Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬১ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬১ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬১ (২)
তোনিমা খান

এক সপ্তাহ যাবৎ মৌনতা একটু বেশিই অসুস্থ। তার শরীর আর কেমোর যন্ত্রণা নিতে পারছে না। আরো দুটো কেমো নেয়ার মতো শক্তি আর সাহস একটাও তার মাঝে নেই। কিন্তু তাকে বাঁচতে হলে এই সেশন সম্পূর্ণ করতেই হবে, সে স্টেপ ডাউন করতে পারবে না।
এক সপ্তাহ বাদে সে পনেরো দিনের জন্য ছুটি পাবে। দুইদিন হলো তার গলদেশ থেকে সেন্ট্রাল লাইন খুলে ফেলা হয়েছে। এখন কষ্ট হলেও সে ছটফট করতে পারে, এক জায়গা থেকে অন্যত্র যেতে পারে।

একদফা বমি করে মৌনতা হসপিটালের বেড আঁকড়ে ধরে নুঁইয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একজন নার্স সর্বক্ষণ তার পাশে থাকে। কিন্তু তার কাছে মৌনতার যন্ত্রণা কমানোর মতো কোনো কিছুই থাকে না।
আজ ওই মানুষটা আসেনি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। হয়তো ব্যস্ত! কত দায়িত্ব পালন করে! কখনো বাবা, কখনো ছেলে, কখনো ভাই, কখনো…এক উন্মাদ প্রেমিক!
ম্লান হেসে উঠল মৌনতা। সাথে সাথেই মুখ দিয়ে শ্বাস করা অবস্থায় লালা গড়িয়ে পড়ল বেসিনে। বেড সংলগ্ন বেসিন রয়েছে তার জন্য।
তন্মধ্যেই লিরা ব্যস্ত ভঙ্গিতে তার কেবিনে উঁকি দিল। তাদের কাছে এই দৃশ্য বড্ড স্বাভাবিক হওয়ায় সে বেশ হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে ডাকল,

-হেই মৌন?
মৌনতা ঝুঁকে বসা অবস্থায় ফিরে তাকালো। ক্ষীণ হেসে প্রত্যুত্তর করল,
-হ্যালো লিরা!
-কষ্ট হচ্ছে?
-আমার জীবনের আরেক নাম কষ্ট। কোনো ব্যাপার‌ না।
লিরা মৃদু হেসে বলল,
-বাইরে যাবে?
-এখন?
-হ্যা, দশ মিনিটের জন্য, এসো।
লিরা এগিয়ে এলো। মৌনতার পড়নে গোড়ালি পর্যন্ত হালকা নীলাভ হসপিটাল পোশাক। লিরা তাকে মুছিয়ে দিয়ে তার মুখে একটা ভিটামিন সি ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দিল। অতঃপর সাথে করে আনা হুইলচেয়ারে বসালো। মৌনতার শরীরে এখন হাঁটার মতো শক্তি টুকুও নেই।
প্রধান ফটকের কাছে আসতেই মৌনতা বলল,

-এখানে কেন এনেছ? ডক্টর কিছু বলবে না?
-না, দশ মিনিটের জন্য ডক্টর অনুমতি দিয়েছে। হয়তো এরপর তোমায় আরেকটু কঠোর কিছু নিয়মের মাঝে রাখবেন।
কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের জবাব পেল এক মিনিট যেতেই। লিরা যতই তাকে রাস্তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে ততটাই মুগ্ধ হচ্ছিল। চোখের মনিতে ভাসছে কিছু আগুনের গোলা! না না ওগুলো ফানুস! রাত বারোটা এক মিনিটে হঠাৎ করেই আকাশে অজস্র ফানুসের মাঝে হঠাৎ করেই অম্বরে বিকট শব্দে একটি বাজি ফুটলো। সাথে সাথে অম্বরে ভেসে উঠল হ্যাপি বার্থডে নামক ছোট্ট একটা উইশ।
মৌনতা হেসে উঠল।
-কারোর জন্মদিন লিরা? এখানে উদযাপন করা হচ্ছে? কী সুন্দর!
সে খুব প্রসন্নমনে প্রশংসা করছিল। লিরা হেসে বলল,
-হুম,এক পাগলের প্রিয় মানুষের জন্মদিন। হ্যাপি বার্থডে মৌনতা।
মৌনতা চমকালো, ভড়কালো। সে অবাকপানে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো লিরার দিকে। সৃষ্টিকর্তা তাকে এতটা বিলাসী আরামদায়ক জীবন দেয়নি যে সে ঘটা করে নিজের জন্মদিন মনে রাখবে আর কেউ তার বার্থডে আয়োজন করবে। বিয়ের পরে তো সেটা আরো বিলাসীতা ছিল! ইমরোজ কখনো জানতোই না তার জন্মদিন কবে। কেউ বললেও অনাদরে উপেক্ষা করত।
সে অস্ফুট স্বরে বলল,

-আজ কত তারিখ?
-জুলাই এর উনিশ তারিখ।
নিরিবিলি সড়কে ভীড় জমেছিল উড়তে থাকা অজস্র ফানুস দেখার নিমিত্তে। সেই ভীড় ঠেলে দুটি মুখ বেরিয়ে আসতেই মৌনতার ঠোঁট বেঁকে গেল।
এরোজের মাথার চুল আঁকড়ে ধরে কাঁধের দুই পাশে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা নায়েল চেঁচিয়ে উঠল,
-হাই মাম্মাআআআ! হ্যাপি বার্থডেএএএএ!
মৌনতা হেসে তার পানে চেয়ে রইল। এরোজ সোজা এসে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। নায়েল খুব নিকটে যেতে পারত না মৌনতার। তবুও মৌনতা তাকে ছুঁয়ে দেয়ার লোভ সামলাতে পারছিল না। সে মুখ বাড়িয়ে মেয়ের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ছলছল নেত্রে বলল,
-আমার মা কেমন আছে?
নায়েল হাসিমুখে বলল,
-আ’ম গুড! দেখো মাম্মা কত ফানুস!
মৌনতা দেখল। পরমুহূর্তে দৃষ্টি রাখল ধূসর নেত্রপানে। এরোজ ম্লান হাসল অবসাদগ্রস্ত মুখটি দেখে। নিচু স্বরে বলল,
-হ্যাপি বার্থডে। আগামী ষাট বছর যেন এভাবেই আপনাকে হ্যাপি বার্থডে জানাতে পারি, বলুন আমিন।
মৌনতা হেসে বলল,

-সময়সীমা একটু বেশি হয়ে গেল না?
এরোজ জবাব দিল না তার কথার। সে নিজ বাক্যে অটল থেকে বলল,
-বলুন ‘আমিন।’
আর দ্বিরুক্তি করল না মৌনতা। বলল,
-আমিন। এখন উপহার দিন।
তার কণ্ঠে রসিকতা ছিল। এরোজ হেসে পকেট থেকে দু’টো ‘রিবন বো’ বের করল যেই রিবন বো বা ফুলগুলো সাধারণত গিফট বক্সের উপর লাগানো হয়। সে রিবন বো দু’টো নিজের আর নায়েলের কপালে লাগিয়ে দিল। এরপর হাসিমুখে বলল,
-এইযে আপনার গিফট। প্লীজ গ্রহণ করুন।
সেই অভূতপূর্ব হাস্যকর দৃশ্যে মৌনতা সহসা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। কতগুলো মাস পর তার মুখে এইটুকু হাসির দেখা মিলেছে তার হিসাব নেই এরোজের। শত কষ্টের মাঝেও তাকে হাসতে দেখে এরোজের বুকের ভার কমলো।
মৌনতা হাসি থামায়। বশ্যতা স্বীকার করে বলে,
-আচ্ছা, গ্রহণ করলাম।
এরোজ হাসল, বিশ্বজয়ের হাসি। গোটা এক জীবনের দুঃখ ভুলে গেল অতটুকু স্বীকারোক্তিতে। সে তো জীবনকে জিতে নিয়েছে।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতেই চমকালো নিলীমা। তবে মুহুর্তেই তার মুখ স্বাভাবিক হয়ে গেল অতি পরিচিত ঘৃণ্য মুখটি দেখে। এটা যে ইদানিং রোজকার দৃশ্য।
– আপনি ক্লান্ত হন না?
নীলিমার কণ্ঠে অবসাদ ছিল। ওয়াহেদ মলিন মুখে চেয়ে রইল। চোখেমুখে কেমন বিদীর্ণ যন্ত্রণার ছায়া‌। নিলীমা চোয়াল শক্ত করে ফের বলল,
– আর কত দুঃখ দেবেন বলুন? আপনার মুখ দেখলে বিগত দশ বছর আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে আমার চোখের সামনে। দয়াকরে আমাদের পথ ছেড়ে দিন। আপনাকে ক্ষমা করলে আমার সন্তানদের করা দশ বছরের কষ্টকে উপহাস করা হবে।
আজ আর কোনো আকুতি-মিনতি কিংবা কোনো কৈফিয়ত দিল না ওয়াহেদ। মিহি স্বরে বলল,

– এক গ্লাস পানি খাওয়াবে নিলীমা?
নিলীমা ভড়কে যায়। এক গ্লাস পানির আবদার নাকচ করার মতো পাষণ্ড সে হতে পারল না। পানি এনে দিল। বুকের বা পাশে ধড়ফড় করা অস্থিতিশীলতা নিয়ে ওয়াহেদ কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটি নিল। পান করে সেটি আবার নিলীমার হাতে দিল। ম্লান হেসে বলল,
– ধন্যবাদ। আর একটা ছোট্ট আবদার করব? রাখবে?
নিলীমা জবাব দিল না। ওয়াহেদ নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিল। বলল,
– একটু শুকতারার সাথে দেখা করতে দেবে?
নিলীমা আজ অযথাই তার কথা ফেলতে পারছিল না। কিংবা সে মানুষটার উপর অতিরিক্ত ত্যক্তবিরক্ত হওয়ায় সবটা মেনে নিয়ে পিছু ছাড়াতে চাইছিল। ঘুমন্ত শুকতারাকে তুলে এনে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল আর সে নিজের কাজে চলে গেল।
বাবাকে দেখে শুকতারা কাঁচা ঘুম ভাঙার বিরক্তি ভুলে গেল। সে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারত। সে অভ্যাস অনুযায়ী তার মুখশ্রী মলিন হয়ে গেল। মস্তিষ্কে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খেল—এই মানুষটা তাদের ছেড়ে এক ধনী পরিবারের নারীকে বিয়ে করেছে। এবং তাদের একটা সন্তান ও রয়েছে।
ওয়াহেদ হাঁটু ভাঁজ করে একটু নুইয়ে গেল। শুকতারার গালে হাত রেখে স্নেহের কণ্ঠে ডাকল,

– আম্মা?
ওয়াহেদ কিছুটা সময় নিল। ভেতরে কতশত প্রশ্নের উচাটন! সে ছলছল নেত্রে একটি প্রশ্নের জবাব চাইল,
– আম্মা, বাবাকে কী কখনো একটুও ভালোবাসোনি? কখনো মনে পড়েনি বাবার কথা?
শুকতারার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর অভ্যাস অনুযায়ি তাকে বিলম্ব করতে হলো না জবাব পেতে। পাথরের ন্যায় থমকে দাঁড়ানো শুকতারা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
– আমি আমার বাবাকে খুব ভালোবেসেছি, তাকে সবসময় মনে করেছি কিন্তু ততক্ষণ…. যতক্ষণ সে আমার বাবা ছিল। কিন্তু এখন আর সে আমার বাবা নেই, অন্য কারোর বাবা। তাই আমি এখন আর তাকে ভালোবাসি না, তার কথা আমার আর মনে পড়ে না।
ওয়াহেদের মনে হলো ওটা এগারো বছর শিশুর বলা ঠুনকো কোনো বাক্য নয় বরং ধারালো খঞ্জর। এর থেকে কঠিন শব্দচয়ন, এর থেকে তিক্ত বাক্য আর কিছু হতেই পারে না। তার হাতটা কেঁপে উঠে খসে পড়ল মেয়েটির গাল থেকে। আর একটি শব্দ করার ও শক্তি পেল না।
কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে আঁছড় মেরে দূরে সরিয়ে দিল। শুকতারা তখনো দাঁড়িয়ে ছিল। ওয়াহেদ রক্তিম নেত্রে মৃদু হেসে বলল,

– যাও ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার ঘুম পুরো হয়নি আম্মা। শুধু এতটুকু একটু মনে রেখো, বাবা তোমায় খুব ভালোবেসেছি। কিন্তু হয়তো পরিস্থিতি আমায় এতটাই কাপুরুষ বানিয়ে দিয়েছিল যে আমি তোমাদের ভালোবাসার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি তবুও তোমাদের ভালোবাসি। তোমাদের একবুক ঘৃণা নিয়ে মৃত্যুবরণ করাটা আমার জন্য খুব কষ্টের হবে।
ওয়াহেদ পুনরায় ঝুঁকে গিয়ে শুকতারার কপালে একটা চুমু খেল আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। শুকতারা চলে গেল।
নিলীমা বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজা লাগাতে এল। সে ভেবেছিল ওয়াহেদ চলে গিয়েছে। কিন্তু সে তখনো ওখানেই ছিল।
সম্মুখে দোতালায় ওঠার সিঁড়ি আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। নিলীমার মুখে ফুটে ওঠা ক্রোধ দেখে ওয়াহেদ একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। বলল,
– তোমায় একটু দেখব বলে অপেক্ষা করছিলাম। এখুনি চলে যাব।
পরপরই মৃদু হেসে বলল,

– নিলীমা তুমি কী জানো, তুমি আজ ও আগের মতোই ছোট্ট একটা জেদি মেয়ে আছো। যে কি-না জেদের বশেই আমার সংসারের খুঁটি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। আমি আজও খুব মনে করি, রাতের আঁধারে হারিকেন জ্বালিয়ে মেঝেতে বসে তোমার সাথে গরম গরম রাতের খাবার খাওয়াকে। তোমার কোলে শুকতারা থাকত আর আমার কোলে কথা। কত সুন্দর সংসার ছিল আমাদের তাই না?
নিলীমার চোখে ভেসে উঠল তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর তিক্ত মুহুর্তগুলো। হ্যাঁ, ওগুলো সুন্দর হলেও আজ তা তিক্ত। যা তাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যন্ত্রণা দেবে, আফসোস করতে বাধ্য করবে—যে তার একটা সুন্দর সুখী সংসার ছিল। আর তা কেউ খুব যত্ন করে ধ্বংস করে দিয়েছে।
সে টলটলে নেত্রে আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে বলল,
– অথচ আপনি আমার সুখের সংসারটা কত অবলীলায় দুঃখে পরিণত করে দিলেন!
ওয়াহেদ অনিমেষ চেয়ে বলল,
– আমার কাপুরুষতার কারণে আমায় ক্ষমা করে দিও, নিলীমা। তোমার জীবনটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য আমায় ক্ষমা করে দিও। আমার মেয়েদের বাবার সুখ না দিতে পাপার কঠিন অপরাধের কারণে ক্ষমা করে দিও।
ওয়াহেদকে ক্ষমা করলে নিলীমার মাতৃত্ব হেরে যাবে, তার সন্তানদের দুঃখগুলোকে তুচ্ছ করা হবে। অতঃপর আজ ও ক্ষমা মিলল না ওয়াহেদের। দরজাটি নির্বিকার ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। আর ওয়াহেদ নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলো বদ্ধ দরজার দিকে। হয়তো এভাবেই তার জীবনের শেষ দরজাটিও বন্ধ হয়ে যাবে কাঁধে ভারী এক ঘৃণার বোঝা নিয়ে।

তপোবনের সময়টা এতটাই ব্যস্ততার মাঝে কাটে যে রাত আর সকাল ব্যতীত স্ত্রী সন্তানের সাথে দেখা হয় না। কখনো বা এক সপ্তাহেও দেখা হয় না। কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে অফিশিয়াল দিক, ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং, প্রজেক্ট এর নকশা থেকে সবটা তার তত্বাবধায়নে সম্পন্ন হয়। আগে তো বাইরের দিকটা ইমরোজ সামলাতো…যেটা এখন দীর্ঘশ্বাস!
আজ সকালেই তপোবন সাতক্ষীরা থেকে খুলনায় এসেছে। দুই ঘন্টা বাড়িতে ছিল আবার আসতে হয়েছে অফিসে।
সে অফিসে ইমপ্লয়ির সাথে কথা বলছিল তখনি একজন এসে বলল,
– স্যার, মিঃ ওয়াহেদ আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। আমি ওনাকে ভেতরে পাঠাব?
খালুজান? ললাটে বিরক্তির ভাঁজ নিয়ে তপোবন বলল,
– দশ মিনিট পরে রুমে পাঠাও।
দশ মিনিট পরে ওয়াহেদ তার কক্ষে ঢুকল। বরাবরের মতোই তপোবন আবেগ পাশে রেখে দায়িত্ববোধের আবরনে আবৃত এক সত্তা ছিল। একটা বইতে পড়েছিল, অপরাধকে ঘৃণা করতে হয় কিন্তু অপরাধীকে নয়।
সে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সালাম দিয়ে বলল,

– খালুজান, হঠাৎ এখানে?
ওয়াহেদ চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়ে একটা ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেললেন। ওনাকে অসুস্থ লাগছিল।
– আপনি কী অসুস্থ? কিছু খাবেন? ঠান্ডা আনাবো নাকি কফি? সকালে নাস্তা করেছিলেন? মুখ শুষ্ক লাগছে।
তপোবন দায়িত্ববোধকে কখনোই উপেক্ষা করতে পারে না। ঠিক এই এক গুণ বরাবরই ওয়াহেদকে মুগ্ধ করে। সে তার চিন্তিত কণ্ঠকে উপেক্ষা করে বলল,
– আমি ঠিক আছি। ওই বুকের ব্যথা একটু বেড়েছে এই আরকি!
– গতমাসে আপনার জার্মানিতে যাওয়ার কথা ছিল। চেকআপ করাননি? ডাক্তার কী বলল?
-গিয়েছিলাম, আগের মতোই বলল। সাবধানে চলতে বলেছে।
বলেই সে থামল। পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
– রূপকথা কেমন আছে? শরীর ঠিক আছে?
মেয়ের সন্তানসম্ভবা হওয়ার খবর এক বক্স মিষ্টির সাথে তাকে জানানো হয়েছিল। প্রিয়জনদের মুখে সুখবর শোনার অধিকার তো তার নেই।
রূপকথাকে খুলনা আর ঢাকার এভার কেয়ার হসপিটালে দুই জায়গায় উন্নতমানের চিকিৎসা সেবার মাঝে রাখা হয়েছে। আজ প্রায় পাঁচ মাস একুশ দিন তার সিস্ট তেমন কোনো উপদ্রব করেনি বরং সেটা নিজ থেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। মূলত এর কারণেই তপোবন নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারছে।
স্ত্রী সন্তানের কথা আসতেই তার মুখে একটা সুপ্ত উজ্জ্বলতা দেখা যায়। সেই উজ্জ্বলতা নিয়েই বলল,

– ভালো আছে। কিন্তু আগের থেকে ভারী হয়েছে হাঁটতে চলতে পারে না তেমন। শ্বাস উঠে যায়।
– একটু দেখাবে ওকে?
আচানক ওয়াহেদের এহেন আবদারে তপোবন কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সামলে নিলো নিজেকে। ল্যাপটপে ফোন করে ওয়াহেদের দিকে স্ক্রিন ফেরাতে চাইল। কিন্তু ওয়াহেদ বাঁধা দিল।
– আমাকে দেখানোর প্রয়োজন নেই। এই অবস্থায় পেরেশানি নিতে পারবে না। আমি দূর থেকেই একটু দেখি।
তপোবনের বুকে কিঞ্চিৎ ব্যথা অনুভব হলো। বাবা সন্তানের এ কেমন বিদঘুটে জটিল মেলবন্ধন!
ফোনটা রিসিভ হতে কিছুটা সময় লাগল। রিসিভ হতেই একটা মেদযুক্ত ফর্সা মুখশ্রী ভেসে উঠল। যেখানে মাতৃত্বের কষ্ট, ক্লান্তি আর অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল। মাতৃত্ব নিয়ে মেয়েটির ফ্যান্টাসি আর মোটিভেশন তিন মাসের মাথাতেই উবে গিয়েছিল। তবুও সে হার মানতে নারাজ ছিল। একটু একটু করে বড় হতে থাকা নিজের ওই উদরপানে চেয়ে সে সব দুঃখ ভুলে যেত।

– হ্যালো! আপনি না এক ঘন্টা আগে অফিসে গেলেন?
রূপকথা ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কাপড় ভাঁজ করছিল। পড়নে সাদা ম্যাটার্নিটি ফ্রক আর সাদা ঢিলেঢালা সেলোয়ার। গায়ে ছড়িয়ে রাখা একটা লাল চুনরি ওড়না।
ওয়াহেদ মুগ্ধ হয়ে দেখছে হুট করেই বড় হয়ে যাওয়া তার ছোট্ট রূপকথাকে। চোখেমুখে আক্ষেপ,‌ যন্ত্রণা আর বেদনার ছড়াছড়ি। মাতৃত্বের সৌন্দর্যে জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট মেয়েটি।
তপোবন ধিমি কণ্ঠে বলল,
– কিছু কথা ছিল। কিন্তু তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাপড় ভাঁজ করছ কেন? জবা কোথায়?
– কাজ করছে। সারাদিন বসে থাকতে ভালোলাগে না। কাজ করলে শরীর ভালো থাকে।
রূপকথা নিজ কর্মে নিমগ্ন থেকেই বলল।
ডক্টর বেড রেস্টে থাকতে বলছে আর মেয়েটি তাকে জ্ঞান দিচ্ছে। তপোবন চাচ্ছিল কটা ধমক দিতে কিন্তু সংযত করল। চাপা স্বরে বলল,

– রাতে পায়ে ব্যথা করলে কারোর সাহায্য চাইবে না।
রূপকথা সরব রাগত স্বরে বলল,
– আমি কারোর সাহায্য চাই না। সবাই নিজ থেকেই আমায় সাহায্য করে।
তপোবন কিছু বলল না। সে ইশারায় ওয়াহেদকে বলল কথা বলতে। কিন্তু সে কোনোভাবেই এই অবস্থায় রূপকথাকে উত্তেজিত করতে চাইছিল না। অগত্যা তপোবন নিজের উদার মনকে দমিয়ে দিল।
কল কাটতেই ওয়াহেদ সাথে করে আনা একটা খাম তপোবনের কাছে এগিয়ে দিল। তপোবন সেটি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

– কী এটা?
-এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। আমি তোমার কাছে আমানত রাখছি।
– ওহ্ আচ্ছা। কবে নিবেন?
তপোবন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল। ওয়াহেদ ম্লান হেসে বলল,
– সঠিক সময় হলে সঠিক হকদারকে তুমি নিজেই দিয়ে দেবে।
তপোবন বুঝল না তার কথার মানে।
– আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। সঠিক হকদার কে? আর আমি তাকে কোথায় পাব?
– খুঁজতে হবে না। এমনিই পেয়ে যাবে। কিন্তু এটা খুলবে না এখন।
– এটা আবার কেমন ছেলেখেলা খালুজান?
ওয়াহেদ জবাব দিল না। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ভীষণ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
– আমার পর আমার সন্তানদের তুমি ছাড়া আর কেউ নেই তপোবন। আমি থেকেও নেই। কিন্তু তুমি সবসময় আমার সন্তানদের পাশে ছিলে। আমার বলতে হবে না আমি জানি, তুমি আজীবন তাদের দেখে রাখবে‌।
তার কথার মাঝেই তপোবন ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,

– খালুজান প্লীজ ভণিতা ছাড়া কথা বলুন। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না আপনি এগুলো কেন বলছেন? আপনি বললেও আমি রূপকথা আর শুকতারার খেয়াল রাখব, না বললেও।
ওয়াহেদ স্মিত হেসে বলল,
– আমি জানি। তাই তোমার কাছে একটু সাহায্যের জন্য এসেছি। আমার মেয়েদের মতো আমার ছেলেটার ও আমি ব্যতীত কেউ নেই তপোবন। ওর মা একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত নারী। সে যেকোনো সময় ওকে আঘাত করে দিতে পারে। তাতে একটুও তার হাত কাঁপবে না। তাই, কখনো যদি আমার কিছু হয়ে যায় তুমি নিহামের খেয়াল রেখো। ওকে নিঝামের কাছ থেকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিও।
তপোবনের ভালো লাগল না এই ধরণের কথোপকথন। সে বলল,
– সেটা পরের বিষয় পরে দেখা যাবে। আর আমি যেকোনো পর্যায়ে নিহামের খেয়াল রাখব। সেটা আপনার বলতে হবে না।

– আমি জানি তুমি কতটা দায়িত্ব সহকারে পুরো পরিবারকে আগলে রাখো। ঠিক তার জন্য ই আমি তোমার কাছে এসেছি। যা অপরাধ তা আমরা করেছি তপোবন। এতে নিহামের কোনো অপরাধ নেই। ওকে তুমি কোনো ধরণের শাস্তি পেতে দিও না।
তপোবন মাথা নেড়ে সায় জানালো। শাস্তি দেয়ার হলে সে তখন রূপকথার ওপর জোর করত না নিহামকে আপন করে নেয়ার জন্য। রূপকথার জন্য কঠিন ছিল বিষয়টা কিন্তু অসম্ভব ছিল না। কেন বাবা মায়ের অপরাধের শাস্তি একটা নিষ্পাপ শিশু পাবে!
কিন্তু তপোবন বুঝল না ওয়াহেদের এমন কথার মানে। হয়তো অসুস্থতার কারণে তার মাঝে দুশ্চিন্তা কাজ করছে। ওয়াহেদের হার্টে ছিদ্র ছিল। অপারেশন করেছিল কিন্তু বছর পার হতেই আরো নানা সমস্যা দেখা যায়। বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিল বহুদিন। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে মনোযোগ দিল।

লোকে বলে—মানুষ যাকে কাঁদায়, একদিন তাকেও ওই মানুষটার জন্য কাঁদতে হয়।
নেহাৎই ভিত্তিহীন এক লোককথা। তবে তার মাঝে নিহিত বাস্তবতা যে এতটা ক্রুর তা জানত না ইমরোজ।
‘Welfare of the Minor’ বাচ্চার সর্বোত্তম কল্যাণ এই নীতি অনুযায়ী নায়েলের কাস্টডির জন্য ইমরোজের করা মামলা ভিত্তিহীন, শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। তার করা কর্মকাণ্ড, একের অধিক সাক্ষী, এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যদের প্রত্যক্ষ সাক্ষীতে তার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এমনিতেও আঠারো বছর পর্যন্ত নায়েলের কাস্টডি মৌনতা পেতো। কিন্তু ইমরোজের কৃতকর্ম তাকে চিরতরে মৌনতার করে দিল। তবুও দিনশেষে একটা আশা রয়ে যায়…মৌনতার যদি কিছু হয়ে যায় তবে নায়েলের কাস্টডি ইমরোজ পাবে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে তাকে বদলাতে হবে।
সন্তান হারানোর মাঝেই ইমরোজের দূর্ভাগ্য আঁটকে নেই। খুলনার সবচেয়ে ভালো প্লেসে থাকা নিজের সব জায়গাগুলো বিক্রি করে যে মোটা অংকের টাকা ইনভেস্ট করে নিজের কোম্পানী দাঁড় করিয়েছিল তা আবারও লস করেছে। ওখানে ইমরোজের সম্পূর্ণ এসেট ছিল। যেটা এক নিমিষেই শেষ হয়ে গিয়েছে। কোম্পানি এখন বন্ধ! তাতে ইনভেস্ট করার মতো আর টাকা তার কাছে নেই। যেটুকু সম্বল আছে তা দিয়ে এখন দিন চলছে।
তার নিজের সম্পত্তি বলতে এখন এই বিলাসবহুল বাড়ি আর একটা গাড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না। ব্যাংক ব্যালেন্স নামেমাত্র।

গা পুড়ে যাওয়া জ্বরে কাতরাতে থাকা ইমরোজের দাঁতে দাঁত লেগে গেল এবার। দেহ কাঁপছে। সে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতেই আকুতির সুরে কাউকে ডাকল।
অবশ্যই এটা সৃজা ছিল। কিন্তু তার দূর্ভাগ্যটাই যে ওই নামটির সাথে জুড়ে ছিল। নারীটি তার ডাকে সাড়া দিল না। ইমরোজের চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়াল কষ্টে। প্রচন্ড যন্ত্রনায় সে আরেকটি মানুষকে ডেকে উঠল। যে কি-না জীবনের কোনো পর্যায় তাকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
– আম্মা? আম্মা শুনছ? তোমার ইমরোজের খুব কষ্ট হচ্ছে তুমি কোথায়?
হায়! আজ তার আদুরে ডাকে সাড়া দেয়ার মতো মাও নেই। ইমরোজের মাথায় আরো একটি নাম আসল। কিন্তু সেটি উচ্চারণ করার অধিকার তার ছিল না। প্রায় অনেকটা সময় পর তার কাঁপুনি থামল। তখন সে একটু নড়তে পারল। খিদের জ্বালায় পেট জ্বলছে। সে হাত বাড়িয়ে এক পানি পান করতে চাইল। কিন্তু কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরতেই তা ধরে রাখার বল পেল না, ফসকে পড়ে গেল।
বিছানা ভিজে উঠতেই ইমরোজকে উঠতে হলো। মেঝেতে পা রাখতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। বাহু আঁকড়ে ধরার মতো কেউ নেই পাশে।

উঠে চাদর নামিয়ে ফেলল। দূর্বল দেহে ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত নয়টা বাজে। কিন্তু সৃজা এখনো তার মায়ের বাসা থেকে আসেনি। সে কোনোমতে নিজের দূর্বল ভঙ্গুর দেহ টেনে বাথরুমে গেল।
তার দেহ ততটাই ভঙ্গুর ছিল যতটা তার পরিস্থিতি। সেই অহংকার, দাপট, আত্মবিশ্বাস আর দেখাতে পারে না ইমরোজ। কাউকে বলতে পারে না নিজের দুঃখগুলোর কথা। কেননা নিজের এই দুঃখের কারণ যে সে!
কিন্তু এই আর্থিক দূরবস্থা কিছুই না তার কাছে যদি না তার পাশে এই মুহূর্তে তার জীবনসঙ্গী দাঁড়িয়ে থাকত।
ঝরনার নিচে দাঁড়াতেই ইমরোজ একদৃষ্টিতে তাকালো নিজের দিকে। চেহারা ভেঙে গিয়েছে, চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছে, সেই রুষ্ট পুষ্ট দেহটি আর নেই। এইগুলো তাকে খুব একটা দুঃখ দেয় না। তাকে দুঃখ দেয় প্রিয় মানুষের বদলে যাওয়া ভয়ঙ্কর আচরণ। তার কষ্ট হয় চোখের সামনে নিজের জীবনসঙ্গীকে বদলে যেতে। যার জন্য গোটা দুনিয়া ছাড়ল সেই এখন ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাচ্ছে তার থেকে।
ইদানিং হুটহাট তার কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয় মৌনতার আর্তনাদগুলো। তার অনুনয়গুলো। যে প্রতিরাতে বেদনা জর্জরিত কণ্ঠে আকুতি করে বলত,

– ইমরোজ..এভাবে বদলে যাচ্ছেন কেন? আপনি কী জানেন প্রিয় মানুষের বদলে যাওয়া দেখা কতটা কষ্টকর? চলুন না আমরা সব মনমালিন্য ভুলে আবার আমাদের মেয়েকে নিয়ে একটা সুখী জীবনযাপন করি।
তখন সে আসলেই বুঝত না প্রিয়জনের বদলে যাওয়া কী হয়, কেমন হয়! কিন্তু এখন? তার এত কষ্ট কেন হচ্ছে? সৃজা তো তার স্ত্রী, তার সাথেই থাকছে, রাতে তার পাশেই ঘুমায়। কিন্তু তবুও তার এত যন্ত্রনা কেন হচ্ছে?
ইমরোজ মাথা ঝাড়া দিল। কোনো কিছু না এগুলো। প্রকৃতি তার সাথে কোনো শোধ নিচ্ছে না। বড় বড় লসের কারণে তার মানসিক চাপ দেখা দিচ্ছে। তার জন্য সে এসব ভাবছে। সৃজা হয়তো তার সাথে রেগে আছে তাকে এখন আর আগের মতো শপিং করিয়ে দিতে পারে না বলে।
বিলাসীতা করার মতো খুব একটা জমা টাকা না থাকলেও সে ঠিক করল আগামীকাল সৃজাকে শপিং করিয়ে দেবে। তাহলে নিশ্চয়ই সে খুশি হয়ে যাবে। সে জ্বরগ্রস্থ অবস্থায় সৃজার বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলো। বাড়িতে কোনো খাবার নেই। ওখান থেকেই খেয়েও আসবে আর সৃজাকে নিয়ে আসবে।
সে ঝাঁপসা চোখে ঢুলতে ঢুলতে ড্রাইভ করছে। চোখ নিভে আসছে তবুও নিজেকে ধরে রাখল। সৃজার মায়ের বাড়িতে ঢুকতেই সৃজার মা অবাক হলো।

– তুমি এখানে? এমন দেখাচ্ছে কেন?
– তিনদিন যাবৎ জ্বর। আপনাকে সৃজা বলেনি?
– নাহ, বলেনি। তুমি বসো।
-সৃজা কোথায়?
-সৃজা তো আসেনি এখানে।
সৃজার মা সতর্ক কণ্ঠে বলল। তার মেয়েটা ঠিক কী করছে আল্লাহ জানে! সে কী কোনো গড়মিল করে ফেলল?
ইমরোজ আশ্চর্য হলো।
– সৃজা এখানে আসেনি মানে? ও তো আমায় বলল, যে আপনি অসুস্থ তাই আপনার কাছে যাবে। তার জন্যই সন্ধ্যায় বেরিয়েছিল বাসা থেকে।
সৃজার মা ঘেমে উঠল। বুঝেগেল সে গড়মিল করে ফেলেছে। সে তৎক্ষণাৎ কৃত্রিম হেসে অতিরঞ্জিত কণ্ঠে বলল,
– হ্যাঁ হ্যাঁ এসেছিল তো। আসলে অসুস্থ থাকায় আমি সব ভুলেই যাচ্ছি। মাথা এতটা ব্যথা! সে সন্ধ্যায় এসেছিল। কিছুক্ষণ বসে আমার জন্য ওষুধ আনতে গিয়েছে।
কিন্তু ইমরোজ বিশ্বাস করল না। তার ভ্রু যুগলে ভাঁজ সরল না। সে বলল,

– ওহ্ আচ্ছা। আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। খিদেও পেয়েছে। কী রান্না করেছেন?
– চিংড়িমাছ আর গরুর গোশত রান্না করেছি। তুমি বিছানায় গিয়ে বিশ্রাম করো। আমি খাবার দিচ্ছি।
বলেই সৃজার মা কোনোমতে ছুটলো। ইমরোজ ধীর কদমে সৃজার ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সহসা ঘুরতে থাকা মাথাটা একটু স্থির হলো। সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে আলমারির দিকে গেল। এইটুকু পথেই ঘেমে গিয়েছে। খুলনার তাপমাত্রার কথা আর নাই বা বলি!
এই ঘরে তার কিছু পোশাক রাখা আছে। সে আলমারি থেকে নিজের একটা টিশার্ট বের করতে গিয়ে দেখল সেখানে অনেক গিফট বক্স রাখা। সে ভ্রু কুঁচকে সব নেড়েচেড়ে দেখল। দামী দামী ব্যাগ, জুতা, আর পোশাক। কিন্তু সেখানে একটা আংটির ও বক্স ছিল।
সে বক্সটা হাতে নিতেই তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। বক্সটা খুব লাক্সারিয়াস ছিল। কিন্তু বক্সটা খুলতেই তার মাঝে থাকা চিরকুটটা পড়তেই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।

“ফর মাই বিউটিফুল এন্ড হট লেডি”
ডেট লেখা দুই মাস আগের। এগুলো তো সে দেয়নি। তবে কে দিয়েছে? তার মানে কী সৃজা কারোর সাথে সম্পর্কে রয়েছে? তবে কী এটাই তার বদলে যাওয়ার কারণ?
মুহুর্তেই সবটা পরিষ্কার হয়ে যেতেই ইমরোজের চোখের সামনে সবটা ধোঁয়াশা হয়ে আসল। এটা যেন সব হারানোর ভয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল। সে মানতেই পারছিল না সৃজার বিশ্বাসঘাতকতা। তার থেকেও ভয় হচ্ছিল, সে দুনিয়াকে কী মুখ দেখাবে? এর জন্যই কী সে বড় মুখ করে তার পরিবার, স্ত্রী সন্তান ছেড়েছিল?
এটা হতে পারে না, এটা হতে পারে না। সৃজা কিছুতেই তাকে দুনিয়ার সামনে ভুল প্রমাণিত করতে পারে না। সে টলতে টলতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সৃজার মা পিছু ডাকল কিন্তু সে শুনল না।
রেস্তোরাঁয় বসে আছে সৃজা। উৎসুক দৃষ্টি সম্মুখে বসে থাকা দূতাবাসের লোকটির দিকে। চঞ্চল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– দুইজনের ভিসার জন্য কত টাকা লাগবে?
দূতাবাসের লোকটি বিনম্র চিত্তে বলল,
– যেহেতু আপনারা অতি সত্বর চাচ্ছেন সেহেতু টাকা একটু বেশি লাগবে। ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা এখন অনেক টাফ। দুইজন একসাথে যেতে হলে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা লাগবে।
সৃজা হকচকালো তার কথায়।
– পঞ্চাশ লক্ষ টাকা?
– জি, আপনারা যদি পনেরো দিনের মধ্যে ভিসা চান তবে এই টাকাটা প্রয়োজন হবে। এর নিচে সম্ভব নয়।
এতক্ষণে অপরপ্রান্তে থাকা সানাফ নীরবতা ভাঙল।
সৃজার উতরে যাওয়া মুখ দেখে বলল,
– আচ্ছা স্যার, আমি কাল সকালের মধ্যে আপনাকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি।
– জি, সম্ভব হলে তাড়াতাড়ি জানাবেন নয়তো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাবে পনেরো দিনের মধ্যে ভিসা রেডি করা।
– হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই।
দূতাবাসের লোকটি চলে গেল। সহসা সানাফ আঁকড়ে ধরল সৃজার হাত। আকুতিভরা কণ্ঠে বলল,

– এমন থমকে আছো কেন সৃজা? আমি তোমায় ওই আজাবের মধ্যে রেখে কোনোভাবেই কানাডায় যাব না। তুমি আর মা আমার সাথে যাবে। ওখানে আমাদের কোনো পিছুটান ছুঁতে পারবে না। আর আমি তো বললাম কানডায় গিয়ে আমি সব টাকা শোধ করে দেব। আপাতত কোনো ম্যানেজ করতে পারবে না?
সৃজা জোরপূর্বক মৃদু হাসল তার কথায়। হাতের উপর হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল,
– আমি ছাড়া তোমায় কোনোভাবে কানাডায় যেতেই দেব না। চিন্তা করো না, আমি কোনো ব্যবস্থা করে ফেলব।
সানাফ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
– আই লাভ ইউ জান।

সৃজা মৃদু হাসল। হ্যাঁ, সেদিনের পর থেকে সানাফারের করা এক একটা পাগলামি, রাতের আঁধারে একটু তার কণ্ঠ শোনার আকুতি তার মন কেঁড়ে নিয়েছিল। জীবনে প্রথমবার কেউ তার দেহ নয় বরং তার কথা, তার উপস্থিতিতেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেত। ইমরোজ যখন ঘরের কাজ করার জন্য তার উপর জোরজবরদস্তি করত, তখন সে নিজ দায়িত্বে তাকে একজন গুণী কাজের মেয়ে রেখে দেয়। যে অনেক সুন্দর রান্না করতে পারে। তার খুঁটিনাটি কষ্ট সব দূর করে দেয়। আজ তিনমাস তারা একে অপরের সাথে সম্পর্কে রয়েছে।
যেই সম্পর্ক পূর্ণতা পাবে যখন তারা পরিবার সমেত কানাডায় সেটেল হবে। থাকবে না কোনো পিছুটান, কেউ টিপিক্যাল মেয়েদের মতো জোরপূর্বক সংসারের চাপ দেবে না, পোশাক পরিচ্ছদে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না।
কিন্তু তার কাগজপত্রে কিছু সমস্যা থাকায় সানাফ তার পরিচিত একটা এজেন্সি ভিসার ব্যবস্থা করে দেবে। যারা খুবই দক্ষ একটা এজেন্সি। কিন্তু সমস্যা হলো তার আর তার মায়ের এত দ্রুত ভিসা রেডি করতে খরচ বেশি হবে। এই খরচ সানাফ-ই বহন করত কিন্তু তার সব টাকা কানাডার ব্যাংকে জমা। যেটা কিছু সমস্যার কারণে সে তুলতে পারছে না। কানাডায় গিয়েই তুলতে হবে।
এখন তাকেই কোনোভাবে ব্যবস্থা করতে হবে।
সে বলল,

– আমার কাছে প্রায় ষাট লক্ষ টাকার স্বর্ণ আছে। যেগুলো অর্ধেক আমার দেনমোহর আর অর্ধেক এমনি।
সানাফ তৎক্ষণাৎ নাকচ করে বলল,
– কিন্তু ওগুলো তোমার হক। ওগুলো তুমি নষ্ট করতে পারো না।
সৃজা বাঁকা হেসে বলল,
– তোমার মনে হয় আমি আমার‌ লস করে কিছু করব? এগুলো আমি পুষিয়ে নেব। কিন্তু ওনাকে টাকা দিয়ে ভিসা করানোটা বেশি জরুরী। তুমি ওনাকে বলো, আমরা রাজী। কাল বিকালে টাকা দেব।
– তুমি শিওর?
– একদম। পনেরো দিন পর তোমার কানাডায় যাওয়ার ডেট। এজেন্সিকে বলবে ওই দিনই যেন আমারাও তোমার সাথে কানাডায় যেতে পারি।
মনে মনে বিশাল ছক কষছে সৃজা। সানাফ অন্তর্ভেদি চোখে তাকে পরখ করল,
– তুমি আসলে কী করতে চাইছ সৃজা?
সৃজা চোখ‌ টিপে বলল,
-সাপ ও মরবে লাঠিও ভাঙবে না—এমনকিছু করব। আমি কখনো আমার হক ছাড়ব না। আমি দুই বছরের বেশি ইমরোজের পেছনে নিজের সময়, ভালোবাসা, অনুভূতি সব নষ্ট করেছি। কিন্তু ও আমায় একজন কাজের লোকের মতো ট্রিট করেছে। যেটা আমার প্রাপ্য নয়।
সানাফ ব্যথিত হলো। চাপা রাগ উপচে বের বয়ে এলো,

– আমি যদি জানতাম ওই মাদার’বোর্ড তোমার উপর এভাবে অত্যাচার করে তবে আরো আগে তোমায় ওখান থেকে বের করে আনতাম।
সৃজা তার হাত চেপে ধরে বলল,
– এত রাগ করো না জান। তুমি আমার জীবনে এসেছ তাতেই আমি খুশি। তুমি‌ ঠিক বলেছিলে, যে যার ভাগ্যে আছে সে তিনটা বিয়ের পর হলেও তার জীবনে আসবে। যেমনটা তুমি এলে।
সানাফ স্মিত হেসে বলল,
– আমায় আসতেই হতো!
সৃজা যখন বাড়ি ফিরল তখন রাত এগারোটা প্রায়। সতর্ক দৃষ্টি ফেলে ঘরে ঢুকতেই কিছুটা চমকে উঠল, ইমরোজ সোফায় শুয়েছিল। তার চোখমুখের করুণ দশা। সে উপেক্ষা করে উপরে উঠতে চাইল কিন্তু ইমরোজ জেগে গেল।
সে অবিচলিত দৃষ্টি ফেলে বলল,
– সৃজা? তুমি এসেছ?
সৃজা দাঁড়িয়ে গেল তাকে উদ্ভ্রান্তের মতো কথা বলতে দেখে। কৃত্রিম হেসে বলল,
– জি, কিন্তু তোমায় এমন লাগছে কেন?
ইমরোজ তার কথার জবাব দিল না বরং তাকে অবাক করে দিয়ে সে ছুটে এসে জাপটে ধরলো সৃজাকে। হড়বড়িয়ে বলল,

– সৃজা, কী হয়েছে তোমার? এমন বদলে যাচ্ছ কেন? তোমার মনে নেই আমরা কত সুন্দর লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করতাম? কত মজা হতো? তুমি কী সব ভুলে গিয়েছ?
সৃজা সতর্ক কণ্ঠে বলল,
-এসব কথা কেন বলছ ইমরোজ?
ইমরোজ জবাব দিল না তার সেই প্রশ্নের ও বরং জ্বরগ্রস্থ কণ্ঠে আকুতি করে বলল,
-প্লীজ সৃজা, আমায় ছেড়ে যেও না। তুমি ছেড়ে গেলে আমি কোথায় যাব বলো? তুমি ছাড়া আমার কে আছে?
সহসা সৃজা চমকে উঠল। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল। ইমরোজ এমন কথা বলছে কেন? ও নিশ্চয়ই সন্দেহ করছে তাকে। সৃজা তৎক্ষণাৎ তাকে জড়িয়ে ধরল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-এসব বাজে কথা বলো না। আমি তোমায় ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি সবসময় তোমার সাথে থাকব। তোমার জ্বর তাই উল্টাপাল্টা বকছ। কিছু খেয়েছ? এসো আমি খাইয়ে দেই।
ইমরোজ তবুও তাকে ছাড়তে নারাজ। সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। জ্বরের ঘোর আর প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ে সে রীতিমতো বাচ্চাদের মতো ছটফট করছিল।
সৃজা কোনোমতে তাকে খাবার খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিল। খুব যত্ন করে ঘুম পাড়িয়ে দিল। সেই পর্যায়ে গিয়ে ইমরোজ একটু শান্ত হলো।
সৃজা তড়িঘড়ি করে সানাফকে ফোন দিল। ভয়ার্ত কন্ঠে জানালো,

-সানাফ, ইমরোজ আমার উপর সন্দেহ করছে। আমাদের যা করার তাড়াতাড়ি করে এখান থেকে বের হতে হবে।
ছকগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য একটুও সময় ছিল না সৃজার হাতে। কিন্তু তাকে সফলভাবে তা করতেই হবে। এই ইমরোজ নামক বোকা ডমিনেটিং পুরুষের ঘরে বসে নিজের সব সখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে দারিদ্র্যের মতো জীবনযাপন সে করতে পারবে না।

তপোবন ঠিক বলেছিল তার দেয়া জ্ঞানের বানী ঠিক রূপকথার উপর ভারী পড়বে।
তখন রাত এগারোটা। পায়ের পাতা সহ আঙুলগুলো ফুলে উঠেছে। ব্যথায় সে ছটফট করে যাচ্ছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। জমজ বাচ্চা হওয়ায় পাঁচ মাসেই তার পেট অতিরিক্ত স্ফিত লাগছে। তুলনামূলক অনেক বেশি ভারীও। রূপকথা বুঝতে পারছে না সে আগামী মাসগুলো কী করে কাটাবে! এখনি তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
তানশানের আগামীকাল সি.টি আছে। তাই সে পড়ায় এতটাই ডুবে গিয়েছিল যে দুই ঘন্টায় ও পাশের ঘরে উঁকি দিতে পারেনি। সে হন্তদন্ত হয়ে বাবার ঘরের দরজায় নক করল।
রূপকথা ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল,
-দরজা খোলা।
তানশান ভেতরে ঢুকেই দেখল রূপকথা বিছানায় শুয়ে মোচড়ামুচড়ি করছে। সে ডেকে উঠল,
-মিমি?
রূপকথা কাত ফিরে তাকালো। ব্যথাতুর মুখে আলতো হাসি ফুটে উঠল।

-তানশান, পড়া শেষ? খাবার খাবে এখন? দাঁড়াও আমি দিচ্ছি।
সন্ধ্যায় ভারী নাস্তা খাওয়ায় সারা রাত কিছু খায়নি ছেলেটা। সে ব্যথা সামলে উঠতে গেলে তানশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসল। গম্ভীর মুখে বাঁধা দিয়ে বলল,
-উঠতে হবে না। আমি এখন খাবো না ভাত। একটু পরে খাবো।
বলতে বলতেই সে এগিয়ে গিয়ে রূপকথার হাতে থাকা বইটা নিয়ে নিলো। পিঠের পেছনে বালিশ দিয়ে রূপকথাকে বসতে সাহায্য করল। রূপকথা কৈফিয়ত দিয়ে বলল,
-আর এক পৃষ্ঠা আছে তাহলেই এমসিকিউ শেষ হয়ে যাবে।
তানশান বই রেখে বলল,
-আর পড়তে হবে না। আপনি যথেষ্ট এগিয়ে আছেন সিলেবাস থেকে।
রূপকথা তার ওয়াদামাফিক মিড টার্মেও টপ টেনের মধ্যে ছিল। অষ্টম হয়েছিল। যেটা একটা বিস্ময়কর ঘটনা ছিল তানশান আর তপোবনের জন্য।
এরপর ছেলেটা কিছুটা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। জিজ্ঞাসা করল,
-কোথায় সমস্যা হচ্ছে? পাপাকে ফোন করব? ডক্টর নিয়ে আসবে?
রূপকথা চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-কথায় কথায় ডাক্তার ডাক্তার করো কেন তোমরা বাপ ছেলে? আজ অনেক হাঁটাহাঁটি করেছি বলে আমার পায়ে পানি নেমেছে।
সেই কথা শুনে তানশান সোজা সেন্টার টেবিলে গেল। ফিরল সরিষার তেল হাতে। রূপকথা তখনো কাতরাচ্ছিল। সে রূপকথার পায়ের নিচে দুইটা বালিশ দিয়ে পায়ের কাছে বসল। রূপকথা ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

-পায়ের কাছে কী করছ? এখানে এসে বসো।
তার কথার কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। সে খুব মনোযোগ সহকারে রূপকথার পা দু’টো আলতো হাতে মালিশ করে দিতে লাগল আর। রূপকথা হতবুদ্ধি হয়ে মাথা তুলে তাকালো। হন্তদন্ত হয়ে বলল,
-আরে এই ছেলে, তুমি পা টিপছ কেন? ইয়া আল্লাহ! তানশান ওঠো। লোকে দেখলে ছিঃ ছিঃ করবে আমি এতটুকু ছেলেকে দিয়ে পা টিপাচ্ছি? ওঠো তানশান।
রূপকথার মাঝে সুপ্ত ভয়ের আভাস ছিল কেননা লোকে তার দিকে আঙুল তুলতে একবার ও ভাববে না। কারণ? সে যে সৎ মা!
তানশান নিদারুণ ভাবে তার আর্তনাদ উপেক্ষা করে বলল,

-কে কী বলে সেটা আমি দেখে নেবো। আমি নিজ ইচ্ছায় করছি, কেউ আমায় জোর করছে না।
-সেটাই, তোমার কেন এমন অদ্ভুত ইচ্ছে হলো? এটা বাজে লাগছে তানশান, ওঠো।
রূপকথা আবার নিজের দেহ বালিশে এলিয়ে দিল। তানশান আর তর্ক করল না এই নির্বোধ, অতিরিক্ত পাকনা নারীর সাথে। কষ্ট সে করছে, অথচ পরোয়া করছে লোকে কী বলবে তার!
তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কাজ করল। রূপকথা এতটাই আরাম বোধ করল যে নিমিষেই ঘুমিয়ে গেল। নারীটির কাতরানো কমাতে পেরে তানশান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তখুনি দরজা খুলে কেউ নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল।
বিগত পাঁচ মিনিট যাবৎ এহেন অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ানোর প্রশান্তি ছিল তপোবনের চোখেমুখে। তানশান বাবাকে দেখে মৃদু হাসল। অতি সাবধানে রূপকথার পা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল,
-মিমির পায়ে অনেক ব্যথা করছিল পাপা। ছটফট করছিল। এখন কমেছে। তুমি কী একটু ডক্টরকে জানাবে?
পূর্বার পরিণতি তপোবনকে যতটা ভেঙেছে তার চেয়েও দ্বিগুণ ভেঙেছে তানশানকে। তাই সে আর কোনোক্রমেই কাউকে হারাতে চায় না। এই সকল যত্ন তারই নিদর্শন। সে সাথে সাথে সায় জানালো,

-কাল জানাব আব্বু। তুমি পড়া শেষ করেছ?
-হ্যাঁ, শেষ করেছি। এখন খাবার খাবো।
-ডাইনিং এ যাও। পাপা আসছি।
তপোবন ঘুমন্ত মেয়েটিকে দেখে পোশাক বদলে নিলো। বড় মাছ রান্না হয়েছে বাড়িতে। ছেলের জন্য সেই মাছ ভর্তা বানিয়ে দু’জনে এক পাতেই খেলো। ভরপুর খেয়ে তানশান বিরক্ত হয়ে গেল।
-এখন আমার ঘুমাতে কষ্ট হবে পাপা। এত খাওয়ালে কেন?
-আমি খাওয়াইনি। তোমার পেটে ক্ষুধা ছিল বলেই তুমি খেয়েছ। দশ মিনিট হাঁটাহাঁটি করো তারপর ঘুমাও।
তপোবন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল। লাইট নিভিয়ে নিজের ঘরে এসে ঢুকে দরজা আটকে দিল। রোজ রাতের নিয়মানুযায়ী অলিভ অয়েল নিয়ে রূপকথার পাশে বসল। ফ্রকটা তুলে উদর উন্মুক্ত করতেই রূপকথা আধো আধো চোখ মেলে তাকালো। এক পলক মানুষটাকে দেখে আবার চোখ বুজলো। বদ্ধ নেত্রেই বলল,
-তানশান আমার পা মালিশ করে ব্যথা গায়েব করে দিয়েছে, তানশানের পাপা।
তপোবন স্ফিত উদরে অলিভ অয়েল দিয়ে মালিশ করতে করতে জবাব দিল,

-দেখেছি।
-সে তার ভাই বোনকে খুব ভালোবাসে।
-সে তার মিমিকেও খুব ভালোবাসে।
-কখনো বলে না কেন?
-ভালোবাসা বলার জিনিস নয়। কাজে, কর্মে, দায়িত্বের সাথে বুঝিয়ে দিতে হয়।
-আপনারা বাবা ছেলে এত গম্ভীর কেন?
-তুমি চঞ্চল বলে।
-এ কেমন নিয়ম?
-এক ঘরে তিনজন চঞ্চল মানুষ থাকলে সেটা ঘর না ডিবেটিং ক্লাব হয়ে যাবে।
-অপমান করলেন? আমি তর্ক করি আপনাদের সাথে?
-নাহ। শুধু বোঝালাম ভিন্ন প্রকৃতির দুই সত্তা একটি ঘরের ভারসাম্য রক্ষা করে। কলহ থেকে বাঁচায়।
রূপকথা বুঝল। চোখ বন্ধ করে উপভোগ করল মালিশটুকু। তার এখন থেকেই স্ট্রেচমার্ক পড়তে শুরু করেছে। তপোবন তাই সেই তিন মাস থেকে রোজ নিয়ম করে রাতে অলিভ অয়েল মেখে দেয় উদরে। আরাম ও লাগে, স্ট্রেচমার্ক ও কম হবে।
দীর্ঘক্ষণ বাদ ঠিক উদরের আবর্ত অংশ বিশেষে উষ্ণ এক ঠোঁটের ছোঁয়া পেতেই রূপকথা আড়ষ্ট হলো। এই ছোট্ট স্পর্শেও সে অভ্যস্ত। এটি না-কি জনাবের নিজস্ব উপায় তার বাচ্চাদের আদর করার। ওখানে আদর করলে না-কি সেটা সোজা তার বাচ্চাদের কাছে চলে যায়। এই লোকের কাছে অদ্ভুত সব ভালোবাসার নিয়ম রয়েছে।
তপোবন তার ফ্রক ঠিক করে সাথে করে আনা একটা কলা বাড়িয়ে দিল। রূপকথা সেটা খেতে লাগল। তন্মধ্যেই তপোবনের ফোন বেজে উঠল।
এত রাতে নিঝামের ফোন দেখে সে ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেল।

-হ্যাঁ খালামনি বলো।
কিন্তু প্রেক্ষিতে ভেসে আসল নিঝামের উন্মাদের মতো আহাজারি। সে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
-ত…তপো…তপোবন ওয়া..ওয়াহেদ কথা বলছে না তপোবন। ওয়াহেদ আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। ওর হঠাৎ বুকে ব্যথা হয় আর ও কাতরাতে কাতরাতে মেঝেতে পড়ে যায়। কিন্তু ও আর চোখ খুলছে না তপোবন। শ্বাস ও নিচ্ছে না। কিছু করো…আমার ওয়াহেদের কিছু হয়ে যাবে। ও মরে যাবে। ও আমায় ছেড়ে চলে যাবে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬১

তপোবন স্তব্ধ হয়ে গেল তার কথায়। কর্নকুহরে প্রদাহ সৃষ্টি করল ‘ শ্বাস ও নিচ্ছে না’ বাক্যটি। ভেসে উঠল সকালের সেই মলিন দুঃস্থ, অসহায় মুখটি। বিছানায় শায়িত রূপকথার দিকে এক পলক চেয়ে তপোবন আচমকাই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। রূপকথা হতভম্ব হয়ে গেল তাকে ছুটতে দেখে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here