Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৯

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৯

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৯
নুরিয়া ইসলাম

সূর্যাস্তের লালচে আলোয় ডুবে যাচ্ছে ছোট্ট এই লায়ারী টাউন, পশ্চিমের আকাশে মেঘের ফাঁকে আলোর রেখা মিলিয়ে যাচ্ছে, আর দূরের পাহাড়ের ছায়া গ্রাস করছে গোটা উপত্যকাকে।বাতাসে ভেসে আসছে নদীর ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে হাওয়া, যা গাছের পাতায় ঝিরঝিরে শব্দ তুলে কাঁপছে।কিন্তু শান্ত এই সন্ধ্যার বিপরীতে শেখ বাড়িতে উত্তেজনার ঝড় বইছে।পুরো বাড়ি অস্থির হয়ে কাজের লোকেরা ছুটছে, ফোন বাজছে, আর শেওনায়াজ শেখের লাঠির ঠকঠক শব্দ পাথরের উঠোনে প্রতিধ্বনি তুলছে, যেটা তার মেজাজের তীব্রতা প্রকাশ করছে।মারিয়া নিখোঁজ।

সকালে বাজারে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়েছিল, কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও তার দেখা নেই। ফোন বন্ধ, কোনো খোঁজ নেই।তানভীর উঠোনে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে, তার ভারী পদক্ষেপে পাথরের মেঝে ঝনঝন করে কেঁপে উঠছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, রক্ত শুকিয়ে মরুভূমির মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে।হাতে ফোন শক্ত করে চেপে ধরেছে, আঙুলের গাঁটগুলো চাপে সাদা হয়ে উঠেছে।পুলিশের সঙ্গে কথা বলছে, গলা ছেড়ে চিৎকার করছে, রাগ আর অসহায়তায় কথাগুলো ছুটে বেরোচ্ছে।ইনায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে , চোখে আতঙ্ক আর অসহায়তা ফুটে উঠেছে। রাইসা আর তুলি কোণায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। বড় চাচা ইরফান শেখ কঠোর গলায় নির্দেশ দিচ্ছেন, খোঁজার জন্য লোক পাঠাচ্ছেন।আর শেওনায়াজ শেখ, ভারী কাঠের চেয়ারে বসে রয়েছে , মুখে গাম্ভীর্যতা ফুটে উঠেছে ,যার ফলে চেহারায় কোন অভিব্যক্তি ধরা যাচ্ছে না।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

শুধু লাঠি ঠুকে গম্ভীর গলায় বলছেন,
—“কোথায় গেল মেয়েটা? এই টাউনে শেখ পরিবারের দিকে তাকানোর সাহস কারো নেই! বাহাদুর, খোঁজ নে, কোথায় মারিয়া!”
তানভীর ফোন রেখে দাদুর কাছে আসে, গলা কাঁপছে তার,
—”দাদাজান, পুলিশকে জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা এখনো কোনো খোঁজ পায়নি!”
এই অস্থিরতার মাঝে হঠাৎ প্রধান ফটকে একটা কালো SUV-এর গর্জন কানে আসে। ধুলো উড়িয়ে, গাড়িটা বজ্রের মতো ঢুকে পড়ে। সবাই চমকে তাকায়। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে আদিল, তার পিছনে এক সুঠাম দেহের ছেলে। আদিল শেওনায়াজ শেখের দিকে এগিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় বলে,
—“আসসালামু আলাইকুম, দাদাজান। কেমন আছেন?”

তার পিছনে এরিক দাঁড়িয়ে রয়েছে । কালো ডেনিম জ্যাকেটে ঢাকা পেশিবহুল শরীর,অ্যাপোলোর মতো নিখুঁত গঠন, চোখে সানগ্লাস। প্রতিটা পদক্ষেপে তার পেশি ফুলে উঠছে, কাঁধ সোজা, মাথা উঁচু। ঠোঁটে বাঁকা হাসি, সানগ্লাসের নিচ থেকে তার ধূসর চোখগুলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবকিছু নিরীক্ষণ করছে। হাতে তার ছোট ব্যাগ, কিন্তু তার উপস্থিতি পুরো উঠোনকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে ।সে চারপাশে তাকাচ্ছে, প্রতিটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকে স্থির যেন সবাই জানতে চাচ্ছে কে এই অপরিচিত ছেলে, যার চেহারায় ব্রিটিশদের মতো আভিজাত্য অথচ চোখেমুখে লুকানো অদ্ভুত এক রহস্য।”
শেওনায়াজ শেখ ভ্রু কুঁচকে এক পলক তাকালেন এরিকের দিকে ,তারপর লাঠি ঠুকে তার নাতির উদ্দেশ্যে বলেন,

—“ব্রিটিশদের মতো দেখতে এই ছেলেটা কে?”
আদিল দাদুর কথায় একপলক এরিকের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো,
—দেখতে বৃটিশদের মতো হলে, কী হবে?আচারণ পুরো রাক্ষসের মতো।”
মনের কথা মনে রেখে দাদুকে বলে,
—“এটা আমার ফ্রেন্ড, এরিক অ্যাসফোর্ড। আমেরিকা থেকে এসেছে। আমি ওকে পাকিস্তান দেখাতে নিয়ে এসেছি…”

ইনায়ার চোখ এরিকের উপর পড়তেই তার হাত থেকে গ্লাস পড়ে যায়।শব্দে উঠোন কেঁপে ওঠে।তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখ বিস্ফারিত হয়ে আনমনে আওড়ায় —এরিক? এখানে? তার হৃদয় থমকে যায়, শ্বাস আটকে আসে। গ্লাস ভাঙার আওয়াজে এরিক ইনায়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে ডেভিল স্মাইল দেয় যার অর্থ হলো, তোমার খবর আছে,একবার হাতের কাছে পায় তোমায়।এরিকের হাসির অর্থ ইনায়া বুঝতে পেরে শুকনো একটা ঢক গিলে। মিস্টার তানভীর তাকায় এরিকের দিকে, প্রথমে তিনি এরিককে এইখানে দেখে কিছুটা অবাক হয় , পরমুহূর্তেই রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। হাত মুঠোবদ্ধ করে এগিয়ে যেতে নিলে, ইনায়ার সম্মানের কথা ভেবে আবার থেমে যায়। এই টাউনে শেখ পরিবারের একটা মান-সম্মান আছে, ইনায়ার বিয়ের বিষয়টা জানাজানি হলে পুরো টাউন তাদের ছিঃ, ছিঃ করবে। বোনের কথা ভেবে,সে রাগ গিলে ফেলে, কিন্তু অগ্নি চোখে এরিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরিক চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে,ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে তানভীরের দিকে তাকায় এরপর মুখ সামনে ঝুঁকিয়ে, হাত দিয়ে ইশারা করে, কোল্ড ভয়েজে বলে,

—“মিস্টার তানভীর, বউ কে খুঁজে পাচ্ছেন না?”
এরিকের কথা শুনে তানভীরের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল, রাগে তার শরীর কাঁপছে। দাঁতে দাঁত পিষে সে বলে,
—“এর পিছনে তোর হাত আছে? বল, শালা!”
এরিকের হাসি গভীর হয়, কাঁধ ঝাঁকায়, চোখ সরু করে, হাত মুঠো করে, হাস্কিস্বরে বলে,
—“ কুল, ম্যান।”
কথাটি বলে এরিক দাঁতে দাঁত পিষে, মুখ তানভীরের কাছে নিয়ে, গর্জে ওঠে সে,
—“৯ ঘন্টা ১৩ মিনিট ৩ সেকেন্ড। আপনি আমাকে আমার বউয়ের থেকে দূরে রেখেছেন।তাই আমিও আপনার বউকে আপনার কাছ থেকে কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে দিলাম।এটাই ছিল প্রথম চাল, মিস্টার তানভীর। খেলা শেষ হলে আপনার কিছুই থাকবে না and I make sure of it, brother-in-law!

শেখ নিওয়াস ভিলায় রাত গভীর হয়েছে। চাঁদের আলো উঠোনের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু বাড়ির ভেতরে অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর মারিয়া বাড়ি ফিরে এসেছে, তাই সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে নিজেদের কক্ষে অবস্থান করছে। কিন্তু ইনায়া তার কক্ষে একা, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত কাঁপছে, মনটা উথালপাথাল হয়ে আছে। এরিকের আগমন তার ভেতরে ঝড় তুলেছে। সে জানে, এরিক তাকে কখনো ছেড়ে দেবে না।
ইনায়ার চিন্তার মাঝেই হঠাৎ দরজার হ্যান্ডেল ঘুরে উঠল। আস্তে করে দরজা খুলে গেল। ইনায়া চমকে ঘুরে তাকাল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এরিক, তার চোখদুটো অন্ধকারে আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। সে দরজা বন্ধ করে চাবি ঘুরিয়ে তালা লাগিয়ে দিল, যাতে ইনায়া কিছুতেই পালাতে না পারে।
ইনায়া এরিকের অভিব্যক্তি দেখে ভয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখে আতঙ্ক আর অসহায়তা ফুটে উঠল। কাঁপা গলায় সে বলল,

—“এ…এরিক? আপনি এত রাতে এখানে কী করছেন?আপনি প্লিজ চলে যান,কেউ দেখে ফেললে চরিত্রে কলঙ্কের কালিমা লাগিয়ে দিবে।”
ইনায়ার ভয়ার্ত মুখ দেখে এরিকের ঠোঁটে একটা বাঁকা, শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল, তার ধূসর চোখ ইনায়ার ওপর স্থির, যেন শিকারি তার শিকারকে নিরীক্ষণ করছে। হাস্কি স্বরে, দাঁত পিষে সে বলল,

— “বউ হও, তুমি আমার। আমিও দেখবো কোন শালা আমার বউয়ের গায়ে কলঙ্কের কালিমা লাগায়।”
“তার আগে আমাকে এটা বল, পালিয়ে গিয়ে কী ভেবেছ, এরিক অ্যাসফোর্ডের কবল থেকে মুক্তি পাবে? এখনো আমাকে চেনোনি তুমি, সুইটহার্ট। তোমাকে ভালোবাসি বলে এতদিন নরম ছিলাম, কিন্তু আজ থেকে… তুমি আমাকে আমার আসল রূপেই দেখবে।”
বলে সে গর্জে উঠল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাতদুটো মুঠোবদ্ধ হলো। এক ঝটকায় সে ইনায়ার হাত নিজের বুকের ওপর জোর করে চেপে ধরল।কোমলীয় স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
—“Feel this heart, baby. শুনতে পাচ্ছ কিছু? My heart beats only for you. Touch this soul, love… আমার প্রতিটা হৃদস্পন্দন শুধু তোমার নামে, তোমার জন্য—forever and always!”
ইনায়া দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। সে বলল,

—“এরিক, প্লিজ… আমি…”
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই এরিক তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। তার পেশিবহুল হাত দিয়ে ইনায়ার কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল। ইনায়া কেঁপে উঠল, কিন্তু কোনো আঘাত লাগল না। এরিকের চোখ লাল হয়ে উঠেছে ইনায়ার প্রত্যাখ্যানে। মুখটা ইনায়ার কাছে নিয়ে এসে ফিসফিস করে সে গর্জে উঠল,
—“বেবিগার্ল, তুমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও পালিয়ে যেতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, আমার আত্মা তোমার প্রতিটি ছায়ায়, প্রতিটি হৃৎস্পন্দনে তোমাকে খুঁজে নেবে।কারণ তুমি আমার, আর তোমাকে আমার কাছে রাখতে আমি গোটা পৃথিবী জ্বালিয়ে দিতে পারি।”

ইনায়ার চোখে জল চিকচিক করছে। সে এরিকের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু এরিক তার হাত আরও শক্ত করে ধরল, শরীরটা ইনায়ার দিকে ঝুঁকিয়ে দিল। ইনায়া আর না পেরে বলে উঠলো ,
— “ছাড়ুন আমায়! এটা হারাম।”
ইনায়ার কাঁপা গলার কথায় এরিকের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং সে সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
—“স্বামী হয় আমি তোমার… রাইট আছে আমার।”
ইনায়া তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে বলল,
— “হালাল নন আপনি আমার জন্য, এরিক।আমাদের মধ্যে কোনো বৈধ বন্ধন নেই।”
‘হালাল’ কথাটি কানে আসতেই এরিক ইনায়াকে ছেড়ে দিল।বাড়তি আর কোন কথা না বলে, দরজা লাগিয়ে সে চলে গেল। ইনায়া তার চলে যাওয়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

এরিকের আগমন শেখ নিওয়াস ভিলায় একটা অশান্ত ঝড়ের পূর্বাভাস বয়ে এনেছে। আদিলকে দেওয়া কক্ষগুলোর মধ্যে এরিকের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে পুরনো অতিথি কক্ষ যেটা একটু জীর্ণ, দেয়ালে হালকা ফাটল, আর জানালার পর্দাগুলোর রঙ মলিন। কক্ষটি এরিকের মতো একজনের জন্য একেবারেই বেমানান। তার পেশিবহুল শরীর, ধারালো চোখ, আর আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গির সঙ্গে এই কক্ষের কোনো মিল নেই।
এরিক তার কালো ডেনিম জ্যাকেট খুলে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। চারপাশে একবার তাকিয়ে তার ভ্রূ কুঁচকে গেল। দেয়ালের পুরনো পেইন্ট, ধুলোমাখা ফ্যানের পাখা, আর বিছানার পাশে একটা জরাজীর্ণ কাঠের টেবিল দেখে তার মুখে বিরক্তির ছায়া পড়ল। সে মুখ বাঁকিয়ে বিরবির করে বলল,

—“এটা কোনো কক্ষ নাকি কোনো গুদাম? আমি এরিক অ্যাসফোর্ড, এই জায়গায় থাকব? হাস্যকর!”
সে তার ছোট ব্যাগটা হাতে তুলে নিল, দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। তার পায়ের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে তার মেজাজের তীব্রতা প্রকাশ পাচ্ছিল। আদিলের কক্ষের দরজার সামনে এসে সে থামল। দরজার হ্যান্ডেলে হাত রেখে এক ঝটকায় দরজাটা খুলে ফেলল। দরজার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
আদিল তখন তার কক্ষে আরাম করে বিছানায় শুয়ে ফোন স্ক্রল করছিল। ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর ট্র্যাক প্যান্টে সে পুরোপুরি রিল্যাক্সড মুডে। হঠাৎ দরজার শব্দে চমকে উঠে পিছনে তাকাল। এরিকের পেশিবহুল শরীর দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে, তার ধূসর চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ঠোঁটে সেই চেনা বাঁকা হাসি। আদিলের মুখে হতাশা আর বিরক্তির মিশ্রণ ফুটে উঠল। এরিক গম্ভীর কণ্ঠে, প্রায় গর্জনের মতো বলে উঠল,

—“আই ওয়ান্ট দিস রুম। গেট আউট।”
আদিল ফোনটা বুকে নামিয়ে, বিছানায় উঠে বসল। ভ্রূ কুঁচকে এরিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“গেট আউট মানে! এটা কী মগের মুল্লুক নাকি?
এটা আমার রুম! তুই তোর নিজের রুমে যা।
—এমনিতেই তুই আমাকে জোর করে এখানে এনেছিস, এখন আবার রুম নিয়ে ঝামেলা করছিস?”
এরিক এক পা এগিয়ে এলো, আদিলের দিকে। তীক্ষ্ণ চোখে আদিলকে একবার পরখ করে , ভ্রূ নাচিয়ে বলল,
—“তোর রুম ছিল!এখন নেই! এই মুহুর্ত থেকে এটা আমার রুম।”
—এখন উঠ, নয়তো আমি নিজেই তোকে বের করে দেব।”
আদিল এবার হালকা হেসে ফেলল, যেন এরিকের এই হুমকি তার কাছে হাস্যকর। বিছানা থেকে নেমে এরিকের দিকে এগিয়ে গেল, হাতে ফোনটা নাড়তে নাড়তে বলল,

—“ওরে বাবা, মিস্টার ব্যাড বয়ের গায়ে এত জোর!
” তুই কী ভাবিস নিজেকে? আমি তোর এই হিটলারি মুডে ভয় পাব?”
— একবার মার খেয়েছি বলে, সবসময় মার খাব?
“এটা শেখ নিওয়াস ভিলা, আমার দাদাজানের বাড়ি। এখানে তোর রাক্ষসের মতো আচরণ চলবে না। যা, তোর রুমে ফিরে যা।”
এরিকের চোখ সরু হয়ে গেল। সে আরেক পা এগিয়ে এলো, আদিলের কথায় তার চোখে রাগ স্পষ্ট ফুটে উঠলো।সে আদিলের দিকে ঝুঁকে, ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর সুরে বলল,
—“তুই আমাকে চ্যালেঞ্জ করছিস, আদিল? আমি যখন কিছু চাই, সেটা আমি পেয়েই ছাড়ি, হয় ভালোভাবে, নয় কায়দা করে।”

” এই রুমটা আমার পছন্দ হয়েছে। আর তুই যদি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস,তাহলে,
—আই সোয়ার, আমি এমন কিছু করবো, তাতে তুই এই রুমে আর এক সেকেন্ডও থাকতে পারবি না।”
আদিল এবার হাসি থামিয়ে একটু গম্ভীর হলো। এরিকের চোখে চোখ রেখে বলল,
“দেখ, আমার এসব ড্রামা ভালো লাগছে না।”
— রুম চাস? ঠিক আছে, আমি দাদাজানের সঙ্গে কথা বলে দেখি।”
” কিন্তু এভাবে হুমকি দেওয়া বন্ধ কর, তোর হুমকিতে আমি ভয় পাই না।”
এরিকের ঠোঁটে আবার সেই বাঁকা হাসি ফিরে এলো। পকেটে হাত গুঁজে, একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল,
—“তুই কী চাস ? রুমটা ছাড়বি, নাকি আমি তোর ফোনটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলব।”
আদিল এবার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

—“ফোন ছুঁড়বি মানে? এটা আমার ব্র্যান্ড নিউ আইফোন!
” এসব হুমকি দেওয়া বন্ধ কর, নয়তো আমি এখনি ইনায়াকে ডেকে বলব,
—”তুই কীভাবে ক্যান্টিনে আমার গালে পাঞ্চ মেরেছিলি।”
আদিলের কথায় এরিক হো হো করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে পুরো কক্ষ যেন কেঁপে উঠল। আদিলের কাঁধে হালকা টোকা দিয়ে বলল,
—“Listen, তোর কী মনে হয়, এই এরিক অ্যাসফোর্ড কাউকে ভয় পায়?”
কথাটি বলেই এরিক একটা বালিশ আদিলের মুখের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
—“তোকে আর এক মুহূর্ত আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না।”
” আর এক মুহূর্ত যদি এখানে থাকিস, তাহলে আমি তোর আইফোনটা শুধু ছুঁড়ব না, পিষে ফেলব। শেষবারের মতো ওয়ার্ন করছি, গেট আউট।”
আদিল হতাশায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে, বিরক্ত মুখে বলল,

—“ঠিক আছে, তুই থাক রুমে।”
কিন্তু আমি এখন ঘুমাবো কোথায়?”
এরিক ঠোঁটে বাঁকা হাসি বজায় রেখে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে একটা উদাসীন ভাব নিয়ে বলল,
—“আহ… ফাক অফ! আমি কী জানি? ”
হলের বারান্দায় গিয়ে শুয়ে পড়, বা চাইলে গাছতলায় ঝুলে থাক।
—”কুকুরও তো রাতে কোথাও না কোথাও আশ্রয় পায়, তুইও পেয়ে যাবি।”
এরিকের সূক্ষ্ম অপমানে আদিল তেলে-বেগুনে জ্বলতে জ্বলতে মনে মনে তাকে দুই-চারটে গালি দিয়ে নিল।
—“শালা, সাইকো একটা!”
আদিল বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল, আর এরিক বিজয়ীর হাসি হেসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

একটি রাজকীয় কক্ষ চারদিকে সুন্দরভাবে সাজানো। লাল আর সোনালি মখমলের পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে, মোমবাতির আলোয় সোনালি সুতোর কাজ ঝকঝক করছে। বিছানায় রক্তলাল গোলাপের পাপড়ি আর জুঁই ফুল ছড়ানো। বাতাসে গোলাপ আর চন্দনের মিষ্টি গন্ধ ভাসছে। কোণে রুপালি ফুলদানিতে তাজা ফুল, পাশে পিতলের দীপাধারে মোমবাতি জ্বলছে। জানালা দিয়ে চাঁদের মৃদু আলো ঢুকছে।
সেই অপরিচিত রাজকীয় কক্ষে ইনায়া বউ সেজে বসে আছে। পরনে তার লাল লেহেঙ্গা , সোনালি জরির কাজ মোমবাতির আলোয় ঝিলমিল করছে। হাতে মেহেন্দির গাঢ় নকশা, গলায় ভারী হীরার নেকলেস, কানে ঝুমকো মৃদু ঝংকার তুলছে। মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে লজ্জায় মুখ নিচু করে রেখেছে। তার হৃদয় দুরু দুরু করছে, শরীর কাঁপছে।বিবাহের রাত কি এমন হয়?

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। ইনায়া চমকে উঠল, কিন্তু মুখ তুলে তাকাতে সাহস পেল না। কারো পায়ের ভারী শব্দ কাছে আসছে । সে বুঝতে পারল, এটা এরিক। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। সে ঘোমটায় মুখ আরও গুঁজে দিল, কিন্তু হৃদয়ের ধড়ফড়ানি যেন শোনা যাচ্ছে। এরিক কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করল, তার ধূসর চোখ ইনায়ার ওপর স্থির। সে কালো শেরওয়ানি পরে আছে, পেশিবহুল শরীরে সেটা যেন তার আভিজাত্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঠোঁটে সেই চেনা বাঁকা হাসি, কিন্তু চোখে একটা গভীর আকাঙ্ক্ষা জ্বল জ্বল করছে।

এরিক ধীরে ধীরে ইনায়ার কাছে এগিয়ে এলো, তার প্রতিটি পদক্ষেপে বাতাস গরম হয়ে উঠছে। সে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে, হাত বাড়িয়ে ইনায়ার ঘোমটা আস্তে করে তুলে দিল। ঘোমটাটা তার কাঁধে ছড়িয়ে পড়ল, আর ইনায়ার লজ্জামাখা মুখ উন্মুক্ত হয়ে গেল। তার চোখ নিচু, গালে লাল আভা, ঠোঁট কাঁপছে অস্ফুরিত আবেগে।। এরিক তার চিবুক ধরে মুখটা উঁচু করল, ধূসর চোখে তার চোখ মিলিত হতেই এরিক ফিসফিস করে বলল,
—“মুনলাইট, আজ তুমি আমার… সম্পূর্ণ হালাল ভাবে আমার। লজ্জা পাচ্ছ কেন?”
ইনায়া লজ্জায় চোখ বুজে ফেলল, কিন্তু তার শরীরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে এরিককে বললো,

—”আপনি… আপনি এত কাছে কেন আসছেন? আমার… আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।”
ইনায়ার কথা শুনে এরিক তার কাছে আরও ঝুঁকে এলো,বিড়বিড়িয়ে বললো,
—”শ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো আমি এখনো কিছুই করিনি, মুনলাইট।
এই বলে হাত দিয়ে সে ইনায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। তার স্পর্শে ইনায়ার শরীর কেঁপে উঠল, শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল। এরিকের ঠোঁট তার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,
—“ম্যাডাম, আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন…কিন্তু ভুলে যাবেন না, আমি সব কিছুর হিসাব রাখি।”
—আজ সেই কষ্টের সুদে–আসলে হিসাব মেটাবো…তোমাকে দিয়ে।”
আমি তোমাকে এমনভাবে চাইব, যাতে আমার ছাড়া আর কারো স্পর্শ সহ্য হবে না তোমার।তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস আমার নামে হবে, তোমার শরীর আমার স্পর্শের কাঙাল হয়ে উঠবে।আমি তোমার প্রতিটা ইঞ্চি দখল করব, যতক্ষণ না তুমি বলো যে,

—তুমি শুধু আমার।”
তোমার শরীরের প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা রন্ধ্রে আমার স্পর্শ ছড়িয়ে দেব, যেন তুমি আমায় ছাড়া অসম্পূর্ণ। আর আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে তোমার নাম ধ্বনিত হবে, যেন আমি তোমায় ছাড়া অর্থহীন। আমরা একে অপরের মাঝে এমনভাবে মিশে যাব, যেখানে আমাদের অস্তিত্ব এক অবিচ্ছেদ্য সত্তায় রূপান্তরিত হবে।
কথা বলার সময় এরিক ইনায়ার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
ইনায়ার পুরো শরীর শিহরিত হয়ে উঠলো।তারপর এক ঝটকায় এরিক তাকে নিজের বাহুতে টেনে নিল,ইনায়ার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,

— “Say it, বেবিগার্ল …তুমি কার।”
ইনায়ার বুক ধুকপুক করছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।চোখে জল চিকচিক করছে।সে কোনো মতে ফিসফিস করে বললো,
—“আপনার… শুধু আপনার…”
এরিকের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটল। সে ফিসফিস করে বলল,
—“Say it louder, বেবিগার্ল… আমি চাই সবাই জানুক তুমি শুধু আমার।”
কথাটি শুনতেই ইনায়ার শরীরে আগুন জ্বলে উঠল, তার হাত অজান্তেই এরিকের বুকে চেপে গেল। এরিক তার ঠোঁট ইনায়ার গলায় ছোঁয়াল, ফিসফিস করে বলল,

— “ফিল মাই টাচ, লাভ…
আজ আমার উন্মাদনা তোমাকে মাতিয়ে তুলবে, তোমার শরীরে আমার স্পর্শের চিহ্ন রেখে যাব, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস তোমার সঙ্গে একাকার হবে, আর তোমার প্রতিটি দৃষ্টি আমার হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। আমরা এমনভাবে একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাব, যেন এই বিশ্বের কোনো শক্তিই আমাদের ভালোবাসাকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারে।”
হঠাৎ দরজায় টোকার তীক্ষ্ণ শব্দে ইনায়া চোখ খুলে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে। চারদিকে তাকিয়ে দেখে কক্ষ অন্ধকার, এরিক নেই। নিজের আচরণে বিরক্ত হয়ে ইনায়া নিচু স্বরে নিজেকেই ভর্ৎসনা করে বললো,

—আসতাগফিরুল্লা, ছিঃ, ছিঃ, ইনায়া, তুই এইগুলো কী দেখলি?তুই নিজেও ওই লোকের মতো শেইমলেস হয়ে গেলি নাকি?”
তার হৃৎপিণ্ড তখনও ধুকপুক করছে, শরীরে এরিকের স্পর্শের উষ্ণতা, এখনও জ্বলন্ত আগুনের মতো লেগে আছে। সে বিছানায় শুয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করে রাতের নিস্তব্ধতায় তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে, কিন্তু ঘুম তার কাছে অধরা হয়ে থাকে। তার মনের প্রতিটি কোণে এরিকের উপস্থিতি এক অলিখিত কবিতার মতো ছড়িয়ে পড়ে, যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে তাদের মিলনের সুর বেজে ওঠেছে।

রাতের শেষ প্রহর চলছে। চারপাশে আযানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে,যার ফলে এক অলৌকিক সুর আকাশকে মুখরিত করে তুলেছে। দীর্ঘ বিনিদ্র রাত পেরিয়ে, মাত্র কিছুক্ষণ আগে এরিকের চোখ দুটো লেগে এসেছিল। ক্লান্ত শরীরটা অবশেষে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিল। কিন্তু আযানের সেই গভীর, মধুর ধ্বনি তার কানে পৌঁছতেই সে ঘুমের মধ্যেই বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ওঠে। পাশে পড়ে থাকা বালিশটা তুলে নিয়ে দুই কান চেপে ধরে সে, যেন এই সুমধুর সুরকে বাইরে রাখতে পারে। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। সুরটা যেন তার মনের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
প্রচণ্ড বিরক্তিতে এরিক বিছানায় উঠে বসে। মুখটা কুঁচকে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে ওঠে,

— “এই ভোররাতে কে যে এই চিৎকার শুরু করে দিয়েছে! একদম unbearable shit!” তার কণ্ঠে বিরক্তির তীব্রতা, এতটাই যে সে এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীটাকেই ধিক্কার দিতে চায়।
কিন্তু তার কথা শেষ হতেই আযানের তীব্রতা আরো বেড়ে যায়। সেই সুর আরো গভীর, আরো মোহনীয় হয়ে ওঠে, যেন আকাশের বুকে এক অদৃশ্য শক্তি তাকে ডাকছে। এরিক থমকে যায়। সে মন দিয়ে শোনে। কিছুক্ষণ আগে যে সুর তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়েছিল, এখন তা তার মনের গভীরে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার মনটা কেমন যেন হালকা হয়ে আসছে, যেন কোনো অজানা জাদু তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সে বুঝতে পারছে না, তার সাথে কী হচ্ছে। আযানের প্রতিধ্বনি তার হৃদয়ে এক নেশার জগৎ সৃষ্টি করছে, যেখানে সে হারিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে, অজান্তেই।

এই সুমধুর ধ্বনি কোথা থেকে আসছে, তা জানার জন্য তার মন ছটফট করে ওঠে। এক অদম্য কৌতূহল তাকে টানে। সে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে, পা টিপে টিপে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখ দুটো ছুটে বেড়ায় অন্ধকারের মাঝে, কিন্তু কিছুই নজরে পড়ে না। শুধু আযানের সেই মোহনীয় সুর চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন অদৃশ্য কোনো উৎস থেকে উৎসারিত হচ্ছে। এরিকের মনটা অস্থিরতায় ছেয়ে যায়। এই ধ্বনির রহস্য, এই অজানা আকর্ষণের উৎস—যতক্ষণ না সে তা উদঘাটন করতে পারছে, তার মন যেন শান্তি পাচ্ছে না।
সে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে, কিন্তু মুহূর্ত আগে যে ঘুম তার চোখে এসেছিল, তা যেন এখন আর ধরা দিচ্ছে না। আযানের সেই সুর তার মনের মধ্যে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেন তাকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু সে বুঝতে পারছে না। তার শরীর শান্ত, কিন্তু মনটা অস্থির। বাকি রাতটা সে এভাবেই ছটফট করে কাটায়।

ইনায়া তার ছোট্ট ঘরের এক কোণে জায়নামাজ বিছিয়ে ফজরের নামাজে দাঁড়িয়েছে। তার মাথায় ওড়না, হাত দুটো বুকের কাছে বাঁধা, চোখ দুটো মাটির দিকে নত। নামাজের প্রতিটি রাকাতে তার মন ডুবে আছে আল্লাহর সান্নিধ্যে। তার হৃদয়ের গভীরে এক অস্থির আকাঙ্ক্ষা, এক নিষিদ্ধ বাসনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, কিন্তু সে তবুও আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করছে।
নামাজ শেষে ইনায়া দুই হাত তুলে মোনাজাত শুরু করে। তার কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে জল চিক চিক করছে। সে ধীর, কম্পিত স্বরে বলে,

“হে আল্লাহ, আমি জানি, নিষিদ্ধ জিনিসের আকাঙ্ক্ষা বড় ভয়ানক। তবুও আপনার এই দুর্বল বান্দা আপনার দরবারে এক ছোট্ট আর্জি নিয়ে এসেছে। আপনি তো বলেছেন, আপনি কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। ইয়া রব, আমি জানি, আমি এক হারাম জিনিসকে হালাল করে পাওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে আপনার কাছে হাত তুলেছি। আপনার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। তার কালো অন্তরে আপনি ইমানের আলো ছড়িয়ে দিন। সে যেন প্রতিটি বিশ্বাসে আপনাকে খুঁজে পায়। আপনার সান্নিধ্যে পৌঁছতে তাকে আপনি সাহায্য করুন। আমিন।”

ইনায়ার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। সে হাত নামায়, জায়নামাজ গুটিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে ওঠে। একটা নোটিফিকেশনের শব্দ। ইনায়ার হৃদয়টা কেঁপে ওঠে। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নেয়। স্ক্রিনে একটা লিঙ্ক জ্বলজ্বল করছে। কৌতূহল তাকে টানে। সে আঙুল দিয়ে লিঙ্কটিতে ক্লিক করে।
একটি ভিডিও চালু হয়। ইনায়ার চোখ দুটো স্থির হয়ে যায় স্ক্রিনের ওপর। ভিডিওতে এরিক একটি মেয়ের সঙ্গে সে, খুব কাছাকাছি, ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ।ক্যামেরার কোণ বদলায়, আরেকটি দৃশ্য। এরিক আরেকটি মেয়ের সঙ্গে, আরো ঘনিষ্ঠ, অবস্থায়। ইনায়ার হাত কাঁপতে শুরু করে। তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে, যেন কেউ তার হৃদয়টাকে চেপে ধরেছে।

সে পুরো ভিডিও দেখতে পারে না। ফোনটা তার হাত থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়। শব্দটা তার কানে বাজে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি বাজে তার হৃদয়ের আর্তনাদ। এরিককে এভাবে দেখে তার বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। ব্যথা এত তীব্র, যেন তার শ্বাস আটকে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না, কেন এই ব্যথা তাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে। সে তো জানত এরিক কেমন। তার অতীত, তার জীবনযাপন—সবই তো ইনায়ার জানা। তবুও এই দৃশ্য, এই সত্য তার চোখের সামনে এসে দাঁড়াতেই তার হৃদয় যেন মেনে নিতে পারছে না।
ইনায়া দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। তার চোখ দুটো জলে ভরে যায়। সেই জল আর ধরে রাখা যায় না। তার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, নীরবে, অবাধে। তার মনের মধ্যে এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

ইনায়ার চোখের জল শুকিয়ে গেলেও তার মনের কোণে একটা ভারী বোঝা তখনো চেপে বসে ছিল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, পা টেনে টেনে, তাকে দেখে যে কেউ বলবে, শরীরের সব শক্তি কোথাও হারিয়ে গেছে। তার ঘরের সামনেই বিশাল হলরুমটা ছড়িয়ে আছে।ঝকঝকে মেঝে, উঁচু ছাত, আর দেওয়ালে ঝোলানো বড় বড় পেইন্টিং। কিন্তু ইনায়ার চোখে কিছুই পড়ছিল না। সে অন্যমনস্কভাবে করিডর ধরে হাঁটছিল, পায়ের শব্দ হলরুমে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। হঠাৎ, একটা শক্ত হাত তার বাহু চেপে ধরল। সে চমকে উঠলো। কেউ তাকে টেনে কাছের একটা ঘরে ঢুকিয়ে নিল। ইনায়ার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করে উঠলো, শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করতে লাগলো। সে ভয়ে আর বিস্ময়ে পিটপিট করে চোখ তুলে তাকালো। সামনে এরিক। তার শক্ত হাত দুটো ইনায়ার বাহু চেপে ধরে আছে।এরিককে দেখে ইনায়ার মাথায় সকালের সেই ভিডিওর দৃশ্য ভেসে উঠলো।সে এক ঝটকায় এরিকের হাত সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠে ক্রোধ আর অভিমান মিশে একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো,

—“আপনার ওই নোংরা হাত দিয়ে আমায় ছুঁবেন না!”
এরিকের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল, “নোংরা হাত? আমার হাত নোংরা?”
ইনায়ার মনের জমে থাকা অভিমান যেন স্রোতের মতো উথলে উঠল। তার কণ্ঠে তেজ, চোখে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পেল। সে চিৎকার করে বলে উঠল,
—“হ্যাঁ, হ্যাঁ! আপনার হাত নোংরা! অস্বীকার করতে পারবেন, এই হাত কখনো কোনো নারীকে স্পর্শ করেনি? অস্বীকার করতে পারবেন, আপনার ধূসর চোখ কখনো কোনো মেয়েকে লোভনীয় দৃষ্টিতে দেখেনি?
অস্বীকার করতে পারবেন, আপনি কখনো কোনো মেয়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেননি, কখনো কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়াননি?”

ইনায়ার প্রতিটি কথা যেন তীরের মতো এরিকের বুক ভেদ করে তার হৃৎপিণ্ডে গিয়ে বিঁধল। সে জানে, ইনায়া একটাও মিথ্যা কথা বলেনি। কিন্তু আজ কেন তার কথাগুলো এত ভারী, এত তীব্র লাগছে? সে ঠোঁট দিয়ে জিভ ভিজিয়ে, গলা থেকে কষ্টে দুটো কথা বের করল,
—“আমি মানছি, আমি ভুল করেছি। আমি খারাপ। কিন্তু কেউ নিজে থেকে খারাপ হয় না, ইনায়া। তুমি ভাগ্যবতী, তোমার কাছে এত সুন্দর একটা পরিবার আছে। কিন্তু সবাই তোমার মতো ভাগ্যবান হয় না।”
এরিকের কণ্ঠে একটা গভীর বেদনা ঝরে পড়ল। সে থামল, যেন তার অতীতের কোনো কালো ছায়া তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
— “আমার বাবা, মিস্টার রিচার্ড অ্যাফোর্ড, একজন বিলিয়নিয়ার। সবাই বলে, বড়লোকের সন্তানরা বেশিরভাগই বিগড়ে যায়। কিন্তু কেউ কি কখনো ভেবেছে, কেন তারা এমন হয়? কখনো কি কেউ ভেবেছে, তাদের এমন হওয়ার পেছনে কোনো কারণ থাকতে পারে? আমার জীবনের এক বিভীষিকাময় অতীত আমাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।”
ইনায়ার চোখে ক্রোধের পাশাপাশি এখন একটা কৌতূহল জেগে উঠল। এরিকের কথা শুনে তার মনের কোণে একটা প্রশ্ন জাগল,

—কী এমন ঘটেছিল এরিকের জীবনে? এরিক বলা শুরু করল,
“আমার বাবা-মা পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তাদের পরিবার তাদের ত্যাগ করেছিল। কিন্তু তারা তবুও নিজেদের মতো করে জীবন গড়ে তুলেছিল। আমার জন্মের পর তাদের দায়িত্ব বেড়ে গেল। বাবা আমাকে ভালো জীবন দেওয়ার জন্য ব্যবসা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে তিনি সফল হলেন, আমাদের জীবন বদলে গেল। আমি ছোটবেলায় বাবার ভক্ত ছিলাম। আমাদের সম্পর্ক ছিল বাবা-ছেলের চেয়ে বন্ধুর মতো। আমি কিছু চাইতাম, আর বাবা তা মুহূর্তেই পূরণ করতেন। তার ব্যবসা বাড়তে লাগল, ব্যস্ততা বাড়ল। তবু তিনি আমাদের জন্য সময় বের করতেন। আমরা সুখী ছিলাম, ইনায়া। কিন্তু সুখ বেশিদিন থাকে না। একটা কুনজর আমাদের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।”
এরিকের কণ্ঠ হঠাৎ করে কেঁপে উঠলো । সে থামল, যেন স্মৃতির ভার বহন করা তার পক্ষে কঠিন। তারপর আবার বলতে শুরু করল,

“লরেন, আমার বাবার সেক্রেটারি। সে কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই সবকিছু বদলে গেল। বাবা আর আগের মতো বাড়ি ফিরতেন না, অফিসে রাত কাটাতেন। আমার সঙ্গে সময় কাটানো বন্ধ করে দিলেন। মা আর বাবার মধ্যে ঝগড়া শুরু হল। আমাদের পরিবারে ফাটল ধরল। একদিন, মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবা লরেনকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। আমি তখন বাগানে আমার কুকুরের সঙ্গে খেলছিলাম। খেলতে খেলতে আমার বল বাবার স্টাডি রুমে চলে গেল। আমি বল আনতে গিয়ে যা দেখলাম।” এরিকের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৮

“আমি দেখলাম, আমার বাবা, যাকে আমি সুপারহিরো ভাবতাম, তিনি লরেনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। সেই মুহূর্তে আমার বাবার প্রতি আমার সমস্ত ভালোবাসা, বিশ্বাস ঘৃণায় পরিণত হল। সেদিন আমি জীবনের প্রথম ধাক্কা খেলাম।”
এরিক একটু থামল। তার ঠোঁটে একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠল। “দ্বিতীয় ধাক্কাটা আরো মারাত্মক। ভালোবাসা। আমার প্রেম, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, দুজনে মিলে আমার সঙ্গে প্রতারণা করল। সেই বিশ্বাসঘাতকতা আমার হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিল। শুধু ভালোবাসা হারাইনি, নারী জাতির প্রতি আমার মনে তীব্র ঘৃণা জন্ম নিল।”
ইনায়া নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। তার মনের ক্রোধ কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। এরিকের চোখে নারী জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা , তার কণ্ঠের বেদনা ইনায়াকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩০