আবির ভাই পর্ব ১৩
উর্মিলা মজুমদার
মেঘ বড় বড় চোখে অরুর দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষের চোখ নাকি মনের আয়না, কিন্তু মেঘের চোখে এখন একরাশ দ্বিধা আর ভয়। সে মনে মনে ভাবছে, এই মেয়েটা কি পাগল? নাকি পাগলামিটাই ওর স্বভাব? বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করার পর মেঘ অবশেষে রাজি হলো। হয়তো নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের যে আদিম আকর্ষণ, সেই আকর্ষণই তাকে টেনে নিয়ে চলল। ওরা দুজনে গুটিগুটি পায়ে এগোল আবির ভাইয়ের রুমের দিকে।
করিডোরটা এখন জনশূন্য। দুপুরের তপ্ত রোদ জানলার গ্রিল গলে মেঝেতে আল্পনা এঁকেছে। মেঘের মনে হচ্ছে ওর বুকের ভেতর কেউ একজন অবিরাম হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছে। সেই রাতের স্মৃতিটা এখনো ওর মনের কোণে টাটকা ক্ষতের মতো লেগে আছে। বড় ভয়ংকর সেই স্মৃতি! দরজার সামনে আসতেই মেঘের পা থমকে গেল। কিন্তু অরু দমবার পাত্র নয়। সে দরজাটা খুলে মেঘকে একরকম হ্যাঁচকা টানে ভেতরে নিয়ে গেল।
ভেতরে ঢুকতেই মেঘের দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। একেই কি বলে ‘অ্যাটাক অফ প্যানিক’? ওর আত্মাটা খাঁচাবন্দি পাখির মতো ছটফট করছে। কিন্তু পরক্ষণেই প্রশান্তিতে ওর চোখ জুড়িয়ে দিল। আবির ভাইয়ের রুচি আছে মানতেই হয়। রুমের দেয়াল থেকে শুরু করে বিশাল খাট, বিছানার চাদর, এমনকি জানলার পর্দাগুলো পর্যন্ত ধবধবে সাদা। মেঘের নিজেরও সাদা রঙ ভীষণ প্রিয়। হঠাৎ মেঘের মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা। আবির ভাই যখন ঠিক এই রুমেই ওকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলেন। সেই মুহূর্তের কথা মনে হতেই মেঘের ঠোঁটে চিলতে হাসি ফুটল। মানুষের মন বড় বিচিত্র; যে স্মৃতি তাকে ভয় পাইয়ে দেয়, সেই স্মৃতির রোমন্থনেই আবার সে আনমনে হাসে।
অরু তখন সাইড টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের বয়াম থেকে কাজু বাদাম বের করতে ব্যস্ত। সেদিকে তাকিয়ে না থেকেই অরু বলে উঠল, “কীরে মেঘ, হাসছিস কেন? ভয় পেয়ে কি মাথাটা পুরোই গেল?”
অরুর গলায় রাজ্যের বিরক্তি। মেঘ হাসছে কেন সেটা ওকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব না। কিছু কিছু হাসি ব্যাখ্যার অতীত। অরুর কথা শুনে মেঘের হাসিটা মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল। মেঘ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “নাহ! কিছু না।”
মেঘ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল কোথায় কী আছে। সাইড টেবিলের ড্রয়ার টান দিল। মানুষ সাধারণত অতি গোপন জিনিস ড্রয়ারেই লুকিয়ে রাখে। কিন্তু আবির ভাই কি সাধারণ মানুষ? নাহ, সেখানে দেখার মতো কিছু নেই।
হঠাৎ করেই মেঘের হাত চলে গেল বিশাল আলমারিটার দিকে। পাল্লা খুলতেই চোখে পড়ল সারি সারি ইস্ত্রি করা দামি শার্ট আর ব্লেজার। কিন্তু মেঘের নজর সেদিকে টিকল না। আলমারির এক কোণে রাখা একটা পারফিউমের বোতল যেন ওকে ডাকছে। বোতলের গায়ে মাঝারি অক্ষরে লেখা— ‘শিসেইডো: দ্য গিঞ্জা’।
মেঘ বোতলটা হাতে নিল। ঢাকনা খুলে সামান্য একটু ঘ্রাণ নিতেই ওর বুকটা হু হু করে উঠল। কী তীব্র একটা সুগন্ধ! মেঘের স্পষ্ট মনে পড়ল, আবির ভাই যখন সামনে এসে দাঁড়ান, ঠিক এই ঘ্রাণটাই চারপাশ ম ম করে। মনে হলো আবির ভাই ঠিক এই মুহূর্তেই ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মানুষের গন্ধ চেনার ক্ষমতা বড় অদ্ভুত। এক নিমেষেই তা মানুষকে স্মৃতির অলিগলিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মেঘ আর দ্বিধা করল না। পারফিউমের বোতলটা আলমারি থেকে সরিয়ে নিজের কাছে নিয়ে নিল। মেঘ অরুকে তাড়া দিয়ে বলল, “চল, বের হই।”
ওরা সবকিছু আগের মতো গুছিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। মেঘের বুকের ভেতর একটা ড্রাম বাজছে দুমদুম! মেঘ জানে আবির ভাই অতিশয় ভুলোমনা মানুষ। হাজারটা পারফিউমের ভিড়ে এই একটা বোতলের কথা তাঁর কিছুতেই মনে থাকার কথা নয়। নিজের রুমে ফিরে অতি সন্তর্পণে পারসোনাল ড্রয়ারের একদম পেছনের কোণে বোতলটা লুকিয়ে রাখল মেঘ। বুকের ঢিপঢিপ একটু কমল বোধহয়।
আশ্বিনের শেষে অক্টোবর এসেও বৃষ্টির গতিবেগ কমেনি। একেই বোধহয় বলে ‘আশ্বিনে ঝড়’। মাঝদুপুরে আকাশ চিরে মেঘের ডাক শুরু হলো। সে কী শব্দ, যেন কোনো বিশাল দৈত্য গুড়গুড় করে তামাক টানছে। মেঘ তন্দ্রার ভেতর ছিল। হঠাৎ মনে হলো রুমের ভেতর কারো অস্তিত্ব। মশারির বাইরে একটা ছায়া কি নড়ে উঠল? মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকে, তখন তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুব সজাগ হয়ে যায়। মেঘেরও হলো। মেঘ চোখ মেলে তাকাল। জানালার বাইরে আকাশ অন্ধকার, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমকানিতে চারপাশ সাদা হয়ে যাচ্ছে।
মেঘের কেন যেন মনে হলো, এই কাজটা অরুর। অরু মেয়েটা বজ্জাত কিসিমের। চুপিচুপি অন্যের রুমে ঢুকে ভয় দেখানো তার পুরনো স্বভাব। মেঘ ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠল। বৃষ্টির ছাঁট আসছে খোলা জানালা দিয়ে। শরীরটা শিরশির করে উঠল।
মেঘ আর দেরি করল না। পা টিপে টিপে অরুর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অরু অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বাইরে প্রকৃতি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে আর সে কী নিশ্চিন্তে ঘুম! মেঘ ওর মশারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অন্ধকারেই ডাকল, “এই অরু, ওঠ।”
অরু পাশ ফিরল। ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত স্বরে বলল, “উহুম, মেঘ ডাকিস না তো। যা এখান থেকে।”
মেঘ ওর মশারির এক কোণা তুলে বলল, “শোন অরু, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে দেখেছিস? চল, দুইজনে মিলে কিছুক্ষণ ভিজি। ভেজার পর গরম পানিতে ডুব দিয়ে গোসল করব। কী আনন্দ হবে বল তো!”
অরু এবার চোখ না মেলেই বালিশে মুখ গুঁজল। খুবই নিরুত্তাপ গলায় বলল, “তোর ওই কবিত্ব এখন রাখ। আমি এখন কোথাও যাব না। মাঝ দুপুরে বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়া বাঁধানোর কোনো শখ আমার নেই। তুই গিয়ে ভিজ। আমাকে বিরক্ত করিস না তো।”
মেঘ জানালার দিকে তাকাল। অরু বুঝতে পারছে না সে কী মিস করছে। বৃষ্টির নিজস্ব ভাষা বোঝার জন্য মনটাকে একটু উদাসীন করতে হয়। অরু বড্ড বেশি বাস্তববাদী হয়ে যাচ্ছে। মায়াবতী হওয়ার লক্ষণ তার মধ্যে আপাতত নেই। অরুর ওপর মেঘের রাগ হলো না। মেঘ পা টিপে টিপে রুম থেকে বেরিয়ে এল। সোজা ছাদে। আকাশ এখন যেন দরিয়া হয়ে নেমেছে। অক্টোবর মাসের সেই মাদকতায় বুঁদ হয়ে মেঘ দু’হাত বাড়িয়ে দিল। তার কোনো পিছুটান নেই, কোনো অসুখের ভয় নেই।মেঘ এই বৃষ্টির তাল লয়ে নাচতে শুরু করল।
কোনো শেখা নাচ নয়, আদিম ছন্দে শরীরটাকে সঁপে দিলাম জলধারার কাছে। ঠিক সেই মুহূর্তে খান বাড়ির গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। রাঙামাটির পাহাড়ি ধুলো সঙ্গে নিয়ে আবির ভাই ফিরলেন। হাতে একটা কালো ছাতা। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে তিনি থমকে গেলেন। ওপরের দিকে তাকাতেই তার চোখের পলক আর পড়ছে না। ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে বৃষ্টির মধ্যে নাচছে। আবির ভাইয়ের বুকের ভেতর তখন কী যেন এক অলৌকিক ড্রাম বাজছে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল।
নিঃশ্বাসের গতি পর্যন্ত। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার পুরো পৃথিবীটা যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। তিনি দ্রুত কদম ফেলে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। নিজের রুমে যাওয়ার কথা তার মনেও এল না। পা জোড়া তাকে টেনে নিয়ে গেল ছাদের দিকে। সিঁড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন মেঘের সেই জল-নৃত্য। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখা বিপজ্জনক। হৃদপিণ্ড যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে গাঢ় স্বরে ডাকলেন, “মেঘ?”
নাচটা হঠাৎ থেমে গেল। মেঘ ঘুরে তাকাল। আবির ভাইকে দেখে সে চমকে উঠল। সেই কালান্তক রাতের পর আজই প্রথম দেখা। মেঘ কিছু বলল না, বলার মতো শব্দ তার ভাণ্ডারে নেই। সে মাথা নিচু করে ভেজা পোশাকে দ্রুত পায়ে আবির ভাইয়ের পাশ কাটিয়ে নেমে গেল। আবির ভাই নিজের রুমে ফিরে এলেন। তিনি শার্টের ওপরের কয়েকটা বোতাম ছিঁড়ে ফেলার ভঙ্গিতে খুললেন, কিন্তু পুরোপুরি পারলেন না। ধপ করে বসে পড়লেন বিছানায়। কপালে হাত চেপে ধরে সামলানোর চেষ্টা করলেন নিজেকে। অস্থিরতা কমানোর জন্য ড্রয়ার থেকে একটা সিগারেট বের করলেন। দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বলে ওঠল। তিনি খাটের ড্যাশবোর্ডে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। ঘন ঘন সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিতে লাগলেন। রাঙামাটি থেকে আসা দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি তাকে চেপে ধরেছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় এক ঘোর তাকে এখন আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ফ্রেশ হওয়ার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। তিনি বালিশটা জাপটে ধরে শুয়ে পড়লেন। অন্ধকারে চোখ বুজে থাকতেই মেঘ আবার ফিরে এল তার কল্পনায়। এক বৃষ্টিস্নাত মানবী তার পুরো অস্তিত্বকে তোলপাড় করে দিচ্ছে। আজ রাতে ঘুমের ভেতরেও তার কোনো নিস্তার নেই। সেখানেও যে মেঘ তার জলমগ্ন নৃত্য নিয়ে হানা দেবে।
পরদিন সকালে
খান বাড়িতে একটা উৎসব-উৎসব ভাব। চারদিকে একটা রণমূর্তি সাজসাজ রব। সবাই নাস্তা শেষ করার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছে। যেন এখনই নাস্তা না সারলে ট্রেন মিস হয়ে যাবে। এমন সময় বড়ো আব্বু ড্রয়িংরুমে উদয় হলেন। তার চোখেমুখে ব্যস্ততা। বড়ো আব্বু যখন ব্যস্ত থাকেন, তখন তাকে দেখে মনে হয় তিনি এই মুহূর্তেই পৃথিবীর কক্ষপথ বদলে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন। খাবার টেবিলে আবির ভাই বেশ আয়েশ করে পাউরুটিতে জেলি মাখাচ্ছিলেন। বড়ো আব্বু সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “আবির, রাঙামাটির প্রজেক্টের খবর কী? সব গুছিয়ে এনেছ?”
আবির ভাই ভাবলেশহীন মানুষ। তিনি জেলির স্তরটা নিখুঁত করার দিকেই বেশি মন দিলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “সবই তো রেডি। এখন শুধু সই-সাবুদ বাকি। ৬০০ কোটির প্রজেক্ট আব্বু, একদম ড্রিম প্রজেক্ট।”
৬০০ কোটি শব্দটা শুনেই মেঝো আব্বু চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। তার কপালে চিন্তার রেখা। তিনি বললেন, “সব তো বুঝলাম, কিন্তু নামটা কী হবে? রিসোর্ট তো বানাবে, তার একটা জুতসই নাম থাকা দরকার না?”
বড়ো আব্বু সায় দিলেন, “ঠিক বলেছ। আবির, রিসোর্টের নামটা তুই-ই ঠিক কর। পুরো দায়িত্ব যখন তোর, নামটাও তোর পছন্দেই হোক।”
আবির ভাই পাউরুটিতে কামড় দেওয়ার আগে খুব সংক্ষেপে বললেন, “এ.এম।”
পুরো ডাইনিং টেবিলে এক মুহূর্তের জন্য শ্মশান নীরবতা নেমে এলো। বড়ো আব্বু ভুরু কুঁচকে বললেন, “এ.এম? এটার মানে কী?”
আবির ভাই সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, নাম এ.এম-ই থাকবে।”
বড়ো আব্বু আর কথা বাড়ালেন না। আবির ভাইয়ের জেদ সম্পর্কে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “আচ্ছা, তোর যা ভালো মনে হয় কর।”
খাওয়াদাওয়া শেষ হলো।
দুপুরবেলা। তপ্ত রোদ উঠেছে। শহরের রোদে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ থাকে, যেটা গ্রামের মিষ্টি রোদে নেই। মেঘ আর অরু বসে আছে স্কুলের খেলার মাঠে। টিফিন পিরিয়ড চলছে। আজ মেঝো আম্মু চমৎকার নুডলস করে দিয়েছেন। মেঘ তৃপ্তি নিয়ে খেল। অরু আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে করিয়ে দিল, “মেঘ, আজ থেকে কিন্তু আমাদের কোচিং শুরু।”
মেঘের মুখটা তেতো হয়ে গেল। সে বিরক্ত গলায় বলল, “কয়টা থেকে?”
”চারটা থেকে ছয়টা।”
”আচ্ছা ঠিক আছে। যমে ধরলে তো আর না বলার উপায় নেই।”
অরু একটু ইতস্তত করে বলল, “যাব কীভাবে? আমাদের নিয়ে যাবে কে?”
মেঘ অবাক হয়ে অরুর দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি। সে বলল, “আশ্চর্য! আমাদের সাইকেল আছে না? সাইকেলে প্যাডেল দেব আর চলে যাব। শহুরে রাজকন্যা হওয়ার দরকার নেই।”
অরু খুশি হয়ে বলল, “দারুণ আইডিয়া!”
ঠিক তখনই এক আগন্তুকের প্রবেশ। রোগাটে গড়নের একটা ছেলে এসে গটগট করে ওদের পাশে বসে পড়ল। যেন ওই জায়গাটা সে আগে থেকেই বুক করে রেখেছে। মেঘ ভুরু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকাল। চোখে অবিশ্বাস।
মেঘ সরাসরি প্রশ্ন করল, “কে আপনি?”
ছেলেটা একটু অপ্রস্তুত হওয়ার বদলে বরং বেশ ভাব নিয়ে হাসল। অরু উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা বলল, “আমি মুগ্ধ। তোমাদের থেকে এক ব্যাচ সিনিয়র।”
মেঘ কাঠখোট্টা গলায় বলল, “তা আমাদের পাশে কী কাজ আপনার? সিনিয়রিটি ঝাড়তে এসেছেন?”
ছেলেটা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “না, মানে… এমনিই বসলাম।”
মেঘ আর কথা বাড়াল না। অরুর হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। এই শহরে ‘এমনি এমনি’ বসার লোক অনেক। তাদের পাত্তা দিলেই বিপদ।
বিকেল চারটা। এই সময়টাকে ঠিক বিকেল বলা যায় কি না, এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তপ্ত রোদের তেজটা স্রেফ একটু মিইয়ে এসেছে। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা নেই, তবে রোদে সেই দুপুরের চড়া ভাবটা আর নেই। মেঘ আর অরু তাদের সাইকেল নিয়ে বের হয়েছে। মেঘের পিঠের ওপর লম্বা একটা বিনুনি দুলছে। সেই বিনুনিটা অদ্ভুত; সাইকেলের প্যাডেলের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে সেটি ডানে-বামে সপাটে দুলছে। মেঘ সাইকেলের গতি বাড়িয়ে অরুর পাশে এসে কিছুটা সন্দেহের স্বরে বলল, “অরু, তুই কি নিশ্চিত কোচিংয়ের রাস্তা এটাই? আমার কাছে কেমন অচেনা লাগছে।”
অরু তার চিরচেনা রহস্যময় হাসিটা দিল। যে হাসির কোনো সুনির্দিষ্ট মানে হয় না। সে বলল, “রাস্তা এটাই। বেশি কথা না বলে তুই চুপচাপ চালিয়ে আয়।”
কোচিং সেন্টারে যখন ওরা পৌঁছাল, তখন ঘড়ির কাঁটা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ, ওরা লেট। স্যার হোয়াইট বোর্ডে হায়ার মেথের জ্যামিতির এক জটিল উপপাদ্য আঁকছেন। বৃত্ত, ত্রিভুজ আর স্পর্শকের সেই জটাজাল দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো এক প্রাচীন গুহাচিত্র। ক্লাসে ঢোকার সময় স্যারের চোখ এড়িয়ে ওরা পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসলো। ঠিক তখনই মেঘের নজর পড়ল জানালার ধারের ওই বেঞ্চটায়। সেখানে বসে আছে সেই ছেলেটা মুগ্ধ।
মুগ্ধ নামটা বেশ ভারি। নাম শুনলেই মনে হয় ছেলেটা সারাক্ষণ কোনো কিছুর ঘোরে থাকে। সে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন জ্যামিতির উপপাদ্যের চেয়ে আকাশের নীল রঙটা বোঝা বেশি জরুরি। টিফিন ব্রেকে মুগ্ধর রহস্যময় আবির্ভাব ঘটল। তবে আসল নাটকটা শুরু হলো কোচিং শেষে। ওরা যখন সাইকেলের দিকে এগোচ্ছে, মুগ্ধ তখন উদয় হলো হাতে দুটো অরেঞ্জ আইস ললি নিয়ে। সে বেশ কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে মেঘের সামনে এসে দাঁড়াল। মুগ্ধ নিচু স্বরে বলল, “এই নাও, তোমাদের জন্য।”
মেঘ আইসক্রিমের দিকে ফিরেও তাকাল না। সে সরাসরি মুগ্ধর চোখের দিকে তাকাল। মুগ্ধর চোখে কোনো শয়তানি বা চপলতা নেই, তবে এক ‘মুগ্ধতা’ আছে। যাকে বলে নামের সার্থকতা। মেঘ গম্ভীর গলায় বলল, “আমরা অচেনা মানুষের দেওয়া খাবার খাই না। নীতিমালায় নিষেধ আছে।”
মুগ্ধ যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বিড়বিড় করে বলল, “আমি তো আর অচেনা নই। আমি মুগ্ধ। এক ব্যাচ সিনিয়র।”
মেঘ তড়িৎ উত্তর দিল, “সিনিয়র বলে কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাওয়ানোর লাইসেন্স পেয়ে গেছেন? বড়দের সম্মান করার কথা বইয়ে আছে, আইসক্রিম খাওয়ার কথা কোথাও নেই।”
মুগ্ধর ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে গেল। হিমুর ভাষায় বললে, ‘ছেলেটির মুখ এখন একটি পাকা টমেটোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে’। সে আর কথা বাড়াল না। আইসক্রিম দুটো একরকম জোর করেই অরুর হাতে গুঁজে দিয়ে প্রায় পালিয়ে গেল। অরু আইসক্রিমে একটা কামড় দিয়ে হাসতে হাসতে মেঘের ওপর গড়িয়ে পড়ল। সে বলল, “মেঘ, দেখলি ছেলেটার কাণ্ড? ছেলেটা কিন্তু বেশ কিউট। তোর ওপর ওর জম্পেশ একটা ক্রাশ আছে।”
মেঘ চোখ বড় বড় করে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি, আর অনেকটা অবজ্ঞা। সে বলল, “অরু, তোর এই ক্রাশ-ফাশ মার্কা কথাবার্তা রাখ তো। এসব শহুরে আদিখ্যেতা আমার একদম পোষায় না। চল, সাইকেল নে।”
মেঘ আর কোনো কথা বলল না। সে সাইকেলে উঠে প্যাডেল মারতে শুরু করল। তার বিনুনিটা আবার দুলতে শুরু করেছে। মুগ্ধর দেওয়া আইস ললিটা মেঘ রাস্তার ধারে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কোচিং থেকে ফেরার পথে মেঘের মাথার ভেতর একটা পোকা নড়াচড়া শুরু করল। পোকাটার নাম ‘এ.এম’। আবির ভাই হঠাৎ করে এই নামটা কেন রাখতে গেলেন? এ.এম মানে কি কোনো মানুষের সংক্ষিপ্ত নাম? নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো গূঢ় রহস্য আছে? মানুষের মাথায় যখন একবার কোনো নামের ভূত চাপে, তখন পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসে। মেঘের অবস্থাও এখন তথৈবচ।
পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে। আকাশের রঙটা এখন অবিকল কাঁচা হলুদের মতো। যেন কে একজন আকাশজুড়ে এক বালতি কাঁচা হলুদ বাটা ছিটিয়ে দিয়েছে। হলুদ রঙের আকাশ মানে হচ্ছে প্রকৃতির জন্ডিস। মেঘ নিজের মনেই একটু হাসল। তারপর হঠাৎ দম ফুরিয়ে এল তার। সাইকেলের প্যাডেল থামিয়ে দিয়ে সে বলল, “অরু, একটু দাঁড়া। বড্ড হাঁপিয়ে গেছি।”
অরুও সম্ভবত হাঁপিয়েছিল। সে তর্কে গেল না। দুজনে সাইকেল থেকে নেমে ওটাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল। সাইকেলও যেন ক্লান্ত, চাকাগুলো ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে বিরক্তি প্রকাশ করছে। ঠিক তখনই মেঘের নজর গেল রাস্তার একপাশে। সেখানে একটা সাদা রঙের কার দাঁড়িয়ে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে সাদিফ ভাই। সাদিফ ভাইয়ের পাশে এক সুন্দরী তরুণী। মেয়েটার হাসিতে যেন হিরের কুচি ঝরছে। মেয়েটা বেশ আয়েশ করে সাদিফ ভাইয়ের গাড়িতে গিয়ে বসল। মেঘের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। মানুষের চোখ যে এত বড় হতে পারে, তা মেঘকে না দেখলে বোঝা দায়। সে ফিসফিস করে উত্তেজিত গলায় বলল, “অরু, এই অরু! দেখ, ওটা আমাদের সাদিফ ভাইয়া না?”
অরু সেদিকে তাকাল। তবে তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হলো না। সে নির্বিকার গলায় বলল, “হ্যাঁ। কেন, কী হয়েছে?”
“সাদিফ ভাইয়ার কি গার্লফ্রেন্ড আছে?”
অরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “থাকতেই পারে। জোয়ান মরদ মানুষ, একটা গার্লফ্রেন্ড থাকাটা কি খুব অপরাধের কিছু? অবাক হওয়ার কী আছে এতে?”
মেঘের কৌতূহল তখন তুঙ্গে। সে বলল, “নাহ, এমনি আরকি। চল না, গিয়ে একটু দেখা করি। একটা হাই দিয়ে আসি।”
অরু এবার মেঘের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে কোনো পাগলাগারদের পলাতক আসামি দেখছে। সে গম্ভীর গলায় বলল, “হ্যাঁ, চল যাই। তারপর মাঝরাস্তায় দুইটা চড় খেয়ে কান গরম করে ফিরে আসি। সাদিফ ভাইয়া এখন প্রেম করছে, এই অবস্থায় তাকে ডিস্টার্ব করা মানে হলো চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ানো।”
মেঘের মুখটা বেলুনের মতো চুপসে গেল। সে আর কথা বাড়াল না। আবার সাইকেলে চড়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো। পথে অরু এটা-সেটা নিয়ে অনর্গল কথা বলে চলল। মেঘ শুধু মাঝে মাঝে ‘হুঁ’, ‘হ্যাঁ’ বলে সায় দিল।
রাত আটটা। ঢাকা শহরের রাত আটটা মানেই রিকশার টুংটাং, বাসের বিকট হর্ন আর মানুষের অহেতুক ব্যস্ততা সব মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি অবস্থা। তবে খান বাড়ির ড্রয়িং রুমের আবহাওয়া আজ অন্যরকম। সেখানে উত্তেজনা থিকথিক করছে। বড় সোফাটাতে সবাই বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। আবির ভাই গম্ভীর মুখে বসে আছেন। সাদিফ ভাই আর প্রেমা আপুও আছেন। প্রেমা আপুকে আজ একটু বেশিই পরিপাটি লাগছে। সাধারণ সাজগোজের মধ্যেও একটা বিশেষত্ব আছে। মেঘ অরু’র পাশে কোনোমতে একটু জায়গা খুঁজে নিয়ে বসল। সাইকেল চালিয়ে আসার কারণে শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে এখন হালকা টনটনে ব্যথা। হাত-পা চুলকাচ্ছে আড্ডার ঠিক আগের মুহূর্তে মেঘের এরকম হয়। একে হয়তো বলা যেতে পারে ‘আড্ডার প্রাক-প্রস্তুতি’। হঠাৎ দেখা গেল অরু এক দৌড়ে কিচেন থেকে একটা খালি পানির বোতল নিয়ে হাজির হলো। অরু মেয়েটার মাথা ভর্তি শয়তানি। সে ঘোষণা করল, “আজ হবে ট্রুথ অর ডেয়ার। সত্য বলবে অথবা শাস্তি নেবে।”
মানুষের ভেতরের সত্য বের করে আনাটা মহাজাগতিক কোনো রহস্য সমাধানের চেয়েও কঠিন। অথচ এক টুকরো প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে সেই সত্য উদ্ধারের চেষ্টা চালানোটা দারুণ বিনোদনমূলক। সবাই অরুর কথায় সায় দিল। বোতলটা সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখা হলো। অরু সজোরে বোতলটাতে একটা মোচড় দিল।
বোতলটা বনবন করে ঘুরছে। ঘোরার সময় গোঁ গোঁ শব্দ করছে, যেন সে নিজেও জানে কার দিকে তাকে থামতে হবে। ধীরে ধীরে তার গতি মন্থর হয়ে এল। এক সময় বোতলের সরু মুখটা ঠিক প্রেমা আপুর দিকে গিয়ে স্থির হলো। পুরো ড্রয়িং রুম অমনি একটা সমবেত চিৎকার উঠল, “শিকার ধরা পড়েছে!”
প্রেমা আপু একটু থতমত খেলেন। আগুনের চারপাশে পতঙ্গরা যেমন ওড়াউড়ি করে, সবাই তেমনি সত্যের চারপাশে ওড়াউড়ি শুরু করল। এখন দেখার বিষয়, প্রেমা আপু সত্যের আগুনে পুড়বেন, নাকি সাহসের কোনো ডেয়ার নিয়ে সবাইকে চমকে দেবেন। আসলে জীবনের বেশিরভাগ সত্যই তো আমরা লুকিয়ে রাখি, শুধু এই রকম দুই-একটা রাতে বোতলের মুখে পড়ে তা সামান্য বেরিয়ে আসতে চায়। প্রেমা আপু মুহূর্তের জন্য একটু থতমত খেলেন। মানুষের মনস্তত্ত্ব বড় বিচিত্র; ধরা পড়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা নিজেদের খুব সাহসী ভাবি। তিনি নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে ঠোঁটে একটা ফিকে হাসি ফুটিয়ে তুললেন। সেই হাসিতে জড়তা থাকলেও কণ্ঠস্বরে কাঠিন্য আনার চেষ্টা করে বললেন, “ঠিক আছে, আমি ট্রুথ-ই বেছে নিলাম। আমার জীবনে কোনো লুকোছাপা নেই।”
আবির ভাই পর্ব ১২
অরু সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসল। তার চোখে এখন কয়েক হাজার জিজ্ঞাসার চিহ্ন ঝিকমিক করছে। সে সরাসরি প্রেমা আপুর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল যে গম্ভীরতা সাধারণত কোনো খুনের মামলার আসামিকে জেরা করার সময় উকিলরা ব্যবহার করেন। অরু বলল, “প্রেমা আপু, এবার তবে বলেই ফেলো তোমার ফোন লিস্টে ‘Heart’ ইমোজি দিয়ে কার নাম সেভ করা? খবরদার, সত্যি বলবে কিন্তু!”
