Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৭

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৭

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৭
তেজরিন উম্মীদ

দুপুর গড়িয়ে তখন ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁইছুঁই। দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা আর বিয়ের দীর্ঘ অনুষ্ঠান শেষে যখন কাজিনদের দলবল নিয়ে ফারাজ আর রুশদী খাবারের টেবিলে বসল, তখন টেবিল জুড়ে হাসাহাসি আর আড্ডার রোল। টেবিলের মধ্যমণি হয়ে আছে বিশাল এক রাজকীয় ‘বিয়ে সাগোরানা’। রুপোলি বড় থালায় সাজানো আস্ত দুটি ভুনা করা হরিণ, যার চারপাশ ঘিরে শুয়ে আছে মচমচে লালচে রঙের বেশ কটি আস্ত মুরগি মোসাল্লাম। পোলাওয়ের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জাফরানের রঙ আর কাজু-কিশমিশের ছড়াছড়ি,এক কথায় এলাহি কারবার!

ফারাজ বসেছে রুশদীর বাঁ-পাশের চেয়ারে। ঠিক সামনেই শান আর সিফাত। ফারাজের কোলে বসে আছে ছোট্ট পুঁচকে শের। রুশদী তার ডান পাশের চেয়ারে টেনে বসিয়েছে তিথিকে। এই অচেনা ভিড়ে তিথি পাশে থাকলে রুশদীর কেন জানি একটু ভরসা হয়, অস্বস্তিটা কমে। রুশদীর খিদেটা মরে গেছে সেই সকালেই, এখন এত সব রাজকীয় পদের গন্ধেও তার রুচি ফিরছে না। তার ওপর ফারাজের ভাইবউরা যেভাবে দুজনকে নিয়ে রসালো রসিকতা শুরু করেছে, তাতে লজ্জায় রুশদী প্লেটে মুখ নামিয়েও স্বস্তি পাচ্ছে না। তার উপর গলার ভারী সোনার গহনা আর লেহেঙ্গার ওজন যেন চেপে বসেছে তার শরীরে,এসবের ভারে তার শরীর ভেঙে আনছে।

খাওয়া শেষে শান্তি নেই। আবার সেই সাজানো পুতুলের মতো স্টেজে গিয়ে বসা। মেহমানদের আবদারে দাঁত বের করে যান্ত্রিক হাসি হাসতে হাসতে গাল দুটো ব্যথা হয়ে এল রুশদীর। টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা একাসনে বসে থাকা যে কী যন্ত্রণার, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। কোমরটা যেন ছিঁড়ে আসছে। সামনে হাই-ভলিউমে গান বাজছে, আর একদল ছেলেমেয়ে পাগলের মতো নাচছে।এসব বোরিংনেস এর সাথে দেখতে হচ্ছে তার। ফারাজ মাঝে মাঝে কাজ আছে বলে উঠে গিয়ে ঘুরে ফিরে আসছে, কিন্তু রুশদীকে বসে থাকতে হচ্ছে মূর্তির মতো।এভাবে বসে থাকতে থাকতে কোমরের জং ধরে গেছে তার। দাঁড়ালে বোধহয় আর হাঁটতেই পারবে না মনে হচ্ছে রুশদীর।
আবার মাথাটা দপদপ করছে উচ্চ শব্দে।সব মিলিয়ে
রুশদীর অবস্থা বেহাল।

স্টেজের সামনে নাচতে থাকা ভিড়টার দিকে তাকিয়ে রুশদী দেখল, শান আর সিফাতের সাথে শের’ও তাল মিলিয়ে লাফাচ্ছে। ফারাজ অনেকক্ষণ হলো উঠে গিয়েছে, এখনো ফেরার নাম নেই।
নাচতে নাচতে যখন শের একদম হাঁপিয়ে উঠল, তখন টলমল পায়ে এসে রুশদীর কোল ঘেঁষে বসল সে। রুশদী তখনো একা বসে আছে।ফারাজ এখনো আসেনি।
শেরের কপালে জমে থাকা ঘামটুকু হাতে থাকার টিস্যু দিয়ে মুছে দিয়ে রুশদী আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হলো? তোমার নাচ শেষ?”

শের বুক ভরে একটা শ্বাস নিয়ে চট করে মাথা নেড়ে উত্তর দিল, “নো!”
রুশদী একটু হেসে আবার শুধাল, “তার মানে আরও নাচবে?”
শের এবার বেশ উৎসাহ নিয়ে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। রুশদী আর কিছু বলল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে শান এক প্রকার টলতে টলতে এসে পাশের সোফায় ধপ করে বসে পড়ল।নাচের চোটে তার গায়ের পাঞ্জাবিটা একদম গায়ের সাথে সেঁটে আছে।ঘাম চুইয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে,মনে হচ্ছে যেন এই মাত্র গোসল করে এসেছে সে। শান কোনোমতে বুক ভরে কয়েকবার শ্বাস নিল, তারপর কিছুটা সামলে নিয়ে রুশদীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,

“ভাবি, তোমার বোন কোথায়? তাকে তো দেখছি না!”
শানের এ কথায় রুশদীর ভ্রু কুঁচকে এল।রুশদীর তো কোনো বোন নেই, তবে সে কার কথা বলছে? রুশদী অবাক হয়ে শুধাল,
“আমার বোন?”
শান হাসিমুখে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ওই যে খাবার টেবিলে তোমার পাশে বসে ছিল, কি যেন নাম মেয়েটার…?”
শান মাথা চুলকে জোর দিয়ে মনে করার চেষ্টা করল নামটা। কিছুক্ষণ পর রুশদীই তার দ্বিধা কাটিয়ে দিল, “তিথির কথা বলছেন?”
শানের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! তিথি! ও তোমার বোন না?”
রুশদী কোনো সংকোচ না রেখেই মৃদু হেসে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, বোনই তো।”
“কোথায় সে? তাকে তো দেখছি না!”

শানের কণ্ঠস্বরে কেমন এক অস্থিরতা।
রুশদী একটু অবাক হলো। শান কেন তিথিকে এভাবে খুঁজছে? হয়তো বিয়াই-বিয়ানের খুনসুটি বা নিছক মজা করার কোনো রসদ খুঁজছে। সে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“তিথি তো নাহিদের সাথে ছবি তুলতে গেল।আশেপাশেই আছে কোথাও।”
নাহিদ নামের এক ছেলের সঙ্গে তিথি একা একা ছবি তুলছে শুনে মুহূর্তেই শানের যেন কলিজার পানি শুকিয়ে এল! একরাশ উৎকণ্ঠা তার চোখেমুখে খেলে গেল। সে কি তবে ভুল জায়গায় মন দিয়ে ফেলল? তিথির জীবনে কি আগে থেকেই কেউ আছে? বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে তার। শান অতি কষ্টে নিজের জড়তা কাটিয়ে আমতা আমতা করে জিগ্যেস করল,

“নাহিদ… নাহিদ কে?”
রুশদী নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “আমার ছোট ভাই।”
এই কয়েক সেকেন্ড শেষে শানের দেহে যেন প্রাণ ফিরে এল। একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সে গা এলিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। যেন,বড় এক বিপদের হাত থেকে বেঁচেছে সে! কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে মনে মনে হাসল শান, তারপর শান্ত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল।
চারপাশে গান আর মানুষের শোরগোলের মাঝে হুট করেই ছোট্ট শের রুশদীর কোলের ওপর মাথা রেখে ডাকল, “মম!”
রুশদী শেরের চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল, “হুম?”
শের তার বড় বড় চোখের নিষ্পাপ চাউনি রুশদীর মুখে স্থির করে বলল, “নাও ইউ আর মাই অফিসিয়াল মম, রাইট?”

রুশদী হাসল, “হুম, একদম তাই।”
“তোমার পুরো নাম কি মম?”
রুশদী একটু অবাক হয়েই তাকাল শেরের দিকে,
“রুমাইসা হক রুশদী। কিন্তু হঠাৎ আমার পুরো নাম জানার এত শখ কেন?”
শের একদম বাচ্চাদের মতো সরল মনে হাসিমুখে বলল, “কারণ, এখন থেকে কেউ যদি আমাকে আমার মম-এর নাম জিজ্ঞেস করে, আমি তোমার নাম বলব। কারণ তুমি এখন থেকে আমার অফিসিয়াল মম! ঠিক আছে না মম?”
বলেই খিলখিল করে হেসে দিল শের। সেই হাসিতে যেন মুক্তো ঝরছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাচ্চার সেই অমলিন হাসিটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র দৃশ্য। শেরের এই ছোট্ট একটা কথা যেন তিরের মতো রুশদীর বুকে বিঁধল। রুশদীর বুকটা এক অজানা মায়ায় টনটন করে উঠল।

রুশদী মুহূর্তেই অনুভব করতে পারল এই পুঁচকেটার করুণ ইতিহাস। হয়তো স্কুলে বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে কতবার ওকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে’তোমার মায়ের নাম কি?’ তখন হয়তো এই নিষ্পাপ মুখটা কালো হয়ে যেত। হয়তো মাথা নিচু করে ভিজে গলায় বলত, ‘আমার মা নেই’। আহারে! কত বড় এক শূন্যতার পাহাড় এই ছোট্ট মনটা একা বয়ে বেড়িয়েছে এতদিন।
রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ঝুঁকে শেরের নাকটা আলতো করে টেনে দিল। বলল,
“অবশ্যই! এটাই বলবে। কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার মায়ের নাম কি, চিৎকার করে বলবে ‘রুমাইসা হক রুশদী’। আর আমার একমাত্র পুঁচকে বাবুটার নাম হলো ‘শেহরান খান শের’। ওকে?”
শের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে দারুণ কায়দায় বলল, “ওক্কে!”

পৃথিবীর কিছু আত্মার সম্পর্কের কাছে রক্তের সম্পর্কও হার মেনে যায়। জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না, মা হওয়ার জন্য প্রয়োজন এক বিশাল হৃদয়ের আলিঙ্গন। রুশদী আর শেরের মাঝে আজ যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন হলো, তা রক্তের বাঁধনের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। একজন পরীর মতো নারী আর এক অবুঝ শিশুর মধ্যে এই আত্মার টানই প্রমাণ করে—জন্মদিলেই মা হওয়া যায় না।

বাসা থেকে ফোন আসায়, প্যান্ডেলের কানের পর্দা ফেটে যাওয়া মিউজিক থেকে বাঁচতে তিথি একটু নির্জনতার খোঁজে রিসোর্টের ফাকা দিকে চলে এল। সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকারটা এখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। রিসোর্টের বাগানের এক কোণে একটা কাঠের বেঞ্চিতে এসে ধপ করে বসল সে। ফোনের ওপাশ থেকে কথাগুলোও ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না নেটওয়ার্কের ঝামেলার কারণে। তার ওপর উটকো উপদ্রব হিসেবে যোগ হয়েছে মশা!
এক একটা মশা যেন একেকটা ড্রাগন কিংবা ডাইনোসর! এই সাইজের মশা যে এই দুনিয়ায় হয়, তা তিথির ধারণাতেও ছিল না। হাত-পা চুলকাতে চুলকাতে ফোনের কথা শেষ করল সে। বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে তিথি নিজের হাতের ওপর বসা একটা হৃষ্টপুষ্ট মশা পিষে দিয়ে গজগজ করে বলল,

“এগুলো মশা নাকি ডাইনোসর? খেয়েদেয়ে যত রক্ত বানিয়েছিলাম, মনে হয় সব এক সুযোগে শুষে নিল!”
তিথি অপেক্ষা করছে নাহিদের জন্য। এই কদিনে নাহিদের সঙ্গে ওর বেশ চমৎকার একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। ছেলেটা যেমন চটপটে, তেমনি অমায়িক। তিথি ওকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই দেখে। দুজনে মিলে পুরো বিয়েবাড়ি মাতিয়ে রেখেছে। কিন্তু এখন জুস আনতে গিয়ে নাহিদ যে কোথায় হাওয়া হলো, কে জানে!তার ফিরার নাম গন্ধও নেই।
তিথির এই অপেক্ষার মাঝে , এক পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এল,
“হ্যালো বিয়াইন!”
তিথি ভ্রু কুঁচকে ওভাবেই বসে রইল। সে ভাবল, নিশ্চয়ই অন্য কাউকে ডাকছে। রুশদীর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথে তার তো তেমন সখ্যতা নেই, তাকে আবার বিয়াইন বলে সম্বোধন করার মতো কে আছে? কিন্তু পরক্ষণেই সেই কণ্ঠটা আরও কাছে থেকে শোনা গেল,
“আরে বিয়ান, আপনাকে বলছি!”

তিথি এবার চোখ তুলে তাকাতেই দেখল সামনে শান দাঁড়িয়ে। গতকাল যার সঙ্গে একদফা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া হয়েছিল তার, আজ ৩২ পাটি দাঁত বের করে সে-ই সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। তিথি বিরক্তও হলো না, আবার খুব একটা আহ্লাদিতও হলো না। নির্লিপ্ত গলায় শুধাল, “জি, বলুন?”
শান কোনো কথা ছাড়াই তিথির থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে বেঞ্চিতে বসে পড়ল। এরপর বেঞ্চের হাতলে এক হাত রেখে তাতে মাথা এলিয়ে দিয়ে একদম সোজাসুজি তিথির চোখের দিকে তাকাল। শানের চোখে আজ অন্যরকম এক ঘোর। চঞ্চল শান মুহূর্তেই যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেল। নিজের গলার স্বরকে যতটা সম্ভব দৃঢ় করে সে বলল,
“দেখ,খুব সিরিয়াস আর আমার ধৈর্য জিনিসটা বড্ড কম। তাই সাতপাঁচ না ভেবে সোজাসুজিই বলে দিচ্ছি— ‘আই লাভ ইউ’!”

স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। মশার গুনগুনানি কিংবা দূরের সাউন্ডবক্সের আওয়াজ—সবই যেন তিথির কানের পাশ দিয়ে বয়ে গেল। শানের কথা শুনে তিথির চোখজোড়া কপালে উঠে গেল। এভাবে সোজাসুজি কেউ কাউকে বলে? যেখানে ভালো করে চেনাজানা নেই, নেই কোনো পূর্ব পরিচয়,হুট করে আকাশ থেকে পড়ার মতো কেউ এমন প্রপোজ করে বসতে পারে, তা তিথির ভাবনারও বাইরে ছিল। দুনিয়াতে এত ডিরেক্ট মানুষ যে থাকতে পারে, তা আজ সে চাক্ষুষ প্রমাণ পেল। তিথি নিজের বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারল না। অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“আপনি কি আমার সাথে ইয়ার্কি করছেন? নাকি উল্টাপাল্টা কিছু গিলেছেন, তাই মাথার ঠিক নেই?”
শান একদম সোজা হয়ে বসল। বলল, “দেখো, আমি মজা করতে ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু সিরিয়াস বিষয়ে আমি একদম হাড়কিপ্টে। আমি তোমাকে নিয়ে ফুললি সিরিয়াস। বিশ্বাস না হলে চলো এখনই বিয়েটা সেরে ফিলে।কাজী সাহেব বোধহয় এখনো আছে। দেরি করলে বিদায় নিতে পারেন।চল শুভ কাজটা সেরে ফেলি।”
তিথি এবার আসলেও ‘থ হয়ে গেল। এক তো একদিনের পরিচয়ে প্রপোজ, তার ওপর সরাসরি বিয়ের কথা! এ কি পাগল নাকি মস্ত বড় অভিনেতা? তিথি ভাবল, বিয়াই যেহেতু হয়, হয়তো একটু বেশিই রসিকতা করছে। সেও পালটা মজা নেওয়ার জন্য ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“কিন্তু সমস্যা তো একটাই, মিস্টার । আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না! তাই বিয়ের প্রশ্নই আসে না।”
শান এবার গা এলিয়ে দিয়ে দারুণ এক হাসি দিল। তারপর একটু ঝুঁকে বলল, “দেখো, তুমি আমাকে বাসো বা নাই বাসো, আমি তোমাকে বাসি এটাই যথেষ্ট! বিয়ের পর এসব নিয়ে কোনো ক্যাচাল হবে না। আগে চলো লাইফটা সেটিং করি। বিয়ের পর তোমাকে এত ভালোবাসব যে, তুমি নিজেই ভালোবাসতে বাধ্য হবে। তখন তুমিই আমার পেছনে ঘুরে বলবে,‘ওগো শান সাহেব, দয়া করে আমাকে একটু কম ভালোবাসুন, আপনার এত ভালোবাসায় আমার সুগার হয়ে যাচ্ছে! এত ভালোবাসা আমার আর সইছে না।’ বিশ্বাস করো, তখন তুমি আমার ভালোবাসার যন্ত্রণায় পালানোর রাস্তা খুঁজে পাবে না। তাই বলছি, সময় থাকতে চলো নিকাহ্‌টা সেরে ফেলি।”

তিথি কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আই থিঙ্ক আপনার মাথায় আসলেও সমস্যা আছে। দ্রুত কোনো ডাক্তার দেখান, না হলে অবস্থা বেগতিক হতে পারে। মগজটা বোধহয় রোস্টের সাথে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছেন!”
বলেই তিথি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বিরক্তি আর একরাশ বিস্ময় নিয়ে হনহনিয়ে প্যান্ডেলের দিকে হাঁটা দিল। শান সেখানেই বসে থাকল। সে অপলক দৃষ্টিতে তিথির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তিথির রাগী হাঁটার ভঙ্গি দেখে সে আপনমনেই হাসল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বলল,
“মিয়া বিবি রাজি তো কিয়া করেগা কাজী? তুমি কবুল বলো আমি লাভ ইউ টু বলছি।”

রাত তখন দশটা। রিসোর্টের একটি সুসজ্জিত কক্ষে রুশদীকে নিয়ে আসা হলো। গোলাপের পাঁপড়ি আর রজনীগন্ধার সুবাসে ঘরটা ম ম করছে। রাইমা খান আর আরও কয়েকজন মিলে রুশদীকে বিছানার ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিল। রুশদীর বুকের ভেতরটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে। এক অজানা অস্থিরতা আর জড়তা তাকে ঘিরে ধরেছে। সে কোনোমতেই চাচ্ছে না তার পাশে থাকা একমাত্র ভরসা তিথি এই ঘর থেকে এখনই চলে যাক। রুশদী আলতো করে তিথির হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখে ইশারায় পাশে বসতে বলল। তিথিও বান্ধবীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে কোনো আপত্তি না করে তার পাশেই জেঁকে বসল।

রুমে তখন ফারাজের কাজিন আর ভাবিদের আড্ডার জোয়ার। বিয়ে আর বাসর রাত নিয়ে তাদের একের পর এক রসালো এবং কিছুটা লজ্জাজনক কথাবার্তায় রুশদী যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল। একটা মেয়ে বাইরে যতই চঞ্চল বা দুরন্ত হোক না কেন, জীবনের এই বিশেষ মোড়ে এসে তাকে লজ্জায় নুইয়ে পড়তেই হয়। রুশদীর গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে জবা ফুলের মতো হয়ে আছে।
এরই মধ্যে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন রুশদীর সৎ নানী। বয়স্ক মানুষ, অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী। তিনি পরম মমতায় রুশদীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দাম্পত্য জীবনের বেশ কিছু গভীর ও সুন্দর জ্ঞান দিলেন, যা রুশদীর কানে বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি যেন নিজের আদি নানীসুলভ রূপে ফিরে এলেন। লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে একদম রুশদীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“জামাই সোহাগ দেহাইলে আবার ডরাইস না !”
এমন সরাসরি এবং অদ্ভুত কথা শুনে রুশদী যেন লজ্জার সাগরে ডুবে গেল। তার মনে হচ্ছিল সে যদি এখনই মাটির সাথে মিশে যেতে পারত! নানীকে মৃদু শাসনের সুরে ধমক দিয়ে ধীরলয়ে বলল, “ধুর নানী! এসব কী বলো? আমি তোমার নাতনি না?”

রুশদী খুব সতর্ক ছিল যাতে ঘরের বাকিরা এই গোপন কথা শুনতে না পায়, তাহলে তো রক্ষে নেই।মজার পাহাড় বয়ে যাবে। কিন্তু একদম গা ঘেঁষে বসে থাকা তিথির কান এড়াল না কথাটা। রুশদীর এমন অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে তার কৌতূহল দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে চোখ টিপে রুশদীকে ফিসফিসিয়ে শুধাল, “এই, নানী কী বলল রে?”
তিথির প্রশ্নে নানী নিজেই দাঁতহীন মাড়ি বের করে এক গাল হেসে উত্তর দিলেন, “কইলাম যে, নিজে তো বিয়া করলি, এহন তোর বান্ধবীরেও একটা ভাতার জুটাইয়া দে!”
নানীর এমন সোজাসাপ্টা গ্রাম্য রসিকতায় তিথি লজ্জায় জিভ কাটল, “ধুর নানী! যা তা বলো না তো!”
তিথির এই অপ্রস্তুত অবস্থা আর নানীর রসিকতায় ঘরে উপস্থিত বাকি মেয়েরা একযোগে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল
হাসি-ঠাট্টা আর চুটকি চলল আরও বেশ কিছুক্ষণ। রুমের আবহাওয়াটা যেন রুশদীর জন্য ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফারাজের এক ভাবি বাঁকা হেসে প্রশ্ন করলেন,
“রুশদী, নানী তোমার কানে কানে কী বলল ? আমাদের বলবে না?”

রুশদী থুতনিটা বুকের সাথে ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছে, এই লজ্জার প্রহর যেন আর শেষ হবে না। এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা অনন্তকাল। তার খুব ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে যদি কেউ তাকে এই ঘর থেকে উদ্ধার করত! এদের এইসব ধারালো আর লজ্জাজনক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে যেন নিঃশব্দে গুমরে মরাই ভালো। সে অতি কষ্টে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “তেমন কিছু না ভাবি।”
তার এই মৃদু আর জড়োসড়ো সুর শুনে রুমে আবার হাসির রোল উঠল। সেই ভাবিটি এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, “এখনই যদি এত লজ্জা পাও, তবে জামাই সামলাবে কী করে শুনি? সামনে তো আরও কঠিন পরীক্ষা!”
রুশদী চুপ করে রইল। সে জানে, এই মানুষদের পালটা উত্তর দেওয়া মানে হলো আগুনের মুখে ঘি ঢালা। এদের প্রশ্নের উত্তর দিলে লজ্জা দেয়ার জন্য এরা আরো হাজারটা কথা খুঁজে পাবে। তাই সে চুপ থাকা বেছে নিল। কিন্তু তিথির সহ্যশক্তি তখন একদম তলানিতে ঠেকেছে। ছোটবেলা থেকেই এসব দেখলে চুপ করে থাকতে পারে না, আর তার প্রিয় বান্ধবীর এমন অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে তার মেজাজ এখন তুঙ্গে। এই সব চম্পা টাইপ ভাবিদের অকারণ কৌতূহল আর কুরুচিপূর্ণ রসিকতা তিথির কাছে স্রেফ নীচতা মনে হচ্ছে।

তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ভাবিটির দিকে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত মার্জিত সুরে বলল, “ভাবি, লজ্জা জিনিসটা কিন্তু মানুষের খুব বড় একটা অলঙ্কার। অন্যকে লজ্জা দিতে গিয়ে নিজের লজ্জাশরমের মাথাটা এভাবে না খেলেই কি ভালো হতো না?মানবতার ফেরিওয়ালা হওয়া ভালো কিন্তু এতটাও না।
রুমের হাসিটা মুহূর্তেই থেমে গেল। তিথি থামল না, সে আরও স্পষ্ট গলায় বলল, “অন্যকে বেশি লজ্জা দিতে দিতে নিজের ভাণ্ডারটা যেন আবার খালি না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। নিজের লজ্জাটা নিজের কাছে সযতনে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এত লজ্জার ফেরিওয়ালা সেজে মানবতার সেবা না করলেই বরং সবাই স্বস্তিতে থাকত।”
ভাবিটির মুখটা মুহূর্তেই তেতো করলার মতো হয়ে গেল। তিথির এমন ঠাণ্ডা মাথায় দেওয়া চাঁছাছোলা জবাবের বিপরীতে কিছু বলার মতো শব্দ তার জানা নেই। তিনি কিছুক্ষণ বড় বড় চোখে তিথির দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর একটা ভেংচি কেটে রাগে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। তার সাথে সাথে বাকি রসিকদের দলটিও মুখ কালো করে ঘর ছাড়ল।

মুহূর্তেই পুরো ঘরেটিতে যেন প্রশান্তি নেমে এল। বড় একটা আপদ বিদায় হওয়ায় রুশদী যেন বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে কৃতজ্ঞতার সাথে তিথির হাতের ওপর চাপ দিল। তিথি হাসল, যেন বলতে চাইল,’আমি থাকতে তোকে কেউ অপদস্থ করতে পারবে না।’

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দশটা চল্লিশের ঘর ছুঁইছুঁই। বাসর ঘরের দরজায় যেন এক ছোটখাটো যুদ্ধ জয় করে ফারাজকে ভেতরে ঢুকতে হলো। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কাজিনদের দলের সাথে দীর্ঘ দরকষাকষির পর শেষমেশ এক হাজার টাকার এক বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে সে মুক্তি পেয়েছে। ফারাজ তো এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলেছিল, “এত দরদাম করে আমার রুমে ঢোকার কোনো দরকার নেই, তোরাই থাক। বউ তো আমারই, আমি পরে বুঝে নেব। বাসর ঘরে ঢুকতে লাখ টাকা দিতে হবে? থাক, আমি চললাম!” অবশেষে অনেক তর্কের পর রফা হলো এক বান্ডিলে।
ফারাজ ঘরে ঢুকতেই একটা স্নিগ্ধ আবেশ তাকে ঘিরে ধরল। পুরো ঘর জুড়ে সাজানো কাঁচা ফুলের সুবাসে ম ম করছে। রুমটা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে কিছুটা অস্বস্তি মেশানো পায়ে সে বিছানার এক কোণে এসে বসল। বিছানার ঠিক মাঝখানে নাখ অবধি লম্বা ঘোমটা টেনে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে রুশদী। ফারাজ শেরওয়ানির পকেট থেকে একটা চেক আর একটি মখমলের ছোট বক্স বের করল। চেকটা রুশদীর দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“এটা নাও।”
রুশদী ঘোমটার আড়াল থেকে হাত বাড়িয়ে চেকটা নিল। কিন্তু চেকের অংকের দিকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল,পুরো ৫০ লক্ষ টাকা! এত বিশাল অংকের টাকা কিসের জন্য? রুশদীর বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে এল। সে মাথার ঘোমটাটা খানিকটা সরিয়ে ফারাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কিসের জন্য?”
ফারাজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে প্রতুত্ত্যর করল , “তোমার দেনমোহর। আর এটাও নাও।”
বলেই সে হাতের সেই মখমলের বক্সটা এগিয়ে ধরল। রুশদী এবার আর বক্সটা হাত দিয়ে স্পর্শ করল না, শুধু কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থেকে পুনরায় প্রশ্ন করল, “আর এটা কিসের জন্য?”
ফারাজ এবার আর কোনো জবাব দিল না। সে বক্সটা খুলে ভেতর থেকে একজোড়া নিখুঁত কারুকার্য খচিত স্বর্ণের চিকন বালা বের করল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, “হাত দাও।”

রুশদী অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। নিজের অজান্তেই সে তার ডান হাতটা ফারাজের দিকে বাড়িয়ে দিল। কেন সে এমন করছে, কেন তার ভেতরে কোনো দ্বিধা কাজ করছে না,তা সে নিজেও জানে না। ফারাজ অতি যত্নে আর নিপুণ মনোযোগের সাথে রুশদীর হাতে বালা পরিয়ে দিতে লাগল। আজ সারাদিন ভারী গয়নার ভার সইতে না পেরে রুশদী আগেই হাতের সব চুড়ি খুলে ফেলেছিল, এখন তার শূন্য হাতের কবজিতে কেবল ফারাজের দেওয়া ভালোবাসার চিহ্নটুকু চকচক করছে।

ফারাজের হাতের স্পর্শ যখন রুশদীর ত্বকে লাগল, তখন তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এক অদ্ভুত অপার্থিব অনুভূতি তার সমস্ত স্নায়ুতে খেলে যাচ্ছে। সে নিজেকে ফেরাতে না পেরে ফারাজের চোখের দিকে তাকাল।ফরাজের চোখের মনি হালকা আকাশ নীল, যেন শান্ত এক সমুদ্র। রুশদী বেশিক্ষণ সেই নীল সমুদ্রে ডুবে থাকতে পারল না, লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
ফারাজ তখন অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তার বাঁ হাতেও বালাটি পরিয়ে দিচ্ছে। রুমের নিস্তব্ধতায় দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। রুশদী অনুভব করল, এই মানুষটার ছোঁয়া কেন যেন তার মনে এক অন্যরকম প্রশান্তি আর ভালো লাগার বীজ বুনে দিচ্ছে।
রুশদী এবার নিজের ভেতরের সংকোচটুকু ঝেড়ে ফেলে সরাসরি ফারাজের দিকে তাকাল। কিছুটা কৌতূহলী গলায় শুধাল, “একটা প্রশ্ন করেছিলাম আপনাকে”

ফারাজ বালার কাজগুলো একবার দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আম্মি বলল, বিয়ের রাতে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য বিশেষ কোনো উপহার থাকা উচিত। তাই নিয়ে এলাম।”
“কে পছন্দ করেছে এটা? কাজগুলো খুব সুন্দর তো!”
রুশদী মুগ্ধ নয়নে হাতের বালার দিকে তাকিয়ে বলল।
ফারাজ এবার রুশদীর দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মৃদু স্বরে বলল, “পছন্দটা আমারই। আমি নিজে কাস্টমাইজড করিয়েছি।”
“ওহ!” রুশদী শুধু এইটুকুই বলল।
সে হাতের বালা দুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল।
ঘরের ভেতর এখন পিনপতন নীরবতা। ফারাজ নিঃশব্দে বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু শব্দগুলো সাজিয়ে উঠতে পারছে না। অনেক সময় পার হয়ে গেলেও যখন ফারাজ কিছু বলল না, তখন রুশদীই নীরবতা ভাঙল। বলল, “যা বলতে চান, দ্বিধা না করে চট করে বলে ফেলুন।”
ফারাজ রুশদীর দিকে ঘাড় ঘোরালেও তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল বিছানায় পড়ে থাকা গোলাপের পাপড়িগুলোর ওপর। অনেকক্ষণ পর সে বলল, “যা বলতে চাই, তা বলতে অনেকটা সময় লাগবে,পরে বলব। এখন কি নফল নামাজ পড়বে না?”
রুশদী মাথা নেড়ে সায় দিল, “হুম, পড়ব তো।”

“তাহলে তুমি ওজু করে নাও।”
রুশদী নিজের ভারী বিয়ের পোশাক আর সাজগোজের দিকে একবার তাকাল। এক প্রকার অনুমতির সুরেই ফারাজকে জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কি চেঞ্জ করে নেব?”
ফারাজ পূর্ণ দৃষ্টিতে একবার রুশদীর দিকে তাকাল। লাল লেহেঙ্গা আর ভারী গয়নায় রুশদীকে একদম ‘শারফারাজ খান’ এর অর্ধাঙ্গিনী মনে হচ্ছে। ফারাজ নরম গলায় বলল, “হ্যাঁ, বদলে নাও। নাহলে তো ওজু হবে না।”
ফারাজের অনুমতি পেয়ে রুশদী বিছানা ছেড়ে উঠল। তিথিকে দিয়ে সে আগেভাগেই তার কমফোর্টেবল একটি থ্রিপিস আনিয়ে রেখেছিল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে একে একে ভারী গয়নাগুলো খুলে রাখল সে। এরপর ওয়াশরুমে ঢুকে ডলে ডলে মুখের সব মেকআপ তুলে ফেলল। প্রথমে শুধু ওজু করার কথা ভাবলেও, সারা দিনের ক্লান্তি আর ঘাম তাকে গোসল করতে বাধ্য করল। ফ্রেশ হয়ে ওজু শেষ করে যখন সে বের হয়ে আসল।
ওয়াশরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দ হতেই বিছানা থেকে ফারাজ সেদিকে তাকাল। রুশদী ভেজা চুলে হালকা পায়ে ফারাজের দিকে এগিয়ে এল। তার সাধারণ সাজ আর সিক্ত মুখশ্রীর মায়াবী রূপ দেখে ফারাজ যেন এক পলক স্থির হয়ে রইল।

রুশদী কাছে এসে শান্ত গলায় বলল, “আমার ওজু শেষ। আপনি ওজু করে আসুন।”
রুশদীর কথা শুনে ফারাজ ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার পূর্ণভাবে রুশদীর ওপর নিবদ্ধ হলো। সে একপলকে পা থেকে মাথা অবধি রুশদীকে পরখ করে নিল। সদ্য গোসল করে আসা রুশদীর শরীরে এখন এক অদ্ভুত পবিত্রতা আর সিক্ত স্নিগ্ধতা। তার পরনে ল্যাভেন্ডার রঙের হালকা একটি জর্জেট থ্রি-পিস। ফর্সা গলা আর কানের পাশ দিয়ে টুপটুপ করে দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। মাথায় ওড়নাটা খুব যত্ন করে দেওয়া, যেখান দিয়ে তার ভেজা চুলের দু-একটি গোছা অবাধ্য হয়ে কপালে এসে লুটিয়ে আছে।
ফারাজের চোখে যেন এক গভীর ঘোর লেগে গেল। সে অপলক দৃষ্টিতে রুশদীকে মেপে দেখতে লাগল। রুশদীর চোখের দিকে তাকাতেই ফারাজ থমকে গেল। বাদামি রঙের সেই মণি দুটোতে —ঠিক যেন কোনো বিদেশিনি সুন্দরী চাউনি। সেই গভীর বাদামি চোখে যখন ল্যাম্পশেডের হালকা হলদেটে আলো পড়ল, তখন মনে হলো সেখানে এক শান্ত আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে।

কিন্তু ফারাজের স্থির দৃষ্টি থমকে গেল রুশদীর ওষ্ঠাধরে। সিক্ত ঠোঁট দুটো প্রাকৃতিকভাবেই মারাত্মক লালচে গোলাপি, যা মেকআপ ছাড়া এই মুহূর্তে আরও বেশি জীবন্ত আর আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিয়েছে। এটুকু দেখাতেই ফারাজের সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন অবশ হয়ে এল, নেশার মতো এক আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরল। ফারাজ অনুভব করল তার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হচ্ছে।
নিজেকে সামলে নিতে ফারাজ এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। জোরে একটা শ্বাস নিয়ে মাথাটা হালকা ঝাকিয়ে নিজের মোহগ্রস্ত ভাব কাটানোর চেষ্টা করল সে। তারপর আর একটি মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। রুমের শীতল হাওয়ায় রুশদীর সেই ভেজা চুলের সুবাস যেন ফারাজের পিছু ছাড়ল না।

প্রায় পনেরো মিনিট পর ফারাজ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এল। পরনে তার ধবধবে সাদা একটি সুতি পাঞ্জাবি। হাতের তোয়ালে দিয়ে সে তার ভেজা চুলগুলো মুছছিল। ওদিকে রুশদী তখন জানালার ধারের ভারী পর্দাটা সরিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। দরজার শব্দে সে পেছন ফিরল।
রুশদী নিজেই অবাক হয়ে ভাবছিল—একই ঘরে একজন পুরুষের সাথে সে একদম একা, অথচ তার ভেতর সেই চিরচেনা অস্বস্তিটা নেই। সচরাচর কোনো অপরিচিত ছেলের ছায়া মাড়ালেও যেখানে রুশদীর দম বন্ধ হয়ে আসত, সেখানে ফারাজের সান্নিধ্য তাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা আর প্রশান্তি দিচ্ছে। রুশদী যেন মনে মনে এই মানুষটাকে অনেক আগে থেকেই চেনে।
তবে ফারাজকে পাঞ্জাবিতে দেখে হঠাৎ রুশদীর মনে এক বিজাতীয় বিরক্তি দানা বাঁধল। ফারাজকে সাদা পাঞ্জাবিতে মোটেও মানাচ্ছে না।অন্তত রুশদীর চোখে তো নয়ই! শেরওয়ানিতেও তাকে খুব একটা আহামরি লাগছিল না, কিন্তু এই সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে আরো বেশি অদ্ভুত লাগছে। ফারাজে ক্লিন শেভ করা ফর্সা মুখটা পাঞ্জাবিতে যেন কেমন ছোলা মুরগির মতো লাগছে। কোনো গালে দাড়িবোঝাই ছেলেদের পাঞ্জাবিতে যতটা সুন্দর লাগে, ফারাজকে তার অর্ধেকও লাগছে না। রুশদী মনে মনে ভাবল, “একে পাঞ্জাবি পরার বুদ্ধি দিল কে? একদম চোখের বিষের মতো লাগছে!”

ফারাজ এরই মধ্যে ঘরের মেঝেতে দুটি জায়নামাজ বিছিয়ে ফেলেছে,একটি সামনে, অন্যটি ঠিক তার পেছনে। ফারাজ ইমাম হয়ে সামনে দাঁড়াল, আর রুশদী তার পেছনে মুক্তাদি হিসেবে। দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করল। রুশদী যখন সিজদায় অবনত হলো, তার ভেতরটা এক অপার্থিব সুখে ভরে উঠল। সে মনে মনে পরম করুণাময়কে ধন্যবাদ জানাল একজন প্রকৃত স্বামী পাওয়ার জন্য।
নামাজ শেষে ফারাজ দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করল। মোনাজাত শেষ করে সে জায়নামাজেই পেছন ঘুরে বসল। রুশদীর সিক্ত ও শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে সে অত্যন্ত মার্জিত এবং ধীরস্থির কণ্ঠে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, ইয়া হাবিবিতি।”
কথাটা বলে ফারাজ নিজের ডান হাতটা রুশদীর দিকে বাড়িয়ে দিল। রুশদী এক মুহূর্ত থমকে গেল। ফারাজের মুখে ‘হাবিবিতি’ (আমার প্রিয়তমা) ডাকটা তার কর্ণকুহরে মধুর মতো বর্ষিত হলো। সে নিজের হাতটা ফারাজের হাতের ওপর রেখে নিচু স্বরে উত্তর দিল,

“ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!”
ফারাজ রুশদীর নরম হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহর কাছে রহমত প্রার্থনা করল। ঘরের শান্ত পরিবেশে ফারাজের গম্ভীর ও সুরেলা কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সেই পবিত্র দোয়া,
“আল্লাহুম্মা বারিক লি ফি আহলি, ওয়া বারিক লাহুম ফিয়্যা। আল্লাহুম্মারযুক্বনি মিনহুম ওয়ারযুক্বহুম মিন্নি। আল্লাহুম্মাঝমা’ বাইনানা মা জামা’তা ফি খাইরিন, ওয়া ফাররিক্ব বাইনানা ইযা ফাররাক্বতা ইলা খাইরিন।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে (স্ত্রীতে) বরকত দিন এবং তাদের জন্য আমাতে বরকত দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তাদের থেকে রিজিক (সন্তান) দান করুন এবং তাদেরকেও আমার থেকে রিজিক দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের দুজনকে যতক্ষণ কল্যাণের ওপর একত্রিত রাখেন, ততক্ষণ একসাথেই রাখুন; আর যখন আমাদের মাঝে বিচ্ছেদ (মৃত্যু) ঘটাবেন, তখন মঙ্গলের দিকেই বিচ্ছেদ ঘটাবেন।”

নামাজ ও দোয়া শেষ করে দুজনে জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখল। এরপর একরাশ প্রশান্তি নিয়ে তারা বিছানায় মুখোমুখি হয়ে বসল। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরবতা ভাঙল। সে বলল, “জানিনা বিশ্বাস করবে কি না, আজ জুম্মার নামাজ শেষে মোনাজাতে আমি শুধু একটা জিনিসই চেয়েছি,আল্লাহ যেন আমাকে এমন একজন জীবনসঙ্গিনী দেন, যে আমার খেয়াল রাখবে, আমার জন্য উত্তম হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমার ছেলেটাকেও ভালোবাসবে।”

ফারাজ একটু থেমে সরাসরি রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে সুধাল, “রুশদী, সত্যি করে বলো তো, শেরকে নিয়ে তোমার কোনো দ্বিধা বা সমস্যা আছে? আমি চাই না আমাদের মাঝে কোনো লুকোছাপা থাকুক।”
রুশদী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিছানায় পা গুটিয়ে আরাম করে বসল। ফারাজের চোখে চোখ রেখে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ! আপনাকে কবুল করার আগেই আমি শেরকে নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নিয়েছি। আমি তো উল্টো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি যে, তিনি আমাকে প্রথম দিনেই এত বড় এক উপহার দিয়েছেন। শেরকে নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও হবে না। আমি তাকে নিজের সন্তানের মত আদর দিয়েই বড় করব।”

রুশদীর মুখে এত বড় আশ্বাসের কথা শুনে ফারাজের বুকটা যেন হালকা হয়ে গেল। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা। সে অভিভূত হয়ে বলল, “প্রথম সাক্ষাতে আমি তোমাকে যা-ই বলে থাকি না কেন, আজ থেকে তুমি আমার জীবনসঙ্গিনী। আমার ওপর তোমার যত অধিকার আর হক আছে, ইনশাআল্লাহ আমি তার সবটুকু পূরণ করব। তোমাকে কখনো কোনো বিষয়ে আক্ষেপে পড়তে দেব না।”

রুশদী অবাক চোখে তাকিয়ে ভাবছিল—বিয়ের আগে দেখা হওয়া সেই উদ্ধত আর রুক্ষ মানুষটা কি এই ফারাজ? অসম্ভব! সেই ‘ম্যানারলেস’ লোকটা যে এত শান্তভাবে কিংবা এত গুছিয়ে কথা বলতে পারে, তা রুশদীর কল্পনারও বাইরে ছিল। ঠিক একই রকমের এক অবিশ্বাস কাজ করছিল ফারাজের মনেও। প্রথম সাক্ষাতের পর সে রুশদীকে বড্ড বেয়াদব আর বাউন্ডুলে স্বভাবের একটা মেয়ে ভেবেছিল। কিন্তু আজকের এই পরিপক্ক আচরণ আর দায়িত্বশীল কথাবার্তা ফারাজের সেই ধারণা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই যুগে এত অল্প বয়সে একটা মেয়ে কীভাবে এত ‘ম্যাচিউরড’ কথা বলতে পারে! ফারাজ মনে মনে এক গর্ববোধ করল,আল্লাহ তাকে আগের সেই জেদি রুশদী নয়, বরং একজন সত্যিকারের জীবনসঙ্গিনী রুশদীকে উপহার দিয়েছেন।
এই আবেগী মুহূর্তের মাঝেই রুশদী হঠাৎ বলে উঠল, “আপনি প্লিজ এই পাঞ্জাবিটা চেঞ্জ করে আসুন।”
একেবারে কোনো ভণিতা ছাড়াই অকপটে কথাটা বলে ফেলল সে। ফারাজ অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কেন? এখন চেঞ্জ করতে হবে কেন?”

রুশদী সোজাসুজি উত্তর দিল, “আমার অসুবিধা হচ্ছে।”
ফারাজ এবার আসলেও ধন্দে পড়ে গেল। তার পাঞ্জাবি পরে থাকার সাথে রুশদীর কী এমন অসুবিধা হতে পারে? সে কিছুটা বিস্মিত হয়ে শুধাল, “আমার পাঞ্জাবির সাথে তোমার অসুবিধার কারণটা তো ঠিক মাথায় ঢুকল না।”
রুশদী এবার অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা মনের বিরক্তিটা উগড়ে দিল। বলল, “আপনাকে পাঞ্জাবিতে একটুও মানাচ্ছে না, বরং খুবই উদ্ভট লাগছে। দয়া করে এটা বদলে আসুন। আপনার দিকে তাকালেই আমার কেন জানি হাসি পাচ্ছে। একটা ছেলেকে কীভাবে পাঞ্জাবিতে এতটা অসুন্দর লাগতে পারে, তা আপনাকে না দেখলে আমি কোনোদিন বুঝতাম না!”

কথাগুলো শুনে ফারাজের পুরুষালি অহংকারে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা লাগল। এই বসর রাতে নতুন বউয়ের মুখ থেকে প্রশংসা শুনবে তো দূরের কথা, উল্টো তাকে অসুন্দর আর উদ্ভট শুনতে হলো! ফারাজের পিত্তি জ্বলে গেল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, রুশদী স্রেফ তাকে একটু খোচানোর জন্যই কথাগুলো বলেছে। সেও তো দমবার পাত্র নয়! কিছুটা জেদ ধরে তেরামো করে বলল,
“না, আমি চেঞ্জ করব না। আমার তো মনে হচ্ছে আমাকে পাঞ্জাবিতে বেশ দারুণ লাগছে। তোমার কাছে অসুন্দর লাগলে আমার কিচ্ছু করার নেই, দরকার হলে তুমি চোখ বন্ধ করে রাখো!”

এতক্ষণ যে গাম্ভীর্য আর আবেগের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ফারাজ আর রুশদীর কেমিস্ট্রি আসলে এমনই,সেখানে ঝগড়া না থাকলে যেন লবণ ছাড়া তরকারির মত পানছে মনে হবে। বাসর ঘরের সেই পবিত্র আলাপন ভেঙে দুই ঘাউরা মানুষের মাঝে শুরু হয়ে গেল যেন এক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
ফারাজের একরোখা জবাব শুনে রুশদী তার ম্যাচিউরড বা ভদ্র মেয়ের মুখোশটা সশব্দে নামিয়ে রাখল। তার সেই আদি ও অকৃত্রিম মেজাজটা এখন টগবগ করে ফুটছে। সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “দেখুন, ভদ্রতা করে বলেছি কাজ হয়নি। এবার সোজাসুজি শুনুন,আপনাকে পাঞ্জাবিতে মোটেও মানাচ্ছে না, বরং জঘন্য লাগছে। তাই আমার চোখের শান্তির জন্য হলেও আপনাকে এখনই এটা চেঞ্জ করতে হবে। ব্যস!”
ফারাজ এবার বিছানায় পা দুলিয়ে আরও আয়েশ করে বসল। জেদ ধরে বলল, “আমি করব না। আর আমাকে সুন্দর লাগছে কি লাগছে না, সেটা সার্টিফিকেট দেওয়ার তুমি কে? নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছ? মেকআপ ধোয়ার পর তো তোমাকে…”

ফারাজ কথা শেষ করার আগেই রুশদী ফোড়ন কাটল, “আমাকে যাই লাগুক, অন্তত আপনার মতো সাদা পাঞ্জাবিতে কাকতাড়ুয়া লাগছে না!”
“কি? কাকতাড়ুয়া!” ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। একজন সুদর্শন পুরুষকে বাসর রাতে তার নিজের স্ত্রী ‘কাকতাড়ুয়া’ বলছে এত বড় অপমান তো হজম করা অসম্ভব! ফারাজ উত্তেজনায় বিছানা ছেড়ে স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে দাঁড়াল। রুশদীর দিকে তর্জনী উঁচিয়ে প্রায় গর্জে উঠে বলল, “দেখো আমি ভদ্র আছি বলে মাথায় চড়ো না! অভদ্রতা করতে বাধ্য করো না আমাকে।”

রুশদী মোটেও দমল না। বরং ঠোঁট বেঁকিয়ে এক বাঁকা হাসি দিল, যা ফারাজের রাগকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে শান্ত গলায় বিদ্রুপের সুরে বলল, “দয়া করে সিনেমার মতো সস্তা ডায়লগ দেবেন না, শুনলে ভীষণ হাসি পায়। আমার ওইটুকু ভদ্রতা দেখেই নিশ্চয়ই আপনি মনে মনে কুপোকাত হয়ে গিয়েছিলেন? তাই বলছি, আমাকে আর বেশি উত্তেজিত করবেন না। চটপট পাঞ্জাবিটা বদলে আসুন। আর যাই হোক, একটা জীবন্ত কাকতাড়ুয়ার সাথে এক ঘরে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না!”
ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি কিন্তু লিমিট ছাড়াচ্ছো রুশদী!”

রুশদী এক মুহূর্ত দেরি না করে তড়িৎ উত্তর দিল, “আপনাকে অনেক আগে একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে? আমি লিমিট ছাড়ানোর পরেই কথা বলতে শুরু করি। সুতরাং আমার লিমিট নিয়ে জ্ঞান দিতে আসবেন না।”
ফারাজ হতাশ গলায় বলল, “তোমাকে তো আজকে রাতে বেশ ভদ্র মনে করেছিলাম। ভুল ছিল আমার।”
“আমি কেমন সেটা তো আপনি প্রথম সাক্ষাতেই জেনে গিয়েছিলেন। এখন আবার নতুন করে জাজ করার নাটক করছেন কেন? যান, পাঞ্জাবি চেঞ্জ করে আসুন। আপনার সাথে বাসর রাতে তড়কাতড়কি করার আমার কোনো ইচ্ছা নেই। যদি বদলে আসেন, তবেই আমি আবার সেই আগের মতো ভদ্র, নম্র আর সভ্য একটা মেয়ে হয়ে যাব। না হলে…. আমার আর সহ্য হচ্ছে না এই বিশ্রী ড্রেসআপটা!”
ফারাজ এবার একগুঁয়ে জেদ ধরল, “আমি করব না চেঞ্জ। কী করবে তুমি?”
“করবেন না?” রুশদীর চোখে যেন আগুন ঝরছে।
“না, করব না।”

ফারাজের এই একরোখা জবাবে রুশদী এবার বিছানা ছেড়ে সোজা ফারাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। এক কোমর হাত দিয়ে অন্য হাতের তর্জনী ফারাজের নাকের সামনে উঁচিয়ে বলল, “এই যে মিস্টার, ভালোই ভালোই বলছি পাঞ্জাবি চেঞ্জ করবেন, নয়তো আপনার কিন্তু খবর আছে!”
ফারাজও দমবার পাত্র নয়। সে দু-কোমরে হাত দিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। রুশদী তার বুকের সমান উচ্চতায় দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে কথা বলছে। ফারাজ রুশদীর এই ছোটখাটো শরীরের আস্ফালন দেখে মনে মনে হাসল। রুশদীকে এই মুহূর্তে রাগী বিড়ালের মতো লাগছে। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “এই যে ‘খাটো পটল’, আগে নিজের হাইটটা দেখ, তারপর আমার সাথে পাঞ্জাবি নিয়ে ফতোয়া দিতে এসো!”

‘খাটো পটল’ শব্দটা শোনামাত্র রুশদীর মেজাজ সাত আসমানে চড়ে গেল। পাঁচ ফিট দুই ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে সে নিজের জায়গায় ঠিকই আছে, ফারাজ বেশি লম্বাসেটা কি তার দোষ? সে চোখ রাঙিয়ে গর্জে উঠল, “আমার হাইট নিয়ে একদম কথা বলবেন না! একদম খবর আছে বলছি! আমার হাইট নিয়ে কথা বলার আপনি কে?আমি যেটা বলেছি সত্যিই বলেছি আপনাকে আসলে পাঞ্জাবিতে খুবই অসুন্দর লাগছে। ”
ফারাজ বাঁকা হেসে পালটা জবাব দিল, “তাহলে তুমি আমাকে কীসে সুন্দর লাগছে আর কীসে লাগছে না,তা নিয়ে কথা বলার কে? আমি খাটো পটল বলেছি কারণ ওটাই সত্যি!”

“আমিও সত্যি বলেছি, আপনাকে পাঞ্জাবিতে কাকতাড়ুয়া লাগছে!”
“তাহলে আমি একদম ঠিক বলেছি যে তুমি একটা খাটো পটল। আমার সাথে কথা বলতে গেলেও তো তোমার ঘাড় মটকে মাথা উঁচু করে তাকাতে হয়।”
রুশদী রাগে কাঁপতে কাঁপতে আঙুল উঁচিয়ে শেষ সতর্কবার্তা দিল, “আমাকে আরেকবার এই ‘পটল-ছটল’ বললে আপনার কপালে কিন্তু দুঃখ আছে!”
“একশ বার বলব খাটো পটল, খাটো পটল, খাটো পটল!”
ফারাজ যেন ছোটদের মতো জেদ ধরে রুশদীকে খেপিয়ে তুলতে লাগল।

“ইউ…!” রাগে কথা আটকে গেল রুশদীর। সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল। হাইট নিয়ে কেউ খোঁচা দিলে রুশদীর মাথা ঠিক থাকে না, আর এখানে এই লোকটা অনবরত তাকে অপমান করে যাচ্ছে। সে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আপনি একটা আস্ত ম্যানারলেস লোক! কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, কাকে সম্মান দিতে হয়,এসব নূন্যতম জ্ঞানও কি আপনার নেই?”
ফারাজ বাঁকা হেসে পালটা তাচ্ছিল্য ছুড়ল, “ওরে বাবা! এখন আমাকে একটা খাটো পটলের কাছ থেকে ম্যানার শিখতে হবে? তুমি নিজে একটা ম্যানারলেস হয়ে আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না। শুরুটা কে করেছিল? আমি নাকি তুমি? এবার সামলাও ঠেলা! আমাকে একটা কথা শোনালে আমি তোমাকে একশটা শোনাব, সাবধান করে দিচ্ছি!”
“আপনি…!” তর্জনী উঁচিয়ে প্রায় গর্জে উঠল রুশদী।
ফারাজ ভ্রু উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল, “আমি কী? হ্যাঁ? আমি কী?”

“আপনি একটা…!”
“আমি একটা কী? বলো?”
“আপনি একটা ম্যানারলেস খাম্বা! বিদ্যুতের খাম্বা আপনি! এত অস্বাভাবিক লম্বা কেন আপনি? আমি যদি খাটো পটল হই, তবে আপনি নির্ঘাত একটা বিদ্যুতের খাম্বা!”
ফারাজ এবার আসলেও দমে যাওয়ার বদলে ক্ষেপে গেল, “কী বললে? খাম্বা? আমি খাম্বা?”
“বাহ! দারুণ তো! নিজে নিজেই তো স্বীকার করে নিলেন। হ্যাঁ, আপনি খাম্বা! আপনি একটা আস্ত ম্যানারলেস খাম্বা!”

বলেই রুশদী অদ্ভত মুখভঙ্গি করে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল। রাগে তার শরীর জ্বলছে। মনে মনে এই লোকটার কতই না প্রশংসা করেছিল সে, অথচ পর্দার আড়ালে লোকটা যে এত ঝগড়াটে আর অসভ্য হতে পারে, তা সে ভুলেই গিয়েছিল । রাগে গজগজ করতে করতে সে মাথার ওপর অবধি ব্ল্যাঙ্কেট টেনে নিয়ে কুঁকড়ে শুয়ে রইল।
ফারাজও তখন রাগে ফুঁসছে। সেও তো রুশদীকে কত ভদ্র ভেবেছিল! অথচ ঘোমটার নিচে যে এমন খেমটা নাচ’ চলছে, তা কে জানত? ঠিক সেই মুহূর্তে ব্ল্যাঙ্কেটের নিচ থেকে রুশদীর আদেশের সুর ভেসে এল,
“লাইট অফ করুন! আমি এখন ঘুমাব।”

ফারাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। তাকে কেউ আদেশ করবে,এটা তার সহ্যশক্তির বাইরে। সে গলার স্বর সপ্তমে তুলে বলল, “এই, তুমি আদেশ করার কে? কাকে আদেশ করছ তুমি?”
রুশদী ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে মুখ বের করে এক ঝটকায় বলল, “এই রুমে আপনি আর আমি ছাড়া তৃতীয় কোনো প্রাণী নেই, সুতরাং আপনাকেই বলছি। লাইট অফ করুন, আমার চোখে আলো লাগছে!”
ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে রুশদীর দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। তার সারা শরীর রাগে রি রি করছে। বাসর রাতে বউকে আদর-সোহাগ করা তো দূরের কথা, এই মেয়ে তো তাকে ভৃত্য মনে করছে! সে ক্রুর হেসে বলল,
“শোনো পটল কুমারী,এটা তোমার বাপের বাড়ি নয় যে তোমার হুকুমে চেরাগ জ্বলবে আর নিভবে। আমার যখন ইচ্ছা হবে তখনই লাইট অফ করব। তার আগে এক চুল নড়ব না।তোমার দরকার হলে তুমি নিজেই লাইট অফ করে নাও!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৬

“আপনি কি আসলেও সেন্সলেস? একজন মানুষ ঘুমানোর চেষ্টা করছে আর আপনি লাইট জ্বালিয়ে নিজের খাম্বা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন?” রুশদী আবার উঠে বসল।
“হ্যাঁ, আমি খাম্বা,!খাবার নড়তে চড়তে পারে না তাই খাম্বা লাইট অফ করতে পারবে না।তাই তুমি লাইট অফ করে এসে সুন্দর মত শুয়ে পড়ো। ”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৮