Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ১২

আবির ভাই পর্ব ১২

আবির ভাই পর্ব ১২
উর্মিলা মজুমদার

অক্টোবর মাস। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার কথা নয়? কিন্তু প্রকৃতি এখন আর ক্যালেন্ডার মেনে চলে না। দুপুরবেলাতেই চারিদিক অন্ধকার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। জানলার বাইরে তাকালে মনে হয় না এটা দুপুর, বরং মনে হয় কোনো বিষণ্ন গোধূলি কিংবা ঘোর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। জগতসংসার ঝাপসা হয়ে গেছে। খান বাড়িতে হইহই করে ঢুকল অরু আর মেঘ। সাদিফ ওদের নিয়ে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে বারান্দাটুকু পার হতে গিয়েই মেয়ে দুটো কাকভেজা হয়ে গেল।

সাদিফ বড় শান্ত স্বভাবের ছেলে। সে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পকেট থেকে টিস্যু বের করে মুখ মুছতে লাগল। তার চোখেমুখে কোনো বিকার নেই। রাহেলা আন্টি কোথা থেকে একটা তোয়ালে নিয়ে এলেন। মেঘ সেই তোয়ালে দিয়ে নিজের ভিজে চুল মুছছে। অরুর মাথায় তখন অন্য চিন্তা। সে একটু উসখুস করে সাদিফের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গলাটা একটু নামিয়ে বলল, “সাদিফ ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
সাদিফ ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “হুম, বল।”
অরু একটু ইতস্তত করে বলল, “মেঘ বলল আবির ভাই নাকি কাল রাতে ড্রিংক করে বাড়ি ফিরেছে। টলছিল। কথাটা কি সত্যি? আমার কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।”

সাদিফ ফোনটা অফ করে অরুর দিকে তাকাল। তার গলায় নির্লিপ্ততা। সে বলল, “যার কাছ থেকে শুনেছিস তার ওপর বিশ্বাস রাখাটা মনেহয় না তোর বোকামি হয়েছে। আবির ভাইয়ের প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। জ্বরের ঘোরে মানুষ টলে, আবির ভাইও টলছিলেন। তিনি মাতাল ছিলেন না, ছিলেন অসুস্থ।”
কথাটা শোনামাত্র মেঘের হাতের তোয়ালে থেমে গেল। বাতাসের আর্দ্রতা যেন হুট করে বেড়ে গেছে। বুকটা কেমন ঢিপঢিপ করছে তার। আবির ভাইয়ের জ্বর? কিন্তু তাতে তার কী? মানুষ তো অসুস্থ হতেই পারে। কিন্তু মেঘের মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন একটা ভারি পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল।
অরু হঠাৎ সপাটে একটা চিৎকার দিল, “এই মেঘ! শুনছিস? কোথায় হারিয়ে গেলি? কতক্ষণ ধরে ডাকছি!”
মেঘ চমকে উঠে বলল, “ওহ হ..হ্যাঁ, বল।”
অরু হাসতে হাসতে বলল, “দেখেছিস? আমি বলেছিলাম না তোর কোথাও ভুল হচ্ছে? একটা অসুস্থ মানুষকে তুই কি না বানিয়ে দিলি মাতাল! তুই পারিসও বটে।” অরু হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। মেঘ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো।

বিকেলে বৃষ্টির বেগ কমে এল, কিন্তু মেঘের মনের মেঘ কাটল না। সে গোসল সেরে রুমে বসে রইল। দুপুরে খাওয়ার রুচি হলো না। মনটা কেবলই উসখুস করছে একবার কি আবির ভাইকে দেখে আসা যায় না? কিন্তু উপায় নেই। আবির ভাইয়ের ঘরে ঢুকতে গেলে অনুমতির দেয়াল টপকাতে হবে। তার ওপর বড় আম্মু সারাক্ষণ সেখানে বসে আছেন।
সন্ধ্যা নামল নীলচে অন্ধকার নিয়ে। অরু পড়তে এল মেঘের রুমে। মেঘ চুপচাপ বই খুলে বসে রইল, কিন্তু একটা অক্ষরও তার মস্তিষ্কে ঢুকল না। অরু দু-একবার কিছু জিজ্ঞেস করল, মেঘ অস্পষ্ট স্বরে কী যেন উত্তর দিল। অরু বুঝল মেঘের আজ “মুড” নেই, তাই সে আর বিরক্ত করল না। রাত বাড়ল। খান বাড়ির বাতিগুলো একে একে নিভে গেল। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু মেঘ জেগে। জানলার বাইরে এখনো ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। আবির ভাইয়ের জ্বরের তপ্ত কপালটা একবার ছুঁয়ে দেখার প্রবল ইচ্ছা তাকে অস্থির করে তুলছে। যদি দেয়াল টপকে বা ছাদ দিয়ে কোনো অলৌকিক উপায়ে সেই ঘরে চলে যাওয়া যেত! আজ রাতে বই পড়তেও ভালো লাগছে না।

আকাশ চিড়ে বৃষ্টি নামল। একেই বোধহয় বলে শ্রাবণের ধারা। বৃষ্টির কোনো নিয়মকানুন নেই, যখন-তখন যার-তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। মেঘ বারান্দায় বসে ছিল, কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটায় তার শখের মেঘলা ভাবটা বেশিক্ষণ টিকল না। সে দৌড়েই রুমে ঢুকল। প্রকৃতি মাঝে মাঝে মানুষকে বড় অসহায় করে দেয়। দেয়াল ঘড়িটা আজ বড় বেশি কথা বলছে। ‘টিকটিক’ শব্দটা নিস্তব্ধ রাতে যেন ড্রাম পিটানোর মতো শোনাচ্ছে। সময় বয়ে যাচ্ছে, অথচ মেঘের সময় যেন শ্লথ হয়ে আছে এক জায়গায়। সে তার ওড়নাটা মাথায় ভালো করে পেঁচিয়ে নিল। নিজেকে একটু আড়াল করার চেষ্টা।

মধ্যরাত। চারপাশ নিঝুম। শুধু বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর ব্যাঙের ডাক। মেঘ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এল। তার গন্তব্য আবির ভাইয়ের ঘর। সেখানে ঢোকা কঠোরভাবে নিষেধ, অনেকটা নিষিদ্ধ পল্লীর মতো। কিন্তু নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই মানুষের আজন্ম তৃষ্ণা। মেঘের বুকটা ধড়ফড় করছে। হৃদপিণ্ডটা যেন কোনো একটা ড্রামসেটের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজছে। সে আস্তে করে আবির ভাইয়ের রুমের দরজায় হাত রাখল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। ভেতরটা অন্ধকার নয়, আবার আলো ঝলমলেও নয়। সাইড টেবিলের ওপর একটা টিমটিমে হলুদ ল্যাম্প জ্বলছে। মেঘ ঢোক গিলল। আবির ভাই কি ঘুমাচ্ছেন? ওষুধে তো কড়া ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল। ঘুমের ওষুধের নীল রঙের বড়িটা কি কাজ করেনি? নাকি আবির ভাইয়ের স্নায়ু বড়িটার চেয়েও বেশি শক্তিশালী? মেঘ পা টিপে টিপে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আবির ভাই বাম কাত হয়ে শুয়ে আছেন। চোখ দু’টো বন্ধ। নিশ্বাস পড়ছে ধীরলয়ে। পরনে অফ-হোয়াইট রঙের একটা গেঞ্জি। গালে কয়েক দিনের না-কাটা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মেঘ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। মানুষটা ঘুমালে কত শান্ত দেখায়! যেন কোনো এক মহাপুরুষের প্রতিচ্ছবি। মেঘের খুব জানতে ইচ্ছে হলো আবির ভাইয়ের গায়ের জ্বরটা কি কমেছে? মেঘ খুব সাবধানে, ভীরু পায়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল আবির ভাইয়ের কপালের দিকে। তার হাত কাঁপছে। বুকটা থরথর করে লাফাচ্ছে। কিন্তু কপাল ছোঁয়ার ঠিক এক ইঞ্চি আগে পৃথিবীটা উল্টে গেল! আবির ভাই খপ করে মেঘের হাতটা ধরে ফেললেন। খুব শক্ত মুঠি। মেঘের মনে হলো তার আত্মাটা শরীর ছেড়ে জানালার গ্রিল দিয়ে বাইরে বৃষ্টির মধ্যে পালিয়ে গেছে। এ কীভাবে সম্ভব? তিনি কি জেগে ছিলেন? নাকি মানুষের স্পর্শ পাওয়ার আগেই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গিয়েছিল? মেঘের গলার ভেতর দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল। তার বড় বড় চোখে অজানিত ভয়। অন্ধকার ফুঁড়ে মেঘের নিচু কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “আবির ভাই, আপনি জে..জেগে আছেন?”

আবির ভাই ওই অবস্থাতেই নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিলেন, “তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি মেঘ। ?”
মেঘ একটু থতমত খেল। গলার স্বরে কাঁপুনি। ও বলল, “কে… কেন? আমি তো স্রেফ দেখতে এসেছিলাম আপনি ঘুমিয়েছেন কি না।”
আবির এবার একগাল হাসল। বলল, “ও আচ্ছা, তাই! তুই তবে মাঝরাতে আমাকে দেখতে এসেছিস?”
মেঘ নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। একটু জোর দিয়ে বলল, “উঁহু, আমি কেন আপনাকে দেখতে আসব? বড় আম্মু বললেন আপনার রুমের জানালাগুলো খোলা কি না দেখে আসতে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে তো, তাই এলাম। জানালা লাগানো কি না দেখা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।”
আবির এবার আর শুয়ে থাকতে পারল না। ধপ করে বিছানায় উঠে বসে বেডের ড্যাশবোর্ডে হেলান দিল। মেঘ তখনই জানালার দিকে এগোতে যাচ্ছিল। আবির খপ করে মেঘের হাতটা ধরল। মেঘ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। আবির ওর হাতটা নিজের সামনে টেনে আনল। রুমটা অন্ধকার হলেও জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রোশনাইে ধরা পড়ল মেঘের হাত ভর্তি টকটকে লাল মেহেদী। আবিরের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। গতরাতে আবির ভাইয়ের শার্টে মেহেদীর দাগ লেগেছিল। আজ সারাদিন ভেবেছে এই দাগটা কার? কে এমন করে তার শার্টে দাগ বসিয়ে দিল?
মেঘের এই মেহেদী রাঙা হাত দেখেই রহস্যের পর্দা খুলে গেল। তারমানে কালকের সেই দাগটা অন্য কারো নয়, ছিল মেঘের।

মেঘ চমকে উঠল। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো মেয়েটা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আবিরের আঙুলগুলো লোহার শলাকার মতো তার কবজি চেপে ধরেছে। মেঘের চোখ গেল আবির ভাইয়ের মুখের দিকে। মানুষটার মুখভঙ্গি পলকেই বদলে গেছে। মূর্তির মতো স্থির, অথচ সেখানে আগ্নেয়গিরির উত্তাপ অবিচল। যন্ত্রণায় তার মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বেরুতেই আবির ঝটকা দিয়ে হাতটা ছেড়ে দিল। মানুষটার চোখেমুখে এখন উন্মাদের আভা। আবির খড়খড়ে গলায় বলল, “কাল রাতে তুই আমার রুমে ঢুকেছিলি?”
মেঘ কুঁকড়ে গেল। সে নিতান্তই সাধারণ, আটপৌরে মেয়ে। মিথ্যে বলার কৌশল তার জানা নেই। মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল, “না তো আবির ভাই, আমি আপনার রুমে যাইনি।”
আবিরের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল, “মিথ্যে বলছিস কেন? আমার শার্টের হাতায় তোর হাতের কাঁচা মেহেদির দাগ এল কোত্থেকে? আকাশ থেকে পড়েছে?”
মেঘের বুক ধক করে উঠল। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তার চোখের মণি ছোট হয়ে এল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আসলে… কাল রাতে আপনি যখন ফিরলেন, তখন আপনার খুব জ্বর ছিল। আপনি ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। সিঁড়িতে পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন আমি আপনাকে ধরতে গিয়ে…”
“থাম! আমি আমি করছিস কেন? পরিষ্কার করে বল কী হয়েছে?” আবিরের ধমকে মেঘ থরথর করে কেঁপে উঠল।

“ওই তো… আপনাকে সিঁড়ি থেকে তুলতে গিয়ে হাতে লেগে থাকা কাঁচা মেহেদি আপনার শার্টে লেগে গিয়েছিল। ব্যস, এটুকুই।”
বলেই মেঘ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। একটা ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে তীরের মতো রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আবির কিছুক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে রুমের সবকটা আলো জ্বেলে দিল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবির নিজের গেঞ্জির কলার সরালো। ঘাড়, গলা, বুক সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। না, কোথাও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দাগ নেই। আবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল টিপে ধরল। বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল, “মেঘ, তোকে বারণ করেছিলাম আমি সজ্ঞানে থাকা অবস্থায় আমার কাছে আসবি না। তুই আমার দুর্বলতার সুযোগ নিলি? কাজটা তুই একদম ভালো করলি না।”
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল আবির। রাতের আকাশটা কেমন থমথমে। সে আবার বিড়বিড় করল, “কেন বারবার আমার অবাধ্য হচ্ছিস? আমি তো ক্রমেই উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি। আমি যখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারাব, তখন আমাকে সামলাবে কে? তুই?”

মেঘ তার রুমে ঢুকে দরজা লক করে দিল। বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। কলতলায় কেউ যেন পাথর ঘষছে, বুকের ভেতরে ঠিক তেমন একটা শব্দ হচ্ছে। মেঘ কিছুক্ষণ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রুম অন্ধকার। নিজের ওপর তীব্র বিরক্তি লাগল মেঘের। সে এতোটা অবুঝ হলো কীভাবে? কাল রাতে যখন সে আবির ভাইকে আগলে ধরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে তুলছিল, তখন কি একবারও মনে হয়নি যে তার হাতের কাঁচা মেহেদির রঙ ওই শার্টে মাখামাখি হয়ে যাবে? কিন্তু তখন তো মাথায় এসব ছিল না। তখন ছিল শুধু মানুষটার কপাল পোড়ানো জ্বর আর তার অসংলগ্ন বিড়বিড়ানি। বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল মেঘ। জানালার বাইরে এক ফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। মেঘের মনে হলো, আবির ভাইয়ের স্পর্শটা এখনো তার কবজিতে লেগে আছে। কেমন যেন তপ্ত ছোঁয়া! মানুষটা তাকে ঘৃণা করে, না কি ভয় পায়? না কি অবাধ্য হওয়ার জন্য শাস্তি দিতে চায়? তার শরীরের ভেতরেও ঝড় বয়ে যাচ্ছে, যে ঝড়ের কোনো নাম নেই। তবে একটা স্বস্তি—মানুষটার জ্বরটা অন্তত কমেছে। হঠাৎ মেঘের মেরুদণ্ড তপ্ত হয়ে গেল। রুমের দেয়ালে একটা ছায়া নড়ল না? ঠিক বারান্দার দিক থেকে একটা দীর্ঘ ছায়া যেন মেঝেতে পড়ে আবার মিলিয়ে গেল। মেঘের হৃদপিণ্ড মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে আবার দ্বিগুণ বেগে ছুটতে শুরু করল।
সে কি ভুল দেখল? নাকি ওই উন্মাদের মতো মানুষটা তাকে অনুসরণ করে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে? মেঘ তড়িৎ গতিতে উঠে গিয়ে বারান্দার দরজাটা টেনে খুলল। বাইরে নিস্তব্ধতা। কামিনী ফুলের হালকা গন্ধ বাতাসে ভাসছে, আর কিচ্ছু নেই। কোনো ছায়া নেই, কোনো মানুষ নেই। ঝিরঝির বৃষ্টির রাত তার ডালপালা মেলে বসে আছে।

“ভ্রান্তি! সব আমার মনের ভুল,” মেঘ বিড়বিড় করে নিজেকে সান্ত্বনা দিল। কিন্তু তার মন মানল না। মনের গহীনে কোথাও একটা ভয় জাঁকিয়ে বসেছে। সে দ্রুত বারান্দার কপাট আটকে দিয়ে ছিটকিনি তুলে দিল। সুইচ টিপে রুমের বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
|১৪|
সকালবেলাটা বেশ সুন্দর। বাড়ির সবাই মিলে নাস্তা সারছে বড় আব্বু খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে পাউরুটিতে জেলি মাখাচ্ছেন। এই গম্ভীর মানুষটাকে দেখলে কেন জানি না সবসময় হিমালয়ের পাদদেশের কোনো এক ঋষির কথা মনে পড়ে। হঠাৎ ত্বরিত বেগে অরু এসে মেঘের পাশের চেয়ারটা দখল করল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাথায় কোনো এক বিচিত্র ফন্দি কাজ করছে। আবির ভাই আর মেজো আব্বু বাড়িতে নেই, তারা গিয়েছেন রাঙামাটি। সেখানে নাকি একটা রিসোর্ট হবে। জল আর পাহাড়ের মিতালিতে কী এক রাজকীয় ব্যাপার-স্যাপার! ডিলারের সাথে কথা বলতে গিয়েছেন তারা।
অরু এক চুমুক চা খেয়ে বেশ সাহসের সাথে বড় আব্বুর দিকে তাকিয়ে বলল, “বড় আব্বু, কলেজে তো উঠলাম। এখন আমাদের একটা কোচিং দরকার।”

বড় আব্বু চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন। নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন, “কোচিং কেন? ভালো কোনো হোম টিউটর রেখে দিলেই তো হয়।”
মেঘ আর অরু মুহূর্তের জন্য একে অপরের চোখের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে কী ছিল তা কেবল ওরাই জানে। মেঘ শান্ত গলায় বলল, “না বড় আব্বু, আমরা কোচিং-ই করব। বাইরের জগতের সাথে একটু পরিচয় হওয়া দরকার।”
বড় আব্বু আর দ্বিমত করলেন না। শুধু বললেন, “ঠিক আছে, তাই হবে।”
আজ শুক্রবার। চারদিকে বৃষ্টির গন্ধ মাখামাখি হয়ে আছে। মেঘমুক্ত আকাশ, রোদের রঙ যেন কাঁচা সোনার মতো। প্রেমা আপুর ঘরে লুডু খেলা চলছে। মেঘ আজ বেশ ফর্মে আছে, পরপর দুবার সে অরুকে হারিয়ে দিল। অরুর মুখটা তখন দেখার মতো হয়েছিল। খেলা শেষে ওরা দুজন ছাদে গেল। দখিনা বাতাসে মেঘের চুল উড়ছে। অরু হঠাৎ মেঘের একটা ফর্সা হাত খপ করে ধরে ফেলল। চোখে দুষ্টুমি ভরা মেয়েটার। অরু ফিসফিস করে বলল, “মেঘ, চল আজ আবার আবির ভাইয়ের রুমে হামলা চালাই। রুমে তো কেউ নেই, উনি এখন রাঙামাটি আছেন।”

মেঘ চমকে উঠল। কাঁপা গলায় বলল, “না অরু, অসম্ভব! তুই কি ভুলে গেছিস সেদিনের কথা? তোকে তো কিছু বলেনি, কিন্তু আমাকে ডেকে নিয়ে যে ধমকটা দিয়েছিল! আমি আর ওই আগুনে হাত দিতে চাই না।”
অরু খিলখিল করে হেসে উঠল। সে মেঘের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় গলায় আওড়াল, “তুই এতো ভীতু কেন মেঘ? আবির ভাই রাগী হতে পারে, কিন্তু মানুষটা এতোটা রুড নয়। চল তে।”

আবির ভাই পর্ব ১১

মেঘ বড় বড় চোখে অরুর দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষের চোখ নাকি মনের আয়না, কিন্তু মেঘের চোখে এখন একরাশ দ্বিধা আর ভয়। সে মনে মনে ভাবছে, এই মেয়েটা কি পাগল? নাকি পাগলামিটাই ওর স্বভাব? বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করার পর মেঘ অবশেষে রাজি হলো। হয়তো নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের যে আদিম আকর্ষণ, সেই আকর্ষণই তাকে টেনে নিয়ে চলল। ওরা দুজনে গুটিগুটি পায়ে এগোল আবির ভাইয়ের রুমের দিকে।

আবির ভাই পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here