অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫২
রিদিতা চৌধুরী
“নিজেরটা গুলিয়ে খেয়েছি, এবার আপনারটাও খাবো শাশুড়ির ছেলে!”
সৌহার্দ্য এক হাতে রিদির কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিরক্ত চোখে তাকাল। অনেকক্ষণ ধরে এই মেয়ের অদ্ভুত সব নাটক সে সহ্য করছে, কিন্তু আর না—এবার সত্যি রিদিকে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে সে উঠে দাঁড়াতে গেল। ঠিক তখনই রিদি আচমকা সৌহার্দ্যের কোলের ওপর উঠে বসে তার বুকে মুখ গুঁজে সশব্দে কেঁদে উঠল!
হঠাৎ রিদিকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে রিদিকে আলতো হাতে একটু সরিয়ে দিতে চাইল, আর গম্ভীর ও ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, “সমস্যা কী? কাঁদছ কেন এভাবে? আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি?”
রিদি সৌহার্দ্যের শার্টে নিজের নাক মুছতে মুছতে ভেজা গলায় ফুঁপিয়ে উঠল, “আপনি আমাকে এভাবে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন কেন? আমি না হয় একটা ভুলই করেছি, আমাকে একটা বাচ্চা ভেবে ক্ষমা করে দিলেই তো হয়! এমন কেন করছেন আমার সাথে? আমার কষ্ট হচ্ছে না একটুও?”
সৌহার্দ্য এক পলক নিজের ভেজা শার্টটার দিকে তাকাল, আর পরমুহূর্তেই রিদির মাথাটা টেনে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল তারপর। কড়া সুরে, আদরে ভরা গলায় সে ফিসফিস করে বলল, “কাছে টানার মতো কী করেছো তুমি? আর তোমার মতো দামড়ি মেয়ের ভুল কেন আমি বাচ্চা ভেবে মাপ করতে যাব, হুম? স্টুপিড! আমার শার্টটার কী করছো তুমি?”
রিদি মুখ তুলে তাকাল, তারপর আবার সৌহার্দ্যের বুকে মুখ গুঁজে নাক টানতে টানতে নরম স্বরে বলল, “ধুয়ে দেব তো আমি!”
এরপর আবার চোখ তুলে সৌহার্দ্যের পানে তাকিয়ে তার গালে একটা আলতো চুমু এঁকে মিষ্টি হেসে বলল, “রাগ কি একটুও কমছে না?”
সৌহার্দ্য নির্বাক হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে গম্ভীর ও ভারী গলায় বলল, “না… এমন ঘেঁষাঘেঁষি করে লাভ নেই, সরো, আমি ঘুমাব।”
বলেই রিদিকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল সে। কিন্তু রিদি তাতে দমে না গিয়ে সৌহার্দ্যের আরও একটু কাছে ঘেঁষে মায়াভরা কণ্ঠে আবদার করল, “এমন করবেন না তো! এবার শেষবারের মতো মাফ করে দিন, আর কখনো আপনার অবাধ্য হব না।”
সৌহার্দ্যের কঠিন ভাব নিমিষেই গলে জল হয়ে গেল রিদির এই আদুরে আকুতিতে। বুকজুড়ে জমে থাকা সমস্ত রাগ এক নিমিষে উবে গেল। দুই হাত বাড়িয়ে রিদিকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চাইল সে। ঠিক তখনই রিদি নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে চঞ্চল গলায় বলে উঠল, “মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে, ডাক্তার সাহেব, চলুন না ছাদে যাই!”
সৌহার্দ্য বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখল—আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বয়ে আসছে স্নিগ্ধ শীতল বাতাস, আর তার সাথে ঝরে পড়ছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা। কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে সৌহার্দ্য আপত্তি জানাল, “উহু, তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে!”
কিন্তু সৌহার্দ্যের কথা কানেই তুলল না রিদি। উল্টো ছুটে গিয়ে সৌহার্দ্যের স্টাডি রুমের বড় খোলা বারান্দায় গিয়ে দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে গেল। এক দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইল সৌহার্দ্য। রিদির এই চঞ্চলতা, এই পাগলামিগুলোই বারবার সৌহার্দ্যকে এই একটি মেয়ের কাছে সম্পূর্ণ হেরে যেতে বাধ্য করে।
হঠাৎ করেই মুষলধারে নেমে এল ঝুম বৃষ্টি। পলকের মধ্যে রিদি ভিজে একাকার হয়ে গেল, আর তার পরনে সাদা শার্টটা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেল। সৌহার্দ্যের চোখ আটকে গেল সেই রমণীর বৃষ্টির জলে ভেজা শরীরের মোহময় ভাঁজে। ধীর পায়ে হেঁটে সে গিয়ে দাঁড়াল রিদির ঠিক শরীর ঘেঁষে। বৃষ্টির ঠান্ডা জলের ফোঁটা আর দুজনের উত্তপ্ত অস্তিত্ব মিলেমিশে একাকার—চারপাশের হুঁশ যেন আর কারোরই নেই।
রিদি খেয়াল করল সৌহার্দ্যের এমন এক ঘোর লাগা দৃষ্টি তার ওপর স্থির। নিজের ভেজা রূপের দিকে চোখ পড়তেই লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে উঠল। সে পাশ ফিরে সরে যেতে চাইল, কিন্তু সৌহার্দ্য বিদ্যুৎ গতিতে রিদির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। কণ্ঠে নেশা ধরানো মাদকতা মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আই ওয়ান্ট টু মেইক ইউ ক্রাই।”
বলেই বারান্দার এক কোণে রাখা ছোট লাউঞ্জারের ওপর রিদিকে শুইয়ে দিল সে। রিদির ছোট্ট নরম শরীরের ওপর নিজের সমস্ত উষ্ণ ভর ছেড়ে দিল সৌহার্দ্য। তার তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় মেয়েটির অবয়ব থরথর করে কেঁপে উঠল; আবেশে সে খামচে ধরল সৌহার্দ্যের শার্টের অংশ।
সৌহার্দ্য রিদির হাত দুটো নিজের শার্টের বোতামের ওপর রেখে ফিসফিস করে বলল, “আনবাটন মাই শার্ট, জান…”
এতক্ষণ তো শুধু সৌহার্দ্যের রাগ ভাঙানোর খেয়ালে পাগলামি করছিল রিদি, কিন্তু এই মুহূর্তে তার সারা শরীর লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। আড়ষ্ট ও আমতা-আমতা করা কণ্ঠে সে বলল, “রুমে চলু…”
সৌহার্দ্য রিদির ঠোঁটে এক ফালি আলতো চুমু এঁকে বলল, “উহু, বিছানার চেয়ে এটা অনেক বেশি আরামদায়ক, জান…”
চোখের ইশারায় রিদিকে আবারও শার্টের বোতামগুলো খুলতে নির্দেশ দিল সে। কাঁপা-কাঁপা হাতে রিদি যখন সৌহার্দ্যের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে ফেলল, তখন সৌহার্দ্য এক ঝটকায় শার্টটি দূরে ছুড়ে ফেলে মুখ ডুবিয়ে দিল সেই তরুণীর উন্মুক্ত উদরের মাঝে। রিদির গোটা শরীর জুড়ে বয়ে গেল সৌহার্দ্যের উত্তপ্ত ঠোঁটের শিহরণ জাগানো স্পর্শ, আর তার সুচালো দাঁতের আলতো কামড় ছড়িয়ে দিল অদ্ভুত এক নেশা।
বাইরে মুষলধারে ঝুম বৃষ্টির তাণ্ডব, আর বারান্দার ওই একান্ত কোণে দুজন মেতে উঠল ভালোবাসার অন্য এক নেশায়!
রাত প্রায় তিনটা। রিদি গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে সৌহার্দ্যের বুকে। সারারাতের তীব্র উত্তাল ঝড় আর সৌহার্দ্যের চরম উন্মাদনা সহ্য করতে গিয়ে মেয়েটার ক্লান্ত শরীরটা যেন একদম এলিয়ে পড়েছে, নাজেহাল অবস্থা। সৌহার্দ্য তখনও অপলক তাকিয়ে আছে রিদির দিকে। রিদির এই কুঁকড়ে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে মায়া আর তীব্র অধিকারবোধে তার বুকটা ভিজে উঠল।
রিদির কানের কাছে মুখটা নিচু করে সে ফিসফিস করে বলল,
— “চলো, গোসল করতে হবে?”
চোখ বন্ধ রেখেই মিনমিন করে রিদি বলল,
— “সকালে…”
কিন্তু সৌহার্দ্য শোনার পাত্র নয়। এক পলক রিদির ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়েই সে তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। বাথরুমে নিয়ে শাওয়ারটা ছেড়ে দিতেই, রিদির জ্বালাপোড়া করা ক্লান্ত শরীরে ঠান্ডা পানির স্পর্শ লাগল। শিরশির করে ওঠা ঠান্ডায় শরীরটা কেঁপে উঠলেও রিদি দাঁতে দাঁত চেপে, ঠোঁট কামড়ে সব সহ্য করে নিল।
গোসল শেষে সৌহার্দ্য রিদিকে আলতো করে ফ্রেশ করিয়ে নিজের একটা কালো শার্ট পরিয়ে দিল। শার্টটা রিদির ছোট শরীরে হাঁটু পর্যন্ত নেমে গেছে। রিদির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে দুষ্টু হাসি হেসে ঠোঁট কামড়ে সৌহার্দ্য ফিসফিস করে বলল,
— “নট ব্যাড! এখন থেকে রোজ রাতে আমার শার্ট পরেই থাকবে তুমি।”
কথাটা বলেই রিদিকে আবার কোলে তুলে এনে খুব যত্নে বিছানায় শুইয়ে দিল। এরপর প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে সে নিজে ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরল। রিদির পাশে শুয়ে, তারপর রিদির কপালে এক ফোঁটা ভালোবাসার ছোঁয়া এঁকে পরম যত্নে তাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে রিদির মুখটা লুকিয়ে নিল।
কাঁচা সকালের মিষ্টি আলোয় রান্নাঘরটা সরগরম। চুলার পাশে দাঁড়িয়ে পৃথা আর সাথী, দুজনে মিলে ব্যস্ত সকালের নাস্তা তৈরিতে। ঠিক তখনই সেখানে এসে হাজির হয় রিদি।
সাথী গরম তাওয়ায় পরোটা ভাজতে ভাজতে দুষ্টু হাসিমুখে রিদির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে খোঁচা দিয়ে বলে উঠল—
“বাহ্ ননদিনী! দেখছি সারা শরীরে জামাইয়ের ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছ!”
কথাটা শুনে রিদি যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আনমনে খেয়ালই করেনি যে তার মাথার ঘোমটাটা একটুখানি সরে গেছে। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আমতা-আমতা করে সে বলে উঠল, “দূর! কী যে বলো ভাবী, এগুলো তো মশার কামড়!”
ঠিক তখনই রান্নাঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল সৌহার্দ্যের গলা ফাটিয়ে ডাকার শব্দ। সে যেন পুরো বাড়িতে রিদির নাম ধরে চিৎকার করছে!
তা শুনে পৃথা মুচকি হেসে রিদির কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল, “যা, তোর ‘মশা’ তোকে ডাকছে, তাড়াতাড়ি গিয়ে হাজিরা দিয়ে আর ও কামড় খেয়ে আয়!”
রিদি লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। মনে মনে একটু তিরস্কারের সুরে ফিসফিস করে বলে উঠল, “লোকটা আসলেই নির্লজ্জ! এভাবে কেউ চেঁচিয়ে ডাকে নাকি?”
রিদি যখন বিড়বিড় করতে করতে রুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখন সাথী দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে এক কাপ কফি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নে, তোর মশার জন্য কফিটা নিয়ে যা!”
সাথী আর পৃথার খিলখিল হাসির শব্দের মধ্যে, লজ্জা-রাঙা মুখটা কোনোমতে লুকিয়ে রিদি দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেল।
রুমে পা রাখতেই সৌহার্দ্য কিছুটা বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল, “কলেজে যাবে না তুমি? সকালে উঠে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো বাদ দিয়ে পড়তে বসতে বলছি না তোমাকে? একটা কথা কতবার বলতে হয়?”
সৌহার্দ্যের এমন ঝাড়ি খেয়েও রিদি একটুও রাগ করল না। উল্টো আলতো পায়ে তার সামনে গিয়ে কফির কাপটা বাড়িয়ে দিল। এরপর সৌহার্দ্যের শার্টের খোলা বোতামগুলোতে হাত বুলিয়ে সেগুলো একে একে লাগিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলল, “এমন করেন কেন বলুন তো? ভাবী পৃথা তো এখন প্রায় সব রান্নাই করে, আমি কি এই বাড়ির বউ না? আমার কি কোনো দায়িত্ব নেই?”
সৌহার্দ্য মুখের ভেতর একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে কড়া গলায় জবাব দিল, “নো! তোমার কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না। তোমার একমাত্র দায়িত্ব শুধু আমার ওপর ফোকাস করা!”
কথাটা বলেই সে রিদির কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। এরপর তাড়া দিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”
সৌহার্দ্য কফিতে একটা চুমুক দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই রিদি মিষ্টি ও অনুগত সুরে জিজ্ঞেস করল, “নাস্তা খাবেন না?”
রিদির দিকে আর ফিরে না তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সৌহার্দ্য বলে গেল, “আমার হাতে সময় নেই। যাওয়ার পথে তোমার খাবার নিয়ে দেব, দ্রুত এসো!”
বলেই সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় দুটো বাজে। ক্যাম্পাসের বাইরের চত্বরে দাঁড়িয়ে রিদি, সুমি, পৃথা আর সায়েম। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা ছুটির পর দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়াটাই ওদের নিত্যদিনের রুটিন, কিন্তু আজ রিদির সব মনোযোগ শুধু সায়েমকে ঘিরে। গত কদিন ধরে সায়েম ক্লাসে আসেনি কেন, আর কার বাড়িতে বা সে ছিল—এই কৌতূহল তার মন থেকে কিছুতেই সরছে না।
সায়েমের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রিদি নাছোড়বান্দার মতো বলে উঠল, “কী হলো রে? মুখ খুলছিস না কেন? এতদিন ক্লাসে আসিসনি কেন বল তো? আর আমরা ছাড়া তোর আবার এমন কোনো বন্ধু জুটে গেল, যার বাড়িতে গিয়ে তুই এভাবে উধাও হয়ে ছিলি?”
সায়েম মনে মনে রিদিকে ভালোমতো ধুয়ে দিয়ে মুখে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে বলে উঠল, “চুপ কর! আমার জীবনে তোর সাথে বন্ধুত্ব করাটাই হলো সবচেয়ে বড় ভুল। তুই কি জানিস, তোর ওই খাটাশ জামাইয়ের গুলশানে একটা আলিশান ফ্ল্যাট আছে?”
রিদি অবাক হয়ে মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইল যে সে এ বিষয়ে কিচ্ছু জানে না। সৌহার্দ্যের এমনিতেই তো অনেকগুলো প্রপার্টি ও ফ্ল্যাট রয়েছে, তাই সে সামান্য বিরক্ত হয়েই বলে বসল, “ওনার ফ্ল্যাটের তো আর অভাব নেই! আমি কি তোকে ওনার কথা…?”
কিন্তু রিদির কথা শেষ হতে দিল না সায়েম। রাগে গরগর করতে সে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “বলব না তো কী করব? তোর ওই খাটাশ জামাই আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পুরো একটা সপ্তাহ ওই ফ্ল্যাটে আটকে রেখেছিল আর ঠিক কাজের ছেলের মতো খাটিয়েছিল! তার নাকি সন্দেহ, আমি নাকি তোকে সবসময় কুবুদ্ধি দিই! ওই খাটাশটা আমার জিন্দেগিটা পুরো শেষ করে দিয়েছে। আজ থেকে তুই আমার সাথে আর কোনো কথা বলবি না! তোদের মতো বিবাহিত মহিলা বন্ধু আমি আর চাই না!”
সায়েমের এই হঠাৎ বিস্ফোরণে রিদি, সুমি আর পৃথা—তিনজনেই একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। রিদি অপরাধীর মতো একটু এগিয়ে সায়েমের পিঠে সান্ত্বনার ছলে হাত রাখতে গেল, কিন্তু সায়েম বিদ্যুৎ গতিতে একপাশে সরে দাঁড়াল।
রিদি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলতেই যাচ্ছিল, “আ…”
কিন্তু তাকে বাক্য শেষ করার সুযোগ না দিয়ে সায়েম প্রায় মিনতি করে বলে উঠল, “বোন, তুই কি আমাকে না মেরে ছাড়বি না? একটু দয়া কর আমার ওপর, প্লিজ একটু দূর থেকে কথা বল!”
সায়েমের এই কাণ্ড দেখে সুমি আর পৃথা কোনোমতে তাদের উপচে পড়া হাসি চেপে রাখল। বন্ধুর ওপর রাগ হলেও ভেতরে ভেতরে তার জন্য একটু আফসোসও হচ্ছিল বইকি।
এরপর সায়েম রিদির দিকে একটা নিষ্পাপ মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “তোকে একটা সিক্রেট কথা বলি, ওই খাটাশকে ভুলেও আমার নামটা বলিস না যেন! আর হ্যাঁ, তুই তোর জামাইয়ের ওপর একটু ভালো করে নজর রাখিস বোন! এত বড় একটা ফ্ল্যাটে ও একা একা কী করে কে জানে? না না, তুই আবার আমাকে ভুল বুঝিস না বলছি… তবে একটু সাবধানে খেয়াল রাখিস। বলা তো যায় না, ভালো মানুষরা কখনো বউয়ের কাছ থেকে লুকিয়ে আলাদা ফ্ল্যাট রাখে না!”
কথাটা বলেই মনে একরাশ কুটিল হাসি হেসে সায়েম ভাবল—’দাঁড়া খাটাশ! তোর বউয়ের কানে এমন বিষ ঢেলে দেব না, তোর সুখের বারোটা বাজিয়ে ছাড়লে আমার নাম সায়েমই না!’
সায়েমের এই অদ্ভুত আর উস্কানিমূলক কথার ধ্যানে বিভোর হয়ে রিদি যখন আনমনে সামনে এগোচ্ছিল, তখনই হঠাৎ একটা পাথরের সাথে হোঁচট খেয়ে তার পায়ের স্লিপারটা ক্যাঁচ করে ছিঁড়ে গেল। সে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সুমি দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে সামলে নিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যাম্পাসের চত্বরের বাতাসে ভেসে এল তনিমার একরাশ বিষাদ ও হিংসায় ভরা চেনা ও বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর—
“কী দেখে যে সৌহার্দ্য স্যারের মতো এমন একজন হ্যান্ডসাম মানুষ তোমাকে বিয়ে করল, সেটাই মাথায় ঢোকে না! না আছে রূপ, না আছে চলাফেরায় একটু স্মার্টনেস, ঠিকমতো হাঁটতেও তো পা…”
তনিমার কথা শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই হঠাৎ ঝড়ের বেগে সেখানে এসে হাজির হলো সৌহার্দ্য। চারপাশের কাউকে পরোয়া না করে সে সোজা রিদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এরপর রিদির পা থেকে ছিঁড়ে যাওয়া জুতোটা আলতো করে খুলে নিয়ে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে বড়োই নরম ও আকুল স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ব্যথা পেয়েছ, জান?”
ক্যাম্পাসের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত ছাত্রছাত্রী তখন একেবারে থমকে গেছে। শুধু তাই নয়, পাশ দিয়ে যাওয়া হাসপাতালের ডাক্তার, রোগী ও সাধারণ মানুষ পর্যন্ত হাঁ করে অবাক দৃষ্টিতে এই দৃশ্য দেখছে। সৌহার্দ্যের মতো এমন রাগী ও গম্ভীর একজন মানুষ যে কোনো সাধারণ কারণে এতখানি ব্যাকুল হয়ে উঠতে পারে, তা উপস্থিত সবার কাছেই ছিল একেবারে অবিশ্বাস্য!
চারপাশের মানুষের এমন অবাক দৃষ্টি দেখে রিদি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে লজ্জা রাঙা মুখে নিজের পা একটু সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আমতা-আমতা করে বলল, “কী করছেন এগুলো? ছেড়ে দিন, আমি একদম ঠিক আছি!”
কিন্তু রিদির কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না সৌহার্দ্য। সে নিজের হাঁটুর ওপর রিদির পা সাবধানে তুলে আলতো হাতে চেক করে দেখল কোথাও কোনো আঘাত বা কেটে গেছে কি না। এরপর রিদির সেই ছেঁড়া স্লিপার দুটো নিজের এক হাতে তুলে নিয়ে সে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল, উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “হেঁটে যেতে পারবে, সুইটহার্ট?”
রিদি লাজুক মুখে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল। তবুও সৌহার্দ্য এক মুহূর্তও দেরি না করে রিদিকে এক হাতে এক টানে পাঁজা কোলে তুলে নিল, আর তার অন্য হাতে ঝুলতে লাগল রিদির সেই ছেঁড়া জুতোজোড়া!
রিদিকে কোলে নিয়ে সে যখন সামনের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকা তনিমার ঠিক সামনে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল। তনিমার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না, বরং একরাশ ঘৃণা ও ক্ষোভ মেশানো গর্জে ওঠা কণ্ঠে সে বলে উঠল—
“এই লাস্ট! আমার বউকে নিয়ে যদি ভবিষ্যতে তোমার মুখ থেকে একটাও বাজে কথা বের হয়, তবে কথা বলার জন্য এই মুখটাই আর আস্ত রাখব না! আর ওর মাঝে যা আছে, তা তোমার মতো মেয়ের ধারণারও বহু দূরে!”
কথাটা শেষ করেই সৌহার্দ্য বড় বড় পা ফেলে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
সৌহার্দ্যের এমন ভালোবাসায় মোড়ানো রূপ দেখে রিদি তার গলা জড়িয়ে ধরে একদৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। রিদিকে এভাবে মায়াবী চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য চারপাশের উৎসুক জনতা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রিদির আরও একটু কাছে ঝুঁকে এল। তারপর তার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—
“এভাবে মায়াবী চোখে তাকিয়ে থেকো না, জান! আমার খুব ব্যাড ফিল হচ্ছে… না হয় বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই গাড়ির ভেতরেই আমি বা…!”
সৌহার্দ্য আর একটা কথাও বলতে পারল না। তার আগেই রিদি লজ্জায় লাল হয়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে তার মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “একটুও লজ্জা করে না আপনার? নির্লজ্জ একটা লোক!”
সৌহার্দ্য ঠোঁটে এক ফালি বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রিদির দিকে তাকাল, এরপর নরম অথচ চতুর ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল,
” উহু লজ্জা করছে না,লজ্জা করলে তোমাকে আমার প্রিন্সেসের আম্মু কিভাবে বানাব জান,!”
সৌহার্দ্যের সেই নির্লজ্জ আর আদুরে কথায় রিদি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে দ্রুত চোখ বুজে ফেলল। রিদির এই মিষ্টি লাজুক রূপ দেখে সৌহার্দ্য আর কথা বাড়াল না; এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠতেই সে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
রিদিকে গাড়িতে পরম যত্নে বসিয়ে সৌহার্দ্য নিজে এসে বসল ড্রাইভিং সিটে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার ঠিক আগে, রিদির ক্লান্ত পা দুটো আলতো করে টেনে সে নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। এরপর বাড়ির উদ্দেশ্যে গাড়িটা সামনের দিকে রওনা দিল।
বিকালের মৃদু আলোয় ডাইনিং টেবিলের এক কোণে পাশাপাশি বসে আছেন সারহান চৌধুরী আর সৌহার্দ্য। বসার ঘরের ঠিক সামনেই চলছে টানটান উত্তেজনার একটা খেলা। সারহান চৌধুরীর দৃষ্টি টিভিতে নিবদ্ধ থাকলেও মাঝে মাঝে স্নেহের আবেশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন ছেলের ওপর। আর সৌহার্দ্য কফির কাপে ছোট একটা চুমুক দিয়ে গভীর মনোযোগে কিছু একটা টাইপ করে চলেছে তার মোবাইল স্ক্রিনে।
টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই একটু আফসোসের সুরে সারহান চৌধুরী বললেন, “আরবান বাবা হবে শুনেছ?”
মোবাইল স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই সৌহার্দ্য ছোট্ট করে জবাব দিল, “হুম!”
ছেলের এমন নির্বিকার ভাব দেখে নাক-মুখ কুঁচকে ফেললেন সারহান চৌধুরী। একটু বিরক্তি আর আক্ষেপ মিশিয়ে বললেন, “সে দিন মাত্র বিয়ে করল, একটা বছর যেতে না যেতেই দাদা বানিয়ে দিচ্ছে! কেউ কেউ চার-পাঁচ বছর বিয়ে করে পারছে না!”
বাবার কথাটার তীক্ষ্ণ অর্থ বুঝতে বাকি রইল না সৌহার্দ্যের। সে মোবাইল থেকে ধীরে ধীরে চোখ তুলে এক পলক তাকাল বাবার দিকে। বেশ বুঝতে পারছে, এই তির্যক কথাগুলোর আসল নিশানা সে নিজেই। তবে কোনো তর্কে না গিয়ে সৌহার্দ্য আবার নিঃশব্দে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল তার মোবাইল স্ক্রিনের দিকেই।
ছেলের এই নীরবতা যেন সারহান চৌধুরীর বুকের ভেতর জমা থাকা ক্ষোভের বারুদে আগুন জ্বেলে দিল। রাগে ফেটে পড়ে তিনি একরকম গর্জে উঠলেন, “নাতিনাতনী নিয়ে খেলার বয়সে এই দামড়া ছেলের সাথে বসে খেলা দেখতে হচ্ছে? একটুও কি লজ্জা করে না? তোমার ছোট ভাই বাবা হতে চলেছে, আর তুমি…”
বাবার এই অন্তর্দহনকারী কথার সামনে সৌহার্দ্য স্থির হয়ে বসে রইল। বাবার অনবরত এই খোঁচাগুলো আজ যেন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেছে। সে আর চুপ থাকতে পারল না; বাবার চোখে চোখ রেখে, কণ্ঠে একরাশ চাপা বিরক্তি নিয়ে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল, “আশ্চর্য! লজ্জা করার মতো কী করলাম আমি? তোমার নাতিনাতনিরাই হয়তো তোমাকে দাদা হিসেবে পছন্দ করছে না, তাই তো দুনিয়াতে আসতে চাচ্ছে না—এতে আমার দোষ কোথায়?”
সৌহার্দ্যের এই কথাটি যেন সারহান চৌধুরীর গায়ে দাহ্য পদার্থ ঢেলে দিল। তিনি রাগে থরথর করতে বলে উঠলেন, “বেয়াদব ছেলে! নিজের সমস্যাটা স্বীকার করার সাহস নেই, উল্টে দোষ চাপাচ্ছ আমার ঘাড়ে?” তারপর আরও একটু খোঁচা দিয়ে ছেলেকে দংশন করার সুরে বললেন, “লজ্জা বাদ দিয়ে সমস্যা থাকলে পরিষ্কার করে বল। আমি তোমার বাবা হলেও তো বন্ধুর মতো, ডক্টর…”
বাবার কথাটা আর শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে সে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বিরক্তিতে তেতে ওঠা গলায় বলে গেল, “আমারও কোনো সমস্যা নেই, তোমারও কোনো দোষ নেই! আসল সমস্যা হলো, পড়া চোর একটা মেয়েকে জোর করে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছ। আমার বাচ্চাগুলো ওই স্টুপিডের মতো হয়েছে, পড়ার ভয়ে দুনিয়াতে আসতে চাচ্ছে না! হ্যাপি তো? এখন তোমার মনের মতো উত্তর পেয়েছ?”
ঠিক সেই মুহূর্তেই নাস্তার ট্রে হাতে ডাইনিং রুমে পা রাখল রিদি। সৌহার্দ্যের মুখ থেকে এমন আজব আর অবিশ্বাস্য কথা শুনে মেয়েটা থমকে গেল, একেবারে আহাম্মক বনে গেল সে! সৌহার্দ্যের যাওয়ার পথের পানে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—কী নির্লজ্জ অবলীলায় মানুষটা তাদের এখনও না-আসা অবুঝ বাচ্চাদের ঘাড়ে পড়ার ভয়ের পুরো দোষটা চাপিয়ে দিয়ে চলে গেল!
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫১
সারহান চৌধুরীর অবস্থাও তখন শোচনীয়। তিনিও হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন ছেলের প্রস্থান পথের দিকে।
সৌহার্দ্য চোখের আড়াল হতেই রাগে-বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে বিড়বিড় করে উঠলেন সারহান চৌধুরী, “অসভ্য একটা ছেলে! পড়া চোর হলেও ভালো, তোমার মতো এমন বেয়াদব না হোক!”
