Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৯

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৯

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৯
তেজরিন উম্মীদ

রিসিপশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত প্রায় শেষ। আত্মীয়-স্বজনরা যে যার গন্তব্যে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সারাটা দিন হাজারো মানুষের ভিড়ে একটা কৃত্রিম হাসি মুখে ঝুলিয়ে রাখলেও রুশদীর বুকের ভেতরটা এখন হাহাকার করে উঠছে। সে গুটিগুটি পায়ে আনাস হকের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা আধখোলা। ভেতরে আনাস হক নিজের ব্যাগ গোছাচ্ছেন।আনাস হক একটু ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দেখলেন রুশদী দাঁড়িয়ে আছে।তিনি নির্বিকার গলায় প্রশ্ন করলেন,”কিছু বলবি?”

রুশদী কোনো উত্তর দিল না। সে কোনো এক অদৃশ্য টানে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল এবং হুট করেই তাকে জড়িয়ে ধরল। এই আলিঙ্গনে ছিল আজন্মের এক জমাটবদ্ধ আকুতি। বাবার গায়ের গন্ধটা পেতেই তার চোখের কোণের বাঁধ ভেঙে গেল।কয়েক ফোটা নোনা জল গড়ালো। বাবার বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে রুশদী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“তোমাকে অনেক ভালোবাসি আব্বু।আম্মু চলে যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আপন বলতে আমার আর কেউ নেই। তুমি বিশ্বাস করো, শত চেষ্টার পরেও আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারি না। তোমার দেওয়া সব অন্যায় আবদার কেন হাসিমুখে মেনে নিই জানো? কারণ আমার খুব ভয় হয়,আমি যদি তোমার কথার অবাধ্য হই, তবে হয়তো তুমি খুব কষ্ট পাবে। তোমার সেই কষ্টের দায়ভার নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।”

খানিকটা দম নিয়ে রুশদী আবার বলল, “আমি জানি আমি তোমার কাছে বোঝা ছিলাম। কিন্তু শেষবারের মতো আমার একটা কথা রাখবে? ছোটবেলার মতো করে আমাকে শুধু একবার ‘মা’ বলে ডাকবে আব্বু? এই একটা ডাক শোনার জন্য আমার আত্মাটা বছরের পর বছর তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে। কথা দিচ্ছি, এই একটা আবদার রাখলে আমি আর কোনোদিন তোমার কাছে কিছুই চাইব না।”
রুশদী বরাবরই বাবার কাছে বড় অসহায়। আনাস হকের অবহেলা আর রূঢ় ব্যবহার তাকে বারবার বিষাক্ত করলেও, দিনশেষে ওই মানুষটার এক চিলতে স্নেহের জন্য সে সব অপমান ভুলে যেতে রাজি। কিন্তু আনাস হকের পাথুরে মনে মেয়ের এই আর্তনাদ এক বিন্দু করুণার উদ্রেক করল না। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা বা স্নেহের লেশমাত্র দেখা গেল না। বরং মনে হলো, তিনি এই আবেগঘন পরিস্থিতি থেকে দ্রুত নিষ্কৃতি পেতে চান।
খুবই অবহেলা আর বিরক্তির স্বরে তিনি রুশদীকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন,”আচ্ছা ডাকলাম মা, হয়েছে তো এবার?”
রুশদীর তপ্ত চোখের জল বাবার নির্লিপ্ততার কাছে হার মেনে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর আনাস হক যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আবার নিজের ব্যাগটা টেনে নিলেন।

পরের দিন সকাল সকাল খান বাড়িতে হাজির হলো আনাস ও নাহিদা। তারা খান বাড়ির বিশাল ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে। তাদের সামনে বসে আছেন রাইমা খান। আভিজাত্যের চরম শিখরে থাকা এই নারীটি পায়ের ওপর পা তুলে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন। তার সামনে বসে থাকা আনাস হক আর নাহিদার ভেতরে চলছে অস্থিরতা। নাহিদা বারবার আনাস হকের হাতের কোনুই দিয়ে গুঁতো দিচ্ছে কিছু শুরু করার জন্য,আর আনাস হক তাদের থামিয়ে দিচ্ছেন। রাইমা খান তাদের অবস্থা দেখে অত্যন্ত শীতল গলায় বললেন,
“যা বলতে চাচ্ছেন সরাসরি বলুন। আমার হাতে খুব একটা সময় নেই।”

আনাস হক গলা ঝেড়ে আমতা আমতা করে শুরু করলেন, “আসলে যা দেওয়া-নেওয়ার কথা ছিল, তা তো এখনো হলো না। তাই আরকি আসা। তা ভাই সাহেব কি বাড়িতে আছেন? ওনার সাথে একটু কথা বললে…”
রাইমা খান কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সেটা টি-টেবিলে রাখলেন। তার চোখের চাউনি আরও ধারালো হয়ে উঠল।
“মন্ত্রী সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে আপনার মতো মানুষের সাথে অযথা সময় ব্যয় করার মতো সময় ওনার নেই। আর আপনি কিসের দেওয়া-নেওয়ার কথা বলছেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
আনাস হক এবার কিছুটা নির্লজ্জের মতো হেসে বললেন, “কিছু অর্থ তো দেওয়ার কথা ছিল। বিয়ে তো হয়ে গেল, মেয়েও আপনাদের বাড়িতে। এখন আমাদের পাওনাটা মিটিয়ে দিলে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারতাম আরকি।”
রাইমা খানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। তিনি সোজা হয়ে বসে বললেন,”আপনি কি রুশদির বিনিময়ে পাওয়া টাকার কথা বলছেন? সোজা বাংলায় বলতে গেলে,নিজের মেয়েকে বিক্রি করা অর্থের কথা?”

আনাস হক থতমত খেয়ে গেলেন। “জি… জি মানে ওভাবেই তো কথা ছিল।”
“শুনুন আনাস সাহেব,” রাইমা খানের কণ্ঠস্বর এবার বরফের মতো ঠান্ডা। “আমরা আমাদের ছেলের জন্য সম্মানিতা ঘরের বউ এনেছি, বাজার থেকে কোনো সস্তা পণ্য কিনে আনিনি যে তার বিনিময়ে আপনাদের হাতে নোটের বান্ডিল তুলে দিতে হবে। তাই এসব কদর্য বিষয় নিয়ে যদি দ্বিতীয়বার কথা না বলেন, তবেই আমরা খুশি হব।”
টাকা দেওয়া হবে না শুনে পাশে বসে থাকা নাহিদা এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বিড়াল যেমন হুট করে খ্যাক করে ওঠে, সেভাবেই চিৎকার করে উঠল সে।
“টাকা দিবেন না মানে? বিয়ের আগে তো কত মিষ্টি কথা! কথা ছিল মেয়ে আপনাদের চৌকাঠ পেরোলেই আমাদের পাওনা আমাদের হাতে দিয়ে দিবেন। এখন রুশদী ঘরে ঢুকতেই রূপ বদলে গেল? টাকা এখন দিবেন না কেন?”
রাইমা খান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তার স্থির দৃষ্টি নাহিদাকে মনে করিয়ে দিল যে তিনি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। রাইমা খান বললেন,

“বোধহয় আপনাদের কানে সমস্যা আছে। একটু আগে আমি যা বলেছি, ওটাই আমার শেষ কথা। আমাদের বাড়িতে আপনাদের মতোন লোভী আর ছোটলোকদের কোনো স্থান নেই। টাকা তো পাবেনই না, বরং আবারও যদি এই দাবি নিয়ে আসেন, তবে মন্ত্রী সাহেবের ক্ষমতা সম্পর্কে আপনাদের ভালোই ধারণা হবে। এবার দয়া করে বিদায় হন।”
রাইমা খানের কড়া কথা শুনে নাহিদার চেহারার রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল।তার কণ্ঠস্বরে এখন উপচে পড়ছে উগ্রতা।
” আমরা ফাউ কথা শুনতে আসিনি। আপনাদের মতো বড়লোকের বাড়ির বউ হয়ে রুশদি এখন রাজরানি হয়ে আছে, আর আমাদের বেলায় লবডঙ্কা? মন্ত্রী সাহেবের খমতা দেখিয়ে পার পাবেন না। টাকা না নিয়ে আমরা এখান থেকে এক পা-ও নড়ছি না!”
রাইমা খান ঠাণ্ডা চোখের দৃষ্টি এবার সরাসরি নাহিদার চোখে।

“আমাদের বাড়ির কাজের লোকগুলোও আপনার চেয়ে নিচু গলায় কথা বলে। এটা ড্রইং রুম, মাছ বাজার নয়। আনাস সাহেব, আপনার স্ত্রীকে সামলান, নইলে আমার দারোয়ান ওকে গেটের বাইরে রেখে আসার সময়ও কিন্তু ঠিক এভাবেই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে।”
আনাস হক কিছুটা ভড়কে গিয়ে নাহিদার আঁচল টেনে ধরার চেষ্টা করলেন, “আরে নাহিদা, বসো। কথা তো শেষ হয়নি…”

“কি কথা শেষ হয়নি?” নাহিদা এবার আনাস হকের হাত ঝামটা দিয়ে সরিয়ে দিল। “তুমি তো একটা মেরুদণ্ডহীন মানুষ! নিজেদের পাওনা চাইতে এসেও কুঁকড়ে আছো? , সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে আমাদের সময় লাগবে না। রুশদীর ওপর আমাদের অধিকার এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমরা যদি এখনই ওকে নিয়ে যেতে চাই, আপনারা আটকাতে পারবেন না।”
রাইমা খান মৃদু হাসলেন। তিনি বেল টিপে ভেতরে ইশারা করতেই দুজন দীর্ঘদেহী বডিগার্ড ঘরে ঢুকল।
“রুশদি এখন এই বাড়ির বউ, আপনাদের পণ্য নয় যে যখন খুশি ফেরত নিয়ে যাবেন। আর আপনাদের দাবি করা ওই তথাকথিত পাওনা… ওটা পাওনা নয়, ওটা ছিল একটা টোপ। যে বাবা-মা নিজের সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি করে, তাদের আইনের ভাষায় কী বলে জানেন তো? আমি চাইলে এখনই পুলিশের হাতে আপনাদের তুলে দিতে পারি, জালিয়াতি আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগে।আপনরা চাইলে আরে বড়ো মামলাও ঠুকতে পারি।”

নাহিদা কিছুটা ভয় পেল ঠিকই, কিন্তু জেদ ছাড়ল না। “পুলিশের ভয় আমাদের দেখাবেন না! আপনারাও তো সেই লেনদেনে রাজি হয়েছিলেন। আমরা ডুবলে আপনাদেরও সাথে নিয়েই ডুবব।”
“প্রমাণ আছে কোনো”মৃদু হেসে বললেন রাইমা খান।
আবার বললেন,
“আপনাদের মতো লোভী মানুষের সাথে আমি কোনো লিখিত চুক্তি করিনি। এখন দয়া করে বিদায় হন। আমার ছেলের সাথে রুশদি এই মুহূর্তে ওপরের ঘরে আছে। আমি চাই না আপনাদের এই কুৎসিত চেহারাটা দেখে ওর সকালটা নষ্ট হোক।”
বডিগার্ডরা এক কদম এগিয়ে আসতেই আনাস হক বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে। তিনি ফ্যাকাশে মুখে নাহিদার হাত শক্ত করে ধরলেন। “চলো এখান থেকে, পরে কথা হবে।”
নাহিদা যেতে যেতেও চিৎকার করে বলতে লাগল, “দেখে নেব আপনাদের! রুশদিকে দিয়েই আপনাদের হাঁড়ি ভাঙব আমি, মনে রাখবেন!”

খান বাড়িতে রুশদীর আজ বারো তম দিন। এই অল্প কদিনেই সে নিজেকে এই নতুন পরিবেশের সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। নিজের অজান্তেই সে খুঁজে পেয়েছে এমন এক পরিবার, যা সে এতদিন শুধু কল্পনাতেই এনেছিল। স্নেহমাখা শাসনের জন্য রাইমা খানের মতো একজন মা পেয়েছে, আর ছোট ভাই নাহিদের অভাবটা যেন সুদে-আসলে পূরণ করে দিয়েছে শান। মাতৃত্বের এক অদ্ভুত সুখানুভূতি রুশদীর মনে খেলা করে যখন পুচকি শের সারাটা দিন ‘মম মম’ বলে তার আঁচল ধরে ঘুরঘুর করে।
তবে খান বাড়ির দুজন মানুষের সাথে রুশদীর দূরত্বটা এখনো রয়েই গেছে। একজন হলেন শেহজাদ খান। রাজনৈতিক ব্যস্ততায় তিনি প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকেন, আর যখন থাকেন, তখন তার গাম্ভীর্য পুরো বাড়ি তখন একদম চুপ হয়ে থাকে। তাকে দেখলেই রুশদীর বুকটা ধক করে ওঠে, এক অজানা ভয়ে সে তটস্থ থাকে। তাই শ্বশুরমশাই বাড়িতে থাকলে রুশদী নিজের ঘর ছেড়ে বের হয় না।

আর দ্বিতীয় জন হলো সেই আলালের ঘরের দুলাল নবাব সিরাজউদ্দৌলার কথিত নাতি জনাব ফারাজ সাহেব। রুশদীর সাথে তার সম্পর্কটা ঠিক টম এন্ড জেরি। কারণে অকারণে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগে। নতুন বউ তার স্বামীর সাথে এমন তেড়েফুঁড়ে ঝগড়া করতে পারে, তা রুশদী আর ফারাজকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। ফারাজকে দেখলে রুশদীর বিন্দুমাত্র মনে হয় না যে সে তার স্বামী।
তখন সকাল সাড়ে এগারোটা। বাড়িতে এক ধরণের আলসেমি দুপুর নামার প্রস্তুতি চলছে। শের এখন স্কুলে, কেজি ক্লাসের এই পুচকিটার এতক্ষণে ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা। ড্রাইভারই সাধারণত তাকে আনতে যায়, ফারাজ যায় মাঝেসাঝে। রুশদী নিচে রাইমা খানের সাথে চা-আড্ডা সেরে ফারাজের ঘরে ঢুকল।
রুমে ঢুকে দেখল ফারাজ বিছানায় আধশোয়া হয়ে আপনমনে ফোন ঘাটছে। রুশদী বিছানার পাশে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল। আজ সে মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়াটা এবার কমানো দরকার। একটা সমঝোতায় না পৌঁছালে এভাবেই হয়তো সারাজীবন মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকবে।
রুশদী কয়েকবার গলা পরিষ্কার করল। ফারাজ একবার চোখের কোণ দিয়ে রুশদীকে দেখলেও কোনো ভাবান্তর দেখাল না।
রুশদী দুই হাত বগলদাবা করে ফারাজের সামনে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। সে গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।”
ফারাজ ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল না। আঙুল চালাতে চালাতেই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“বলো, শুনছি তো।”
কারো সাথে কথা বলার সময় সেই মানুষটি অন্য দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকলে রুশদীর ভীষণ রাগ হয়। ফারাজের এই অবহেলা তার মেজাজ আরও বিগড়ে দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ফোনটা রাখুন আগে, তারপর কথা বলছি।”
“বললাম তো বলো! আমার কান দুটো তো খোলাই আছে।” ফারাজের ভাবলেশহীন উত্তর।
রুশদী এবার রাগে গজগজ করতে করতে বলল, “আপনি ফোনটা রেখে আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। ”
, “আমি কি চোখ দিয়ে শুনব নাকি কান দিয়ে? আমার কান খারা আছে, তুমি বলে যাও। আমার চোখ যেদিকেই থাকুক, আমি ঠিকই শুনছি।”

ফারাজের পুরো মনোযোগ তখন ফোনের স্ক্রিনে কোনো এক খেলায় বা মেসেজে নিবদ্ধ। রুশদী শেষবারের মতো সতর্কবাণী উচ্চারণ করল, “ফোনটা রাখুন বলছি!”
ফারাজ এবারও পাত্তাই দিল না, আগের মতোই বলল, “তুমি বলো।”
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল রুশদীর। সে এক ঝটকায় ফারাজের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। রুশদী ফোনটা নিজের পেছনে লুকিয়ে বলল,
“এবার হয়েছে? আমার দিকে তাকাতে পেরেছেন?”
ফারাজ এবার বিছানায় সোজা হয়ে বসে পূর্ণ দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকাল। তার কপালে কিঞ্চিৎ বিরক্তির রেখা ফুটে উঠেছে। রুশদী মনে মনে এটাই চেয়েছিল,ফারাজের সমস্ত মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেওয়া। ফারাজ হাত ঝেড়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,

“এখন কী বলবে বলো! শুনছি।”
রুশদী তার জমানো শর্তগুলো পেশ করতে শুরু করল,
“আপনি আর আমার সাথে কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতে পারবেন না। আপনি আমার সাথে একদম হাসবেন্ড এর মতো বিহেভ করবেন।”
ফারাজ নির্বিকার মুখে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বলছে সে কথাগুলো শুনছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখালো না। কেবল শান্ত গলায় ছোট করে প্রশ্ন করল,
“আর কিছু?”
“আর, আর আমাকে ভুলেও খাটো পটল বলবেন না। আমার হাইট একটু শট হতেই পারে, আপনি অপমান করতে পারবেন না।”
ফারাজের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠলেও সে তা প্রকাশ হতে দিল না। আবারও সেই একই ছোট প্রশ্,
“আর?”

“আর, রাতে আমার খুদা লাগলে আমার সাথে ঝগড়া না করে খাবারের ব্যবস্থা করে দিবেন?”
ফারাজ এবারও হেলদোল দেখাল না। তার মুখে শুধু সেই এক শব্দ, “আর?”
রুশদী এবার গভীর চিন্তায় পড়ল। আর কী কী বলা যায়? ফারাজকে বাগে আনতে হলে ফর্দটা বেশ লম্বা হওয়া প্রয়োজন। সে একটু ভেবে নিয়ে বলল,
“আর! আর… আর বাহিরে যখন যাব, তখন আপনি একটু কুঁজো হয়ে আমার সাথে হাঁটবেন যাতে আমাকে বেশি খাটো না লাগে। ওই খাম্বার মতো সোজা হয়ে হাঁটলে তো মানুষ ভাববে আমি আপনার পকেট থেকে পড়ে গিয়েছি!”
ফারাজ এবারও গম্ভীর মুখে বলল, “আর?”

“আর মাঝরাতে যদি আমার হঠাৎ করে রাস্তার মোড়ের মামার দোকানের চা খেতে ইচ্ছে করে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজতে মন চায় বা রাতে হাঁটতে যেতে মন চায় তবে আপনি কোনো ওজর-আপত্তি ছাড়াই আমার সাথে যাবেন। খবরদার, তখন কিন্তু আপনার ওই ‘ক্লিন শেভড’ গম্ভীর চেহারা নিয়ে বলবেন না যে আপনার ঘুম পাচ্ছে!”
ফারাজ যেন রুশদীর পাগলামিগুলো উপভোগ করছে। সে ঠোঁট টিপে হাসি চেপে আবারও গম্ভীর মুখে বলল, “আর?”
রুশদী এবার একটু তেতে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “আর শোনেন ফারাজ সাহেব, আমাকে যখন তখন আপনার ওই বাজখাঁই দরাজ কণ্ঠে ধমক দেওয়া চলবে না। আমি চিল্লাইলে আপনি চুপ থাকবেন, আর আমি যখন চুপ থাকব… তখনো আপনি চুপই থাকবেন! এক কথায়, আমার কথার ওপর কোনো কথা হবে না।”
রুশদী যেন দম নিচ্ছে না। সে আবারও যোগ করল, “আর… ওই , পুঁচকে শের! ও যদি মাঝরাতে আমার কোল দখল করে নেয়, আপনি কিন্তু হিংসা করতে পারবেন না। দরকার হলপ সোফায় গিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি রাখবেন, আমাদের বিরক্ত করা চলবে না!”

ফারাজ একটা বাঁকা হাসি দিয়ে আবারও বলল, “আর?”
“আর শুনুন! সপ্তাহে অন্তত একদিন আমাকে শপিংয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি যদি সারা দিন ঘুরে মাত্র একটা ক্লিপ কিনি, তাও আপনাকে হাসি মুখে আমার ব্যাগ বইতে হবে। খবরদার, তখন কিন্তু আপনার ওই বিদ্যুতের খাম্বাার মতো লম্বা শরীর নিয়ে ক্লান্ত হওয়ার নাটক করবেন না!”
রুশদী হাঁপাতে লাগল। একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে সে ফারাজের উত্তরের অপেক্ষায় স্থির হয়ে দাঁড়াল। ফারাজ বলল,
“আর? আর কিছু? নাকি ফর্দ শেষ?”
রুশদী এবার একটু লজ্জিত হাসল, গালের ওপর হালকা আভা খেলে গেল তার। কিন্তু পরক্ষণেই সেটা সামলে নিয়ে মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আর শেষ কথা,আপনি যখন বাসায় থাকবেন, তখন ফোন টিপাটিপি বন্ধ। আপনার সব মনোযোগ থাকতে হবে এই আমার দিকে। আমি যখন কথা বলব, তখন আপনাকে হুঁ-হাঁ করতে হবে, আর না বুঝলেও মাথা নাড়তে হবে। বুঝেছেন?”

ফারাজ এখনো পাথরের মূর্তির মতো নির্বিকার। সে আবারও সেই সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “আর?”
রুশদী এবার বিরক্ততে ঝারি মেরে বলল,
“আর আপনি এই আর বলাটা বাদ দিন।”
ফারাজ এবার বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। রুশদীর অস্থিরতা দেখে তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে, তোমার আর কিছু বাকি আছে, নাকি আপাতত ফর্দ শেষ?”
রুশদী বিজয়ীর বেশে বুক ফুলিয়ে বলল, “হুম শেষ।”
“তাহলে আমি কিছু বলি?”
রুশদী ভ্রু নাচিয়ে অনুমতি দিল, “হুম বলুন।”

“তোমার কথা শুনে মানে তুমি চাচ্ছ আমি একজন স্বামী নয়, বরং একজন রোবট, ডেলিভারি বয় আর বডিগার্ড,সব মিলিয়ে একটা অল-ইন-ওয়ান প্যাকেজ হয়ে থাকি? তাই তো?”
রুশদী বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মাথা নেড়ে সায় দিল, “একদম! আপনি তো ইন্টেলিজেন্ট খাম্বা, ঠিকই ধরেছেন।”
ফারাজ এবার এক ধাপ এগিয়ে রুশদীর আরও কাছে এল। তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসায় রুশদী কিছুটা থমকে গেল। ফারাজ বাঁকা হেসে বলল, “শর্ত তো সব তোমারই শুনলাম। ডিলে আমারও কিছু শর্ত আছে। তুমি আমার শর্ত মানো, আমিও তোমার শর্ত মানবো।”
রুশদী একটু ইতস্তত করে বলল, “আচ্ছা বলুন আপনার শর্ত।”
ফারাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে বলল, “শর্ত মাত্র দুইটা। শর্ত এক,তুমি প্রতিদিন অন্তত একবার আমাকে স্বীকার করে বলবে যে, সাদা পাঞ্জাবিতে আমাকে আসলে হিরোর মতো লাগে, কাকতাড়ুয়ার মতো নয়! রাজি?”
রুশদী এবার বড়সড় বেকায়দায় পড়ল।

, “সেটা তো অসম্ভব! আমি মিথ্যে বলতে পারি না।”
ফারাজ সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে নিল। “তবে সব শর্ত বাতিল, বিদায় হও এখান থেকে।”
ফারাজের এই ড্যাম কেয়ার ভাব দেখে রুশদী বুঝল পরিস্থিতি বেগতিক। এভাবে সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। সে হাত-পা ছুড়ে অস্থির হয়ে বলল,
“উফ! আচ্ছা বাবা, মাঝেমধ্যে বলব। এখন আপনার দ্বিতীয় শর্ত বলুন।”
ফারাজ ধীরস্থির গলায় বলল, “আমি যা চাইব দিতে হবে।”
রুশদী অবাক হয়ে নিজের দিকে তাকালো। তার কাছে দেওয়ার মতো আছেই বা কী! সে অসহায় মুখভঙ্গি করে বলল, “আমি গরিব মানুষ আপনাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছুই নেই জনাব ফারাজ।”
ফারাজ এক চুল ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। সে অটল গলায় বলল, “সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। কিন্তু আমি যা চাইবো দিতে হবে।”

রুশদীর কৌতূহল এবার তুঙ্গে। সে চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল, “কী চাইবেন আপনি শুনি?”
ফারাজ এবার একটা হাসি দিয়ে তার খুব কাছে ঝুঁকে এল। নিচু স্বরে বলল, “পরিস্থিতি, মুড, মাইন্ড অনুযায়ী থাকবে। তাই এখন বলতে পারছি না।”
রুশদী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তবে ফারাজের শর্ত নিয়ে সে বেশি কিছু ভাবল না। কি আর চাইবে!এমনি বলছে হয়ত।
“ওকে ডিল ডান।”
ফারাজ ভ্রু নাঁচিয়ে কিছুটা সন্দেহের চোখে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে হাসিটা এখনো লেগে আছে। সে আবারও নিশ্চিত হতে চাইল,
“রাজি তুমি আমার শর্তে?”
“হ্যাঁ।” রুশদী মাথা নেড়ে সায় দিল।
ফারাজ দূরে সরে গেল।ফারাজ এবার একটু সতর্ক করে দিল, “ভেবে বলো, পরে কিন্তু কথা বদলাতে পারবে না।”
রুশদী এবার একটু বিরক্ত হলো। জেদি মেজাজে বলে উঠল, “একবার যখন বলেছি, তখন বলেছিই। হ্যাঁ, রাজি।”
“তবে ঠিক আছে।”

ফারাজ এবার তার কপালে হাত দেওয়ার ভঙ্গি করে অদ্ভুত এক দরদ মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল, “এখন বলো, তুমি কি অসুস্থ?”
রুশদী থতমত খেয়ে পিছিয়ে গেল। অবাক হয়ে বলল, “না তো! কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন করলেন কেন?”
ফারাজ এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঠাট্টার ছলে বলল, “তোমার কথাবার্তা শুনে আমার মনে হচ্ছে তুমি অসুস্থ। জ্বর-টর এসেছে নাকি?”
রুশদী মুখ কুঁচকে ফারাজের দিকে তাকাল। রাগে তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
“এই যে! মাত্র বললাম না আমার সাথে ঝগড়া করবেন না? আপনি আবার পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে আসছেন। দেখুন, আমি আপনার সাথে আর ঝগড়া করব না। দুজনই এখন সাদা পতাকা হাতে নিয়ে আপস করে ফেলি, এটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই আপনার উচিত আমার সব কথা হাসিমুখে মেনে নেওয়া।”

“হঠাৎ তোমার মাথায় এই আপসে আসার বুদ্ধি কীভাবে আসল?”
রুশদী এবার বেশ ভাব নিয়ে বিছানায় বসল। যেন কোনো বড় রাজনৈতিক সমাধান দিচ্ছে, এমন ভঙ্গিতে বলল,
“না, আমিই ভেবে দেখলাম আপনার সাথে অযথা ঝগড়া করাটা ঠিক মানাচ্ছে না। যতই হোক আমি তো নতুন বউ! আমার একটু ভদ্র হয়ে চলা উচিত। ভেবে দেখলাম, যতই ঝগড়াঝাঁটি করি না কেন, জীবনটা তো আপনার সাথেই কাটাতে হবে। তাই অকারণে ঝগড়া করে জীবনটা তেতো করার চেয়ে আপনার সাথে মিলেমিশে একটা বুটিপুল লাইফ লিড করাই তো ভালো।”

রুশদী এক দমে বলে চলল, “অযথা ঝগড়াঝাঁটির কী দরকার? যেখানে আপনি বাইরে গিয়ে খেটে টাকা উপার্জন করে এনে আমাকে খাওয়াবেন, আর সারা জীবন আমাকে আগলে রাখবেন—সেখানে আপনার সাথে আমার রেড ফ্ল্যাগ সম্পর্ক না রাখাই ভালো। আমরা গ্রিন ফ্ল্যাগ হয়ে থাকলেই লাভে থাকব। ইউ নো, আই অ্যাম এ ম্যাচিউর গার্ল! এজন্যই আমার মাথায় এই বুদ্ধিটা আগে এসেছে। দেখেছেন, আপনার আগেই আমি আপস করে ফেললাম! এটাই প্রমাণ করে যে আই অ্যাম ম্যাচিউর।”
রুশদীর মুখে ‘ম্যাচিউর’ শব্দটা শুনে ফারাজ আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে তাচ্ছিল্য মিশিয়ে উপহাস করে বলল,

“তুমি ম্যাচিউর?”
রুশদী বুক ফুলিয়ে বলল, “অবভিয়াসলি আই অ্যাম!”
ফারাজ এবার খিলখিল করে হেসে উঠল।
“এই কথা কে বলল তোমাকে?”
“আমি নিজেই জানি।” রুশদী বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল।
ফারাজ মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে ভুল জানো তুমি।”
রুশদী শান্তভাবে মুচকি হেসে বলল, “হুম উহু! আপনি যতই আমার সাথে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে চান না কেন, আমি কিন্তু আজ তাতে পা দিচ্ছি না।”
ফারাজ এবার একটু অবাক হলো। রুশদীকে রাগানো এত সহজ কাজ ছিল,কিন্তু আজ দেখছি আসলেই বুদ্ধিমানের মতো কথা বলছে। সে হাসতে হাসতে বলল,
“তাহলে তুমি ধরে ফেলেছ আমার ফন্দি?”

রুশদী ঘাড় উঁচিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল, “ইয়েস, কজ আমি ইন্টেলিজেন্ট!”
ফারাজ ঠোঁট উল্টে তালি দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই অবশ্যই! আসলে ছোট পাত্রে চুন রাখলে যেমন সেটা অনেক বেশি ঘন মনে হয়, তোমার ওই ছোট্ট শরীরে বুদ্ধির ঘনত্বও বোধহয় সেভাবেই আল্লাহ একটু বেশিই দিয়েছেন। অতটুকু মাথায় এত বুদ্ধি রাখো কী করে?সেটা ভেবেই তো আমি মাঝেমধ্যে ধন্দে পড়ে যাই!”
রুশদী কয়েক সেকেন্ড হা করে তাকিয়ে রইল। ফারাজ একদিকে তাকে ‘বুদ্ধিমান’ বলল, আবার একই সাথে তাকে ‘ছোট পাত্র’ বলে তার হাইট নিয়েও অপমান করে দিল। কথাটার মানে যখন পুরোটা মাথায় ঢুকল, তখন রুশদীর রাগে কান দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম।

রুশদী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি কি আমাকে পরোক্ষভাবে আবার খাটো বললেন?”
ফারাজ একদম নিষ্পাপ মুখে দু-হাত ছড়িয়ে বলল, “আরে না! আমি তো জাস্ট বিজ্ঞানের কথা বললাম। ছোট জায়গায় কোনো কিছু থাকলে সেটা তো স্পেশালই হয়। এখন তুমি যদি সেটাকে অপমান হিসেবে নাও, তবে সেটা তোমার বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা, আমার নয়!”
রুশদী এবার রাগে গজগজ করতে করতে বিছানা থেকে একটা বালিশ টেনে নিয়ে ফারাজের দিকে ছুড়ে মারল। ফারাজ খুব কায়দা করে সেটা ধরে ফেলল এবং একটা বিজয়ী হাসি দিয়ে বলল, “ইন্টেলিজেন্ট মানুষরা কিন্তু রাগ করে না রুশদী, তারা পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করে। তুমি ফেল!”
“আসলেই আপনি ম্যারনেস!”

ফারাজকে তার ফোনটা একরকম ছুঁড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে রাগে গটগট করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল রুশদী। তার গটগট করে চলে যাওয়া দেখে ফারাজ আরো জোরে হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ৫ ফুট ২ ইঞ্চির এই পিচ্চি মেয়েটাকে রাগাতে কেন যেন ফারাজের এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করে। দিনে অন্তত একবার রুশদীকে না চটালে ফারাজের পেটের ভাত ঠিকমতো হজম হতে চায় না। এটা এখন ফারাজের কাছে অনেকটা প্রতিদিনের ‘মেডিসিন’ এর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রুশদী যখন রেগেমেগে একদম অগ্নিশর্মা হয়ে যায়, তার ফরসা গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে ওঠে। সেই অবস্থায় সে যখন নিজের ছোট্ট কোমরে হাত দিয়ে, মাথাটা যতটা সম্ভব উঁচিয়ে তর্জনী আঙুল নাচিয়ে ফারাজের সাথে তর্ক করে, তখন সেই দৃশ্যটা ফারাজের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মজার দৃশ্য মনে হয়। রুশদীকে খেপিয়ে তুলতে পারলে ফারাজ আনন্দ খুঁজে পায়। মনে মনে সে স্বীকার করে, মেয়েটা আর যাই হোক, ভীষণ কিউট। তার ঝগড়ার বিষয়গুলোও একদম তার মতোই কিউট কিউট।
রুশদী রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও ফারাজের মনে হলো, এই খাটো পটলটার সাথে সারা জীবন এভাবেই খুনসুটি করে কাটিয়ে দেওয়াটা খুব একটা মন্দ হবে না।

রুশদী যখন ড্রয়িং রুমে পা রাখল, ঠিক সেই মুহূর্তে স্কুল থেকে ফিরেছে ছোট্ট শের। কাঁধের ভারী ব্যাগটা অবহেলায় সোফার এক কোণে ছুঁড়ে মেরে সে একছুটে এসে রুশদীর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রুশদী পরম আদরে তাকে দুই হাতে আগলে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।
“আজকের দিনটা কেমন কাটল তোমার?”
শের তার কচি হাত দুটো দিয়ে রুশদীর গলা জড়িয়ে ধরে বেশ আবেগ নিয়ে বলল,
“তোমাকে অনেক মিস করেছি স্কুলে! আচ্ছা, তুমি আবার কলেজ যাবে কবে থেকে? তুমি গেলে তখন কলেজেও আমাদের দেখা হবে।”

রুশদী কিছুটা অবাক হয়ে হেসে ফেলল। বাচ্চার সরলতা তাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। সে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কলেজে তোমার সাথে আমার দেখা হবে কী করে?
“কেন হবে না? তুমি আর আমি তো একই ইনস্টিটিউশন”
সেটা কীভাবে সম্ভব?”
শের তার ডাগর ডাগর চোখ জোড়া বড় বড় করে বলল, “কেন বুঝছ না? তুমি কলেজ সেকশনের আর আমি স্কুল সেকশনের। নাম তো একটাই—এস.কে!”
“তার মানে তুমিও এস.কে তে পড়ো?”

শের বেশ গর্বের সাথে মাথা নাড়ল। ততক্ষণে তারা ঘরের ভেতর পৌঁছে গেছে। রুশদী তাকে বিছানায় দাঁড় করিয়ে দিল।ফটাজ ছেলেকে দেখে সে একটু আদুরে গলায় কিছু বলতে চাইল, “এসে পড়েছ তা হলে—”
কিন্তু ফারাজের বাক্য শেষ হওয়ার সুযোগ পেল না। শের এক হাত দিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে বলল, “পাপা, তোমার সাথে পরে কথা বলছি। মমের সাথে আমার একটা খুব ইম্পর্টেন্ট কথা আছে।”
ফারাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। নিজের ছেলের মুখে এমন কথা শুনে সে রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। যে ছেলে তাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না, সে এখন তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না! ফারাজ মনে মনে একটু আহত হলেও ছেলের এই নাটকীয়তায় মনে মনে বলল, ‘ছ্যাঃ! নতুন মামাকে পেয়ে এভাবেই জন্মদাতা পিতাকে ভুলে গেলি?’
রুশদী মুচকি হেসে শেরের স্কুল ড্রেস চেঞ্জ শুরু করল। সে যখন মনোযোগ দিয়ে শেরের গলার টাইটা আলগা করছে, তখন শের হঠাৎ বলল

“আজ স্কুলে না গিয়ে তুমি খুব বড় একটা জিনিস মিস করেছ”
রুশদী কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কী এমন জিনিস?”
“ওই যে পচা ভাইয়াটা আছে না? আজকে প্রিন্সিপাল স্যার তাকে দিয়ে পুরো গ্রাউন্ডে কান ধরে চক্কর কাটিয়েছেন!”
রুশদী একটু ভাবনায় পড়ল। সে বুঝতে চেষ্টা করল শের আসলে কাকে ইঙ্গিত করছে। সে নিচু হয়ে প্রশ্ন করল, “কিন্তু তুমি কার কথা বলছো, শের?”
“আরে ওই যে পচা ভাইয়াটা! মনে নেই তোমার?”
রুশদী এবারও ঠিক ধরতে পারল না। সে শেরের চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলল, “আমি ঠিক চিনতে পারছি না সোনা। তুমি একটু বুঝিয়ে বলো তো, কে সে?”
শের এবার আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকাল। তার মনে হলো এই কথাগুলো এখন পাপর সামনে বলা ঠিক হবে না। সে রুশদীর একদম কাছে এসে ফিসফিস করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বলল, “পরে বলব পাপার সামনে বলা যাবে না।”

ফিসফিস করে কথাটা বলার পরেও শুনে ফেলল ফারাজ,
“আমাকে কি বলা যাবে না শের?”
শেরের কোমরে হাত দিয়ে বেশ বিরক্তির সাথে বাবার দিকে তাকালো ,
“উফ পাপা! তুমি আমাদের কথা কান পেতে শুনছো কেন? মম একদম ঠিক বলে, তোমার কোনো ম্যানার নেই! আমাদের প্রাইভেট কথা তুমি কেন শুনছো?”
ছেলের মুখে এমন বড় বড় কথা শুনে ফারাজ যখন বাকরুদ্ধ, তখন শের আরও এক ধাপ এগিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে হুমকি দেওয়ার সুরে বলল, “বেশি ডিস্টার্ব করলে কিন্তু আমি তোমার সিনিয়রকে বলে দেবো। বলব তোমার লাইসেন্স যেন আরও কয়েক মাসের জন্য সাসপেন্ড করে রাখা হয়, হুম!”

ফারাজ যেন নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।একি সত্যিই তার সেই ছোট শান্ত ছেলে শের? নাকি রুশদী সাথে করে অন্য কোনো সত্তাকে নিয়ে এসেছে? রুশদীকে পাওয়ার পর থেকে শের যেন আমূল বদলে গেছে। ফারাজকে সে আর পাত্তাই দেয় না; সারাদিন মমের আঁচল ধরে টইটই করে ঘুরে বেড়ানোই এখন তার একমাত্র কাজ।
ফারাজের খুব জানতে ইচ্ছে হলো,কোথায় গেল সেই ছেলেটা, যে তাকে ছাড়া এক লোকমা ভাত পর্যন্ত মুখে তুলত না? এই শের তো তাকে পাত্তাই দেয় না!সে বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে ধীর গলায় বলল, “শের, তুমি… তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ?”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৮

শের মোটেও দমে গেল না। বরং বুক টান টান করে বলল, “ইয়েস! হুমকি দেওয়া তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।”
“শের, তুমি কি সত্যিই আমার ছেলে? তোমাকে খুব অপরিচিত লাগছে আজ।”
শের এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সে রুশদীর কাঁধে মাথা রেখে চপল ভঙ্গিতে বলল, “কজ নাও আইম মম’স সন!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১০