Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ১৪

আবির ভাই পর্ব ১৪

আবির ভাই পর্ব ১৪
উর্মিলা মজুমদার

​অরু সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসল। তার চোখে এখন কয়েক হাজার জিজ্ঞাসার চিহ্ন ঝিকমিক করছে। সে সরাসরি প্রেমা আপুর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল যে গম্ভীরতা সাধারণত কোনো খুনের মামলার আসামিকে জেরা করার সময় উকিলরা ব্যবহার করেন। অরু বলল, “প্রেমা আপু, এবার তবে বলেই ফেলো তোমার ফোন লিস্টে ‘Heart’ ইমোজি দিয়ে কার নাম সেভ করা? খবরদার, সত্যি বলবে কিন্তু!”

​পুরো ড্রয়িং রুমে হঠাৎ পিনপতন নীরবতা নেমে এল। এই নীরবতাকে বলা যেতে পারে ‘আতঙ্কজনক নীরবতা’। সাদিফ ভাই কৌতুহলী হয়ে শরীরটা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে দিলেন। দেখা গেল প্রেমা আপুর ফর্সা মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ঠিক যেমনটা বিকেলে আইসক্রিম হাতে নিয়ে মুগ্ধর হয়েছিল। ​প্রেমা আপু আমতা আমতা করে বললেন, “অরু, এটা কিন্তু রীতিমতো ব্যক্তিগত আক্রমণ! খেলাধুলায় ব্যক্তিগত বিষয় আসা ঠিক না।”
​অরু জেদের স্বরে বলল, “ট্রুথ মানে ট্রুথ। এখানে ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই। সত্য বড়ই নিষ্ঠুর জিনিস আপু, কোনো এক্সকিউজ চলবে না।”
​প্রেমা আপু যেন এক অতল গহ্বরে পড়ে গেছেন। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “নামটা কি আজ বলতেই হবে? অন্য কিছু জিজ্ঞেস কর।”

​মেঘ সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে পপকন চিবাচ্ছিল। সে পপকন চিবানোর মাঝখানে একটা নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো রোমান গ্লাডিয়েটর, যে দয়া দেখাতে জানে না। মেঘ বলল, “অবশ্যই বলতে হবে। শর্ত তাই। সত্য গোপন করা আর চুরির মাল লুকিয়ে রাখা একই কথা।”
​প্রেমা আপু সম্ভবত নামটা বলে দেওয়ার জন্য মুখ খুললেন, ঠিক তখনই বড় ভাই সুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে আবির ভাই ধমক দিয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, “অরু, কারো পারসোনাল বিষয় এভাবে পাবলিক করাটা কিন্তু একদমই উচিত নয়। আমাদের মনে রাখা উচিত আমরা ড্রয়িং রুমে বসে আছি, কোনো আদালতের কাঠগড়ায় নয়। সবার একেকটা নিজস্ব পারসোনাল লাইফ আছে।”
​আবির ভাইয়ের ধমকে মেঘ চুপচাপ বসে দৃশ্যটা উপভোগ করছে। আপনি দর্শক সারিতে বসে জগতের তামাশা দেখতে পারেন, আবার সেই তামাশার অংশও হতে পারেন। প্রেমা আপুর মুখের রক্তহীন সাদা ভাবটা এখনো কাটেনি, আর অরুর চোখে তখনো শিকার ফসকে যাওয়ার অতৃপ্তি। ​আবির ভাইয়ের ধমক খেয়ে চারদিকের উত্তেজনায় যেন এক বালতি ঠান্ডা জল পড়ে গেল। সবার মুখ মুহূর্তেই চুপসে গেছে। অরু মেয়েটা সহজে হার মানার পাত্রী নয়।

সে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট করে বোতলটা আবার ঘুরিয়ে দিল। বোতলটা এবার যেন একটু বেশিই উৎসাহ নিয়ে ঘুরল এবং সমস্ত নাটকীয়তা বজায় রেখে তার সরু মুখটা থামল সরাসরি আবির ভাইয়ের দিকে। ​আবির ভাই এবার পরিষ্কার থতমত খেলেন। যাকে বলে নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পড়া। অরু দাঁত বের করে হাসল। সেই হাসিতে বিচ্ছু বাহিনীর সেনাপতির তৃপ্তি। সে বলল, “আবির ভাই, এবার আপনার পালা। পালানোর পথ কিন্তু বন্ধ।”
​আবির ভাই শুকনো একটা ঢোক গিললেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “ঠিক আছে, আমি ট্রুথ-ই বেছে নিলাম।”
​মেঘ সোফায় নড়েচড়ে বসল। সে সরাসরি প্রশ্নটা করল, “আবির ভাই, আপনি যে রাঙামাটির প্রজেক্টের নাম দিয়েছেন ‘এ.এম’ এই রহস্যটা কী? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় অর্থ আছে। নামটা কি আমাদের বলা যায়?”

​আবির ভাইয়ের চেহারা এক মুহূর্তে পাংশু হয়ে গেল। এসি চালিত ড্রয়িং রুমেও দেখা গেল তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। মানুষের অবচেতন মন বড় বিচিত্র; যখন সে কোনো কিছু লুকোতে চায়, তখন শরীরের ভাষা তা ফাঁস করে দেয়। তিনি জোর করে একটা হাসি মুখে এনে বললেন, “আরে না, ওটার কোনো বিশেষ মানে নেই। এমনিতে মাথায় এল, তাই দিয়ে দিলাম।”
​মেঘ এবার একটা জুতসই ফোড়ন কাটতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কিচেন থেকে মেঝো আম্মুর ডাক ভেসে এল, “মেঘ! একটু এদিকে আয় তো মা!”
​মেঘের তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় দশা। আড্ডার এমন একটা মোক্ষম সময়ে কেন তাকে কিচেনে যেতে হবে? সে বেশ বিরক্ত হয়েই উঠে গেল। জানা গেল মেঘের আব্বু ফোন দিয়েছেন, জরুরি কিছু কথা আছে। ​বেশ খানিকক্ষণ পর মেঘ যখন ড্রয়িং রুমে ফিরে এল, তখন পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে। সেই জেরার টেবিল নেই। সেখানে এখন গান খেলা করছে। আবির ভাই হাতে গিটার তুলে নিয়েছেন। তাঁর আঙুলগুলো তারের ওপর দিয়ে খেলে যাচ্ছে। তিনি গাইছেন-

​”ওও একটা প্রেমের গান লিখেছি।
আর তাতে তোর নাম লিখেছি।
মাঝরাতে বদনাম হয়েছে মন।
যেই না চোখের ইচ্ছে হলো।
তোর পাড়াতে থাকতেই গেল।
ডাকনামে তোর ডাকতে গেল মন”
​মেঘ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কাঠ হয়ে গেছে। গানের কথাগুলো ড্রয়িং রুমের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে, আর সেই প্রতিটা ধাক্কায় মেঘের ভেতরের সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। আবির ভাই গানটা শেষ করে কারও দিকে না তাকিয়েই উঠে দাঁড়ালেন। তারপর মন্থর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। ​পুরো ড্রয়িং রুম হঠাৎ খুব ফাঁকা মনে হতে লাগল। মেঘের মনটা কোনো এক অজানা বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছে। কয়েক মিনিট আগের সেই হাসাহাসি, ট্রুথ-অর-ডেয়ারের সেই আনন্দ সবই যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল।

ড্রয়িং রুমটা খা খা করছে। একটু আগেও এখানে প্রেমা আপু আর সাদিফ ভাইয়ার ছিল। তারা চলে যাওয়ার পর যেন ড্রয়িং রুমটা হঠাৎ খুব বেশি বড় হয়ে গেছে। মেঘ একা চুপচাপ বসে আছে সোফায়। সে আপনমনেই কী যেন গুণগুণ করছে। ​মানুষ যখন খুব বেশি নিস্তব্ধতায় থাকে, তখন সে নিজের অজান্তেই নিজেকে শোনানোর জন্য শব্দ তৈরি করে। মেঘও তাই করছিল।
​হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা নাশ হয়ে গেল ফোনের রিংটোনে। মেঘের ঘোর ভাঙল। সে দেখল সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর সাদা রঙের আইফোনটা পড়ে আছে। আবির ভাইয়ের ফোন। মেঘ জানে এই ফোন ধরা ঠিক হবে না। অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়া অপরাধ। কিন্তু নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের চিরন্তন এক টান থাকে। মেঘ মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফোনটা হাতে তুলে নিল। ​স্ক্রিনে তাকিয়ে মেঘের ভুরু কুঁচকে গেল। কোনো নাম নেই, একটা অচেনা নম্বর। ​হঠাৎ মেঘের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। মানুষের হৃৎপিণ্ড কোনো কারণ ছাড়াই মাঝে মাঝে অবাধ্য হয়ে ওঠে। মেঘ জানে না সে কেন এটা করছে, কিন্তু সে রিসিভ বাটনটা চেপে কানে ধরল। এপাশ থেকে কোনো শব্দ করার সাহস তার নেই। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ​ওপাশ থেকে একটা চটপটে মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল, “আবির? কেমন আছো?”

​মেঘ উত্তর দিল না। তার নিঃশ্বাস থেমে গেছে। ওপাশ থেকে মেয়েটি আবার বলল, “তুমি আমার কল কেন রিসিভ করছ না? শুনতে পাচ্ছ? আমি মিরা। ওই যে সেদিন পার্টিতে দেখা হলো আমাদের… মনে পড়ছে না? তুমি সেদিন থেকে আমাকে অ্যাভয়েড করছ। হোয়াই আবির? বাই দ্য ওয়ে, আমি আগামীকাল পাপার হয়ে মিটিংয়ে জয়েন করব। তু—”
(#আবির_ভাই উপন্যাসটি বই হিসেবে বেড়িয়েছে। আপনারা চাইলে এক্ষুণি প্রি-অর্ডার করতে পারেন।)
​মেয়েটির কথা শেষ হওয়ার আগেই মেঘের হাত থেকে ফোনটা আলগা হয়ে সোফার গদিতে পড়ে গেল। অপরাধবোধ আর নামহীন কোনো যন্ত্রণা তাকে গ্রাস করল। ​মেঘ এক মুহূর্ত আর সেখানে দাঁড়াল না। আবির ভাইয়ের ফোনটা কোথায় থাকল, বা সেটা কে তুলে নেবে—সেসব নিয়ে ভাবার ক্ষমতা তখন তার নেই। সে দৌড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে সে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল।
সেই রাতে মেঘকে আর কেউ রুম থেকে বের হতে দেখেনি।

পরদিন সকালে মেঘের ঘুম ভাঙল অনেক ভোরে। ভোরে ঘুম ভাঙা বাঁদর ঘরানার মানুষের কাজ নয়, তারা সাধারণত দুপুর অবধি ঘুমায়। কিন্তু মেঘ আজ ব্যতিক্রম। মেয়েটা কি আদৌ সারা রাত ঘুমিয়েছে? চোখের নিচে কালচে দাগ। সেখানে এক সমুদ্র ক্লান্তি নাকি এক আকাশ বিষণ্ণতা জমে আছে, তা বোঝা দায়। অরু যখন মেঘকে ডাকতে এল, তখন সে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ল। মেঘ তার আগেই বিছানা ছেড়েছে। একেই বোধহয় বলে ‘আশ্চর্যের ওপর আশ্চর্য’। সারা বাড়ি খুঁজে মেঘকে পাওয়া গেল ছাদে। সে একা একা দোলনায় দুলছে।
অক্টোবরের আকাশ আজ বড্ড ভার। মেঘ জমলে আকাশকে দেখতে বড় অভিমানী লাগে। অক্টোবর এলেই এই মেঘেদের খুব বাড়বাড়ন্ত হয়। তারা দল বেঁধে আসে, যেন কোনো গোপন সভার আয়োজন। অরু ধীর হয়ে মেঘের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘ তখন গুনগুন করে গাইছে—

“আকাশের ঐ নীল ঠিকানায়
মেঘেরা সদা ডানা ছড়ায়
ওদেরই সেই ভালোবাসা
এ মনে আজ পেয়েছে ঠাঁই”
গান শেষ হতেই অরু মোক্ষম সুযোগটা কাজে লাগাল। পেছন থেকে হুংকার ছাড়ল, “ভাওওওওও!”
সাধারণ মেয়ে হলে অন্তত হাত থেকে ফোনটা ফেলে দিত কিংবা ছোটখাটো একটা চিৎকার দিত। কিন্তু মেঘ চমকাল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে দোলনা দুলিয়ে যেতে লাগল। অরু কিছুটা হতাশ হলো। অবাক হয়ে বলল, “কীরে, তোর হয়েছেটা কী আজ?”
“কই, কিছু হয়নি তো।”
“তাহলে আজ যে সূর্য ওঠার আগেই তুই জেগে উঠলি?”
মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে সরু গলায় বলল, “এমনি। ঘুমটা খুব ভোরেই আজ আমাকে ছেড়ে পালিয়েছে।”

“কী জানি বাবা! আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে কে জানে?”
“আজ সূর্য উঠবে না অরু। আজ বৃষ্টি হবে।”
তখনই পেছন থেকে মেঝো আম্মুর রাজকীয় কণ্ঠ শোনা গেল। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, “হয়েছে তোদের আর রিচার্জ করতে হবে না। অনেক হয়েছে।”
মেঘ ভুরু কুঁচকাল। ‘রিচার্জ’ দিয়ে মেঝো আম্মু ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন তা বুঝতে মেঘের মতো বুদ্ধিমতীরও সময় লাগছে। অরু মেঘের মাথায় একটা টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আম্মু মাঝেসাঝে ভুলভাল ইংরেজি বলে ফেলে। ওটা রিসার্চ হবে।”
এরপর গলা উঁচিয়ে বলল, “উফ আম্মু! ওটা রিচার্জ নয়, রিসার্চ। রিসার্চ!”

আবির ভাই পর্ব ১৩

মেঝো আম্মু দমবার পাত্রী নন। তিনি ঝামটা দিয়ে বললেন, “আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটাই। এখন তোরা ভাগ। কলেজে যা দ্রুত। আবির গাড়ি বের করবে। ও বের হয়ে গেলে তোরা আর লিফট পাবি না।”
আবির ভাইয়ের নাম শুনতেই মেঘের মধ্যে কেমন একটা চঞ্চলতা দেখা দিল। সে দোলনা ছেড়ে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটার মাথায় যে কী খেলা করছে, তা বিধাতা পুরুষ ছাড়া আর কেউ জানে না। ঝটপট তৈরি হওয়ার জন্য সে রুমের দিকে ছুটল। খাল বাড়ির দুই বাঁদর— অরু আর মেঘ এখন মহাব্যস্ত।

আবির ভাই পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here