Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৮

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৮

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৮
Maha Aarat

শরতের রূপের তুলনা নেই। শিউলিঝরা সকাল, দূর্বাঘাসে শিশিরের ফোঁটা, নদীতীর বা বনের প্রান্তে কাশফুলের সাদা এলোকেশের দোলা, আকাশের নরম নীল ছুঁয়ে ভাসা শুভ্র মেঘের দল, নৌকার পালে বিলাসী হাওয়া—বাংলার শরতে প্রকৃতির এমনই মনভোলানো দান।এছাড়া ভেসে বেড়ানো মেঘের প্রান্ত ছুঁয়ে উড়ে চলা পাখপাখালির ঝাঁক, বাঁশবনে ডাহুকের ডাকাডাকি, বিলঝিলের ডুবো ডুবো জলে জড়িয়ে থাকা শালুক পাতা, আঁধারের বুক চিরে জোনাকির রুপালি সেলাই, ঘোর লাগা চাঁদের আলো—কী নেই এই ঋতুর কাছে। শরতের এক আনন্দময় ঘ্রাণ আছে। হয়তো এ জন্য বলা হয়ে থাকে, প্রকৃতিতে শরৎ আসে ‘নববধূর মতো’।

গ্রীষ্মের দাবদাহ আর বর্ষাকালের অবিরাম বর্ষণের পর এই ঋতু জনজীবনে আসে ভিন্ন চেহারায়, স্বস্তি নিয়ে। প্রকৃতি হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ ও মনোরম। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে মাঠে তখন কচি ধানের হেলেদুলে কাটানো কৈশোর। এমন সবুজের সমারোহে কবিমন গেয়ে ওঠে, ‘আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা, নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।’
শরতের রূপটাই এমন, যে রূপে সাধারণের মনটাও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠে। অবসাদগ্রস্ত মনটাতেও নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।
দূপুরের ভোজের আয়োজনে শুধু মাহের,আহমাদ সহ হাফসার ফুপিরা।গুটিকতক মেহমান নিয়ে লাঞ্চ শেষে গেস্টরুমে তাদের রেস্ট নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।হাফসার সাথে এ নিয়ে সকাল থেকে তৃতীয়বার দেখা আরহামের।আম্মুর রুমে চুপচাপ বসে ছিলো সে।লাঞ্চের আগে মাহের মাএ কিছুসময়ের জন্য কথা বলেছিলেন।আরহাম রুমে এসে বললেন, ‘নিচে আসবেন?বাবা,মাহের কথা বলতে চান।’
হাফসা চুপিচুপি আরহামের পিছু পিছু এলো।আরহাম কিছুক্ষণ তাদের সাথে বসলেও উনার জন্য হাফসার সংকোচবোধ করায় উঠে গিয়েছিলেন।

মাহের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?’
হাফসা মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কবে সে বাড়ি যাবে?’
মাহের হেসে উত্তর দিলেন, ‘খুব শীঘ্রই।’
কুশলাদি আরো আলাপ-আলাপচরিতার হাফসা কাকামণির দিকে ইশারা করে বলল, ‘ভাইয়ার জন্য মেয়ে দেখতে।মাহের এ প্রসঙ্গ একেবারেই এড়িয়ে গেলেন।কাকামণির নীরব হাসির সংকেত বুঝে হাফসা কিছুটা স্বস্তি পেলেও মাহেরের এ নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।তাদের সাথে স্বল্প আলাপ শেষ হতেই ফুপিদের সাথে মিট হলো।আরহামের রাজকীয় অবস্থা দেখে তাঁরা বরাবরই আওড়াচ্ছেন, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে।হাফসার স্বামী তো বিশাল বড়লোক।শুধু আরেক বউ না থাকলেই হতো।হাফসার কেন জানি রাগ হচ্ছিলো।আপুকে নিয়ে যেখানে তাঁর নিজের কোনো আপত্তি নেই,সেখানে তাদের এতো অবজেকশন কিসের!

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আযান পড়লো।মেহমানরা বিকেলের আগেই রওয়ানা দিয়েছেন।শোনশান পরিবেশে নীরবতা নেমে এলো।কিছুক্ষণ আগেও মেহমানে ভরপুর পরিবেশ এখন একান্তই নীরব।আইরা টারও নড়চড় নেই।হাফসা ভাবলো,নামাজ শেষে একবার তাঁর রুমে যাবে।
পরেরদিন দূপুর~
আইরা অসুস্থ।মায়ের শরীর ভালো না বলে আরহাম নিজেই তাকে ডক্টরে নিয়ে এলেন।একজন ফিমেইল ডক্টরের কাছেই আইরা সবসময় চেকাপ করায়।ডক্টরের সাথে মিট হওয়া বাদে টেস্ট করিয়ে সেটার রিপোর্টের জন্য একঘন্টা অপেক্ষা করার কথা বললে আরহাম হাতঘড়িতে তাকান।এই টেস্টের রিপোর্ট আসা বাদে তাকে আরেকটা টেস্টের জন্য প্রিপেয়ার হতে হবে।কিন্তু এত দীর্ঘ সময় কীভাবে কাটানো যায়?
আরহাম খানিক ভেবে বললেন, ‘আমি একটু উপরে যাবো।তুমি কি একা এখানে বসবে?’
গার্লস ওয়েটিং রুম দেখিয়ে আরহাম প্রশ্ন ছুঁড়লে আইরা একবাক্যে দ্বিমত করে বলে, ‘একা ভয় লাগবে।’
‘আচ্ছা চলো।’

উপরের ফ্লোরে এসে আইরা নিকাবের নিচ দিয়ে গাঢ় দৃষ্টি ফেললো কাঁচের দরজায়।আরহাম কাউকে টেক্সট করার কিছুক্ষণের মধ্যেই অমি বেরিয়ে আসলো।আরহামের সাথে মুসাফাহা শেষে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ করলো।
মাহের উঠে এসে আরহামের সাথে কুশল বিনিময় করে পেছনে তাকালেন একবার।আরহাম আইরাকে ইশারা করে বললেন, ‘ওদিকে গিয়ে বসো।’
দূই বন্ধু একসাথে বসে পড়লেন।আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘পেশেন্ট নেই তো?’
‘এখন নেই।যোহররে সময় হয়ে এসেছে তাই।’
আরও কিছু কথোপকথনের মধ্যে আরহামের ফোন এসে ডুকলো।কল ধরে ওপাশের আওয়াজ শুনতেই উনার কপালে ভাঁজ পড়লো।চোখেমুখে আতঙ্ক রেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন ফ্যাক্টরিতে?কখন?’
উত্তর শুনে তিনি সাথে সাথে জবাব দিলেন, ‘এক্ষুণি আসছি।’
ফোন রাখতেই মাহের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হলো?কোনো সমস্যা?’
আরহাম দ্রুততা নিয়ে বলে উঠলেন, ‘তুমি কি কাইন্ডলি আইরাকে একটু বাসায় পৌঁছে দিতে পারবে?প্লিজ?আমাকে এখুনি যেতে হবে।’

‘কি হয়েছে সেটা বলো?’
‘ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগেছে।’
আরহাম আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালেন না।আইরা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের যাওয়ার দিকে।মাহের নিজেও কোনো কথা খুঁজে পেলেন না।
কিছুক্ষণ পেরোতেই মাহের ফোনে দৃষ্টি রেখে বললেন, ‘কিছু সময় অপেক্ষা করুন।একটু পরে বেরোব।’
বলতে বলতে তিনি হয়তো কারোর নাম্বারে ডায়াল করলেন।কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো রেসপন্স না আসায় নিজের কাজে মনোযোগী হলেন।
মাহেরের থেকে হাত তিনেক দূরে বসে আছে সে।বসে আছে বললে ভুল হবে বরং ছটফট করছে বলতে হবে।ক্যালেন্ডার টা নেড়ে নেড়ে দেখা শেষ হলে পেশেন্ট এর এ্যাপ্রন টা নেড়েচেড়ে দেখছে।পেশেন্ট এর গ্লাসটাও চোখে নিতে মিস হয়নি।পেশেন্ট এর নির্দেশনাবালীর মেনুও দেখা শেষ।
গলায় খুশখুশ সহ্যের বাইরে যাওয়ায় একসময় বলেই ফেললো, ‘পানি খাবো।’
মাহের চোখ তুলে তাকালে দৃষ্টি নিচু করে নিলো সে।সেকেন্ড দূয়েক পর আড়চোখে তাকাতে দেখলো উনার দৃষ্টি সরে গেছে।টেলিফোন কল করে বললেন, ‘সফট ড্রিংক লাগবে।গার্ল সার্ভেন্ট দিয়ে পাঠাবে।’

অমির সাথে কয়েকদফা ঝগড়া শেষে এশা বাঁধা না মেনে রুমে ঢুকলোই।এশাকে দেখতেই মাহের আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকালেন।তেমনি আরেকজোড়া দৃষ্টিতেও সে গভীরভাবে আটকালো।
‘আপনি?এখানে কেন?’
এশা উত্তর দিলো, ‘আপনার সাথে আমার কথা বলা প্রয়োজন।’ বলতে বলতে সে চেয়ার টেনে মাহেরের মুখোমুখি বসে পড়লো।মাহের অগ্নি দৃষ্টিতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অমির দিকে তাকালেন।যে অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে এদিকেই।
টেবিলে এনে রাখা ড্রিংকসের বোতলে মুখ লাগিয়ে এক চুমুকে পানি খেয়ে বলতে লাগলো, ‘জানেন বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন কিন্তু আমি তো আপনাকে….

এতটুক বলে সে থামলো আইরাকে দেখে।ভ্রু কুঁচকে মাহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘উনি কে?এখানে কেন?’
তাঁর কন্ঠে তাচ্ছিল্যতা।সেই আভাস বুঝতে পেরে জ্বরে বুদ হয়ে আসা আইরার লাল চোখজোড়াতে অমনি অশ্রু জড়ো হলো।কিশোরী মন বিষিয়ে উঠলো অপরিচিতার উপস্থিতিতে।
‘আপনি কি প্রাইভেসি বুঝেন না?আপনি তো এডুকেটেড তাও বাঁধা সত্ত্বেও যখন তখন এন্ট্রি নিয়ে নিবেন?’
এশার চোখমুখে গম্ভীরতার চাপ ভাসলো।সে সূচালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, ‘যখন তখন মিনস?আপনি,আপনারা কি কোনো স্পেশাল মোমেন্ট লিড করছিলেন?’
‘যাস্ট সাট আপ!!’মাহেরের উচ্চ আওয়াজে ভয়ে লাফিয়ে উঠলো অমি।এই মেয়ে বাদে যে তাঁর উপর আজ তুফান যাবে,এটা ভেবেই সে ভীমড়ি খাচ্ছে।
মাহেরের উঁচু আওয়াজেও এশার কোনো হেলদোল নেই।সে সমানতালে জিজ্ঞেস করলো, ‘উনি কে?পেশেন্ট তো নয়ই।’

‘উ্ উনি স্যারের বন্ধুর বোন।’-অমি ভয়ার্ত কন্ঠে কথাটা বলতেই এশার চোখেমুখে আঁধার নেমে এলো।ভারী গলায় সে জিজ্ঞেস করলো, ‘তাহলে উনিই কি আপনার পছন্দ করা পাএী?’
মাহের স্বাভাবিকভাবে আইরার দিকে হেঁটে আসলেন।পাশাপাশি দাঁড়িয়ে উত্তর দিলেন, ‘হুম।’
উত্তর দিয়েই আইরার টেস্টের ফাইলটা নিজের হাতে নিয়ে আইরার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘চলো।বাসায় যাই।’
আইরার দৃষ্টিতে অবাকতার কোনো রেশ নেই।সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে মাহেররে সাথে বেরিয়ে গেলো।
তাঁরা চলে যেতেই অমি মেকি হেসে বলে, ‘এবার বিশ্বাস হয়েছে?উনাদের আক্বদ হয়ে গেছে।শুধু তুলে আনা বাকি।’
এশার চোখ ছলছল।নাক টানতে টানতে সে জিজ্ঞেস করলো, ‘কবে আক্বদ হলো?’
‘গতকালই।দাওয়াত পাননি?’
এশা রাগী দৃষ্টি ছুঁড়ে বেরিয়ে গেলো।
গাড়িতে উঠতেই মাহের সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে নিচুস্বরে বললেন, আমি আন্তরিকভাবে দূ:খিত।এটা না বলে উপায় ছিলো না।ফরগিভ মি।’
আইরার খুব জানতে ইচ্ছে হলো মেয়েটা কে।উত্তর না শুনে তাঁর অস্থিরতা কমছিলো না তাই জিজ্ঞেস করেই বসলো, ‘ক্ কে উনি?’
‘পেশেন্ট।’
আইরার চিন্তাভাবনায় বিঘ্ন ঘটালো ভাইয়ের ফোনে।কল ধরতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাসায় পৌঁছেছো?’
‘যাচ্ছি।’
‘পৌঁছে জানিয়ো।’

নিশুতি রাত।বাইরের আলোতে চারপাশটা একদম ঝকঝকে তকতকে।উঠোনে সবুজ আর্টিফিশিয়াল ঘাসের কার্পেট।একপাশের পিলারের সাথে ঝুলে আছে বাস্কেট।অন্যপাশে দোলনা।
একা ঘরে হাফসার দম বন্ধ লাগে।তবে এটা সে অস্বীকার করবে না,আরহাম নিজ থেকে কথা বলার চেষ্টা করেন।হাফসার জড়তা কাটানোর চেষ্টা করেন।কিন্তু লোকটার সামনে আসলেই তাঁর কী যেনো হয়!কী যেনো হয়!অদৃশ্য এক আত্না তাকে যেনো দমিয়ে রাখে।সে যেনো কথা বুঝাতে পারে না,কেউ তাঁর গলা চেপে ধরে।কিন্তু এমন কেন হয়।আরহাম নিয়ে কি তাঁর কোনো ফোবিয়া আছে?
আইরার সাথে গল্প করছিলো সে।গল্পে গল্পে আইরা বেমালুম বলে ফেলেছিলো আজকের ইন্সিডেন্টের কথা।শোনার সময় সেকেন্ডে সেকেন্ডে যেনো হাফসার এক্সাইটমেন্ট পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।পুরো ঘটনা বলার পর সে বলল,

‘ভাবি’পু মেয়েটা এতো একরোখা কেন?একদম গায়েপড়া স্বভাব।মেয়েরা থাকবে একটু লাজুক,চোখ নিচে রেখে কথা বলবে,আপনার মতো।’
হাফসা ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, ‘মেয়েটার নাম কি সে জানে?বাসা কোথায়?সে ভাইয়াকে পছন্দ করে?’
আইরার কেনজানি ভালো লাগলো না ভাবিপুর এক্সাইটমেন্ট।এই মেয়েকে নিয়ে তিনি হাবিজাবি প্রশ্ন কেন করবেন?
হাফসা পুনরায় প্রশ্ন করতেই আইরা অকপটে বলল, ‘জানিনা।’
দূজনের আলোচনায় আম্মু এসে হাফসার হাতে অরেন্জের গ্লাস দিয়ে বললেন, ‘আরহামকে দিয়ে আসো।ওর জন্য অপেক্ষা করলাম অথচ ও নাকি ডিনার করবে না।কেন জানি এতো মন খারাপ দেখলাম ওর।’
বলতে বলতে আম্মু দুশ্চিন্তা নিয়ে চলে যেতেই আইরা চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘আমাদের ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগেছে আজ।আমি যখন হসপিটালে ছিলাম ভাইয়ার ফোন আসলো।’
এতক্ষণের এক্সাইটমেন্ট উবে হাফসার চোখেমুখে জড়ো হলো ভয়।জড়তা আর অস্বস্তি কাটিয়ে সে ধীর পায়ে এগোলো আরহামের রুমের দিকে।এদিকে লোকটার কড়া আদেশ, এসব যেনো ঘূর্ণাক্ষরে আম্মু টের না পান।
ঘামে জবজবে জুব্বা গায়ে, এলোমেলো চুলে আঙ্গুল চালিয়ে কাউচে চুপচাপ বসে ছিলেন আরহাম।দরজায় নক হতেই দৃষ্টি তুলে হাফসাকে দেখতেই স্বাভাবিক হলেন তিনি।কিন্তু উনার দূ:শ্চিন্তার ছাপ যেনো বুঝিয়ে দিচ্ছে, উনার ভেতরের অস্থিরতা।
হাফসার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে কেবল বললেন, ‘জাযাকাল্লাহ।’
হাফসা ফিরে আসার সময় ঘুরে দেখলো, লোকটা গ্লাসটা বিছানার পাশে বক্সে রেখে আবারও অন্যমনষ্ক হয়ে পড়লেন।এতো কাছে থেকেও সে একটু ভরসা দিতে পারলো না।

বাসায় ফিরতে ফিরতে আজ রাত হলো বেশ।শাওয়ার নিয়ে রুমে ফিরতেই ডিনারের ডাক এলো।খাবার টেবিলে কাকামণিকে দেখে মুচকি হাসলেন মাহের।অন্য বিষয়াদি আলাপ করতে করতে কাকামণি ধীরে ধীরে বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই হাত থেমে গেলো মাহেরের।খাবার থামিয়ে ধীরসুরে বললেন, ‘আমি তো বেশ আছি,চাচা।আমার কোনোকিছুর অসুবিধা হচ্ছে না।আমার কাউকে প্রয়োজন নেই।’
‘কেন?তুমি কি চিরকুমার হয়ে থাকবে?’
চাকার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হতেই মাহেরের নজর যায় সেদিকে।হুইল চেয়ারে বসা দাদিকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি।আয়না শেখ,বয়স নব্বই এর কৌটায়।পারিবারিক ঝামেলার আগ থেকেই উনার বসবাস শহরে।সামাদ মুস্তাকিমের ডানহাত তিনি।গতকালই গ্রামে ফিরেছেন।মাহেরের সাথে টুকটাক কথা বলার এক ফাঁকে বললেন, ‘হাফসার সাথে দেখা হইছে?কেমন আছে ও?’
‘ভালো।’

‘শেষে বিয়াতি জামাই’এর কাছেই বইন বিয়া দিলা।আমার নাতিটারে(রিযাল) কেন ফিরায়া দিলা?ও কোন দিকে কম আছিলো?’
আহমাদ মা’য়ের বাঁকা কথা শুনে মা’কে চোখ ইশারা করলেন।মাহেরের মন মেজাজ এমনিতেই গরম,তাঁর উপর এমন প্রসঙ্গ আগুনে ঘি ঢালার মতো।
ছেলের নিষেধ না শুনে ভদ্রমহিলা কথা চলতি রেখে বললেন, ‘যা ঘটার ঘইট্টা গেছে,বইনের কপাল তো তুমিই পোড়াইবা।’
মাহেরের হাত থেমে গেলো।উনার নীরবতা বুঝিয়ে দিচ্ছে মস্তিষে বয়ে চলা অগ্নিকান্ড।
‘বিয়া-শাদীতে মুরব্বিদের পরামর্শ হুনোন লাগে।এখন তুমি একা কী করবা।জীবনডা এমনাই নষ্ঠ কইরো না।যাক গে,বাইরে আত্নীয় বাড়াইতে যাওনের দরকার নাই আর।আমরা চিন্তা করছি,ঘরের মাইয়া ঘরেই থাকবো।রিয়া’রে বিয়া করো তুমি।করলে তুমগো দূই পরিবারের ঝামেলাও মিইট্টা যাইবো।’
উক্ত কথাটা যথেষ্ট ছিলো মাহেরের গরম মস্তিস্কে শীশা ঢালার।রাগ সামলে খাবার রেখে উঠে যেতেই আহমাদ বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘দিলেন তো মা ওর রাগ তুলে।মেয়ের কি অভাব পড়েছে?’
‘রিয়ার মতো মেয়ে পাইবা না।দূজনের সুখেরই সংসার হইবো।

‘দরকার নেই।এত অন্যায় ভুলে যাব কি করে?’
‘বুঁড়ার কথা মুড়ায় লাগবো।আমার কথা কেউ কানে নেয় না।বাইরের মাইয়া ঘরে আইনা ধ্বংস ডাইকা আনতেছে ওরা।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৭

রুমে এসে লাইট নিভিয়ে মাথায় বালিশ চেপে ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হলেন মাহের।স্মৃতিতে পুরনো ঘটনা ভাসছে।মায়ের মুখ যতবার স্মরনে আসে,ততবার কাছের মানুষের দেওয়া আঘাতের ঘা যেনো আরো তাজা হয়ে উঠে।একটা নারী’ই একটা পরিবার ধ্বংস করতে পারে।মাহেরের আক্ষেপ বাড়তেই বুকের ভেতর যন্ত্রণাদায়ক অনুভব অনুভব করলেন।এই অনুভূতি উনাকে কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে জানা নেই তবে মা হারানোর আফসোস উনার কোনোদিনই ঘুচবে না।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৯