Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩০

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩০

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩০
তোনিমা খান

আজ তানশানের ঘরের আলো দশটার সাথে সাথেই নিভে গিয়েছে। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণ তীব্র মাথাব্যথা!
তমসায় আচ্ছন্ন ঘরটিতে ড্রিম লাইটের ক্ষীণ নীলচে আলোর আধিপত্য। দীর্ঘ দশ মিনিট বাদ ললাটে লাগাতার কারোর ছোঁয়া অনুভব হলে তানশান চোখ খুলে তাকায়। পূর্বের ন্যায় ভেসে ওঠা রূপকথার মলিন মুখ দেখে বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“আপনার কি আর কোনো কাজ নেই? ভোর ছয়টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত আপনি আমার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকেন।”
রূপকথা ভ্রুক্ষেপ করে না সেই বিরক্তি মাখা কণ্ঠে। নিজ ভাবনায় অটল থেকেই বলল,

–“হঠাৎ এত মাথা ব্যথা করছে কেন? গা তো গরম না।”
–“এমন মাঝেমধ্যেই হয়। আপনার এত চিন্তা করতে হবে না। আপনি ঘরে যান।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে নিলো। মৃদু ধমকের সুরে বলল,
–“মাথা ব্যথায় ছটফট করছে আবার বলে চিন্তা করতে হবে না। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে ঘুমাও।”
মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে তানশানের। সে বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“আমি কিন্তু পাপাকে বলে দেবো আপনি আমায় বিরক্ত করেন।”
–“আমিও তোমার পাপাকে বলে দেবো, তার ছেলে ইতিমধ্যেই ছেলের বউ তৈরি করে রেখেছে।”
রূপকথার খোঁচা মারা কথায় সহসা তানশান বিরক্তিতে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ করলো। বদ্ধ নেত্রে বলল,
–“আপনার ফোন যেদিন আমার হাতে আসবে সেদিন এসব উল্টাপাল্টা ব্লাকমেইল করার শখ মিটে যাবে। আমি কতবার বলেছি আমি এসব লেইম কাজ করার কথা কখনো চিন্তা ও করতে পারি নি।”

–“আমার ফোনের ধারেকাছেও এলে তোমার পশ্চাৎদেশ লাল করে দেবো। আর লেইম কাজ করার চিন্তা করতে পারো না কিন্তু চিঠির উত্তর ঠিক ই লিখতে পারো, তাই না?”, রূপকথার কথায় তানশান চোখমুখ কুঁচকে ছিঃ বলল। আর কিছু বলে না। এই ভদ্রমহিলার সাথে ঝগড়ায় পেরে ওঠে না স্বল্পভাষী ছেলেটা।
তানশনাকে দমাতে পেরে রূপকথাও নিশ্চিন্তে তার পাশে পা গুটিয়ে বসে নিজমনে মাথা টিপতে লাগলো। অন্যদিকে তলপেট পীড়ায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। ছেলেটির হঠাৎ অসুস্থতার কাছে নিজের অসুস্থতা অদেখাই রয়ে গেল। তবে এখন মনে হয় ব্যথার তীব্রতা আরো বাড়ছে। রূপকথা দাঁতে দাঁত চেপে নীরবে মাথা টিপতে লাগলো।
তানশানের খুব বাজে বদ অভ্যাস সে মায়ের ডাইরি পড়া ছাড়া ঘুমাতে পারে না। রূপকথার কারণে সেটা পারছে না। মা যে আস্ত এক অনুভূতি তাকে একান্তে অনুভব করতেই সুখ।
রূপকথা যাওয়ার অপেক্ষা করতে করতে একটাসময় সে ঘুমিয়েই পড়লো ডাইরি পড়া ব্যতীত। দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবন নীরবে দেখে চলেছে ভীষণ অপ্রত্যাশিত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য!
সম্মুখের ঐ স্ত্রী রূপী ছোট্ট মেয়েটি কি জানে? সে জেদ করতে করতে সে তাদের বাবা ছেলের একাকী জীবনের প্রত্যাহিক অভ্যাস হয়ে উঠছে?
তানশান ঘুমিয়ে পড়তেই রূপকথা সতর্ক দৃষ্টি ফেললো ছেলেটির পানে। তলপেট আঁকড়ে ধরে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে নামতেই আঁধারে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবনকে দেখে হকচকিয়ে গেল।
তপোবন মৃদু হেসে বলল,

–“কাজ হয়েছে মুরুব্বি? এখন কি একটু পড়তে বসবেন?”
রূপকথা ঘন ঘন মাথা নেড়ে শুধায়,
–“আপনি কখন এলেন?”
–“মাত্র।”
–“তানশান এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেল কিভাবে?”
–“মাথা ব্যথা করছিল। পড়তে পারছিল না তারপর আমি জোরপূর্বক ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।”, রূপকথা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল। তপোবনের ললাটে চিন্তা দেখাগেল না। তার মতো ছেলের ও মাইগ্রেন আছে। হুটহাট এমন ব্যথা হয়!
রূপকথা পুনরায় বলল,
–“কোনো ওষুধ দেইনি।”
–“প্রয়োজন নেই, একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।”
তলপেটের ব্যথায় রূপকথা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তবুও দায়িত্বগুলো থেকে তো ছুটি নেই। সে বলল,
–“খেতে চলুন।”
–“মৌন, ভাত বেড়েছে। তুমি গিয়ে পড়তে বসো।”
রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো।
–“নাহ, আমি আসি। আম্মা নয়তো রাগ করবেন।”
–“করবে না, তুমি পড়তে যাও।”
রূপকথা আর কথা বাড়ালো না, ঘরে চলে যায়। পেট ব্যথায় দুই পা’ও এখন ব্যথায় চিড়বিড় করছে। সে বিবর্ণ মুখে ঘরে চলে যায়।
তপোবন দরজা চাপিয়ে ছেলের পাশে কিয়ৎকাল বসে।

তপোবন ঠিক বলে ছোট্ট নায়েল হলো তাদের বুড়ি মা। কেমন বুঝে বুঝে মোক্ষম সময়ে আবদার করতে হয় তা সে খুব ভালো করে জানে।
–“আজ তো খুব বেশি বুবু পেয়েছি, আজ পাপাল সাথে ঘুমাই?”
মৌনতা উদাসীন হতে গিয়েও হেসে ফেলল মেয়ের ছোটমুখের আবদার শুনে। মেয়েকে কোলে নিয়ে চলতে চলতে বলে,
–“বুবু পেয়েছো বলে আজ পাপার সাথে ঘুমাতে হবে?”
–“হুম। পাপা আদল কলে দেবে।”
মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
–“আচ্ছা, ঘুমাবে। কিন্তু পাপা তো অনেক রাতে আসে।”
–“আমি অপেক্কা কলব তো!”, নায়েল কুঁচকানো মুখে বলা কথাটিতে মৌনতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। মেয়ের নরম তুলতুলে গালে আদর দিয়ে বলল,
–“আচ্ছা ঠিক আছে আমরা আজ পাপার সাথে জড়াজড়ি করে ঘুমাবো, ওকে?”
–“ওক্কেএএএ!” সহসা নায়েল হাত জাগিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
মৌনতা পুনরায় বলল,

–“কিন্তু তুমি ঐ ব্যাড বয়ের কাছে গিয়েছিলে কেন? আমি না বারণ করেছিলাম?”
–“আমি যাইনি তো! ভাইজানের ঘল থেকে ছুটতে ছুটতে বেল হয়েছিলাম আর ধপাস করে পলে গিয়েছি।”
–“যেখানেই পড়ো না কেন কিন্তু ছোট পাপার আশেপাশে পড়বে না। সে রাগী, বকা দেবে তোমায়।”
–“ওকে।”
মা মেয়ে অজশ্রবারের মতো আরেকবার অপেক্ষা জুড়ে দিলো সেই মানুষটার জন্য যেই মানুষটা আদোতেও সেই মূল্যবান অপেক্ষার হকদার নয়।
ইমরোজের আসতে আসতে রাত বারোটা বেজে গেল। তবে চোখমুখের দশা ভীষণ বিক্ষিপ্ত!
পুরো বাড়ি তখন নিস্তব্ধ। সিগারেটে লাগাতার লম্বা লম্বা টান দিতে দিতে অস্থির চিত্তে নিজের ঘরে ঢুকলো ইমরোজ।
মৌনতা হাতের কাজ শেষ করে কেবলই বিছানা গুছাতে নিয়েছিল। ইমরোজকে দেখে খানিক বিরক্তি ছেয়ে গেল তার মুখশ্রীতে। ইমরোজ ঘরে কিংবা তার আর নায়েলের সামনে কখনো সিগারেট খায় না।
তবে মুখশ্রী অত্যাধিক পরিমাণে রাগান্বিত দেখে সে নম্র স্বরে শুধায়।

–“এত দেরি হলো কেন?”
ইমরোজের জবাব আসল না। সে অস্থির চিত্তে পায়চারী করছে ঘরময়। পায়ে বাইরের জুতা, হাতে সিগারেট এহেন বিশৃঙ্খলতায় মৌনতা দম বন্ধ হয়ে আসা অনুভূতি নিয়ে মুখে কাপড় চাপলো। কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“ঘরে বসে সিগারেট খাচ্ছেন কেন?”
ইমরোজের গতিরোধ হয়। একপলক মৌনতার বিরক্তি মিশ্রিত মুখপানে চেয়ে থমথমে মুখে আদেশের সুরে বলল,
–“বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ঘুমাতে আসো।”
–“শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ইমরোজ।”
–“তোমার সবকিছুতেই সমস্যা। সব তো আর ত্যাগ করা যাবে না তোমার জন্য!”
–“কিছুক্ষণের মধ্যে নায়েল আসবে। আপনি চাচ্ছেন নিজের মেয়েটাকেও এই বিষাক্ত ধোঁয়ার মাঝে রাখবেন?”
মৌনতার মৃদু ক্রুব্ধ কণ্ঠে ইমরোজ কপাল কুঁচকে বলল,
–“নায়েল এখানে কেন আসবে? ও ঘুমায়নি?
তার প্রশ্নের মাঝেই কাঙ্খিত মানুষটির আগমন ঘটে। নায়েল লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল,
–“ইয়েয়ে পাপা এসে গিয়েছো? আমিও এসে গিয়েছি।”
নায়েলের উল্লাসে ভরা কণ্ঠে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ইমরোজ সোজা মৌনতার পানে তাকায়। শুধায়,
–“ও এখনো জেগে আছে কেন? ওকে ঘুম পাড়াও নি?”
বিছানার ঝাড়ু হাতে মৌনতা থমথমে মুখে বলল,

— “না, ও আপনার সাথে ঘুমাবে দেখে জেগে আছে এখনো।”
মায়ের সাথে সাথে নায়েল ও চিৎকার করে বলল,
–“ইয়েস পাপা, আমলা একসাথে ঘুমাবো। অনেক মজা হবে।”
মেয়ের কথায় ইমরোজ গমগমে স্বরে বলল,
–“পাপার আজ মেজাজ খারাপ নায়েল। কাল ঘুমাবে পাপার সাথে। আজ ফুপির কাছে যাও।”
মৌনতা হাতের কাজ থামিয়ে ইমরোজের শক্ত মুখটির দিকে তাকালো। চোখেমুখে ব্যাথাতুর বিস্ময়ের অনুভূতি! মেয়েটা তো রোজ রোজ বাবা মায়ের কাছে ঘুমানোর বায়না করে না। যদিও করে তবে খুব সাবধানে!
–“মেয়েটা রোজ রোজ আপনার কাছে ঘুমানোর বায়না করে না, ইমরোজ। কতদিন হলো ও আপনার কাছে ঘুমায় না? ওর কি ওর বাবার সাথে ঘুমাতে ইচ্ছে করে না? আর আপনিই বা এমন করছেন কেন? আপনার মেয়েটা আপনার সাথে ঘুমাতে চাইছে তাতে তো খুশি হওয়ার কথা তাই না? অথচ আপনি রাগ দেখাচ্ছেন?”
–“কয়েক দিন আগেও ও আমাদের কাছে ঘুমিয়েছে, মৌনতা। কথা বাড়াবে না একটুও। যখন বলছি আমার মেজাজ খারাপ তখন তোমার কি উচিৎ নয় যে ওকে বুজিয়ে রোজের কাছে রেখে আসা? তা না তুমি তর্ক করতে বসে গিয়েছো?”
মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বদলে যাওয়া স্বামীর অসহনীয় এই রূপ। জীবন ঠিক কতটা ঘৃণ্য পর্যায়ে দাঁড় কারলে সন্তানের সুখ ও ফিকে পড়ে এক বাবার কাছে?

–“মেয়ের থেকেও কি আপনার মেজাজ খারাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইমরোজ? বাইরে থেকে এসেছেন মেয়েটাকে একটু বুকে জড়িয়ে নিয়েই দেখুন না! সকল মেজাজ খারাপ মিলিয়ে যাবে।”
বাবা মায়ের একের পর এক বাকবিতন্ডা বুঝতে পেরে নায়েলের উৎফুল্লতা গায়েব হয়ে গেল। সে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রয় ঘরের এক কিনারায়। কিয়ৎকাল বাদ মিনিমিনে স্বরে বাবার উদ্দেশ্যে বলল,
–“আমি এখানেই ঘুমাবো তোমাদেল মাঝে। ফুপিল সাথে ঘুমাবো না।”
ইমরোজ মেয়ের কথায় ভ্রুক্ষেপ করে না বরং শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“মৌনতা একদম কথা বাড়বে না। আমি ক্লান্ত, আমি এখন একটু শান্তিমতো বিশ্রাম নেবো, ওকে চুপচাপ রোজের ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসো।”
বলেই ইমরোজ থমথমে মুখে মেয়ের দিকে তাকালো। গম্ভীর গলায় বলল,
–“নায়েল এখন ফুপির ঘরে চলে যাও। কাল এখানে ঘুমাবে। যাও, রাত হয়েছে অনেক।”
মেয়ের কান্না চেপে রাখা লালচে মুখ দেখে মৌনতা টলমলে নেত্রে চেয়ে অনুনয় করে বলল,
–“ও আজ থাকুক না ইমরোজ? আপনি এতটা কঠোর কি করে হতে পারেন?”
নায়েল ও আজ জেদি গলায় বলল,

–“আমি এখানেই থাকব, কোথাও যাব না।”
ইমরোজ রেগে গেল মা মেয়ের এহেন জেদে। হ্যাঁ বাবার কাছে ঘুমাতে চাওয়া, বাবার আদর পেতে চাওয়া জেদ-ই মনে হলো ইমরোজের কাছে। সে ক্ষিপ্ত কন্ঠে নায়েলকে বলল,
–“দিনদিন জেদি হয়েছো নায়েল! তোমায় বলেছি বাবার আজ মেজাজ খারাপ! একবার যখন বারন করেছি আজ এখানে ঘুমাবে না তারপরেও জেদ দেখাচ্ছো? যাও ফুপির কাছে যাও।”
বাবার উচ্চস্বরে ধমকে নায়েল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হেঁচকি তুলতে তুলতে অভিযোগ করে বলল,
–“তুমি কেন আমায় ভালোবাসো না? আমাকে কেন ঘুমাতে নাও না তোমাদেল সাথে?”
মৌনতা দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে নায়েলকে বুকে জড়িয়ে নেয়। ইমরোজের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“আপনি কেমন বাবা ইমরোজ? আপনার মেয়ে আপনার কাছে ঘুমাতে চায় বলে তাকে ধমকাচ্ছেন? এতোটুকু বাচ্চাকে? ও কি বোঝে?”

–“কিছু বোঝেনা তাই বলছি ওকে রোজের কাছে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু না তুমি তো কিছু বললেই নাকের চোখের পানি এক করে আবেগী কথা নিয়ে বসে পড়ো। আর মেয়েটাকেও দিন দিন নিজের মতো বেয়াদব, জেদি বানাচ্ছো। আমার প্রচুর মেজাজ খারাপ হচ্ছে মৌনতা, ওকে রোজের কাছে পাঠাও।” ইমরোজ বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল। মৌনতা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় ইমরোজের দিকে। নম্র কণ্ঠে বললো,
–“ও আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না, ইমরোজ। রাতে ক্ষুদা লাগে উঠিয়ে খাওয়াতে হয়।”
–“রোজ উঠিয়ে খাইয়ে দেবে।”
অতিষ্ট ভঙ্গিতে কথাটি বলেই ইমরোজ নায়েলকে কোলে তুলে রুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে দিলো। হাঁটু গেড়ে বসে নম্র কন্ঠে বলল,
“ফুপির কাছে যাও, মা। পাপার কাছে কাল ঘুমাবে।”
নায়েল কথা বলল না, সে কাঁদছে হেঁচকি তুলে। ইমরোজ তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। আর মৌনতা বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ইমরোজের দিকে। আর নায়েল কাঁদতে কাঁদতে ফুপির ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা অবাক কন্ঠে শুধায়,
–“আপনি কি আসলেই বাবা ইমরোজ? আপনার যত মেজাজ খারাপ ই থাকুক না কেন মেয়েটার এই ছোট্ট একটা চাওয়া তো পূরন করতেই পারতেন, তাই না? বাবা মা কত কিছুই তো করে সন্তানের জন্য অথচ আপনি নিজের মেয়েটাকে একটু নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমাতেও চান না।”
ইমরোজ ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ক্রন্দনরত মৌনতার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে। শক্ত কন্ঠ বললো,

–“কথায় কথায় কেঁদে ভাসিয়ে ছোট একটা বিষয়কে নিয়ে সিনক্রিয়েট করা তোমার বাজে অভ্যাস মৌনতা। তোমার এই আবেগী কথা শুনতে শুনতে আমার কান পেঁকে গিয়েছে মৌনতা। এগুলোর জন্যই আমার ঘরে আসতে বিরক্ত লাগে। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বিছানায় যাও।”
–“আজকাল বাহিরেই সব ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নতমানের আধুনিক ব্যবস্থা, ঘরের সবকিছু তো বিরক্ত লাগবেই।”
বলেই মৌনতা দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিতেই তার চোখমুখ ঠিকরে কান্না বেরিয়ে আসে নায়েলকে কাঁদতে কাঁদতে রোজের ঘরে যেতে দেখে। নিজেকে অসহায় লাগতে শুরু করল। সে দরজা ছেড়ে মেয়েটির দিকে পা বাড়াতে যায়। কিন্তু তখনি হাতে সজোরে টান লাগে। ইমরোজ জোরপূর্বক মৌনতাকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে দরজা আটকে দিলো।
নায়েল পা থামিয়ে একপলক অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায় বদ্ধ দরজার দিকে। অতঃপর পুনরায় হাঁটতে শুরু করলো।
শরীরের অসহ্য জ্বলন কমাতেই এরোজ গোসল করে এই শীতের রাতে। ভার হয়ে আসা মাথা মুছতে মুছতেই আরশির সামনে দাঁড়ালে নিস্তব্ধ রজনীতে খানিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে কারোর কান্নার শব্দ। অন্তঃস্থল নিদারুণ অস্থির হয়ে পড়লো সেই কান্নার শব্দে। সে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় খোলা দরজার পানে। আওয়াজ তখন আরো সন্নিকটে অনুভব হয়।

অন্তঃস্থলের উদগ্রীবতা বৃদ্ধি পায় ঘরের সামনে থেকে ক্রন্দনরত নায়েলকে যেতে দেখে। দৃষ্টি ম্লান হয় প্রথমবার চাচা হওয়ার অনূভুতি তীব্র হলেও দ্বিতীয়বার ছিল বড্ডো উড়োভাসা। শুধু শুনেছিল রোজের পর তাদের ঘরে আরো একটা রাজকুমারী এসেছে।
কখনো আগ্রহ হয়নি সেই রাজকুমারীকে দেখার। কিন্তু কয় মাস আগে যখন একটা ছবি দেখলো তখন বিস্মিত হয় মানুষরূপী ছোট্ট একটা জীবন্ত রূপাঞ্জেল দেখে। অন্তঃস্থল হাঁসফাঁস করে উঠেছিল একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য।
ছোট্ট রাজকুমারীর সৌন্দর্যে ঘোরগ্রস্থ এরোজ নিজের উদগ্রীবতা লুকিয়ে ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠল,
–“হেই নায়েল!”
এরোজের ডাকে চলন্ত নায়েল পা থামিয়ে এক পা পিছিয়ে এরোজের সোজাসুজি দাড়ায়। কেঁদেকেটে একাকার ছোট্ট মুখটি দেখে আরশির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ ভীষণ নম্র সুরে শুধায়,
–“কাঁদছো কেন?”
নায়েল জবাব দেয় না বরং কান্নার গতিবেগ আরো বেড়ে যায়। এরোজ উদগ্রীবতা লুকাতে পারে না।
–“কি হয়েছে এমন কাঁদছো কেন? ছোট পাপার কাছে এসো।”
নায়েল না বোধক মাথা নাড়লো। এরোজ পুনরায় শুধায়,
–“কেন?”
নায়েল হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

–“তোমাল কাছে যাব না। তোমাল মুখ থেকে গন্ধ আসে।”
এরোজ কিয়ৎকাল তাকিয়ে রইল, মেয়েটি যত বাজে মুহুর্তেই থাকুক না কেন সব মাথায় থাকে। কারোর সাথে বাড়তি কথা বলায় অনাগ্রহী ছেলেটা আজ কৈফিয়ত ও দিলো। বলল,
–“আমার মুখে কোনো গন্ধ নেই। আমি গোসল করেছি, মাউথ ওয়াশ ও করেছি।”
তাতেও নায়েল ঢুকলো না। এরোজ এবার অধৈর্য হয়ে শুধায়,
–“কি সমস্যা তোমার? কাছেও আসছো না আবার কেঁদেই যাচ্ছো। তুমি কি জানো তোমায় কাঁদতে দেখলে কি বাজে লাগে? কাছে এসো, বলো কি হয়েছে?”
নায়েল হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
–“তোমাল ঘল থেকেও পঁচা গন্ধ আসে। আমাল বমি আসে।”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলল মেয়েটির পানে। অতঃপর এদিক ওদিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সেন্টার টেবিলের উপর থেকে এয়ার ফ্রেশনারটা হাতে নিলো। এবং পাশে রাখা একটি এলাচের কৌটা থেকে একটা এলাচ মুখে নিলো। সেটা চিবুতে চিবুতেই নায়েলের কাছে এগিয়ে আসলো। হাঁটু গেঁড়ে বসে ঠিক তিন ফুটের মেয়েটির সামনে। হা করে দেখিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বলল,

–“শুঁকে দেখো কোনো গন্ধ নেই। আর রুমেও কোনো গন্ধ নেই। তবুও তুমি যদি চাও আমি এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দিচ্ছি। তবুও বলো কাঁদছো কেন?”
নায়েল কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নেড়ে বলল,
–“ঠিক আছে, এয়াল ফেশ দাও।”
এরোজ ডানে বামে মাথা নেড়ে ছোট্ট মেয়েটির আদেশ অনুযায়ী পুরো ঘরে এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দিলো।
এবার নায়েল গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে এরোজকে দেখিয়ে দেখিয়ে দিলো, এখানে এখানে এয়ার ফ্রেশনার দাও। আর এরোজ সেইসব করলো।
ঘরময় সুগন্ধে ভরে যেতেই এরোজ কোমড়ে হাত দিয়ে কপাল কুঁচকে তাকায় ছোট্ট মেয়েটির পানে। পড়নে শুধুই একটা ট্রাউজার! গমগমে স্বরে শুধায়,
–“হয়েছে?”

নায়েল এবার বাম হাতে অশ্রু মুছে মাথা নেড়ে সায় জানালো। এবং পুতুলের ন্যায় দু’হাত বাড়িয়ে দিলো এরোজের দিকে। এরোজ খানিক ভড়কায় প্রথমবার কোলে ওঠার নীরব আবদারে।
আপনাআপনি ওষ্ঠকোনে ভর করে স্মিত হাসি। সে আবদার পূরণ করে, হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেয় নায়েলকে। সহসা নায়েল তার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো।
এরোজ থমকায় উদাম প্রশস্ত বুকটিতে কেউ চার হাত পায়ে পুরোপুরি নিজের দখলে নিয়ে নিতেই। ঠিক ছয় বছর বাদ বক্ষজুড়ে দমকা হাওয়ার ন্যায় এক ফালি সুখ আঁছড়ে পড়তেই এরোজ ফাঁকা ঢোক গিলল।
ভীষণ ঠুনকো মুহুর্ত অথচ ভঙ্গুর ছেলেটির ভেতর সহ বাহিরটাতে তোলপাড় চলছে। এরোজ বোকার মতো এদিক ওদিক তাকিয়ে মুহুর্তটিকে আত্মস্থ করার প্রয়াস করে। জীবন তাকে কখনোই এত সুখ অনুভব করার সৌভাগ্য দেয়নি। তবে এ কেমন মুহুর্ত? বুকজুড়ে এত প্রশান্তি কেন? না চাইতেও আদুরে কণ্ঠে নিঃসৃত হয় কণ্ঠনালী থেকে,

–“আমার মায়ের কি হয়েছে? কাঁদছে কেন?”
এরোজের আদুরে কণ্ঠে নায়েল আবার স্বশব্দে কেঁদে উঠল । হেঁচকি তুলতে তুলতে মুখ তুলে তাকায় এরোজের মুখপানে। অভিযোগ করে বলে,
–“পাপা, কেন আমায় ভালোবাসে না?”
এরোজ কৃত্রিম হাসল। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“কে বলেছে তোমার পাপা তোমায় ভালোবাসে না? সে তোমায় খুব ভালোবাসে।”
নায়েল না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“না, বাসে না। পাপা আমায় কখনো তাল সাথে ঘুমাতে নেয় না। আমাকে বেল কলে দিয়েছে। মাম্মাল সাথে ঘুমাতে দেয়নি।”
–“তোমার পাপা এসেছে?”,
এরোজের প্রশ্নে নায়েল মাথা নেড়ে সায় জানায়। এরোজ ক্ষীণ কন্ঠে বলল,

–“পাপা হয়তো ক্লান্ত মা, তাই একটু বিশ্রাম নিতে চাইছে। তুমি মন খারাপ করো না। তুমি কি চকলেট খাবে? চলো তোমায় চকলেট দেই।”
নায়েলকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে এরোজ ড্রয়ার থেকে তিনটা চকলেট বের করে। ছোট্ট বাচ্চাটি ঠুনকো এক চকলেট পেয়ে হাজারটা দুঃখ ভুলে গেল। নায়েলের হাতে চকলেটগুলো দিতেই তার কান্নারত মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে চকলেটগুলো নিয়ে বলল,
–“থ্যাংকিউ!”
মেয়েটির মুখে হাসি দেখে এরোজ ও বোকার মতো হাসল। বুক জুড়ে অজানা প্রশান্তি অনুভব হয়। নায়েল চকলেট ছিঁড়ে তৎক্ষণাৎ মুখে পুরে। ছোট পাপা গুড বয় হয়ে গিয়েছে দেখে শুধায়,
–“তুমি গুড বয় হয়ে গিয়েছো?”
–“নাহ।”
–“তবে আমায় ভালোবাসছো কেন?”
–“কিছু মানুষ জোরপূর্বক ভালোবাসা আদায় করে নিতে পারে।”
–“কি?”
নায়েল কপাল কুঁচকে নিলো। সামান্য একটা কপাল কুঁচকানো অথচ এরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অনাহুত’র ন্যায়। মস্তিষ্কে দাপিয়ে বেড়ালো এমন বহু কপাল কুঁচকানো স্নিগ্ধ মুখশ্রী। এরোজ স্মিত হাসল। নায়েল খেতে খেতে গম্ভীর গলায় শুধালো,

–“সেদিন থাট্টি ফাস্ট নাইট গিয়েছে জানো?”
এরোজ নীরবে মাথা নাড়লো। নায়েল বেজায় খুশি হলো এরোজ ভদ্র ছেলের মতো তার কথায় সায় জানাতেই। সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“থাট্টি ফাস্ট নাইটে ছবাই ছবাইকে গিফট দেয় জানো?”
এরোজ এবারেও নীরবে মাথা নাড়লো। নায়েল এবার গাল ভরে হেসে বলল,
–“কিন্তু তুমি আমায় কোনো গিফট দাওনি আমাল মনে আছে। তুমি কি গিফট এনেছো আমাল জন্য?”
মোহগ্রস্ত এরোজ ক্ষীণ কণ্ঠে আওড়ালো,
–“গিফট?”
–“হু গিফট। আমায় গিফট দাও। সবাই আমায় গিফট দিয়েছে কিন্তু পাপা আল তুমি দাওনি। আমাল গিফট পেতে খুব ভালো লাগে।”, নায়েল চকলেট খেতে খেতে বললো।
এরোজ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল বিছানার পাশে। সে তো কোনো গিফট আনেনি নায়েলের জন্য। অথচ তার বক্ষস্থল অস্থির হয়ে পড়েছে ছোট্ট মেয়েটির আবদার পূরণ করার জন্য!
সে এদিক ওদিক তাকিয়ে ধীরপায়ে কাবার্ডের কাছে এগিয়ে গেল। তালাবদ্ধ একটি ড্রায়ার খুললো। খুলতেই পুরো ড্রয়ার জুড়ে মেয়েদের হেয়ার ব্যান্ড গুলো বেরিয়ে আসল। সে সেখান থেকে পাঁচটা হেয়ার ব্যান্ড আর দু’টো বো ক্লিপ নিয়ে নায়েলের কোলে রাখলো। ইতস্তত কন্ঠে বলল,

–“এগুলো কি উপহার হিসেবে তোমার পছন্দ? তোমার তো চুল রয়েছে বেশ লম্বা।”
নায়েল সেগুলো দেখে খুশি হয়ে গেল। আনন্দিত কন্ঠে শুধায়,
–“এগুলো আমাল জন্য এনেছো? সব আমাল?”
–“হুঁ, তোমার পছন্দ হয়েছে?”
–“খুব পছন্দ হয়েছে।”, নায়েলের জবাবে এরোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে এবার প্রফুল্ল হেসে পুনরায় ড্রয়ারের কাছে গিয়ে সবগুলো ব্যান্ড আর ক্লিপ নিয়ে আসলো। সেগুলো সব নায়েলের কোলে রেখে বলল,
–“তবে এগুলো সব তোমার। তুমি পড়বে?”
–“ওয়াও ছোট পাপা! ছব আমাল? আমি পলবো। , নায়েলের উচ্ছ্বসিত কন্ঠে এরোজ ও বাচ্চাদের প্রানখোলা হাসল। খেয়াল করলো না সে বহুদিন না না বহু বছর বাদ খুশিতে হাসছে। ভেবেছিল এগুলো এভাবেই ড্রয়ারেই থেকে যাবে সারাজীবন, কাঙ্খিত মানুষটিকে আর দেয়া হবে না। আর না তাকে পড়তে দেখার স্বাদ মিটবে।
বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসা নায়েলের সামনে পা গুটিয়ে বসে এরোজ। জিজ্ঞাসা করে,

–“কোথায় যাচ্ছিলে একটু আগে?”
–“ফুপিল কাছে।”, নায়েল চকলেট খেতে খেতে বলল। এরোজ শঙ্কিত কণ্ঠে শুধালো,
–“ঘুমাতে?”
–“হু”
এরোজ এক পলক তাকায় পুরো নিস্তব্ধ বাড়িটির দিকে। অতঃপর ভীষণ সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“আজ ছোট পাপার কাছে ঘুমাবে?”
কব্জি দিয়ে অবশিষ্ট নোনাজলগুলো মুছতে মুছতে নায়েল পাল্টা প্রশ্ন করল,
–“এখানে? তোমাল কাছে?”
–“হু, ঘুমাবে?”
এরোজ চাতক পাখির ন্যায় হ্যাঁ বোধক জবাবের আশায় তাকিয়ে আছে নায়েলের দিকে। নায়েল নির্বিকার মৃদু হেসে বলল,
–“আচ্ছা।”
সহসা এরোজের চোখমুখ ঠিকরে হাসি বেরিয়ে আসে। সে চকিতে উঠে দাঁড়ায়। চঞ্চল চিত্তে তড়িঘড়ি করে নিজের এলোমেলো বিধ্বস্ত বিছানা আর ঘরটা গোছাতে লাগলো। নায়েলের কম্ফোর্টের জন্য সে বিছানা, বালিশ, কম্ফোটার ও সব বদলে দিয়ে তাতে পারফিউম স্প্রে করে দিলো। অতঃপর হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

–“নায়েল দেখো, কত সুন্দর বিছানা গুছিয়েছি। কোনো দূর্গন্ধ ও আসছে না।”
–“ওয়াও, ওয়াও! সুন্দল হয়েচে।”, নায়েল হাসিমুখে হাত তালি দিয়ে বিছানায় উঠে গেল। নায়েল প্রসন্নতা দেখে এরোজের প্রসন্নতা আরও দ্বিগুন বেড়ে গেল। মিনিট পনেরো আগের সেই ভঙ্গুর এরোজটা হঠাৎ কোথাও হারিয়ে গেল, আশ্চর্য ভাবে তার মাঝে দায়িত্বের আনাগোনা দেখা গেল।
সে গরম পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে এনে নায়েলের হাত মুখ মুছিয়ে দিলো। নায়েল বিছানায় পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো। দাঁড়িয়ে থাকা এরোজকে ডেকে বলল,
–“আসো আসো ঘুমাই। আমায় কিন্তু গল্প শোনাতে হবে।”
এরোজের প্রসন্নতা মিইয়ে গেল। সে কপাল কুঁচকে আওড়ায়,
–“গল্প? কিন্তু আমি তো গল্প বলতে পারি না।”
নায়েল ছোট মুখ করে বলল,
–“আমি তো গল্প শোনা ছালা ঘুমাই না।”
এরোজ চিন্তিত হলো। আচমকা পাওয়া এই সুখময় মুহুর্তটা কোনোভাবেই হাতাছাড়া করতে না চাওয়ার বাসনা মস্তিষ্কে প্রকট। সে ত্রস্ত পায়ে গিয়ে ফোন হাতে নেয়। ইউটিউবে ঢুকতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে কানে এয়ারফোন গুঁজে বিছানায় চলে গেল। ড্রিম লাইটের আলোয় নায়েল ঘাড় কাত করে তাকায় এরোজের মুখপানে। উদাসীন কণ্ঠে শুধায়,

–“গল্প শোনাবে না?”
এরোজ স্মিত হেসে নায়েলের পানে দুই হাত বাড়িয়ে দিলো। নায়েল বিনা দ্বন্দ্বে এরোজের বুকের সাথে লেপ্টে গেল। আর এরোজ, এয়ারফোনে বলতে থাকা নারীর কথাগুলো অবিকল সুর টেনে টেনে বলতে শুরু করলো। নায়েলের সে কি উচ্ছ্বাস! চাচার বুকে একটা ছোট্ট আদুরে পাখির ছানার ন্যায় চুপটি করে শুয়ে শুয়ে গল্প শুনতে লাগলো। একটাসময় সেভাবেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
যেই ঘরটিতে সর্বদা তীব্র এলকোহলের ঝাঁঝালো গন্ধের রাজত্ব থাকতো আজ অদ্ভুত ভাবে সেই ঘরে বেবি পাউডারের সুঘ্রাণে মো মো করছে। যেই রাজকুমারীটিকে একটু দেখার জন্য সেই দূর দেশ থেকে ছুটে এসেছে সেই রাজকুমারীটি আজ এরোজের বুকে। দূর্ভাগা এরোজ তখনো অবিশ্বাস্য নয়ন ফেলে ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলছে, যদি রাজকুমারীটির ঘুম ভেঙে যায়? যদি সকাল হয়ে যায় আর সুখগুলো চাকচিক্যময় পাষণ্ড পৃথিবীর আড়ালের হারিয়ে যায়?
এরোজ ছলছলে নত দৃষ্টি ফেললো ঘন কালো কেশে আবৃত ছোট্ট মাথাটির দিকে। বুকে গাল দাবিয়ে আরামে ঘুমিয়ে আছে‌।
কম্পিত হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো ঘন কালো রেশমী চুলগুলো। একবার দু’বার অজশ্রবার! সে কি স্নিগ্ধ অনুভূতি! এরোজের দৃষ্টি ছলছলে অথচ ওষ্ঠকোনে প্রগাঢ় হাসি, বিশ্বজয়ের মতো হাসি। ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
–“তুমি আমার স্বপ্ন নও।”

রাত তখন গভীর। তপোবনের ঘরে আসতে রাত হলো। কাল বাদে পোরশু যশোরে যাবে বলে কিছু জরুরী আলোচনায় ছিল বাবার সাথে।
ঘরে ঢুকতেই সে কাউকে দেখতে পেল না। সে পোশাক বদলে বারান্দা সহ ওয়াশরুম খুঁজলো। কিন্তু পেলোনা মেয়েটিকে। ঘরেই তো ছিল! ছেলের ঘরে না থাকলে আর কোথাও থাকার কথা নয়।
ছোট্ট মেয়েটির এত ম্যাচিউরিটি দেখে তপোবন ইদানিং একটু বেশিই অবাক হয়। কিভাবে জোরপূর্বক মায়ের অধিকার আদায় করে নিচ্ছে তার চোরা স্বভাবের গম্ভীর ছেলের থেকে! ইদানিং ছেলেটাকে কতটা চঞ্চল দেখা যায়! সে তার মিমির সাথে দুষ্টুমি করে, পড়া কমপ্লিট করে রাখলে তার জন্য উপহার কিনে আনে। আবার উপহারের লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে কত পড়া আদায় করে নেয়।
তপোবন অলস পায়ে মেয়েটিকে খুঁজতে খুঁজতেই চোখ আটকায় চেইঞ্জিং রুমের একটু ফাঁক করে রাখা দরজার দিকে। সেই ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে শাড়ির আঁচল!
দরজায় খট করে আওয়াজ হতেই রূপকথা তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে একটা পাঞ্জাবি হাতে দাঁড়িয়ে গেল। স্ত্রীর চোখমুখ আর এমন চোরা ভাব ভঙ্গিতে তপোবন ভ্রু টানটান করে তাকায়। জোরপূর্বক কৃত্রিম হাসির আড়ালে কান্নারত মুখ লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় মগ্ন মেয়েটি। তপোবন গম্ভীর গলায় শুধালো,

–“কি হয়েছে?”
রূপকথা কৃত্রিম হেসে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“কিছু না। আপনার কাপড় গোছাচ্ছিলাম। শেষ গোছানো!”
তড়িঘড়ি করে বলেই মেয়েটি তপোবনকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়। কিন্তু বলিষ্ঠ এক হাত তার পেট জড়িয়ে নিতেই তার গতি শ্লথ হয়ে আসে। এতোটুকু স্পর্শ ইদানিং দু’জনের জন্য বড্ডো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে! কাউকে জড়তায় আচ্ছন্ন হতে দেখাগেল না। তপোবন ঘাড় কাত করে একই স্বরে শুধায়,
–” কি হয়েছে?”
–“কিছু হয়নি তো!”, রূপকথার পুনশ্চঃ বলা কথাটিতে তপোবন গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
–“আমি মিথ্যা কথা বলা একটুও পছন্দ করি না, রূপকথা। আমার মনে হয় না আমি তোমার সাথে এমন কোন আচরণ করি, যাতে তোমার আমাকে মিথ্যা বলতে হবে। কাঁদছিলে কেন?”
রূপকথার মাথা নত হয়ে আসে। নত শির থুতনি ঠেকে বক্ষে। তপোবন আবার বলে,

–“আমি আর জিজ্ঞেস করব না, রূপকথা।”
–” পেট ব্যথা করছে!”, রূপকথা মিনমিনে স্বরে তপোবনের কপাল কুঁচকে যায়। আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–“হ্যাঁ? পেট ব্যথার করছে সেটা বলতে মানুষ এমন করে?”
প্রশ্নটি করে তপোবন নিজেই যেন উত্তর পেয়ে গেলো। মেয়েটির ছুটে পালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় সেটি আরো গাঢ় হলো। সে গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বলল,
–” ছোটাছুটি করো না। চুপ করে দাঁড়াও।”
রূপকথা অসহায় হয়ে পড়ে। চুপ করে লেপ্টে রয় বাহুর মাঝে। তপোবন ধিমি কণ্ঠে শুধায়,
–“পিরিয়ডের ব্যথা?”
রূপকথা নত শির নাড়লো। তপোবন বিরক্ত মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলল। টেনে মেয়েটিকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করায়। থুতনি চেপে মাথা উঁচু করে গম্ভীর গলায় বলে,
–” সেটা এভাবে বলার কি আছে? এটা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, রূপকথা। এই প্রক্রিয়া না থাকলে তুমি আমি পৃথিবীতে আসতাম না। তাই এটা অসম্মান করা বন্ধ করো। মাথা উঁচু করে কথা বলতে শেখো।”
রূপকথা আবারো নত শির মাথা নাড়লে তপোবন ফের ধমকে উঠলো।

–“মাথা উঁচু করো!”
রূপকথা মাথা তুললো। কপাল কুঁচকে অভিমানী দৃষ্টিতে তাকায় লোকটির পানে। তপোবন সেই চাহনি উপেক্ষা করে। মেয়েটি অবাক করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো। রূপকথা মৃদু চেঁচিয়ে উঠল,
–“ছাড়ুন ছাড়ুন, কি করছেন?”
তপোবন জবাব দেয় না। হেঁটে গিয়ে মেয়েটিকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। আলমারি ঘেঁটে কিছু খুঁজলো। কিয়ৎকাল বাদ ফিরে আসে বিছানায় একটা বই হাতে।
রূপকথাকে অবাক করে দিয়ে তার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ে কাত ফিরে। একহাতের শক্ত টানে মেয়েটির পিঠ ঠেকে বক্ষে। পর মুহুর্তটি ছিলো অকল্পনীয়, আশ্চর্যের। শাড়ির ছাপিয়ে উষ্ণ একটি হাত কুঁচির গোছা আঁকড়ে ধরতেই পুরুষালী আঙুলগুলো ছুঁয়ে গেলো নরম উদর। মেয়েটির রুদ্ধশ্বাস আঁটকে রইল। করুণ স্বরে ছটফটিয়ে উঠে বলে,
–“কি করছেন?”
বিলম্বহীন ভেসে আসে ভারী কণ্ঠ,

–“রিল্যাক্স, ছটফট করার কিছু নেই। আমি কিছু করছি না।”
লাজে মিইয়ে গেল ছোট্ট মেয়েটি। শাড়ির কুঁচি টেনে নিচে নামাতেই অবমুক্ত উদরে লেপ্টে গেল তেলতেলে উষ্ণ স্পর্শ! সরিষার তেলের গন্ধ নাকে ঠেকে, গতরে কম্পন সৃষ্টি করে ধীর গতি সম্পন্ন হাতের স্পর্শ। ধীরস্থির তলপেট উষ্ণ হাতের লাগাতার রাউন্ড রাউন্ড স্পর্শে ব্যথা অনুভব করা ভুলে যায় মেয়েটি। এহেন সম্মোহিত মুহুর্তে নবযৌবনের অনুভূতির সাগরে ভাসার আগেই ভেসে আসে অদ্ভুত প্রশ্ন!
–“প্রাণীবিদ্যার জনক কে?”
অনুভূতির সাগরে ভাসতে চাওয়া মেয়েটি হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ল। রূপকথা কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“হ্যাঁ?”
তপোবন আবারো একই প্রশ্ন করলো,
–“প্রাণীবিদ্যার জনক কে?”
রূপকথা লোকটির অভিপ্রায় বুঝতে পেরে ভোঁতা মুখে জবাব দেয়,
–“অ্যারিস্টটল।”

সেখানেই সমাপ্তি ঘটে রূপকথার স্বামীর প্রথম স্পর্শের সেই অবর্ণনীয় অনুভূতির! তপোবন স্মিত হাসলো মিইয়ে যাওয়া মেয়েটিকে দেখে। সে এতো সহজে এই অনুভূতি গুলোকে মাথাচাড়া হতে দেবে না। সে চায় না কারোর উঠতি বয়সের আবেগ হতে‌। স্বামীর জায়গা থেকে কারোর জীবনের একমাত্র ভালোবাসার মানুষ হতে চায়। এখনো অনেক গভীরতার বাকি এই অনুভূতি গুলোর! সেভাবেই প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে রূপকথা ঘুমিয়ে পড়ে। পেটে রাব করতে থাকা তপোবন তাকায় ঘুমন্ত মুখটির দিকে। পরম আদরের সাথে সপ্তম বারের মতো স্ত্রীর ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯ (৩)

তবে ললাটে দুশ্চিন্তা। এই অভিজ্ঞতা আজকের নয়। পূর্বার ও এমন পেটে ব্যথা হতো, আর প্রতিবার সে এমনি করে তেল মালিশ করতো। যেটা মেয়েটির সবচেয়ে পছন্দের একটা মুহুর্ত ছিল। পূর্বার তো শারীরিক সমস্যা ছিল, যেই শারীরিক সমস্যা একদিন তাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু রূপকথা? অস্থির হয়ে পড়ে তপোবনের অন্তঃস্থল!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩১