ খেয়ে ঘুমাবেন।”
বলেই তপোবন গটগট করে বেরিয়ে যায়। এদিকে নির্জনা বেগম আকাশপাতাল চিন্তা আঁকড়ে থম মেরে বসে পড়লেন।
রাত তখন এগারোটা বেজে বিশ মিনিট। ইমরোজ সহ সকলে খাবার খেয়ে উপরে চলে গিয়েছে। নিচে তখন শুধু মৌনতা, রূপকথা, রোজ, জবা আর মাজেদা। রূপকথা আর জবা টেবিল গুছিয়ে রাখছে। গরুর মগজের বাটিটা ফ্রিজে ঢুকাতে গেলে মৌনতা রূপকথাকে বাঁধা দিয়ে বলল,

–”রূপকথা ওটা ঢুকিয়ে রেখো না। ভাত আর ওটা টেবিলেই রাখো। ছোট ভাইজানের পছন্দের খাবার এটা। আজ খেতেও পারে।”
–”ভাইজান একদিন ও বাসায় ভাত খায়, মৌন বউ? শুধু শুধু ওগুলো বের করে রাখছ। ভাইজান দেখবে মাতাল হয়ে রাত একটা দু’টোয় আসবে। ততক্ষণ বসে থাকবে?”, রোজের কথায় মৌনতা বলল,
–”ঠ্যাকা পড়েছে? জবা আর মাজেদা চাচির দায়িত্ব ওটা। আমি তোমার ঐ মাতাল ভাইয়ের ধারেকাছে যাই না। বাবা? কি লাল লাল চোখ। অতিরিক্ত মদ খেলে চোখ অমন লাল হয়ে থাকে?”
–”তোমার পায়ে ব্যথা কমেছে, তাই না মৌন বউ? এসো একটু ঝগড়া করি।”, রোজ উৎসুক কণ্ঠে বলল। মৌনতা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
–”ঝগড়া করার ও ক্লাস লাগে, তোমার সেই ক্লাস নেই ননদিনী। ”
রোজ চোখ বড়বড় করে তাকায়। বিস্ময় নিয়ে বলে,
–”কি বললে? আমার ক্লাস নেই? সিকদার বাড়ির একমাত্র মনি আমি। তুমি পরের বাড়ির মেয়ে আমার মূল্য কি বুঝবে?”

–”তুমি আর সিকদার বাড়ির মনি নেই, ননদিনী। সিকদার বাড়ির মনি এখন নায়েল আর তানশান। তুমি এখন পরের বাড়ির আমানত। যা আমরা খাইয়ে পড়িয়ে রাখছি।”, মৌনতা ব্যঙ্গ করে বলল। রোজ চেঁচিয়ে উঠল,
–”মৌন বউ, তুমি আমার জাত শত্রু! তোমায় আমি বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেব। আমার ভাইয়েরটা খেয়ে আমাকে অপমান করা?”
এমনি টুকটাক দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া লেগে যায় তাদের মাঝে। তারা মগ্ন হয় ঝগড়াতে। রোজ এক দফা ঝগড়া করে নায়েলকে নিয়ে উপরে চলে যায়। রূপকথাও উপরে চলে যায় কলেজের ফর্ম পূরণ করবে। তানশানের বাবা বলেছে আগামীকাল কলেজে ভর্তি করাতে নিয়ে যাবে।
তপোবন ঘরে ফিরলে রূপকথা ফর্ম হাতে উৎসুক দৃষ্টি ফেলল তার পানে। কিছু বলে না, কারণ এই লোক তার আগেই সব বুঝে যায়। তার ধারণা সত্য করে দিয়ে তপোবন তার উৎসুক দৃষ্টি দেখে শুধালো,

–“ফর্ম পূরণ করতে সমস্যা হচ্ছে?”
রূপকথা ঘন ঘন মাথা নেড়ে ফর্মটা বাড়িয়ে দিলো। সে কিছু বেসিক ইনকোয়ারি ব্যতীত অনেক কিছুই পূরণ করেনি। তন্মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় খালি জায়গাটি হলো গার্ডিয়ান। যেখানে বাবা মা স্বামী নামক তিনটা অপশন রয়েছে। মেয়েটি একটাও পূরণ করেনি।
তপোবন অনুভব করে ঐ খালি ঘরটি পূরণ হলে তার বিভ্রান্তিকর অন্তঃস্থলের খালিঘরটিও পূরণ হবে। তাই সে বিলম্বহীন শুধায়,
–“অভিভাবকের জায়গায় কাকে দিতে চাও? মা নাকি…”
তপোবন থামে। বয়সের দোরগোড়ায় পরিপক্ব একজন মানুষ হয়েও কিছু প্রশ্নে দ্বিধা কাজ করে। তবে এই দ্বিধা দূর করার জন্য হলেও তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে,
–“নাকি আমাকে?”
কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন রূপকথা এক পলক চোখ তুলে তাকায়। পরপরই দৃষ্টি নামিয়ে নেয় অন্তঃস্থলের দ্বিধায়। কিয়ৎকাল বাদ মিনমিনে স্বরে বলে,

–“আপনার যা ইচ্ছা।”
তপোবন আরেকবার চোখ বুলায় ফ্রমটিতে। স্থায়ী এড্রেস থেকে শুরু করে অনেক কিছুই ফাঁকা। এই ফাঁকা ঘরগুলো পূরণ হওয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যকার দ্বিধার জায়গাটাও পূরণ হয়ে যাবে। সে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
–“আমার ইচ্ছা নয় এটা সম্পূর্ণ তোমার ইচ্ছা, রূপকথা। এই সামান্য একটা ফ্রমটির উপর তোমার সামনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নির্ভর করে। এখানে তোমার স্থায়ী ঠিকানা চাইছে, তোমার একমাত্র গার্ডিয়ান চাইছে। তোমার গার্ডিয়ান আমি হলে আমিই তোমার স্থায়ী ঠিকানা হবো। তাই সিদ্ধান্ত তোমার!”
স্পষ্ট গুরুগম্ভীর কণ্ঠে রূপকথা চোখ তুলে তাকায়। লোকটা সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এমন শক্ত কথা টেনে আনছে কেন?
যেখানে রূপকথার ছোট্ট মস্তিষ্ক আগামীকালের কথা ভাবে সেখানে তপোবন আগামী দশ বছরের কথা ভাবে। এটাই বোধহয় বয়সের তারতম্যের স্পষ্ট নিদর্শন! রূপকথার মাথায় সহজ একটা বিষয়কে এত কঠিন করার কারণ ঢুকলো না। সে অবুঝ কণ্ঠে বলল,
–“আমি তো জানি সব মেয়েদের স্বামীই তার আসল গার্ডিয়ান হয়, আর স্থায়ী ঠিকানা।”
তপোবনের অতি স্বাভাবিক মুখচ্ছবিতে অপ্রকাশিত স্মিত হাসির উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়ে। আর জেরা করে না, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চায় না মেয়েটি তাকে একমাত্র অভিভাবকের জায়গা দিতে চায় কি-না! দায়িত্ব কয়েকধাপ বেড়ে গেলেও তপোবন তা অতি সাগ্রহে কাঁধে তুলে নিলো। নেই কোনো সংশয়! সে চেয়ার টেনে মেয়েটির সামনে বসে অসম্পূর্ণ পুরো ফর্মটা পূরণ করে দিলো নিজ দায়িত্বে। যেখানে রূপকথার সবটা জুড়ে শুধুই তপোবন সিকদারের অস্তিত্ব।

রাত গভীর হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন একটা বেজে পাঁচ মিনিট। ইমরোজের অপেক্ষায় ডাইনিং টেবিলে ঝিমুচ্ছে মৌনতা। বলেছে আসতে এখনো আধা ঘন্টা লাগবে। সে আসলে খাবার দিতে হবে। ইমরোজের খাওয়ার সময় তার পাশে থাকতে হয় সবসময় নয়তো সে রেগে যায়। তার সাথে জবা আর মাজেদাও জেগে আছে। তারা কথার ফুলঝুড়ি খুলে বসেছে।
এমনি সময় স্বশব্দে কলিং বেল বেজে উঠল। সাথে সাথেই মাজেদা আর জবার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তারা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় মৌনতার দিকে। মৌনতা কপাল কুঁচকে সন্দিগ্ধ গলায় শুধায়,
–“কি হলো এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? ইমরোজের আসতে তো আরো দেরি আছে তবে কে এসেছে? ছোট ভাইজান এসেছে না-কি?”
জবা ঘন ঘন মাথা নাড়লো।
–“গত কালকেও এই সময়েই আইছিল, ভাবিজান।”
মাজেদা বিতৃষ্ণা ভরা কন্ঠে বলতে লাগল,,

–“মাইজ্জা বউ, তোমারে তো কওয়াই হয় নাই কালকে আরো কি কি করছে এরোজ বাপে জানো? বড় ভাবিজান কইছিল লেবুর শরবত দিয়ে আসতে। সেই দিয়ে আসতে যাইয়া আমি আর জবা জান বাঁচাইয়া কোনরকম পালাইয়া আসছি। গ্লাস ধইরা ছুঁড়ে মারছে আমগো দিকে। হায়াত ছিল দেইখা গতকাইল বাঁইচা গেছি বউ, নয়তো দেখতা আইজ তোমাগো মাজেদা চাচি কবরে। ঐ পাগলরে আইজ তুমি একটু দেহো বউ নয়তো আমগো মুখ দেখলেও দেহা যাইব একটা গ্লাস ছুঁইড়া মারবে।”
–“হ হ ভাবিজান আইজ আফনে একটু যান আমগো বাঁচান।”, জবা অনুনয় করে বলল। মৌনতা শুকনো ঢোক গিললো। ছোট ভাইজানের সামনে যেতে তার ও তো ভয় করে। কখন কি অমত হয় আর ছুঁড়ে মারে। ওদিকে লাগাতার উগ্র চিত্তে কলিং বেল বেজেই যাচ্ছে। মৌনতা তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছাড়লো ঘরের সকলে উঠে যাবে নয়তো। জবাকে তাড়া দিয়ে বলল,

–“তাড়াতাড়ি লেবুর রস তৈরি কর জবা, নয়তো আব্বুজানের চোখে বাঁধলে আজ একটা কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে।”
–“বানাইতেছি বানাইতেছি। আফনে যান দরজা খোলেন।” ,জবা চেঁচিয়ে বলল।
মৌনতা লম্বা শ্বাস নিয়ে মাথায় কাপড় টেনে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। খুলতেই উটকো বিশ্রী এক গন্ধ নাকে এসে ঠেকলো। মৌনতা নাকে আঁচল চেপে ধরে পুরো দরজাটা খুলে দিল। এবং সাথে সাথেই দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো এক সুবিশাল অবয়ব হেলে পড়তে নিলো মৌনতার গায়ে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মৌনতার চোখ বৃহৎ আকৃতির ধারণ করল। সে তড়িৎ গতিতে দরজা ছেঁড়ে দূরে সরে যায় ফলস্বরূপ হেলে পড়া মানুষটা মেঝেতে স্বশব্দে পড়ে গেল।

সুবিশাল দেহাবয়ব, মাথা ভরতি ঘন এলোমেলো চুল, পড়নে ঢিলেঢালা ডার্ক ব্লু টিশার্ট আর সাদা প্যান্ট। ফর্সা আদলের চেহারায় ফোলা ফোলা ভাব। মাদকের প্রভাবে ঘুরতে থাকা মাথা ঝাড়া দিয়ে ধীরে ধীরে মাতাল দেহ টেনে উঠে বসল এরোজ। ঝাঁপসা দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকায় সে। ধীরে ধীরে ঝাঁপসা দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয় অদূরে নীল শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নারী অবয়ব। লাল হয়ে থাকা চোখ দু’টো তুলে তাকায় এরোজ। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই মৌনতা তড়িৎ মুখের আঁচল সরিয়ে ফেললো। এই মাতালের তো ঠিক নেই দেখাযাবে এটা দেখেও রেগে গেল। পরপরই সে ইতস্তত কন্ঠে সাফাইয়ের সুরে বলল,
–“দুঃখিত ছোট ভাইজান! আমি আসলে বুঝতে পারিনি আপনি পড়ে যাবেন। আপনি উঠুন আমি কি সাহায্য করব আপনাকে?”
বলেই মৌনতা হাত বাড়াতে গেলে তৎক্ষণাৎ একটি হাত তাকে বাঁধা প্রদান করল। নত মস্তকে এরোজ নিজের বা হাতটি জাগিয়ে বারণ করে মৌনতাকে। মৌনতা থেমে যায়। তবে জাগিয়ে তোলা হাতটিও বেশিক্ষণ জাগিয়ে রাখতে পারল না এরোজ, এতটাই মাতাল সে। তবুও নিজ প্রচেষ্টায় ঢুলতে ঢুলতে উঠে দাঁড়ায় সে এবং পা বাড়ায় ঘরের ভিতরের দিকে।
এরোজকে উপড়ে যেতে দেখে মৌনতা ছুটে গেলো রান্নাঘরে। জবা লেবুর রস নিয়ে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের দরজায়। মৌনতা তার সামনে পা থামিয়ে বুকে হাত চেপে শ্বাস নিলো। বিরক্তি নিয়ে বলল,

–“এই জবা তুই যা তো লেবুর জুসটা দিয়ে আয় ছোট ভাইজানকে। ইদানিং আমারো ভয় করে তার সামনে যেতে।”
–“আফনার মাথা ঠিক আছে? গত কাইলকের কথা আমি ভুলি নাই। লেবুর জুস সহ গ্লাসটা আমগো দিকে ছুঁড়ে মারছিল। ভাগ্য ভালো থাকায় আর আয়ু থাকায় আমি এহনো বাইচ্যা আছি। বাবা আমার এতো তাড়াতাড়ি মরনের শখ নাই আফনে যান। আমি পারুম না।”
–“দিয়ে আয় না। আব্বুজান এমন মাতাল অবস্থায় দেখলে শুধুশুধু এই রাতে চিৎকার চেঁচামেচি করে ঘর মাথায় তুলে ফেলবে।”, মৌনতা অনুনয় করে বলল।
–“ভাবিজান আফনার পায়ে পড়ি, আমায় এই অল্প বয়সে মারবেন না। আমি তারে লেবুর জুস দিতে পারুম না। আফনে অন্য কোনো কাজ কন আমি কইরা দিতাছি।”
মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লেবুর জুসটা হাতে নিয়ে নিলো। এরোজ ঢুলতে ঢুলতে সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠছিলো। মৌনতা ছুটে গিয়ে তার পেছনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত মিনমিনে স্বরে ডেকে উঠল,,
–”ছোট ভাইজান?”
এরোজ থামে, ভার হয়ে আসা মাথা ঘুরিয়ে পিছু ফিরে তাকায়। লালচে ঐ নিভু নিভু ভয়ানক দৃষ্টি দেখে মৌনতা তড়িঘড়ি করে বলল,

–“লেবুর জুস এনেছিলাম, ছোট ভাইজান।
এটা একটু পান করে নিন দয়াকরে। আব্বুজান উপড়ে আছে, তার শরীরটা ভালো না। আপনাকে এভাবে… না মানে সে এই রাতে চিৎকার চেঁচামেচি করলে বাড়ির সকলে উঠে…”
–“বেশি কথা না বলে ওটা দিন।”,মৌনতাকে পুরো কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই ভাঙা জড়ানো রুক্ষ কন্ঠটিতে মৌনতার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। সে ভেবেছিল এখন একটা রাম ধমক খাবে। তবে বেশ অবাক হলো এরোজের বাড়িয়ে দেয়া হাতটি দেখে। সে আ’ত’ঙ্ক গ্রস্থ হয়েই হড়বড়িয়ে গ্লাসটি এরোজের হাতে দিল। এরোজ সেটি নিয়েই এক ঢোকে গিলে নেয়। গ্লাসটি পুনরায় মৌনতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে পুনরায় ঢুলতে ঢুলতে উপড়ে উঠতে লাগল। মৌনতা পেছন থেকে শুধায়,,

–“রাতের খাবার খাবেন না ছোট ভাইজান?”
এরোজের কোন জবাব আসল না, সে চলছে তো চলছে। মৌনতা পুনরায় শুধায়,
–“ভাত খাবেন না, ভাইজান?”
–“না”, এই পর্যায়ে এরোজের ভাঙা গলা শোনা গেল।
মৌনতা ফের হড়বড়িয়ে উঁচু গলায় বলল,
–”আপনার পছন্দের গরুর মগজ ভুনা করেছিলাম, ভাইজান।”
অত্যন্ত পছন্দের খাবারের নাম শুনে না থামতে চাওয়া এরোজের গতি শ্লথ হয়ে আসে। পা থামিয়ে পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ধিমি কণ্ঠে শুধায়,
–”আম্মা রান্না করেছে?”
‘মা’ এই একটা মানুষ-ই আছে যে সবকিছু উপেক্ষা করে এরোজের খেয়াল রাখে, তার জন্য চিন্তা করে। তাতে সে মাতাল হোক আর গুন্ডা হোক। মৌনতা ইতস্তত করে বলল,
–”আমিই রান্না করেছি , ভাইজান। খুব একটা খারাপ হয়নি। আম্মার‌ মতোই হয়েছে। আপনি খেয়ে দেখতে পারেন, আমি আম্মার থেকেই রান্নাটা শিখেছি। আসলে আম্মার কোমড়ে ব্যথা তো তাই বেশিক্ষন দাঁড়িয়ে রান্না করতে পারে না।”
এরোজ নীরবে শুনলো অতঃপর নিরুদ্বেগ ফের উপরের দিকে পা বাড়ায়। মৌনতা পুনরায় জিজ্ঞেস করল,

– “খাবেন না, ভাইজান?”
–”বারুন, ফ্রেশ হয়ে আসছি।”, এরোজ উঠতে উঠতে বলল। মৌনতা সহ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জবা এক দীর্ঘ হাঁফ ছাড়লো। মৌনতা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে গেল। জবাকে দেখেই তেজ দেখিয়ে বলল,,
–“এই হতাচ্ছারি কই গ্লাস ভেঙেছে? রাগ দেখিয়েছে? সে তো ভদ্র লোকের মতো চুপচাপ লেবুর জুস খেয়ে নিয়েছে।”
–“তাইলে দেহেন গিয়া আইজ কম খাইছে ঐসব ছাইপাশ।”, জবা মুখ বাঁকিয়ে বলল।
মৌনতা অসম্মতি প্রকাশ করল,
–“ওসব খাওয়ায় সে কখনো কম্প্রোমাইজ করে না। আজ দেখ গিয়ে আরো বেশি খেয়েছে হাঁটতে পারছিল না। একটা মানুষ এতোটা বিগড়ে যায় কিভাবে? মাজেদা চাচি আর আম্মার মুখে তো কতো শুনেছিলাম তার ছোট বাপের প্রশংসা। এই তার নমুনা? আস্ত এক মাতাল, গুন্ডা, উগ্র লোক।”
–“প্রসংশার মতো পোলাই আছিল আমার এরোজ বাপ। কিন্তু তোমাগো বিয়ের পরপরই যে বিদাশ থিকা আসল তারপর থিকাই অমন হইয়া গেছে। উড়োভাসা কয়েকবার শুনেছিলাম যে কোনো মাইয়ার পাল্লায় পইড়া ছ্যাঁকা খাইছে তাই অমন হইয়া গেছে।”, মাজেদা পান বানাতে বানাতে বলল।
–“সেটা আমিও শুনেছিলাম মাজেদা চাচি। কিন্তু কেমন পুরুষ মানুষ যে একটা মেয়ের চলে যাওয়ায় নিজেকে এভাবে কষ্ট দেয়? ঘরের মানুষগুলোর সাথে এমন করে, বোকা নাকি? একটা মানুষের জন্য এতো গুলো মানুষকে কষ্ট দেয়?”, রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা বললো।
–“তা কি জানি আমি? যৌবনের প্রেমের তাড়না তোমরাই ভালো জানো। আমি ওসব বুঝিনা বাপু।”, মাজেদা মুখ বিকৃত করে বললেন।
মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাড়া দিয়ে বলল,

–“জবা যা, ভাইজানের জন্য খাবার বার।”
এরোজ নিচে আসল বিশ মিনিট পর। স্নান শেষের সিক্ত বদনে পাতলা টিশার্ট আর হাঁটু সমান শর্টস দেখে মৌনতা আর জবা মুখ বিকৃত করে নেয়। জবা ফিসফিসিয়ে বলে,
–“লাজলজ্জাও নাই, শীত ও নাই।”
মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলে,
–“কিছুই নেই। আছে শুধু গা ভরতি তেজ আর উগ্রতা।”
এরোজ নীরবে প্লেট টেনে খেতে বসে। জবা হাতের কাছে আগেই সব গুছিয়ে রেখেছে। খেতে খেতেই এরোজের চোখ আটকায় নীল শাড়ির আঁচল ছাপিয়ে লম্বা দোদুল্যমান বেনুনীর নিচে থাকা বোহো হেয়ার ব্যান্ডটির দিকে। দৃষ্টি হঠাৎ করেই শান্ত জলধারার ন্যায় শীতল, স্থির হয়ে আসে চুলের সাথে দুলতে থাকা নিজের কেনা ব্যান্ডটি দেখে।
দীর্ঘ এই জীবনে সে শুধু স্মৃতি আঁকড়ে ধরাই শিখেছে। তাই এগুলোই তার সঙ্গী হয়। জীবনের এক পর্যায়ে কারোর স্মৃতি হিসেবে এই বাহারি রকমের চুলের সরঞ্জামগুলো তার সঙ্গী হয়। তাই অভ্যাস মাফিক কোথাও বের হলে সে এগুলো ব্যতীত কিছুই কেনে না।
কিনতে কিনতে আজ রাখার জায়গা নেই। আসার সময় কিছু নিয়ে এসেছিল। রোজকে দিয়েছিল।
থেমে যাওয়া হস্তদ্বয় আবার ধীরগতিতে ভাত মাখতে শুরু করল। মাথা ঘুরছে, চোখের সামনে সব কেমন ধোঁয়াশা হয়ে আসছে তবুও মস্তিষ্কে কিছু স্মৃতিরা সুস্পষ্ট ভাবে জীবন্ত হয়ে উঠছে। বুকের ভেতর যন্ত্রনা অনুভব হয়। কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে এরোজের ঠোঁটের কোনে
আলতো হাসির রেখা।
তবে ক্ষণকাল যেতেই সেই স্মিত হাসি মিলিয়ে গেল। যখন জবা পাশে এসে দাঁড়াল আর হৈ হৈ করে শুধায়,

–“ভাইজান আর কিছু লাগবে?”
এরোজ নিরুত্তর ঘাড় কাত করে তাকায় জবার বেনুনীতে ঝুলতে থাকা বোহো হেয়ার ব্যান্ডের দিকে। পরপরই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অদূরে মৌনতার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা মাজেদা চাচির দিকে। যার খোপাতেও শোভা পাচ্ছে তার কেনা বোহো ক্লিপ গুলো।
ঠোঁটের কোনে থাকা আলতো হাসি অচিরেই তাচ্ছিল্যের হাসিতে পরিণত হয়।।
সে খেয়ে উঠে পকেট থেকে দু’টো বুবু লুবু চকলেট বের করে। নত মস্তকে সেটি মৌনতার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–”এই দু’টো নায়েলকে দেবেন।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৪

বলেই সে গটগট করে উপরে চলে যায়। চোখের সামনে সব কেমন ধোঁয়াশা হয়ে আসছে।
মৌনতার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ছেয়ে গেল পছন্দের চকলেটটি দেখে। আজ নিজের হাতে যখন পড়েছে এখান থেকে একটা গায়েব করে দেবে। নায়েলকে একটা দেবে। সে আনন্দিত চিত্তে একটা চকলেট ছিঁড়ে তৎক্ষণাৎ মুখে পুরল। জবা আর মাজেদা চাচিকেও দিলো। আর বর্ণনা করল এই চকলেটের অতুলনীয় স্বাদ!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৬