Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩
রিদিতা চৌধুরী

“আই’ম নট ইন্টারেস্টেড ইন হার!”
কথাটা ছুঁড়ে দিয়েই সৌহার্দ্য আবার স্টাডি ফাইলের পাতায় ডুবে গেল। কালি-কালো কলমটা ওর আঙুলে ঘুরছে, চোখ আটকে আছে হার্টের জটিল ভাস্কুলার ডায়াগ্রামে।
ভাইয়ের গলার বরফ-ঠান্ডা নির্লিপ্ততা শুনে আরবান ঢোক গিলল। ও সৌহার্দ্যকে চেনে। একবার ‘না’ বললে দুনিয়া উল্টে গেলেও সিদ্ধান্ত পাল্টায় না মানুষটার। তাই আর একটা শব্দও না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল। দরজা ‘ক্লিক’ করে বন্ধ হতেই সৌহার্দ্য এক সেকেন্ডের জন্য মাথা তুলল। দরজার ওপাশে তাকিয়ে কী যেন ভাবল, তারপর আবার ঝুঁকে পড়ল ফাইলের ওপর। আজ রাতে একটা ইমারজেন্সি ওটি। রোগীর হার্টের মেইন আর্টারি ফেটে যাচ্ছে। একটা ভুল মানেই সব শেষ। কলমের খসখস শব্দটাই এখন ঘরের একমাত্র আওয়াজ।

অন্যদিকে, কলেজের বারান্দা। ক্লাস শেষ হতেই বন্ধুদের আড্ডায় মেতেছে রিদি, সুমি, সায়েম আর পৃথা। সৌহার্দ্য ক্লাসে না আসায় যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল সবাই। সুমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যাক বাবা, বাঁচা গেল! ওই খাটাশ প্রফেসরটার ক্লাস ছিল না আজ।”
সায়েম চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে ফোড়ন কাটল, “আমার মনে হয় ব্যাটা রোজ বউয়ের সাথে ঝগড়া করে আসে। তাই মেজাজটা সবসময় তেঁতো।”
পৃথা আর সুমি হেসে গড়িয়ে পড়ল। রিদি চুপ। ওর ঠোঁটে হাসি নেই। সৌহার্দ্যের নাম শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে ওঠে। বলার মতো কিছু নেই, কিই বা থাকতে পারে নাম মাত্র স্বামী তার সেটা ও হয়তো আর কিছু দিন।
পৃথা হঠাৎ গলা নামিয়ে একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “আরে না ব্যাটা একদম পিওর সিঙ্গেল।”
তিন জোড়া চোখ একসাথে পৃথার দিকে। পৃথা থতমত খেয়ে আমতা আমতা করল, “আরে ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন? ব্যাটা যা হ্যান্ডসাম! প্রথম দিন একটু ক্রাশ খেয়েছিলাম। তাই উইকিপিডিয়া চেক করছিলাম আর কি!”
উইকিপিডিয়া শব্দটা রিদির কানে ছুরির মতো বিঁধল। বুকের ভেতরটা ভার হয়ে এলো। মনে মনে বলল, ‘কেন কষ্ট পাচ্ছি আমি? ওই লোক তো আমাকে চায় না। না চাওয়া মানুষটার জন্য কষ্ট পাওয়াটাই কি নিয়ম বলেই একটা তাচ্ছিল্য পূণ্য হাসি দিলো!’
ওর ভাবনার মাঝে সুমি রিদির পিঠে আলতো চাপড় দিল, “কোথায় হারিয়ে গেলি? চল ফুচকা খাবো।” হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল।

কলেজ গেটের সামনে তেঁতুল-গোলার টক-ঝাঁঝালো গন্ধ। প্লাস্টিকের টুলে বসে চারজন ফুচকা মুখে পুরতে পুরতে, গল্পে মশগুল। হঠাৎ পেছন থেকে বজ্রের মতো গমগমে কণ্ঠ, “হেই ইউ! চার চোখ! কাম হেয়ার!”
চারজন চমকে ঘাড় ঘোরালো। রোদের ঝলসানো আলোয় সৌহার্দ্য দাঁড়িয়ে। কালো শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট। শার্ট ইন করা, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখে কালো সানগ্লাস। এক হাত প্যান্টের পকেটে। ফর্সা মুখটা ঘামে চিকচিক করছে, চোয়াল শক্ত।
সায়েমের গলা শুকিয়ে গেল, “আ…আমাকে স্যার?”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি ঝরালো, “ইয়েস। তুমি ছাড়া এখানে চার চোখ আর কেউ আছে?”
রিদি নাক-মুখ কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মনে বিড়বিড় করল, ‘বেয়াদব, অহংকারী লোক। মানুষের নাম ধরে ডাকলে তার জাত চলে যায় নাকি!’
সায়েম আমতা আমতা করে এগিয়ে গেল, “কিছু বলবেন স্যার?”
“তো কিছু না বললে কি তোমার সুন্দর চেহারা দেখার জন্য ডাকছি?” সৌহার্দ্যর গলায় খোঁচা। তারপর একটা মোটা ফাইল সায়েমের দিকে বাড়িয়ে দিল। “এটা নাও। অফিস রুমে ডা. সুজন হায়দার আছে। ওকে দিবে। বলবে সৌহার্দ্য স্যার দিয়েছে। গো অ্যাহেড!”
সায়েম দৌড় দিতেই সৌহার্দ্যর চোখ গেল রিদির ওপর। ঠোঁটে লেগে থাকা তেঁতুল দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল।

“ইউ বোচা নাক। এসব খাচ্ছ কেন? আনহেলদি ফুড পয়েজনিং হবে।”
রিদির মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। তেড়ে গিয়ে বলল, “আপনার সমস্যা কি? আমি কি খাবো সেটা আপনিই ঠিক করে দিবেন নাকি?”
“হেই রুড গার্ল! হ্যাভেন্ট ইউ লার্নড এনিথিং একসেপ্ট আর্গুইং ব্যাক?” সৌহার্দ্যর গলাও চড়ে গেল।
রিদি পাল্টা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই সৌহার্দ্য একবার ওকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল, “স্টুপিড।” বলে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। কালো শার্টের পিঠটা রোদে জ্বলছিল।
সৌহার্দ্য মিলিয়ে যেতেই রিদি দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “ইংরেজর বাচ্চা! ঘরের বউয়ের খবর নেই, বাইরে মেয়েদের নিয়ে চুলকানি। লুচ্চা ডাক্তার!”
সুমি রিদির পিঠে হাত রাখল, “রিদি, এই ডাক্তার তোর পেছনে পড়ে আছে কেন রে?”
পৃথা আঙুল দাঁতে ঠেকিয়ে বলল, “আসলেই তো। আমাদের কিছু বলল না, তোকেই কেন বলল? ডাল মে কুচ কালা হ্যায়!”
রিদি ওদের ভাবনার মাঝে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বলল, “তোরা ভাবতে থাক। আমার লেট হয়ে যাচ্ছে। আমি গেলাম ভাই।” আর পেছনে না তাকিয়ে হাঁটা দিল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। রিদি যখন বাড়ি ঢুকল, পুরো বাড়ি নিঝুম। সবাই খেয়ে-দেয়ে হয়তো ঘুম দিয়েছে। রিদি পা টিপে টিপে হাঁটল। ছোট মার সামনে পড়তে চায় না। সামনে পড়লে মহিলার ভাঙ্গা রেকর্ড চালু হয়ে যাবে!
ঘরে ঢুকে ব্যাগটা ছুঁড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখ লেগে আসছিল। এমন সময় হঠাৎ দরজায় টোকা। ওড়নাটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলতেই দেখল শাশুড়ি শাহেদা চৌধুরী দরজার সামনে দাড়িয়ে। চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া।
“আসুন, আম্মু।” রিদি মৃদু হাসল।
শাহেদা চৌধুরী মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “এত দেরি হলো কেন আম্মা? টেনশন হচ্ছিল। ফোনও বন্ধ। কোথায় ছিলি?”
রিদি শাহেদা চৌধুরীদে জড়িয়ে ধরল ওনার উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে একটু হেসে বলল, “আম্মু, সুমিদের সাথে ছিলাম।”
“চল, খেয়ে নিবি। সারাদিন কাজ আর পড়া, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে হয় না।” শাহেদা চৌধুরীর গলায় অভিমান মিশিয়ে বলল।

“সত্যি আম্মু, খিদে নেই। ফুচকা-চটপটি খেয়েছি।”
শাহেদা চৌধুরী আর কথা না বাড়িয়ে রিদির মাথাটা নিজের কোলে টেনে নিলেন। চুলে বিলি কাটতে কাটতে ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবুর সাথে কথা হয়নি?”
রিদি নাক মুখ কুঁচকে ফেলল। মনে মনে বলল, ‘বুইড়া একটা পেঁকে ঝুনা হয়ে গেছে, সে কিনা বাবু!’ মনের কথা মনে চেপে শান্ত গলায় বলল, “থাক না আম্মু ওসব কথা। উনি যখন আমাকে চান না, জোর করে কি হবে? জোর করে কি সংসার হয়?”
শাহেদা চৌধুরী আর কিছু বললেন না। কিই বা বলবে নিজের ছেলেকে তিনি চেনে। দুনিয়া উল্টে গেলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরবে না। নিজের মেয়ে নেই। রিদিকে পেয়ে মেয়ের অভাব পূরণ হয়েছে। কিন্তু মেয়েটাকে একটু সুখ শান্তি দিতে পারছেন না । শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখতে পারবে কিনা এই ভয়ে থাকেন তিনি! ঝায়ের মনও বোঝেন। অনেক কিছু চোখে দেখেও না দেখার ভান করে থাকে! কি করার আছে যৌথ পরিবারে অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করতে হয়, নাহলে ভাঙন ধরে।

রাত ২টা। দেয়াল ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে। রিদি সোফায় বসে ঢুলছে। আরবান বলে গেছে সৌহার্দ্যের ইমারজেন্সি ওটি আছে, ফিরতে দেরি হবে। ডুপ্লিকেট চাবিও নিতে ভুলে গেছে। ফোন করে বলে দিছে কেউ যেন জেগে থাকে।
চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে দিতেই কলিং বেলের শব্দ। ধরফর করে উঠে ওড়নাটা মাথায় টেনে দরজা খুলল রিদি।
সামনে সৌহার্দ্য। এলোমেলো চুল, চোখ দুটো লাল, রক্তজবার মতো। কালো শার্ট ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। এক হাতে এপ্রোন, অন্য হাতে ফোন। ফোনে কারো সাথে রাগী গলায় কথা বলছে। রিদির দিকে এক পলক তাকিয়েই পাশ কেটে ভেতরে ঢুকে সোফায় শরীর এলিয়ে দিল। এপ্রোনটা ছুঁড়ে ফেলল পাশে। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
রিদি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই ভেসে এলো সৌহার্দ্যের শান্ত গম্ভীর কন্ঠস্বর “হেই! মিউট! দেড় ব্যাটারি! এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দাও। ফাস্ট!”
রিদির রাগ উঠলেও মানুষটার ক্লান্ত মুখটা দেখে রাগ গিলে ফেলল। ফ্রিজ থেকে বরফ-ঠান্ডা পানি ঢেলে গ্লাসটা সেন্টার টেবিলে রাখল।
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রিদি চলে যেতে নিতেই পেছন থেকে ভেসে আসলো ঠান্ডা গলার স্বর, “এই বাড়ির সবার সম্পর্কে জানো?”

রিদি বুঝল না হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন। তবুও মাথা উপর-নিচ নাড়ল।
সৌহার্দ্য সোজা হয়ে বসল, গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “এই বাড়ির মেজো ছেলে মানে সৌহার্দ্য চৌধুরীর বউকে চেনো?”
রিদি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। নিজের সম্পর্কে নিজেকেই জিজ্ঞেস করছে লোকটা! কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না, দ্রুত উপরে নিচে মাথা নাড়ল – মানে হ্যাঁ, চিনি।
সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে, খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “নাম কি ওটার?”
রিদির ভেতরটা তেতো হয়ে গেল। নিজের বউয়ের নামটাও পর্যন্ত জানে না এই লোক! মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল, ‘বেয়াদব হাওয়াত্তা লোক, নিজের বউয়ের নাম জানিস না, ওই মোটা মাথা নিয়ে তোকে কে ডাক্তার বানালো?’ কিন্তু নিজের মনের কথাটা গিলে নিলো।
সৌহার্দ্য এতক্ষন ধরে উত্তরের আশায় ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই ধমকে উঠল,

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২

“দেড় ব্যাটারি! মিউট! গো অ্যাওয়ে ফ্রম মাই সাইট!”
বজ্রের মতো ধমকে রিদি কেঁপে উঠল। রাগে-দুঃখে বিড়বিড় করে বলল , “হাওয়াত্তা ব্যাটা! জীবনে বউয়ের ভালোবাসা পাবি না। কাছে গেলে জায়গামতো লাথি খাবি বেয়াদব লোক একটা!” বলেই দুপদাপ পা পেলে নিজের রুমের উদ্দেশ্য চলে গেল!
সৌহার্দ্য রিদির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “এটা রিয়েল মিউট তো?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here