Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১০

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১০

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১০
Maha Aarat

চারতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মাহেরের ১৭ টা কল।আরহাম কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না।কল উঠালেই সে বলছে, তাড়াতাড়ি নিচে নামো।আমি অপেক্ষা করছি।’
হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমেই উবু হয়ে লম্বা কয়েকটা ক্লান্তির শ্বাস নিলেন আরহাম।মাহের উনার বাহু ধরে টান দিয়ে গাড়িতে নিয়ে বসালো।সিট লাগিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি রান করতেই আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছো?কেন যাচ্ছো?আমি কেন যাচ্ছি?বলো তো আমাকে?’
মাহের একহাতে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে বললেন, ‘কুল হও।বলছি সব।’
আরহাম চুপচাপ বসে রয়েছেন।মাহের কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেটা আন্দাজ করার ট্রাই করছেন।গাড়িতে জিপিএস লাগানো।সেদিকেই নিঁখুত দৃষ্টি মাহেরের।আরহাম আর চুপচাপ থাকতে পারলেন না।এতক্ষণ মাহের চুপ করিয়ে রেখেছে।আরহাম যতক্ষণে জিজ্ঞেস করলেন, মাহের ততক্ষণে কোনো সরু ইটের রাস্তায় ঢুকে গেছে।

‘এক্সেটলি বলো আমরা কোথায় আসছি?’
মাহের শান্তসুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ভয় পাচ্ছো?’
‘নাহ।’
‘তবে?’
‘জিজ্ঞেস করবো না?’
মাহের মুচকি হেসে বললেন, ‘মে বি ভয় পাচ্ছো।’
আরহাম মাহেরের রসিকতা বুঝে ফেললেন।সবসময়ের গম্ভীর মানুষটা আজ এতো খুশি খুশি কেন!
‘মোটেই না।তোমাকে ভয় পাবার কি হলো?’
‘বাসায় তোমার ওয়াইফ আছেন,ফ্যামিলি আছে।সাপোজ আমি তোমার কোনো ক্ষতি করে ফেললাম।’
‘আমার চেয়েও বড় রেসপন্সসিবিলিটি তোমার আছে।আর দেখি তুমি কি ক্ষতি করতে পারো আমার।’
‘বেশ।’
‘এ জায়গাটা অপরিচিত মনে হচ্ছে।এ পথে আসা হয়নি কখনো।’
‘তোমাকে জানানোর সুযোগ পাইনি।হাফসার নিকাহ প্রায় ঠিক।চাচা পাকা কথা সেরে ফেলেছেন।আমি শুধু পাএ দেখতে যাচ্ছি।আমার সাথে তুমি যাচ্ছো ব্যসস…

আরহাম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হুয়াট?ক্ কেন?এত তাড়াতাড়ি কীভাবে কি?’
‘প্রোপোজাল টা তারাই দিয়েছে।খোঁজ নিয়ে দেখলাম বেশ ভালোই।তাই এগোলাম।’
‘তুমি একথা আগে বললে না?’
‘সুযোগ পাইনি।’
‘এখানে আসার কথা বললে না?’
‘এখন তো বললাম।’
আরহাম আর প্রশ্ন করলেন না।উনাকে নীরব দেখে মাহের প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘সরি।তোমার কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল?’
‘হু।’
‘এক্সট্রিমলি সরি ফর দ্যাট।তাহলে এক কাজ করি?আজকে ফিরে যাই চলো।যেতে তো আধঘন্টা লাগবে।আমি অন্যসময় দেখা করে নিবো।’
মাহের কথাটুকু শেষ করে দ্রুত গাড়ি মোড় নেওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন।আরহাম তৎক্ষনাৎ বাঁধা দিয়ে কেবল বললেন, ‘যে কাজে এসেছো সেরে যাও।আই উইল ম্যানেজ।’

এশা গম্ভীর মুখে নত হয়ে বাবার সামনে বসে আছে।তাঁর হাতে দশখানেক ফটো সাথে টেবিলের খামে বায়োডাটা।বাবা তাকে পরখ করলেন কয়েক সেকেন্ড।রুম থেকে বেরোবার আগে কেবল বলে গেলেন, ‘যত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সেটা তোমার জন্যই ভালো হবে।কবরে যাওয়ার সময় চলে আসছে আমার।অন্তত শান্তিতে মৃত্যুটাকে গ্রহণ করতে দাও।’
বাবা বেরিয়ে যেতেই দূহাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো এশা।তাঁর দোষ শুধু লোকটাকে পছন্দ করা।উনাকে খুব করে ভালোবেসে ফেলা।আচ্ছা লোকটার যদি তাকে এতটাই অপছন্দ তবে আগে জানান নি কেন?বাবার সামনে ইনসাল্ট করার খুব বেশী প্রয়োজন ছিলো?কত আশা নিয়ে এসেছিলো সে।মাহের কেন এমন করলেন?তিনি সত্যি এতো অপছন্দ করেন আমাকে?
মিসেস মাইশা রুমে আসছিলেন তাকে লাঞ্চের জন্য ডাকতে।বিছানার চাদর খামচে ধরে নি:শব্দে কাঁদতে দেখে মুখটা মলিন হয়ে এলো উনার।মেয়েটা কেনো ভুল মানুষকেই ভালোবাসলো।মায়ের চোখও বাঁধা মানলো না।চোখের সামনে উনার পাগল মেয়েটার কষ্ট উনার সহ্য হচ্ছে না।এই যে সেদিনের পর থেকে তাঁর চোখে ঘুম নেই,খাওয়ার ঠিক নেই,নিজের কাজের বা রুটিনের ঠিক নেই এটা কেউ আন্দাজ করতে পারুক আর না পারুক মা তো সব বুঝছেন।ছেলেটাকে কি নিজে কাতর হয়ে একটা বার বুঝাবেন?
মুখের ওপর জড়ো হয়ে আসা চুলগুলো দূহাতে মুষ্টিবদ্ধ করে পেছনে ঠেলে দিলো এশা।তাঁর কান্না থামছে না।যতবারই সেই ঘটনার কথা মনে পড়ছে সে ভেঙে পড়ছে।

ফ্ল্যাশব্যাক….
মাহেরকে বসতে বলে নেহাল সাহেব হয়তো কাউকে ডাকতে গেলেন।কিন্তু সেই সুযোগ দিলো না মাহের।হাত ধরে উনাকে পাশে বসিয়ে বিনয়ের সুরে বললেন, ‘আঙ্কেল আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই যেটা আপনার মেয়েকে হয়তো বলতে পারবো না।আপনি তো উনার বাবা।আপনি তে উনার জন্য বেস্ট সিদ্ধান্ত টাই নিবেন।’
ভদ্রলোক কিছুটা বিভ্রমে পড়ে গেলেন।তবুও সিরিয়াস হয়ে বললেন, ‘বলো।’
মাহের গোপনে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে আরম্ভ করলেন, ‘আপনার মেয়ে আমাকে পছন্দ করেন।কিন্তু আমি করি না আঙ্কেল।এমন না যে আপনার মেয়ে পছন্দ হওয়ার অযোগ্য উনি,এমনটা না।উনি অবশ্যই যোগ্য,বেটার।কিন্তু আমি উনাকে চাচ্ছি না।প্রথম থেকে এ পর্যন্ত অনেকবার বলেছি আমি উনাকে নিয়ে ভাবতে চাই না কিন্তু উনি যথারীতি পাগলামি করেই যাচ্ছেন।আঙ্কেল আপনার মেয়ে একজন যোগ্য ছেলে ডিজার্ভ করেন।আপনি হয়তো আমার পরিবার সম্পর্কে কম জানেন।আমি অনেক বড় একাকীত্ব, ভরসার অভাব নিয়ে বড়ো হয়েছি।মা থেকেও মায়ের অভাবের যন্ত্রণাটা প্রতিনিয়ত অনুভব করছি।আমি বড়ো হয়ে গেছি।নিজের ক্যারিয়ার সেটেল করেছি।দায়িত্ব নিতে শিখে গেছি।কিন্তু দিনশেষে মা’ এই মানুষটার অভাব আমার কোনোদিনও ঘুচবে না।ছোটবেলা থেকেই কিছু কঠিন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে হতে আমি একদম ক্লান্ত।আমি একটা অনুভূতিহীন মানুষ আঙ্কেল।কেন জানি আর দশজন থেকে নিজের ডিফারেন্স খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারি।উনি যেমন চাইবেন আমি তেমন হতে পারবো না।একজন মানুষের দায়িত্ব নিতে অপারগ আমি।এসব বিষয় নিয়ে এখনো ভাবিনি।আমার বোনের টেনশন আছে আমার।আর পারিবারিক অনেক ঝামেলা সাফার করতে হচ্ছে।সবশেষে বলবো, আপনি আপনার মেয়ের জন্য যোগ্য ছেলে খুঁজে নিন।আমি সে যোগ্য মানুষ নয়।আমার সাথে সংসার করলে উনি বিরক্ত হয়ে যাবেন।আর সেটা তো অনেক দূরের কথা।আমি এসবের জন্য মোটেও প্রস্তুত নই।এমনকি কোনো কথাও দিতে পারবো না। আপনি তো বুঝবেন,আমি সত্যি পারবো না।ক্ষমা করবেন আমাকে।কিন্তু উনি আমার প্রতি উইক হবেন এমন কিছু আমি করিনি বা বুঝাইনি এখন পর্যন্ত।আ’ম সরী আঙ্কেল।আই কান্ট একসেপ্ট ইউর ডটার।প্লিজ ফাইন্ড এ্যা বেটার পার্টনার ফর ইউর ডটার।হ্যাপি উইস ফর হার।ফরগিভ মি।’

সুন্দর স্নিগ্ধ সকাল।রোদের তেজ নেই।নিভু নিভু আবছায়া সাথে শীতল বাতাস।আজ পরিবেশের মন ভালো বুঝা যায়।মাহের হাফসাকে নিতে আসছেন কোনো প্রয়োজনে।আন্টির থেকে বিদায় নিয়ে তাকে বেরোতে বেরোতে বললেন, ‘ডক্টরে যাবো।’
হাফসা তৎক্ষনাৎ হাঁটা থামিয়ে ভীত দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো।মাহের ওর অভিব্যাক্তি বুঝে হালকা হেসে বললেন, ‘আরে আমার কিছু হয়নি।তোমাকে নিয়ে যাবো।’
হাফসার মুখ মলিন হয়ে গেলো মুহুর্তেই।তবে সে মুখে কিছু বললো না।আগেরবার সে খুব করে মানা করেছে।এবার কী বলবে?

হাফসা কেবল গাড়িতে উঠলো।মাহের সিট খুলে নিজেও উঠতে যাবেন এমন সময় চিকন একটা সুর কানে ভাসলো উনার।হাফসা জানালা দিয়ে দেখলো করিডোর পেরিয়ে ছুটে আসছে আইরা।দ্রুত আসতে গিয়ে গেট পেরোতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ধপাস করে পড়ে গেলো সে।হাফসা ছুটে গেলো আইরার দিকে।আইরা ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলো।ধারালো লোহার গেটে পায়ের আঙ্গুলে বেশ ব্যথা পেয়েছে সে।হাফসা তাঁর পা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেই আইরা সামলে নিয়ে ব্যথাতুর কন্ঠে নিচুস্বরে বলল, ‘আমি পারবো আপনি ওগুলো মনে করে আনবেন তো?’
হাফসা তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে আইরার ক্ষত হওয়া পা দেখতে লাগলো।রক্ত বেরোচ্ছে সরু স্রোতে।ছিঁলেছে বেশ জায়গা।আইরা তাকে বাঁধা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একজন মেইডের সাহায্যে ভেতরে চলে গেল।
হাফসা বিরসমুখে ফিরে আসলে মাহের তাড়া দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি আসো।দেরি হয়ে যাচ্ছে। ‘

দুপুরের নিভু নিভু রোদ্দুরে পরিবেশটা ছিমছাম।হাফসা গাড়িতে ঘুমে ঝিমোচ্ছে দেখে মাহের অন্য বিষয়ে চেয়েও কথা তুলতে পারলেন না।
ড্রাইভিং এ ব্যস্ত হতে গিয়ে মাহের অন্য ভাবনায় চলে গেলেন।এতো এতো টেস্টের রিপোর্ট ক্লিয়ার তাও কেনো হাফসার সমস্যার সমাধান হয় না।বোনটা কি এমন ট্রমায় পড়ে কথা হারালো এই প্রশ্ন হাজারবার করতে গিয়েও পারেননি।তবে এর পিছনেও আয়না শেখ এর হাত আছে।মানুষটা কেবল সুন্দর পরিবার টা ভেঙে দিয়েছেন বারেবার।জোড়া লাগানোর প্রলেপকেই যেখানে ঝড়ো বাতাসে নিভিয়ে গিয়েছেন সেখানে সত্যি টা কীভাবে নিজ থেকে স্বীকার করতেন?মা’য়ের অপরাধ ছিলো একটা স্বাক্ষর।আর?আর কি কিছু?স্রষ্টার হুকুম ছাড়া তো কিছুই হয় না।এটা মাহের মন থেকে বিশ্বাস করেন।

খোলাহল ছেড়ে গাড়ি রোডে এসে আটকা পড়েছে জ্যামে।গাড়ির হর্ণের লাগাতার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো হাফসার।পিটপিট করে চোখ খুলে আশপাশ তাকাতেই আইরার কথা মনে হলো ওর।তৎক্ষনাৎ গাড়ি থামাতে বলল কোনো শপে।মাহেরও থামালেন কিন্তু শপে গিয়ে সে যখন ১০০ টা ❝কিন্ডার জয়❞ চকলেট নিতে বললো মাহের অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসব বাচ্চাদের চকলেট তুমি কবে থেকে খাও?’
হাফসা ইশারায় বুঝালো সে খাবে না।আরেক জনের জন্য নিবে।
মাহেরের কৌতূহল তবুও দমে না।বললেন, ‘ও বাসায় তো কোনো বাচ্চা নেই।’
হাফসা আইরার জন্য নেওয়ার কথা বলতেই মাহের কয়েক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে মুখ গোল করে কয়েকটা ভারী নি:শ্বাস ছাড়লেন।শপ থেকে বের হয়ে হাফসার হঠাৎ মনে পড়লো আইরার পায়ের ব্যথা পাওয়ার কথা।ভাইকে ওষুধ নেওয়ার কথা বললো সে।ফার্মেসীতে ভীড় নেই।ভাইয়ের পিছুপিছু হাফসাও গিয়ে দাঁড়ালো।ব্যথানাশক ওষুধের সাথে মোটা মোটা গোল গোল ট্যাবলেট নিতে দেখে সে ভাইয়ের দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে চোখ রেখে বুঝালো, ‘এই ওষুধ কিসের?’
‘ক্যালসিয়াম।’
‘কেন?’
‘হাঁটতে বসতে পড়ে যাওয়া দূর্বল মানুষদের প্রয়োজন।’
হাফসা সায় জানালো।আসলেই আইরা মেয়েটা উঠতে বসতে পড়ে।চঞ্চল বলেই কি এমন এক্সিডেন্ট প্রতিনিয়ত ঘটে?

মাহের আর আরহামের মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা একসাথেই।সেই সময়ে কত যাওয়া আসা হয়েছে তাদের বাড়ি।ছোট্ট উমায়ের পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতো।ভাইয়ের পাশে এসে বসে থাকতো।তালিম করানোর সময় বাবার কোলে এসে বসে থাকতেন চুপচাপ।আরহাম তাকে আদর করে কতো চকোলেট-টয়েস দিয়েছেন সেটা মনে হতেই আরহামের মস্তক অবনমিত হয়ে যায়।সেদিনের এই পিচ্চিটার উপরে ভেতরে ভেতরে এত দূর্বলতা ছিল?
তারপর আরহামের পরিবার চলে যান শহরে।মাহের এর সাথে রাজধানীতেই বেশীরভাগ দেখা হতো।মিশর যাওয়ার আগেও গ্রামে এসেছেন বেশ কয়েকবার।কিন্তু তাকে আর দেখেন নি।মাহেরই কোনো একদিন কথায় কথায় বলেছিলো, সে পরপুরুষের সামনে বের হতে চায় না।মাহের অনেক জোর জবরদস্তি করেও তাকে জেনারেল লাইনে পড়ানো যায় নি।অতপর বাবার ইচ্ছেমতোই সে অ্যারাবিক লাইনে পড়েছে,এখনও পড়ছে।
আরহাম মস্তিষ্ক থেকে ঝেড়ে ফেললেন পুরনো ভাবনা।নিজের আবেগকে কন্ট্রোল করতে এখন সক্ষম তিনি।এই যেমন গত তিন চারদিনেও তাঁর ছায়াঁটার আশপাশে অবধি পড়েন নি আরহাম।সকাল সকাল বেরিয়ে যেতেন,ফিরতেন রাত করে।মাহের খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবে উনাকে।
নতুন বাসায় উনাকে নতুন একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে যেটা সম্পর্কে উনি এখনো অবগত নয়।আরহাম আয়নায় হাতের আঙ্গুলগুলো চুলে ঢুকিয়ে গুছিয়ে নিলেন চুলগুলো।টেবিলে রাখা তাজা বেলি ফুলের ঘ্রাণ পুরো কক্ষে ছড়িয়ে গেছে।আরহাম চুপিচুপি সেটা আড়াল করে মাইমুনার রুমের দিকে এগোলেন।

হাফসার বিনুনি করা লম্বা চুলগুলো নিয়ে খেলা করছে আইরা।মাইমুনা তাঁর সাথে কথা বলায় ব্যস্ত।হাফসা যদিও কথা বলতে পারে না।তবে তাঁর আচরন নিঁখুত ভাবে কথাগুলো বুঝিয়ে দেয়।এমন ফুটফুটে একটা মেয়ের জন্য মাইমুনার খারাপ লাগে।উনি শুধু জেনেছেন, হাফসার জন্ম থেকে এ সমস্যা না।তাঁর চৌদ্দ বছর বয়স থেকে এ সমস্যা।আর সেটাও একটা ইন্সিডেন্টের পর থেকে।এ ব্যাপারে বেশ ক’বার জিজ্ঞেস করেও উত্তর পাননি মাইমুনা।
হাফসা তৈরী হচ্ছে কাল চলে যাওয়ার জন্য।ব্যাগ গুছাতে গেলেই আইরা গোছানো কাপড় এলোমেলো করে দেয়।গাল ফুলিয়ে বসে থাকে মেয়েটা।হাফসা মুচকি হেসে তাকে ইশারায় বুঝায়, এই বাচ্চা মেয়েকে সেও ভীষণ মিস করবে।কিন্তু এবার তাকে ফিরতে হবে।
হাফসা যখন ইশারায় কথা বলে তখন তাঁর গোল গোল চোখগুলোও যেনো তাল মিলায়।আইরা অবাক হয়ে দেখে তাকে।

ওদের তিনজনের জমজমাট আড্ডার মাঝে আম্মু এসে বললেন, ‘মাইমুনা তোমাকে আরহাম খুঁজছে।’
হাফসার সঙ্গ ত্যাগ করতে ইচ্ছে হলো না মাইমুনার।মাকে আবদারের সুরে বলল, ‘একটু পরে যাচ্ছি আম্মু।’
‘আরহাম রাগ করবে।অনেকক্ষণ থেকে তোমার অপেক্ষায় আছে।’
মাইমুনা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়।আম্মু বেরিয়ে যেতেই সে হাফ ছেড়ে বলল, ‘একটু পর এমনিতেই যাব আমি।আর একটু গল্প করে নিই।তোমাকে তো আর পাবো না।’

‘হুয়াট ইজ দিস?আমাকে রীতিমতো ইগনোর করছেন আপনি।’
‘উহু শাহ।আমি তো শুধু হাফসার সাথে…
‘কতক্ষণ তো ছিলেন।তারপরও?’
‘ও তো এখন এমনিই একা হয়ে যাবে।তাই একটু গল্প করলাম।’
‘আপনার সাথে ঠিকমতো কথাও হয়নি এখন পর্যন্ত।’
‘আমিও তো রেগে ছিলাম না?কাটাকাটি হয়ে যাক?’
আরহাম না পারতেও হেসে ফেললেন।মাইমুনার এলোচুল আলতো স্পর্শে কানের পিঠে গুজে দিতে দিতে বললেন, ‘আজকে রাতে ঘুরতে যাবো।’
সত্যি?সত্যি বলছেন?আপনি শাহ একথা বলছেন?’
‘বলতে পারি না?’
‘সবসময় তো আমি রিকুয়েস্ট করতে হয়।’
‘এবার আমি করলাম।এবার ছাদে চলুন।দারুন ওয়েদার আজকের।’

মাইমুনা আর আরহাম ছাদের দিকে এগোচ্ছেন।মাইমুনা জানতে চাইলো, ‘আইরাও যাবে তো?’
‘জ্বি না।আমি আর আপনি শুধু।’
‘সম্ভবই না।ও তো মেঝেতে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে পাগল হয়ে যাবে।’
আরহাম হাসলেন।মাইমুনাকে দোলনায় বসিয়ে বললেন, ‘আইরার ফিউচার নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।’
‘সী ইজ অনলি সেভেনটিন।’
‘এখনই না।এইটিন হয়ে যাবে।’
‘তাহলে কি আর।পাএ খুঁজুন।অনেকদিন হলো বিয়ে খাই না।’
‘সংসার করার মতো এডাল্ট না সে।এই পাগলকে নিবে কে?’
‘আমার ননাস কে নিয়ে এসব কথা আমি মানতে নারাজ।ওকে নেওয়ার পাগলের অভাব নেই।’
‘যেমন?’

‘একজনের কথা জানি।তবে সিক্রেট।’
‘মানে?ইজ সী কমিটেড উইথ সামওয়ান?’
‘আরে রেগে যাচ্ছেন কেন শাহ?এমন কিছুই না।’
‘এখানে ভালো লাগছে না।নিচে চলুন।’
‘ওয়েট।’
মাইমুনা গভীর দৃষ্টিতে তাকায় আরহামের দিকে।আরহাম অপ্রস্তুতভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হু?’
‘আপনি এখনো স্বাভাবিক হতে পারেন নি।’
‘অবশ্যই পোরেছি।’
‘ আপনি তিন বছরের চেনা মানুষ আমার।কেন মিথ্যে বলছেন?’
‘মিথ্যে নয়।তবে আমি স্বাভাবিক আছি।’
‘তাই?’
‘একদম।’
‘হাফসাকে পছন্দ করেন?’
‘শুধু উনার কথা….
প্রশ্নটা মস্তিষ্কে পৌঁছতেই কথা বন্ধ হয়ে যায় আরহামের।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসব আজেবাজে প্রশ্ন কেন?’
‘হ্যাঁ অথবা না?’

আরহাম চমকাতেও চেয়েও পারছেন না।মাইমুনা এসব বিষয় জানার কথা না।তবে?
‘উত্তর দিন।’
‘না।’
‘মিথ্যে বলছেন।’
‘কেনো মিথ্যে বলবো?তাকে কেন পছন্দ করবো আমি?সী হিজ গায়রে মাহরাম ফর মি।’
‘মাহরাম হলে তো ফেতনার ভয় থাকতো না।’
আরহামের অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো।ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে কেন জানি।তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টায় বললেন, ‘আমি পছন্দ করি না।এসব কি ধরনের প্রশ্ন?’
‘আজ ওকে অনেক কটু কথা বলেছি আমি।শুধুমাএ আপনি ওকে পছন্দ করেন বলে।এক হাতে তাকি বাজে না।’
আরহামের মেজাজ বিগড়ে গেলো মুহুর্তেই।কঠিনস্বরে বললেন, ‘মানে?এসব আপনাকে কে বলে?উনার সাথে কেনো খারাপ বিহ্যাভ করেছেন?’
‘কজ আপনি তাকে পছন্দ করেন।’
আরহাম রাগের মাথায় বলে উঠলেন, ‘না।আমি তাকে পছন্দ করতাম।উনি করেন না।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৯

মাইমুনা অদ্ভুত হাসি হাসলো।যে হাসিতে লুকিয়ে আছে কেবল যন্ত্রণার সুঁচ।আরহামকর মস্তক অবনমিত হয়ে যায়।ইতিমধ্যে ভেতরে চেপে থাকা কথাটা তিনি উগড়ে ফেলেছেন।এবার মাইমুনাকে কীভাবে বুঝাবেন!গতরাত টা কত বাজেভাবে কেটেছে উনার শুধুমাত্র উমায়েরে’র বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে!সবার সামনে স্বাভাবিক থাকলেও উনার বুকের ভেতরে যেনো খোদ আকাশটাই চেপে বসেছে সেটা কাকে বলবেন তিনি?এই হারাম ফিলিংস থেকে তবেই বের হতে পারবেন যদি ফাইনালি উনার নিকাহ টা হয়ে যায়।আরহাম সেই অপেক্ষাতেই আছেন।কিন্তু সেকেন্ড গুলোও যে ঘন্টার গতিতে কাটছে উনার!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১১