Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (২)
তোনিমা খান

পনেরো দিন বাদে ঈদ-উল-আযহা। ঈদের ঠিক দু’দিন বাদে মৌনতার চতুর্থ কেমো। মাঝে থাকা সময়টুকু তার শরীর পরবর্তী কেমোর জন্য প্রস্তুত করার জন্য দেয়া হয়েছে। এই সময়টুকুর মাঝে সে কোনো ভীড়, লোকসমাগমে যেতে পারবে না যেখানে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ডক্টর খুব জোর দিয়ে বলেছেন, শেষ মুহূর্তে এসে কোনোভাবেই কোনো রিস্ক নেয়া যাবে না।
বিয়ে নিয়ে এরোজের অন্তঃস্থলে থাকা অজস্র উন্মাদনা সেখানেই থমকে যায়। শেষ সময়ে এসে সে কোনোভাবেই কোনো রিস্ক নিতে পারবে না। সাতটা বছর অপেক্ষা যখন করতে পেরেছে আরো সাত মাস অনায়াসেই সে অপেক্ষা করে নেবে। তবুও মানুষটা সুস্থ হোক, তার হোক।
সমুদ্রের শীতল পানি পালাক্রমে উত্তাল বেগে এসে রুগ্ন পা দুটি ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথেই দেহে মৃদু কম্পন দেখা গেল। সামারটাইম হলেও প্রায়শই তাপমাত্রা ফল করে। আজ দুপুরে যতটাই গরম ছিল, সন্ধ্যার পর ঠিক ততটাই ঠান্ডা আবহাওয়া।
মৌনতা বিচের পাড় থেকে এক পা দূরে সরে আসতেই তার পাশে এসে কেউ দাঁড়াল।
বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা ঘাড় কাত করে এক পলক চাইল আনির গম্ভীর, মলিন মুখপানে। পুনরায় দৃষ্টি রাখল আবছা আলোয় থৈ থৈ সমুদ্রপানে।

– মন খারাপ, আনি?
আনি ঘাড় কাত করে চাইল ক্যান্সার নামক মরণব্যধী রোগে আক্রান্ত এক নারীর বিদীর্ণ বিদঘুটে চেহারার পানে। তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করল,
– এরোজ তোমায় কেন ভালোবাসে? তোমার মাঝে কী আছে?
– তার কাছেই জিজ্ঞেস করো।
মৌনতা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল।
– এরোজ কখনো তার ব্যক্তিগত বিষয়ে কাউকে কৈফিয়ত দিতে পছন্দ করে না।
– এটা তার একটা চমৎকার গুণ! আমারো এটা ধারণ করা উচিৎ, এমনকি তোমারো। কারোর ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক না গলানো আর কাউকে নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ে না বলা—এই দুটো গুণ-ই আমাদের ব্যক্তিত্বে থাকা উচিত।
– তুমি আমায় জ্ঞান দিও না। নিজের দিকে চেয়ে দেখো। তোমার মাঝে কোনো সৌন্দর্য নেই। তুমি ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মা। আর তোমায় কঙ্কালের মতো দেখাচ্ছে। হাড় ব্যতীত কিছু নেই। তুমি কোনোভাবেই এরোজকে ডিজার্ভ করো না।

এই কথাগুলো এমনি সময় মৌনতাকে আঘাত দিলেও অদ্ভুতভাবে তাকে আজ একটুও আঘাত দিতে পারল না। কোনো এক অদ্ভুত শক্তি কাজ করছিল তার মাঝে। কেননা তাকে কেউ সব সৌন্দর্যের উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসে। সেখানে সৌন্দর্যের দোহাই দিয়ে যোগ্য অযোগ্য প্রমাণ করা অসম্ভব।
সে স্মিত হেসে এক পা এগিয়ে গিয়ে আবার সমুদ্রের পানিতে পা ডুবিয়ে দিল। ধিমি কণ্ঠে বলল,
– Maybe I don’t deserve him. But I’m his only desire.
ব্যস মৌনতার অতটুকু দৃঢ় কণ্ঠে আনির সব উদ্বেগ অস্থিরতা মিলিয়ে গেল। এরোজ কখনোই তাকে প্রশ্রয় দেয়নি। আজ মনে হলো, এরোজ সত্যিই তার হাতের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। আনি অসন্তোষের সাথে নিজেকে দেখে। বাঙালি ছোঁয়া আর বিদেশি ছোঁয়ায় অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী একজন মেয়ে সে। অথচ তার এত সৌন্দর্য হেরে গেল একজন ক্যান্সার রোগীতে আক্রান্ত বিশ্রী সৌন্দর্যের নারীর কাছে। রাগে দুঃখে ফুঁসে উঠে আনি গটগট করে চলে গেল। অদূরে বেঞ্চের কাছে আনির পরিবার, নিশাত খালামনির পরিবার সহ আরো অনেক পরিচিত প্রবাসীরা হৈ হুল্লোড়ে করছে। মূলত প্রচন্ড গরমের কারণেই তারা সকলে নিকটস্থ বিচের পাড়ে বারবিকিউ পার্টির অ্যারেঞ্জ করেছিল। কিন্তু আঁধার নামতেই প্রকৃতিতে অদ্ভুত শীতলতাও নামতে শুরু করেছে।

– মৌন?
মায়ের ডাকে মৌনতা চকিতে ফিরে তাকালো। পড়নে পপকর্ন কাপড়ের ফ্রক আর ঢিলেঢালা প্যান্ট আর হিজাব। সে ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
– জি আম্মা?
– এগুলো কী?
মা ঠিক কী জিজ্ঞাসা করছে তা বুঝতে সময় লাগল না মৌনতার। মাসুমা বেগম তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। মেয়ের মুখপানে চেয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
– এগুলো কী করছিস?
– যেটা বহু আগে করা উচিৎ ছিল সেটাই করছি, আম্মা।
মাসুমা বেগমের চোখে বিস্ময়।
– তোর কাছে এটা উচিৎ মনে হচ্ছে? আমি সবসময় জানতাম এরোজের মনে অন্য কিছু চলে। কিন্তু তাই বলে তুই? তুই ওকে কোন জ্ঞানে প্রশ্রয় দিচ্ছিস?
– কারণ এই পৃথিবীতে সেই একমাত্র শক্তিশালী মানুষ যার কাছে থাকলে নায়েলকে কোনো দুঃখ স্পর্শ করতে পারবে না।
মৌনতা টলটলে চোখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল। মাসুমা বেগম অবোধ কণ্ঠে বললেন,

– এটা শুধুই নায়েলের জন্য?
– নাহ।
– তবে?
মৌনতা স্মিত হেসে বলল,
– আমার মতো অর্ধমৃত, বিশ্রী দেখতে একটা মানুষের জন্য কেউ সাত বছর যাবৎ চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছে, আম্মা। এখনো অপেক্ষা করে যাচ্ছে। আমি একটু সুস্থ হলে তার মুখে এমন হাসি থাকে যেন তার যন্ত্রণা কমেছে।
এত বছর পর তার ভাগ্য আজ সহায় হলেও আমার জীবন সহায় হবে কি-না আমি জানি না। কিন্তু জীবনের এক শেষ লহমাটুকু তার নামে লিখে দিলে সে যদি সুখী হয় তবে আমি তাকে সুখী করব। কারণ সে আমার পাশে সেই সময় ছিল যখন আমি সবচেয়ে বেশি নিঃস্ব আর বিপদগ্রস্ত ছিলাম। আমায় সেই ঋণটুকু পরিশোধ করতে হবে।
– তাই বলে সিকদার পরিবারের পুরুষকে? যেই বাড়ির আরেক পুরুষ তোকে শেষ করে দিয়েছে?
মৌনতা ম্লান হাসল। বলল,

– তখন আবেগ দিয়ে মানুষ চিনতাম। আর এখন অভিজ্ঞতা দিয়ে। এবার আর ভুল হবে না মানুষ চিনতে। কিন্তু জীবনকে চিনতে ভুল হতেই পারে।
মৌনতা ভাবুক হলো। জীবন কী সত্যিই মৃত্যু উপহার দিয়ে মৌনতাকে ভুল প্রমাণিত করবে না-কি জীবন উপহার দিয়ে জীবনকে নতুন করে জানার সুযোগ দেবে? কে জানে? মাসুমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়ে এখন সেই বয়সে নেই যে দু’টো চড় দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন। তিনি বললেন,
– যেমন তোর ইচ্ছা।
ওয়েস্টার সয়া সস,টমেটো সস সহ আরো দুই ধরণের সস নিয়ে ততক্ষণে বিচে পৌঁছায় নিশান্ত, এরোজ। এরোজের কাঁধে বরাবরের ন্যায় আরামপ্রিয় নায়েল বসে আছে। বিচে আসতেই সে খেলার কিছু সঙ্গী পেল। তাদের পেছনে ছুটতে লাগল। এরোজ এগিয়ে যায় অদূরে একাকী বেঞ্চিতে বসে ঝিমুতে থাকা অবয়বের দিকে। নিঃশব্দে পাশে গিয়ে বসতেই দেখল মৌনতা গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
– কী হলো শরীর খারাপ করছে? নাকি শীত করছে?
মৌনতা চমকে ফিরে তাকালো। ধাতস্থ হয়ে বলল,

– আপনি? একটু শীত করছিল। এখানকার বাতাস অনেক ঠান্ডা।
এরোজ হাত বাড়িয়ে নারীটির হাত ছুঁয়ে দিল। ঠান্ডায় জমে আছে। সে নির্বিকারভাবে নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো হাত দুটি। অনবরত ঘষতে ঘষতে মিনিটের মাঝেই হাত দুটো গরম হয়ে উঠল। নিশান্তকে হাঁক ছেড়ে বলল,
– পাশের মল থেকে এক জোড়া শকস নিয়ে আয়।
নিশান্ত ভাইয়ের বাধ্যগত সেবক। সে দশ‌ মিনিটের মধ্যে শকস নিয়ে আসে। এরোজ হাঁটু গেড়ে বসে শকস পড়িয়ে দিয়ে আবার হাত দুটো গরম বানাতে লাগল। তখুনি দৃষ্টি স্থির হয় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নারীটির পানে। এরোজ ভ্রু নাচালো,

– কী?
মৌনতা মুখ ফিরিয়ে নিলো।
– কিছু না।
– বাসায় যাবেন নাকি আরেকটু থাকবেন?
এরোজের প্রশ্নে মৌনতা বলল,
– আরেকটু থাকি। এখানে ভালো লাগছে।
– তবে খালামনিদের সাথে চলে যাবে। আনির থেকে দূরে থাকবেন।
– কেন আপনি কোথায় যাবেন?
– অফিসে যেতে হবে।
-এই রাতে?
– হুম, প্রি ফ্লাইট ইন্সপেকশন আছে।
– এটা কী?
– প্লেন উড্ডয়নের আগে প্লেনের কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কি-না সেটা চেক করা।
– ওহ! আপনি এই কাজ করেন?
– আমার আরো অনেক কাজ আছে। নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
– আপনি তো আগে কাজ করতেন না। এখন কেন করেন?
– কাজ না করলে বউ বাচ্চা খাওয়াবো কী করে?
পুরুষটির নির্লিপ্ত কণ্ঠে মৌনতা আড়চোখে চাইল। চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরে যায়। এরোজ হাসল তার মুখে ওঠা অদ্ভুত সুন্দর লাজ দেখে।

এরোজ একটা বারবিকিউ খেয়ে চলে গেল অফিসে। মৌনতা বাড়ি ফিরে নায়েলকে ঘুম পাড়াল। এক ঘন্টা লেগে গেল তাকে ঘুম পাড়াতে। সে পুরোদস্তুর অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে তার ছোট পাপার মাঝে। সে কাছে থাকলে সব কাজই খুব সহজে মিটে যায়। কিন্তু যখন না থাকে তখন তাদের বেগ পোহাতে হয়।
নামাজ শেষে তসবিহ পড়তে পড়তে মৌনতা নিচে নামলো। ওয়ার্ম লাইটের আবছা আলোয় আলোকিত বিলাসবহুল বাড়িটিতে যত্নের ভারী অভাব, সুখের ছোঁয়ার আনাগোনা নেই। অসুস্থতাকে খানিক উপেক্ষা করল। দীর্ঘ সাড়ে সাত মাস বাদে চিরচেনা হারিয়ে যাওয়া ওই ঘরকুনো সংসারী মেয়েটির আদল ফুটে ওঠে তার মাঝে। কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে মৌনতা গুটি গুটি কদমে অগোছালো ঘরটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সুসজ্জিত করে তুলল। যেখানে যেটা উপযুক্ত ভাবে সেজে থাকা উচিৎ সেটাকে সেখানে রাখল। পুরো ঘরটি ঘরনীর ছোঁয়া পেতেই নতুন সাজে সেজে উঠল।

ঘর গুছিয়ে মৌনতা রান্নাঘরে ঢুকল। সে স্বভাবতই একজন সংসারী, ঘরকুনো নারী। কিন্তু তার এই স্বভাবটুকুকে সবাই সম্মান করে না। সবার কাছে দূর্বল, ন্যাকা, ব্যাকডেটেড লাগে। তবুও সে চাইলেই বদলাতে পারে না নিজের এই স্বভাবটুকু। অন্তরালে ইচ্ছে জাগত, কেউ কী তার এই স্বভাবটুকুর জন্য তাকে ভালোবাসতে পারত না? কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কী অদ্ভুত অভিপ্রায়! কেউ তার এই স্বভাবটুকুর জন্যই তাকে ভালোবেসেছে, পুরো পৃথিবীর উর্ধ্বে গিয়ে গিয়ে ভালোবেসেছে। মৌনতার মুখে হাসি ফুটে উঠল। পুরো কিচেন ঘুরে দেখে প্রয়োজনীয় সবকিছু নামালো। বহুমাস বাদে সে খুব যত্ন করে রান্না করল। কিন্তু ভুল মানুষের জন্য নয়, সঠিক মানুষের জন্য।
এরোজ ফিরল রাত বারোটা নাগাদ। নিঃশব্দে দরজা আঁটকে উপরে যেতে নিলেই চমকালো সোফায় গুটিয়ে শুয়ে থাকা মৌনতাকে দেখে। এরোজ ভ্রু কুঁচকালো দ্রুত এগিয়ে গেল। শরীর খারাপ লাগছে নাকি!
এরোজ নীরবে গিয়ে সোফার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল। চোখদুটো ছলছল করে উঠল রুগ্ন দেহটি দেখে। ঊনত্রিশ বছর বয়সী এক নারী কিন্তু ওজন মাত্র সাতাশ কেজি! চেহারার দিকে তাকাতে তার ভয় করে। সে তো এই নারীটির এমন ভয়ঙ্কর দশা দেখে অভ্যস্ত নয়। নিজের করে পাক বা না পাক, সবসময় চেয়েছে মৌনতা যেখানেই থাকুক যার সাথেই থাকুক ভালো থাকুক। কিন্তু…
ক্রোধ, বেদনায় কাতর হয়ে আসল দেহ। সে ডাকল,

– মৌন?
বার দুয়েক ডাকতেই মৌনতা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে এরোজকে দেখে ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
– এসেছেন?
পরপরই ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
– ক্ষিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? আসুন খাবার দেই।
মৌনতা মাথার হিজাব ঠিক করতে করতে খাবার ঘরের দিকে চলে গেল। ঠিক যেন দায়িত্ববান এক স্ত্রী। এরোজ অবাক হয়ে তার পিছু পিছু গেল। মৌনতা খাবারের উপর থেকে ঢাকনা সরিয়ে দিয়ে বলল,
– নিন, বসুন।
গরম গরম খিচুড়ি আর ঝাল ঝাল গরুর গোশত দেখে এরোজের অন্তঃস্থল যতটা না পুলকিত হলো তার থেকেও বেশি পুলকিত হলো মৌনতার ক্ষুদ্র যত্নটুকুতে। কবে বা কখন তার জন্য কেউ এতটা যত্ন করেছিল তার মনে নেই। সে জিজ্ঞেস করল,

– এগুলো কে রান্না করেছে?
– আমি।
– আপনার আগুনের কাছে আসা বারণ।
– ইলেক্ট্রিক চুলায় রান্না করেছি।
– এগুলো সত্যিই আপনি রান্না করেছেন?
এরোজ পুনরায় মৃদু অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
মৌনতা বিরক্ত হয়ে বলল,
– কেন আমি কী রান্না করতে পারি না?
– পারেন, কিন্তু এগুলো কার জন্য রান্না করেছেন?
সামান্য খাবার নিয়ে একের পর এক জেরা করায় মৌনতার বিরক্তি এবার রাগ পরিণত হলো। সে প্লেট আঁকড়ে ধরে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– আপনি খাবেন না-কি উঠিয়ে রাখব?
মৌনতার নাক কুঁচকানো দেখে এরোজ হেসে উঠল গা দুলিয়ে। শার্টের উপর থাকা পাতলা ক্যাজুয়াল কার্ডিগানটা খুলতে খুলতে বলল,

– খাবেন না-কি খাইয়ে দেব? এটাও তো বলতে পারতেন! আমার জন্য রান্না করেছেন, এটাও তো বলতে পারতেন। কিন্তু আপনার তো এতটুকু সহানুভূতি হয় না আমার উপর। পাষাণ নারী!
বলেই এরোজ রান্নাঘরে ঢুকল। যেতে যেতে বলল,
– বসুন, দশ মিনিট পর খাচ্ছি।
মৌনতা কোমরে হাত দিয়ে দেখতে লাগল লোকটির কর্মকাণ্ড। এরোজ কিচের এপ্রোন পরে প্যানকেকের ডো বানাতে লাগল। বলল,
– রাতের খাবার কখন খেয়েছেন?
– দশটার সময়।
– মাঝে আর কিছু খাননি?
– নাহ।
– আপনার একটু পর পর খেতে হবে সেটা মাথায় থাকে না?
এরোজ খুব দক্ষ হাতে ব্যাটার বিট করতে করতে জিজ্ঞাসা করল।
– বমি আসে।
যদিও বমির প্রকোপ এখন বেশ খানিকটা কমেছে।
এরোজ নিশ্চুপ থাকল। মৌনতা রান্নাঘরে ঢুকে তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। প্রথমে দেখেই বুঝেছে প্যান কেক বানাচ্ছে। লোকটার হাতের বানানো প্যান কেক দারুণ সুস্বাদু!

– আপনি প্যান কেক বানানো শিখেছেন কার থেকে?
– ইউটিউব।
– আপনি সব রান্না পারেন?
– নাহ।
– তবে?
– তবে কী?
– এই যে আমার খাবার রান্না করেন আর নায়েলের জন্য রান্না করেন?
এরোজ এক ঝলক দৃষ্টি ফেলে বলল,
– শুধু আপনার আর নায়েলের খাবার ই রান্না করতে পারি। আর কিছু পারি না।
– তো এই প্যান কেক কে খায়?
– নায়েলের পছন্দের খাবার এটি। আপনি জানেন না?
– আমার জানার কথা? আপনি তো ষড়যন্ত্র করে আমার মেয়েটাকে আমার দুঃসম্পর্কের মেয়ে বানিয়ে দিয়েছেন!
এরোজ সরব কপাল কুঁচকে তাকালো।
– ষড়যন্ত্র?
মৌনতা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

– আলবাৎ ষড়যন্ত্র। আপনি ওর সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছেন যে ও এখন আপনাকে ছাড়া কিছু বোঝে না। আপনার অভ্যাস নিজের মধ্যে আয়ত্ত করছে, আপনার পছন্দের খাবার ও খুব মজা করে খায়।
সহসা এরোজের কুঁচকানো কপাল মসৃণ হলো। পুনশ্চ কাজে মনোযোগ দিয়ে বাঁকা হেসে আওড়ালো,
– দ্যাটস মাই ডটার!
মৌনতা কিয়ৎকাল থামলো সম্বোধনটি শুনে। নিজমনে দুইবার আওড়ালো।
– দ্যাটস মাই ডটার…দ্যাটস মাই ডটার…নো দ্যাটস আওয়ার ডটার। হ্যাঁ তাদের মেয়ে। যেখানে কোনো কলুষিত সত্তার স্থান নেই। মৌনতা প্রসন্ন চাহনিতে দেখে নিলো ব্যস্ত লোকটিকে।
– এখন এগুলো কেন বানাচ্ছেন?
– রাতে নায়েলের ঘুম ভেঙে গেলে খাবে। প্যান কেক খুব মজা করে খায়।
মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। পুরুষ মানুষ এমন ও হয়? তারা তো টাকা রোজগার আর সন্তান জন্ম দিয়েই খালাস। তারা মহৎ কিছু করে ফেলেছে, এখন সন্তান লালন পালন করা স্ত্রীদের কাজ। সন্তান রাতে উঠলে কী খাবে এই চিন্তা তো কেবল মায়েদের ই। পুরুষ মানুষ এত খুঁটিনাটি চিন্তা করে না-কি?
– আর এখন আপনি খাবেন।

এরোজের কথায় ভাবুক মৌনতা ধ্যানচ্যূত হলো। তার ও প্যানকেক ভালো লাগে। কিন্তু সেটা ম্যাপল সিরাপের সাথে। আর নায়েল খায় চকলেট সিরাপের সাথে্ ঠিক পাঁচ মিনিট পরে এরোজ খাবার টেবিলে একটা সুন্দর প্লেটার রাখল।
প্যান কেক এর সাথে ম্যাপল সিরাপ আর উপরে কিছু রাস্পবেরি আর ব্লু বেরি সেজে আছে। প্লেটারটির সৌখিন রূপ দেখেও খাওয়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করে উঠল। সে চেয়ার টেনে বসে পড়ল খেতে।
এরোজ ও তার সামনে চেয়ার টেনে বসে খিচুড়ি আর মাংস তুলে নিলো প্লেটে।
খাবারটি নিজের সামনে রাখতেই এরোজ কেমন মিইয়ে গেল। এটা তার জন্য স্বপ্ন ছিল। তার প্রিয় মানুষটি তার স্ত্রী হবে, তার ঘরে থাকবে, তার জন্য রান্না করে অপেক্ষা করবে আর তারা একসাথে খাবার খাবে।
এরোজকে থমকে যেতে দেখে মৌনতা নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞাসা করল,
– কী হলো? বসে আছেন কেন? খাবার পছন্দ হয়নি?
মৌনতার কণ্ঠ শঙ্কিত! সে যে খুব যত্ন করে রেঁধেছিল, তবে কী পছন্দ হয়নি? কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে এরোজ ক্ষীণ স্বরে বলল,

– মৌন, এটা স্বপ্ন নয়তো? ভেঙে যাবে না তো?
মৌনতার দেহ ম্লান হয়ে আসল এরোজের কণ্ঠে চাপা ভয় ছিল। সে আকুতিভরা ধূসর দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখল। শুকনো ঢোক গিলে বড্ড সাহসী কণ্ঠে বলল,
– এটা স্বপ্ন নয়, ভেঙে যাবে না।
এরোজ আশ্বস্ত হলো। চোখ ছলছলে, ঠোঁটে এক ফালি হাসি নিয়ে খিচুড়ি মুখে তুললো। আর বাচ্চাদের মতো করে জেদি কণ্ঠে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
– স্বপ্ন নয়। এটা স্বপ্ন নয়। ভেঙে যাবে না। আমি ভাঙতে দেবোই না।
মৌনতার গলা থেকে আর খাবার নামে না সম্মুখের পুরুষটির অদ্ভুত উন্মাদনা দেখে। অন্তঃস্থল প্রশ্ন করেই বসল, যদি স্বপ্ন ভেঙে যায়? তবে এই ভঙ্গুর মানুষটার কী হবে? এই মানুষটা যে একটু ভালোবাসা, যত্নের জন্য কাতর হয়ে আছে।

কানাডার পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে নায়েল। এখানকার অভ্যাস, ভাষা, দক্ষতা সব আয়ত্তে নিয়ে নিচ্ছে চাইল্ড কেয়ারের একাধিক ভিন্নধর্মী শিশুদের সাথে চলতে চলতে। তার সময় খুব প্রাণবন্ত কাটলেও আজ তার মন ভীষণ বিষন্ন!
ঘরময় নায়েলের কান্নার স্বর আরো তীব্রবেগে আন্দোলিত হলো। সদ্য গাড়ি গ্যারেজে রাখা এরোজ সেই কান্নার শব্দে দ্রুত কদমে ঘরে ঢুকল। মৌনতা রাগান্বিত স্বরে তাকে কিছু বলছে। সে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চা মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলো। বিচলিত কণ্ঠে বলল,
– কী হয়েছে? ওকে বকছেন কেন?
মৌনতা জবাব দিল না। নিশান্ত বলল,
– ভাই, চাইল্ড কেয়ারে সিজনাল ফেস্টিভ্যাল আগামী সপ্তাহে। প্লে বেজড লার্নিং —কীভাবে বাবা মায়েরা সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠবে সেই পারপাজে।
– তো?
এরোজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল। নিশান্ত হে হে করে হেসে বলল,

– বাবা হওয়া কঠিন ব্রো। এই ফেস্টিভ্যালে বাবা মায়েদের তার বাচ্চার সাথে খেলায় আর ডান্সে অংশ নিতে হবে। প্রথম হবে ব্যালে ড্যান্স। সেখানে মেয়ের সাথে তার বাবাকে ডান্স করতে হবে। এরপর বাবা মা সন্তানের একসাথে একশো মিটার দৌড় হবে। সর্বশেষ বাবা মাকে বাচ্চার সাথে নির্দিষ্ট সময়ে কিছু ছবি আঁকতে হবে। আর এই তিনটা খেলায় যেই পরিবারের স্কোর বেশি হবে সেই পরিবার জিতবে।
– কী সব উদ্ভট খেলা!
এরোজ চাপা স্বরে বিড়বিড় করলে নায়েল সরব ক্রন্দনরত কঠিন চোখে তাকালো। আরো জোরে কেঁদে উঠে বলল,
– উটভট বলছ কেন? এগুলো ভালো খেলা। আমি খেলব।
এরোজ জিভ কামড়ে বোকাসোকা হাসল। নায়েলের গালে চুমু দিয়ে বলল,
– আরে আরে তাতে কান্না করার কী আছে? ছোট পাপা আছি না? ছোট পাপাও কখনো কিছুতে হারিনি, আমার নায়েল ও কিছুতে হারবে না। আমরা খেলব।
– সত্যি?
নায়েল কান্না থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

– একদম সত্যি।
– তিন্তু, আমাল টিচাল বলেছে আমাল নাকি বাবা মা নেই। আমি খেলতে পালব না।
বলতেই নায়েলের চোখে আবার জল জমল। এরোজ চমকালো তার এহেন কথায়। চোখেমুখে রাগ ফুটে উঠল তৎক্ষণাৎ। সে গর্জে উঠে বলল,
– কোন ইডিয়ট এমন কথা বলেছে? কাল আমায় দেখাবে। ওটার চোখ গুহা থেকে বের করে এনে দেখাব আমার নায়েলের বাবা মা পরিবার সব আছে। আমার নায়েল খেলবে, একশবার খেলবে।
মৌনতা আড়চোখে তাকালো জেদি দুই অবয়বের পানে। এই লোকটা তার মেয়েটাকে নিজের মতো বানাচ্ছে। যা করবে তো করবেই! একটা ষাঁড় গরু আর তার বাছুর! একদম এক জেদ!
পরদিন সকাল সকাল দু’জনের জেদের কারণে মৌনতার ঠাঁই হলো নায়েলের চাইল্ড কেয়ারে। এরোজ দাঁতে দাঁত চেপে নারী শিক্ষকের হাতে বিয়ের কার্ডটি ধরিয়ে দিয়ে বলল,
– শিঘ্রই আমাদের বিয়ে। আপনি কিন্তু আসবেন ই আসবেন। এই যে ওর মা আর আমি বাবা। এখন নিশ্চয়ই ও ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে পারবে?
মোটা, ফর্সা সোনালী চুলের নারীটি কার্ডটি দেখেই উল্লাসে মেতে উঠল। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে অভিনন্দন জানিয়ে বলল,

– ওহ মিঃ এরোজ! কংগ্রাচুলেশন বোথ অফ ইউ। আমি খুব খুশি হয়েছি আপনাদের দেখে। নিশ্চয়ই আপনাদের বিয়েতে আসব আমি। এমনিতেও আমি বাঙালিদের খুব ভালোবাসি। তারা খুবই অতিথিপরায়ণ হয়।
পরপরই বললেন,
– নায়েল খেলতে পারবে, অবশ্যই খেলতে পারবে। আপনি একটা কাজ করতে পারেন, নতুন জীবন শুরু করার খুশিতে বাচ্চাদের কিছু ডোনেট করতে পারেন এতে জিসাস খুব খুশি হয়।
এরোজ কপাল কুঁচকে নিলো। ব্যবসা কাকে বলে মহিলাকে দেখে শেখা উচিৎ। কীভাবে টাকা নেয়ার উপলক্ষ্য বানাতে হয় তা কেই বা ভালো পারে ওনার থেকে। নায়েলকে এখানে ভর্তি করানোর পর থেকে কত টাকা যে নিলো তার থেকে! কিন্তু তার গায়ে লাগল না, যেহেতু বাচ্চাদের ওয়েলফেয়ার এর জন্য ডোনেট করতে বলেছে। আর এখানে তার সুখ ও তো মিশে আছে। সে বিয়ে উপলক্ষ্যে বড় অংকের একটা এমাউন্ট ডোনেট করল। এতে ভদ্রমহিলার খুশির অন্ত ছিল না।
এরপর শুরু হলো আরেক পরীক্ষার প্রস্তুতি। ব্যালে ডান্স! চাচা ভাতিজি একজন ও ব্যালে ডান্স পারে না। নায়েলকে সুন্দর সাদা রঙের একটা ব্যালে ডান্সের পোশাক পরিয়ে তখন দু’জন প্রাকটিস করছে।
টিভি দেখে দেখে বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে নায়েল এরোজের আঙুল ধরে একপাক ঘুরতেই সে ঠাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। আর এরোজ বোকার মতো হাত পেতে বসে ছিল। নায়েল তেতে উঠল,

– আলে তুমি আমায় এভাবে কোলে তুলে নেবে না? কী করেছ? তাকিয়ে তাকিয়ে আমার মুখ দেখছ কেন? সুন্দল কলে নাচো নয়তো জিততে পালবে না বোকা ছেলে!
এরোজ তৎক্ষণাৎ বিরোধ করে বলল,
– এই বোকা মেয়ে! তোমার না তিন পাক ঘোরার কথা ছিল? তুমি এক পাক ঘুরেই পড়ে গেলে কেন?
– আমি যখনি পলব তুমি তখুনি ধলবে, কিছু বোঝে না!
নায়েল কোমরে হাত দিয়ে বলল।
সোফায় বসে দু’জনের কান্ড দেখতে থাকা মৌনতা এবার নীরবতা ভেঙে ফিক করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে নায়েল আর এরোজ ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো। রেগেমেগে দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল,
– দিস ইজ ভেরি ব্যাড!

দু’জনের এহেন বিরক্তিমাখা কণ্ঠে মৌনতার হাসি কমার বদলে আরো দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে হাসতে হাসতে সোফায় শুয়ে পড়ল। দেহে আর শক্তি নেই বসে থাকার। এরোজ আর নায়েল ফুঁসতে ফুঁসতে আবার নাচ প্রাকটিস করতে লাগল এবং প্রতিবার নায়েল সময়ের আগে পড়ে যায় আর এরোজ ধরতে পারে না এই নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগে থাকে।
এমনি ঝগড়া করতে করতে সপ্তাহ কেটে গেল। সেদিন ছিল নায়েলের ফেস্টিভ্যাল। মৌনতা সহ পুরো পরিবার আশ্চর্য হয়ে গেল যখন ব্যালে ডান্স প্রতিযোগিতায় নায়েল আর এরোজ একবার ও ভুল করেনি। নায়েল যতবার পেছনে হেলে পড়েছে এরোজ ঠিক ততবার ভীষণ যত্নে তাকে বাহুডোরে আগলে নিয়েছে। কিন্তু তবুও দু’জনে অদক্ষ ছিল। তাদের প্রতিযোগী বিদেশি কাপলরা ব্যালে ডান্সে আরো অনেক বেশি দক্ষ ছিল।
দূর্ভাগ্যবশত প্রথম রাউন্ডে নায়েল আর এরোজের স্কোর সবচেয়ে কম আসল। তাতে নায়েলের মন খারাপ হয়ে গেল। আর এরোজের মন খারাপ হলো নায়েলের কান্না চেপে রাখা মুখটি দেখে। সে ছোট্ট পুতুলটিকে নারাজ হতে দেখতে পারে না। সে নায়েলের গালে চুমু দিয়ে বলল,

– এখনো দুই রাউন্ড আছে মা।‌ মন খারাপ করো না। আমরা পরের দুই রাউন্ডে ভালো করব। আমরাই জিতব।
– না, জিতব না। তিনটা রাউন্ডেই বেশি নাম্বাল পেতে হবে। আমলা পাইনি।
– কে বলেছে এই কথা? আমরা জিতে দেখিয়ে দেব সবাইকে, এসো।
পরবর্তী রাউন্ড ছিল ফ্যামিলি সমেত একশো মিটার দৌড়। সুবিস্তৃত রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ মৌনতা অন্য যুগলদের দেখে চিন্তিত হলো। মৌনতা বলল,
– আমি দৌড়াতে পারব না। একটু দৌড়ালেই আমার শরীর ছেড়ে দেবে। শুধু শুধু নায়েলের মন খারাপ হবে। তার থেকে বাদ দিন।
এরোজ নাকচ করে বলল,
– বাদ দেয়া যাবে না। আমাদের জিততেই হবে।
– আমি দৌড়াব কী করে?
– আপনাকে দৌড়াতে হবে না।
বলেই এরোজ হাঁটু গেড়ে বসল। নায়েলকে বলল,
– মা তুমি আমার পিঠে চড়বে। শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরবে ওকে? জিততে হলে একটুও আমার গলা ছাড়া যাবে না।

– ওকে ছাড়ব না। শক্ত করে ধরে রাখব।
সময় হয়ে এসেছে। নায়েল তড়িঘড়ি করে এরোজের পিঠে চড়ে শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরল। এরোজ মৃদু হেসে এবার কৌতুহলী মৌনতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো। মৌনতা চেঁচিয়ে উঠল,
– কী করছেন? গ্যালারি ভর্তি লোক।
– নো কম্প্রোমাইজ! এই প্রতিযোগিতা জিততেই হবে। আমার মেয়ে প্রথম কিছু চেয়েছে তা পূরণ করতেই হবে।
গ্যালারির সকলে অবাক চোখে তাকালো। অন্য প্রতিযোগীরাও। নিশান্ত আর নিভা চিৎকার করে উঠল আনন্দে! তারা উৎসুক এই ভিন্নিধর্মী প্রতিযোগিতা দেখার জন্য। বাঁশির সিটি পড়ল। সব পরিবার দৌড়াতে শুরু করল।
খেলাধুলা, শরীরচর্চা, দৌড়ে দক্ষ এরোজ নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুটলো প্রিয় মানুষদুটিকে নিয়ে। চোখেমুখে অদম্য দৃঢ়তা। সন্তানের ইচ্ছাটা পূরণ করতে না পারলে তার চোখে আবার জল আসবে।
মিনিটের মাঝেই উৎসুক গ্যালারিতে চিৎকার পড়ে গেল তথাকথিত স্ত্রী সন্তান নিয়ে ছুটতে থাকা পুরুষটি বিজয়ের লাল ফিতা ছুঁয়ে যেতেই।
নায়েল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল,

– ও মাই গড! পাপা আমলা জিতে গিয়েছি। ইয়েএএএএ
মৌনতা আশ্চর্য হলো, আপ্লুত হলো তাদের কাণ্ডে। ধড়ফড় করা বুক শিথিল হয়ে আসে এরোজ আর নায়েলকে একসাথে জড়িয়ে ধরে উল্লাসে লাফাতে দেখে। মৌনতা সেই লগ্নে জীবনের এক অন্য মানে খুঁজে পেল। তার জন্য সারাজীবন সুখ তো কেবল অতটুকুই ছিল। তার সন্তানের মুখের হাসি আর বাবার আদর। মৌনতা ছলছল নয়নে উল্লাসে ফেটে পড়া মেয়েকে দেখল।
সব প্রতিযোগীর বাবা মা তাদের এসে অভিনন্দন জানালো আর প্রশংসা করল তার অদ্ভুত কাণ্ডের।
তৃতীয় রাউন্ড ও এসে গেল ততক্ষণে। ছবি আঁকায় অদক্ষ এরোজ। মৌনতা কিছু ট্রাই করল কিন্তু তা আরো বিশ্রী! এরোজ পেন্সিল কামড়াতে কামড়াতে ভাবুক হলো। মন মস্তিষ্কে শুধু একটাই জেদ, তাদের জিততেই হবে। সে সাতপাঁচ না ভেবে কিছু আঁকতে শুরু করল। সময় ছিল ত্রিশ মিনিট। ত্রিশ মিনিট বাদ মৌনতা আর নায়েল ক্যানভাস পেপার চোখের সামনে তুলতেই আচমকা চেঁচিয়ে উঠল বিশালাকৃতির একটা অ্যারোপ্লেন দেখে। যার জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে একটি ছোট্ট মেয়ে আর তার মা। সেটি ছিল অবিকল কোনো প্লেনের প্রতিচ্ছবি।
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তার বিদ্যার সঠিক প্রয়োগ করেছিল বটে! যেখানে অন্যসব বাবা মায়েরা ফুল, গাছ বাড়ি, স্কুল এঁকেছিলেন সেখানে এরোজের আঁকা প্লেনটি ছিল একদম ভিন্ন আর পার্ফেক্ট। কোথাও কোনো খুঁত ছিল না। মাপ, ঝোপ, রঙ করা এতটাই নিখুঁত ছিল।

দুরুদুরু বুকে নায়েল আর এরোজ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে গ্যালারির এক কোনায় চুপটি করে বসে ছিল। গালে গাল ঠেকিয়ে দু’জন নিজেদের হেরে যাওয়ার লজ্জা, দুঃখ থেকে বাঁচাতে চাইছিল কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ অনেক বিজয়ী ঘোষণা করা হলো।
– দ্য উইনার ইজ নায়েল সিকদার এন্ড হার প্যারেন্টস।
নায়েলের নাম শুনতেই এরোজ আর নায়েল গ্যালারি ছেড়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল। উপস্থিত সকলে ভড়কে গিয়ে তাদের দেখল। মৌনতা উল্লাসে হাসতে হাসতেই কেঁদে ফেলল দু’জনকে জিততে দেখে।
জীবনে কিছু ঠুনকো মুহুর্ত কাউকে কতটা সুখ দিতে পারে তা কাঁদতে থাকা মৌনতাকে দেখে বোঝা যায়। মেয়েটি এমনি কিছু ঠুনকো ভিত্তিহীন সুখ আর আনন্দ চাইতো—যার কাছে তাদের চাওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু…সে এতদিনে এসে বুঝল সে ভুল মানুষের কাছে ভুলকিছু চেয়ে এসেছে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২

মৌনতা মুখে দু’হাত চেপে দীর্ঘক্ষণ কাঁদল। কিন্তু কেন কাঁদল তা জানা নেই।
আনন্দে কাঁদছিল নাকি এই সুখময় মুহুর্তগুলো হারিয়ে ফেলার ভয়ে কাঁদছিল? মৌনতা কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করে উঠল,
-হে আল্লাহ! আমি বাঁচতে চাই আমার নায়েল আর তার সুখের সাথে। এভাবেই জীবনের প্রতিটা প্রতিযোগিতায় একসাথে জিততে চাই। প্লীজ!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here