Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (২)
তোনিমা খান

–“তুমি আমার সাথে অন্যায় করছ, আব্বু।”
–“আর তুমি আমার মেয়ে, নাতনির জীবন শেষ করে দিয়েছ। আমার মেয়েটা মৃত্যুর সাথে লড়ছে, আমার নাতনির শৈশব এলোমেলো করে দিয়েছ, আমার পরিবার ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছ।”
বছরের পর বছর ধরে নিজের পরিবারকে আগলে রাখা এক পিতার আর্তনাদ ছিল তকদির সিকদারের কণ্ঠে। ফুঁসতে থাকা ইমরোজ কথা হারায়।
চতুর সৃজা ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,

–“বাহ্ আঙ্কেল, আপনারা পরিকল্পনা তো চমৎকার। আপনি কি সামান্য অযুহাত ধরে ইমরোজকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছেন?”
সৃজা থামে, পরপরই তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বলল,
–” আঙ্কেল, প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে তার পছন্দমতো যোগ্য জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার। বাবা মা হিসেবে তাতে হস্তক্ষেপ না করে আপনাদের উচিৎ ছিল ছেলেকে বোঝা। কিন্তু আপনারা তো বাইরের একটা মেয়ের দোহাই দিয়ে নিজের ছেলেকে ঠকাচ্ছেন।”
তকদির সিকদার শানিত দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন,
–“ঠিক বলেছো, ইমরোজ সত্যিই আজ নিজের যোগ্য জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছে। তোমরা দুজনই দু’টো অমানুষ। একটা মেয়ের সাজানো গোছানো সংসার নষ্ট করে দিয়ে বড় বড় কথা বলতে লজ্জা করে না?”
সৃজার চোখমুখ লাল হয়ে গেল জনসম্মুখে এমন অপমানে। সে তেজি কণ্ঠে বলল,
–“আপনি আমার সাথে এমন আচরণ করতে পারেন না, আঙ্কেল। আপনি আমার স্বামীকে ঠকাচ্ছেন আমি আওয়াজ তুলবই। আপনি কেন মৌনতা আর নায়েলের কথা বলে ওকে ওর প্রাপ্য থেকে ভাগ বঞ্চিত করতে চাচ্ছেন? সরাসরি বললেই পারতেন, যে ওকে আপনারা সম্পত্তি দিতেই চান না।”

–“আমি সরাসরিই আমার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি। এখন তোমরা নেবে কি-না সেটা তোমাদের সিদ্ধান্ত। এখানে সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা হচ্ছে। আমার পূর্ণ অধিকার রয়েছে ন্যায্য ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য দেয়ার।”
–“আপনি এটাকে ন্যায্য বলছেন? ওর সম্পত্তি ওর প্রাক্তন স্ত্রীর নামে করে দিয়ে আপনি মহৎ সাজতে চাইছেন?”
–“মৌনতা নিজের শেষ নিঃশ্বাস লাগিয়ে দিয়েছে এই সংসারের পেছনে। এখন সে মৃত্যুর সাথে লড়ছে‌। আমার ছেলের কাছে বিয়ে দেয়ার পর মৌনতার বাবা নিজের মেয়েকে অর্ধমৃত অবস্থায় পেয়েছে। মেয়ের চিকিৎসা করানোর মতো অর্থটুকু তার নেই। আমার উচিৎ ছিল পুরোটা সম্পত্তি ওর আর নায়েলের নামে করে দেয়া কিন্তু আমি তবুও কোথাও আঁটকে যাই। দিনশেষে আমি একজন বাবা। আমি এই ছেলেটাকে জন্ম দিয়েছি, কোলেপিঠে বড় করেছি এটাই আমার সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব। নয়তো বিশ্বাস করো, আমি আমার অর্জিত সম্পদের এক কানা কড়িও ওই অমানুষটাকে দিতাম না। আমার কাছে সময় কম, তোমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাবে।”
ক্ষিপ্ত ইমরোজ শালিস বৈঠকে সকলের কাছে আবদার করে কিন্তু তারাও সায় জানান তকদির সিকদারের সিদ্ধান্তে। ইমরোজ এবার অস্থির চিত্তে ভাইয়ের স্মরণাপন্ন হয়।

–“ভাইজান, আমি মানছি আমি অপরাধী। আমায় অলরেডি যথেষ্ট শাস্তি দেয়া হয়েছে। আমার পিতৃত্বে সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে, আজ দুই মাস আমি হাঁটতে চলতে পারছি না, দুই মাস যাবৎ আমি আমার মেয়েকে দেখতে পারছি না। এটা কী কম শাস্তি?”
তপোবন নিরুত্তর, নিস্তেজ। ভাইয়ের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে ইমরোজ অনুনয় করে বলল,
–“ভাইজান, প্লীজ কিছু বলো।”
তপোবন চোখ তুলে তাকায়। মিহি স্বরে বলল,
–“কিছু বলার মতো উপায় তুই রাখিসনি ইমরোজ।”
ভাই ও মুখ ফিরিয়ে নিতেই ইমরোজ বাবার দিকে তাকায়। অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলে,
–“তুমি নায়েলের সম্পত্তি ভাগ করছ কেন? নায়েল আমার মেয়ে, আমার সবকিছুই তো ওর।”
ছেলের এহেন হাস্যকর কথায় তকদির সিকদার হেসে উঠলেন।
–“তোমার মতো স্বার্থান্বেষী বাবার কাছে সন্তানের কোনো মূল্য আছে না-কি? যে স্বার্থের জন্য নিজের সন্তানের মাকে মারতে চাইতে পারে, সে কোনোদিন নিজের সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবে না তার গ্যারান্টি কী? আমার নাতনির ভবিষ্যত আমি দেখে নেব। তোমার এত চিন্তা করতে হবে না।”

–“নায়েল আমার সন্তান আব্বু। তোমরা ওর উপর একটুও অধিকার ফলাতে পারো না। আমি মামলা করছি নায়েলের কাস্টিডির জন্য। ও শিঘ্রই আমার কাছে চলে আসবে।”
তকদির সিকদার দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
–“তোমার যত মামলা মোকাদ্দমা করার তুমি করে নাও। কিন্তু কোন আইন তোমার মতো জঘন্য, স্বার্থপর বাবার কাছে নিষ্পাপ ওই শিশুটির কাস্টিডি দেয় সেটা আমিও দেখে নেব। যদি এক মুহুর্তের জন্যও নিজের সন্তানকে ভালোবেসে থাকো তবে ওর থেকে দূরে থাকো। ওর জীবনটা আর জটিল করো না।”
ইমরোজ জেদি কণ্ঠে বলল,
–“আমি নায়েলকে আমার কাছে এনেই ছাড়ব আব্বু। আমার মেয়ে পানিতে ভেসে আসেনি যে ও এখানে সেখানে বড় হবে।”
পরপরই তীব্র বিরোধ করে বলল,

–“আব্বু দোষটা কী সবটাই আমার? নাকি তোমরা অন্য কারোর দোষ ঢাকছো? আমার আর মৌনতার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যায় এরোজ কেন অমন উগ্র আচরণ করেছে এটা বলো? আমার মেয়ে কেন এরোজের কাছে থাকবে? এরোজের কেন এত দরদ মৌনতা আর নায়েলের প্রতি? খালামনির বাসা থাকতে মৌনতা আর নায়েল এরোজের বাড়িতে কেন আছে? না কি আমার পিঠপিছে মৌনতা আর এরোজ…”
ইমরোজ বাক্যটি শেষ করতে পারল না সপাটে এক চড় পড়ল তার বাম গালে। আলোচনার বিষয়বস্তুর মোড় ঘোড়ানোর মৃদু প্রচেষ্টা বিফলেই গেল ইমরোজের। তকদির সিকদার হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,
–“মুখ সামলে কথা বলো, কুলাঙ্গার ছেলে! নিজের স্বার্থের জন্য এখন আমার মৌনতার চরিত্রে দাগ বসাতে চাইছো? তোমার মতো জঘন্য মানুষ আমি কখনো দেখিনি। নিজের পরকিয়ার প্রেম সফল করতে স্ত্রীকে মারতে চেয়েছো, এখন আবার দোষ ওর ঘাড়ে দেয়ার জন্য নিজের ভাই আর স্ত্রীর নামে মিথ্যা রটাচ্ছো? মেয়েটার উপর একটু তো করুণা করো, মেয়েটা ছয় বছর একনিষ্ঠভাবে তোমার সংসার করেছে, তোমার বাচ্চার মা।”
ইমরোজ রক্তাভ নেত্রে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠল বাবার উপর,

–“যেই মানুষটাকে আমি আমার জীবনেই রাখিনি তাকে কেন তুমি আমার ভাগের সম্পত্তি দেবে? আমার পুরো সম্পত্তি চাই যা ভাইজান আর এরোজ পেয়েছে।”
তকদির সিকদার তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
–“এইতো মূল কথায় আসো। তোমার মূল সমস্যা মৌনতাকে কেন সম্পত্তি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর জন্য তুমি ওর চরিত্রে আঙুল তুলবে কেন? এটা সম্পূর্ণ আমার সিদ্ধান্ত মৌনতা জানেনা অব্দি। আমার সিদ্ধান্ত নেয়া শেষ। তোমায় যেটা দেয়া হচ্ছে সেটা নিলে নাও, নয়তো চলে যাও এখান থেকে।”
ইমরোজ রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বাবার উপর। কিন্তু করার মতো কিছুই থাকে না। তকদির সিকদারকে টলাতে পারবে না কেউ। সে রেগে চলে আসতে চাইলো। কিন্তু সৃজা তাকে আঁটকে দিল। অনুনয় করে বলল, রাগের মাথায় এই ভুল করলে তাদেরকেই পস্তাতে হবে।

অগত্যা ইমরোজকে সেইটুকুই গ্রহণ করতে হয়। তবে অবাক করা বিষয় হলো কোম্পানিতেও মৌনতাকে রোজের সমান ভাগ দেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ইমরোজ ও তপোবন আর এরোজের সমানই ভাগ পেয়েছে। তাতে ইমরোজ একটু সন্তুষ্টি পেলেও সৃজা সন্তুষ্ট হতে পারল না। মৌনতা যদি কোম্পানিতে দশ পার্সেন্ট এর মালিক হয় তবে সে কোথায়?
মৌনতা সব হারিয়েও যেন কোথাও না কোথাও আশ্চর্যজনকভাবে জিতে যাচ্ছে। সৃজা অতটুকুই মানতে পারল না। ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরেও কেন মৌনতা এতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকবে সিকদার পরিবারের সাথে?
একটা মানুষের থেকে সব কেড়ে নেয়া যায় কিন্তু তার অর্জিত সম্মান কেড়ে নেয়া যায় না। সৃজাও পারেনি মৌনতার সম্মান কেড়ে নিতে। কিন্তু সে নিজে সব পেয়েও লাঞ্ছিত, কলুষিত এক সত্তা।
সারাদিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল সকলকে সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারার ঝামেলা মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে। তপোবন আর তকদির সিকদার বলহীন দেহে বাড়ি ফিরল। জীবনের দ্বন্দ্বগুলো যখন অনুভূতির কাছে হেরে যায় তখন তার যন্ত্রনা কতটা বিদঘুটে হয়?
ছোট্ট একটা জীবন অথচ সামান্য চাহিদা সেই জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইমরোজ চাইলেই নিজের অভ্যাসকে দমাতে পারত, চাইলেই সন্তানের মুখ দেখে নিজের চাহিদা ভুলতে পারত কিন্তু…তার কাছে এই ইহকাল অতীব গুরুত্বপূর্ণ যার কারণে সেটা গোটা পরিবারটা তছনছ করে দিল।
নিজের এক ছেলের প্রতি সব মায়া, আশা, দায়িত্ব ত্যাগ করে তকদির সিকদার শ্রান্ত দেহে ঘরে প্রবেশ করেন। বাবার বিধ্বস্ত দশা দেখে রোজ ছুটে আসে।

–“আব্বু, এমন দেখাচ্ছে কেন? সব ঠিক আছে?”
মেয়ের চিন্তিত মুখ দেখে তকদির সিকদার ম্লান কণ্ঠে বললেন,
–“দেহ থেকে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে, আম্মা। বুকটা ভীষণ ব্যথা করছে।”
রোজ অবুঝপানে চেয়ে রইল। বুঝতে পারল না বাবার কথা। তবে এতটুকু বুঝল বাবা কষ্টে আছে। সে তৎক্ষণাৎ বাবাকে জড়িয়ে ধরল। তকদির সিকদার মেয়েকে আগলে নিতেই চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আমার পরিবারটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল আম্মা। চারিদিকে শুধু শূন্যতা। আমার নায়েল নেই, আমার মৌনতা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেনা, আব্বু চা দেব? আমার উগ্র ছেলেটা ত্যাড়ামো করে না আমার সাথে, আমার ইমরোজ বাড়িতে আসে না। আমি এই ব্যথা কী করে ভুলব? ইমরোজ কী করে আমার পরিবারটা এভাবে ছাড়খাড় করে দিতে পারল?”
রোজের কাছে বলার মতো কিছু নেই। তপোবন ম্লান দেহে বাবাকে আর বোনকে আগলে নিল নিজের সাথে। আশ্বস্ত করে বলল,

–“একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে আব্বু। আমাদের ঘর আবার পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। নায়েল, মৌনতা আর এরোজ সবাই ফিরে আসবে।”
অনিশ্চিত সেই স্বান্তনায় তকদির সিকদার মাথা নেড়ে সায় জানান। সোফায় বসা নির্জনা বেগম ছলছল নেত্রে তিনজনকে দেখে।
বাবা মেয়েকে একে অপরের দুঃখের উপশম হতে দেখে বুকে স্বস্তি বোধ হয়‌। বহুবছর আগে জীবনের কাঠিন্যতা আরেকটু কঠিন হয়ে উঠেছিল যখন জানতে পারল, সে মা হতে চলেছে।
ছোট বোনের ফেলে যাওয়া সন্তানদের বড় করতে করতে তারাই নির্জনা বেগমের পৃথিবী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু যখন জানল সে মা হবে, সকলেই বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল। ইনিয়েবিনিয়ে বলেছিল, এই বুঝি সন্তানদের মাঝে ভেদাভেদ শুরু হবে, এই বুঝি সংসারটা আবার ভাঙবে।
তিন সন্তান তাকে ঘৃণা করবে এই ভয়, জড়তায় নির্জনা বেগম ভেতর থেকে তখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কোনোক্রমেই সংসার ভাঙতে দেখতে সে রাজী ছিলেন না। গর্ভের সন্তানের প্রতি বিতৃষ্ণা অনীহা চলে আসে। দীর্ঘ দুই মাস সে তিন ছেলেকে জানতেই দেয়নি—যে সে গর্ভবতী। বহুবার চেষ্টা করেছেন গর্ভের সন্তান গর্ভেই মেরে ফেলতে। কিন্তু তকদির সিকদার কখনো সেই অনুমতি দেননি।
এরপর একদিন তপোবন জানল। তখন সে সতেরো বছরের এক কিশোর। নির্জনা বেগমকে অবাক করে দিয়ে সে অদ্ভুত উল্লাসে ফেটে পড়ল যখন জানল, তার একটা ছোট ভাইবোন হবে।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটেছে আর সবাইকে বলেছে তার একটা ছোট ভাই বোন আসছে। ইমরোজ আর এরোজের খুব একটা ভালো না লাগলেও তারা ভাইয়ের আনন্দে শামিল হয়। হাসিমুখে মেনে নেয়। অপেক্ষা করে ছোট্ট কারোর পদচারণার।

এইতো এভাবেই তপোবন সবসময় নির্জনা বেগমের সাহস হয়েছে। কখনো ভেঙে পড়তে দেয়নি, লড়তে সাহায্য করেছে। এরপর তিন ভাইয়ের কোলজুড়ে গোলাপের ন্যায় একটা ছোট্ট লালচে পুতুল আসে। তপোবন তার গোলাপের ন্যায় লাল ঠোঁট, গাল দেখে নাম দিয়েছিল, রোজ। তাদের প্রাণ!
রোজ সত্যিই তার ভাইদের প্রিয় হয়ে উঠল। কিন্তু জন্মের আগে থেকেই মায়ের মনের মধ্যে সৃষ্ট হওয়া অনীহা থেকে মুক্তি পেল না। মা ছোটবেলা থেকেই তাকে দূরে দূরে রাখত, খুব একটা আদর করত না,কখনো আদর করে একটু বুকে জড়িয়ে নেয়নি। সব আদর ভাইয়েরা আর বাবা করত। যদিও বড় হতে হতে রোজ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে মায়ের কাঠিন্যতায়। এখন আর সে আশাও করে না কোনোকিছুর
নির্জনা বেগম চোখের পানি মুছে ফেললেন। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয় রোজকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু তাতেও জড়তা অনুভব হয়। যদি রোজ, প্রশ্নবিদ্ধ করে?

তামজিদ জোবায়েদ গলা খাঁকারি দিয়ে আড়চোখে তাকালেন স্ত্রীর পানে। চাপা স্বরে শুধালেন,
–“মেয়ে ঘটিত ব্যাপার স্যাপার?”
মৈতি বিমর্ষ চিত্তে মাথা নেড়ে সায় জানালো। তামজিদ জোবায়েদ দাঁতে দাঁত চাপলেন।
–“দেখেছো, সময় থাকতে ছেলেকে শাসন না করার ফল এটা।”
মৈতি রেগে গেল। ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“নিজে সারাজীবন প্রতি পায়ে পায়ে শাসন করে কোন মহাভারত জয় করে নিয়েছ? প্রতি পদে পদে শাসন করার পরেও এই অবস্থা কী করে হলো? কলেজে তুমি যাও কী করতে? ছেলে কী করে কার পেছনে ঘোরে তুমি দেখবে না?”
–“হ্যাঁ, আমি আমার কাজ ফেলে তোমার আধবুড়ো ছেলের কর্মকাণ্ড দেখব তাই না? একটু বুদ্ধি খাটিয়ে কথা বলো মৈতি।”
স্বামী স্ত্রী একদফা রাগারাগী করে চুপ করলেন। তামজিদ জোবায়েদ লম্বা শ্বাস নিয়ে ইতস্তত কণ্ঠে বললেন,

–“এখন এগুলো নিয়ে কথা না বলে আমাদের উপায় খোঁজা উচিৎ। তোমার ছেলের সাথে সরাসরি কথা বলো। কোনো মেয়ে পছন্দ থাকলে জানাতে বলো। আমি বিয়ে করিয়ে দেব তবুও এমন মরার মতো পড়ে থাকতে বারণ করো।”
তামজিদ জোবায়েদ অস্থিরতা চেপে বললেন। ছোটবেলা থেকে তৃশান দূরন্ত, মেধাবী আর উগ্র। সে হিমশিম খেতো ওর দূরন্তপনা সামলাতে। কিন্তু তবুও ওই দূরন্তপনাই যেন তার শান্তির কারণ। এই যে হঠাৎ একদম চুপচাপ হয়ে গেল, এটা তার পিতৃত্ব ভরা অন্তঃস্থল মানতেই পারছে না। যা করতে হয় করবে তবুও আগের মতো চঞ্চল, দূরন্ত হোক।
মৈতি উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“সেটাই তো বলছে না। কোনো মেয়ের জন্য এমন করছে এটাই স্বীকার করছে না। এটা তো আমি সেদিনকার কথা শুনে ধারণা করেছি। সেদিন যে কান্নাকাটি করল এরপর আর একটা টু শব্দ ও করেনি।”
–“কী মুশকিল বলতো। না বললে বুঝব কী করে সমস্যা কোথায়? ছেলেমেয়ে লাফাবে, মজা করবে, হাসবে তা না মরার মতো পড়ে আছে। এটা সহ্য করা যায়?”, তামজিদ জোবায়েদ অস্থির কণ্ঠে বলতে বলতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের ঘরে যাবে সোজাসাপ্টা কথা বলবে।
সে সিঁড়ি অব্দি যেতেই দেখল তৃশান নত মস্তকে নামছে। সে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,

–“যাচ্ছো কোথায়?”
প্রত্যুত্তরে ভেসে আসল ছেলের ভাঙা কণ্ঠ।
–“বাইরে।”
–“আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে।”
–“বলো।”, তৃশান সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে বলল। দৃষ্টি অদূরে দরজা পানে।
তামজিদ জোবায়েদ পেছনে হাত বেঁধে ছেলের দিকে তাকায়। আদেশের সুরে বলল,
–“ওদিকে কী তাকাচ্ছো, আমার দিকে তাকাও।”
তৃশান পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় বাবার মুখপানে। থমথমে মুখে বলল,
–“যা বলার তাড়াতাড়ি বলো।”
–“কী হয়েছে তোমার?”
–“কী হবে?”
পাল্টা প্রশ্নে তামজিদ জোবায়েদ খেকিয়ে উঠলেন,
–“সারাদিন এমন মনমরা হয়ে পড়ে থাকো কেন? আগের মতো গুন্ডামি, মারামারি, ত্যাড়ামো করো না কেন?”
–“তো তুমি চাও আমি এগুলো করি?”
–“নাহ, কিন্তু হঠাৎ করে কী এমন হলো যে তুমি এমন চুপচাপ হয়ে গেলে।”
–“কিছু না।”

–“দেখো আমি বেশ জানি তুমি কোনো মেয়ের পেছনে ঘুরতে। এরকম কোনো বিষয় হলে খুলে বলো, আমি সেই মেয়ের বাড়ির লোকের সাথে কথা বলি। কিন্তু এমন চুপচাপ হয়ে যাওয়ার তো কোনো মানে হয় না।”
না চাইতেও একটু একটু করে ভেতর থেকে আর্তনাদ ঠিকরে বের হতে চাইছে। তৃশানের চোখ টলটল করে উঠল ফের চোখের সামনে কারোর রাগি মুখ ভেসে উঠতেই। ফর্সা মুখ রাগলে নাক, ঠোঁট লাল হয়ে যাওয়া সেই অপার্থিব সৌন্দর্য আজ ও জ্বলজ্বল করে তার চোখে। অথচ আজ প্রায় আড়াই মাস মেয়েটিকে এক নজর দেখা হলো না।
বাবা মা তাদের মাতৃত্ব আর পিতৃত্বে কতটা বলীয়ান হলে সারাজীবনের করা অপরাধ এক নিমিষেই ভুলে গিয়ে সন্তানের সুখের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তৃশান ছলছল নেত্রে বাবার পানে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“এমন কিছু না।”
তামজিদ জোবায়েদ স্পষ্ট দেখলেন ছেলের চোখে জল।
–“মিথ্যা কথা বলছো কেন? আমি কী কখনো বলেছি তোমার কথা শুনব না? খুলে বলো কী হয়েছে?”
–“বললাম তো কিছু হয়নি। তুমিই তো বলতে ভদ্র সভ্য হতে, তাই হচ্ছি।”
–“এমন ভদ্রসভ্য হতে বলিনি যে মুখে একটু হাসিও থাকবে না।”
–“কারণ ছাড়া হাসি আসছে না। তুমি কোনো জোক বলো আমি হাসব।”
–“মজা করছ আমার সাথে?”
–“উঁহু।”
তামজিদ জোবায়ের এবার ধৈর্য হারা হয়ে গেলেন। বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বললেন,
–“সবসময় কিছু না কিছু করে আমায় জ্বালাতেই হবে, তাই না? আমার বয়স হয়েছে, সব সামলে আমি হিমশিম খাই। একটু তো বাপকে বোঝার চেষ্টা করো।”
–“চেষ্টা তো করছি। বলো কী করতে হবে।”, তৃশান ধিমি কণ্ঠে বলল। তামজিদ জোবায়েদ চঞ্চল কণ্ঠে বললেন,
–“হাসবে, খেলবে, মজা করবে, আনন্দ করবে। পড়াশুনা শেষ একটা চাকরি খুঁজবে। মাঝেমধ্যে বাবার দায়িত্বগুলো নিজের কাঁধে নিয়ে নেবে।”

–“আচ্ছা।”
ছেলের শান্ত জবাবে তামজিদ জোবায়েদ ভড়কে গিয়ে বলেন,
–“কি আচ্ছা?”
–“তুমি যা বলছ তা করব।”
–“সত্যি?”
–“হুম।”
–“তবে আগামী সপ্তাহে ক্লাস নাইন আর নিউ টেনের একটা ম্যাথ অলেম্পিয়ার আর সাত দিনের একটা ট্যুর আছে ঢাকাতে। নিজ দায়িত্বে টিমকে নিয়ে যাও সেখানে। আর সহিসালমত ভাবে সব কাজ সম্পন্ন করে নিয়ে আসো।”, তামজিদ জোবায়েদের উৎসুক কণ্ঠে তৃশান শান্ত স্বরে বলল,
–“আচ্ছা।”
তামজিদ জোবায়েদের মুখ চকচক করে উঠল।

–“সত্যি বলছো?”
তৃশান আর জবাব দিল না। গটগট করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
তামজিদ জোবায়েদ বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসিমুখে বললেন,
–“মৈতি, কিছু তো হয়েছে বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমার ছেলে বলবে না। তবে যা হয় ভালোর জন্য হয়। এবার যদি তোমার ছেলে একটু সঠিকভাবে জীবনযাপন করতে শুরু করে তবে আমার থেকে খুশি কেউ হবে না।”
–“কিন্তু আমার ছেলেটা ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছে।”
তামজিদ জোবায়েদ স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে হাসিমুখে বললেন,
–“মাঝেমধ্যে সুখের নেশায় আমাদের বিবেক বুদ্ধি যেমন লোপ পায়, তেমনি মাঝেমধ্যে দুঃখ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে। চিন্তা করো না, ও নিশ্চিত নিজের মধ্যেই সবটা সামলে উঠবে। আর না সামলে উঠতে পারলে আমরা আছি না? ঠিক সমাধান করে নেবো।”
স্বামীর কথায় আশ্বস্ত হয় মৈতি। কেননা ছেলের মতো এই লোক ও ত্যাদড়! কিছু বললে তা করেই ছাড়ে।
সকাল থেকে রোজের শরীর খারাপ। জ্বর আসার পূর্বাভাস। উপরন্তু বুকভার, সম্মুখে ভেসে ওঠা এক অর্ধমৃত বিধ্বস্ত মুখ দেখে।
রোজ বাচ্চাদের মতো চোখের পানি মুছতেই মৌনতা শীতল দৃষ্টি ফেলল। শুধায়,

–“কাঁদছ কেন?”
রোজ কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাদের মতো করে বলল,
–“আমি তোমার কাছে আসব মৌন বউ।”
–“আমি আর তোমার মৌন বউ নেই। কতবার বলেছি, ওই নামে ডাকবে না রোজ।”
–“তুমি সবসময় আমার মৌন বউ ছিলে আর থাকবে।”
মৌনতা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। হাতে আধখাওয়া একটা বুবু লুবু চকলেট। অতি প্রিয় চকলেটটিও সবটা খেতে পারছে না, ভেতর থেকে উগড়ে বের হয়ে আসতে চাইছে সব। সে রেখে দিল চকলেটটা। হিটারের উষ্ণতায় ঘেমে উঠতেই মাথার টুপিটা খুলে ফেলল।
সহসা অপরপ্রান্ত থেকে ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ ভেসে আসল। মৌনতা এবার বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“এখনো মরে যাইনি রোজ এভাবে কাঁদছ কেন?”
রোজ জবাব দিতে পারে না কান্নার তোপে‌। তার রুহ কেঁপে উঠছে প্রিয় মানুষটির বিভৎস রূপ দেখে। মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল, চামড়ায় জায়গায় জায়গায় কালচে ছাপ আর নরকঙ্কালের ন্যায় মুখশ্রী। সে কী বিদঘুটে চেহারা! রোজ অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,

–“তোমার চুল?”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“তোমার ভাইয়ের দেয়া শাস্তি। সুন্দর লাগছে না আমায়?”
–“এমন করে বলোনা। তুমি আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে যাবে, আমি জানি শুধু একটু ধৈর্য আর কষ্ট সহ্য করতে হবে।”
–“সবাই বলে। এগুলো শুনতে আর ভালো লাগে না রোজ। রাখি পরে কথা বলব।”
মৌনতা কেটে দেয় ফোন। রোজ আরো দ্বিগুণ শব্দে কেঁদে উঠল। পাশেই বসে থাকা রূপকথা আর জবার দৃষ্টি ছলছলে। জবা চোখ মুছে ফেলল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আফা, আফনে এমন মরা কান্না করবেন না। আমি আর বিশ্বাস আমার ভাবিজান আবার সুস্থ হইয়া ফিরা আইবে। আমরা হাসিমুখে তার অপেক্ষা করুম‌। এত মাইনসের দোয়া বিফলে যাইতেই পারে না।”
সৃষ্টিকর্তা ফিরিয়ে দেবেন না এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে সকলে পুনরায় নিজ জীবনের তাগিদে ছোটে।
রোজ ফোলা ফোলা মুখ নিয়ে দূর্বল দেহে নিচে নামতেই নির্জনা বেগম চোখ তুলে তাকালেন। গম্ভীর গলায় শুধালেন,

–“মুখের এমন অবস্থা কেন রোজ?”
–“তেমন কিছু না আম্মা, জ্বর উঠবে মনে হয়। তাই মাথা ব্যথা করছে।”, রোজ কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল।
না পেয়ে হাঁক ছেড়ে জবাকে ডেকে বলল,
–“জবা আপা, আমার জামা ধুয়ে কোথায় রেখেছো? উপরে কোথাও নেই, নিচেও দেখছি না।”
জবা ছুটে আসে বসার ঘরে। মাথায় হাত দিয়ে হড়বড়িয়ে বলল,
–“আরে আফা, ছাদ থিকা কাপড় আনতে মনে নেই।”
–“এগুলোই করবে তুমি। ফতুয়াগুলো সব কটা ধুতে দিয়েছি, এখন আমি পড়ব কী? গরম লাগছে আমার।”
রোজ রাগ ঝেড়ে বলল। শরীর অচিরেই খারাপ হতে শুরু করেছে। নির্জনা বেগম নীরবে মেয়েকে অবলোকন করে বলল,
–“ভাইজানকে বলে দাও, আসার সময় আর কটা ফতুয়া নিয়ে আসতে।”
মায়ের কথামতো রোজ ভাইকে ফোন করে বলল। তপোবন জানালো সে নিয়ে আসবে। রোজ পুনরায় উপরে উঠতে গেলে নির্জনা বেগম পিছু ডাকলেন,
–“কোথায় যাচ্ছো?”
রোজ ফিরে তাকায়। দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“ঘুমাবো, মাথা ব্যথা করছে।”
–“আমার কাছে এসো, আমি মাথা টিপে দিচ্ছি।”
মায়ের নত শির বলা ভীষণ অনাকাঙ্ক্ষিত কথায় রোজ কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“হ্যাঁ?”
–“আমার কাছে আসতে বলেছি। হ্যাঁ হ্যাঁ করছ কেন ওখানে বসে?”
মায়ের ক্ষিপ্ত কণ্ঠে রোজ ভড়কে গিয়ে এগিয়ে গেল। নির্জনা বেগম সোফার এক কিনারায় বসে সুতা দিয়ে জামা বুনাচ্ছিল। রোজ এগিয়ে যেতেই সে হাতের কুশিকাটা সরিয়ে রেখে কোল দেখিয়ে বলল,

–“এখানে শুয়ে পড়ো।”
মায়ের ব্যতিক্রমী আচরণে হতবাক রোজ জড়তা নিয়েই মায়ের কোলে শুয়ে পড়ল। মা বরাবরই রোজের জন্য একজন কঠিন সত্তা। সবসময় তাদের মাঝে একটা দূরত্ব বজায় ছিল। তবে জীবনে প্রথমবার না-কি অজস্রবার জানে না রোজ। কিন্তু বিবেক বুদ্ধি হওয়ার পর এই প্রথম সে অনুভব করল চুলের ভাঁজে মায়ের স্পর্শ। যেই স্পর্শ পৃথিবীর সব স্পর্শের চেয়ে নমনীয়, আদুরে আর মহৌষধের ন্যায় জাদুকরী।
মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই শারীরিক দুঃখগুলো কোথায় যেন লুকিয়ে গেল। রোজ অবাক হয়‌। মায়ের স্পর্শ এত শক্তিশালী? এত কেন প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে? কেন দেহের সকল অস্থিরতা মিলিয়ে যাচ্ছে ওই উষ্ণ স্পর্শের তালে?
ভাবতে ভাবতেই জাদুকরী স্পর্শে কখন রোজ ঘুমে তলিয়ে গেল টেরই পেল না। মেয়ে ঘুমাতেই নির্জনা বেগম ছলছল নেত্রে পূর্ণ চোখে তাকালেন মেয়ের মুখপানে। কোমর জড়িয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে রোজ। আজ এত বছর পর মনে হলো, এই মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নিলে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব হয়। কোথাও একটুকরো শূন্যতা পূরণ হয়ে যাচ্ছে।
এই প্রথম রোজকে স্পর্শ করতে, ভালোবাসতে একটুও জড়তা, ঘৃণা, অনীহা অনুভব হচ্ছে না নির্জনা বেগমের। সে ছলছল নেত্রে মৃদু হাসল। ইচ্ছে করছে মেয়েটিকে এভাবেই নিজের সাথে আগলে রাখতে। কিন্তু সময় যে ফুরিয়ে গিয়েছে। সেই ছোট্ট রোজ, রোজের শৈশব হারিয়ে গিয়েছে। মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো, ছুটে এসে অবুঝ আবদার করা, মন খারাপ হলে মায়ের গায়ের সাথে লেগে বসে থাকা এগুলো এখন আর করেনা রোজ। যখন করত তখন সে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, তাই এতটুকু শাস্তি তার প্রাপ্য।

স্যূপ খেতে খেতে মৌনতা উৎসুক দৃষ্টি ফেলল আনির দিকে। উৎসুক কণ্ঠেই শুধাল,
–“নায়েলের চাচু তোমায় ভালোবাসত?”
আনি হাসিমুখে মাথা নেড়ে সায় জানালো। মৌনতা পিটপিট করে চেয়ে বলল,
–“কিন্তু আমি যতটুকু শুনেছি, তার ভালোবাসার মানুষটির বিয়ে হয়ে গিয়েছে অন্য কারোর সাথে।”
আনি উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আরে বিয়ে হয়ে যায়নি। আমি অন্য কাউকে ডেট করছিলাম। কিন্তু এখন আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি ওকে খুব ভালোবাসি কিন্তু ও আমার সাথে রেগে আছে। তাই সবসময় রাগ দেখায় আমার সাথে।”
–“হাহ! সত্যি?”
–“হুম।”
মৌনতা ঠোঁট উল্টালো। এত ঠুনকো একটা ব্যপারে ওই মানুষটা এমন হয়ে গিয়েছে বিশ্বাস হলো না। তবে এতে তার কী! সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবার খেতে লাগল।
হসপিটালের খাবারের চেয়ে এখানে একটু ভালো খাবার দেয়া হয়। অন্তত কিছু মশলা এড করা হয়। খেয়ে স্বস্তি পাওয়া যায়।
দুপুর একটা নাগাদ এরোজ বাড়িতে ফিরলো। ফিরেই বসার ঘরে আনিকে দেখে তার মাথায় আগুন ধরে গেল।
সে ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“আনি,তোমায় বলেছিলাম না যখন তখন এই বাড়িতে আসবে না? মৌনতা অসুস্থ, ওর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে অধিক মানুষের সাথে মেলামেশা করলে। তোমার মাঝে কি একটুও কমনসেন্স নেই?”
আনি ব্যথিত হয়ে বলল,

–“আমি নিজেকে স্যানিটাইজ করেই এসেছি এরোজ। তুমি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছো কেন?”
–“জীবাণুটাই তো তুমি নিজে। নিজেকে স্যানিটাইজ করে গায়েব করে দিতে পারলে না? অসহ্যকর!”
সব কথা ইংরেজিতে বললেও এই কথাটি বাংলায় বলল এরোজ। ঘরের এক কোনায় পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা ফিক করে হেসে উঠল তার কথায়। কিন্তু আনি কিছু বুঝল না।
কারোর হাসির শব্দে এরোজ ফিরে তাকায় নিজের বাম দিকে। মৌনতা হাসি থামিয়ে নিলো তৎক্ষণাৎ। গম্ভীর গলায় শুধাল,
–“নায়েল?”
–“নিশান্তের সাথে আসছে। আপনি বাইরে কী করছেন? আপনাকে বলেছিলাম না জীবাণু থেকে দূরে থাকতে?”
–“ও একা এসে বসে ছিল তাই কথা বলছিলাম।”
–“ওর থেকেই দূরে থাকতে বলেছি।”
মৌনতা কিছু বলল না। শুধু মনে হচ্ছে, আনি এতক্ষণ তাকে মিথ্যা গল্প বলেছে। নায়েলকে কাঁধে নিয়ে নিশান্ত ঢুকতেই আনিকে দেখতে পেল। তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। এই মেয়েটা এরোজ বলতে পাগল! সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকে।
এরোজ তাকে আদেশের সুরে বলল,

–“দুই মিনিটের মধ্যে এটাকে এখান থেকে গায়েব করবি।”
নিশান্ত ইনিয়ে বিনিয়ে আনিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। এরোজ সোজা নায়েলকে নিয়ে গোসলে ঢুকলো। দু’জনে একদম গোসল শেষ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে বের হলো।
মাসুমা বেগম এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিলো বাথরোব পরা নায়েলকে। মাথা মুছতে মুছতে এরোজকে বলল,
–“নয়েলকে চাইল্ড কেয়ারে দেয়ার খুব প্রয়োজন?”
এরোজ মাথা মুছতে মুছতে বলল,
–“চাইল্ড কেয়ারে না দিলে ওর ভাষা শেখাটা কঠিন হয়ে যাবে। বাচ্চাদের সাথে থাকতে থাকতে ও খুব সহজে ভাষা আয়ত্তে নিয়ে নেবে। ওকে একা রাখব না তো। যতক্ষণ চাইল্ড কেয়ারে থাকবে ততক্ষণ নিশান্ত আর নিভার মধ্যে একজন ওর সাথে থাকবে। চিন্তা করবেন না।”
–“ভাষা শেখাটা কি খুব প্রয়োজন? আমরা এখানে এক কিংবা দেড় বছরের জন্য আছি। ভাষা না শিখলেও চলবে।”
এরোজের ব্যস্ত হাত থেমে গেল। আনত মুখে খানিক সময় নিলো জবাব দিতে। বলতে পারল না এই ভাষা আর এই দেশ-ই নায়েলের আগামী ভবিষ্যত। সে কিয়ৎকাল বাদ ধিমি কণ্ঠে বলল,

–“ওর বিকাশের সময় এটা। এখন ওর অনেক মানুষের সাথে মিশতে হবে, জানতে হবে। এত লম্বা সময় যদি ও মানুষের সাথে না মেশে তবে ওর বিকাশে বিঘ্ন ঘটবে। তাই ভাষা শেখাটা ওর জন্য গুরুত্বপূর্ণ!”
মাসুমা বেগম আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। আজ নায়েলের প্রথম দিন ছিল চাইল্ড কেয়ারে। মৌনতার সাথেও কথা হয়েছে এই ব্যপারে, ও সায় জানিয়েছে। কিন্তু তার মন সায় দেয় না। সে তো একটু হলেও বুঝতে পারছে এরোজের অভিপ্রায়। এটা যদি সত্যি হয় এর থেকে বাজে আর কিছু হবে না।
নিজের বড় ভাইয়ের দ্বারা প্রতারিত, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর প্রতি এরোজ কী করে এমন অনুভূতি লালন করতে পারে?
মাসুমা বেগম অস্থির দৃষ্টি ফেললেন। এমনটা হতেই দেয়া যাবে না। নিজের বিধ্বস্ত মেয়ের জীবন আর জটিল হতে দেবে না সে। একবার শুধু মৌনতা সুস্থ হোক, এরপর আর কোনোদিন সিকদার বাড়ির ছায়াও পড়তে দেবে না মৌনতার উপর।
সে নায়েলকে নিয়ে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। পুরোপুরি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়েই নায়েল মায়ের কাছে যেতে পারল।
নায়েল গুটি গুটি কদমে সোফায় উঠে মায়ের গায়ের সাথে লেগে বসতেই মৌনতা তাকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে নিলো। ললাট বরাবর চুমু দিয়ে বলল,

–“আমার মা গোসল করেছে?”
–“হুম হুম, ছোট পাপা কলিয়ে দিয়েছে। বেছি বেছি বদি ওয়াশ দিয়ে গোসল কলিয়ে দিয়েছে। দেখো আমি সুন্দল হয়ে গিয়েচি লাইক প্রিন্সেস।”
মেয়ের চঞ্চল কণ্ঠে মৌনতা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল। চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“হুম, একদম স্নো হোয়াইটের মতো লাগছে আমার নায়েলকে। কিন্তু তুমি কি সবসময় ছোট পাপার সাথেই গোসল করতে?”
নায়েল ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“হুম সবসময় আমলা একসাথে গোসল করি। সুমিং পুলেও গোসল করেছি একদিন।”
–“তাই নাকি?”
–“হুম বলো সুমিং পুল। আমি, নিশান্ত, নিভাপু, নাবিলা আপু ছবাই একসাথে গোসল করেছি। উনেক মজা হয়েছিল।”

মেয়ের কথা শুনতে শুনতেই মৌনতা ভাবুক হয়। এই বাড়িতে এসেছে আজ প্রায় দেড় দিন। কিন্তু তার দেখা এরোজ আর এই এরোজের মধ্যে বিস্তর ফারাক। চোখেমুখে ভরপুর দৃঢ়তা আর দায়িত্ববোধ। এক মুহুর্তের জন্য ও আগের সেই উদাসীন উদ্দেশ্যহীন মানুষটাকে দেখা যায়নি। পুরোটা সময় তার খেয়াল রাখা, নায়েলের খেয়াল রাখা আবার কাজে যাওয়া। বিশ্রাম নিতেও তেমন একটা দেখা যায় না।
এরোজের বাড়ির নিচ তলায় বসার ঘর, রান্নাঘর আর দুইটা গেস্টরুম। মাস্টার বেডরুম সব দোতালায়। ব্যাক ইয়ার্ডে বাড়ির সাথেই যুক্ত বড়সড় একটা সুইমিং পুল।
এরোজ বসার ঘরে আসতেই মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। এরোজ সোজা রান্নাঘরে ঢুকলো। মাসুমা বেগম রান্না করতে করতে শুধালেন,

–“কিছু খাবে? কি খাবে বলো বানিয়ে দিচ্ছি।”
এরোজ সৌজন্য হেসে বলল,
–“না আন্টি, কিছু খাবো না। আমি ওনার খাবারটা‌ বানাবো। দেড়টা বেজে গিয়েছে, ডক্টর একটার মধ্যে খাবার দিতে বলেছে।”
–“ওকে কী খাবার বানিয়ে দেব আমায় বলো আমি বানাচ্ছি। তুমি রান্না করতে পারো না-কি?”
–“তাকে যেই খাবারগুলো দিতে বলেছে তা আপনি বানাতে পারবেন না। আমি রান্না করতে পারি সমস্যা নেই আন্টি। আপনি একটু বিশ্রাম নিন আমি ততক্ষণে রান্না করে নিচ্ছি।”
–“মাসুমা বেগম নীরবে সরে গেলেন। মায়ের কোলে চেপে বসা নায়েলকে গিয়ে বললেন,
–“নানুমনি আমার কাছে এসো তোমার খাবার রান্না করা হয়ে গিয়েছে।”
নায়েল নানুর সাথে যাবে না। মৌনতা মেয়ের চুলগুলো ছুঁয়ে দিতে দিতে বলল,

–“আমায় দাও আমি খাওয়াচ্ছি।”
–“পারবি?”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“পারব না কেন? যার জন্য এই দেহে এখনো প্রাণ আছে, তার জন্য সব করতে পারব। তুমি খাবার আনো।”
মৌনতা মেয়েকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে খাওয়াতে শুরু করল। যদিও কিছুক্ষণ পরপর তাকে বিশ্রাম নিতে হয়েছে।
খাওয়াতে খাওয়াতেই মা মেয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। নায়েলকে কিচেন কেবিনেটের উপর বসিয়ে মৌনতা তাকায় নিজ কর্মে মগ্ন লোকটির দিকে। অনলাইন দেখে দেখে নিমগ্ন চিত্তে রান্না করছে। যেন একচুল এদিক ওদিক না হয়।
–“আপনি রান্না করতে পারেন?”
–“উহু।”, এরোজ ছোট্ট করে জবাব দিল।
–“তবে?”
–“তবে কী?”
–“আপনি রান্না করছেন কেন?”
–“এগুলো বিদেশি খাবার। আমি রান্না না করলে কে রান্না করবে? এখানে মেইড পাওয়া মুশকিল। আমি বাড়িতে যাওয়ায় আমার মেইড চলে গিয়েছে।”, এরোজ সবজি সটে করতে করতে বলল।
মৌনতা মেয়ের মুখে খাবার তুলে দেয়। বাঁকা চোখে চেয়ে খানিক কৌতুহলী গলায় শুধাল,
–“আনিকে কি আপনি পছন্দ করতেন?”
এরোজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। কপাল কুঁচকে শুধায়,

–“কেন?”
–“ও বলল, আপনি নাকি ওর জন্য নিজের জান দিতেও পারেন, আবার কারোর জান নিতেও পারেন।”
–“ফিল্মি ডায়লগ! কোথাও থেকে শিখে এসেছে হয়তো।”
এরোজের শান্ত স্বরে বলা কথায় মৌনতা ঠোঁট চেপে হাসল। ফের বলল,
–“আপনি নাকি ওর জন্য মাতাল হয়েছেন।”
এরোজ বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করল। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“শি ইজ ইনসেইন।”
পরপরই বলল,
–“আর আপনি এগুলো শুনেছেন?”
–“ও গল্প করছিল। সবটা কী মিথ্যা?”
এরোজ জবাব দিল না। মৌনতা ফের কৌতুহলী গলায় শুধাল,
–“আপনি কাকে ভালোবাসেন?”
একহাতে ছুরি হাতে আর এক হাত কোমরে ঠেকিয়ে এরোজ পা এলবো করে দাঁড়াল। রুক্ষ স্বরে বলল,
–“আপনাকে এসব মিসইনফর্মেশন কে দিয়েছে? এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজের দিকে খেয়াল দিন। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিছু? চুল কাটতে হবে।”
মৌনতার মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে গেল এরোজের কথায়। আনত স্বরে মিনমিন করে বলল,

–“আমি চুল কাটব না। যেটুকু আছে সেটুকু থাকবে।”
এরোজ নম্র স্বরে বলল,
–“যেটুকু আছে সেটুকুও আগামী সপ্তাহে পড়ে যাবে‌। কেটে ফেলা উত্তম আপনার জন্য। এই পড়া চুলগুলো নায়েলের মুখে যেতে পারে। এভাবে রাখা ঠিক নয়।”
নায়েলের প্রসঙ্গ আসতেই মৌনতা বিবাদ ভুলে গেল। নত শির মাথা নেড়ে বলল,
–“আচ্ছা কাটব।”
–“গোসল করেছেন?”
–“নাহ।”
–“দেড়টা বাজে আপনি এতক্ষণ কী করছিলেন? এগারোটার মধ্যে গোসল করবেন প্রতিদিন। দশ মিনিট বসুন, আমি ট্রিমার নিয়ে আসছি।”
এরোজ দ্রুত হাত চালায়। দশ মিনিটের মধ্যে খাবার বানিয়ে ট্রিমার নিয়ে নিচে আসে। নিচে আসতেই দেখল মৌনতা কাঁদছে। মাসুমা বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

–“চিকিৎসা শেষ হলেই আবার চুল আগের মতো হয়ে যাবে আম্মা।”
নায়েল অবাক হয়ে দেখল মায়ের মাথা। টুপি খোলা অবস্থায় খুব কমই সে মাকে দেখেছে। সে অবাকপানে বলল,
–“আআআ, মাম্মাল চুল নেই। আলে তুমি তো ছোট বেবিদেল মতো টাকু হয়ে গিয়েছ।”
মেয়ের কথায় মৌনতা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালো। এরোজ এগিয়ে আসতেই মৌনতা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার হাতে থাকা ট্রিমারটির দিকে। একজন নারীর সবচেয়ে মূল্যবান বাহ্যিক সৌন্দর্য যে তার চুল। তার ও সম্বল বলতে অতটুকুই ছিল। সে আহামরি সুন্দরী নয়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা স্বামী নামক সৌন্দর্যের সাথে তার সবটুকু সৌন্দর্য কেড়ে নিচ্ছে কেন?
এরোজ বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে সাহস জোগায়। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“এই সোফায় বসুন।”
তার কথামতো নির্দিষ্ট সোফায় বসে মৌনতা। ট্রিমারের আওয়াজ কর্নগোচর হলে বুকটা ধড়ফড়িয়ে উঠল। বরাবরের ন্যায় ভয়গুলো গ্রাস করল মৌনতাকে। শেষ সম্বলটুকু একটু একটু করে কোলে পড়তেই মৌনতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এরোজ রক্তাভ নেত্রে চোয়াল শক্ত করে মাথা থেকে অবশিষ্ট চুলগুলো কেটে ফেলল।
চোখেমুখে অদ্ভুত হিংস্রতা, দৃঢ়তা। তার সবটুকু কেড়ে নেয়ার নিঃশেষিত শোক আর দেখা যাচ্ছে না ওই চোখেমুখে। শুধুই হিংস্রতার আনাগোনা।

ইদানিং রূপকথার উপর পারতে সই সংসারের চাপ দেয়া হয় না। দুপুরের রান্নাটা প্রতিদিন শাশুড়ি ই করে। তার দায়িত্ব শুধু সকালের নাস্তা, সন্ধ্যার নাস্তা তৈরি করা আর বাকিসব টুকিটাকি কাজগুলো। যেগুলো পড়াশুনা করে খুব সানন্দেই সম্পন্ন করতে পারে সে।
রূপকথা তখন সন্ধ্যার নাস্তা বানাচ্ছিল। বানাতে বানাতেই অজস্রবারের মতো বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায় আঁচল ধরে পিছু পিছু ঘুরতে থাকা ছেলের পানে।
শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে তানশান করুণ চোখে চেয়ে অজস্রবারের মতো বলল,
–“প্লীজ মিমি।”
রূপকথা খুনতি হাতে তেজি কণ্ঠে বলল,
–“তোমার পাপা যদি তোমার কথাই না শোনে তবে আমার কথা শুনবে কী করে? অদ্ভুত কথা!”
–“কেন শুনবে না? আপনি বুঝিয়ে বলবেন একটু‌। ওখানে সবাই যায় আর সবার অভিভাবকরাও যায়।”
–“তুমি বলেছো না তোমার পাপাকে?”
–“বলেছিলাম তো।”
–“কী বলেছে?”
–“কিছুই বলেনি সোজাসুজি না করে দিয়েছে।”
–“কিছুই যখন বলেনি, তখন সে নিশ্চয়ই কিছু বুঝে না করেছে। নয়তো পড়াশুনার বিষয়ে সে কেন নাকচ করবে?”
–“পাপা সবসময়ই এমন করে, মিমি। আজ পর্যন্ত কখনো বাইরের কোনো স্কুলের ম্যাথ অলেম্পিয়ারে অংশ নিতে দেয়নি। স্কুলের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দিয়েছে। কিন্তু এই ম্যাথ অলেম্পিয়ার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাবে। যদি আমি প্রতিটা পর্যায়ে জিততে পারি তবে আমায় চিনে নিয়ে যাওয়া হবে ওখানে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য।”

রূপকথা শুনতে শুনতেই ফের মগ্ন হয় বার্গার এসেম্বল করতে। আগামী সপ্তাহে তানশানের স্কুল থেকে একটা ম্যাথ অলেম্পিয়ারের জন্য মেধাবী চৌদ্দ জনকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। জিততে পারলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা ম্যাথ অলেম্পিয়ারে অংশ নিতে পারবে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানে সুনেহরাও অংশ নেবে।
তানশান এবার রূপকথার বাহু আঁকড়ে ধরলো। আহ্লাদী সুরে অনুনয় করে বলল,
–“ও মিমি! সুনেহরার মতো স্টুডেন্ট ও ওখানে অংশ নিচ্ছে সেখানে আমি তো ওর থেকে কত ভালো স্টুডেন্ট। আমার ও উচিৎ অংশ নেয়া। এতে আমার আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে। আপনি ভাবুন তো, আমি যদি এত মানুষের মাঝে জিতে যাই তবে কত আনন্দ হবে।”
রূপকথা ঘাড় কাত করে তাকায় অতি নিকটে থাকা আহ্লাদী মুখপানে। দৃষ্টি বড্ডো তৃষ্ণার্ত! আগে এমনি আহ্লাদী আবদার করত মৌনতা ভাবির কাছে। তখন তার খুব আফসোস হতো তার কাছেও যদি এমন আদুরে আবদার করত? আজ একটু একটু করে আফসোস গুলো মিলিয়ে যাচ্ছে। তানশান তার কাছেও আবদার করছে। সে মৃদু হেসে ছেলের মাথা এলোমেলো করে দিয়ে বলল,

–“আচ্ছা যাও আমি কথা বলব। কিন্তু না মানলে আমার দোষ নেই।”
–“মানবে না কেন! মানাতে হবে। আমি বলে বলে দেবো আপনি সেগুলো বুঝিয়ে বলবেন।”
–“আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু পরিবর্তে আমায় কী দেবে?”
রূপকথা গাল ভরে হেসে বলল। সহসা তানশান মুখ বিকৃত করে নিলো। বিদ্রুপ করে বলল,
–“আপনি পড়াশুনা ছেড়ে ব্যবসা করুন মিমি। আপনি কথায় কথায় যেই বিজনেস করেন, তাতে দেখবেন অল্প সময়েই আপনি কোটিপতি হয়ে গিয়েছেন।”
রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–“তবে নিজের কাজ নিজে করে নাও, যাও।”
–“আমি কখন বললাম কিছু দেব না? আপনি যা চান তাই দেব তো।”
–“তোমার পাপার গতকাল ফুচকা খাওয়ানোর কথা ছিল কিন্তু খাওয়ায়নি। তুমি খাওয়াবে?”
–“এত ছোট ব্যপার? কাল সকালে স্কুলে গিয়ে খাওয়াবো।”
রূপকথা খুশি হয়ে গেল। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“আচ্ছা আচ্ছা।”
তপোবনের ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। এসেই সে কোনোমতে খাওয়া-দাওয়া করে হোয়াইট বোর্ডে রিসেন্ট প্রজেক্টের স্ট্রাকচার আঁকতে বসে গিয়েছে।
রূপকথা আর তানশান দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে তাকালো। তানশান ইশারায় ভেতরে যেতে বলল। ফিসফিসিয়ে বলল,

–“যা যা শিখিয়ে দিয়েছি তাই বলবেন কিন্তু। আমার পেছনে যেমন নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকেন পাপার পেছনেও তেমন লেগে থাকবেন। রাজি করিয়েই দম নেবেন ওকে?”
রূপকথা বড় বড় নেত্রে চেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“এ মা, এতে তো অনেক কষ্ট করতে হবে। না না শুধু ফুচকাতে হবে না, আরো কিছু দিতে হবে।”
তানশান কপাল চাপড়ালো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“আরে আমার মা, যা চান সব দেব শুধু পাপাকে একটু রাজি করান।”
–“ও তুমি টেনশন করো না আমি ঠিক রাজি করিয়ে নেব।”
বলেই মা ছেলে রুমের দিকে তাকালে আচমকা মৃদু চেঁচিয়ে উঠল ভয়ে। মার্কার হাতে তপোবন সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বউ বাচ্চার এমন থতমত খেয়ে যাওয়া মুখ দেখে তপোবন ভ্রু নাচালো।
–“কী হচ্ছে এখানে? কিসের এত খুসুরফুসুর হচ্ছে?”
–“কিছু না পাপা। কিছু না।”, তানশান কাঁধ ঝাঁকিয়ে কুল সাজার চেষ্টা করল। কিন্তু বাবার সামনে যে এগুলো নিতান্তই বোকামি। ছেলের আদ্যপান্ত চেনা তপোবন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,

–“পড়াশুনা নেই তোমার?”
–“আছে, সেটা নিয়েই মিমির সাথে একটু আলোচনা করছিলাম আরকি।”
তপোবন এবার তাকায় স্ত্রীর পানে।
–“তোমার পড়াশুনা নেই?”
–“আছে, কিন্তু একটু পর পড়ব। আমার একটু কাজ আছে।”
দু’জনের গড়িমসি দেখে তপোবনে এবার কঠোর গলায় বলল,
–“এগুলো বাদ দিয়ে পড়তে যাও দু’জন। তোমরা কিসের জন্য ঘুরঘুর করছো তা কী আমি বুঝি না? শুধু নামে প্রতিযোগিতা, এগুলোর পেছনে যত সময় যাবে ততদিনে তোমার একটা বই শেষ হয়ে যাবে তানশান। এই সেন্সটুকু তোমার মাঝে কাজ করছে না? পাপা তোমায় কতবার বলেছি, প্রতিযোগিতায় মনোযোগ না দিয়ে নিজের দক্ষতার দিকে নজর দাও।”
তানশান নত শির কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

–“এত দক্ষতার কী দরকার যদি আমি তা কাজেই না লাগাতে পারি। এই প্রতিযোগিতায় জিততে পারলে আমি চিনে যেতে পারব পাপা।”
–“তোমার কী মনে হয় আমি তোমায় চিনে পাঠাতে পারি না? কিন্তু সবকিছুর একটা সঠিক সময় আছে তানশান। পড়াশুনা করে বড় হও পুরো পৃথিবী ঘুরবে‌‌, পাপা একটুও বাঁধা দেব না।”
তানশান চোখ তুলে তাকায়। টলটলে নেত্রে বলে, –“চিনে গিয়ে যদি আমি জিততে পারি তবে আমি সেখানে পড়াশুনা করার সুযোগ পাব।”
তপোবনের দেহ ম্লান হয়ে আসে ছেলের আকাঙ্ক্ষা শুনে। বাবা হিসেবে ছেলের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার নেশা হলেও, এই আকাঙ্ক্ষা সে বরাবরই এড়িয়ে যায়। ছেলের এই আকাঙ্ক্ষাটা তার কাছে ভয়ঙ্কর বিদঘুটে লাগে। সন্তানরা কী করে বাবা মায়ের থেকে দূরে যেতে চায়? তাদের বুক পোড়ে না? সে তো তানশানের দূরে যাওয়ার কথা শুনলেই উন্মাদ হয়ে যায়। ভাবতেই পারে না। ছেলেটাকে কী করে বোঝাবে, তার মাঝে বাবার প্রাণ রয়েছে।
সে সব চাওয়া মেনে নেবে কিন্তু এই একটা চাওয়া কখনো মানবে না।
তাই কঠিন স্বরে বলল,

–“পাপা যতদিন বেঁচে আছি ততদিন দেশ থেকে কোথাও যেতে পারবে না, তানশান। পাপা মরে যাই তারপর যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেও।”
রূপকথা আর তানশান চমকে উঠল তার কঠিন প্রত্যুত্তরে। তানশান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বাবার কঠিন মুখপানে। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“পাপা।”
–“আমি জানি, তোমার উপর আমি অনেক জোরজবরদস্তি করি। কিন্তু সত্য এটাই, আমার বাঁচার প্রথম খুঁটি তুমি। আমি কোনোভাবেই সজ্ঞানে তোমায় নিজের থেকে দূরে করতে পারব না। তাই ভালো হবে, এসব প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে একাডেমিক পড়াশুনায় মনোযোগী হও।”
পুনশ্চ তপোবনের কঠিন গলায় তানশান নির্বাক নীরবে নিজের ঘরে চলে গেল। ছেলের গমনের পানে চেয়ে রূপকথা তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকলো। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“সামান্য একটা বিষয় নিয়ে ছেলেটার সাথে এত রাগ দেখালেন কেন?”
–“যেন আর কোনোদিন এমন আবদার করার সাহস না পায়।”
পুনরায় তপোবনের কঠিন গলায় রূপকথা ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“আপনার বাঁচার কারণ তানশান হতে পারে কিন্তু তানশানকে বেঁচে থাকতে তো দিতে হবে?”
তপোবন কপাল কুঁচকে তাকায়।

–“মানে?”
–“ছেলেটা সারা বছর স্কুল, ঘর, কোচিং, পড়াশুনা এগুলোর মাঝে থাকলে ওর তো ক্লান্তি অনুভব হয়‌। ওর ও দম বন্ধ হয়ে আসে সারাক্ষণ এই চার দেয়ালের মাঝে থাকতে। ওর ও ইচ্ছে করে একটু ঘোরাফেরা করতে, নিজেকে জানতে, নিজের অর্জিত জ্ঞানকে পরীক্ষা করতে।”, রূপকথা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল।তপোবন থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। নীরব এক দ্বন্দ্বময় পরিবেশ আলোড়িত হয় কামরা জুড়ে।
তপোবনের একই রকম জেদি মুখ দেখে রূপকথা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। মানুষটাকে প্রথম এমন অবুঝ হতে দেখছে।
আলগোছে পায়ের উপর দু’টো পা, গলদেশে দু’টো মেয়েলি হাত অনুভব হতেই তপোবন দৃষ্টি নামায়। থমথমে মুখে উচ্চতায় অতি ক্ষুদ্র নারীটির কোমর আঁকড়ে ধরলো। ভারসাম্য রক্ষা হতেই রূপকথা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল পুরুষালী গলদেশ। নম্র স্বরে অনুনয় করে বলল,
–“এমন অবুঝের মতো করছেন কেন? আপনি যদি ওর সাথে রাগ দেখান তবে ও কার কাছে যাবে? যেই ছেলেটা পড়াশুনায় এত ভালো তার তো ইচ্ছে করে অজস্র ট্রফি নিজের নামে করতে। জীবনে একটু পরিবর্তন ঘটলে পড়াশুনায় আগ্রহ আরো দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। সবসময় একই জীবন বয়ে চলা দুঃসহনীয়।”
তপোবন উষ্ণ এক নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

–“আমি ওকে আজ পর্যন্ত কখনো পারতে সই একা ছাড়িনি। অত দূরে ওকে টিচারের সঙ্গে কোন সাহসে পাঠাবো?”
–“আমরা কেউ একজন ওর সাথে যাব। নয়তো রোজ আপু যাবে। কিন্তু প্লীজ যেতে দিন। ছোট মানুষ নিজেকে চিনুক, জানুক তার কতটা ক্ষমতা।”
তপোবন জেদ ভুললো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আচ্ছা।”
রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
–“থ্যাংক ইউ, তানশানের পাপা।”
প্রগাঢ় হেসে বলেই রূপকথা চট করে মুখ এগিয়ে নিয়ে একটা চুমু দেয় তপোবনের বাম গালে। অতঃপর ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ছেলেটা যে তার মিমির কাছে প্রথম এমন আবদার করেছে। না পূরণ করে উপায় আছে?
তানশানের ঘরে ঢুকতেই দেখল নত শির চুপটি করে টেবিলে বসে আছে ছেলেটা। সে এগিয়ে গিয়ে ছেলের মাথাটা আগলে নেয় নিজের সাথে। তানশান নীরবে লেগে বসল মিমির সাথে। রূপকথা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“এইটুকুতে এত মন খারাপ? পাপার তো তোমার জন্য চিন্তা হয়। দূরে পাঠাতে ভয়, তুমি তার কতটা কাছের তা কী জানো না? তবে কেন রাগ করছো?”

–“রাগ করিনি।”
–“তবে কষ্ট পেয়েছো?”
তানশান জবাব দিল না। রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“কিছু পেতে হবে না সব ভুলে যাও। পাপা রাজি হয়ে গিয়েছে। তোমায় ম্যাথ অলেম্পিয়ারে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে কিন্তু সাথে তোমার ফুপি যাবে।”
তবে তানশানের মাঝে আর সেই প্রসন্নতা দেখাগেল না। সে আনত মুখে বলল,
–“আমি যাব না ম্যাথ অলেম্পিয়ারে।”
–“এখন কিন্তু খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মিমি রাজি করিয়ে ফেলেছি তোমার পাপাকে। এখন নাকচ করা যাবে না।”
তানশান নত শির বলল,
–“না, আমি যাব না। পাপা মন থেকে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। পাপা মনে মনে কষ্ট পাবে।”
রূপকথা ম্লান হাসল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীকে ইশারা করলো কিছু। এগিয়ে যায় ছেলের কাছে। রূপকথা সরে দাঁড়ালো।
ছেলের সামনে চেয়ার টেনে বসে তপোবন আঁকড়ে ধরে ছেলের দুই হাত। ভীষণ আদরের সাথে হাতের উল্টোপিঠে চুমু দিয়ে বলল,
–“পাপার কাছে তুমি কতটা মূল্যবান তা যদি শব্দে প্রকাশ করতে পারতাম তবে হয়তো ভালো হতো। আমি প্রায়শই বোঝাতে ব্যর্থ হই তোমায়। পাপা কখনো শুধু শুধু তোমার সাথে রাগ করিনা। কিন্তু হয়তো পাপা এইসব বিষয়ে একটু বেশিই কঠোর হয়ে যাই। এর একটাই কারণ আমি তোমায় হারাতে ভয় পাই।”
তপোবন থামে। ফের বলতে শুরু করল,

–” পাপা স্যরি, তানশান। পাপা তোমায় একটুও কষ্ট দিতে চাইনি। অলেম্পিয়ারে যেতে চাও, যাবে কিন্তু ফুপিকে সাথে নিয়ে যাবে। আমি দরকার পড়লে প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলব। সে নিজ দায়িত্বে তোমাদের দেখে রাখবে।”
তানশান চোখ তুলে তাকায়। মাথা নেড়ে বলল,
–“আমি যাব না থাক।”
তপোবন ম্লান হেসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলো। বলল,
–“কেন যাবে না! পাপা মন থেকে তোমায় যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। তুমি যাবে আর উইন হয়ে আসবে, ঠিক আছে? পাপাকে আবার আশাহত করো না।”
তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল বাবার কথায়‌। শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“থ্যাংক ইউ পাপা।”
–“ইউ ওয়েলকাম পাপা। শুধু পাপার এই জানটাকে দেখেশুনে রাখবে আর সহিসালামত পুনরায় পাপার হাতে তুলে দেবে, বুঝলে?”
তানশান হেসে উঠল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

–“পাপার জানকে একদম সহিসালামত পাপার হাতে তুলে দেব, প্রমিজ।”
–“এইতো গুড বয়। কাম অন এখন হাসো আর বেশি বেশি ম্যাথ চর্চা করো। উইন হয়েই আসতে হবে কিন্তু।”
তানশান হাসিমুখে দ্রুত বই খুলে বসল। তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা স্ত্রীর পানে। চোখেমুখে নিদারুণ অসহায়ত্ব। রাজি তো হয়েছে কিন্তু অন্তঃস্থল তখনো দ্বিধাগ্রস্ত! রূপকথা চোখে আশ্বস্ত করে তাকে।

সৃজা সম্মান, কতৃত্ব আর অধিকারের দিক দিয়ে মৌনতার কাছে বাজেভাবে হেরে গেলেও, নিজের লালসাকে হারতে দিল না। তার চাহিদা সে যে করেই হোক পূরণ করে।
আর সেই চাহিদার আরেকটি অংশ ছিল নিজস্ব একটা গাড়ি। সম্পত্তি পাওয়ার পরপরই ইমরোজ তাকে নতুন একটি গাড়ি কিনে দেয়। সেটা নিয়েই আজ শহর ঘুরে বেড়িয়েছে সে, বন্ধুদের সাথে নিয়ে আড্ডা, পার্টি করেছে। রাত বারোটা নাগাদ হাস্যোজ্জ্বল মুখে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতেই সৃজা হতভম্ব হয়ে গেল। অদূরে রাস্তার ওপারে পার্ক করে রাখা নিজের সদ্য কেনা কালো গাড়িটি ভাঙারির ন্যায় ভেঙে চুরমার করে ফেলে রাখা সেথায়।
নির্জন সড়কে সৃজা আচমকা আর্তনাদ করে উঠল।
–“আমার গাড়ি…..!”
তার চিৎকারে আশেপাশে কিছু লোক জড়ো হলো। কিন্তু কেউ ঠিক করে বলতে পারছে না কে করেছেন এই কাজ। তবে কয়েকজন বলল, সঙ্গ বদ্ধ কিছু গুণ্ডারা এই কাজ করেছে।
সৃজার বন্ধুরা পুলিশে ফোন দিল। সৃজা নিজের গাড়িটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। গতকালকেই ইমরোজ কিনে দিয়েছিল, মার্কেটে এভেইলেবল সবচেয়ে দামী গাড়িটা। অথচ…আজ তার শখের জিনিসটা।
সৃজা তখন কাঁদছিল তন্মধ্যেই তার ফোনটা বেজে উঠল। লাগাতার ফোন বাজায় সৃজা ফোনটা তোলে বিদেশি নাম্বার দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল। চোখ মুছতে মুছতে ফ্যাসফেসে গলায় বলল,

–“হ্যালো! কে?”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল ধিমি কণ্ঠ,
–“ডিড ইউ ফরগেট মি সুইটহার্ট? বাট আই ডিড’ন্ট। আই রিমেমবার ইউ এভরি সেকেন্ড।”
সৃজা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সতর্ক কণ্ঠে শুধাল,
–“কে আপনি?”
–“তুমি আমায় এত সহজে ভুলে গেলে কী করে সুইটহার্ট? আমার নিজের উপর রাগ হচ্ছে। আমার সবটুকু সুখ কেড়ে নিয়ে তোমরা সুখে বাস করবে এটা তো হতে পারে না। আমি সুখে থাকব না, তোরাও সুখে থাকতে পারবি না। শা/লী/র স্লা/ট!”
সৃজা চমকে উঠল পূর্ণ কণ্ঠ শুনে। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫

–“এরোজ?”
–“এইতো গুড গার্ল! মনে পড়েছে তাই না? এখন থেকে সবসময় মনে রাখবি এই নামটা। যখনি সুখ খুঁজতে যাবি তখনি একবার হলেও মনে করবি এই নামটা। কারণ তোর সুখ ছিনিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। সামান্য গাড়ির জন্য তুই এমন কাঁদছিস আর এদিকে তোরা আমার জীবন কেড়ে নিয়েছিস। আমায় এতটা বিদঘুটে পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছিস—যে আজ আমি নিজের হাতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটুকু হারাতে বাধ্য হয়েছি। আমার কী অবস্থা হচ্ছে বলতো? আমি শ্বাস নিতে পারছি না। এই বুঝি সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমি ঘুমাতে পারি না, এই বুঝি আমি তাকে আরেকবার হারিয়ে ফেললাম। এত বিদঘুটে জীবন কারোর না হোক!”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here