Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১৫

অভিসৃতি পর্ব ১৫

অভিসৃতি পর্ব ১৫
নওরিন কবির তিশা

অলক্ষ্যে বহমান প্রমত্তা তটিনীর ন্যায় দুটো দিন কেটে গেছে অজান্তেই। অট্টালিকা জুড়ে বাড়ন্ত স্বজনদের সমাগম; পরিণয়ের তোড়জোড়ে চারপাশটা উৎসবমুখর। আজ বাদে কাল বিবাহের দিন ধার্য করা হয়েছে। আড়ম্বরহীন সংক্ষিপ্ত পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও, প্রখ্যাত শিল্পপতি আনোয়ার ইয়াসিরের অতি আদুরে ছোট মেয়ের বিয়ে বলে কথা! আমন্ত্রণে কিংবা ভূরিভোজে সামান্যতম খামতি রাখতে নারাজ তিনি। অবশ্য, দীর্ঘমেয়াদী আনন্দ-উৎসবের শখটুকু অপূর্ণই রয়ে গেছে পরিবারের।

নেপথ্যের হেতুটিও সুস্পষ্ট—দুর্জয়ের পেশাগত জীবনের কঠোর শৃঙ্খলা আর দায়িত্বের প্রতি একাগ্রতা। সুদূর সীমান্ত থেকে ডাক পড়লেই ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করে ছুটে যেতে হবে তাকে; তাই এই তড়িঘড়ি তদারকি। আনোয়ার ইয়াসিরের সুবিশাল অট্টালিকা—উত্তরাধিকারীদের নামে যার নামকরণ ‘পায়রা-কায়রা নিবাস’। নিকেতনের সম্মুখের বিশাল উদ্যানের ন্যায় প্রশস্ত জায়গাটা সজ্জিত হয়েছে হলুদিয়া আয়োজনে।
অথচ এত এত আত্মীয়-স্বজনের ভিড়েও কয়রার বন্ধু মহলের উপস্থিতি বড্ড স্বতন্ত্র। ছেলেগুলো, একাগ্রচিত্তে ডেকোরেশনের লোকজনকে তদারকি করছে। আনোয়ার ইয়াসির এই একটা কারণেই কায়রার বন্ধু মহলকে ভীষণ পছন্দ করেন। ছেলেগুলো প্রচন্ড দায়িত্ববান, আর মেয়েগুলো যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। এজন্যই, এত বেপরোয়া ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মেয়ে থাকলেও কখনো মেয়ের উচ্ছন্নে যাওয়ার চিন্তা করেনি পরিবার।
সমগ্র বাড়ি লোকজন সমগমে গিজগিজ করছে। অপরাহ্ন পেরিয়ে সায়াহ্নের অপেক্ষায় প্রতীক্ষিত প্রকৃতি। সুশৃংখলিত নিয়ম-নীতি আর বন্ধু মহলের সহযোগিতায় বেশ ভালোভাবেই সমস্ত অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটেছে। আপাতত, রাতের উৎসবের তোড়জোড় চলছে। মেয়েলি অনুষ্ঠান—মেহেদি যাকে বলে।
তুজা আর মেধা উপস্থিত কায়রার কক্ষেই। তুজা কায়রার জলসিক্ত কেশরাজ হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে দ্রুত শুকিয়ে দিতে দিতে হঠাৎ বলল,,

“দোস্ত জানিস কি হয়েছে?”
“কি?”
“ঐদিন তোরা ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসলি না, তারপর দিহান ভাইও চলে গিয়েছিল।”
কায়রা মুখ কুঁচকে বলল,,“তাতে আমার কি?”
কায়রার এমন তীব্র অনীহায় তুজা ক্ষুণ্ণ হয়ে বিরক্তিমুখে বলল,
“পুরোটা শুনবি তো?”
“হ্যাঁ তো, বল!”
তুজা প্রথমে বিরক্ত হলেও নিজের ভেতরের চাপা কথাগুলো উগড়ে দিতে,জলদি হাতে হেয়ার ড্রায়ারটা একপাশে রেখে বেশ চঞ্চল কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
“আরে শোন! ওইদিন তোরা গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই দিহান ভাই একপ্রকার ফুঁসতে ফুঁসতে স্পট ত্যাগ করেছিল। দেন… দ্যাট নাইট উনি মারাত্মক একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেন! আজ প্রায় দু’দিন ধরে হসপিটালে ভর্তি উনি!”

“কী বলিস? অ্যাক্সিডেন্ট?”
তূজা প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করবে। তার ঠিক আগ মুহূর্তে, পাশ থেকে মেধা বাগড়া দিয়ে বলল,,
“আরে ধুর বাদ দে তো! অ্যাক্সিডেন্ট মারে! ওভাবে কখনো অ্যাক্সিডেন্ট হয় নাকি?”
তুজা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল,
“মানে? তুই কী বলতে চাইছিস?”
“রুশাফদের কাছে শুনিসনি? ডিপার্টমেন্ট থেকে ওরা তো হসপিটালে দেখতে গিয়েছিল কাল। ওদের যা ডিসক্রিপশন, তাতে তো আমার মনে হয় কেউ বেশ নিপুণ হাতে পিটিয়ে ওনার হাত-পা গুটিয়ে দিয়েছে! বিশেষ করে ডান হাতটা নাকি মারাত্মক জখম হয়েছে! ডক্টররা রড বসিয়েছে ভেতরে!”
মেধার সুনির্দিষ্ট আর বিস্ফোরক বর্ণনায় কায়রা একপ্রকার থ মেরে বসে রইল! অনাড়ম্বর কেশরাশি পিঠে ছড়িয়ে ও নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল সম্মুখের দীঘল দর্পনে। বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে নানাবিধ সমীকরণ মেলাবার বহু প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হিসেবে গণ্য হলো। হারিয়ে গেল শব্দভাণ্ডার! তবে কি সে যা ভাবছে? সহসা, পায়রার ডাকে কল্পলোক হতে ছিটকে বাস্তবে ফিরলো ও। না,ওকে ডাকছে না। ডাকছে, তুজা আর মেধাকে। সকাল থেকে কিছু খায়নি ওরা।
ওরা প্রস্থান করতেই একটা পেটে খাবারের পরস’রা সাজিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল পায়রা। এক ঝলক বোনের দিকে তাকিয়ে, খাবারগুলো পাশের টেবিলে রেখে চিরাচরিত ঝগড়ুটে কন্ঠে বলল,,

“ধর, খা!”
বলেই ও বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো‌। তবে পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলে খাবারের প্লেটটা হাতে তুলে কায়রার দিকে চেয়ে বলল,,
“খেতে তো পারবি না,বিছানা নোংরা করবি! বাড়ি এত শত লোক, না বাবা আব্বুর মান সম্মানের ফালুদা করতে চাই না আমি। হা কর, কৃপা করে খাইয়ে দিচ্ছি।”
বোনের এহেন দ্বিমুখী সত্ত্বায় মৃদু হাস্যে চাইলো কায়রা নিস্পৃহ বাক্যের আড়ালে গূঢ় স্নেহটুকু অনুধাবন করে, বোনকে ক্ষ্যাপাবার তাগিদটা আজ আর জাগল না অন্তরে। সে বাধ্য মেয়ের মতো মুখ সবটুকু খাবার শেষ করল।
আহারান্তে, হঠাৎই নৈঃশব্দ্যের প্রাচীর ভেদ করে কায়রা মৃদুকণ্ঠে শুধাল,

“আমায় মিস করবি, আপু?”
পায়রা থমকায় ‌নিমেষের তরে;ক্ষণকাল স্থাণু হয়ে রয় কায়রার পানে। পরক্ষণেই অবশ্য স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মেজাজ সামলে নিয়ে জবাব দিলো,,
“তোকে মিস করব? আর ইয়্যু কিডিং উইথ মি? বাঁচলাম বাবা! তুই গেলে এ বাড়ির এয়ার কোয়ালিটি ইম্প্রুভ করবে। আমার পার্সোনাল স্পেস পাব, তোর ওই ক্যাওস হ্যান্ডেল করতে হবে না, ইভেন আব্বু শুধু আমার জন্যই ড্রেস কিনবে, সবকিছু আমি একাই এনজয় করতে পারব! সো প্লিজ, একবার বিদায় হলে ভুলেও আর ব্যাক করিস না, এই বাড়িতে আমায় শান্তিতে এক্সিস্ট করতে দে!”
পায়রা তখনো নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের অনাসক্তি প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে! কায়রা নিবিড় মমতায় বোনের মুখের পানে চেয়ে রইল। সহসা পায়রার চোখের তারায় একফোঁটা অশ্রুবিন্দু চিকচিক করে উঠতেই কায়রা কোমল স্বরে বলে উঠল,

“তোর চোখে পানি আপু?”
পায়রা চকিতে হাত উল্টে চোখের কোণ জোড়া মুছে নিল। কৃত্রিম চটে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“স্টুপিড নাকি? ঘরে লাইটের ব্রাইটনেস দেখছিস? আলোয় চোখ জ্বালা করছে তাই! মোটেও সেন্টিমেন্টাল হয়ে কান্নাকাটি করছি না, ওকে?”
কায়রা এবার একপা এগিয়ে এসে, ধীরলয়ে পায়রার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল,,
“আচ্ছা বাবা, মেনে নিলাম। কিন্তু আজকের রাতটুকু অন্তত আর ঝগড়াটা না করি? কাল তো সত্যিই সব বদলে যাবে!”
পায়রা আর নিজের কঠিন আবরণটা ধরে রাখতে পারল না। এক পরম মমতায় ছোট বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুটে বলে উঠলো,,
“আমি সত্যিই তোকে মিস করবো কায়ু,খেউ!”

“ইয়ে মানে হ্যালো?”
তাকিয়ে থাকা সময়ের গতি যেন পলকের জন্য থমকে গেছে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া ঘরজুড়ে তখন নিশ্ছিদ্র নীরবতা। ওপাশে ফোনের সংযোগটি বহাল থাকলেও অপর প্রান্তের গম্ভীর, নিঃশব্দ উপস্থিতি কায়রার শংকিত হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে চলেছে অতিমাত্রায়। ​বিগত আধঘণ্টা ধরে একইভাবে চেষ্টা চালিয়েও কায়রা মনের জমানো সংকোচের আগল ভাঙতে অক্ষম।

অথচ ওর এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বে অপর প্রান্তের মানবটির ধৈর্যের সীমা ভঙ্গন হলো হয়তো। কপট গাম্ভীর্যে সে শুধালো,,
“এনিথিং ইম্পর্টেন্ট?”
​কায়রা এবার সমস্ত সাহস জমাবদ্ধ করে অস্ফুটে কৌতুহলী কন্ঠে শুধালো,,
“আপনি কি… দিহান ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে কিছু জানেন?”
​ওপাশের নীরবতা যেন এক মুহূর্তের জন্য আরও ঘনীভূত হলো। দুর্জয় উত্তরের পরিবর্তে নিরাসক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,,
“কোন দিহান?”
​কায়রার অস্থিরতা এক লাফে দ্বিগুণ হলো। হাতের মুঠোয় ফোনটা শক্ত করে ধরে সে ঢোক গিলে বলল,
“ওই যে… সেদিন ক্যাম্পাসে হঠাৎ আমার হাত ধরে টান দিয়েছিল যে…”

“আইসি!”
“বলুন না, আপনি কিছু জানেন?”
দুর্জয় এবারও নিজের স্বভাবসুলভ ভারী কণ্ঠে শুধাল,
“আমার কি বিশেষ কিছু জানার কথা ছিল?”
কথাটার ধরন শুনে কায়রার সমাধানকৃত সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট হলো মুহূর্তেই। ও কিছুটা লজ্জিত ও হতচকিত হয়ে তোতলে উঠে বলল,
“নাহ্… মানে, আমি ভেবেছিলাম বোধহয় আপনি ঘটনাটার পেছনে… আই মিন, আপনি কিছু জানেন হয়তো। তাই জাস্ট জানতে চাইছিলাম।”
দুর্জয়ের নীরবতা কায়রার বক্ষস্থলে অচেনা আলোড়ন তুলল। খানিকবাদে,ওপাশ হতে ধাতব কণ্ঠে ভেসে এল সংক্ষিপ্ত উক্তি,,

​“অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মাথা ঘামানো আপনার অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে, মিস কায়রা। ডু আই লুক লাইক অ্যান ইনভেস্টিগেটর টু ইউ?”
​কায়রা ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে মৃদু অভিমানের সুরে বলে উঠল,
“মোটেও না! কিন্তু সেদিন যেভাবে আপনার ফোনটা ভাঙল আর আপনি ওভাবে বললেন… তাই তো সন্দেহ হলো! মেধা তো বলছিল কেউ নাকি ইচ্ছা করে ওকে ধরে আচ্ছাসে কেলিয়েছে!”
পরপর জ্বীভ কাটল,কার সামনে কি ভাষা ব্যবহার করেছে,ভেবেই শুধরিয়ে বলল,,
“মানে,মেরেছে‌ আর কি!”
“সামরিক জীবনের প্রথম শিক্ষা হলো—যে হাত অন্য কারোর সীমানা ডিঙাতে চায়, তার পরিণতি দুমড়ে যাওয়া তরুশাখা’র ন্যায় হওয়া উচিত। তা ছাড়া, আপনার সেই চকলেট বয় কোনো অ্যাক্সিডেন্ট নয়, মেজার ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্যাটস অল।”
“তার মানে সত্যিই কাজটা আপনার? আপনি-ই ওকে পিটিয়েছেন?”
​দুর্জয় সুঠাম দেহ রকিং চেয়ারে হেলিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,

“অনধিকার চর্চা সহ্য করা দুর্জয় আহসানের চরিত্রে নেই। আপনাকে অহেতুক টাচ করার মাশুল ওটা। এনি মোর কোশ্চেনস?”
“না… মানে… খুব খারাপ কিন্তু কাজটা একদমই হয়নি! অসভ্যটার শাস্তি হওয়াই উচিত ছিল! তবে… আপনার জন্য ভয় লাগছিল যদি কোনো ঝামেলা হয়।”
কায়রার অহেতুক দুশ্চিন্তায় ​দুর্জয়ের ওষ্ঠাধরের কোণে দুর্লভ হাস্য রেখার দেখা মিললো,,
“আই নো হাউ টু প্রটেক্ট মাই টেরিটরি। সো, উইথ আউট অ্যানি টেনশন,এখন চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ুন।”
​“এতো দ্রুত ঘুমাবো নাকি? মেহেদী বাকি এখনো, যাইহোক আপনাকে গুড নাইট, মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখুন আমাকে নিয়ে!”

বলেই লাজুক হেসে ফোন কেটে দিলো ও।
“কায়ার কপাল ভাই! দারুণ একটা বর পেল! জাস্ট হাত ধরেছে তাই হাত ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে দিছে ভাই! এদিকে আমার জন্য তো কেউ, চুলটা ও ছিঁড়ল না কারোর! এ জীবন রেখে কি লাভ!”
তূজার আফসোসবাণীতে বন্ধুদের চারজোড়া নেত্রে স্পষ্ট দৃশ্যমান হলো সীমাহীন অসহিষ্ণুতা। ​গাড়ির সিটে অলস ভঙ্গিতে গা হেলিয়ে থাকা ইভানের পক্ষে নৈঃশব্দ্যে সমর্থন জানানো সম্ভব হলো না। তূজার দিকে আড়াচোখে চেয়ে বাঁকা হেসে কটাক্ষের সুর চড়ালো,
“আহা রে! শখ কত! কার কপাল পোড়াবি তুই? যে তোকে সহ্য করবে, সেই তো দুনিয়ার অষ্টম আশ্চর্য! এই ঝাল মেজাজ নিয়ে কপাল চাপড়ে কী হবে, তোর জন্য তো কোনো পাগলও কাতার দেবে না!”
​তূজা একলহমায় চটে গিয়ে ফুঁসে উঠল,
“মুখ সামলে কথা বল ইভান! আমার ঝাল মেজাজ নাকি? তোর মতো একটা অসভ্য চ্যাটের সাথে তো কেউ কথাও বলবে না! আর জেনে রাখ, সময় হলে, দেখতে পাবি কেমন ড্যাসিং ম্যান আমার লাইফে আসে!”
​ইভান শ্লেষ মিশ্রিত হাসিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“ড্যাসিং ম্যান? নাকি টাকলু কাকু? তোকে সহ্য করে সংসার করা মানে তো নিত্যদিন থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার সামলানো! ওটা সরকারি চাকুরীজীবী ভোটকা কাক্কুর পক্ষে ছাড়া পসিবল হবে না!”
তূজা দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করে চোটে গিয়ে বলল,,
“আমার জন্য পাত্র ঠিক হয়েই আছে। আর পর ইয়্যুর কাইন্ড ইনফরমেশন ভীষণ সুন্দর দেখতে সে,একেবারে মনের মত! কায়রার বিয়ের এক মাসের মধ্যেই আমরাও বিয়ে করছি! আর সেখানে তোকে ইনভাইটও করবো না। যা!”
মেধা এবার কথোপকথনের মাঝে নাক গলিয়ে বলল,,
“এই, সত্যি নাকি?”
তূজা ঘাড় ঘুরিয়ে মেধায় দিকে চেয়ে বলল,,“হ্যাঁ, তোদের বলেছিলাম না,আমার বড় ফুপির ভাসুরের ছেলের কথা? নিনাদ ভাই, ইউএস-এ থাকে, দেশে ফিরলেই সামনের মাসেই বিয়ের ডেট ফিক্সড হবে!”
​ইভানের সুগঠিত ওষ্ঠাধরের হাসিটুকু আচমকা উবে গেল। মুখশ্রীতে এক বিদঘুটে, থমথমে কাঠিন্য ভর করল। পরমুহূর্তে বাকি সকলে গল্পে মশগুল হলেও নিশ্চুপ রইলো সে।

বাড়ির প্রায় জনশূন্য হয়ে এসেছে। নিশুতি নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চরাচর। কায়রার নিদ্রাচ্ছন্নতার আগ অব্দি ওর কক্ষেই ছিল পায়রা। অবশেষে,কায়রা ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালে তবে পায়রা নিজের কক্ষে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। হঠাৎ, বাবা-মায়ের কক্ষের সম্মুখে এসে থমকায় সে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে গল্পের গুঞ্জন। ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত হলো মুহূর্তেই। দরজা থেকে ভেতরে ঢুকলো তৎক্ষণাৎ। কক্ষে অবস্থানরত তিন সদস্য পায়রার এহেন হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ দৃশ্য অবলোকন করতেই অপ্রস্তুত হলো ও।
বোকাহাস্যে,আনোয়ার ইয়াসিরের দিকে চেয়ে কিছু বলো আগেই পাশ থেকে নুরা বেগম বললেন,,
“সিরাজ আংকেলকে সালাম করো পায়রা।”
এতক্ষণে সম্মুখে বসারত মানবটির দিকে দৃষ্টি স্থাপন করলো পায়রা।সঙ্গে সঙ্গে,প্রিয় মুখটা দেখতেই আপ্লুত হয়ে, দু’কদম এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে বলল,
“আসসালামুয়ালাইকুম আংকেল। কেমন আছেন? আসলে,আমি আপনাকে খেয়াল করি নাই,স্যরি।”
সিরাজ রহমান;আনোয়ার ইয়াসিরের বাল্যবন্ধু সঙ্গে ব্যবসায়িক সঙ্গী। দীর্ঘদিন যাবৎ, দেশে বিদেশে একত্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তারা। তাছাড়া মানুষটার ব্যবহারও অমায়িক। সিরাজ রহমান সাহেব,স্বভাবসুলভ হেসে বললেন,,

“ওয়ালাইকুমুস সালাম মা। এইতো আলহামদুলিল্লাহ। তোমার কি অবস্থা, আম্মা?”
এই একটা কারণেই লোকটার প্রতি দ্বিগুণ শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে পায়রার।কত দারুণভাবে,কথায় কথায় মিষ্টি সম্বোধন দেয়! পায়রাও অমায়িক হেসে বলল,,
“আলহামদুলিল্লাহ আংকেল। আমিও ভালো আছি।”
ওদের কুশলপর্ব শেষে পাশ থেকে নুরা বেগম বললেন,,
“তা,বাবাকে আনলেন না কেনো ভাইজান?কোনোদিন ওকে দেখি না।শুনলাম দেশে এসেছে?”
সিরাজ সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে নুরা বেগমের দিকে চেয়ে বললেন,,
“এসেছে তো,অনেক দিন। কিন্তু আপনারা যে কাণ্ড বাধিয়েছেন,তাতে বেচারা কোথায় যাবে?”
নুরা বেগমের সঙ্গে এবার বিস্মিত হলেন আনোয়ার ইয়াসিরও।একত্রে শুধালেন,

“কেনো?কি হয়েছে?”
ওনাদের বিচলিত হতে দেখে,সিরাজ সাহেব অভয় দিয়ে বললেন,,
“তেমন কোনো সিরিয়াস ইস্যু নয়। অ্যাকচুয়ালি, আমাদের কায়রা মামনির পাত্র,অর্থাৎ দুর্জয় আমার ছেলের জিগারের দোস্ত। আমার আর আনোয়ারের মতো। ওরাও একসঙ্গে ক্যাডেটে পড়েছে।তাই, বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে আমি এখানে আর ও ওখানে।”
ওনার কথায় নিশ্চিন্ত হলেন আনোয়ার খান আর নুরা বেগম। পুনরায়, ওনারা গল্পে মশগুল হলে, পায়রা অনুমতিক্রমে কক্ষ থেকে প্রস্থান করলো।

স্নিগ্ধ প্রভাতী রৌদ্ররশ্মি ধরণীর বুকে প্রাণের সঞ্চার করছে। বিশেষ দিন উপলক্ষে প্রকৃতি ও যেন বিশেষ রূপে সজ্জিত হয়েছে আজ। আসন্ন রিক্ততার প্রহর উপলক্ষে যৎ-কিঞ্চিৎ কুহেলির দেখা দুষ্প্রাপ্য নয় এখন। তবে, আজ বেলা চড়াও হলেও কুহেলির আস্তরণ সূক্ষ্ম রূপে প্রতীয়মান অঞ্চলজুড়ে। খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সুবিশাল ও আধুনিক ‘ কনভেনশন সেন্টার’-এ আজ কায়রার বিবাহোত্তর সংবর্ধনার আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন।
বিস্তর হল সম্পূর্ণটাই সজ্জিত হয়েছে, শুভ্র গোলাপের স্তবকে। শুভ্র মখমলে মোড়া নবদম্পতির বিশেষ আসনটি শ্বেতশুভ্র চন্দ্রমল্লিকা আর রঙিন অর্কিডের নিপুণ কারুকাজে সজ্জ্বিত। কনভেনশন হলে কায়রাকে বধূবেশে আসনে বসানো হয়েছে খানিক আগেই। পরনে গহনার ভারিক্কি-ই পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক রূপে কাজ করছে, চিরাচরিত বাঙালি শাড়ির পরিবর্তে ওর পরনে হালকা ঘিয়ে রঙা দামি লেহেঙ্গা, নিপুনরূপে সজ্জিত হয়েছে স্বর্গীয় অপ্সরার ন্যায় মুখশ্রী। লাজুকতার গাঢ় প্রলেপ যেনো সৌন্দর্যকে বর্ধিত করছে দ্বিগুণ রূপে।

বেলা আরেকটু বাড়তেই সুসংহত ভঙ্গিতে এসে উপস্থিত হলো পাত্রপক্ষ। আর অমনি চিরাচরিত নিয়ম অনুসারে প্রবেশদ্বারে বিশাল হুলস্থুল কান্ড বাধিয়ে দিল কায়রার কাজিনরা—সাথে যোগ দিয়েছে তূজা, মেধা, ইভান, রুশাফ ও নিহার! ফিতা উঁচিয়ে ধরে সমস্বরে তাদের প্রকাণ্ড দাবি,
“বিশ হাজার টাকা না দিলে ভেতরে প্রবেশের নো-এন্ট্রি!”
ঝঞ্ঝাট অপছন্দকারী দুর্জয় চটজলদি তৎপর হলেও ওয়ালেট বের করতে। তবে বিপত্তি বাঁধালো সায়মন। পশ্চাৎ হতে অগ্রভাগে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে উড়ে এসে জুড়ে বসা আপদের ন্যায়, বিঘ্ন দিয়ে বলল,,,
“হেই লেডিস! এত সহজে বিশ হাজার টাকা? মানে… অ্যামাউন্টটা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই, বাট আই হ্যাভ আ স্মল কন্ডিশন। আজকের এই ব্রাইডাল টিমে সুন্দরী আর গ্ল্যামারাস শালী কারা কারা আছে, আগে একটু ফার্স্ট হ্যান্ড ইন্ট্রোডাকশন তো হতে হবে! স্মার্ট ফ্রেন্ডদের ফ্রন্ট সারিতে দেখতে চাই, আদারওয়াইজ নো ডিল!”
সায়মনের এমন প্রকাশ্য ফ্লার্টিং আর বিদ্রূপাত্মক সংলাপে কাজিনদের ভিড়ে এক মুহূর্তের জন্য শোরগোল পড়ে গেল। একজন তড়িঘড়ি ছুটে ভেতরে গিয়ে পায়রার হাত ধরে বলল,

“পায়রা আপু! বাইরে শিগগির এসো! বরপক্ষের এক সাংঘাতিক ভাব ওয়ালা ফ্রেন্ড এসে মহা ঝামেলা পাকাচ্ছে! বলে নাকি সুন্দরী শালী না দেখলে টাকা দেবে না!”
পায়রা প্রথমে অনীহা দেখালেও অনাহূত অতিথির এমন স্পর্ধা শুনে আর ক্ষোভ সংবরণ করতে পারল না। ওড়নার আঁচল সামলে, গটগট পায়ে সোজা তোরণদ্বারের দিকে ধাবিত হলো ও। ভিড় ঠেলে সামনে এসে তীব্র কণ্ঠে হাঁক ছাড়ল,
“ শালীদের রূপের গ্রেড পরীক্ষা করতে আসা হনুটা কে দেখি?
কথাটা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই সায়মনের মুখোমুখি চোখ পড়তেই থমকে গেল পায়রা! আর ওদিকে সাইমনও সুগঠিত ওষ্ঠাধরে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে চোখ নামিয়ে পায়রাকে দেখে চমকে উঠলেন! দুজনে একসঙ্গে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

“আরে! আপনি?”
পায়রা একহাত কোমরে দিয়ে দাউদাউ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“মি.? আপনি এখানে বরপক্ষে কী করছেন শুনি?”
সাইমন একহাত স্যুটের পকেটে পুরে অলস ভঙ্গিতে বাঁকা হেসে বললেন,
“আমি দুর্জয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড, মিস চ্যাটারবক্স! কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, আপনি এখানে শালী সেজে মাগনা টাকা মারার ধান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
পায়রা রাগে ফুঁসে উঠে বলল,

অভিসৃতি পর্ব ১৪

“মাগনা মানে? ওটা আমাদের রাইট! আর আপনার মতো কিপটে ব্যারিস্টারের কাছ থেকে আমাদের টাকা নেওয়াও লাগবে না! দূরে গিয়ে ম”রুন!”
সায়মন এক পা এগিয়ে এসে পায়রার দিকে ঝুঁকে নিচু, সুগভীর কণ্ঠে কৌতুক ঢেলে বললেন,
“২০ হাজার তো দূর, এক টাকাও মিলবে না যদি না আপনি মিষ্টি করে একটু হাসেন, মিস পায়রা! বাট আই নো, সেটা আপনার এই রাগী ফিউজড ফেসের পক্ষে ইম্পসিবল!”

অভিসৃতি পর্ব ১৫ (২)