আবির ভাই পর্ব ১১
উর্মিলা মজুমদার
মেঘ আর অরু বেশ তড়িঘড়ি করেই তৈরি হলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে দেখা দিল এক বিচিত্র সমস্যা। সমস্যাটা যাতায়াত নিয়ে। গতকাল তো আবির ভাই নিয়ে গিয়েছিল, আজ কে যাবে?
অরু একগাল লুচি পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, “আম্মু, আবির ভাই কোথায়?”
সিঁড়ি মুছতে থাকা রাহেলা খালা নির্লিপ্ত গলায় বললেন, “ছোটো সাহেব তো রুমে। অঘোরে ঘুমাচ্ছে।”
অরু অস্থির হয়ে উঠল। “রাহেলা আন্টি, একটু ডেকে দেন না। আমাদের কলেজে পৌঁছে দেওয়ার কথা ওনার।”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বড়ো আম্মু গম্ভীর গলায় বললেন, “থাক, ডাকতে হবে না। ছেলেটা বোধহয় অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছে। শরীর খারাপ হতে পারে, ঘুমাতে দে। জাগাস না।”
অরুর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। “তাহলে বড়ো আম্মু, আমরা যাব কার সাথে?”
বড়ো আম্মু চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে বললেন, “আমি সাদিফকে বলে দিচ্ছি। ও তোদের নিয়ে যাবে।”
অরু মাথা নাড়ল। তার কাছে সাদিফ কিংবা আবির ভাই যেকোনো একজন হলেই হলো। গন্তব্যে পৌঁছানোই আসল কথা। কিন্তু মেঘ কোনো কথা বলল না। সে চুপচাপ বসে লুচি মুখে পুরছো। তার ভেতরে বোধহয় কোনো অস্থির গোপন কথা টগবগ করে ফুটছে। কাল রাতে আবির ভাই যখন ফিরল, তখন তার পা টলছিল। মাতাল মানুষের মতো টলছিল কিন্তু এই কথা মেঘ কাউকে বলতে পারবে না। বললে নিজের বিপদ। সে কেন এত রাত পর্যন্ত জেগে জানলা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিল, সেই কৈফিয়ত কে দেবে? তাই সে বোবা সেজে রইল।
খাওয়া শেষ করে ওরা সাদিফের গাড়িতে গিয়ে উঠল। সাদিফ নিজেই ড্রাইভ করছে। মেঘের মুখটা থমথমে, যেন এখনই বৃষ্টি নামবে। কিন্তু অরু হলো চড়ুই পাখির মতো এক মুহূর্ত চুপ করে থাকা তার স্বভাবে নেই। সে বিসমিল্লাহ বলে আলাপ শুরু করল।
“সাদিফ ভাই, আমরা যদি না আসতাম তবে কি আপনি বাইকে করে ইউনিভার্সিটিতে যেতেন?”
সাদিফ আয়নায় একবার অরুর দিকে তাকিয়ে হাসল। “হ্যাঁ, তা যেতাম। তবে তোদের জন্য আজ গাড়ি বের করলাম। সমস্যা নেই।”
মেঘ হঠাৎ অরুকে কনুই দিয়ে একটা হালকা খোঁচা দিল। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “সাদিফ ভাইয়ার বাইক আছে নাকি?”
অরু অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ, আছে তো। কেন?”
মেঘ রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “না, এমনি। কলেজে গিয়ে তোকে একটা কথা বলব।”
সাদিফ ওদের কলেজের গেটে নামিয়ে দিয়ে হাত নাড়িয়ে চলে গেল। ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে যাবে এখন সাদিফ। গাড়িটা দৃষ্টির আড়াল হতেই অরু মেঘকে চেপে ধরল।
“মেঘ, কী কথা বলবি বল না? তুই তো আমায় সাসপেন্সে মেরে ফেলবি!”
মেঘ চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মেহেদি রাঙানো চিকন আঙুল দিয়ে অরুর হাতটা খপ করে ধরল। মেঘের চোখমুখ অন্যরকম দেখাচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল, “প্রমিজ কর, এই কথা কাউকে বলবি না। কাকপক্ষীও যেন না জানে কখনো।”
অরু থতমত খেয়ে গেল। মেঘের গম্ভীর চেহারা দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, প্রমিজ। এবার বল।”
মেঘ চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। “জানিস, কাল রাতে আমি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছি, হুট করে দেখি আবির ভাই পার্টি থেকে ফিরল।”
অরু অধৈর্য হয়ে বলল, “হ্যাঁ, তারপর? ফিরেছে তো ভালো কথা।”
মেঘ চোখ বড় বড় করে বলল, “আরে না, ফেরার ভঙ্গিটা দেখতিস যদি! মানুষ ওভাবে হাঁটে না। কেমন যেন হেলেদুলে টালমাটাল হয়ে হাঁটছিল। সিঁড়িতে ওঠার সময় ধপ করে পড়ে গেল। আমি তখনই বুঝলাম উনি ড্রিংকস করে…”
মেঘের কথা শেষ হওয়ার আগেই অরু তার হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। অবিশ্বাস। অরু চিৎকার করে উঠল, “ওয়েট, ওয়েট! তুই কী আবল-তাবল বকছিস মেঘ? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? আমাদের আবির ভাই ড্রিংকস করবে? আর ইউ ম্যাড?”
মেঘ অবাক হয়ে অরুর দিকে তাকাল। অরুর ফর্সা মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার অতি চেনা আবির ভাই এমন কিছু করতে পারেন। মেঘ কিছুটা রহস্যময় হাসি হাসল। চোখের মণি দুটো নাচিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী রে, তোর কি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?”
অরু কড়া গলায় উত্তর দিল, “একদমই না। আবির ভাই ড্রিংকস করতেই পারে না। আর অতি উন্নতমানের যুক্তি যদি মেনেও নিই যে তিনি সামান্য ড্রিংকস করেছেন, তাহলেও মাতাল হয়ে সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার মতো মানুষ তিনি নন। তোর নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। হয়তো অন্ধকারের বিভ্রান্তিতে তুই অন্য কিছু দেখেছিস।”
মেঘ গম্ভীর হলো। সত্য যখন তেতো হয়, মানুষ তখন যুক্তি দিয়ে তাকে মিষ্টি করার চেষ্টা করে। মেঘ বলল, “আমার কোনো ভুল হচ্ছে না, অরু। তুই চাইলে সাদিফ ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারিস। কাল রাতে সাদিফ ভাইয়াই ওনাকে ধরে ধরে রুমে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
অরু এবার একটু থমকাল। তার চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। সাদিফের নাম আসাতে যুক্তির তরীটা যেন একটু টলমল করে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, “আচ্ছা, দেখছি আমি। সাদিফ ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলেই সব বেরিয়ে আসবে। চল এখন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘণ্টার শব্দ অনেক আগেই পেয়েছি। প্রফেসর বোধহয় ক্লাসে ঢুকে গেছেন।”
দুজনেই ছুটতে শুরু করল। করিডোর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তাদের হাঁপ ধরে গেল। ক্লাসের দরজায় যখন পৌঁছাল, তখন দেখা গেল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। ক্লাস শুরু তো হয়েছেই,প্রেজেন্ট ডাকাও শেষ। মেঘ দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁটুতে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “মে উই কাম ইন, স্যার?”
ভেতর থেকে একজন দীর্ঘদেহী মানুষ ঘুরে তাকালেন। প্রফেসরের চশমার ফ্রেমটা বেশ মোটা। তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই তরুণীর দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি ল্যাবরেটরিতে নতুন কোনো প্রজাতির খরগোশ দেখছেন। ধবধবে সাদা দুটো খরগোশ ভয়ে কাঁপছে। অরুর ভ্রু কুঁচকে গেল। এই প্রফেসরকে তো সে আগে দেখেনি। গতকালও কলেজে ছিল না। হয়তো শিডিউল অদলবদল হয়েছে, নয়তো নতুন কেউ জয়েন করেছেন। লোকটার চাহনি বেশ অতভূত। অরু আর মেঘের গা শিউরে ওঠল। মেঘের ফরসা কান দুটো লাল হয়ে গেল যখন প্রফেসর কর্কশ গলায় বললেন, “নো! ইউ আর ভেরি লেট।”
অরু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রফেসর তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আজকের জন্য তোমাদের শাস্তি হলো এই পুরো পিরিয়ডটা এক্সিট ডোরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। দ্বিতীয় ক্লাসে তোমরা ঢুকতে পারবে, তবে আজ তোমাদের প্রেজেন্ট নেওয়া হবে না। যাও, দাঁড়িয়ে থাকো।”
অরু আর মেঘ একে অপরের দিকে তাকাল। করার কিছু নেই। নিয়ম বড় বালাই। মেঘের মানিব্যাগের কথাটা আর বলা হলো না। কথাটা বলতে গিয়েও জিভের ডগায় এসে আটকে গেল। থাকুক। সব কথা সবাইকে বলতে নেই। আবির ভাইয়ের মানিব্যাগে মেঘের ছবি এই দুর্ধর্ষ তথ্য অরু শুনলে নির্ঘাত হাসবে। অরু মেয়েটা অদ্ভুত। সে সহজ কথা বিশ্বাস করে না, আবার অতি জটিল কথা খুব সহজে বিশ্বাস করে ফেলে। মানুষের মন আসলে আশ্চর্য গোলকধাঁধা। যা সে দেখে, তা সে বিশ্বাস করে না; আবার যা দেখে না, তার পেছনেই সে ছুটে মরে। মহাপুরুষরা হয়তো এই কারণেই বলে গেছেন— জগতটাই মায়া।
খান বাড়িতে তখন দুপুরের রোদ ঝিমিয়ে পড়েছে। চরাচরে আলস নিস্তব্ধতা। আবিরের রুমের দরজায় কেউ টোকা দেয়নি। বাড়িতে মেহমান নেই, হইচই নেই। সবাই জানে আবির ঘুমাচ্ছে। আবিরের ঘুম ভাঙল রায়হানের ফোনে। রায়হান একা নয়, জায়ান আর তূর্য মিলে ফোনের ওপাশ থেকে রীতিমতো একটা ছোটখাটো ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছে। আবির ঘুমের ঘোরে হাতড়ে হাতড়ে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা নিল। গলাটা বুজে এসেছে, যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোনো অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি।
“হুম, বল?”
রায়হানের গলায় এক পৃথিবী উৎকণ্ঠা। সে চিৎকার করে বলল, “কী রে ইয়ার? সেই কখন থেকে ফোন করছি! ফোন তুলছিস না কেন?”
আবির হাই তুলে বলল, “ঘুমাচ্ছিলাম।”
“তোর জ্বর কমেছে?”
কথাটা শুনেই আবিরের তন্দ্রা উবে গেল। সে ধড়ফড় করে উঠে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসল। শরীরের হাড়গোড় মনে হচ্ছে কেউ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। কপালে হাত না দিয়েই সে উত্তাপ টের পাচ্ছিল। শান্ত গলায় বলল, “নাহ, সারেনি। মনে হচ্ছে উল্টো বাড়ছে।”
“আন্টিকে জানিয়েছিস? ওষুধ খেয়েছিস কিছু?”
“না, দরকার নেই। বাড়িতে জানলে সবাই হুলুস্থুল শুরু করবে। আমি নিজেই খেয়ে নেব।”
রায়হান ধমক দিয়ে বলল, “রাখ তোর নিজের খাওয়া! আমি আসছি এক্ষুনি। তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”
ফোনটা কেটে গেল। আবির ফোনটা রেখে নিজের দিকে তাকাল। শরীরটা পুড়ছে। হঠাৎ আবিরের নজর গেল নিজের পরনের নেভি ব্লু শার্টের ওপর। আর ঠিক তখনই তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন একটা ‘বিট’ মিস করল। চোখের পাতা কচলে সে আবার তাকাল। এটা সে কী দেখছে?
শার্টের হাতায় আর বুকের কাছে স্পষ্ট মেহেদীর লালচে ছাপ। জ্বরের ঘোরে সে হয়তো ভুল দেখছে। কিন্তু না, দাগগুলো সত্য। গতরাতের পার্টিতে জ্বর যখন তাকে প্রথম অ্যাটাক করল, তখন তার জ্ঞানবুদ্ধি সব লোপ পেয়েছিল। কীভাবে বাড়ি ফিরেছে, তার বিন্দুবিসর্গও মনে নেই। কিন্তু এই মেহেদী কোত্থেকে এল? পার্টিতে তো কেউ মেহেদী পরে নাচানাচি করার কথা নয়। সে কি ভুল করে কারো মেহেদী রাঙানো হাত চেপে ধরেছিল? নাকি অন্য কিছু? আবির ঘাম ঘামছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রায়হান, জায়ান আর তূর্য দলবল নিয়ে খান বাড়িতে এসে হাজির। বড় আম্মু ওদের দেখেই আকাশ থেকে পড়লেন।
যখন শুনলেন আবিরের গায়ে প্রচণ্ড জ্বর, তখন তার অবস্থা দেখার মতো হলো। আবিরের জ্বর আসা মানে এই বাড়িতে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি হওয়া। বড় আম্মু প্রায় কাঁদতে কাঁদতে আবিরের রুমে ঢুকলেন। বড় আম্মুর চোখে পানি মানেই হিমালয় গলে যাওয়া সবার নিকট। তিনি শাসনের স্বরে বললেন, “সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তুই এই বাড়ির দরজা পার হবি না। একদম না!”
আবির ভাই পর্ব ১০
মেঝো আম্মু ততক্ষণে গরম গরম সুপ বানিয়ে নিয়ে হাজির। পুরো বাড়ি এখন আবিরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। বড় আম্মু পাশে বসে ছেলের সেবা করছেন। আবির বিছানায় শুয়ে চোখ বুঁজে আছে। শরীর জ্বরে পুড়ছে, অথচ তার সমস্ত চেতনা পড়ে আছে শার্টের ওই মেহেদীর দাগে। গত রাতে কী ঘটেছিল? কোনো এক রহস্যময়ী কি তার জীবনে প্রবেশ করেছে? নাকি সে নিজেই কোনো গোলমেলে ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে? জ্বরের ঘোরে মানুষ অনেক কিছু করে, কিন্তু মেহেদীর দাগ তো আর স্বপ্ন নয়। এটা তো বাস্তব। আর এই বাস্তবতাই আবিরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত আবির জানতে না পারছে এই মেহেদীর দাগ কোথা থেকে এলো এবং কার
