আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫২ (২)
অরাত্রিকা রহমান
রাত ১১টা~
মিরায়া রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর রায়ান হঠাৎ মিরায়াকে হেঁচকা টানে নিজের বুকের উপর এনে ফেলে জিজ্ঞেস করল-
“কালো জাদু করলে বুঝি? দরকার ছিল না যদিও আমি এমনিতেই..”
-“বাজে কথা কম বলে কাজের কথা বেশি বলবেন মাথা আর শরীর দুটোই ভালো থাকবে। ধর্মের ব্যাপারে এমন বলতে আছে নাকি।”
রায়ান কথা শেষ করতে না দিয়ে সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠলো মিরায়া আর নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হিজাবটা খুলে চুল খুলে তা ঝাড়তে লাগলো। রায়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই অপরূপ সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করছে। একটা সময় মিরায়া চুলগুলো কে হাতে পাকিয়ে খোঁপা করতে লাগলে তার ঘাড়ের অনেক টা অংশ উন্মুক্ত হয়ে ধরা দেয় রায়ানের চোখে। রায়ান অপলকে কিছু সময় সেদিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ চোখ সরিয়ে নিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ওহ আল্লাহ, হচ্ছে টা কি আমার! Why is she so beautiful. I can’t take a cold shower now..”
পর মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“না না, come on Rayan get a hold.”
মিরায়া আড় চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে চুল বাঁধা শেষ হলে শোয়ার জন্য বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে বালিশ আর কম্বল নিয়ে নেয়। রায়ান তখনি মিরায়ার হাত আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হচ্ছে এটা?”
-“দেখতে পাচ্ছেন না বুঝি?”
-“দেখতে পাচ্ছি বলেই জিজ্ঞেস করছি। এগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
মিরায়া রায়ানের কথার কোনো প্রকার উত্তর না দিয়ে রায়ানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে যেতে চাইলে রায়ান মিরায়ার হাত টেনে ধরে বলল-
“আমার থেকে মুখ ফেরানোর সাহস হলো কি করে? I told you, I don’t like rejection, didn’t I?”
মিরায়া বালিশ আর কম্বল হাত থেকে ফেলে দিয়ে রায়ানের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রায়ানের বুকে জোরে এক ধাক্কা দিয়ে বলল-
“I don’t give a shit what you don’t like or do..I am rejecting you.. হ্যাঁ, আমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি আপনার থেকে মি.রায়ান চৌধুরী। কি করবেন আপনি?”
রায়ান এক পা পিছিয়ে গেলেও নিমিষেই মিরায়ার কাঁধের ছোট্ট চুল ভেদ করে তার উন্মুক্ত ঘাড়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল-
“তুমি খুব ভালো করে জানো বেইবি আমি ঠিক কি কি করতে পারি।”
মিরায়া হঠাৎ রায়ানের এমন রূপ দেখে একটু ভয় পেয়ে গেল তবে দমলো না। উল্টো গলা গম্ভীর করে বলল-
“আপনি অসভ্যতামি করছেন রায়ান।”
রায়ান মিরায়ার মাথায় চুল আর মেদহীন কোমরখামচে ধরে নিজের আরো কাছে টেনে বলল-
“অসভ্যতামির এখনো কিছু শুরুই করি নি। তোমার ধারনাই নেই আমি ঠিক কতটা অসভ্য হতে পারি তোমার সাথে।”
মিরায়া দাঁতে দাঁত চেপে রায়ানের হাতের শক্ত ছোঁয়া সহ্য করে বলল-
“আপনি এমন করতে পারেন না!”
রায়ান মিরায়ার ঠোঁটের কাছে গিয়ে বলল-
“কেন করতে পারি না?! তুমি আমার বউ। My newly and legally married wife. আমার যা ইচ্ছে তাই করতে পারবো।”
-“আপনি জোর করে বিয়ে করেছেন। মানি না এই বিয়ে আমি।”
রায়ান মিরায়াকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে বলল-
“Oh really! ঠিক আছে। সমস্যা নেই, মানিয়ে নিচ্ছি তোমাকে।”
কথাটা যেন কোনো অদৃশ্য অধিকার থেকে বলেই মিরায়াকে নিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে বিছানায় উঠে বসে বলল-
“বিয়ে যখন হয়েছে, নিজেদের জীবনের সাথে সাথে বাকি সব ও শেয়ার করতে হবে, ইনক্লুডিং বেড। তুমি আমার বিছানাতেই ঘুমাবে। Do you get that, my Mrs.?”
মিরায়া রায়ানের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে বিছানা থেকে নামাতে নিলে রায়ান ও মিরায়াকে থামাতে নিজের শক্তির প্রয়োগ করতে শুরু করে। বিছানায় এক প্রকার দক্ষযজ্ঞ চালাতে শুরু করলো দুজনে। বেশি প্রহার মিরায়া করছিল আর রায়ান মিরায়ার যেন না লেগে যায় ধস্তাধস্তি তে সেই দিকে মন দিয়ে আছে। প্রায় ১০ মিনিট এই যুদ্ধ চলার পর মিরায়া ক্লান্ত হয়ে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পরলে রায়ানও নিজেকে সামলাতে না পেরে মিরায়ার উপর পড়ে যায়। দুই জনই বেশ হাঁপিয়ে উঠেছে। মিরায়া চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে লাগলো, শরীরের অবশিষ্ট শক্তি টুকু যেন খরচ হয়ে গেছে আর সম্ভব নয় তার পক্ষে। রায়ান মিরায়া উপর থাকা কালীন হাঁপাতে হাঁপাতে খেয়াল করলো মিরায়া কুর্তির গলা কাঁধের এক দিক থেকে নেমে গেছে যার দরুন কালো রংয়ের ইনার স্ট্রেপ দেখা যাচ্ছে। রায়ান নিজের হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে নিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা চেষ্টা করতেই মিরায়ার মায়া মায়া মুখশ্রী তার নজরে পরলো। প্রিয়তমাকে এমন অস্থির হতে দেখলে যে কারো মাথা বিগড়ে যাবে।
-“Oh shit! I can’t anymore. You are teasing me hard heartbird.”
রায়ান নিজের নিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভাঙলো, মুখ ডুবালো সেই উন্মুক্ত গলায়। মিরায়া হঠাৎ চোখ খুলে বড় বড় করে তাকিয়ে দেখলো রায়ান তার উপরে অবস্থান করছে। মিরায়া তৎক্ষণাৎ রায়ানকে সরানোর চেষ্টা করে বলল-
“রায়ান, কি করছেন আপনি? উঠুন। Leave me.”
রায়ান মিরায়ার কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না এখন। ছোট ছোটচুমুতে যখন মিরায়ার গলায় তার রাজত্বের বিস্তার ঘটলো, রায়ান একটু মাথা তুলে মিরায়ার কাঁধ থেকে ইনার স্ট্রেপটা সরিয়ে নিয়ে সেখানে ঠোঁট ছোঁয়াল। ক্ষুধার্ত হিংস্র প্রাণীর মতো এমন হঠাৎ আক্রমণে মিরায়া চমকে উঠে রায়ানের কাছে মুক্তি চাইলো-
“রা…রায়ান প্লিজ। ছাড়ুন আমাকে। কি করছেন আপনি এগুলো?”
রায়ান ওই অবস্থাতেই মাথা না সুচক নাড়িয়ে ফিসফিস করলো অস্পষ্ট ভাঙা শব্দে-
“I ..I am too lost now.. Can’t con…Troll…”
কথাটা বলেই মিরায়ার কলারবনে কামর বসালো মিরায়া ও ব্যাথায় ককিয়ে উঠে রায়ানের চুলে আর পিঠে খামচে ধরলো।
মিরায়া কেঁদে ফেলল ওই মুহূর্তে। তার মাথায় অতীতের সব কিছু ফিরে ফিরে আসছে বারবার। নিজের প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে নিজেকে বিলিন করাতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। রায়ান নিজের মতো ব্যস্ত তবে মিরা চোখের পানি ফেলে রায়ানকে খুব নরম আওয়াজে প্রশ্ন করলো-
“যদি…যদি আমি সুন্দর না হতাম.. তাহলে আপনি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিতেন। তাই না?”
রায়ান থেমে গেল। সম্পূর্ণ ঘরে কেবল দুইজন মানব মানবীর গরম নিঃশ্বাস ছাড়া কিছুই নেই এখন। কলম পতন নিস্তব্ধতায় মিরায়া আবার নিজের প্রশ্ন রাখলো রায়ানের কাছে-
“যদি… আমাকে আপনার ভালো না লাগতো তবে কি এই অনাথ মেয়েকে কখনো বউ করতে এমন মরিয়া হতেন?”
রায়ান চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মিরায়ার উপর থেকে উঠে সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেল। মিরায়া রায়ানের দিকে আর তাকায়নি, চুপচাপ নিজের জামা ঠিক করে নিয়ে এক কাত হয়ে শুয়ে পরলো এক রাশ অভিমান আর অভিযোগ নিজের চোখে রেখে।
রাত ১১.৩০~
রায়ান গোসল করে ঘরে এসেছে কিছু সময় হয়েছে। মিরায়া ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছে, সারাটা দিন কিছু খাওয়া নেই তার আর কতই বা চলবে শরীর। রায়ান নিজের চুল না মুছে বিছানার কাছে এসে হাঁটু মুড়ে মিরায়ার পাশে বসলো। কিছু টা সময় মিরায়াকে দেখে মিরায়ার কপালে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল-
“I am sorry.”
তার চোখ ছলছল করলো কিন্তু আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটার আগেই তা মিলিয়ে গেল চোখেই। রায়ান মিরায়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করলো-
“ভালোবাসি, হৃদপাখি। বড্ড বেশি ভালোবাসি। এছাড়া আর কোনো কারণ নেই তোমাকে বউ হিসেবে চাওয়ার বিশ্বাস করো। আল্লাহর তৈরি পৃথিবীতে- সৌন্দর্যের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, খুঁজতে গেলেও এর শেষ মিলবে না। তবে আমি যে তোমার মধ্যে নিজের জীবন দেখে নিয়েছি, তোমার আগে বা তোমার পরে তোমার বর কোনো সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়নি আর হবেও না। দয়া করে আমার ভালোবাসাকে সৌন্দর্যের পূজারী হওয়ার মাপ দন্ডে পরিমাপ করো না। খুব কষ্ট হবে নয় তো।”
মিরায়া অজান্তেই নিজের প্রশ্নের উত্তর পেল তবে তার শোনার ভাগ্য হলো না। রায়ান শান্ত হয়ে বিছানায় উঠে এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে পরলো।
রাত ১.৩০~
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে ঘুম ও জুড়ে এসেছিল রায়ানের চোখে, বেচারা নিজেও অনেক অসুস্থ তার উপর সেও কাজের চাপে পড়ে যাওয়ায় সারাদিন কিছু খায়নি। ক্লান্ত শরীরে ঘুমের ঘোরে চলে যাওয়ার কিছু সময় পরই সেই ঘোর ভাঙলো তার, যখন হঠাৎ তার হাত বিছানার অপর দিকে গিয়ে পড়ল। রায়ান ঘুমের মধ্যেই মিরায়ায় শুয়ে থাকার সাইডে হাত ভিড়ালো কিন্তু শুন্যতা অনুভব হতেই চট করে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখল মিরায়া বিছানায় নেই।
রায়ান তাড়াতাড়ি উঠে বসে তার দিকে চোখ ঘুরিয়ে মিরায়াকে ডাকলো-
“হৃদপাখি..!”
মিরায়ার আওয়াজ না পেয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো দরজা খোলা। তার মানে হয়তো মিরায়া বাইরে গেছে। রায়ান এক মুহূর্তের জন্য ভেবে বসলো মিরায়া হয়তো এই রাতের অন্ধকারে আবার পালাতে চেষ্টা করছে।
-“আল্লাহ, এই মেয়েটা কি আমাকে একটু শান্তি দিবে না। বিয়ে করে তো সুখেই রাখতে চাইছি ওকে তাও কেন আমার মাথা ব্যাথা উঠাচ্ছে!”
রায়ান তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে সিঁড়ির দিকে গিয়ে নামতে নামতে বিড়বিড় করলো-
“এবার যদি ধরতে পারি আর মায়া দয়া করবো না আমি। অনেক হয়েছে এই লুকোচুরি খেলা। আমি অতিষ্ঠ, আমার কি কাজ নেই! বউ পালাবে আর তাকে ধরতে আমিও ছুটবো। আজকে পেলে এমন হাল করবো আর হাঁটতেই পারবে না পালানোর তো দূর।”
রায়ান কথা গুলো বলতে বলতে সিঁড়ি থেকে নেমে সদর দরজার দিকে যেতে পা বাড়ালে হঠাৎ কিছু একটা খেয়াল করে দু পা পিছু হটে মাথা রান্নাঘরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলো মিরায়া রান্নাঘরে কিছু রান্না করছে। এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আওড়ালো-
“My cute little headache…..”
তারপর ধীর পায়ে রান্নাঘরের গিয়ে মিরায়ার পাশে দাঁড়ালো। মিরায়া বাসনের কাঁচের ঢাকনায় রায়ানের প্রতিবিম্ব দেখলো কিন্তু পাত্তা দিলো না। রায়ান খেয়াল করলো সেটা, যে মিরায়া রায়ানকে দেখেও কিছু বলছে না। তাই সে চুপ করেই মিরায়ার পাশে রইল। এই দিকে মিরায়া নিজের মতো ম্যাগি নুডুলস বানাচ্ছে। তার মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙার পর খুব খিদে পেয়েছিল বলে খেতে নেমেছিল, কিন্তু বিয়ের খাবার খাবে না তাই অবশেষে উপায় না পেয়ে সুপ নুডুলস বানাচ্ছে নিজের জন্য। মিরায়া কে মন দিয়ে রান্না করতে দেখে রায়ান তার প্রশংসা করলো-
“তুমি রান্না করতে পারো খুব ভালো করে।”
মিরায়া শুনেও না শুনে এড়িয়ে গেল বলে রায়ান এটা নিয়েও প্রশংসা করল-
“ইগনোর ও করতে পারো খুব ভালো করেই।”
মিরায়া এতেও কোনো পাত্তা দিলো না বলে রায়ান ইচ্ছে করে একটু দুষ্টুমি করে বলল-
“ইগনোর করার সময় দেখতে তোমাকে খুব সুন্দরও লাগে।”
মিরায়া এবার না পারতে আড় চোখে বিরক্তি নিয়ে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান বুকের বাম সাইডে হাত রেখে বলল-
“এভাবে তাকালে যে মরে যাবো বউ। খুব কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছি, আমাকে পাগল করো না।”
মিরায়া তখন নুডুলস নাড়ছিল। রায়ানের এমন কথা শুনে রায়ানের দিকে খুন্তি উঁচু করে ধরে শাশালো –
“সামনে থেকে সরবেন না ছেকা দিবো?!”
রায়ান দুই হাত অপরাধীর ন্যায় উপরে করে নিয়ে এক কদম পিছায়। মিরায়া আবার খাবার বানানোর দিকে নজর দিলে দুই কদম এগিয়ে এসে বলল-
“ছ্যাঁকা তো দিয়েছই একটু আগে। এখন দিতে চাইলে দিতেই পারো।”
তখনি অসাবধানতাবশত ফুটন্ত পানির কিছু ফোটা ছিটে রায়ানের পেটের দিকে গেলে রায়ান মৃদু আর্তনাদ করে সরে বলল-
“ও মা বলেছি বললে সত্যি সত্যি দিতে হবে নাকি। মায়া দয়া নেই তোমার? মেরে ফেলতে চাইছো নাকি নিজের বরকে?”
-“আরে কি যা তা বলছেন! আমি কি ইচ্ছে করে কিছু করেছি নাকি। আপনা আপনি ছিটে গেছে।”
মিরায়া চমকে গেলো পুরোটা ঘটনাতে, সে তো কিছু করে নি ইচ্ছে করে। রায়ান আবারো আওয়াজ করলো-“আউউ..কি জল্লাদ বউ রে বাবা, শেষে আমাকে পুড়িয়ে মারতে চাইছে।”
মিরায়া বেশ চিন্তিত গলায় রায়ানের কাছে এগিয়ে পেটের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল-
“সরি সরি। দেখি কোথায় লেগেছে। আমি ইচ্ছে করে করি নি। আপনি সামনে এলেন কেন? সরি সরি, সত্যি ইচ্ছে করে করি নি।”
রায়ান হঠাৎ মিরায়ার হাত ধরে বলল-
“সত্যি সত্যি সরি তুমি?”
মিরায়া হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
-“সত্যি সত্যি সরি তো?-
মিরায়া ঘাবড়ে গিয়ে আবার মাথা নাড়লো হ্যাঁ সূচক কিন্তু রায়ান হঠাৎ দাঁত বের করে হেঁসে মিরায়ার কাছে এসে ঝুকে নিজের গাল পেতে দিয়ে বলল-
“Then give me a kiss..And I will forget..”
মিরায়া যেখানে চিন্তিত ছিল এখন চোখ ছোট ছোট করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“এখন সত্যি সত্যি গরম পানি ঢেলে দিব কিন্তু।”
রায়ান বাচ্চা দের মতো মুখ করে হতাশায় সোজা হয়ে দাঁড়ালে মিরায়া লুকায়িত একটু ঠোঁট কামড়ে হেসে রান্নায় মন দিলো। একটু পর সুপ নুডুলস রান্না শেষ হলে মিরায়া সেটা টেবিলে নিয়ে গিয়ে একটা ছোট সুপ বোলে ঢালতে গেলে রায়ান পাশ থেকে এসে গরম পাত্রটা ধরতে হাত বাড়িয়ে বলল-
“আমাকে দাও, আমি ঢেলে দিচ্ছি। এটা অনেক গরম তুমি পারবে না, লেগে যাবে।”
মিরায়া রায়ানের হাতে পাত্রটা না দিয়ে নিজের সাইডে নিয়ে নেয় জেদ দেখিয়ে। রায়ান আবার নরম গলায় বলল-
“পাখি, আমার কথা টা শোনো প্লিজ। ওটা অনেক গরম। লাগলে হাত পুরে যাবে। আমাকে দাও আমি করে দিচ্ছি।”
কিন্তু মিরায়া রায়ানের হাতে দিল না আর রায়ান ও জোরজবরদস্তি করলো না যদি এখন এমন করেতে গিয়ে মিরায়ার লেগে যায় তাই ধরলো না কিন্তু কাছাকাছি রইল। মিরায়া রায়ানকে এমন কাছাকাছি থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল-
“এমন মাথার উপর চড়ে বসলে কিভাবে ঢালবো আমি? দূরে সরুন তো।”
রায়ান এক পা সরলে, মিরায়া সুপ ঢালতে যায়, আর গরম ধোঁয়া উপরের দিকে উঠতে থাকায় হাতে তাপ লাগতেই থাকে কিন্তু প্রথম তেমন না লাগলেও শেষের দিকে লাগতেই পাত্রটা হাত থেকে ফস্কে যায় আর টেবিলের বোলটাতে লেগে পুরোটা সুপ ও পড়ে যায়। রায়ান সেকেন্ডের ব্যবধানে মিরায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে ঘুরিয়ে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে মিরায়াকে যেন মিরায়া শরীরে ছিটকে না আসে।
টেবিলের আর ফ্লোরের অবস্থা নেই আর। মিরায়া এই অবস্থা দেখে বাচ্চা দের মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেদে ফেলল-
“আআহহা..আমি এখন কি খাবো? কত কষ্ট করে বানিয়েছিলাম আমি। আমার আর শক্তি নেই। অনেক খিদে পেয়েছে। আমার হাতে কেন সব বিগড়ে যায়! ওহ আল্লাহ!”
রায়ানের কেন জানি বেশ হাঁসি পাচ্ছিল মিরায়াকে দেখে তবে মায়া ও হচ্ছিল বটে- এত কষ্ট করে বানিয়েছিল খাবে বলে কিন্তু খাওয়া হলো না। রায়ান মুখ টিপে হেঁসে স্বান্তনা দিতে বলল-
“আরে কাঁদছ কেন? তোমার দোষ কোথায় এখানে? নিজেকে দোষ দিচ্ছ কেন?”
মিরায়া চোখ মুছে রায়ানের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো এমন ভাবে যেন আসল অপরাধী পেয়েছে –
“ঠিক বলেছেন। আমার দোষ নেই আপনার দোষ সব।”
রায়ান চোখ বড় বড় করে নিয়ে তার দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করলো-
“আমার..আমার দোষ?(মিরায়া মাথা নাড়ালো) যা বাবা আমি কি করলাম?”
মিরায়খ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“হ্যাঁ আপনার দোষ, আপনার জন্য সব হয়েছে। আপনার জন্য পড়ে গেছে। তখন থেকে আমার খাওয়ার দিকে নজর দিয়ে ছিলেন তাই তো নষ্ট হয়ে গেল।”
রায়ান হা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এইভাবে চিপায় পড়বে জানলে সে কিছুই বলতো না। এই দিকে মিরায়া সারাদিনের ধকল, খিদে, ক্লান্তি আর মনের সব অভিযোগ অভিমান এর দরুন হাইপার হয়ে গেলো। কান্নার বেগ বাড়িয়ে রায়ানের গাঁয়ে এলোপাথাড়িভাবে হাত ছুড়তে ছুড়তে বলতে লাগলো-
“অসভ্য, খারাপ লোক, আপনার জন্য আমার ঠিক মতো খাওয়া হয়নি এক মাসেরও বেশি হয়েছে। আজ বিয়ে হলো তাও কিছু খাইনি, এখন একটু নিজে রান্না করে খাবো তাও সহ্য হলো না আপনার। আর কত কষ্ট দেবেন আমাকে?”
রায়ান নিজেকে প্রথমে মিরায়ার প্রহার থেকে বাঁচতে চাইলেও হঠাৎ তা বন্ধ করে দিয়ে মিরায়ার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে সব অভিযোগ শুনলো।
-“কি হলো! কিছু বলছেন না কেন? বলুন আর কত সহ্য করতে হবে? এত গুলো বছর কষ্ট দিয়েছেন মেনে নিয়েছিলাম এই ভেবে হয় তো আপনার জন্যও পরিস্থিতি কঠিন ছিল। আবার গোটা একটা মাস আমাকে এভাবে কষ্ট দিলেন। কি ক্ষতি করেছি আমি হ্যাঁ? কেন এমন করছেন আমার সাথে? আজ আবার এতো নাটক করে বিয়ে করলেন এত কিছুর পর। কেন? কেন?”
মিরায়া রায়ানকে এভাবে কাঁদতে কাঁদতে মারতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে রায়ানের বুকেই ঢলে পড়লো আর শেষ অব্দি আঘাত করতে করতে বলল-
-“আমার এমন অবস্থার জন্য আপনি দোষী। আপনিই একমাত্র দোষী।”
রায়ান মিরায়ার সব কথা শুনে মিরায়াকে আগলে নিয়ে মিরায়ার মাথায় নরম হাতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“রিলেক্স, রিলেক্স, আমার দোষ, সব আমার দোষ। আমি দোষী। শান্ত হও সোনা। শরীর খারাপ করবে। আমি মানছি আমি দোষী। অনেক কষ্ট দিয়েছি কিন্তু আর কষ্ট দেবো না তোমাকে, একটুও না। আর ভুল হবে না, আর ছেড়ে যাবো না। তুমি শান্ত হও প্লিজ।”
রায়ানের কথায় কি ছিল কে জানে তবে তা মিরায়াকে শান্ত করতে যথেষ্ট ছিল। মিরায়া রায়ান কে আঁকড়ে ধরলে রায়ান মিরায়ার মাথায় চুমু খেয়ে তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে ফ্রিজ থেকে সব খাবার বের করে। মিরায়া এখনো একটু হেঁচকি তুলছে কাঁদতে কাঁদতে। রায়ান খাবার গরম করার পাশাপাশি মিরায়াকে অনেক টা সামলে নিলো।
খাবার সব গরম করে নেমে একই প্লেটে মিরায়াকে খাইয়ে দিল আর নিজেও খেল নিজেদের বিয়ের খাবার। আসলে আল্লাহ সবার রিজিক লিখে রেখেছেন, বিয়ের খাবারই দুইজনের রিজিকে ছিল এটাই পরিশেষে গণ্য করা হবে। রায়ানের হাতে খুব সহজেই মিরায়া খাবার খেয়ে নিল, কি আর করবে খিদেও পেয়েছিল খুব। খাওয়া শেষে রায়ান রান্নাঘরের সবকিছু পরিষ্কার করেছে নিজ হাতে। মিরায়া ঘুমিয়ে গেছিল খেতে খেতে। কাজ শেষ করে রায়ান মিরায়াকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে চলে যায়।
মিরায়াকে বিছানায় রাখতেই মিরায়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মিরায়া মৃদু চোখ খুলে রায়ানের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে মুখ খুলতেই রায়ান মিরায়া ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে মিরায়াকে চুপ করিয়ে দিল। আর নিজে মিরায়া পাশে শুয়ে মিরায়াকে পিছন থেকে জড়িয়ে রইল। রায়ান হাত এভাবে কোমর আর পেটে স্পর্শ করছিল বলে মিরায়ার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল বিধায় মাথা ঘুরিয়ে রায়ান কে হাত সরাতে বলতে যাবে তার আগেই রায়ান আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল-
“বিয়ে করে যে শুধু জড়িয়ে ধরে রাত পার করছি তাই অনেক ছাড়। হাত সরাতে বলার দুঃসাহস দেখিও না যদি রাত টা ঘুমিয়ে কাটাতে চাও। নাহলে, রাত জাগতে হতে পারে।”
মিরায়া রায়ানের কথায় চমকে আশ্চর্য হয়ে হালকা ঘুরে তাকালে রায়ানও মুখ তুলে চেয়ে ভ্রু উচিয়ে বলল-
“কিহ্! আমি রোবট না মানুষ। I can’t take cold shower everytime, right?”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫২
মিরায়া কয়েক বার শুধু পলক ফেলল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরায়ার কপালে গালে চুমু খেয়ে আবার মিরায়াকে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো-“Good night, my Mrs.”
অতঃপর দুইজন একসাথে ঘুমের দেশে পারি দিলো। দুইজনের জন্যই এই অনুভূতি নতুন তবে স্বস্তির ঠেকলো। এমন রাত আগে কখনো আসেনি তাদের জীবনে।
