অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৯
Maha Aarat
আরহামের হাতে দূটো অপশন।প্রথমটা হচ্ছে, তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া ,দ্বিতীয়টা হচ্ছে, সম্মুখ শাস্তি।
আজকের সকালের ঘটনা টা ছিল অত্যন্ত দূরুহ ও লজ্জ্বাজনক।ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আরহামের কাছে বিভিন্ন কল,টেক্সট আসতে থাকে।প্রথমে ফোন, তারপর বার্তা, তারপর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া একটি ভয়েস ক্লিপ।
কল ধরলেই শোনা যাচ্ছে,তিরস্কারের বুলি।আরহাম প্রথমে শকড হয়ে যান।কিন্তু পরক্ষনেই উক্ত ঘটনা সম্পর্ক অবগত হতেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন।
মধ্যরাতে উনার প্রতিষ্ঠানের মেইন ভার্চুয়াল ব্র্যাঞ্চ হ্যাক করে সেখানে একটা অডিও ক্লিপ আপলোড করা হয়েছে।বিজনেস রিলেটেড অফিসিয়াল ভার্চুয়াল ব্র্যাঞ্চ পোর্টালেও সেই একই ভয়েস ক্লিপ পোস্ট করা হয়েছে।
যাতে আরহামের ভয়েসে শোনা যায় তাদের দূজনের একান্ত কথোপকথন।যে কেউ বিশ্বাস করে নিবে,এটা নির্ঘাত সত্যি।
অডিও ক্লিপে কিছু বাক্য কিছু নীরবতা।কিন্তু এই নীরবতার শক্তি যেনো আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।একদম উনার কন্ঠে বলা কথা,তিনি নিজে বেটার হাফ সম্বোধন করছেন আদওয়া নামের কাউকে,আরহাম প্রথমে নিজেই যেনো দিশেহারা হয়ে যান।
হুলস্থুল করে নিচে নামলে দেখেন ড্রয়িংরুমে থমথমে পরিবেশ।আরহাম বুঝতে পারেন,এ ঘটনা সম্পর্কে ইতিমধ্যে সবাই অবগত।কথা হারিয়ে যায় উনার।এমন ঘোর শত্রুতামি কে করতে পারে।আর এটা এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ,যাতে চেনা সবারই কাছে বিস্ময়কর কিছু হয়ে দাঁড়াবে।
আহনাফ তাজওয়ার যখন উদভ্রান্তের মতো আরহামকে জিজ্ঞেস করছিলেন,কে কারা তোমার সাথে এমন করতে পারে তিনি শুধু উত্তর দিয়েছিলেন ,আপনার বন্ধুর কাছে জিজ্ঞেস করুন।
অতপর আদওয়ার আগমন এই বাড়িতে।অল্প সময়ের ব্যবধানে দূ পরিবার মুখোমুখি।এ ঘটনা সম্পর্কে আদওয়ার মা বাবা এ বাড়িতে আসার আগে কেউই অবগত ছিলেন না।আসার পর বিস্তারিত শুনতেই লজ্জ্বায় ,অপমানে মাথা হেট হয়ে যায় তাদের।একপাশে জড়োসড়ো হয়ে বসা কোণায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বসা আদওয়ার দিকে দৃষ্টিপাত হয় তাদের,কেবল এক জোড়া চোখ ছাড়া।
সে স্বীকার করলো,এ ঘটনা সে নিজেই ঘটিয়েছে।কিন্তু তার এখনকার মতামত হলো,সে বুঝতে পারেনি,এটা আরহামের ক্যারিয়ারে এতো অমাবস্যা নিয়ে আসবে,আরহামের রেপুটেশনে প্রশ্ন তুলবে।মিসেস আফসানা রাগে,ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘তোমার কি ক্ষতি করেছে আমার ছেলে?তুমি কি জন্য তাকে জীবিত অবস্থাই মরে যাওয়ার শাস্তি দিচ্ছো?’
আদওয়ার বুকে ঢিপঢিপ ভয়,তবুও দৃঢ় কন্ঠস্বর বজায় রেখেই সে জবাব দিলো, ‘আমি উনাকে ভালোবাসি।’
‘ভেরী সুন সে সন্তানের বাবা হতে যাচ্ছে।আর দূই দূইজন স্ত্রী রেখে সে তোমার মতো সাইকো মেয়ের দিকে কেন তাকাবে?’
আদওয়ার ব্রেইনে কেবল খেলে গেলো “সাইকো” শব্দটা।সে তো তাঁর পছন্দের মানুষকে পাবার জন্যই এত সব করেছে।কেউ কেনো তাকে বুঝতে চাইছে না।আরহামকে পাওয়ার জন্য যতোটা সাইকো হতে হয় সে হবেই।এতে তাঁর কিছু যায় আসে না।উচ্চ আওয়াজে সে মিসেস আফসানার উত্তর দিলো,
‘আমি তো এসব কিছুই করতে চাইনি।ভালোয় ভালোয় আমাকে মেনো নিলে কি হতো।আমি কি এতোটাই খারাপ কেউ?উনাকে আমি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি।উনি আমাকে অপমান করে রিজেক্ট করে দিয়েছেন তাই বোধ হারিয়ে এরকমটা করতে বাধ্য হয়েছি।’
আহনাফ তাজওয়ার সহ আড়ালে থাকা আরও দূজোড়া চোখ চমকে তাকায় আরহামের দিকে।আরহামের এলোমেলো চুল,নীরব নিঠুর চেহারা,রাগে জ্বলজ্বল করা চোখ আর শক্ত মুভভঙ্গি দৃষ্টিগোচর হলো না ভদ্রলোকের।
তিনি জিজ্ঞেস করলে আরহাম উত্তর দিলেন বেশ কিছুক্ষণ পর,
‘এটা কি সত্যি?’
তিনি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়তেই বাকিটুকু আদওয়া নিজেই ব্যখ্যা করতে গিয়ে বলল, ‘এ নিয়ে তিনবার প্রস্তাব দিয়েছি, ‘আসুন হালাল সম্পর্কে যাই ‘ উনি আমাকে অপমান করেছেন।ফিরিয়ে দিয়েছেন।’
‘তুমি একটাবার আমাকে জানাতে পারতে?’-আরহামের উদ্দেশ্যে আহনাফ তাজওয়ারের এর উৎসু্ক স্বর!
‘কি করতেন আপনি?আমাকে বিয়ে দিয়ে দিতেন,রাইট?’
আরহামের শক্তস্বরে ভদ্রলোকের মুখ চুপসে এলো।আরহাম এবার মুখ খুললেন,মিসেস সেমু আর আয়বীর সাহেবের উদ্দেশ্যে কেবল বললেন, ‘শিক্ষা দিয়েছেন ঠিক,কিন্তু ভালো কিছু না।আপনাদের সাইকো মেয়েকে আমার সামনে থেকে নিয়ে যান।ওয়াল্লাহি আর কোনো কিছু হবে,আমি ছেড়ে দেব না।’
আদওয়া এবার নিজের মুখ্যম চাল চাললো।পকেট থেকে বের করলো ধারালো কোনো ছুরি।নিজের দিকে তাক করে বলল, ‘ব্যাপারটা যেহেতু এতদূর গড়িয়ে গিয়েছেই,আমিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাড়ছি না।আমি কিছু করে ফেলবো,আমি জানিনা আমি সত্যি কিছু করে ফেলবো!’
এই প্রথমবারের মতো আরহাম তাঁর উদ্দেশ্য কথা বললেন।এই প্রথমবার! জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ অথচ নিয়ন্ত্রিত এক আগুনের মতো কণ্ঠে তিনি বললেন,
— ‘আল্লাহর কসম করে বলছি, যদি নিজেকে আঘাত করেন,আমি ফিরেও তাকাবো না।
মিসেস সেমু দৌড়ে এসে মেয়ের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিতে চাইলেন।আয়বীর সাহেব কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “বাবা আরহাম, ক্ষমা করে দাও। আমরা জানতাম না ও এতটা দূরে চলে গেছে।”
আরহাম কিছু বললেন না। শুধু আদওয়ার উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো বললেন,
“আপনি না আমাকে ইহকালে পাবেন,না পরকালে দোষী বানাতে পারবেন।আপনি আমার সামনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেও আমি বাঁধা দিবো না,বোধ হারাবো না।গায়রে মাহরাম তো গায়রে মাহরামই।”
আরহামও নিজের শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলে সেও নিজের জেদটাকে জিতিয়ে নিতে নিজেকে গুরুতরভাবে আঘাত করেই বসলো।উপস্থিত সবাই কেঁপে উঠলো,উদগ্রীব হলো,অথচ আরহাম টললেন না।চুপচাপ নিজের অবস্থান আলাদা করে নিলেন।
সন্ধ্যার সময়।
সন্ধ্যার আবছা আলোয় বারান্দায় একা বসে ছিলেন আরহাম।সামনে পর্দা দুলছে,আলতো বাতাসে নড়ে উঠছে, কিন্তু উনার দৃষ্টি সেখানে স্থির হলো না একবারও।
উনার শরীরে ক্লান্তি নেই, কিন্তু হৃদয়? যেন একধরনের নিঃশব্দ অনুতাপ ছড়িয়ে আছে ওখানে। ঠিক তখনই হাফসা এসে চায়ের কাপ রেখে গেলো উনার পাশে। কোনো কথা বললেন না, চোখেও তাকালেন না। শুধু শব্দ করে রাখা কাপটাই যেন বলে গেল—“আপনার প্রতি যত্ন আছে, কিন্তু আপনি এখন অনেক দূরের মানুষ।”
মাইমুনাও আজ একটিবার চোখ তুলে তাকাননি।দূজনেই কোনো কথা বলেন নি।
আরহাম বুঝলেন, তারা তাঁকে সন্দেহ করছে না—তবে তারা ব্যথিত। তবে একটা অদ্ভুত নিরাসক্ত অভিমান জমে উঠেছে দুজনের ভেতর।যেন তারা ভেবেছে—’শুরুটাই যখন জানান নি,তবে শেষটায়ও অনিমন্ত্রিত অতিথি হতে চাই না।’
এই অবহেলা ছিল না আগে।
দুমড়েমুচড়ে যাওয়া হৃদয়ের ব্যথা সহ্য করা যেন অসহনীয় হয়ে উঠেছে আরহামের কাছে।উনার অপরাধ একটাই,আদওয়া নামের মেয়েটার পাগলামি,আরহাম কে এতো করে চাওয়ার আকাঙ্খা বা তাঁর বার্তা বা প্রস্তাব,এসব কিছু সম্পর্কে তিনি তাদের জানান নি।এটাই অপরাধ!
অথচ আরহাম ভয় পেয়েছিলেন।ভেবেছিলেন, সত্য বললেও যদি আঘাত লাগে…
তখন তো তিনিই হয়ে যাবেন সেই আগুনের প্রথম ছাই।
তিনি চাননি আদওয়ার কাহিনি ঘর পর্যন্ত পৌঁছাক। কিন্তু যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। হয়তো কেউ জেনেছে, হয়তো অনেকেই জেনেছে,বিশ্বাস করেছে,সত্য বলে ধরে নিয়েছে।আরহাম জানেন না। তবে অনুভব করেন—উনাকে ঘিরে একধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।যে শূন্যতার কোনো সঙ্গী নেই!
রাত দশটা।
হাফসা কুরআনের তাফসীর পড়ছে বিছানার একপাশে। শব্দ নেই।
মাইমুনা অন্য পাশে একই রুমে,চুপচাপ বইয়ের পাতায় চোখ রাখছে।কিন্তু দুজনেই জানে—আরহাম তাদের পাশেই এসে দাঁড়িয়েছেন,অনেকক্ষণ ধরে।
“একটু কথা বলব?”
আরহামের গলা কাঁপা কাঁপা।
মাইমুনা তাকাল না।হাফসা একটু মাথা নাড়লো।
আরহাম বিছানার পাশে বসলেন। তারপর বললেন—
‘আমি আপনাদের তো কোনো কষ্ট দিই নি,আমার সাথে এমন কেন করছেন আপনারা?মাইমুনা, হাফসা… আপনারাই তো আমার সব। আর যদি আপনাদের নিরাসক্ত আচরণ পাই, তাহলে কোথায় যাবো?”
হাফসা বই বন্ধ করলো। কণ্ঠে বিন্দুমাত্র রাগ নেই, তবু ব্যথা ফুটে উঠলো—
— “আপনি একা ছিলেন, বলেই তো কিছুই বলেননি আমাদের। সব একাই সামলেছেন। তো, আজ আমরাও মনে করছি—আমরা না থাকলে আপনিও ঠিকই সামলে নেবেন নিজেকে।”
মাইমুনাও এবার ধীর কণ্ঠে বললো—
— “আপনাকে নিয়ে রাগ নেই। শুধু একরকম দূরত্ব মনে হয়। আপনি দূরে চলে গেছেন, আমরাও পিছু টানতে পারিনি।
আপনার জীবন নিয়ে আপনি যতটা একা থাকতে চান,আমরাও ঠিক ততটাই পেছনে সরে যেতে জানি।”
আরহাম দুহাতে মুখ ঢাকলেন। এই দুটি নারীই তাঁর জীবন। আজ কেউ সন্দেহ করেনি তাঁকে—তবু ভালোবাসার সেই উষ্ণ ছায়া হারিয়ে গেছে যেন।
‘আল্লাহ… আমার কোনো অভিযোগ নেই… কিন্তু তাদের ভালোবাসা চাই।আমি আমার আগের স্ত্রীদের চাই,আমি অনেক ক্লান্ত, ইয়া রব্বি।”
রাত গভীর
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।
নীরবতার বুক চিরে ঘড়ির কাঁটা যেন শুধু বলে যাচ্ছে—তুমি একা, তুমি নিঃসঙ্গ।
আরহাম ধীরে উঠে দাঁড়ালেন বিছানার পাশের টুল থেকে। পাশের দুটি মানুষ—তাঁর প্রাণ, তাঁর শান্তির দুই আশ্রয়—ঘুমিয়ে আছে, অথচ কতটা দূরে আজ তাঁরা।
চুপচাপ নিজের রুমে এসে ওয়াশরুমে গিয়ে অযু করলেন। ঠান্ডা পানি গড়িয়ে পড়লো হাতে, মুখে, হৃদয়ে।
কাঁধে একটি পাতলা চাদর ফেলে, নিঃশব্দে জায়নামাজ পেতে দাঁড়ালেন তাহাজ্জুদের নামাজে।
প্রথম তাকবীরেই উনার ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
সিজদায় যেতেই চোখ থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়লো অশ্রু, চোয়ালের কাছ থেকে মাটিতে।
গলার স্বর কাঁপছে, অথচ তাতে কান্নার চেয়ে বেশি ছিল একটা পুরুষের ভেঙে পড়া আত্মা।
‘আল্লাহ… আমার কোনো অভিযোগ নেই… তোমার দেওয়া সব নিয়ামতে আমি সন্তুষ্ট কিন্তু তাদের ভালোবাসা চাই।আমি আমার আগের স্ত্রীদের চাই,আমি অনেক ক্লান্ত, ইয়া রাব্বি,ইয়া আরহামার রাহীমিন।
ইয়া রব্বি…
এই হৃদয়টা কষ্টে আছে।
এই বুকটা দুঃখে ভারী হয়ে গেছে।
আমার কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই।
শুধু উনাদের ভালোবাসা চাই।
তাদের আগের মতো চাই।
উনারা আমাকে ছেড়ে যায়নি,
তবু কেন জানি মনে হয়, আমি আর তাঁদের ঘরের কেউ নই।
আঁধারের মধ্যে কেবল কাঁপা কাঁপা স্বর আর চোখের জল।
একটি মানুষ, যাকে ঘিরে একসময় ভালোবাসার আলোকচ্ছটা ছিল—আজ যেন সেই আলো নিভে গেছে।
আরহাম আবার সিজদায় গেলেন।
এইবার তাঁর কণ্ঠ যেন একটু ভেঙে গেল—
— “আমার হৃদয় ক্লান্ত, ইয়া রব্বি।
আমি শক্ত হতে চেয়েছিলাম।
সব সামলে নিতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমি পারছিনা,
আমি ব্যর্থ।
ইয়া রাব্বি,আমাকে ঘিরে যেসব মিথ্যে অভিযোগ আর দোষারোপ সৃষ্টি হয়েছে ,তুমি অচিরেই সেগুলো মিটিয়ে নাও,
আমাকে নির্দোষ প্রমান করো,
আমার ওপর যারা ভুল অভিযোগ ফেলেছে,তাদের কঠিন হেদায়েত দাও,সঠিক বুঝ দাও,কিন্তু আমার ঘরের শান্তি ফিরিয়ে দাও!
নিরব সিজদা।
দীর্ঘ, নিঃস্বরে ভেজা সিজদা।
সালাত শেষে আরহাম আকাশের দিকে তাকালেন।
তাহাজ্জুদের আকাশ সবসময় সুন্দর হয়,
কিন্তু আজ যেন তাঁর চোখে তা ঘোলাটে।
তবু বিশ্বাস ছিল—
এই অশ্রু যার হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন,উনি কোনোদিন ঠকান না।
সকাল ১১টা।
আরহামের বাবা আহনাফ তাজওয়ার দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
চেহারায় দুশ্চিন্তা।
— “তোমার খবর রটেছে। আদওয়া এখনো থেমে থাকেনি।
আমরা চাই, এবার কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিব।নইলে তোমার সংসারেও প্রভাব পড়বে।”
আরহাম মাথা নিচু করলেন।
এই মানুষটিই জীবনের প্রতিটি পদে তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন, ভালোবাসার কাঠিন্যে গড়া যে আবরণ আজ আরহামকে সুরক্ষা দেয়।
— “আব্বু,আমি মিথ্যা বলিনি।
কিন্তু তারা তো শুধু আমার সত্ত্বা নয়, আমার হৃদয়েও আঘাত করেছে।’
আহনাফ তাজওয়ার ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
— “তোমার স্ত্রী’রা কিছু বলছে না ঠিক, কিন্তু তারা তো তোমার প্রতিচ্ছবি দেখে।
যদি তুমি দুর্বল হয়ে পড়ো, ওরাও গুটিয়ে যাবে।’
এই কথা যেন অন্তরবিদারক তির হয়ে বিদ্ধ করলো আরহামকে।
তিনি চুপচাপ বসে থাকলেন, আর মনে মনে ঠিক করলেন—এই সংসার, এই দুটি নারীর ভালোবাসা তিনি ফিরে আনবেন।যতই কষ্ট হোক, সব সত্য দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে।
দূপুরে একসাথে বসা হয় না আর।আগের আনন্দ ,উল্লাস উচ্ছাস কিছুই নেই,আইরা সবকিছু জেনেছে,সে আসতে চেয়েছিলো,মাহের আসতে চেয়েছিলেন,হাফসা না করে দিয়েছে।পরিস্থিতি এখনো বিগড়ানো।শান্ত হোক অতপর…
সব চিন্তা একপাশে রেখে নীরবে চোখ বুজে রইলো সে।হৃদয়ে এক সুর বাজছে,
প্রিয়তম,আপনি যখন কাঁদছিলেন,আমি দেখিনি।
কিন্তু আমার হৃদয়ে যেন একটা ব্যথা ছুঁয়ে গিয়েছিল।
আমি কি তবে সত্যিই দূরে সরে গেছি?”
ঈদের সকাল —
ফজরের নামাজের পর ঘরজুড়ে ছড়িয়ে ছিল ঈদের দিনের প্রথম আলো।
মসজিদ থেকে ঈদের তাকবীর ভেসে আসছিল—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…”
কিন্তু এই ঘরে, আজ যেন কিছু একটা কম।
আরহাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন মাঠের দিকে।লোকজন নতুন পাঞ্জাবি পরে ছুটছেন ঈদের জামাতের দিকে।
শিশুরা রঙিন জামায় হাসছে, ছোটাছুটি করছে, বেলুন উড়ছে বাতাসে।
কিন্তু উনার চোখে সেই দীপ্তি নেই।ঘটনার আজ চারদিন।অথচ সবকিছু এখনো মলিন।
হাফসা আজ সবুজ ড্রেস পরেছেন,কিন্তু চেহারায় কোনো সাজ নেই।
মাইমুনা নীল গাউন,এতো সৌন্দর্যের মাঝেও যেনো কিছু একটা কমতি।
আজ খুব সুন্দরভাবে রান্না হয়েছে—
পোলাও, রোস্ট, সেমাই, দই, পায়েস, বিফ তেহারি—সবই প্রস্তুত।
তবু রান্নাঘরে কোনো হাসি নেই, কোনোরকম গল্পের শব্দ নেই।
সকাল আটটা।
আরহাম ঈদের জামাত থেকে ফিরলেন।
সাথে কারও মিষ্টি শুভেচ্ছা নেই।
কেউ বলে না—“ঈদ মোবারক, আপনি ফিরে এলেন!”
শুধু একটা নীরব চা টেবিলে রাখা, হাফসার হাতে।
তিনি বললেন না কিছু।
শুধু বসে রইলেন, মাথা নিচু করে।
হাফসা চোখে চোখ রাখলেন না।
আজ ঈদের দিন শুরু হলো,যেন কোনো সাধারণ দিনের মতো।
মাইমুনা একটা সাদা বাটি এনে দিলেন—ভেতরে পায়েস।কেবল বললেন ,
— “ঈদের সকালে মিষ্টি খেতে হয়।”
তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না।
শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব।
আরহাম কেবল চেয়ে রইলেন পায়েসের দিকে।
— “আপনাদের মাঝে কোনো উচ্ছ্বাস নেই কেন?”
আরহাম খুব নিচু স্বরে বললেন।
‘তেমন কিছু না।এই যে আমরা হাসছি!’মাইমুনা বললেন।
হাসার চেষ্টা করলো দূজনে।
‘কষ্ট করে হাসার প্রয়োজন নেই।’
কোনো উত্তর এলো না,আরহামের হাতে শুষ্ক স্পর্শ এঁকে দূজনে পরপর সালাম পৌঁছে চলে গেলেন।
আরহাম কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না।এই দিনটি, যা অন্য সময় ছিল হাসির, গল্পের, প্রার্থনার,
আজ শুধু একধরনের নীরবতার বোঝা হয়ে ঝুলে আছে।
দুপুর।
একসাথে খাওয়ার সময় এলেও কেউ কোনো কথা বলে না।
চামচের শব্দ আর হালকা কাশির শব্দ ছাড়া কিছু নেই।
পাঁচজন মানুষ, এক টেবিলে,
তবু যেন পাঁচটা আলাদা জগতে বসে আছে।
ঈদের নতুন জামাকাপড় পরে ছবি তোলা হয়নি আজ।
কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরেনি “ঈদ মোবারক” বলে।
কেউ চোখে চোখ রেখে হাসেনি।
আরহামের মনে হলো—
এটা তো ঈদের দিন! অথচ এ যেন শোকের দিন…
খাবার টেবিলেই তিনি বললেন ,
‘আমি কি এমন কিছু করেছি যা আমাদের এই অবস্থায় এনে ফেললো?”
কারো উত্তর এলো না।
আহনাফ তাজওয়ার নিজেও এ প্রশ্নের উত্তরের আশায় ছিলেন।আরহাম চুপচাপ উঠে গেলেন টেবিল থেকে।
পিছনে হাফসা আর মাইমুনা তাকালেন,
কিন্তু কিছু বললেন না।
শুধু একরকম ব্যথিত কোমলতা লেগে রইলো সেই তাকানোর ভেতর।
রাত।
আরহাম ছাদে উঠে গেলেন একা।
নিচে মাইক বাজছে—পাড়ায় কোথাও কেউ ঈদের গানের সুরে আনন্দ করছে।
তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—
— “ইয়া আল্লাহ, তুমি আমাকে সব দিয়েছো,
কিন্তু এই ঘরের সেই হাসি,আনন্দ,যা সব ছিলো—আজ কোথায় গেলো?”
চোখ বেয়ে নেমে এলো এক ফোঁটা জল।
তারপর তিনি নিচে নেমে এলেন।
চুপচাপ একটা ছোট প্যাকেট বের করলেন—হাফসা ও মাইমুনার জন্য ঈদের উপহার।
তাঁরা অবাক হয়ে তাকালেন।
আরহাম কিছু না বলে বললেন—
— “ঈদের দিনেও আপনাদের প্রানবন্ত দেখিনি।’ অতপর খানিক থেমে বললেন ,
ঈদ মোবারক ,
আপনাদের দুজনকে আমি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসি।
এমন ভালোবাসা,
যা কখনো দাবি করে না,
শুধু পাশে থাকার প্রার্থনা করে।
আপনারা যদি মুখ ফিরিয়ে থাকেন,
তবুও আমি ফেরাবো না।
আপনারা যদি বুঝতে না পারেন,
তবুও আমি বোঝাতে ছাড়বো না।
কারণ আপনারা হারিয়ে গেলে—
ঈদের সকাল আর আমার জীবন,
দুটোই একসাথে রঙহীন হয়ে যাবে।
হাফসা পেছন ফিরলো,যেন চোখের জল আড়াল করতে।আরহামের সেটা চক্ষুর আড়াল হলো না।
মাইমুনা এগিয়ে এলেন—
প্যাকেট হাতে নিলেন, কিছু বললেন না।
তবু এই ছোট্ট উপহারের মাঝে যেন এক বিন্দু নরম ভাবনা ফিরে এলো।
ঈদের দিন শেষ হলো, কোনো ছবি তোলা হয়নি, কেউ কারও হাত ধরেনি।ভালোবাসার আলাপ হয়নি,প্রেমের উষ্ণ আলিঙ্গন হয়নি,
তবু ওই নীরবতার মাঝেই যেন জমেছে এক নতুন সূচনা—
ভালোবাসার, ক্ষমার, এবং ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
শেষ নয়, এক সূর্যাস্তের পরে ভোরের অপেক্ষা….
পরের দিনে খুব ভোরেই মাহের আসলেন।সোজা আরহামের কাছে গিয়েই জড়িয়ে ধরলেন বন্ধুকে।তবুও আরহামের সরব মেলে না।
‘তুমি কেনো এতো ভেঙে পড়ছো,আরহাম?এগুলো তো সত্যি না।আমরা এটা ক্লিয়ার করবো,এটার সমাধান আছে।’
‘তোমার বোনকে বলো,আমাকে ভুল না বুঝতে।তারা দূজনে আমার থেকে দূরে সরে গেছেন,মাহের।আমি এটা নিতেই পারছি না।আমি তো ক্ষমা চাচ্ছি। এতোগুলা দিন থেকে কষ্ট দেওয়ার মানে কি?’-আরহামের কাতর কন্ঠস্বর।
‘তুমি এজন্য বেশি আপসেট?ওকে আমি হাফসাকে বুঝিয়ে নিচ্ছি।সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ,বি কুল!’
হাফসার সাথে সাক্ষাৎ……
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৮
‘আরহামের সাথে এমন আচরণ কেন করছো?তুমি কি তাকে বিশ্বাস করো না?আরহাম ইজ ডিফরেন্ট,সে কখনো তোমাকে আঘাত দিবে না,তার এ দূ:সময়ে তুমি পাশে থাকার কথা ছিল ,তা নয় তাকে ভেতর থেকে শেষ করে ফেলছো যন্ত্রণা দিয়ে।’-মাহের।
হাফসার টনক নড়ে।সে নিজেও বুঝতে পারছে,লোকটাকে রীতিমতো আঘাত দিচ্ছে তারা।এবং নিজেরাও কষ্ট পাচ্ছে।এটার একটা সুন্দর সমাধান হওয়া জরুরী কিন্তু কীভাবে.
