Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৮
ফাহিমা ইসলাম

রজনীর তৃতীয় প্রহর ক্রমশ আপন গভীরতার আবরণ আরও নিবিড় করে বিস্তার করছে ধরাধামের বুকে। সিকদার বাড়ির সর্বত্র এখন এক পরিশ্রান্ত প্রশান্তির আধিপত্য। কিছুক্ষণ আগেও যে প্রাসাদোপম গৃহটি হাসি, কোলাহল, উলুধ্বনি, ঢোলকের মত্ত ছন্দ আর আত্মীয়স্বজনের উচ্ছ্বাসে কম্পমান ছিল, সেই একই গৃহ এখন নৈঃশব্দ্যের এক গম্ভীর উপাসনালয়ে রূপ নিয়েছে। অলিন্দজুড়ে ঝুলে থাকা আলোকমালাগুলো এখনও জ্বলছে বটে, তবে তাদের দীপ্তিও যেন ক্লান্ত হয়ে এসেছে; বাতাসে ভেসে থাকা মেহেন্দির গাঢ় সুরভি আর রজনীগন্ধার মাদকতা নিস্তব্ধতার সঙ্গে মিশে এক অপার্থিব আবহ নির্মাণ করছে।এই প্রশান্ত নিশীথেই ধীর পায়ে নিজের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো তূর্ণা।সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ, অতিথি আপ্যায়ন, হাসি-আনন্দ আর অবিরাম ব্যস্ততা তার দেহকে ক্লান্ত করলেও মাতৃহৃদয়ের অভ্যাস কখনও ক্লান্ত হয় না। কক্ষে প্রবেশ করেই তার প্রথম দৃষ্টি ছুটে যায় সন্তানদের দিকে।

রোদেশী দোলনায় নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন। ক্ষুদ্র বুকখানি অত্যন্ত নিয়মিত ছন্দে ওঠানামা করছে। রোদ্দুর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে, ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে; মনে হচ্ছে স্বপ্নের ভেতরেও সে যেন কোনো দুরন্ত খেলায় মেতে আছে। তারপর তূর্ণার দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি থমকে যায় রোদেলার কাছে। বড় বিছানার একপাশে গোল হয়ে শুয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি যেন শান্তির এক নির্মল প্রতিমা। এলোমেলো চুলের কয়েকটি গোছা কপালের উপর নেমে এসেছে। গোলাপি গাল দুটো নিদ্রার আবেশে আরও কোমল হয়ে উঠেছে। ছোট্ট মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরা রয়েছে তার বহুদিনের প্রিয় কাপড়ের পুতুলটি যেন সেই পুতুলটিও আজ তার সঙ্গে ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে। তূর্ণা আশেপাশে তাকিয়ে রৌদ্রিকে খুঁজলো পেলো না, বহুক্ষণ আগেই গায় থেকে মেহেন্দির সাজ সড়িয়ে ফেলেছে। রোদেলার দিকে তাকালেই
তূর্ণার বুকের ভেতরটা হঠাৎই এক অদ্ভুত কোমলতায় ভরে ওঠে। সে অত্যন্ত সাবধানে বিছানার কিনারায় বসে পড়ে। বাচ্চারা দোলনায় ঘুমায়, রাতে তূর্ণা বা রৌদ্রিক উঠে দেখে কিছুখন পরপরই সমস্যা হচ্ছে কিনা। বিছানায় সে, রোদেলা আর রৌদ্রিক থাকে। তূর্ণা কাঁপা কাঁপা আঙুলে আলতো করে সরিয়ে দিলো রোদেলার কপালে নেমে আসা চুলগুলো।

মুহূর্তেই রোদেলা ঘুমের ঘোরে সামান্য নড়ে ওঠে। তূর্ণার বুক ধক করে ওঠে এই বুঝি ঘুমটা ভেঙে গেলো।
কিন্তু না,রোদেলা আবারও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বরং অবচেতনেই আরও একটু সরে এসে মায়ের ওড়নার প্রান্ত মুঠোয় চেপে ধরলো। সেটা দেখে তূর্ণা নিঃশব্দে হাসলো, সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে মেয়ের কপালে দীর্ঘ, স্নিগ্ধ এক চুম্বন এঁকে দেয়। অস্ফুট স্বরে ফিসফিস করে বলে-
“আমার রোদ!”
কোনো উত্তর আসে না। ঘুমন্ত রোদেলা যেন মায়ের কণ্ঠস্বর চিনতে পারে। ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত ক্ষীণ এক হাসির রেখা ফুটে ওঠে। পরক্ষণেই সে আধোঘুমে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে-
“মা…”

শব্দটি এতটাই ক্ষীণ যে, বাতাস না চাইলে হয়তো সেটিও বহন করত না। কিন্তু তূর্ণার কানে পৌঁছানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। মুহূর্তের মধ্যে তার সমগ্র অস্তিত্ব ভালোবাসার এক অবর্ণনীয় প্লাবনে ভেসে যায়। সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। দু’হাতে অত্যন্ত যত্নে মেয়ের ছোট্ট মুখখানা আগলে ধরে আরও একবার কপালে চুম্বন রাখে। সিজারের কারণে ঠিক মতো কাউকেই কোলে নিতে পারে না, আগে যেমন রোদেলাকে কোলে নিয়ে সারা বাড়ি টইটই করে ঘুরতো সেটা কমেছে। ক্ষতটা বেগ গভীর হওয়ায় কিছু হলেই ঘাঁ’টা ভেসে ওঠে। তাই আগের মতো নেওয়া হয় না কোলে, তবে রাতে বেলা রোদেলা অর্ধেক তার বুকের সঙ্গে লেপ্টে ঘুমাবে বাকিটা রৌদ্রিকের। কাউকেই খালি হাতে ফেরায় না সে, তূর্ণা আলতো করে রোদেলার সব চুলগুলো একত্রে করে কোনো রকমে একটা বেনি করে দিলো। রোদেলা তূর্ণার বুকের সঙ্গে একবারে মিশে গেছে, তূর্ণা একবার উঁকি দিয়ে বাকি দুইটাকে দেখে নিলো। না তারা এখন গভীর ঘুমে, ওঠার চান্স নেই। তূর্ণা আবারও চোখ ঘুরিয়ে রৌদ্রিকে খুঁজলো। তূর্ণা চোখ গেলো দরজার দিকো। দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্রিক।হাতে ধোঁয়া ওঠা এক মগ দুধ। অন্য হাতে তূর্ণার জন্য গরম পানির গ
ব্যাগ।কিছুক্ষণ ধরেই সে নীরবে এই দৃশ্য দেখছিলো। সামনে পৃথিবীর সমস্ত শব্দই যেন অর্থহীন হয়ে যায়। রৌদ্রিক ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলে-

“ওদের তিনজনই অনেকক্ষণ আগে ঘুমিয়েছে। তুমি এখনো কিছু খাওনি। আগে একটু দুধ খেয়ে নাও। তারপর ঘুমাও।”
তূর্ণা কিছু বলে না। শুধু একবার রৌদ্রিকের দিকে তাকায়।
অনেক রাত হয়েছে তাই আর না করলো না, রৌদ্রিকের কথা মতো দুধটা খেয়ে নিলো।তারপর কোমড়ের নিচে গরম পানির ব্যাগটা দিলো, এতে করে কিছুটা শান্তি লাগলো তূর্ণার। সারাদিনের এতো দৌড়ঝাঁপে কোমড়টা ব্যথা হয়ে গিয়েছিলো।
“ আপনি না থাকলে কি যে হতো।”
“ এরজন্যই আমি আছি।”
তূর্ণা হাসলো রৌদ্রিকের পানে চেয়ে, রোদেলার পা এসে ঠেকেছে রৌদ্রিকের একদম বুকের উপর। রৌদ্রিক মেয়ের পা’টা সড়িয়ে না দিয়ে সেখানটায় পর পর কয়েকটা চুমু দিয়ে বুকের সঙ্গে পা’টা জড়িয়ে নিদ্রাদেশে তলিয়ে গেলো।

রজনীর অন্তিম প্রহর ক্রমশ বিদায়ের পথে হাঁটছে। পূর্বাকাশ এখনও সম্পূর্ণ রঞ্জিত হয়নি; কেবল দিগন্তরেখার গায়ে অতি সূক্ষ্ম রক্তিম আলো লেপ্টে আছে। সিকদার বাড়ির বিশাল অট্টালিকাও এখনও নিদ্রার অমোঘ অধীন।
ছোট্ট রোদেলা আধোঘুম চোখেই নিজের নরম কম্বলটা গুটিয়ে সরিয়ে দিলো। এলোমেলো কেশরাশি কপালের ওপর ঝুলে আছে। নিদ্রালু দুই চোখ কচলাতে কচলাতে সে ধীর পায়ে বিছানার অপর প্রান্তে গড়িয়ে যায়। সেখানে গভীর নিদ্রায় নয়, বরং অবসন্ন দেহটাকে সামান্য বিশ্রাম দেওয়ার বৃথা প্রয়াসে শুয়ে আছে রৌদ্রিক। গত কয়েকদিনের অবিরাম কর্মব্যস্ততা, অতিথি আপ্যায়নের অনন্ত দায়, বিয়ের প্রস্তুতির অগণিত ব্যস্ততা, সন্তানের দেখভাল সব মিলিয়ে বিশ্রাম যেন তার জীবন থেকে নির্বাসিত হয়েছে। সারারাত চোখ বুজলেও নিদ্রা তার দোরগোড়ায় এসে ফিরে গেছে। দীর্ঘ অনিদ্রার নির্মম ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে তার মুখাবয়বে। চোখের শুভ্রতা রক্তাভ ক্লান্তিতে রঞ্জিত হয়েছে, চোখের নিচে গাঢ় অবসাদের ছায়া, তবুও সেই মুখশ্রীর দৃঢ়তা এতটুকুও ম্লান হয়নি। রোদেলা নিঃশব্দে এসে বাবার প্রশস্ত বক্ষের ওপর ঠিক বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। নরম দু’হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে সে গাল ঘষে দেয় তার থুতনিতে।ক্ষুদ্র কণ্ঠে আধোঘুম জড়ানো আবদার ভেসে আসে-

“পাপা.. হাম… হাঁটি… যাবো…!!”
রৌদ্রিকের চোখ তখনও সম্পূর্ণ খোলেনি।কিন্তু সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর তার সমস্ত ক্লান্তির ওপর যেন মমতার কোমল স্পর্শ বুলিয়ে দিলো। চোখ মেলে তাকাতেই বুকের ওপর গুটিসুটি মেরে থাকা ছোট্ট মানুষটাকে দেখে তার অধরের কোণে অতি সূক্ষ্ম এক হাসির রেখা জন্ম নিলো।সে আলতো করে রোদেলার এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিলো। মেয়েকে বুকের সঙ্গে ভালো করে চে’পে ধরলো।
গভীর, ঘুমভাঙা স্বরে ফিসফিস করে বলে-
“রোদের ঘুম ভেঙে গেছে?”
রোদেলা গম্ভীর মুখ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে।ছোট্ট আঙুল তুলে জানালার দিকে দেখিয়ে আবারও অস্পষ্ট স্বরে বলে-

“সূজু… আতছে… হাম… যাই..পাপা…!!”
ভোরে হাঁটাহাটি এটা তাদের দু’জনের বহুদিনের অলিখিত অভ্যাস। দিনের সমস্ত কোলাহল শুরু হওয়ার আগে পৃথিবীটাকে কেবল বাবা আর মেয়ের চোখে দেখে নেওয়ার ক্ষুদ্র এক উৎসব। রৌদ্রিক চোখের পাতা কয়েকবার বন্ধ করে অনিদ্রাজনিত জ্বালাটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলো। কপালের দু’পাশে আঙুল চেপে ধরে একবার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। দেহের প্রতিটি পেশি বিশ্রাম ভিক্ষা করছে। চোখ দুটো এখনও আগুনের মতো জ্বলছে। তবুও বুকের ওপর মুখ গুঁজে থাকা শিশুটার একটিমাত্র আবদারের কাছে সেই ক্লান্তি মুহূর্তেই নতজানু হয়ে পড়ে। কারণ রোদেলার কোনো ইচ্ছেই সে অপূর্ণ রাখার অভ্যাস গড়ে তোলেনি। সে মৃদু হেসে রোদেলার ছোট্ট নাকটা আলতো চেপে ধরে।
“চল তাহলে… আজও সূর্য ওঠার আগেই আমরা তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে আসি।”
কথা শেষ হতেই রোদেলা আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে।
“ইই…পাপা.. যাই… যাই!”

তার সেই অস্পষ্ট উচ্ছ্বাসে নিস্তব্ধ ভোরটাও যেন মৃদু হেসে ওঠছে। রৌদ্রিক ধীরে ধীরে উঠে বসে। এক হাতে মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে আগলে নিলো, অন্য হাতে এলোমেলো হয়ে হওয়া চুলগুলো ঠিক করে দিলো আবারও। তারপর অত্যন্ত যত্নে ক্ষুদ্র পায়ের পাতায় জুতো গলিয়ে দেয়, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিকে স্পর্শ করছে। জানালার বাইরে তখন আলো আরও একটু উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে।
রৌদ্রিকের বৃহৎ করতলের ভেতর প্রায় হারিয়েই গেছে রোদেলার তুলতুলে হাতখানি। হাঁটতে হাঁটতে বাগানে এসেছে, বাহিরের সাজানো হরেক রকম লাইট গুলো এখনো জ্বলছে। রোদেলা রৌদ্রিকের আঙুলে ধরে সেটা দোল দিচ্ছে, কখনো আবার হঠাৎ থেমে গিয়ে শিশিরভেজা ঘাসের দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকালো; হঠাৎই সে নিচু হয়ে বসে পড়ে। ঘাসের ফাঁকে ফুটে থাকা ক্ষুদ্র সাদা বুনো ফুলটির দিকে আঙুল দেখিয়ে আধো উচ্চারণে বলে ওঠে-

” পাপা ফুল।”
রৌদ্রিকও হাঁটু গেড়ে বসলো। সেই ফুলটি ছিঁড়ে না নিয়ে কেবল আলতো করে তার পাপড়িতে আঙুল ছোঁয়ালো। রোদেলা সেটা ছিড়তে চাইলেই রৌদ্রিক শান্ত স্বরে বলে-
“সব সৌন্দর্য নিজের করে নিতে হয় না, রোদ। কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই ভালোবাসতে হয়।”
রোদেলা কিছুই বোঝল না তবু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে ওঠে। তারপর দু’হাত বাড়িয়ে বলে-
“কুল…”
রৌদ্রিক বিন্দুমাত্র দেরি করে না।অনায়াসে মেয়েকে দুই বাহুর মধ্যে তুলে নেয়। রোদেলা মুহূর্তেই বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। গোলাপি গাল ঠেকিয়ে দেয় তার দাড়িভরা থুতনিতে। ছোট্ট আঙুল দিয়ে বাবার ভ্রু, নাক, ঠোঁট একটার পর একটা ছুঁয়ে দেখছে যেন প্রতিদিন একই মুখ দেখেও নতুন করে চিনে নিচ্ছে।রৌদ্রিক মৃদু হেসে ইচ্ছে করেই মুখটা কুঁচকে ফেলতেই রোদেলা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠলো।তার সেই স্বচ্ছ, নির্মল হাসি ভোরের বাতাসেও তরঙ্গ তোলে।

“আআ… হিহি..পাপা..”
একসময় রৌদ্রিক তাকে কাঁধে বসিয়ে দেয়। মুহূর্তেই পৃথিবীটা হঠাৎই অনেক উঁচু হয়ে যায় রোদেলার কাছে।
সে আনন্দে দু’হাত মেলে বাতাস ধরতে চাইলো। রোদেলাট ঘুম একদম কেটে গেছে, রৌদ্রিক বাড়ি থেকে বেড় হলো না আর। বাগানেই হাঁটাহাটি করছে। রোদেলা এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছে আর রৌদ্রিক উত্তর দিচ্ছে। রোদেলার আনন্দ দেখে রৌদ্রিকের চোখে এখন অনির্বচনীয় প্রশান্তি।এই ক্ষুদ্র মানুষটার সামান্য হাসির জন্যই যেন তার সমস্ত ক্লান্তি, অনিদ্রা, দায়িত্ব আর ব্যস্ততা অর্থহীন হয়ে পড়েছে তার কাছে।ঠিক সেই সময় পেছন থেকে ভেসে আসে এক পরিচিত, স্নেহমাখা কণ্ঠ-
“বাপ-বেটির সকালবেলার আদালত তো দেখি আজও বসেছে!”
রৌদ্রিক ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। উদ্যানপথ ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন রশিদ সিকদার। পরিপাটি সাদা পাঞ্জাবি, ঠোঁটের কোণে চিরচেনা মৃদু হাসি। বয়স তাঁর চুলে রূপালি ছাপ ফেলেছে, কিন্তু ব্যক্তিত্বের দীপ্তি এখনও অবিচল।
রৌদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে কাঁধ থেকে রোদেলাকে নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

“ তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম।
রশিদ সিকদার এগিয়ে এসে স্নেহভরে রৌদ্রিকের কাঁধে হাত রাখেন। তারপর নিচু হয়ে রোদেলার দিকে হাত বাড়াতেই ছোট্ট মেয়েটা প্রথমে বাবার পায়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।
মুহূর্ত দুয়েক উঁকি দিয়ে রশিদ সিকদারের দিকে তাকালো।
তারপর নিজেই দৌড়ে গিয়ে রশিদ সিকদারের হাঁটু জড়িয়ে ধরে। রশিদ সিকদার অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন।তিনি রোদেলাকে কোলে তুলে নিয়ে বলেন-
“এই যে আমার ছোট্ট রোদ, সকালে দাদুকে না ডেকে বেড়াতে চলে এলে?”
পরক্ষণেই রোদেলা দুই হাত দিয়ে রশিদ সিকদারের গাল চেপে ধরে অস্পষ্ট স্বরে ঘুম জড়ানো স্বরে
” এত্তু আগেই এতেছি তো দাদু।”

বলেই সে হেসে ফেলে। সেই হাসির সংক্রমণে রশিদ সিকদারও হেসে ওঠেন। কিছুক্ষণ নীরবে বাবা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। তারপর রৌদ্রিকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ধীর কণ্ঠে বলেন-
“ ঘুম হয়নি তোর তাই না? চোখের অবস্থা কি! যাহ তুই ঘুমা আমি আর রোদ দাদুভাইকে নিয়ে হাঁটি। তোর ছুটি আপাতত।”
“ লাগবে না চাচ্চু চল ওইদিকটায় যাই। এমনি এখন ঘুমালে আর ঘুম হবে না।”
” ঘুমা একটু সবাই উঠলে আবারও তো কাজের মাঝেই থাকবি।”
“ ঘুমিয়ে নিবো নি একসময়। এতো চিন্তা করো না তো।”
“ ডাক্তার হয়ে নিজেই নিজের খেয়াল রাখিস না এটা কেমন কথা।”
“ এতোটুকুও ফাঁকিবাজি করাই যায় বোনের বিয়েতে।”
তারা তিনজন নানা কথা বলবে বলতে সারা বাগান কয়েকটা চক্কর কাটলো।

সময়ের এক অদৃশ্য রথচক্র কখন যে নীরবে জীবনকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যায়, তা মানুষ বুঝে উঠতে পারে কেবল স্মৃতির দিকে ফিরে তাকালে। সুখ, দুঃখ, মিলন, বিদায় সবকিছুকে সমান নির্লিপ্ততায় বক্ষে ধারণ করে কাল আপন নিয়মেই প্রবহমান থাকে। কোনো উৎসব চিরস্থায়ী হয় না, আবার কোনো শূন্যতাও অনন্তকাল স্থির থাকে না। জীবন তার নিজস্ব গতিতেই প্রতিটি মানুষকে নতুন অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দেয়। রিনির বিয়েও অবশেষে সুসম্পন্ন হয়েছে।
অশ্রুসজল বিদায়ের সেই ক্ষণ পেরিয়ে সিকদার বাড়ির আঙিনা ধীরে ধীরে আবারও তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। অতিথিদের পদচারণা স্তিমিত হয়েছে, আলোকমালার রঙিন ঝলক একে একে নিভে গিয়েছে, হাসির উচ্চকিত কলরব মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে দেয় দৈনন্দিন জীবনের চিরচেনা ব্যস্ততাকে। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ হয়। সপ্তাহ গড়িয়ে মাস। মাস পেরিয়ে ঋতুচক্র বদলায়।
বাড়ির প্রতিটি মানুষই ধীরে ধীরে নিজ নিজ জীবনের পরিধিতে পুনরায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কারও দায়িত্ব বাড়ে, কারও কর্মব্যস্ততা, কারও স্বপ্নের বিস্তার।
এদিকে রোদেলার জীবনেও সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের।

ছোট্ট কাঁধে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে, দু’পাশে ফিতে বাঁধা চুল দুলিয়ে, প্রতিদিন ভোরে বাবার হাত শক্ত করে ধরে সে স্কুলের উদ্দেশে রওনা দেয়। অক্ষরের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়, নতুন বন্ধু, নতুন শ্রেণিকক্ষ সবকিছু নিয়েই তার অপরিসীম কৌতূহল। স্কুল থেকে ফিরে সেখানে ঘটা প্রতিটি ঘটনা আগে তূর্ণাকে বলবে৷ দুই মা-মেয়ে আগের মতোই সব ছেড়ে নিজেদের গল্পে মজে যায়। তারপর রৌদ্রিক বাড়ি ফিরলে তাকেও এক এক করে সব খুলে বলবে কি কি করেছে সে সারাদিন। রৌদ্রিকও মন দিয়ে মেয়ের সব কথা শুনবে। অন্যদিকে রোদ্দুর আর রোদেশীও আর আগের সেই কেবল কোলজুড়ে শুয়ে থাকা দুই অবুঝ শিশু নয়।সময় তাদেরও একটু একটু করে বড় করে তুলেছে। এখন তারা হামাগুড়ি দিয়ে ঘরময় রাজত্ব করে, টলমল পায়ে দাঁড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে, অকারণে হেসে ওঠে, আবার তুচ্ছ কারণেই মুখ বাঁকিয়ে কান্না এসব দিয়েই ভরে ওঠে সিকদার বাড়ির প্রতিটি প্রহর। সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে তাদের ভাষাহীন পৃথিবীতে। একসময় অস্পষ্ট স্বর, হাসি আর কান্নাতেই সীমাবদ্ধ থাকা দুটি কণ্ঠ ধীরে ধীরে শব্দের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে শিখেছে। আ,ম,দা,চা এইসব অক্ষর উচ্চারণ করতে শিখেছে। তারা কখনো স্পষ্ট, কখনো অস্পষ্ট অক্ষরগুলো তাদের ক্ষুদ্র অধরে ফুটে ওঠার চেষ্টা করে। ঠিক সদ্য বিকশিত শিউলি ফুলের মতোই নির্মল।

রোদেলা এখন স্কুলে রোদেশী ঘুমে, ঘুম নেই রোদ্দুরের চোখে। রোদেলা ফিরবে ঘন্টাখানেক পর, তাকে নিতে যায় তূর্ণা। মাঝে মাঝে রৌদ্রিকও আনে, তবে তূর্ণাই আনে বেশি৷ বাবার সঙ্গে সকালে স্কুল যায় আর আসে মায়ের সঙ্গে ল।
পশ্চিমাকাশে সূর্যটা তার সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে। দ্বিতীয় তলার প্রশস্ত বারান্দাজুড়ে নরম বাতাস বইছে। রেলিংয়ের পাশে রাখা দোলচেয়ারে বসে আছে তূর্ণা।
তার কোলে আধশোয়া হয়ে আছে রোদ্দুর। গোলগাল গালদুটো কখনো মায়ের ওড়না মুঠোয় পুরে টানছে, কখনো আবার দুই হাত তুলে বাতাস ধরার নিষ্ফল চেষ্টা করছে।
তূর্ণা মুগ্ধ নয়নে ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে-
“আমার সোনা বাবু… বলো তো, মা… মা বলো…”
রোদ্দুর বিস্মিত চোখে কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো.। মনে হচ্ছে, শব্দগুলোর অর্থ সে বোঝে না; কিন্তু সেই কণ্ঠের স্নেহ সে নিঃসন্দেহে অনুভব করে।তূর্ণা আবারও ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে-

“মা…”
রোদ্দুরও ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে চেষ্টা করে।প্রথমে বেরিয়ে আসে-
“ম্…”
তারপর
“মা…”
তূর্ণার চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।সে উৎসাহভরা কণ্ঠে আবারও বলে-
“আরেকবার বলো, বাবু… মা… একদম আপুর মতো বল তো দেখি।”
রোদ্দুর হঠাৎ দু’হাত নেড়ে আনন্দে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
পরক্ষণেই অদ্ভুত এক স্বচ্ছতায়, জড়ানো অথচ স্পষ্টতম উচ্চারণে বলে ফেলে-
“মা…ম্মাম…”
মুহূর্তটি যেন সময়ের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। তূর্ণা নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেলো বোধয় তার বুকের ভেতর কোথাও এক অদৃশ্য সুরের তার হঠাৎ করেই বেজে ওঠে।
এতদিন ধরে অসংখ্যবার নিজের মুখে উচ্চারিত একটি সাধারণ শব্দ আজ সন্তানের কণ্ঠে ফিরে এসে কেন এত অলৌকিক শোনায় তার কোনো ভাষা নেই।চোখের কোণে অশ্রুর ক্ষুদ্র বিন্দুগুলো নীরবে জন্ম নিলো । সে দু’হাতে রোদ্দুরের গোলগাল মুখখানা আলতো করে আঁকড়ে ধরে।
কাঁপা কাঁপা হাসিতে ভিজে যায় তার অধর।

“আবার বলো তো আব্বা … একবার… শুধু আর একবার…”
রোদ্দুর কিছুই বোঝে না। সে শুধু মায়ের হাসি দেখে নিজেও হেসে ওঠে। তারপর আবারও সেই একই শব্দ, একই সরলতায়, একই নিষ্পাপ নিশ্চয়তায় উচ্চারণ করে-
“ম্মাম…”
তূর্ণার মনটা ভরে গেলো, সে এখন মন ভরে বাবা ডাকতে পারে। কারণ আল্লাহ তার কোলে ছোট একটা বাবা পাঠিয়েছে, মা জিনিসটা কি সেটা তার জানা নেই। তাই তার জীবনে দুইটা মাও পাঠিয়েছে। তাকে একদম ভরা কোল করে দিয়েছে। রোদ্দুর হাত ছুড়ে হাসছে, তার হাসি যেনো থামছেই না। সেটা দেখে তূর্ণা অধর কোনো হাসির রেখা ফুটে ওঠে, সে অশ্রুসজল চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আল্লাহ আমাকে এযাবৎ পিতা শূণ্য করলেও তোমাকে
দিয়ে আমার আব্বার সখ পূর্ণ করেছে। আমার জীবনে
রোদ্দুর নামক বাবাকে পাঠিয়েছে, মায়ের কাছে তার
রোদ্দুরকে পাঠিয়েছে। তূর্ণার জীবনে কি চাই বল
বাবা?”
রোদ্দুর কি বুঝলো সে হেসে উঠলো আবারও দাঁত উঠবে উঠবে ভাব। দুধের দাঁত ওঠাও শুরু করেছে তাদের।

সকাল পেরিয়ে দুপুর ভাগে সময় চলে এসেছে
শরৎশেষের কোমল সমীরণ পথের দু’ধারে সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়ার পত্রপল্লবকে দোলায়িত করে অদৃশ্য কোনো সুরের জন্ম দিচ্ছে। স্কুলের শেষ ঘণ্টা বেজে যাওয়ার বহুক্ষণ পরও চারপাশে শিশুদের কলরবের ক্ষীণ অনুরণন ভেসে বেড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদচারণা, টুকরো টুকরো হাসি, অকারণ উচ্ছ্বাস। সেই ভিড়ের মাঝখান দিয়েই ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলছে তূর্ণা। এক হাতে রোদেলার ছোট্ট আঙুল শক্ত করে ধরা, অন্য কাঁধে ঝুলছে মেয়ের ক্ষুদ্র স্কুলব্যাগ। রোদেলা আজও একরাশ গল্প জমিয়ে রেখেছে।
চার বছরের ছোট্ট পৃথিবীতে প্রতিটি দিনই এক একটি নতুন আবিষ্কার। একটু পরপরই সে মাথা উঁচু করে মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার নিজের মতো করেই জড়ানো কণ্ঠে বলতে শুরু করে-
“মা… আজ না… আমাদে ম্যাম আমাদের গোল গোল আঁকতে দিয়েতে.. আমি একদম বউড়ো সূজু আঁকছি। একদত ডিমের মতো হয়ে গেতে।”
বলতে বলতেই নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সে। তূর্ণাও মৃদু হেসে মেয়ের এলোমেলো কপাল থেকে ঘামে ভেজা চুল সরিয়ে দেয়। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে-

“তাই নাকি? তাহলে আমার রোদেলা তো আজ খুব সুন্দর এঁকেছে?”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে গর্বে বুক ফুলিয়ে ফেলে।
“হুম! ম্যাম্মা স্টাত দিয়েছে জানো…”
‘স্টার’ শব্দটি এখনও তার জিভের সঙ্গে পুরোপুরি বন্ধুত্ব করতে পারেনি। তূর্ণার বুকের ভেতরটা অকারণেই ভালো লাগায় ভরে ওঠে।সে মেয়ের গালে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে দিলো। হাঁটতে হাঁটতেই আচমকা লক্ষ্য করে, রোদেলার ডান পায়ের জুতোর ফিতা খুলে গেছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে পথের ধারে ছায়াঘেরা এক জায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে। রোদেলা গল্প বলায় এতটাই নিমগ্ন যে নিজের জুতোর কথাই খেয়াল নেই। সে এখনও একনাগাড়ে বলে চলেছে*
“আয় মা জানো? আজ না… আমি টিফিনে সব খেয়েতি। কিন্তু আরিফ না, আমাগে আপেল চাইছিলো। আমি অদুক দিছি…”

তূর্ণা হাসতে হাসতেই ফিতেটা যত্ন করে বেঁধে দেয়। তারপর দুই হাত দিয়ে মেয়ের ছোট্ট পায়ের ওপর আলতো চাপ দিয়ে দেখে কোথাও অস্বস্তি হচ্ছে কি না।সব ঠিক আছে বুঝে উঠে দাঁড়ায়।কপালে নেমে আসা চুলগুলো আবারও কানের পেছনে গুঁজে দিলো। পানির বোতল খুলে মেয়ের দিকে এগিয়ে ধরে।
“আগে একটু পানি খাও। এত কথা বললে গলা শুকিয়ে যাবে।”
রোদেলা বাধ্য মেয়ের মতো দু’চুমুক পানি খায় বটে, কিন্তু বোতল নামানোর আগেই আবার নতুন গল্পের ঝুলি খুলে বসে।
“মা আমি আজ না…পয়েম বলেতি, পাপা শিখিয়েতিল যেতা।.”
“কী কবিতা বলেছো?”
রোদেলা চোখ দুটো গোল করে অনেক ভাবার ভান করে।

তারপর ভাঙা ভাঙা ছন্দে কয়েকটি লাইন বলতে গিয়েই নিজেই গুলিয়ে ফেললো। ভুল বুঝতে পেরে নিজের দুই গাল চেপে ধরে এমনভাবে হেসে ওঠে যে পথের দু-একজন পথচারীও অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুচকি হেসে ফেলে। তূর্ণা সেই হাসির দিকে তাকিয়ে থাকলো। গাড়িতে ওঠার পরও তার গল্প শেষ হলো না, নতুন বন্ধু বানিয়েছে তাদের কে, কেমন সব বলছে৷ তূর্ণাও মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনছে
গাড়ি গলির মুখে পৌঁছাতেই রোদেলা হঠাৎ দু’হাত প্রসারিত করে তূর্ণার দিকে তাকায়। রোদেলা মিষ্টি কণ্ঠে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭ (২)

” মা কোল।”
তূর্ণা এক মুহূর্তও দেরি করে না। মৃদু হেসে নিচু হয়ে মেয়েকে দুই বাহুর নিবিড় আশ্রয়ে তুলে নেয়।রোদেলা সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মাথাটা তার কাঁধে এলিয়ে দিলো।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here