Home অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২২

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২২

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২২
নুসাইবা ইভানা

জিয়ান কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এই রাত যেন বিভীষিকাময়। মাথা নিচু করে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
“ডাক্তার এসে বলল, আপনার বাবার বিপি হাই। একটু খেয়াল রাখবেন।”
জিয়ান যেন কিছুটা স্বস্তি পেল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “জীবনটা কী থেকে কী হয়ে গেল!”
জিয়ান পকেট থেকে নিজের ফোন বের করল নয়নাকে কল করার জন্য। ফোন বের করে দেখল, নয়নার অনেকগুলো মিসড কল। জিয়ান কলব্যাক করবে, এমন সময় হড়বড় করে অনিকেত এসে জিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এত কিছু হয়ে গেল, তুই আমাকে একবার খবর দিলি না কেন! আন্টির কী অবস্থা এখন?”
জিয়ান অনিকেতকে দেখে কিছুটা ভরসা পেল। অনিকেতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কী থেকে কী হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি না।”

“তুই থাক, আমি আন্টির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আসছি। আর হ্যাঁ, অবস্থা বুঝে দ্রুত সিঙ্গাপুর শিফট কর আন্টিকে। এভাবে বিপদে ভেঙে পড়লে জীবনে হেরে যেতে হয়। শক্ত কর নিজেকে।”
অনিকেত চলে গেল মিতা বেগমের কেবিনে। ঢোকার আগে অনিকেত স্থির হল। আজকের দিনটা অনিকেতের জন্যও ছিল বেশ ইমোশনাল একটা দিন। আবেগ যারা দমিয়ে রাখতে জানে, তারাই সহজে বাঁচতে পারে। দুঃখ লুকিয়ে স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নেয় জীবন।
আজ সন্ধ্যায় জাহানারা বেগম আর মাহবুব তালুকদার অনিকেতের চেম্বারে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। অনিকেত যখন প্রেসক্রিপশন লিখছিল, বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছিল সামনে বসে থাকা দুজন মানুষের দিকে। তার সামনে তার জন্মদাতা পিতা-মাতা উপস্থিত, অথচ তবুও একে অপরকে কেউ চেনে না। মানুষ যে বলে রক্তের টান, নারীর টান—আচ্ছা, ওনাদের কি ওসব টান অনুভব হয় না আমার জন্য?
মাহবুব তালুকদার বললেন, “ডাক্তার সাহেব, যা যা টেস্ট দরকার লিখে দিন। আমার স্ত্রীর চিকিৎসায় যেন ত্রুটি না থাকে।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অনিকেত বলল, “জি স্যার। আমি এখানে টেস্টগুলো লিখে দিয়েছি, আপনি করিয়ে নিয়ে আসুন। আজ তো আর হবে না, আগামীকাল রিপোর্ট দেখব। তারপর বোঝা যাবে কী সমস্যা হচ্ছে।”
জাহানারা বেগম অনিকেতের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মাহবুব তালুকদার জাহানারা বেগমের হাত ধরে বললেন, “চলো, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। নয়নার বাসায় আসার কথা। অথচ পুরোটা দিন আমরা বাইরে। টেস্টগুলো করিয়ে দ্রুত ফিরতে হবে।”

চেম্বার থেকে বেরিয়ে জাহানারা বেগম বললেন, “তুমি কি ওই ডাক্তার ছেলেটার চোখ-মুখ খেয়াল করে দেখেছ? একদম আমার নাফির মতো মুখের গড়ন। কেন কেড়ে নিলে আমার নাফিকে? ঘৃণা করি আমি তোমাকে।”
মাহবুব তালুকদার মনে মনে বললেন, ‘আমি তোমাকে তোমার নাফির সাথে দেখা করিয়ে এনেছি জাহানারা। যাকে তুমি নাফির মতো ভাবছ, সে’ই নাফি। কিন্তু এই সত্যি আমি কোনোদিন তোমাকে জানাতে পারব না। এতগুলো বছর পর এসব সামনে এনে নিজের বংশের নাম খারাপ করতে পারব না।’

অনিকেতের চোখের কোণে তার অজান্তেই কেমন জল জমে উঠেছে। বুকটা ভারী হয়ে আসছে। যে বাবা-মাকে ছোটো থেকে খুঁজে এসেছে, তারা চোখের সামনে, তবুও বাবা-মা বলে ডাকার অধিকার নেই তার! চেম্বার শেষ করে বের হবে, তার ঠিক আগ মুহূর্তে নাহিদের কল এল। নাহিদ জিয়ানের মায়ের অসুস্থতার সংবাদ দিল। সঙ্গে সঙ্গে অনিকেত চলে এল মেডিকেলে।
(বর্তমান)
অনিকেত কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ভালো করে মিতা বেগমকে চেকআপ করতে লাগল।

জাহিন সেভাবেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল ঘণ্টা দুয়েক। যখন তার হুঁশ ফিরল, দ্রুত এলোমেলো পায়ে হেঁটে এল ইমার্জেন্সি রুমের সামনে।
ইমার্জেন্সি রুম থেকে একজন নার্স বের হল।
জাহিন তাকে জিজ্ঞেস করল, “পেশেন্টের কী অবস্থা এখন?”
নার্স বলল, “দুঃখিত স্যার, পেশেন্টকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আপনি পেশেন্টের বাসার লোক? তাহলে আমার সাথে চলুন, কিছু ফর্মালিটি পূরণ করতে হবে।”
জাহিন যেন আর কোনো কথা শুনতে পারল না। ফ্লোরে হাঁটু মুড়ে বসে চিৎকার করে বলল, “মা, তুমি না থাকলে আমিও থাকব না এই স্বার্থপর পৃথিবীতে। এখানে সবার কাছে ঘৃণিত আমি। আমি পাপিষ্ঠ, আমি ধ্বংস। আমাকে তোমার সাথে নিয়ে কেন গেলে না মা? আমি আসছি তোমার কাছে।”

জাহিনের চিৎকারে আশপাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেল।
জিয়ানও দৌড়ে ছুটে এল। জাহিনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “কী হয়েছে?”
জাহিন জিয়ানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাকে মেরে ফেল ভাই। আমি খুনি, আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। ভাই ও ভাই, আমার শ্বাসটুকু নিয়ে আম্মুকে দিয়ে দে। আমার আম্মুকে ছাড়া আমি বাঁচতে চাই না। মেরে ফেল আমাকে, আমি খারাপ।”
জিয়ান জাহিনকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “শান্ত হ জাহিন। আম্মুর কিছু হয়নি। আম্মুকে অন্য রুমে শিফট করা হয়েছে। আম্মু ঠিক আছে। তুই একটু স্বাভাবিক হ ভাই আমার।”

জাহিন জিয়ানের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, “আমাকে একবার আম্মুকে দেখা। আমার আম্মু।”
জিয়ান জাহিনের হাত ধরে নিয়ে গেল মিতা বেগমের কেবিনের কাছে। লুকিং গ্লাস দিয়ে জাহিনকে তাকাতে ইশারা করল। জাহিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজার সামনে বসে পড়ল। নিজেকে কী অসহায় লাগছে তার! এই পরিবারকে সে ছেড়ে দিয়েছিল! অথচ যে ভাইয়ের সাথে এত জঘন্য অন্যায় করেছিল, সেই ভাই তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। যে মেয়ের সাথে বিয়ের পর একটা মুহূর্তও ভালো ব্যবহার করেনি, সে তাকে সান্ত্বনা দিল। পৃথিবীতে পরিবার ছাড়া কেউ নিজের হয় না—এই অনুভূতি জাহিনের মনে শিকড় গেঁড়ে বসল। এখন তার মনে হচ্ছে, তার বাবা তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি, ওসবে হয়তো ছিল শাসন। ভালোবাসলে মানুষ তো শাসনও করে? জাহিন যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে লাগল।

অনিকেত রুম থেকে বের হয়ে বলল, “চিন্তার কোনো কারণ নেই, আন্টি সুস্থ হয়ে যাবেন। আশা করি আগামী তিন দিন পর আন্টিকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবি।”
নয়না আর ডাক্তার ইশান এসে উপস্থিত হল সেই মুহূর্তে। নয়না জিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “সব ঠিক আছে? আম্মুর এখন কী অবস্থা?”
জিয়ান নয়নাকে জড়িয়ে ধরল। নিজেকে বিধ্বস্ত লাগছিল। সেই কখন থেকে ইচ্ছে করছিল, কাউকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারলে মনটা হয়তো একটু শান্ত হতো। নয়না জিয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। নিজেকে সামলাও। এখন তোমার পরিবারের তোমাকে প্রয়োজন।”

জিয়ান নয়নাকে ছেড়ে দিয়ে নয়নার হাত ধরে রাখল।
অনিকেত বলল, “আন্টি এখন বিপদমুক্ত। আপাতত চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে।”
“জি ভাইয়া, পুরোপুরি খেয়াল রাখব। আচ্ছা, বাবা কোথায়? ওনাকে তো দেখতে পাচ্ছি না।”
জিয়ান বলল, “বাবা আরেক কেবিনে। ওনাকে স্লিপিং পিল দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।”
নয়না জিয়ানকে বলল, “হাত-মুখ ধুয়ে এসো, খাবার এনেছি। খেয়ে নাও। সারা দিন কিছু খাওনি।”
অনিকেত এত কিছুর মধ্যেও নয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ অনিকেত আবিষ্কার করল, নয়না আর তার চেহারায় অনেক মিল আছে।
নয়না জিয়ানকে খাইয়ে দিচ্ছে। মেহনুর জাহিনকে খাইয়ে দিচ্ছে। অনিকেত আর ঈশান বসে আছে ঢুলতে ঢুলতে।
অনিকেত বলল, “আপনার নাম?”

“ডাক্তার ঈশান। আপনার নাম?”
“ডাক্তার অনিকেত মাহমুদ।”
“নাইস টু মিট ইউ, ডাক্তার অনিকেত মাহমুদ। আপনার সাথে জিয়ানের সম্পর্ক?”
“ও আমার বন্ধু। আমরা খুব ক্লোজ, ধরতে গেলে একই পরিবারের। আপনার সাথে সুনয়নার সম্পর্ক?”
“আমরা পরিচিত। সিলেটে পরিচয় হয়েছে আমাদের।”
অনিকেত আর কথা বাড়াল না। তার মন ভরে দেখতে ইচ্ছে করছে নয়নাকে—তার ছোটোবোন। ইচ্ছে করছে একবার নয়নার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।
ঈশান লক্ষ্য করল, অনিকেত এক ধ্যানে নয়নার দিকে তাকিয়ে আছে।

অন্তর নয়নার বাসায় এসেছে তুষিকে খুঁজতে। বাসায় এসে নীলাঞ্জনার সাথে দেখা হয়েছে।
নীলাঞ্জনা অন্তরকে বসিয়ে বলল, “আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছিলেন, এর জন্য সারা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। কোনো দরকার ছিল ভাইয়া, এখানে কেন এলেন?”
“আমি তুষির পরিবারের। তুষি কি এ বাসায় পরশু এসেছিল?”
“না, আসেনি তো।”
“ধন্যবাদ আপু, আমি আজ চলি। জরুরি কাজ আছে।”
“অল্প কিছু খেয়ে যান।”
“আজ না, অন্যদিন আসব। নয়না এলে বলবেন আমার সাথে যোগাযোগ করতে। এই নিন আমার নম্বর। বলবেন, ইমার্জেন্সি খুব।”

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২১

“নয়না তো হসপিটালে। ওর শাশুড়ির অবস্থা আশঙ্কাজনক।”
“কোন হসপিটালে? নামটা জানেন আপু?”
“না, সেটা তো জানি না।”
“আপনি কি সুনয়নার কাছে কল করে জেনে নিতে পারবেন? খুব ইমার্জেন্সি, প্লিজ না করবেন না।”

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৩